ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ০৬ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সময় থেমে গেলে কেমন হয়? চারপাশটা যখন ধীরে চলতে থাকে, নিশ্চুপ হয়ে যায় বুকের ধ্বনিটা সেটাই কি প্রলয়? ফিলোসোফির ভাষায় কারো কণ্ঠ শুনে হৃদপিণ্ড থেমে যাওয়াকে কী বলে? বিভ্রম নাকি ভুল?
 মেজবাহ্ ঠিক জানে না তার সাথে কী হয়েছে। তবে আচমকা সে অনুভব করল তার শরীরের ভেতর দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গিয়েছি। তার পা জমে গিয়েছে মাটির সঙ্গে। চারপাশটায় এই গ্রীষ্মতেও সুইজারল্যান্ডের স্নো-ফল হচ্ছে যেন। স্নো-ফলের ভেতর মেজবাহ্ দাঁড়িয়ে আছে সেই অপরিচিত এক কণ্ঠ নিয়ে। যেই কণ্ঠটি প্রতিটি শুক্রবারে মেজবাহ্ শেখের বুকে ঘন ঝড় নামিয়ে দেয়। যে ফোনকলের অপেক্ষায় মেজবাহ্ সপ্তাহের বাকি ছয়টি দিন কাটায় অস্থির ভাবে। যেই কণ্ঠটি শুনে থেমে যায় মেজবাহ্ শেখের ব্যস্ত দিনের ক্লান্তি। ঠিক সেই কণ্ঠটি এই মুহূর্তে তার কান ছিঁটকে বেরিয়ে গেলো যেন। সে কি ভুল শুনছে? সে কি এই ভর সন্ধ্যেতে জেগেই স্বপ্ন দেখছে? কী হয়েছে তার? শরীর এমন নিশ্চল লাগছে কেন?

 মেজবাহ্'র চারপাশের ধীর চলা পৃথিবীটা এক মুহূর্তে চূর্ণ করেই সিকান্দারের কণ্ঠ ভেসে এলো,
 “ভাই, কেবিনটা পেয়েছি। আসেন।”

 কেবিন পেয়েছে? কীসের কেবিন? কোন কেবিনের কথা বলছে সিকান্দার? মেজবাহ্'র যেন বুঝতে অসুবিধা হলো। হতবিহ্বলের মতো সিকান্দারের মুখটিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। 
 সিকান্দার মেজবাহ্'র সেই অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে ভড়কালো কিছুটা। ভাইয়ের মুখটা কেমন রক্তশূণ্য লাগল তার কাছে। 

 সে দু'কদম এগিয়ে এলো। মেজবাহ্'র খুব নিকটে এসে দ্বিধান্বিত স্বরে ডাকল পুনরায়, “ভাই.. কেবিনটা…”

  মেজবাহ্'র ঘোর ভাঙলো। এক ঝটকায় যেন অলৌকিক দুনিয়া থেকে এসে পড়ল তার কোলাহলপূর্ণ অশান্তির পৃথিবীটায়। তড়িৎগতিতে পিছে ঘুরতেই দেখল মধ্যবয়স্ক লোকটি বেরিয়ে যাচ্ছেন হন্তদন্ত পায়ে। খুব যেন তাড়া লোকটির। মেজবাহ্ চোখ ঘোরালো। লোকটির সামনে একটি ছোটোখাটো মেয়েকে আবছা দেখতে পেলো কেবল। তারপর আরও কিছু মেয়েকে দেখলো চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। এমন পাগলের মতো মাথা ঘুরিয়ে দেখল যেন পিছে ফেলে এসেছে তার জীবনের একটি অংশ।
 কোথায় সেই কণ্ঠের মেয়েটি? একটু আগে যে ডাকল বাবা বলে? না-কি সে শুনল ভুল? বিকেলেই মেয়েটির কথা মনে করছিলো বলেই কি সেই স্বরটি কানে বাজলো? তাই বলে এতটা একরকম কণ্ঠ? রিসেপশনের কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। এই মেয়েটি কি সুচরিতা? এই অপরিচিত মুখের ভিড়ে তার সুচরিতা আছে? কোনটি তার সুচরিতা?

  চাপা শ্বাস ফেলল সে। বুকটা কেমন ধক্ করে উঠেছে। মেয়েটা তাকে মেরে ফেলার পায়তারা করেছে না-কি? নয়ত ঐ কণ্ঠ শুনলে শ্বাসটা কেন বাড়ে এত? 
মেজবাহ্'র অদৃশ্য একটি রাগ গিয়ে যেন পড়ল সিকান্দারের উপর। এই গর্দভটা এই মুহূর্তে না ডাকলে সে তো আরও কিছুক্ষণ শীতল, বরফে ডুবে থাকা একটি পৃথিবীতে বিচরণ করত!

 “ভাই, কেবিনে যাবেন না?” সিকান্দার পুনরায় তাড়া দিলো। 
জায়গাটা হসপিটাল না হলে মেজবাহ্ আজ একটা কেলেঙ্কারি করে বসতো। ব ন্দুকটা বের করে হয়ত একটা নিশানা সিকান্দারের জিভ বরাবর মারতো। অসভ্য ছেলে একটা!

 “কেবিনে কী তোর? কেবিনে যাওয়ার জন্য এত মরে যাচ্ছিস কেন? যেন মনে হচ্ছে তোর বউকে ডেলিভারি রুম থেকে বের করে কেবিনে শিফট করেছে। নবজাতকের মুখ দেখিয়ে মিষ্টি খাওয়াবি আমাদের তাই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতেই হবে। ফালতু ছেলে একটা!” মেজবাহ্’র মুখের চাপা বুলিতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো সিকান্দার। চোখগুলো বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। ভড়কে যাওয়া উদ্ভট চোখে তাকিয়ে রইল সে। 
 
মেজবাহ্ আর কথা না বাড়িয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। সিকান্দারকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দিলো। ধাক্কাটা মৃদু দেখালেও সেই শক্ত সামর্থ্য দেহের ধাক্কায় দু'পা পেছালো সে। বিড়বিড় করে বলল, “যাহ্ শালা! আমি আবার কী করলাম? এতক্ষণ তো নিজেই এমন তাড়াহুড়ো করছিলো যেন নিজের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। এখন সব দোষ আমার?”

