মাওলানা ভাসানী হল সংলগ্ন। সূর্য আজ দাপট দেখায়নি। পথে-ঘাঁটে জলের সিক্ততা হলের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ করেছে। নাযীফ ঘুরে ঘুরে নিজের হলে এসে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরল,
- স্যার, ভেতরে যাবেন?
শোয়েব পকেটে দুহাত গুঁজে ছিমছাম হলটা দেখল। লাল ইটের উঁচু ভবন। বয়সের ছাপ পরলেও আভিজাত্য হারায়নি। শোয়েব সম্মতিসূচক নাড়ল,
- যাওয়া যায়, নাযীফ।
- তাহলে আসুন, স্যার।
যেতে যেতে শ্রেষ্ঠার দিকে বলল,
- শ্রেষ্ঠা, বাইরে থাকবি?
শ্রেষ্ঠা তখন সোহানা ও শাওলিনের সাথে কথায় মগ্ন। তর্জনীতে দূরের বেঞ্চ দেখিয়ে বলল,
- আমরা ওদিকে বসছি। তুই ভাইয়াকে হলটা দেখিয়ে নিয়ে আয়।
- ঠিকআছে।
নাযীফ শোয়েবকে পথ দেখিয়ে ভেতরে গেল। তিনজন পা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বেঞ্চে বসলো। শাওলিন অনেকক্ষণ ধরেই চুপচাপ। কিছু একটা নিবিড় মনে ভাবছে। সোহানা খয়েরি রঙের হাঁটু ছুঁই কুর্তিটা ঢোলা জিন্সের ওপর টানটান করে বলল,
- কাল কী হয়েছিল?
প্রশ্নটা শুনে শাওলিন চমকে তাকাল। ফের নতমুখে বলল,
- দুপুরে কল দিয়েছিলাম। রাতে ধানমন্ডি থেকে ফিরে দেখি, ড্রয়িংরুমে বসে ম্যাচ দেখছে।
সোহানা বিস্ময়ে আঁতকে উঠল। উত্তেজিত স্বরে বলল,
- ফ্ল্যাটের চাবি কোথায় পেল?
- জানি না।
বলেই বেঞ্চের ধারগুলো দুহাতে ধরল শাওলিন। কথাটা শুনে শ্রেষ্ঠা কেমন উদ্বিগ্ন হলো। খোঁপাটা বেঁধে বিচলিত সুরে বলল,
- কাল কী কোনো ঝামেলা করেছেন?
শাওলিন কথাটা মুখে এনেও গিলে ফেলল। একবুক গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
- আরেকটু হলে, খুন করে ফেলতো।
শ্রেষ্ঠার আর সোহানা বেশ উদ্বিগ্ন হলো। একসঙ্গে দুজন বলে উঠল,
- কাকে?
- রেবেকা মণিকে। ফুলদানি দিয়ে মারতে যাচ্ছিলেন। আমি না থাকতে আজ হয়ত আইসিউতে থাকতেন।
কথা শুনে কেউ কথা বলতে পারল না। হতবাক দৃষ্টিতে নিজেদের দেখল দুজন। শাওলিন চুপ করে আছে। মনে সহর্ষ ভয় জোঁকের মতো জেঁকে বসেছে। মাথাটা অনিশ্চিত ভাবে ডানে-বামে নাড়িয়ে ধীরগলায় বলল,
- কাল যা দেখেছি, তারপর থেকে মনে হচ্ছে আমাকে কেউ কিছু জানাচ্ছে না।
সোহানা চকিতে জিজ্ঞাসা করল,
- মানে?
শাওলিন চোখ তুলে বলল,
- সবাই যেন কিছু লুকাচ্ছে।
বিপরীত মুখে বসে ছিল শ্রেষ্ঠা। নিচের ঠোঁট কামড়ে চিন্তাসুরে বলল,
- আমার সন্দেহ নাযীফের দিকে যাচ্ছে।
কথাটা শুনে ঝট করে সোহানা তাকাল। ভ্রুঁ কুঁচকে অস্থির স্বরে বলল,
- কেন?
