ইট-পাথরের দালানকোঠা পেরিয়ে পাভেলদের গাড়িটা রূপনগরে প্রবেশ করল ঠিক তপ্ত ভরদুপুরে। রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ।মাথার ওপর নীল আকাশটাকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি তাল আর নারকেল গাছ। মাঝেমধ্যে রাস্তার ধারে ছোট্ট পুকুর দেখা যাচ্ছে। পুকুরের সেই পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা সাদা হাঁস। মিতালী এতক্ষণ গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে ছিল। গ্রাম্য আবহ আসতেই গাড়ির জানালার কাছ খুলে দিলো পাভেল। কাচ নামাতেই এক পশলা টাটকা মাটির সোঁদা গন্ধ ভুরভুর করে এসে ওদের নাকে লাগল। মিতালী কৌতূহল চেপে বলল,
'এটা সত্যিই তোমাদের গ্রাম?'
পাভেল বলল,
'কেন? দেখে মনে হচ্ছে না?'
'এত সুন্দর হবে ভাবিনি!আগে কেন নিয়ে আসলে না আমায়?'
'অনেক বছর আসা হয়নি।'
'কত বছর?'
প্রায় তিন তো হবেই!'
মিতালী আর প্রশ্ন করল না।ততক্ষনে গাড়িটা এসে থামল রূপনগরের বিখ্যাত কাইয়ুমদের পৈতৃক ভিটাবাড়ির প্রাঙ্গণে। দোতলা মস্ত বড় বাড়ি। সামনে বিশাল উঠান। একপাশে বহু বছরের পুরনো বাঁধানো একটা বেলগাছ। গাড়ি থামার শব্দ হতেই চারোপাশে ডাক পড়ল,
'আইসে, আইসে। পাভেল ভাইয়েরা আইয়া পরসে গো দাদি!'
সেই ডাকে ভিতর থেকে হুলুস্থরের মতো একে একে বেরিয়ে এলেন সকলে। সবাই অপেক্ষা করছিলেন ওদের জন্যই।দাদি সুফিয়া বেগম গত মাসে গ্রামে দিরে আসেন। আর যাননি। গাড়ি থেকে প্রথম নামল পাভেল। তার পেছন পেছন হাত নামল মিতালী। সবার শেষে নেমে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী।
হাসিমুখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন বড় চাচি জাহানারা বেগম, রুমানা ফুপি। প্রিয়ন্তীর দাদার ছেলেমেয়ে মোট চারজন। দুজন ছেলে, আর মেয়ে দুজন। সবচেয়ে বড় ছেলেরে নাম আবদুল কাইয়ুম।তারপর মাঝখানে এক মেয়ে,শাহনাজ। তৃতীয় সন্তান ছিলেন প্রিয়ন্তীর বাবা,পলাশ রহমান। সবচেয়ে ছোট মেয়ের,রুমানা।
প্রিয়ন্তীর বাবা ব্যবসার কাজে অনেক বছর আগে শহরে পারি জমান। সেখানেই সংসার গড়ে ওঠে তার। সেই সংসারে সর্বপ্রথম আসে পাভেল। এরপর প্রিয়ন্তী। প্রিয়ন্তী আর পাভেল শহরেই বড় হয়। তবুও ছোটবেলায় প্রায় তারা দাদার বাড়িতে বেড়াতে আসত। গ্রামের সেই দিনগুলো তখন কত আনন্দেই না কাটত ওদের।
কিন্তু দাদা মারা যাওয়ার পর দাদীও একসময় শহরে গিয়ে ওদের সঙ্গেই থাকতে শুরু করেন। তারপর যখন প্রিয়ন্তীর বাবা–মা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন
তখন সেই দাদীই হয়ে উঠেছিলেন প্রিয়ন্তীর আশ্রয়, অভিভাবক, সবকিছু। রূপনগরের বাড়িটা এখনও যৌথ পরিবারের উষ্ণতায় ভরা। বড় চাচা আবদুল কাইয়ুমের তিন সন্তান। বড় ছেলে রাশেদ কাইয়ুম,
তার বিয়ে হয়ে গেছে এবং একটা ছোট্ট ছেলেও আছে। নাম রিহান।
তারপর ছেলে নাফিসা। সবচেয়ে ছোট মেয়ে নুসরাত। প্রিয়ন্তীর সমবয়সী সে। এখন ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে।
বড় ফুপি শাহনাজের দুই সন্তান। ছেলে সাব্বির হাসান, বর্তমানে এ্যাবরোডে লেখাপড়া করে সে। আর মেয়ে সাদিয়া হাসান। তার পড়াশোনাও প্রায় শেষ। বিয়েও ঠিক হয়ে আছে। সবচেয়ে ছোট ফুপি রুমানার আবার তিন সন্তান। দুই মেয়ে,মেহরিন আর মাহিরা। দুজনেই প্রায় প্রিয়ন্তীর বয়সী। মাহিরা বড়, মেহরিণ ছোটো। মাস দুয়েক আগেই মাহিরার বিয়ে হয়ে যায়। তবে ছেলে খারাপ হওয়ায় মাহিরার মা ওকে নিজেদের সঙ্গে নিজেদের বাড়িতেই রাখে। শশুর বাড়িতে যেতে দেয়না। আর তাদের সবার ছোট ভাই, মুয়াজ। মাত্র নয় বছর বয়স। দুষ্টুমিতে ভরা, চঞ্চল একটা ছেলে।
'ওরে আমার সোনা পাখিরা এসেছে রে! এতদিন পর চাচী ফুপিদের কথা মনে পড়ল বুঝি?'