 ইমনকে যেই কেবিনে পাওয়া যাওয়ার কথা সেই কেবিনে গিয়ে দেখল, কেবিনটা ফাঁকা। ইমন কেন, ইমনের টিকিটারও খোঁজ নেই। ওরা আসতে আসতে চলেও গেলো এই ছেলে?
 রিসেপশনিস্টের সেই সিনিয়র অফিসারটা সাথে ছিলো বলেই মেজবাহ্ তাকেই জিজ্ঞেস করল। 
“এই রুমের পেশেন্ট কোথায়? আহত হয়ে এডমিট হয়েছিলো না?”

  সিনিয়র অফিসারের এত খোঁজ জানবার কথা নয়। হসপিটালে এমন আহত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা নেহাৎ অল্প নয়। সকলের ডিটেইলস তো আর তার মনে থাকে না। 
তিনি মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলেন,
 “রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি। অপেক্ষা করুন।” কথা শেষ করেই অফিসারটি ছুটলে রিসেপশনের দিকে। এতক্ষণ সিকান্দারও এসে দাড়িয়েছে। খোলা দরজার ওপাশে খালি কেবিনটা দেখে সে যেন অবাক হলো কিছুটা, 
 “ভাই, সেই ছেলে নেই এখানে? চলে গিয়েছে!”

মেজবাহ্'র মাথায় তখনো সেই সুপ্ত ভাবনাটি বিচরণ করছে। কিছুক্ষণ আগে তার সঙ্গে হওয়া ঘটনাটি সত্যি ছিলো না-কি ভ্রম, সেই হিসেবে থেকে থেকে মত্ত হয়ে যাচ্ছে অবাদ্ধ মনটি। 
সিকান্দারকে সে বেশ হেলা করে উত্তর দিলো,
 “কোথায় চলে গিয়েছে! এইতো ভেতরে শুয়ে আছে তোকে দেখার জন্য। যা দেখা দিয়ে আয়।”

 “শুয়ে আছে! কোথায়? রুমতো ফাঁকা।” কথা বলতে বলতে সিকান্দার আরও একবার উঁকি দিলো রুমটিকে। তার চোখ সত্যিই দেখছে কি-না সেটা বোঝার চেষ্টা করল। ভাই যেহেতু বলেছে একবারতো তাই দেখতেই হয়।

 মেজবাহ্'র সঙ্গে থাকা দলের ছেলেগুলো মিটিমিটি হাসকে লাগল ওদের এই কীর্তিতে। এই সিকান্দারটা এত বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে অথচ মেজবাহ্ শেখকে বিশ্বাস করে অন্ধের মতো। ভাই যদি একবার বলে পৃথিবীটা গোল না ত্রিভুজাকৃতির তাহলে সিকান্দারও সেই কথাই মাইকিং করে প্রচার করতে শুরু করবে। ওর ভাবনামতে, দুনিয়াে সবাই ভুল করতে পারলেও ওদের ভাই ভুল করতে পারেন না।

  এই পর্যায়ে হেসে ফেলল মেজবাহ্। তবে সেটি খুবই সুপ্ত ভাবে। কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে সিকান্দারের মজা উড়িয়ে বলল,
“কী ব্যাপার, সিকান্দার? তুই দেখছি এই ছেলেটাকে চোখে হারাচ্ছিস। ভালো-টালো বেসে ফেললি না-কি?”

 “ভাই! ভালো কীভাবে বাসবো? ও তো ছেলে!” সিকান্দারের বোকা বনে যাওয়াটা দেখে এবার সকলে হেসে ফেলল। হাসল মেজবাহ্ও। ছেলেটার বাহুতে দু'টো চাপড় দিয়ে নিজের দিকে টেনে এনে নিয়ে এলো। তার জীবনে যে ক'জনকে সে পছন্দ করে, বিশেষ ভাবে তার মাঝে এই সিকান্দারও একজন। এমন শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে সে নিজের ক্যারিয়ারে দুটো পায়নি। বাকিগুলোও ভালো কিন্তু সিকান্দারের মতো নয়। সিকান্দারের বিশেষত্বই যেন ওকে বানিয়েছে আলাদা।

তন্মধ্যেই রিসেপশন থেকে ছুটে এলেন অফিসার। কিছুটা অপরাধী স্বরে জানালেন, “উনাকে কিছুক্ষণ আগেই ডিসচার্জ করে দেওয়া হয়েছে। মাথায় আর হাতে আঘাত পেয়েছেন। আপাতত কিছুটা ভালো আছেন আর হসপিটালেও থাকতে চাচ্ছিলেন না বলে ডিসচার্জ করে নিয়ে গিয়েছে তার পরিবার।”

মেজবাহ্ ভ্রু কুঁচকালো। ছেলেটা কি বুঝতে পেরেছিলো সে যে এখানটায় আসবে? তা-ই বলেই কি এত তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছে? 
 অফিসারকে বিদেয় করেই সিকান্দারকে ইশারা করল মেজবাহ্। ছেলেটা কে এবং তার চৌদ্দ গোষ্ঠীতে আছে কে কে সেই সমস্ত খোঁজ যেন তার কাছে পৌঁছানো হয়। যত দ্রুত সম্ভব। 