- ওই ক্যামেরাটায় . .
শ্রেষ্ঠা রহস্য করে থামল। দুজনের দিকে ফের বলে উঠল,
- ও যেভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকল, তারপর থেকে ক্যামেরার কথা একবারও বলতে চায়নি। ব্যাপারটা স্বাভাবিক লাগেনি।
দপ করে জ্বলে ওঠা সোহানা ফুৎকার দেয়া মোমের মতো নিভে যায়। সোহানা নিচু স্বরে বলল,
- তুই ওকে জিজ্ঞেস করেছিস?
- করেছি। এড়িয়ে গেছে।
শাওলিন স্থির চোখে শ্রেষ্ঠার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে বেসামাল প্রশ্ন নিয়ে বলল,
- তোমার কী মনে হয়? ক্যামেরাটার সঙ্গে সবকিছুর সম্পর্ক আছে?
শ্রেষ্ঠা দুঠোঁট মুখের ভেতর রাখল। একমুহুর্ত ভেবে বলল,
- জানি না, জানা।
শাওলিনের দিকে তাকাল শ্রেষ্ঠা। শ্বাস ছেড়ে বলল,
- মন থেকে চাই, কিছুই না থাক।
উত্তরটা এমন, যেখানে অনিচ্ছুক মন শঙ্কার সাগরে ডুবে যায়। সোহানা আপাদমস্তক বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ঘূর্ণিঝড় বইছে। শাওলিন স্থিরভাবে বসেছিল। শ্রেষ্ঠা নিষ্পলক চোখে ফোনের স্ক্রিন দেখছে। রাহাতের নম্বরটা ওই মানুষটার ফোনে সেভ করেছে। মন বলছে কাজটা ভালো হয়নি!
ভাসানী হলের করিডোর প্রায় নিস্তব্ধ। বেশির ভাগ ছাত্র এখনো ঘুমিয়ে। নাযীফ নিজের রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। শোয়েবও ঢুকে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ছেলে মানুষের রুম হিসেবে আশ্চর্য রকম গুছানো। নাযীফ পড়ার টেবিলের খাতা সরাচ্ছিল। ঠিক তখনি পেছন থেকে শোনা গেল,
- তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।
দুটো হাত সহসা থমকে গেল। নাযীফ পুরোপুরি নিথর, নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরাতেই সংকোচে বলল,
- কেন, স্যার?
ঘরের বাতাস কেমন যেন হিমশীতল হয়ে গেছে। নাযীফ পিঠ বরাবর ঠাণ্ডা শিহরণ টের পাচ্ছে। শোয়েব এক পা এগোতেই বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল! চকিতে কিছু করবে, তার আগেই শোয়েব সমুখে দাঁড়িয়ে বলল,
- ভেবেছিলাম শাওলিনের কান্নার কারণ তুমি। তাই তোমার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখলাম, তুমি চুপ আছ।
নাযীফ কণ্ঠার কাছে ঢোক গিলতে পারল না। চোখে ভয়ের ছাপ। বুকের ভেতর প্রচণ্ড ধক্ ধক্ নিয়ে বলল,
- আপনি কেন ভাবছেন আমি কিছু জানি?