জাহানারা বেগম, আর রুমানা এগিয়ে এসে প্রিয়ন্তী কে জড়িয়ে ধরলেন বুঁকের কাছে। সেই ছোটো দেখেছিলো মেয়েটাকে। কত বড় হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই রুমানা পাভেলের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলে উঠলেন,
'আহা জোহরা তুমি তো প্রিয়ন্তীকে নিয়েই ব্যস্ত পড়ে গেলে! আমাদের নতুন বৌমা কে বরণ করো আগে। পাভেল, বউকে এভাবে পেছনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন রে? সামনে আন!'
পাভেল হেসে মিতালীর দিকে তাকাল। মিতালী নতুন বউয়ের মতো কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে আঁচলটা মাথায় টেনে দিয়ে সামনে এগিয়ে এল। রুমানা মিতালীর চিবুক ছুঁয়ে মিষ্টি হেসে বললেন,
'মাশাল্লাহ! শহরের মেয়ে হলেও বউটার ভেতরে শান্ত-শিষ্ট একটা ভাব আছে। চোখ দুটো যেন মায়ায় ভরা।'
পাশ থেকে জাহানারা হাসলেন,
'হ্যা রে পাভেল। তোকে এই মেয়ে দিলো কিভাবে?'
নুসরাত এগিয়ে এসে বলল,
'নতুন ভাবি, তোমাকে তো আমরা ছবিতে দেখেছি। সামনাসামনি তো আরো মিষ্টি লাগছে! এ কয়দিন কিন্তু তোমাকে আমরা একদম ছাড়ছি না।'
মিতালী নিচু গলায় হেসে বলল,
'আমিও যাচ্ছিনা এতো সহজে। আপনাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।'
সবাই মিলে কথা বলতে বলতে বিশাল বৈঠকখানায় গিয়ে বসল। বড় প্রাচীন কাঠের সোফা আর ফরাশে আরাম করে বসার ব্যবস্থা। ঘরের মাঝখানে ঝুলছে পুরনো আমলের বড় পাখা। জাহানারা চাচি হাঁক ছাড়লেন,
'নাফিস! ওই নাফিস! সুফিয়ানকে বল ঘর থেকে ডাবের কাঁদি কেটে নিয়ে আসতে! রোদ উঠে গেছে। পোলাপানগুলো জার্নি করে তৃষ্ণার্ত হয়ে এসেছে!'
কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাঁসার গ্লাসে করে ডাবের তাজা পানি নিয়ে এলো নুসরাত। মিষ্টি ডাবের পানিতে চুমুক দিয়ে পাভেলের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। মিতালী চারপাশের ঘরদোর, উঁচু সিলিং আর বিশাল কাঠের জানালাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিল। পাভেল বলল,
'তা আমাদের বিয়ের কনে কোথায়? তাকে তো দেখলাম না!'
রুমানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুচকি হাসলেন,
'আর বলিস না পাভেল! মেয়েটাকে নিয়ে আমি আর পারি না। বয়স সতেরো পাড় হয়ে আঠারো তে পড়ে যাবে দুদিন পর। কিন্তু বুদ্ধিসুদ্ধি বলতে ওই পাঁচ বছরের বাচ্চার মতোই রয়ে গেল! সারাদিন টইটই করে পাড়াময় ঘুরে বেড়াবে।তার বেলায় কষ্ট নেই। যত কষ্ট ওই পড়াশোনার বেলাতেই। তাইতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ে দিয়ে দিবো।নাহলে বড়োদের রেখে ছোটোদের কে বিয়ে দেয়? সারাদিন এই বাড়ি থেকে বিচার, ওই বিচার এসব দেখতে দেখতে প্রাণটা অতিষ্ট।'
জাহানারা চাচিও হেসে উঠে বললেন,
'লেকের কাছে মাছ ধরতে গিয়েছে। তোরা আসবি শুনে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে গোসল করতে পাঠিয়েছি। পুকুরপারে গেছে।'
'আমাকে নিয়ে কথা হচ্ছে বুঝি?'
কণ্ঠস্বর ধরে তাকাল উপস্থিত সকলে। পাভেল আর প্রিয়ন্তী স্বাভাবিক থাকলেও অবাকের চূড়ান্ত পৌছালো মিতালী। মেয়েটির পরনে ধানি কাঁচাহলুদ রঙের একটা সুতি থ্রি পিস।ভিজা চুল থেকে এখনো টুপটুপ করে পানি ঝরছে। তবে যেটা দেখে মিতালী থমকে গেছে তা হলো মেয়েটির চেহারা!
মিতালী চোখ বড় বড় করে একবার প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাল। আবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা মেয়েটার দিকে চাইল।অবিকল এক রূপ! একই নাকের গড়ন। একই চোখের পাতা। আর ঠিক এক ছাঁচে গড়া মুখাবয়ব!একপলকে দেখলে যে কেউ একদম থ বনে যাবে।এ যেন প্রিয়ন্তীরই কোনো হুবহু প্রতিরূপ! তফাৎ শুধু গায়ের রঙ আর চুলে। প্রিয়ন্তী ধবধবে দুধে-আলতা ফর্সা। আর এই মেয়েটি কাঁচাহলুদের মতো ফর্সা।চুলগুলো প্রিয়ন্তীর চাইতে লম্বায় বড় বেশি।
'পাভেল ভাই? এটা আমাদের ভাবি নিশ্চই?'
পাভেল মাথা ঝুকালো। মেহরিণ এসে মিতালীর পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। মিতালী তখনো বিস্মিত। মেহরিন এক গাল মুক্তোঝরা হাসি দিয়ে মিতালীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,
'আরে! তুমিই বুঝি মিতালী ভাবি? ও মা! তুমি তো দেখতে একদম পুতুলের মতো! পাভেল ভাইয়া তো তোমার ছবি দেখে যা বলেছিল, সামনাসামনি তো তুমি আরও সুন্দর!'
মিতালীর সম্বিৎ ফিরল। মুচকি হেসে বলল,
'মেহরিন? তোমাকে দেখে আমি এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম প্রিয়ন্তী বুঝি দাঁড়িয়ে আছে!তোমরা দুজন তো দেখতে অবিকল একরকম!'
মেহরিন খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল,
'ভাবি, তুমি প্রথম নও! গ্রামের ছোটবড় সবাই আমাদের দুজনকে একসাথে দেখলে গুলিয়ে ফেলে! তবে প্রিয়ন্তী আপু হলো একদম শান্ত লক্ষ্মী মেয়ে। আমি তার উল্টো। বাড়ির সবাই আমাকে বলে দেখতে প্রিয়ন্তী আপুর থেকে হওয়ার চেয়ে স্বভাবতা উনার মতো হলে নাকি ভালো হতো বেশি।'
—————
দুপুরের খাবারের পর বাড়ির বড়োরা আলাপ আলোচনায় বসেছেন। ছোটরা বসেছে দুতলার ঘরে। খাট জুড়ে গা এলিয়ে বসেছে সব কাজিনরা। একপাশে বালিশে হেলান দিয়ে বসেছে প্রিয়ন্তী। তার ঠিক কোল ঘেঁষে বসেছে মেহরিণ, মাহিরা। নুসরাত বিছানায় পা ঝুলিয়ে নেলপালিশ লাগাচ্ছে। নাফিসও আছে সাথে। মুয়াজ খাটের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে এধার-ওধার করছে।প্রিয়ন্তী বলল,
'আগে কতবার বলেছিলাম মন দিয়ে একটু পড়াশোনা টা কন্টিনিউ কর। দেখলি তো। ঠিকই ফুপি আর সহ্য করতে না পেরে ধরেবেঁধে তোকে বিয়ের আসনে বসাচ্ছে!'