—————

  শুক্লাদের বাড়িটা আর চার-পাঁচটা শিল্পপতিদের বাড়ির মতোই সুন্দর, সৌহার্দ্যপূর্ণ। ধনী হওয়ার ছাপ বাড়িটার চারপাশটা জুড়েই। বাড়ির গেইট থেকেই আলো ঝলমলে একটা ব্যাপার। বাহির থেকে দেখলেই যে-কেউ আঁচ করতে পারবে বাড়িটায় যে-সে লোক থাকে না। একমাত্র উচ্চবিত্ত ছাড়া এমন বাড়ি কারো হওয়াও সম্ভব নয়।

  ইমনকে দেওয়া হয়েছে একটি ঘর। ঘরের চারপাশটা খোলামেলা, বাতাস আসা-যাওয়া করার মতোই সুন্দর। ইমনকে ঘরে দেওয়ার পরই টুইটুবানি নিজে যেচে রান্নাঘরটা বুঝে নিয়েছে। ইমন ভাইয়ের কোনো কমতি সে হতে দিবে না। যার-তার হাতের রান্নাও সে ইমন ভাইকে খেতে দেবে না বলেই পণ করেছে। কেবল আজ বলে নয়, সবসময়ই ওর এই এক দোষ। শিকদার বাড়ির কাউকেই ও বাহিরে খেতে দিতে পছন্দ করে না। নিজের মনমতো রেঁধে খাওয়াতে চায় কেবল।

 জোহরাকে দেওয়া হয়েছে শুক্লার ঘরে থাকতে। যদিও বাড়িটিতে অনেকগুলোই ঘর তবুও শুক্লা এক প্রকার জোর করেই নিজের ঘরে তুলেছে জোহরাকে। বহু বছর পর জোহরাদের এই বাড়িতে পা পড়েছে। গত দেড়, দুই বছর আগে যদিও বা ওরা ভাইবোনেরা সিলেট ঘুরতে এসেছিলো কিন্তু ওদের বাড়িতে উঠেনি। সেজন্য শুক্লার মা শাহানা বেগম বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। তার বোনের ছেলেমেয়ে গুলোকে তিনিও যে কম আদর করেন না। অথচ ছেলেমেয়ে গুলো অব্দি বাবার মতো মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছে এই পরিবারটা থেকে। তাদের কী দোষ ছিলো? দোষ যা ছিলো তা তো শিকদারের পরিবারের তবে কোন শাস্তি মিলেছিলো তাদের?

 জোহরাদের এইখানে উপস্থিতিটা ঠিক মানতে পারেননি ইকবাল হোসেন- জোহরার খালু। তেমন আন্তরিকতা তার হাবভাবে ফুটে উঠেননি। এমনিতেও তিনি আগে থেকেই একটু অহংকারী মানুষ ছিলেন তার উপর শিকদার পরিবারের সাথে তাদের যেই একটা অসম্মানজনক ঘটনা ঘটেছিলো এরপর এই পরিবারটাকে তিনিও যেন অদেখা করেই বেঁচে ছিলেন। দুটো পরিবারের জন্যই এই দেখা অস্বস্তিজনক। কিন্তু যাবের শিকদারও যে অসহায়। ছেলের এহেন দশা না ঘটলে এই বাড়িতে আদৌ কি পা রাখতেন তিনি? মরে গেলেও না। মাথা নত করে যে জায়গা দিয়ে চলতে হয় সে জায়গাতে যাবের শিকদার আসেনই না। অথচ আজ অদৃষ্ট তাকে সেই এক অস্বস্তিকর মোড়েই এনে দাঁড় করিয়েছে।

  শুক্লার রুমটি অত্যাধিক পরিপাটি। বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় দূরের এক খণ্ড বাগানময় সিলেটকে। সবুজ, সৌরভময়ী সিলেট। জোহরা না চাইতেও ঘুরে ঘুরে রুমটি দেখছে। এমন পরিপাটি ঘর কমই দেখা যায়। অবশ্য শুক্লা আপুর রুম এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। একদিকে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ, অপরদিকে বিত্তবান পিতার কন্যা। তার রুম রুচিশীল ভাবে গোছানো না থাকলে কার রুমই বা গোছানো থাকবে?

 “জোহরা, তুমি আমার আলমারিটা খুলে তোমার যেই পোশাকটি পছন্দ হয় সেটি বের করে গোসল করে পরে নাও। সারাদিন বহু ধকল গিয়েছে তো তোমাদের উপর। যাও।” 
 শুক্ল আপুর কণ্ঠটিও বেশ সুন্দর। বাচনভঙ্গি এত সুস্পষ্ট। মনে হয় যেন আবৃতি করে কথা বলে। 
শুক্লার হাত জোহরা বাম বাহুটির উপর। মুখে আন্তরিক হাসির কোনো কমতি নেই। মোটেও লোক দেখানো আন্তরিকতা নয়। সত্যি সত্যি তাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে জোহরাদেরকে দেখে।

 জোহরার ভেতরে তবুও আড়ষ্টতা। তাছাড়া থাকবে না-ই বা কেন? এই পরিবারটির কাছে তাদের মাথা নত হয়ে গিয়েছে তা-ও চিরজীবনের জন্য। সেখানে চাইলেও কি তারা প্রফুল্ল মনে কথা বলতে পারে?
 জোহরা অস্বস্তিতে জড়িয়ে গেলো, “আপু, তুমিই না-হয় একটা জামা বের করে দাও। তোমার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়া উচিত মনে হচ্ছে না।”

জোহরার আড়ষ্টতা, অস্বস্তিতে গুটিয়ে যাওয়া চোখ এড়ালো না শুক্লার। এবং এতে বোধহয় তার কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুণ্নও হলো। জোহরার থুতনিতে হাত দিয়ে বেশ স্নেহভরা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
 “চোখ নামিয়ে এমন করে কথা বলছো কেন, জোহরা? আমি, আমরা কী তোমার, তোমাদের পর? নেহাৎ খালা বেঁচে নেই বলেই তোমরা আমাদের সাথে যোগাযোগ না করে থাকে পারছ। খালা থাকলে তা হতে দিতো না মোটেও। আম্মু আর খালাতো জানের জান ছিলো।”

