লাগাতার কল দিল শোয়েব। রাফান একটা কলও ধরল না। বিচিত্র আশঙ্কায় ভ্রুঁ কোঁচকাল শোয়েব। রাফান কী ঠিক আছে? এমন কাণ্ড তো কখনো হয়নি! হঠাৎ ডানদিকের সাইড মিররে চোখ আঁটকে গেল। সাদা এসইউভি গাড়িটা প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসছে। যেকোনো মুহুর্তে অঘটন ঘটানোর পরিস্থিতি। দ্রুত একটা বুদ্ধি খাটাল শোয়েব। এক্সিলেটরে চাপ বাড়িয়ে গাড়িটা ডানে নিল একবার, পলক ঝাপটাতেই বাঁয়ে ফেরালো চকিতেই। পেছনে থাকা এসইউভি খানিক হকচকিয়ে গেল। শোয়েব এ ফাঁকে সামনে থাকা এক মালবাহী ট্রাককে উচ্চগতিতে পাশ কাটাতে শুরু করল। ট্রাক ড্রাইভার এই প্রতিযোগিতা দেখে রুখে থাকল না। কল্যাণপুরের রাস্তায় পাশাপাশি দুটো বাহন বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নামল। শোয়েবের একরোখা মূর্তি দেখে শাওলিন হতবাক। পেছনে শ্রেষ্ঠা অবাক চোখে মানুষটাকে মাপছে। একটু আগে এই মানুষটাই কী শান্ত, সুধীর, স্বাভাবিক ছিল? শাওলিন ট্রাকটা দেখে ভীতিকর ঢোক গিলে বলল,
- খারাপ ভাবে স্পিড দিচ্ছেন। এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়িটা যেকোনো মুহুর্তে উলটে যেতে পারে!
শোয়েব কথাটা গ্রাহ্য করল না। কপালের ভ্রুঁদ্বয় কুঞ্চিত রেখে মিররে তাকাল। এসইউভিটা বেশ পেছনে চলে গেছে। ট্রাকটা তখনো পাল্লা দেয়ার মেজাজ ছাড়েনি। শোয়েব বাঁয়ে তাকিয়ে শাওলিনের চাহনি উপেক্ষা করে ট্রাকের ড্রাইভারটাকে দেখতে চাইল। মনে হলো অদক্ষ চালক। সামনে ফিরে একটা কৌশল খাটাল শোয়েব। স্পিড সামান্য ধীর করতেই শাওলিনের উদ্দেশ্য বলল,
- আমার গাড়ি উল্টায় না। গাড়ি উল্টে দেয়।
কথা শুনে চোখ বিস্ফোরিত করল শাওলিন। ঠিক তখনি দেখল শোয়েব ধাপ করে করে গতি বাড়াল। ট্রাক ড্রাইভারটা ভেবেছিল লেজুড় কেটে গেছে। বিজয়ীর হাসিতে হেল্পার ছোকরাকে কী যেন বোঝাচ্ছে, এমন সময় অফ-হোয়াইট ল্যাণ্ড ক্রুজারটা বাঁপাশ দিয়ে শোঁ করে ছুটে বেরোল। কল্যাণপুর পেরিয়ে টেকনিক্যাল ক্রস করল শোয়েব। এমন সময় কান থেকে ইয়ারপিস খুলে ফোনটা লাউড স্পিকারে দিতেই ওপাশ থেকে পরিচিত গলাটা এল,
- রাফান বলছি, স্যার।
কপালের খাঁজ রাগান্বিত হলো শোয়েবের। খেপে উঠল তার বজ্রকণ্ঠ,
- কোথায় আছ তুমি!
- স্যার, মগবাজার।
দাঁতে দাঁত পিষল শোয়েব। দৃশ্যটা শ্রেষ্ঠার নজর এড়াল না। এক অদ্ভুত হিংস্রতা শোয়েবের মুখে ছেয়ে উঠেছে। কেমন ভয় লাগছে বুকের ভেতর। রাফান ওপাশ থেকে কিছু জানাতে গেলে শোয়েব তীব্র ভৎর্সনায় বলল,
- সাফাই গাইবে না তোমার স্পর্ধা দেখে আশ্চর্য! মোহাম্মদপুরে থাকার কথা, তুমি জানাচ্ছ মগবাজার আছ!