'ধরেবেঁধে বলোনা প্রিয়ন্তী। ওই ফাজিলটা আরো উল্টো খুশি। খুশিতে দুই রাত ঘুমাতেই পারছেনা।'
মেহরিন লাজুক মুখে চোখ তুলে নুসরাত এর দিকে একটা বালিশ ছুঁড়ে মারল। নাফিস হেসে উঠে বলল,
'হ্যাঁ প্রিয়ন্তী, ঠিকই শুনেছিস।পাশের হাওলাদার বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে আমাদের এই বানরটার!'
মুয়াজ বলল,
'আরে না, নাফিস ভাইয়া ভুল বলছ! হাওলাদার বাড়িতে তো শুধু বর ডাল-ভাত খেতে আসবে! বরের আসল বাড়ি তো শহরে!'
মাহিরা মুয়াজের মাথায় আলতো একটা চড় মেরে ধমকে উঠল,
'এই মুয়াজ! ছোট মানুষ ছোট মানুষের মতো থাক! ডাল-ভাত খেতে আসবে মানে কী? ঐটা ছেলের নানার বাড়ি। ওরা অনেক বড় খানদান। ছেলে আর তার বাবা-মা সবাই শহরে বিশাল বড় বাড়িতে থাকে।'
প্রিয়ন্তী বেশ কৌতূহল নিয়ে মেহরিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মেহরিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে নিচু গলায় শুধাল,
'তুই ছেলেকে দেখেছিস? তোর পছন্দ হয়েছে তো? নাকি চাচি বা ফুপির চাপে পড়ে রাজি হয়েছিস?'
'পছন্দ হয়েছে মানে। পছন্দ না হলে আমাদের মেহরিণ কে কেউ জোড় করে বিয়ের আসরে বসাতে পারে নাকি?'
প্রিয়ন্তী বেশ কৌতূহলি হয়ে বলল,
'দেখতে কেমন রে?'
'আস্ত একটা বুনো ষাঁড়ের মতন!'
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল মেহরিণ। পাশ থেকে মাহিরা বালিশ ছুড়ে বলল,
'লাভ নেই। এই শয়তান বলবে না কিছু। আমরা অনেক চেষ্টা করেও এর মুখ থেকে একটা শব্দও বের করতে পারিনি!'
—————
আগের দিনটা হেসে-খেলে কাজিনদের আড্ডায় কেটে গেলেও রাতের অন্ধকার নামতেই প্রিয়ন্তীর মনের মেঘগুলো যেন আবার ঘন হয়ে উঠল। সারাটা রাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছে ও। একটা মানুষ এতটা পাষান কি করে হতে পারে। বারবার ফোন চেক করেছে প্রিয়ন্তী। একটা মেসেজ ও আসেনি আর। প্রিয়ন্তী ও পন করেছে। সেও আগ বাড়িয়ে ব্যাটাকে আর মেসেজ দিবেনা। সে দিলেও উত্তর দিবেনা। সিন্ই করবেনা।
দুপুরের খাবার শেষে নিজের রুমে এসে শুয়েছে প্রিয়ন্তী।ঘুমিয়েছে এক চোট। বিকেলের দিকে ওর ঘরে এলো মিতালী। পরনে তার গাঢ় বটল গ্রিন রঙের একটা জামদানি শাড়ি। আঁচলটা পরিপাটি করে পিন করা। চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করা। আর তাতে গুঁজে দেওয়া দুটো তাজা বেলি ফুল।
মিতালী বিছানার কাছে এগিয়ে এসে প্রিয়ন্তীর গায়ে আলতো করে ধাক্কা দিল,
'এই প্রিয়! ওঠো তো, আর কত শুয়ে থাকবে? ওঠো তাড়াতাড়ি!জলদি রেডি হও!'
প্রিয়ন্তী চোখ মেলে ভাবির দিকে চাইল। আলসেমি আর অনিচ্ছায় মুখ কুঁচকে বলল,
'কী হয়েছে ভাবি? এখন কোথায় যাব?'