  মায়ের কথা উঠতেই জোহরার শুকনো মুখটি শুকিয়ে যায় আরও। মলিন হয়ে আসে চোখ দু'টো। অস্বস্তি, অশান্তি আর ঐ কিছুক্ষণ আগে লোকটার পেছনটুকু দেখতে পাওয়ার উত্তেজনাটা বুকের ভেতর এলোমেলো হয়ে দলা পাকিয়ে গিয়েছে যেন। এতটুকু মনের কি আর সাধ্য আছে এত কিছু বহন করার?
 ছোটো মুখে জোহরা কেবল অসম্মতি জানায়, “না, আপু অমন কিছু নয়। তুমি শুধু শুধু ভাবছো।”

 “তোমাদের আচরণেই তো ভাবছি। আচ্ছা, সেসব বাদ দাওতো। তুমি তখন হসপিটাল থেকে ওরকম ভাবে ছুটে ফিরে এলে কেন খালুকে ডাকতে গিয়ে। গাড়িতে যেভাবে লাফিয়ে বসেছিলে যেন মনে হচ্ছিলো ভূত দেখে ফেলেছিলে।”
 শুক্লার কৌতূহল দৃষ্টিতে নিভে এলো জোহরা। বুকের মিছিল সরব হয়ে উঠল। সে দৌড়ে আসবে না? সেই মুহূর্তে বাবাকে ডাকতে গিয়ে যখন সে বুঝল কেলেঙ্কারি ঘটে গিয়েছে তখনতো চোখের সামনে অন্ধকার দেখছিলো। লোকটার মুখটা না দেখলেও সেই লম্বাচওড়া শরীর, সাদা পাঞ্জাবি, নীল রঙের চাদরটা, বলিষ্ঠ বাহু, গায়ের শুভ্র রঙ, চুলগুলোর ভাঁজ… কী চেনে না সে লোকটার? সব যেন মুখস্থ হয়ে আছে তার। সেই মানুষটার মুখের সামনে দাঁড়াতে পারতো? মানুষটা চিনে ফেলতো না? তার মুখটা না-হয় চিনতো না, কিন্তু কণ্ঠটা? সেটা কি ঐ চতুর মেজবাহ্ শেখ না চিনে থাকতো? তাও-তো ছুটে পালিয়ে ছিলো সে!

  জোহরাকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুক্লা মৃদু ঝাঁকালো তার বাহু, “কথায় কথায় কী এত ভাবতে বসো, জোহরা? তুমিতো আগে খুব চঞ্চল ছিলে। এখন এত ভাবুক হলে কেন? তা-ও এত অল্প বয়সে?”

  জোহরা বাস্তবে ফিরে আসে। প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতে চায়, “সারাদিন তো খুব দৌড়ঝাঁপ গিয়েছে তাই একটু ক্লান্ত লাগছে আপু। তুমি আমায় একটা জামা দাও আমি দু'টো মগ জল ঢালি শরীরে।”

  শুক্লা বুঝল, ওর সাথে স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে মেয়েটার। হয়ত আর স্বাভাবিক হবেও না। না-হওয়াটাই স্বাভাবিক বৈকি। সে ছোটো একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়। আলমারি খুলে সুন্দর দেখতে একটি সাদা গ্রাউনের মতো জামা বের করে আনে। জোহরা ছোটোখাটো দেখতে ভরাট মুখের মেয়ে। এই ফ্রকটাতে আদুরে বিড়ালের মতো লাগবে ওকে। 

 জামাটি পেয়েই বুকে জড়িয়ে বাথরুমের দিকর এগিয়ে যায় জোহরা। প্রশ্ন করবে কী করবে না ভেবে চট করেই শুক্লা জিজ্ঞেস করে বসল, “রুনু আপার কী খবর, জোহরা? কোনো খবর পেয়েছিলে তার?”

 ঐ মেয়েলি নামটা কর্ণগোচর হতেই পা থেমে যায় জোহরার। হাতটা থেকে পরে যায় জামাটা। শরীরে যেন ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। কত বছর পর এই নামটা কেউ বলল তার সামনে? ঠিক কত বছর পর নিজের কানে সেই নামটা সে শুনতে পেলো? বহুবছর? বহুদিন? এই নিষিদ্ধ নামটা তার কত আপন! কত আপন!

  জোহরা মূর্তির মতো থমকে দাঁড়িয়ে বহু কষ্টে বলল, “এই নামটা উচ্চারণ করো না আর, আপু। আম্মাকে তো হারিয়েই ফেলেছি, বাবাকে আর হারাতে চাই না। আমাদের তাহলে আর থাকবে কে বলো?”

—————

  শেখ বাড়িতে খাবার খাওয়ার একটা বিশেষ কায়দা আছে। সকলে এসে চেয়ারে না বসলে খাওয়া আরম্ভ করা হয় না। বহু বছর ধরে এই নিয়মই চলে আসছে। এই নিয়মের নড়চড় হয়নি কখনো। আজও নয়। একে একে বসতে শুরু করেছে সকলে। 

  রিমঝিম আজ খাবার দিতে বাহিরে যায়নি। এমনকি যায়নি নিজের শোবার ঘরেও। বিকেল থেকে রাত অব্দি কাটিয়ে দিয়েছে লাইব্রেরিতে। শেখ বাড়ির নিজস্ব লাইব্রেরি। নিজের জীবনের খুঁটি খুঁজে পায় না সে। ভাসছে কেবল স্রোতের কালে। দিক্বিদিক শূণ্য তার। কোথায় গেলে শান্তিতে বাঁচবে তেমন খোঁজ চায় না সে। সে খোঁজ চায়, কোথায় গেলে একটু শান্তিতে মরতে পারবে। কোথায় গেলে প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবে সে? তার জীবনটাতো এমন ছিলো না। হাসতে-খেলতে থাকা সুন্দর একটা জীবন ছিলো তার। এরপর নিজের ভুলে সেই সুন্দর জীবনটা সে ধ্বংস করে দিয়েছে। মিশিয়ে দিয়েছে মাটির সঙ্গে। এখন আর আফসোস করারও দুদণ্ড সুযোগ নেই। কান্নার মতোও জল নেই চোখে। এ কেমন হাহাকারে ভরা জীর্ন জীবন বেছে নিলো সে?