একটু আগের নাযীফ পুরোপুরি বদলে গেছে। ছেলেটার সুন্দর মুখ শোয়েবের শান্ত অবয়বের সামনে শিরশির করছে। শোয়েব ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে বলল,
- কারণ, আমি জানতাম না তুমি শাওলিনের ভালো চাও।
নাযীফ অজান্তেই পিছিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কোমরের কাছে শক্ত অবলম্বন ঠেকলে, দুহাতে পেছনের টেবিল ধরে বলল,
- আপনি সব জানিয়ে দিন, স্যার। এতো বড়ো বেইমানি করবেন না। আমি ওর চোখে আপনার জন্য সম্মান দেখেছি।
শোয়েব দ্ব্যর্থ হাসিটা ঠোঁটে রেখেই বলল,
- আমি সম্মান পেতে এমনটা করছি না। ওই চোখে অন্যকিছু দেখেছি। আমি চাই না সেটা কখনো দূর হোক।
- আপনি সত্যকে অন্ধকারে রাখছেন।
- হয়ত।
- অন্ধকারেও যে আলো জ্বলে, তা আপনি ভুলে যাচ্ছেন স্যার। এমন কিছু করবেন না, যে নিয়ম আপনি নিজের হাতে বানাচ্ছেন, সেই হাতই একদিন কেটে যাবে।
শোয়েবের চেহারা হঠাৎ রাগে পরিণত হচ্ছিল। কিন্তু কাতর ভঙ্গিতে বদলে গেল। যেন অভিজ্ঞ কোনো অভিনেতা নিজের দুঃখ প্রকাশে ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর স্তিমিত করে বলল,
- শাওলিন ন্যায়-অন্যায় বোঝে। যখন বুঝবে আমি অন্যায় কিছু করিনি, তখন কী আমাকে সমর্থন দেবে না?
নাযীফ হঠাৎ জোর গলায় বলে উঠল,
- বিবেকের আইনে কী করবেন? সেই আইনের কাছে আপনি সবসময়ই ---
শব্দটা উচ্চারণ করতে পারল না নাযীফ। কণ্ঠস্বর থমকে এসেছে। শোয়েব চোখবন্ধ করে ভেতরের উত্তপ্ত কিছুকে ঠাণ্ডা করে তাকাল। বেশ শান্ত ও ধীর গলায় বলল,
- তুমি সোহাকে ভালোবাসো। দারুণ মিষ্টি একটা মেয়ে। একদিন ঘর সাজিয়ে বউ বানিয়ে সঙ্গী করে নেবে। নেবে না?
নাযীফ বুকে হিম্মত রেখে বলল,
- আসমান আর জমিন এক করবেন না। আমি সোহাকে ভালোবাসি, কিন্তু এর মানে এ নয় আমি বিবেক বিসর্জন দেব। আপনি এই মুহুর্তে যা করছেন, সেটাকে মানুষরূপী কাজ বলে না। আপনার একটা ভুলে অনেকগুলো মানুষের নাম মৃত্যুর কাতারে চলে গেছে। ওকে সব বলে দিন স্যার। জানা বোকা নয়। ও আমাদের ভেতর সবচেয়ে বিচক্ষণ মানুষ। যার জীবনে হারানোর কিছু নেই, তাকে আর দুঃখ দিয়েন না স্যার।
শোয়েব চোখ ও চেহারা কাতর ভঙ্গি থেকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফিরিয়ে আনে। কপালের ওপর একগুচ্ছ চুল তার ভ্রুঁকে ছুঁয়ে আছে। কিছুক্ষণ একভাবে পরখ করে ঘাড়টা ডানে কাত করে বলল,
- যার কিছু পাওয়ার যোগ্যতা নেই, তার চেয়ে চরম ভিখারি আর কে আছে?
ভঙ্গিটা দেখে নাযীফ আর কোনো কথা বলল না। মনে হলো বিকারগ্রস্ত খুনি কথাটা শোনাল। শোয়েব ডান পকেট থেকে একটা বাণ্ডিল বের করে টেবিলে রাখল। ঘাড়টা সোজা করে ভদ্রগলায় বলল,
- আর কিছুদিন সময়। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
অন্য পকেট থেকে আরেকটি বাণ্ডিল বের করে একইভাবে টেবিলের ওপর রাখল। চশমা পড়ুয়া সুদর্শন চেহারাটা শান্ত করে বলল,
- ভয় পেয়ো না। আমার অনুমতি ছাড়া কেউ এ মুখো তাকাবে না। নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করো।
নাযীফ হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। শুধু নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল শোয়েবের শান্তমুখে। শোয়েব পা ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে ঘাড়টা ডান বরাবর পিছু করল,
- ওগুলো ক্যামেরার জন্য। নতুন একটা কিনে নিও।
শোয়েব বেরিয়ে গেল। আস্তে করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ হলো। নাযীফ টেবিলে তাকাল। নিরুপায় ভাবে গভীর দম ছাড়ল সে। এমন সময় খটাশ করে শব্দ হলো। সমস্ত গা কাঁপিয়ে চমকে তাকাল নাযীফ। বারান্দার দরজা খুলে কেউ দাঁড়িয়ে আছে! সেদিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে নাযীফ আমতা আমতা করে বলল,
- সে. .সেলিম?