'কোথায় যাব মানে? যাবে না নাকি ছেলেদের বাড়ি? আজকে না মেহরিনের মেহেদির ডালা নিয়ে যাওয়া হবে? সবাই রেডি হচ্ছে।আর তুমি এখনো এভাবে শুয়ে আছো!'
প্রিয়ন্তী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরে শুলো,
'আমার ভালো লাগছে না। তোমরা যাও।'
'কোনো অজুহাত চলবে না।একদম চুপচাপ ওঠো তো!'
প্রিয়ন্তী নাছোড়বান্দার মতো উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু বিছানা ছেড়ে নামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ঘরের কোণে রাখা সাধারণ একটা সুতি থ্রি-পিস দেখিয়ে বলল,
'হাওলাদার বাড়ি তো এই ভিটার একদম পাশেই ভাবি! দুই কদম হাঁটলেই তো ওদের উঠোন দেখা যায়। এর জন্য এত সেজেগুজে যাওয়া লাগে নাকি?'
'হয়েছে, তোমার আর জ্ঞান দিতে হবে না! দুই কদম হোক আর আধ কিলোমিটার হোক। আজকে অনুষ্ঠান আছে ওদের ওখানে। আর তুমি কনের নিজের মামাতো বোন! এভাবে শুকনো মুখে যাবে মানে কী? আমি যা বলছি শোনো!এই নাও এটা পরো!'
সকালের দিকে পাভেল বাজারে গিয়ে সবার জন্য একই রঙের শাড়ি কিনে এনেছে। সেটাই প্রিয়ন্তীর হাতে ধরিয়ে দিলো মিতালী।ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধাল,
'যাও এটা পড়ে আসো।'
অনিচ্ছায় প্রিয়ন্তী শাড়িটা জড়ালো গায়ে। এরপর মিতালী নিজে হাতেই সাজিয়ে দিলো ননদ কে। বলল,
'দেখো তো! একটু সাজতেই কত মিষ্টি লাগছে!'
বাড়ির সকলে প্রথমে ভেবেছিলো ঘরোয়া ভাবেই বিয়ের আয়োজনটা শেষ করবেন। তবে বাড়ির ছোটদের অনুরোধে মোটামুটি বড় করেই আয়োজন করা হচ্ছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে ধমকাদমকি করছেন বড় চাচি আর রুমানা ফুপু। চারপাশে ডালা, সাজানো মিষ্টির ঝুড়ি, নানা রঙের ফল আর থালায় থালায় মেহেদি সেজে রয়েছে।
'ওরে তোরা এখনও তৈরি হসনি? নাফিস! মাহিরা! তোদের সাজগোজ কি আর শেষ হবে না?'
ফুপু চিল্লাচ্ছেন।নাফিস দোতলা থেকে নামতে নামতে গায়ে নীল রঙের পাঞ্জাবিটা ঠিক করে বলল,
'আহা ফুপু! চিল্লাচ্ছ কেন? বরের বাড়ির লোকজনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। একটু টিপটপ হতে হবে না? এই দেখো, সাব্বির ভাইয়ের পাঠানো ঘড়িটাও পরে নিয়েছি!'
এরপর সবাই এসে জড়ো হলো প্রিয়ন্তীর ঘরে।মুয়াজ দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই মাহিরা বলল,
'এই মুয়াজ! শুনলাম কাল মাঝরাতে নাকি বরপক্ষ ঢাকা থেকে এসেছে। তুই দেখেছিস রে?'
মুয়াজ মুখ কালো করে বলল,
'না তো। কয়বার চক্কর দিলাম সকাল থেইকা।কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেখিনাই। তবে বাড়ির সামনে কাদা-মাখা একটা জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এসেছি! বাফরে, একদম মিলিটারি গাড়ির মতো দেখতে!'
মাহিরা মুয়াজের মাথায় একটা টোকা মেরে বলল,
'ধুর ব্যাটা! গাড়ির কথা কে জিজ্ঞেস করেছে?বর দেখেছিস ক্কিনা সেটা বল!'
'না। তবে দুলাল ভাই নাকি সকালে কাজ করতে গিয়ে বরের বাড়ির একজনকে দেখে এসেছে। দুলাল ভাই বলছিল লোকটা নাকি ঢাল-তলোয়ারের মতো একদম লম্বা। মারাত্মক হ্যান্ডসাম দেখতে! তবে মুখটা নাকি খুব গম্ভীর আর রাগী টাইপ। কিন্তু ওইটাই বর কিনা তা তো আর দুলাল ভাই নিশ্চিত বলতে পারেনি!'