রাফান কথা বলতে পারল না। শ্রেষ্ঠা নির্বাক হয়ে গেছে। শাওলিন ভ্রুকুটি করে তাকাল। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল শোয়েব। নিজের ওপর দুজোড়া সন্দেহের দৃষ্টি পেয়ে সহসা ঠাণ্ডা হলো। সাথে সাথে প্রসঙ্গ বদলে বলল,
- গাড়ির পেছনে ফেউ লেগেছে। কাজটা কার? আমার বতর্মান লোকেশন কীভাবে ট্রেস হলো?
রাফান দু মুহুর্তের জন্য চুপ। যেন ভাবনা থেকে উত্তর টুকে বলল,
- আপনার ফোন অন?
- হ্যাঁ। আর কারণটা তুমি জানো।
কথাটা বলতেই আড়চোখে একবার শাওলিনের দিকে তাকাল শোয়েব। শাওলিন স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যে নীরব। রাফান ওপাশ থেকে আবার বলল,
- যেহেতু লোকেশন ট্রেস, তার মানে কালরাত থেকেই কিছু ঘটছে। আপনাকে আহত করার সম্ভাবনা শতভাগ। মারবে না।
এমন উদ্ভট জবাব শুনে শোয়েব ফোনের দিকে তাকাল,
- আহত করে কী ফায়দা? মেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ না? ছেড়ে দিবে কেন?
যতটা সহজ সুরে শোয়েব উচ্চারণ করল, তার চেয়ে অকল্পনীয় মাত্রায় শাওলিন কেঁপে উঠল। এগুলো কী আলাপ হচ্ছে? কেন ওই গাড়িটা মারতে আসবে? ও শোয়েবের দিকে এমন চোখে তাকাল, যেন এই মানুষটার কিছু হলে ওর সমস্ত কিছু নিঃস্ব হয়ে যাবে। অস্থির, ভীত, চিন্তিত হয়ে পড়ল শাওলিন। মুখের গাম্ভীর্য মুহুর্তেই খসে গেল কর্পূর হয়ে। হঠাৎ ভ্রুম ভ্রুম করে তীব্র শব্দ হলো। টায়ারের ঘর্ষণে চমকে উঠে পেছনে তাকাল শাওলিন। শ্রেষ্ঠাও নিজের পেছনে থাকা কাঁচের বাইরে জ্বলন্ত আভা দেখতে পাচ্ছে। হিংস্র পশুর চোখের মতো লাগছে গাড়ির ফরসা আলো দুটো। তবে এখন দুজোড়া আলো! গাড়ি দুটো! শ্রেষ্ঠা বিচলিত হয়ে বলল,
- আরেকটা যুক্ত হয়েছে! দুটো গাড়ি পেছনে লেগেছে!
শোয়েব মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলল,
- সেফজোন লাগবে, রাফান। এই অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্ভব না।
রাফান আশ্চর্য হয়ে গেল,
- আপনি এ কথা বলছেন?
শোয়েব এই প্রথম অসহায় কণ্ঠে জানাল,
- রিষ্ক চাচ্ছি না রাফান। বোঝো!
হাতের গ্রিপ হালকা করছিল শোয়েব। ইচ্ছে করছিল শাওলিনের কোল থেকে একটা হাত মুঠোয় নিতে। আঙুলগুলো জড়িয়ে রাখতে, যেন ভরসা করুক কিচ্ছু হবে না। রাফান চিন্তিত সুরে তখনো বলে চলল,
- আপনি পাহাড়ি রুটের ওয়ান অফ দ্য এক্সেপশনাল ব্যক্তি! সবচেয়ে বাজে ওয়েদারেও ড্রাইভ করেছেন স্যার! সুনীল স্যার পর্যন্ত বলেন আপনি কার চেজে সেরা। আপনি গা ঢাকা দিতে চাচ্ছেন স্যার?
মেজাজ খারাপ হলো শোয়েবের। রাফান বুঝতে পারছে না সে এখন একা নয়। তার সহধর্মিনী, এক বোন সমতুল্য শ্যালিকা নিয়ে বেরিয়েছে। আগে যদি জানতো এমন উৎপাত অপেক্ষা করছে, তাহলে এদের লাশ ফেলে তারপর গাড়ি নামাতো সে। শোয়েব স্থির মেজাজে চতুর উত্তরটা দিল,
- তুমি থাকলে অসুবিধে ছিল না মাই বয়। তোমার ওপর ভরসা করি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আর ভিন্ন পরিস্থিতিতে তোমার স্যার হুটহাট কিছু করবেন না। ইফ ইয়্যু নো ইয়্যু নো।
শেষ কথাটার ইঙ্গিত যেন রাফানই বুঝল। শোয়েব প্রতি সেকেণ্ডে সেকেণ্ডে পেছনের হালচাল দেখছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে ভ্রুঁ দুটো কোঁচকাতে লাগল। ফুয়েল ইন্ডিকেটর শুভ লক্ষণ দিচ্ছে না! রাফান বাঁহাতের ক্যানোলা ছুটিয়ে হাসপাতালের বেড থেকে নামতে নামতে বলল,
- আপনি কোথায় আছেন? আপনার একজেক্ট লোকেশন কী?