সেলিম এক পা ভেতরে দিয়ে টেবিলের দিকে তাকাল। ফের নজর সরে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল,
- আমি জানতাম তুই চুপ করে আছিস।
সেলিমের শান্ত চেহারা বলে দিচ্ছে সব শুনে ফেলেছে সে। বারান্দায় কখন ঢুকেছে নাযীফ জানে না। সিগারেটের শেষ টুকরোটা পাশের ডাস্টবিনে ছুড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে এল সেলিম। এগোতে এগোতে প্রশ্নবিদ্ধ গলায় বলল,
- মির্জা নাম কেটে দিলেও মানুষ চিনতে ভুল করিনি!
নাযীফ বন্ধুর চোখে চোখ মেলাতে পারল না। মাথা নিচু করে ধপ করে বিছানায় বসল। সেলিম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
- তুই ভুল করলি রে। সেদিন বারবার বলেছিলাম, ওদিকে যাস না। তুই শুনিসনি।
নাযীফ দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। দম নিতেও আজ কষ্ট হচ্ছিল যেন। চোখ বন্ধ করতেই আবার সবকিছু ফিরে এল। আজও সেই দিনের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। যদি সেদিন সেলিমের কথাটা শুনত?
সেদিন শ্রেষ্ঠা, সোহানা, জিদান, রোজা আর সেলিম ট্রাভেল ব্যাগ খুলে পোশাক বের করছে। ঘরের এক কোণে জ্বরতপ্ত শরীর নিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে শাওলিন। নাযীফ ট্রেকিং বুটের ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বলল,
- এটা খাগড়াছড়ির সেই ভয়ংকর স্পট, যেখানে দিনের বেলা অস্বাভাবিক কিছু ঘটে। এই জায়গার কথাই আর্টিকেলে ছিল।
জিদান বিরক্ত মুখে বলল,
- বালের আর্টিকেলে ভরসা না করলে চলে না? কোন রামছাগলের বুদ্ধিতে একটা অ্যানোনিমাস আইডিকে এত গুরুত্ব দিস?
নাযীফ কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। চেস্টব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। ক্যামেরার স্ট্র্যাপ ঠিক করল। দরজার দিকে এগোতেই সেলিম বলল,
- এই! একা যাবি?
- হ্যাঁ। কেন?
- অন্তত কাউকে নিয়ে যা।
- আরে এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না।
সেলিম সাবধান করতে বলল,
- জায়গাটা এমনিতেই সমস্যা। তোর বাড়াবাড়িটা কিন্তু ভালো লাগছে না, নাযীফ।
নাযীফ ততক্ষণে ঝটপট বেরিয়ে গেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে সেলিম অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। মাথার ওপর তখনও মেঘ জমেনি।
ম্যাপে লাল কালিতে চিহ্ন দেওয়া পথ ধরে হাঁটছিল নাযীফ। চারদিকে ঘন জঙ্গল। বুনো গাছের গায়ে লতা জড়িয়ে আছে। অদ্ভুত সব পাখির ডাক। দূরে কোথাও অচেনা কোনো প্রাণীর গর্জন শোনা গেল। তবু ভয় না পেয়ে এগিয়ে চলল নাযীফ। বাঁ হাতে ক্যামেরা। ডান হাতে লোহার হাতল লাগানো লাঠি। পথের প্রতিটি দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করছে।