ফুপিদের তাড়নায় জলদি পরিপাটি হয়ে নিচে নামল ওরা। পিতলের কাঁসা ঢালা হাতে নিয়ে ছুটল হওলাদার বাড়ির উদ্দেশ্য। দূরের পথ নয়। এইতো মাঝের একটা বাড়ি রেখেই হাওয়ালাদাঁড় বাড়িটি।
মিনিট দুয়েকের মাথায় একত্রে এসে পৌছালো সেখানে। বাড়িটা রূপনগরের বেশ পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী। মেহরিনের ভাব ভবিষ্যৎ শ্বশুরালয়ের নানার বাড়ি এটি। ধবধবে সাদা রঙের প্রকাণ্ড দোতলা এক দালান। সামনে প্রশস্ত উঠোন আর চারপাশে সুপারি ও নারিকেল গাছের সুবিন্যস্ত সারি।
বিয়ের উপলক্ষে বাড়ির সামনের উঠোনটা সাজানো হয়েছে। উঠোনজুড়ে টানানো হয়েছে নানা রঙের কাপড়ের দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল। সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মেহমানদের বসার চেয়ার।
বাড়ির ফটকের কাছে এসে নাফিস, পাভেল আর মাহিরাসহ অন্য কাজিনরা থামল। ওরা কৌতুহলী চোখে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল বর বা তার বন্ধুদের কোথাও দেখা যায় কি না দেখতে! তবে বাড়ির সামনের প্যান্ডেলে তখন শুধু পরিবারের দু-একজন প্রবীণ আত্মীয় আর ডেকোরেটরের লোক ছাড়া পরিচিত বিশেষ কাউকে চোখে পড়ল না।
সবাই যখন প্যান্ডেলের নানারকম সাজগোজ দেখে মন্তব্য করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একটু পেছনে পড়া প্রিয়ন্তী এক অস্বস্তিকর সমস্যায় পড়ল। মিতালীর জোর জবরদস্তিতে পরা শাড়ির আলগা আঁচলটা ওর ডান হাতের কাচের চুড়ির সুক্ষ্ম ফাঁকে আটকে গেছে! হাত নাড়াতে গেলেই চুড়ির ঘর্ষণে শাড়ির মিহি সুতো টেনে ওঠার উপক্রম।প্রিয়ন্তী বিড়বিড় করে উঠল বিরক্তিতে,
'ধুর! কী এক মুসিবতে পড়লাম!'
বাম হাত দিয়ে ডান হাতের চুড়িগুলো ধরে শাড়ির পেঁচানো সুতোটা সাবধানে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগল সে। মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলেই পুরো মনোযোগ আটকে রেখেছিল ও।
ঠিক সেই মুহূর্তে হাওলাদার বাড়ির ভেতরে কারুকাজ করা বড় দরজাটা খুলে গেল।ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে এলেন দুইজন যুবক। দুজনের গায়েই পাঞ্জাবি। একজনের পরনে হালকা নীলচে রঙ্গের সিল্ক পাঞ্জাবি, আর অন্যজনের পরনে গাঢ় অফ-হোয়াইট রঙের। কথা বলতে বলতে সামনে এগোচ্ছে তাড়া।
ওদের বের হতে দেখেই মেহরিনের মেয়ে কাজিনদের দলটা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। মাহিরার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওর চাচাতো বোন রিয়া একহাত দিয়ে মাহিরার বাহুতে চিমটি কেটে গায়ের ওপর প্রায় ঢলে পড়ল,
'ওরে মাহিরা! আমায় একটু শক্ত করে ধর তো বোন! আমার পা জোড়া বোধহয় মাটির সাথে জমে বরফ হয়ে গেল রে!'
মাহিরা চোখ দুটো বড় বড় করে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করল,
'আমার অবস্থাও তো সেইম। ওরে ভাই রে ভাই, গ্রামে এ কী চিজ দেখলাম! এরা কি কোনো ভিআইপি গ্রহ থেকে ল্যান্ড করল নাকি?'