- সাভার যাচ্ছি। সঙ্গে দুজন সুন্দরী।
কথাটা শুনে শ্রেষ্ঠা পেছন থেকে জোরে হেসে ফেলেছে। শাওলিন বিব্রত লজ্জায় অন্যদিকে তাকাল। রাফান অর্থবোধক হাসিতে বলল,
- স্যার, দুজনের একজন আপনার বেটার হাফ? অন্যজন পরিচিত কেউ?
শোয়েব কথাটা অন্য ইঙ্গিতে বলল,
- অন্যজনটাও অন্য কারুর কেউ।
গাড়ির ভেতর বাকি দুজন কথাটা শুনলেও অর্থোদ্ধার করতে পারল না। তাদের মনোযোগ পেছনে আধমাইল দূরত্বে থাকা গাড়িটার দিকে। রাফান কিছু বলতে হিমশিম খাচ্ছিল। হঠাৎ পাশ থেকে অপরিচিত গলা ভেসে এল,
- এই ঔষুধ ডিসপেন্সারিতে পাবেন। হাত বেশি নাড়াচাড়া করবেন না। আপনার সেলাইয়ের ঘা গভীর।
ফোনের ভেতর কথাগুলো শুনে মুখের রঙ বদলে গেল সবার। শ্রেষ্ঠা ঝট করে সমুখে ফিরে চাইল। ওই আপাদমস্তক রাগী রাক্ষসটা আহত? ওই রাক্ষসকে কে জখম করল? শ্রেষ্ঠা ত্রস্তভাবে তাকালে শাওলিন চোখ দ্বারা বাঁধা দিয়ে বোঝাল। শোয়েব কথাটা শুনে নিশ্চুপ। ফুয়েল ইণ্ডিকেটর বড্ড খারাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফোনের ওপাশে খসখস হতেই রাফান ফোন কানে তুলে বলল,
- স্যার, ক্ষমা চাচ্ছি। আমি ইঞ্জুর্ড। মোশাররফকে আপনার নির্দেশে কুমিল্লা থাকতে বলেছি। কালরাতে...
রাফান বলতে শুরু করলে শোয়েব তীক্ষ্মকণ্ঠে থামাল,
- এখন না। পরে বলো। তুমি ঠিক আছ?
রাফান বাঁ কাঁধে যন্ত্রণা পাচ্ছে। হাসপাতাল থাকা দরকার, কিন্তু গায়ে শার্ট গলাতে গলাতে চোখ খিঁচিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। একজন নার্স ট্রে হাতে কিছু নাশতা নিয়ে ঢুকেছিল। দৃশ্যটা দেখে হতবাক হয়ে চেঁচাল,
- কী হচ্ছে কী! আপনি এই অবস্থায় শার্ট পরছেন কেন? কোথায় যাচ্ছেন?
রাফান হিম নজরে তাকাল। রাগী সত্তায় ফিরে গেছে সর্বস্ব। নার্সটা ভয়ে চুপটি মেরে গেল। রাফান দরজা দিয়ে বেরুতে বেরুতে বলল,
- স্যার, আশপাশের কোনো সেফজোনে চলে যান! দ্রুত করুন!
কথাগুলো শুনে শোয়েব রাস্তায় তাকাল। সামনে ধূ ধূ করছে বৃষ্টি ভেজা রাস্তা। যানবাহন প্রায় নেই বললেই ভালো। প্রায় নির্জন রুটের অবস্থা মেপে শোয়েব জলদ্গম্ভীর স্বরে বলল,
- আশেপাশে কোনো সেফ প্লেস নেই। কিন্তু...
রহস্য রেখে কথাটা বলল শোয়েব। রাফান কিছু আঁচ করলে শ্রেষ্ঠা পেছন থেকে ঝুঁকে এল। সেলিমের গাড়িতে চড়ার দরুন যে ঘটনাটা বেশি ঘটে, সেটাই এখন চাক্ষুষ দেখে আঁতকে উঠল,
- ফুয়েল শেষ হয়ে এসেছে! কী হবে এখন? গাড়ি তো এখনো পিছু ছাড়েনি!