হঠাৎ যেন আলো কমে এল। নাযীফ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। কালো মেঘ পুরো আকাশ ঢেকে ফেলেছে। চারধারে অস্বাভাবিক হারে অন্ধকার নামছে। সে একবার পেছনে তাকাল। ফিরে যাবে? নাকি এগোবে? মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মনকেই হারিয়ে দিল। অদম্য সাহসে ঘন গহিন অরণ্যে প্রবেশ করল। একটা শেকড় মাটি থেকে সামান্য উঁচু হয়ে ছিল। পা বাঁধিয়ে মুখ থুবড়ে আছড়ে পরল সে। স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা মাটিতে পাতা পঁচার দুর্গন্ধ ধাক্কা দিল নাকে। দুহাতে ভর দিয়ে উঠতেই সামনে চোখ পড়ল। একটা প্রাচীন দেয়াল। কিন্তু ইটের নয়। লতা-পাতা, শেকড় আর অদ্ভুত গাছপালায় গড়ে ওঠা বিশাল প্রাকৃতিক প্রাচীর। মাথা তুলে তাকাল নাযীফ। দশ বা বারো ফুট উঁচু। নাযীফ ধীরে ধীরে হাত রাখল দেয়ালের গায়ে। হিমঠান্ডা। অস্বাভাবিক ঠান্ডা। ঠিক তখনই সড়াৎ করে শব্দ হলো! নাযীফ বিস্ময়ে চোখ বড়ো করে ফেলেছে। ডান হাতের লাঠিটা হঠাৎ দেয়ালের গায়ে সেঁটে গেছে! ভয় পেয়ে যায় নাযীফ! উল্কাবেগে দু পা পিছিয়ে যায়! শুষ্ক ঢোক গিলল নাযীফ। একপা দুপা করে বিন্দু বিন্দু সাহস সঞ্চয় করে এগোতে গেল সে। লাঠিটা হোটেল ম্যানেজার থেকে নেয়া। কিছু টাকার বিনিময়ে লাঠিটা পেয়েছে। নাযীফ হাত বাড়িয়ে লাঠিটা খিঁচে টান মারল। অমনেই লাঠিটা তীব্র আকর্ষণে ফের আগের জায়গায় চলে গেল। এবার নিশ্চিত হলো নাযীফ, বুঝতে পারল এখানে ম্যাগনেটিক ফিল্ড বিদ্যমান। কোনো শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র এখানে গুপ্তভাবে লুকোনো। কিন্তু... জঙ্গলের ভেতরে? প্রাকৃতিক দেয়ালে? অসম্ভব! ভয় আর বিস্ময় মিলেমিশে আক্রমণ করল! সে দ্রুত ক্যামেরা বের করে দৃশ্য ধারণ শুরু করল। তারপর ব্যাগ থেকে ম্যাপ বের করল সে। লাল কালিতে জায়গাটার ওপর একটা বড় গোলচিহ্ন এঁকে, তার মাঝখানে ক্রস টেনে দিল। হাত কাঁপছে। তবু লিখে রাখল। কারণ সে জানত, এমন জায়গা জীবনে দ্বিতীয়বার নাও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তখনও নাযীফ জানত না, দেয়ালটাই সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস নয়!
ম্যাপটা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢোকাতে যাচ্ছিল নাযীফ।
ঠিক তখনই কাঁধের ওপর ভারী একটা হাত এসে পড়ল। এক মুহূর্তে তার সমস্ত শরীর জমে যায়। নিঃশ্বাস আটকে পড়ল বুকের গহিনে। মনে হলো, হৃদপিণ্ডটা যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। সে ঘাড় ঘোরানোর সাহস পেল না।চারপাশ ভয়ানক নিস্তব্ধ। শুধু দূরে বজ্র গর্জে উঠল। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটা পড়ল তার গালে।
নাযীফের আঙুল থেকে ক্যামেরাটা প্রায় ফসকে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে, ঢোক গিলে, মাথা ঘোরাতে শুরু করল নাযীফ!
নাযীফ আচমকা দুহাতে মুখ সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরের ভেতর যেন অক্সিজেন কমে এসেছে। সেলিম স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নীরবতাটাই যেন সব কথা ব্যক্ত করে দিচ্ছে। সেলিম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নাযীফের কাঁধে হাত রাখল।
- এরপরও কী মনে হয়, চুপ করে থাকাটা ঠিক হচ্ছে?