রিয়া আবার ফুসফুস করে উঠল,
'ইশ! এদের কোনো একটাকে যদি আমার ভাগ্য লিখে রাখত। তাইলে তিনবেলা খাবারের পরিবর্তে এদের চেহারা দেখে দেখে পেট ভরতাম আমি!'
পরপর ওদের পিছন পিছন নামল আরেকজন। এবারের টা ওদের দুটো থেকেও আরো সুদর্শন দেখতে। দেখলে দেখতেই মন চায় শুধু। মাহিরা ঢুক গিলে বলল,
'এরে! এটা তো দেখি আরো জোস্। কোনটা রেখে
কোনটা দেখব!'
কথা শেষ হতে না হতেই সেই ঠিক পেছন থেকে নেমে এলো আরও একজন। গায়ে তার আকাশি রঙের সুতি পাঞ্জাবি। কাঁধ দুটো যেন পাহাড়ের মতো চওড়া। টানটান বলিষ্ঠ দেহাবয়ব। গায়ের রঙ উজ্জ্বল -ফর্সা। সুগঠিত চিবুক আর একজোড়া তীক্ষ্ণ কড়া চোখ! তাকে দেখামাত্রই মাহিরার মুখ থেকে একপ্রকার আর্তনাদ বেরিয়ে এল,
'ওরে প্রিয় রে! এটা তো দেখি ওই সামনের গুলো থেকেও বেশি কড়া! ইশ! ইশ! পুরাই টসটসে টমেটো! আমার তো ভাই একেই লাগবে! একে বিয়ে না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না বলে দিলাম! প্রয়োজনে এ বাড়ির সামনে অনশন ধর্মঘটে বসব, তবুও এদের মধ্যে থেকে অন্তত এই শেষের জনটাকে আমার চাই-ই চাই!'
মাহিরার এহেন নাটকীয় চিল্লাচিল্লিতে বিন্দুমাত্র হেলদোল দেখা গেল না প্রিয়ন্তীর মধ্যে। সে তখনো মাথা নিচু করে নিজের ব্যস্ত হাতে কাঁচের চুড়ি থেকে শাড়ির সুতো ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। মেজাজটা এমনিতেই খিঁচড়ে আছে ওর। সে মাথা না তুলে একদম নিরুত্তাপ গলায় বলল,
'তুই ভালো করে দেখ মাহিরা। আমি এসব ফালতু জিনিসে একদম ইন্টারেস্টেড নই!'
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতালী এতক্ষণ কাজিনদের কাণ্ড কারখানা দেখে ঠোঁট টিপে হাসছিল। এবার ননদের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বেশ টেনে টেনে রহস্যময় গলায় আওড়াল,
'আরেহ আরেহ প্রিয়, দেখই না একবার! দেখলে হয়তো ইন্টারেস্টেড হলেও হয়ে যেতে পারো!'
প্রিয়ন্তী এবার একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দিল,
'ভাবি তুমিও?'
মাহিরা একপ্রকার গায়ের জোরে প্রিয়ন্তীর থুতনিটা ধরে ওর মুখটা সোজা সামনের দিকে ঘুরিয়ে দিল,
'একবার চোখ তুলে আগে তাকা তো মাইয়া। বললেই হলো ইন্টারেস্টেড না? আগে দেখ, তারপর বল!'
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখটা সামনে ঘুরাতেই প্রিয়ন্তীর নজর গিয়ে পড়ল সেই আকাশী পাঞ্জাবি পরা শরীরটার ওপর।মাথায় বাজ পড়ল অমনি। বন্ধ হলো শ্বাস প্রশাস। থমকে গেল বুকের ধুকপুকানি। আটকে গেল চোখের পলক।কাজল কালো দুচোখ জুড়ে ছেয়ে এল অবিশ্বাস্য বিস্ময়!সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে কি করবে, কি বলবে—সব হারিয়ে একপ্রকার কি কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে!
এই তো সেই পরিচিত অবয়ব!সেই নিস্পৃহ আর রাশভারী মানুষটা! যার একটা মেসেজের অপেক্ষায় ছটফট করছে ও।প্রিয়ন্তীর শুকিয়ে যাওয়া গোলাপি ঠোঁট দুটো আপনাতেই একটু ফাঁক হয়ে গেল। চরম স্তব্ধতার মাঝে ওর গলা দিয়ে অস্ফুট শব্দে বেরিয়ে এল,
'ক...কমান্ডার সাহেব!'
·
·
·
চলবে……………………………………………………