শোয়েব ইণ্ডিকেটরে তাকিয়ে বুঝল ভাগ্য চর্তুপাশ থেকে চেপে ধরেছে। যেন উচিত শিক্ষায় জব্দ করতে মত্ত। এমন সময় আবারও সরোষে গর্জন শোনা গেল। আকাশের মেঘ কিছুটা ফরসা হয়েছে। শাওলিন মনে মনে চিন্তা কষছিল। এভাবে বিপদ থেকে রক্ষা পাবার উপায় কী? কোনো না কোনো পথ তো খোলা আছে? কিছু না কিছু তো থাকবে? শাওলিন নিচের অধর কামড়ে দ্রুত ভাবতে লাগল। হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। শাওলিন চকিতে তাকিয়ে বলল,
- জাহাঙ্গীরনগর নিন!
শোয়েব দুই ভ্রুর মাঝখানে শঙ্কার ভাঁজ ফেলল। বাঁয়ে মুখ ফেরাতেই শাওলিন দৃঢ়তার সুরে বলল,
- জাহাঙ্গীরনগর নিন! কথা বাড়াবেন না প্লিজ। যা বলছি, করুন। এর চাইতে সেরা সেফজোন আর একটাও নেই! ফুয়েল ট্র্যাক খালি হওয়ার আগেই গাড়িটাকে জাহাঙ্গীরনগর নিন!
শাওলিনের কথায় সম্বিত পেল শোয়েব। চোখের সামনে সবচেয়ে সুন্দর বুদ্ধিটা দেখে মৃদু হাসলো সে। মনে মনে সায় দিল, বিপদে শুধু তার মাথাটাই আগে চলে না, তার অর্ধাঙ্গিণীর মাথাটাও খেলে। বাকি কাজ শাওলিন নিজেই সমাধা করল। শ্রেষ্ঠার দিকে ত্রস্ত গলায় বলল,
- শ্রেষ্ঠা, তোমার সোর্স খাটাও! এই মুহুর্তে গেটগুলোতে খবর দাও। সাদা রঙের এসইউভি, লাস্টে টু টু থ্রি টু, এই গাড়ি আমাদের ক্যাম্পাসে যেন না ঢোকে।
শ্রেষ্ঠা ডেনিম জিন্সের পকেট থেকে ফোন বের করল। চটজলদি জানাল,
- মনে কর কাজ শেষ।
শ্রেষ্ঠার পূর্ণ আশ্বাসে শাওলিন স্বস্তির হাসি দেয়। শোয়েব দেরি না করে স্পেডোমিটারের কাটা বাড়াতে থাকে। শাওলিন স্পিডের সংখ্যাগুলো গুণতে লাগল, সত্তর.. আশি.. ইবনে সিনা ক্রস হলো। রেডিয়ো কলোনি উতরে গেল মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে। শাওলিন জানালার বাইরে ব্যাক মিররে তাকাল। সাদা এসইউভি যেন নির্লজ্জ জোঁকের মতো পিছু লেগেছে। কিন্তু এখন ব্যাপক দূরে অবস্থানরত। হঠাৎ দূরে জাহাঙ্গীরনগরের প্রবেশদ্বার দেখতে পেলে শ্রেষ্ঠা শান্ত গলায় বলল,
- ফারশাদ ভাইয়া, আপনি যে গেটে একবার এসেছিলেন, ফটাফট সেই গেটে যান।
শোয়েব রিয়ারভিউ মিররে তাকাল। তার চোখে গর্বমিশ্রিত হাসি। শ্রেষ্ঠা পেছন থেকে ফিরতি হাসি দিয়ে প্রশংসাটা গ্রহণ করল। ঠিক মিনিট পাঁচেকের ভেতর গাড়িটা প্রান্তিক গেটে ঢোকাল শোয়েব। এক টানে অনেকদূর ভেতরে অগ্রসর হলো। দুই বান্ধবি পেছনের দৃশ্যপট দেখে হাসি দিয়ে ফেলেছে। প্রান্তিক গেটে গার্ড এসে দাঁড়িয়েছে। গার্ডের পাশে ক্যাম্পাসে কর্মরত ঝাড়ুদার মামারা। ঠিক তখনি ওরা দেখল, গেটের বাইরে আচানক থমকে গেছে সাদা এসইউভি। শ্রেষ্ঠা আশ্বস্ত করে বলল,
- শালার মন্ত্রীর গাড়িও আমরা আঁটকে দিই, এটা আর এমন কী জিনিস!