নাযীফ শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।
গলা খটখটে শুকনো। অনেক কষ্টে বলল,
- আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
- জানাকেও না?
প্রশ্নটা শুনে নাযীফ চোখ বন্ধ করে বলল,
- ওকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি বলেই কিছু বলতে চাইছি না।
এ কথায় সেলিমের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রাগারুণ দৃষ্টিতে বলল,
- তুই যত দেরি করছিস, তত বিপদ বাড়ছে।
- আমি সেটা জানি, সেলিম।
- তাহলে উনাকে বাঁচাচ্ছিস কেন?
নাযীফ জানালার বাইরে তাকাল। মেঘের মুকুট পড়েছে আকাশ। ঝড়-জলের আভাস স্পষ্ট। মেঘের মতো জমাট গম্ভীর গলায় বলল,
- মানুষের বানানো আইনে এ দেশ চলে। কিন্তু যারা আইন বানায়, তারাই তো অমানুষ রে।
গলার কাছে ব্যথার মতো কিছু একটা আঁটকে আছে। সেই ব্যথা এতোটাই তীব্র যে, নাযীফ ঢোক গিলতে পারলো না।
—————
কোয়ার্টারের বারান্দাগুলো প্রশস্ত ও বিশাল। সামনে মুক্ত উঠোন। সবুজে ঢাকা ঘাসের আস্তরণে বৃষ্টির ফোঁটা চিকচিক করছে। বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে দূরের পাহাড় আর ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রেবেকা। হাতে মোবাইল ফোন। টেবিলের ওপর এক কাপ ঠান্ডা চা। বিস্কুটের প্লেট এখনো ছোঁয়া হয়নি। তার চোখ বারবার ফোনের স্ক্রিনে চলে যাচ্ছে। যেন বহু প্রতীক্ষিত কারো কলের অপেক্ষায়। হঠাৎ ভুম ভুম মোবাইলটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই বিশেষ নম্বর। রেবেকার চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চট করে রিসিভ করতেই কানে ধরল রেবেকা। গুরুগম্ভীর স্বরে এক পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল,
- কেমন আছেন, আপা?
রেবেকা 'আপা' ডাক শুনে বিরক্ত হলো। কণ্ঠে তেজ মিশিয়ে জানাল,
- আপনাকে আপা ডাকতে নিষেধ করেছি। কলটা যার, তাকে দিন।
ওপাশ থেকে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল লোকটা। যেন জং ধরা দরজা শব্দ করছে। লোকটা রসিকতার আভাসে বলল,
- ও মোর খোদা! ভুল করি ফেলালাম!
ইচ্ছাকৃত আঞ্চলিক টানে মশকারা করল লোকটা। পরক্ষণে মোদ্দাকথায় ফিরল,
- একটু ধৈর্য রাখেন। লাইনে আসছে।
রেবেকা এমনিতেও ধৈর্য ধরতো। না বললেও ধরতো। অন্তত এই ক্ষেত্রে অবশ্যই ধৈর্য ধরাকে মূল্যবান মনে করে। ঠিক পাঁচ মিনিট অতিক্রম হলো। রেবেকা তখনো ফোন ছাড়ল না। হঠাৎ নিশ্বাসের শব্দ দ্বারা কেউ যেন উপস্থিতি বোঝাল। রেবেকার শরীরে রক্ত চলাচল বেড়ে গেল। কণ্ঠস্বর আঁটকে এল, ঝিঁঝিঁ করে উঠল মাথা। ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠে বলল,
- কী ব্যাপার? এই নম্বরে কল দিয়েছ কেন?
রেবেকা ঠোঁটের কাছে হাত রেখে বলল,
- কবে আসবে?
- তুমি পরেছ?
- কী?
- যা পড়তে বলেছি?