 খাবার টেবিলে সবার শেষে উপস্থিত হলো মেজবাহ্। চুলগুলো ভেজা এখনো। এসেই বোধহয় গোসল সেরেছে। কখন যে সে গোসল করে, কখন যে বাড়ি ফেরে ঠিকঠাক জানেও না কেউ। থাকেতো নিজের অন্য এক পৃথিবীতে। 
 মেজবাহ্ খাবার টেবিলে কাজ ব্যতীত কথা বলে না তেমন। খাওয়াতে ব্যাঘাত ঘটে। কারো দিকে তাকায়ও না তেমন। বাড়ির কারো প্রতিই বিশেষ আগ্রহ নেই তার। তবে আজ টেবিলে রিমঝিমের অনুপস্থিতি সর্বপ্রথম তার চোখে লাগল। একবার চোখ রাখল ডাইনিং পেরিয়ে ওপাশে থাকা রান্নাঘরটার দিকেও। তার বিশেষ রাকঢাক নেই বলেই প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করল, “রিমঝিম কোথায়?”

 স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন কিন্তু মেজবাহ্ প্রশ্ন করাতে তা অস্বাভাবিক শোনালো। শোনানোর কথাই। রেণুকা বেগম ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন বোধহয়। তিনি ছেলেটাকে বার বার বলেছেন অন্তত তার বড়ো জায়ের পুত্রবধূ বিষয়ক কোনো কথা যেন ছেলেটা না বলে। কিন্তু এই ছেলে এত জেদি হয়েছে! মায়ের কথাও শোনার প্রয়োজন করে না। 
 তাহমিনা বেগম ঢোক গিললেন। তিনি এতক্ষণ স্বস্তির শ্বাস নিচ্ছিলেন পুত্রবধূকে উপস্থিত না দেখে। মেজবাহ্’র কান অব্দি তখনে ঘটনা চলে গেলে বিপদ ঘটে যাবে। তাই চেয়েছিলেন মেয়েটা এখানে না আসুক। কিন্তু এই দস্যি ছেলে ঠিক ঠিক সেই মেয়েরই খোঁজ করল? ওর এত কীসের দরদ মেয়েটার প্রতি?

  কাউকে টু শব্দটি করতে না দেখে মেজবাহ্'র বিচক্ষণ মস্তিষ্ক ঘটনা আঁচ করে ফেলল হয়ত। খাবারের প্লেটে হাতও দিলো না। কর্কশ স্বরে পুনরায় প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপার? কারো কানে কি আমার কথা যায়নি? রিমঝিম কোথায়?”

  কবির শেখ নিজের পুত্রকে আটকাতে চাইলেন, “হয়ত ওর শরীর বিশেষ ভালো নেই তাই আসেনি। সবসময় বাড়ির কাজ করতে হবে এমন কোনো কথা আছে না-কি? বিশ্রাম করছে হয়ত!”

“আব্বু, লোক চড়িয়ে খাই আমি। প্রতিদিন শ'খানেক মানুষকে এক হাতে সামলাই। আর তুমি আমায় ছেলেভোলানো কথা বলছো? যেই মেয়ে জ্বর নিয়ে টলতে টলতে এখানে আমাদের খাবার পরিবেশন করার কথা ভুলে না সে আজ বিশ্রাম করছে তা মেনে নিবো? কী হয়েছে বাড়িতে?”

  মেজবাহ্'র রাগ যে তড়তড় করে বাড়ছে তা ওর কণ্ঠেই প্রকাশ পাচ্ছে। ঘটনা বেগতিক দেখে রেণুকা বেগম ডাকলেন ছেলেকে, “মেজবাহ্, মন দিয়ে খাও বাপজান আমার। বউমার শরীর ভালো নেই বিশেষ।”

 “সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। শরীর ভালো নেই কেন? কী হয়েছে? ভণিতা করা হচ্ছে কেন এখানে? আমি কি ভণিতার মতো প্রশ্ন করেছি এখানে? হ্যাঁ? রিমঝিম কোথায়?”
 এবার প্রশ্নের সঙ্গে তীব্র একটি চড় বসালো খাবার টেবিলে। সেই চড়ে টেবিলের উপর থাকা ডালের বাটিটা পড়ে কিছু ডাল ছড়িয়ে গেলো বিশ্রী ভাবেই।

 ভয় পেয়ে গেলো টুপুর ছোটো ছেলেটি। মা যদিও ওকে শিখিয়ে দিয়ে ছিলো বড়োদের মাঝে কথা বলতে না কিন্তু ভাবির প্রতি মায়া থেকে অথবা ভয় থেকেই ও কথা বলে ফেলল, 
 “ভাইজান, ভাবিতো লাইব্রেরিতে। বড়ো ভাইজান ভাবিকে অনেক জোরে চড় মেরেছিল। ভাবি ব্যথা পেয়েছে।”
 চার বছরের রৌদ্ররের আধো বুলিতে ফুটে ওঠা কথায় মেজবাহ্’র কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো সবটা। ক্ষুব্ধ হয়ে কাঠের চেয়ারটা পেছনের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে গেলো। এতটা জোরেই ছুঁড়ল যে চেয়ারটা সেন্ট্রাল টেবিলের সাথে ধাক্কা খেয়ে টেবিলের উপর থাকা ফুলদানিটা পরে ভেঙে চুরে একাকার হয়ে গেলো। 