—————
গাড়িটা পার্ক করে শোয়েব চারপাশে নজর বুলাল। মাথার ওপর সবুজ ছাদ, পাতার ফাঁকে ফাঁকে সোনালী রোদ্দুর ঝালর কেটে মাটিতে ছায়া ফেলছে। চারিদিক নীরব, শান্তি মোড়ানো প্রসন্নতা। শাওলিন সোজা পথ ধরে একমনে সামনে হাঁটছিল। শ্রেষ্ঠা বেশ সামনে। ফোনে কথারত, হাঁটছে নাযীফের হল ভাসানী হলের দিকে। শোয়েব পেছন থেকে পকেটে দুহাত গুঁজে হাঁটতে লাগল। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো স্যুটটা গাড়িতে রেখে এসেছে। মৃদু বাতাসের ঝাপটায় কপালের ওপর ছেয়ে যাচ্ছে চুল। শাওলিনকে পূর্ণচোখে দেখছিল সে। ধীর পায়ে হাঁটার ভঙ্গি, ডানে তাকানো সময় মুখের পাশটুকু দেখতে পাওয়া, শাড়ির লম্বা আঁচলে পিঠ ঢেকে নেয়ার শালীন সৌন্দর্যকে মনভরে উপভোগ করছে শোয়েব। ওর উজ্জ্বলবর্ণ দেহটা কালো রঙের শাড়িতে আবৃত। শাড়িটা তার কিনে দেয়া। পাড়টা মোটা, রঙটা মৃদু সোনালী। সেই সোনালী রঙ যেন গোটা শাড়িতে সুক্ষ্ম বুননে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটিয়েছে। পায়ে মাঝারি হিল, চুলগুলো খোঁপায় বাঁধা ছিল, কিন্তু গাড়িতে খোঁপা খুলে পিঠময় মেঘ ছড়িয়ে আছে। যেন কালো অরণ্য, যেখানে শোয়েব মুখ ডুবিয়ে স্বস্তির শ্বাস নেয়। হাঁটতে হাঁটতে শোয়েব মৃদুগলায় ডাকল,
- ইয়াং লেডি,
শাওলিন আমূল কেঁপে উঠল। ঝট করে পিছু তাকাল বিস্ময় চাহনিতে। শোয়েব চোখটা শাওলিনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত উঠাতে লাগল। ওই এফোঁড় ওফোঁড় চাহনিতে শিরশির করে উঠল ওর। শাওলিন বিব্রত মুখে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
- দুষ্টুমি করবেন না। এটা ক্যাম্পাস এরিয়া। অসভ্যতা করলে ভালো হবে না বলে দিলাম।
শোয়েব নির্লজ্জ ভাবে প্রশ্নটা করল,
- তোমার হল পেছনে রেখে এলাম। তাহলে হলে চলো, সভ্য হয়ে যাই।
শাওলিন চোখ তপ্ত করে তাকাল। মুখ সামনে ফিরিয়ে হাঁটতে লাগল দৃঢ়পায়ে। শোয়েব এগিয়ে ওর ডানেপাশে হাঁটতে লাগল। শাওলিন বাঁপাশে চিরচেনা দৃশ্যগুলো দেখে যাচ্ছে। বুকের ভেতর চিনচিনে কেমন সুখ, রক্তে রক্তে ছুটে যাচ্ছে চঞ্চলতা। বৃষ্টিভেজা জাহাঙ্গীরনগরে শাওলিন সেই মানুষটার পাশে হাঁটছে, যাকে সে মনে জায়গা দিলেও মুখে কখনো বলেনি। এখনো বলা হয়নি কতটা আপন ভাবে তাকে। এই যত্ন করা অনুভূতিগুলো কখনো কারো প্রতি তৈরি হয়নি। যার প্রতি হলো, সে আজ ওকে আশ্রয় দিয়েছে বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। শোয়েব নীরবতা ভঙ্গ করে বলল,
- কখনো ভেবেছ আমি তোমার বিদ্যাস্থানে তোমার পাশে পাশে হাঁটব?