রেবেকা নাক-মুখ রক্তিম করে ফেলল। প্রত্যুত্তরে চাপা গলায় নরমসুরে বলল,
- হুঁ।
- আধঘণ্টার ভেতর আসছি। এসে কিন্তু দেরি করব না।
- আধঘণ্টা?
- হ্যাঁ।
- রাতে থাকবে না? এখন কোয়ার্টার ফাঁকা। পূজার ছুটিতে সবাই চলে গেছে।
- সন্দেহ জাগানো যাবে না। তোমার চাকরি, আমার চাকরি দুজনেরই যাবে।
রেবেকা ভয় নিয়ে চুপ হলো। এই প্রসঙ্গে কখনো যুক্তি খাটে না। রেবেকা প্রতীক্ষিত সুরে বলল,
- দ্রুত আসেন। অপেক্ষা করছি।
কলটা কেটে দেয় রেবেকা। আধঘণ্টার ভেতর ডাবল রুমের ফ্ল্যাটটা গুছিয়ে ফেলে। আয়নায় নিজের দিকে তাকায়। দেহের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের ভরা দীপ্তি। স্বামীর সান্নিধ্য খুব বেশিদিনের ছিল না। বয়স ত্রিশের ঘর ছুঁলেও মনের দিক থেকে চঞ্চলা কিশোরীই অনুভব করে। নিজেকে নিয়ে মগ্ন সময় কাটাতে কাটাতে কখন যে আধঘণ্টা চলে যায় সে হুঁশ রেবেকার নেই। কলিংবেলের শব্দে ভ্রম ভাঙে রেবেকার। দুরন্ত কিশোরীর ন্যায় চঞ্চল পায়ে খট করে দরজাটা খুলে দেয়। বাইরে টিমটিমে ফরসা আলো। সেই আলোতে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা চওড়া এক পুরুষ। ভেতরে ঢুকতেই দুহাতে খামচে ধরল রেবেকাকে। দরজা আঁটকানোর জো যেন নেই। রেবেকা কোনোমতে দরজাটা লক করে দৃঢ় বাঁধনের ভেতর কুঁকড়াতে থাকল। সেই পুরুষ শার্টের বাটন খুলতে খুলতে বলছে,
- তোমার ননদের কী খবর?
মুখে হিংসার আঁচ লাগল রেবেকার। শোবার ঘরে এক কুৎসিত পোশাকে নিজের সৌন্দর্য ফোটাল রেবেকা। সেই সৌন্দর্যে দগ্ধ হলো পুরুষ চোখ। লোকটা ওর দিকে হাত বাড়াতেই হিংস্র গলায় বলল,
- এগোবে না! যাও, শাওলিনের কাছে যাও।
লোকটা হো হো করে ঘর কাঁপিয়ে হাসলো। উর্ধ্বাংশ পুরোপুরি অনাবৃত করে কোমল হাতটা ধরতে বলল,
- এহহে, এভাবে কেউ রাগে? তোমার ননদের খবর অন্য কারণে নিচ্ছি। কারণটা তুমি জানো না?
এক ঝটকায় টান দিয়ে রেবেকাকে নিজের বুকের ওপর আছড়ে ফেলল সে। অশালীন ভাবে রুচি মেটাতেই রেবেকা আবেশে চোখ বুজে বলল,
- শোয়েব যেকোনো সময় ফাঁস করে দিতে পারে। তুমি আর দেরি করো না লক্ষ্মী! যা করার জলদি করো!
লোকটা কেমন নির্ভয়চিত্তে হাসতে লাগল। অসংলগ্ন কর্মে মন ডুবিয়ে বলল,
- হাঁড়ি উপুড় আমিও করতে জানি। শুধু ফাঁসটা কেউ করুক!
রেবেকাকে কঠিন বলয়ে আঁটকে ফের বলতে লাগল। এবার কিছুটা রহস্যময় ভাবে জানাল,
- কাজ অনেকটা এগিয়েছে। শুধু ওই জায়গাটা খোঁজা বাকি। ওটা কোথায় লুকিয়েছে, একবার ধরতে পারলেই শেষ। এরপর কুপিয়ে মারব শূ... বাচ্চাকে!