  মেজবাহ্ এক মুহূর্ত দেরি না করেই ছুটে এসে চেপে ধরল হিমেলের গলাটা। এত রাগান্বিত, ক্রোধান্ধ হয়ে গেলো সে এক মুহূর্তের মাঝেই যেন শান্ত-শীতল মেজবাহ্ শেখের খোলশ পাল্টে গিয়েছে। খাবারের টেবিল থেকে টেনে তুলে ফেলল এক ঝটকায়। ভুলেই বসলো ছেলেটা ওর বড়ো ভাই হয়। 

 “তোকে বারবার বলেছিলাম এই বাড়িতে মেয়েদের শরীরে হাত দেওয়া নিষেধ, হাত তুলবি না। তারপরেও, তারপরেও তুই এই আস্পর্ধা কেন দেখালি? এত বড়ো সাহস তোর? এত বড়ো কাপুরুষ তুই?” কথা থামিয়ে পরপর ঘুষি বসিয়ে দিলো 
এত তীব্র ভাবে যে ছিটকে নাক থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো হিমেলের। এবার রাগ চেপে বসল হিমেলের মাথাতেও। সেও বিপরীতে মেজবাহ্কে ধাক্কা দিলো। মুহূর্তেই বাড়িটাতে বেঁধে গেলো লঙ্কাকাণ্ড। 

 তাহমিনা বেগম নাটকীয় ভঙ্গিতে চিৎকার করে ওঠলেন। বাড়ির অন্যান্য পুরুষদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
 “আমার ছেলেটাকে তো মেরে ফেলবে ও! কেউ ধরেন ওকে! ধরেন।”

 রাহাত এবার এগিয়ে গেলো। হিমেলকে ধরলো সে। কবির শেখ ও রেণুকা বেগম ধরলেন নিজের ছেলেকে। কিন্তু মেজবাহ্’র সেই আগুন গরম রাগের সামনে উনারা কি পারেন? ও পারছে না ছুটে গিয়ে মেরেই ফেলতে। 
 কবির শেখ শান্ত বাচনভঙ্গির মানুষ। ছেলেকে টানতে টানতে বোঝাতে লাগলেন, “শান্ত হও, মেজবাহ্। এ কেমন হটকারিতা দেখাচ্ছো তুমি? সম্পর্কেরও একটা মূল্য আছে। ও তোমার ভাই!”

 “ভাই? সম্পর্ক? কীসের সম্পর্ক ওর সাথে আমার? ও একটা লম্পট। বউ পেটানো কাপুরুষ! তুমি ওর পক্ষ নিচ্ছো, আব্বু? ও কীভাবে এই অন্যায় করতে পারে? তোমরা শেল্টার দাও বলেই ওর এত বাড়। বড়ো চাচীতো ছেলেকে মাথায় তুলে রাখেন। আর উনার ছেলে সগর্বে বউয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস পায়। ও অন্যায় করা স্বত্তেও আমাকে শান্ত হতে বলছেন? হ্যাঁ?”

 “অন্যায়কে অন্যায় বোঝাতে গিয়ে তুমিও আরেকটি অন্যায় করে বসবে, তাই বলে? এ কেমন নীতি হলো তবে?”

 রিমঝিম এই ভাঙচুরের শব্দ পেতেই ছুটে এলো। হিমেলের নাক থেকে গলগল করে রক্ত পড়তে দেখে ওর যেন মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। শীগ্রই গিয়ে নিজের আঁচল দিয়ে চেপে ধরল হিমেলের রাগ। হিমেলও ফুঁসছে। রিমঝিমের হাত এক ঝটকায় ফেলে দিলো সে। 

 তা দেখে মেজবাহ্'র রাগ পাল্লা দিয়ে বাড়ল। তেড়ে যেতে চাইল পুনরায়,
 “আবার তুই উনার উপরই রাগ ঝাড়ছিস। আবার? বউ তোর রাগ ঝাড়ার বস্তু নয়। বার বার বলেছিলাম তোকে। এই বাড়িতে এসব চলবে না। তুই তারপরও এটা করলি।”

 “আমার বউ আমি কী করব, তা আমার ব্যাপার। বেশ করেছি, আরও করব। তুই কে বলার? তোর এত কীসের দরদ হ্যাঁ? কীসের?”

রিমঝিম ভয় পেয়ে গেলো। আরও একবার যে কেলেঙ্কারি ঘটতে চলেছে সেই আভাস পেতেই মূর্ছা গেলো সে। মেজবাহ্’র দিকে এগিয়ে ক্রন্দনরত স্বরে অনুরোধ করল, “শান্ত হোন, ভাইজান। শান্ত হোন।”

  মেয়েটার চোখের জল, আকুতি মেজবাহ্'র মাথার আগুন বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুণ। এই মেয়েটার জায়গায় অন্য কেউ হলে মেজবাহ্ নির্ঘাত খু ন করে ফেলত। যে মানুষের নিজের জন্য নিজের মায়া নেই সেই সমস্ত মানুষদের মেজবাহ্ ঘৃণা করে। এমনকি এই মেয়েটাকেও। 

 মেজবাহ্'র দাদা মনির শেখ এতক্ষণ সবকিছুই খেয়াল করছিলেন নীরবে। দুই নাতির মাঝে সাপেনেউলে সম্পর্কে সম্বন্ধে তিনি অবগত। তাই বলে হাতাহাতি অব্দি চলে যাবে! 
 পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল বিধায়ই তিনি পারিবারিক বিষয়ে নিজে যেচে মুখ খুললেন,
“হিমেল, ঠান্ডা হও তুমি। তোমার এই রাগ মানাচ্ছে না। যতই হোক তুমি অন্যায় করেছো এটাতো মিথ্যে নয়। আবার কোন সাহসে কথা বলছো, হ্যাঁ?”