শাওলিন চোখবন্ধ করে কথাটা অনুভব করে নিল। স্বস্তিময় শ্বাসে আস্তে আস্তে বলল,
- কিছু জিনিস ভাবনার বাইরে হয়। কখনো জানার সুযোগ নেই কে আজ পাশে থাকবে, কে কাল নেই।
শোয়েব কথাটার গভীরত্ব বোঝার চেষ্টা করল। গাছের পাতা চুয়ে টুপটাপ বৃষ্টিফোঁটা গায়ে পড়ছে। শীতল অনুভূতিতে ভালো লাগছে। শোয়েব ওর দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
- তুমি আমার জন্য কল্পনা করো? কখনো ভাবো, আমি তোমার জন্য সব করতে পারি? যা চাও, তাই করতে পারি শুধু একশর্তে?
শাওলিন প্রশ্নভরা চোখ তুলে তাকাল। শান্তভাবে শুধাল,
- কী শর্তে?
শোয়েব গতি মন্থর করে থামল। শাওলিন বাঁপাশ থেকে সরে শোয়েবের মুখোমুখি হলো। শোয়েব পকেটে হাত গুঁজে সেই ভঙ্গিতেই অনুরোধ করে বলল,
- আমাকে জড়িয়ে ধরো।
শাওলিন একদৃষ্টে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। আকাশ মেঘলা। জনশূন্য, নিথর আশপাশ। গাছের পাতা থেকে ঝরেপড়া পানি, ভেজা মাটির আর্দ্র-ঘ্রাণ। শাওলিন বুকের ভেতর হু হু শূন্যতা ঠাহর করল। পায়ে পায়ে এগোতে লাগল সামনে। মধ্যবর্তী দূরত্বকে সম্পূর্ণ শূন্য বানিয়ে শাওলিন মুখ উঁচু করে তাকাল,
- শর্ত শুধু এটাই? আর নেই?
শোয়েব মৃদুহাস্যে না সূচক মাথা নাড়াল। ভঙ্গিটা এতো নিষ্পাপ ঠেকল শাওলিনের কাছে, যেন কোনো বাচ্চা সীমিত চাওয়ায় মন খুশি রাখছে। শাওলিন চোখবন্ধ করে বুকের ভেতর মাথা গুঁজে দিল। দুটো হাতে আঁকড়ে ধরল শোয়েবকে। পকেট থেকে হাত দুটো বের করে শাওলিনকে আবদ্ধ করল শোয়েব। ওর মাথায় থুতনি রেখে একহাত চুলের ভীষণ গভীরে, অন্যহাত পিঠে রাখল সে। শাওলিন এই অদ্ভুত ভালো লাগায় নিজেকে কঠোরভাবে দমাতে লাগল। চোখদুটোর বাঁধ ভেঙে যেতে চাইছে। বুকের ভেতর আবারও আছড়ে পড়েছে কিছুক্ষণ আগের ভীতি। শাওলিন সর্বোচ্চ শান্তস্বরে ধীরে ধীরে বলল,
- আমাকে সবকিছু বলবেন। আপনার সবকিছু, আপনার অতীত, বতর্মান, সব।
শোয়েব নিরুত্তর রইল। ঘনভাবে শ্বাস ছাড়ার শব্দ ব্যতীত কিছুই বেরুল না। শাওলিন এই নীরবতাকে সম্মতি মেনে নিল যে শোয়েব নিশ্চয় ধীরে ধীরে সব জানাবে। কিন্তু শাওলিন তখনো বোঝেনি, এই জানার ভেতরে যে ভবিষ্যতটা নির্ভর! সেই স্বপ্নে সাজানো ভবিষ্যৎ যদি অমাবস্যার আঁধারে ছেয়ে যায়, শোয়েব কী সেই অঘটন হতে দেবে?
শোয়েব প্রাণপণে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শাওলিন নিজেকে মুক্ত করে বুকে থুতনি রেখে বলল,
- সব বলবেন তো?
শোয়েব নিস্তেজ চোখে তাকাল। মনে মনে যে পরিকল্পনা করেছিল শাওলিনকে ধীরেসুস্থে বোঝাবে। তারপর বলবে একে একে। এখন মনেহচ্ছে হাতে সময় খুব কম। ভাগ্য তার ঝুলিতে সময়ের রিযিক ফুরিয়ে এনেছে। আচমকা নিস্তব্ধতা ভেদ করে খুকখুক করে কাশি দেয়ার শব্দ হলো। বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো ছিঁটকে দাঁড়াল শাওলিন। ঘুরে তাকিয়ে দেখল সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সোহানা কাশি দেয়ার মুঠোটা নিচে নামালে দুষ্টু হাসিতে বলল,
- সব সিসিটিভিতে উঠে গেছে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………