রেবেকা বুকের ভেতর গুটিশুটি পাকিয়ে শুধাল,
- আজ অন্তত বলো। ওই জায়গাটা কী?
- খুবই সেন্সেটিভ, রেবা। আজ বলা যাবে না। তবে একদিন বলব। সেই সময় ঘনিয়ে আসছে।
- সময় ঘনিয়ে আসছে?
- হ্যাঁ। তোমার ননদকে বিয়ে করেছে মানে ফারশাদ আখেরি গুছাচ্ছে।
রেবেকা চোখে-মুখে দ্বন্দ্ব নিয়ে তাকাল। তার চোখে দৃষ্টিপাত করে বলল,
- শোয়েব কী বলির পাঁঠা বানাতে ওকে বিয়ে করেনি? ওকে ব্যবহার করবে না?
লোকটা তখন নেশাগ্রস্ত। চিন্তাশক্তি ক্রমশ নিভে আসছে। আসল সত্যিটাই গড়গড় করে বলে ফেলল,
- এখনো মধুচন্দ্রিমায় যায়নি। কিন্তু বউয়ের নামে সব লিখে দিচ্ছে। এটা কী বলির পাঁঠা? নাকি নিজের গলাকাটা?
বিস্মিত চোখে নিজেই নিজেকে বলতে লাগল রেবেকা,
- তার মানে. .
লোকটা ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি টেনে বলল,
- ফারশাদ ভাবছে, আর কয়েকটা দিন। তারপর সব গুছিয়ে দেশ ছাড়বে।
রেবেকার বুক কেমন ধড়ফড়িয়ে উঠল। ঢোক গিলে বলল,
- তুমি কী করবে?
লোকটা সাথে সাথে উত্তর দিল না। পকেট থেকে সিগারেট জ্বালিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল। বাইরে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
- এবার ও পালাতে পারবে না। সাত টুকরো না করলে আমিও মির্জা না!
—————
শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল ক্যাম্পাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পর। উইন্ডশিল্ডে টুপটাপ শব্দ তুলে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে। ওয়াইপার ছন্দ মেনে কাঁচ পরিষ্কার করছে, কিন্তু আকাশের রঙ রাতের চাদরে আচ্ছন্ন। এখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। কুমিল্লার যাত্রী বিরতির গাড়ির ভেতর অস্বাভাবিক নীরবতা। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে শোয়েব। পাশে বসে শাওলিন জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে।দুজনের কেউই কথা বলছে না। অনেকক্ষণ পর শোয়েব নিজেই নীরবতা ভাঙল,
- ক্লান্ত?
শাওলিন চোখ না ফিরিয়েই মৃদু স্বরে বলল,
- হয়তো।
আবার নীরবতা ঘিরে ধরল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দে শাওলিনের ঘুম এসে যায়। কিন্তু আজ অস্বস্তি জমা পাহাড় বুকে বাসা বেঁধেছে। কয়েক মিনিট পর শাওলিন ধীর গলায় বলল,
- একটা প্রশ্ন করব?
শোয়েব এক মুহূর্তের জন্য ওর দিকে তাকাল।তারপর আবার সামনে চেয়ে বলল,
- করো।
শাওলিন কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবল। যেন প্রশ্নটা মনে খচখচ করছে। অবশেষে মনোবল কঠোর করে বলল,
- আমার ডায়েরি পড়েছেন?
শোয়েব কোনো কথা বলল না। প্রতীক্ষার চোখে তাকিয়ে থাকল শাওলিন। যখন দেখল পাঁচ মিনিট পরও কোনো উত্তর এল না, তখন জানালার কাঁচে মুখ ফেরাতেই শুনল,
- প্রতিরাতে পড়তাম।
শাওলিন ভাসা ভাসা চোখে শুধাল,
- কী বুঝতে পারলেন?
শোয়েব গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
- তোমার আদর দরকার।
·
·
·
চলবে……………………………………………………