 “শান্ত হবে? আব্বা, আপনার গুণধর নাতি আমার ছেলের গায়ে কোন সাহসে হাত তুলল? সে কি নিজের বুদ্ধি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে?” তাহমিনা বেগম শ্বশুরের কথায় প্রতিবাদ করে ওঠলেন। ছেলেকে জড়িয়ে রেখেছেন শক্ত হাতেই।

 “তোমার ছেলে যখন অন্যায় করছিলো তখন যদি থামাতে তাহলেতো এটা হতো না, বউমা। আমাদের বংশে একমাত্র হিমেল ব্যতীত কেউ নারীদের গায়ে হাত দেয়নি। মেজবাহ্'র রাগতো অস্বাভাবিক নয়। তোমার ছেলে কুলঙ্গারটাকে তো আরও ক'ঘা দেওয়া উচিত।”

 “আব্বা, আপনি কিন্তু আপনার ঐ নাতির টান টানছিন। কী গো, তুমি কিছু বলো!” তাহমিনা বেগম রাগে-দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে শেষের বাক্যটি বললেন। 
এতক্ষণের ঝামেলায় সবচেয়ে নির্দোষ, নিষ্ক্রিয় অবদান রেখেছেন দোলন শেখ। নিজের ছেলেকেও কিছু বলেননি এমনকি ভাতিজাকেও নয়। যেহেতু এবার স্ত্রী তার বক্তব্য চাচ্ছেই তাই না চেয়েও তার মন্তব্য করতে হবে। এবং তিনি নিরীহ মানুষটির মতোই বললেন,
“আব্বা ঠিকই বলছেন। অন্যায়কে অন্যায়ই বলতে হয়। সে মেজবাহ্ করুক কিংবা আমার ছেলে। আমার এখানে কিছু বলার নেই।”
 স্বামীর এমন নির্ভীক মনোভাবে তাহমিনা বেগম ফুঁসে ওঠলেন। রাগে পারছেন না গিলে খেতে। 

 রিমঝিম ততক্ষণে ছুটে গিয়েছে রান্নাঘরে। রেফ্রিজারেটর থেকে নিয়ে এসেছে বরফের খণ্ড। যত্ন করে লাগিয়ে দিলো স্বামীর নাকে। তাহমিনা বেগম আলগোছেই পুত্রবধূর থেকে বরফখণ্ডটি টেনে নিয়ে নিলেন। রিমঝিম অপ্রস্তুত হলেও বলল না কিচ্ছুটি। এমনিতেই তার জন্য আজ আবারও চারবছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে গিয়েছে। এত লজ্জা নিয়ে সে থাকবে কী করে?

 রিমঝিম নিজের হাতের অবশিষ্ট বরফগুলো বাটিতে করে মেজবাহ্'র দিকে এগিয়ে দিলো। মেজবাহ্ মুখটি তখন রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। চোখগুলো মনে হচ্ছে জ্বলজ্বল করছে। চোখের কোণাটাও কেমন অস্বাভাবিক লাল! যে-কেউ দেখল ভয় পাবে। 

 রিমঝিমের বাড়িয়ে দেওয়া বরফের বাটির দিকে এক পলক তাকিয়ে সেই বরফসহ বাটিটাও সে ছুঁড়ে মারল। আবারও ঝনঝনিয়ে ভেঙে গেলো এই কাঁচের বাটিটাও। 
 মেজবাহ্ নিজের হাত ঝারতে ঝারতে জায়গাটা ছাড়ার সময় দাঁত কিড়মিড় করল, “যেদিন নিজেকে নিজে সাহায্য করবেন সেদিন অন্যকে সাহায্য করার কথা ভাববেন এর আগে না। অন্তত আমার সামনেতো না-ই।”

সেই তেজ নিয়েই বেরিয়ে গেলো সে। রাহাত রিমঝিমের দিকে তাকালো। কোনো ভাইয়ের পক্ষ না নিয়ে কেবল রিমঝিমকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ভাবি, আপনি ঘরে যান। আর কখনো হিমেল ভাইয়ের মার খাবেন না ভুলেও। আপনার একটা মার হিমেল ভাইয়ের দিকে দশগুণ হয়ে ফিরবে।”

 “রাহাত! তুমিও ওর পক্ষ নিচ্ছ?”

“মাফ করো, আম্মা। তুমি বড়ো ভাইকে বেশি আশকারা দিয়ে ফেলেছো। নয়ত এত কুলাঙ্গার হতো না।” 

 শেখ বাড়ির জায়গা খালি হলো ধীরে ধীরে। ডাইনিং রুমে থেকে গেলো কেবল রিমঝিম। এই সর্বশান্ত হয়ে থেকে যাওয়টাই তো কেবল তার ভাগ্য। কী আর করতে পারে সে?

  রূপসা বেগমের স্বামী অর্থাৎ মেজবাহ্’র ছোটো চাচা থাকেন লন্ডনে। ছোটোবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি একটা অনীহা ছিলো তার। পছন্দ করতেন না এসব ক্ষমতার যু দ্ধ। তাই তরুণ হতেই পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমিয়ে ছিলেন দেশের বাহিরে। এখন লন্ডনেই বেশ নামকরা একটি হসপিটালে ডাক্তারি পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। 
 শেখ বাড়ির ছোটো থেকে ছোটো ঘটনা রূপসা তার স্বামীর কানে তুলে দেন। তাদের সুখের সংসার। ঘাটতি বলতে কেবল একটি সন্তানের হাহাকার ছাড়া কিছু নেই। বিবাহের বারো বছরেও কোনো সন্তান নেই তাদের। চেষ্টা কম করেননি উনারা। কিন্তু উপরওয়ালা যদি না দেন করবেনই-বা কী?

 আজও যথারীতি রূপসা বেগম স্বামীকে ফোন লাগালেন। তাদের ল্যান্ডফোনটা তো টিঅ্যান্ডটি ল্যান্ডফোন। তাই সেখানের কোড লাগিয়ে সরাসরিই কল দেওয়া যায়। যদিও একটু খরচ বেশি কিন্তু এই সামান্য খরচ শেখ বাড়ির বউয়ের কাছে আহামরি নয়। 

  ফোনের ওপাশে ব্যস্ত তপু শেখ ফোন ধরতেই রূপসা বেগম কিছুক্ষণ আগের ঘটনা হড়বড়িয়ে বললেন। পেটে যেন এতক্ষণ কথা জমে পাহাড় হয়ে ছিলো। এখন বলতে পেরে হালকা লাগছে নিজেকে।  
 শেষ পর্যায়ে বললেন, “জানো, এই মেয়েটার জন্য কোথাও যেন বাড়ির শান্তিটাই হারিয়ে গিয়েছে। মেজবাহ্টা ঘরের ছেলে হয়েও বাড়ির ভেতরে থাকে না। ভাইয়ে ভাইয়ে হাতাহাতি হয়ে গেলো এ নিয়ে দু'বার। ঐ এক মেয়ের জন্য এ অবস্থা হলো।”

 তপু শেখ বুদ্ধিমান লোক। স্ত্রী'র কথায় হাসলেন তিনি।
 “মেয়েটার কী দোষ এতে, রূপা? ও নিজেও তো এসেছিলো স্বামীকে বিশ্বাস করে। অথচ স্বামীই ওর আপন হলো না। তোমার তো ওর জন্য করুণা হওয়া উচিত অথচ তুমি রাগ হচ্ছো!”

  “রাগ হতে চাই না কিন্তু এসে পড়ে। ও না এলেতো এমন হতো না।”

“এতিম একটা মেয়ে। ওর প্রতি কেন রাগ বলোতো? সে পরিবার পায়নি, তোমাদের পরিবার ভেবে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে। মেজবাহ্'র মতো তোমরাও ওর সাথে দাঁড়াবে তা-না, তোমরা ওর উপর রাগ করো? এই সমস্ত ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যদি কেউ ভুক্তভোগী হয়ে থাকে তাহলে সেটা ও। ওর প্রতি নরম থেকো, রূপা।”

  “তুমি রিমঝিমের প্রতি নরম থাকতে বলো অপরদিকে টুপু মেয়েটাকে আবার ঠিক সহ্য করতে পারো না। তোমায় বুঝি না বাপু। দু'জনেই তো অসহায়। একজনের প্রতি মায়া আরেকজনের প্রতি রাগ কীসের?” রূপার সহজ-সরল প্রশ্নের পরিবর্তে জবাব এলো ধীরে, “তুমি বুঝবে না, রূপা। কিছু জিনিস বোঝানো যায় না। যাচ্ছি, আমার কাজ বাকি।”

—————

  মেজবাহ্'র রাগ ঠান্ডা হয়নি এখনো। বাহিরে বইছে ঝড়ো হাওয়া। বৈশাখে মাঝে মাঝে এত ঝড়ো হাওয়া হয়! সিলেটের দিকটায় যেন আজকাল একটু বেশিই ঝড়ো হাওয়া বইছে! 
মেজবাহ্ তার চেয়ারে বসে আছে। মাথাটা বড্ড ভার। এই মাথাটা ঠান্ডা হবে একটি মাত্র কণ্ঠে। যে কণ্ঠটিই আজকাল তার রাগ নামাতে পারে। কিন্তু তা শুনবার উপায় কি? শুক্রবার ব্যতীত কি আর মেয়েটা তার খোঁজ নেয়? এ-ও যেন তাকে নিয়ে খেলছে। সপ্তাহের ছয়টি দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখে। কেন? মেজবাহ্ শেখের কি মূল্য নেই? তার জন্য কি কেবল একটি দিনই মায়া করা যায়? বাকি দিনগুলোতে কী করে সে? হ্যাঁ? কী এমন রাজকার্য চালায়? মেজবাহ্ গোটা একটি জেলা চালিয়েও তার জন্য ভাবতে পারে অথচ অতটুকু একটা মেয়ে তাকে নিয়ে ভাবতে পারে না? সব ওর মর্জিতেই হবে? একদম না। সে এখুনি কল দিবে। হোক আজ বুধবার, মেজবাহ্'র বহু আকাঙ্ক্ষার শুক্রবার না হোক। তবুও সে মেয়েটার কথা শুনতে চায়। মেয়েটা ফিসফিসিয়ে না-হয় দু'টো কথাই বলুক তবুও তো শান্ত হবে মনটা! না-হয় সে রাগে যা খুশি করে ফেলতে পারে। এই রাগের প্রতি তার নিজেরও সংযম নেই।

  ঢাকাতেও আজ ঝড়ো হাওয়া বইছে। বিকেলেতো এক দফা বৃষ্টিও হয়েছিলো। রাস্তাঘাট ভেজা। মাটির ভেজা ঘ্রাণ এখনো ভাসছে চারপাশে।
প্রেমা বসে আছে বসার ঘরে। ঘুম আসছে না তার ঠিক। বিরস চোখে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। 

 তন্মধ্যেই বেজে উঠল বাড়ির টেলিফোনটা। সারাদিনে ভাইয়ের খবর পায়নি বলে আকুল প্রেমা বাবার নিষেধাজ্ঞার কথা বেমালুম ভুলে বসে। দ্রুত ছুটে যায় টেলিফোনের কাছে। রিসিভারটা ওঠাতেই একটি খসখসে ভারি স্বর এসে বাঁধল প্রেমার মস্তিষ্কে,
 “সুচরিতা, বুকের ভেতর তাণ্ডব বইছে। শান্ত করুন, শান্তু করুন দয়া করে…”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp