সন্ধ্যে নিভে যাবে যাবে ভাব। বাড়ির বাহিরে জ্বালানো বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় সিকান্দারের শ্যামলাটে মুখটি দেখা যাচ্ছে। পুষ্ট দেহে নীল রঙের শার্টটি বেশ মানায়। হাতের পেশির সঙ্গে এমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে শার্টটি যে তার শরীরের শক্ত পেশিগুলো অব্দি স্পষ্ট।
শুক্লা সিকান্দারের উপকারে অতি কৃতজ্ঞ হলে। আন্তরিক ভঙ্গিমায় বলল, “চলুন না, বাড়ির ভেতরে চলুন। আপনই এই সময়ে আমার অনেক বড়ো উপকার করলেন। মাইক্রোবাস না পেলে একটা মুসিবতেই পড়তাম।”
“আরে না না, এভাবে বলবেন না। শেখ বাড়িরই কিছু মাইক্রোবাস আছে ভাড়া দিয়ে রাখে। সেখানের একজনকেই পেয়ে গেলাম নিয়ে চলে এলাম। তা এতো সন্ধ্যায় মাইক্রোবাস হুট করে দরকার হলো? কোনো বিপদ হলো কি?”
সিকান্দার একটু লাজুক ধরনের ছেলে। পুরোটা সময় সে কথা বলল অন্য দিকে তাকিয়ে। শুক্লা যে তার সামনে দাঁড়ানো সেদিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন অব্দি বোধ করল না।
সিকান্দারের এই হাবভাব সম্পর্কে অবগত শুক্লা। ছেলেটার এত লজ্জা সে উপভোগই করি। মিটমিট করে হাসেও। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। হাস্যরত স্বরে বলল, “কী ব্যাপার, আপনি অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছেন কেন? আমি তো এই দিকে!”
সিকান্দারের মতো পুরু শরীরের পুরুষ শুক্লার এই লজ্জা দেওয়ার অভিযান সফল করে সত্যি সত্যি লজ্জা পেলে। মাথাটা ঘোরালোতো না-ই, বরং চট করে নামিয়ে ফেলল।
“সমস্যা নেই। আর কিছু লাগলে জানাতে বলেছেন ভাই।”
“আর কিছু লাগবে না। আপনি আপনার ভাইকে গিয়ে বলবেন আমি তার কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। এই অসময়ে মাইক্রোবাসটা পাঠানোর জন্য।”
“কিন্তু এই সময় মাইক্রোবাস কেন প্রয়োজন বললেন না তো?” সিকান্দারের প্রশ্নে চট করে কিছুক্ষণ আগের ঘটে যাওয়া সমস্ত কিছু আয়নার মতো ভাসমান হলো শুক্লার চোখে। লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়। বাড়ি বয়ে আসা অতিথিদের তার আব্বু এতকিছু কীভাবে বলল সে ভেবেই পায় না। কেবল আব্বুর মুখের উপর কথা বলে না বিধায় সে এটা নিয়ে কিছু বলেনি। তবে বলবে, পরে। আম্মুকে প্রতিনিয়ত বোনের ছেলেমেয়েদের জন্য কষ্ট পেতে দেখে সে। তবুও আব্বুটা যে কেন বোঝে না!
মাথা ভর্তি ভাবনা ঝেরে ফেলল। পারিবারিক বিষয়তো আর বাহিরে বলা যায় না তাই ছোটো কণ্ঠে গা বাঁচানোর ভঙ্গিতে বলল, “আমার খালুরা এসেছিলেন ঢাকা থেকে। বাড়ি ফিরে যাবেন। কাল সকালেই যেতেন। কিন্তু ঢাকা থেকে ইমার্জেন্সি ফোন এলো তাই এখনই যেতে হবে।”
ঢাকার কথা শুনতেই চট করে সিকান্দারের মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠল। ঢাকা? সেদিনের ঐ ছেলেটাও তো ঢাকারই ছিলো। সিকান্দারের আগ্রহ বাড়ল কিছুটা। আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করাটা বেমানান হবে জেনেও সে প্রশ্ন করল,
“ওহ্ এত রাতেই চলে যাবেন? খালুদের পরিবারে কে কে আছে? মানে এত রাত করে যাবেতো, ডা কা তির আজকাল উপদ্রব বেড়েছে কি-না! তাহলে আমি ড্রাইভারকে সতর্ক করে দিয়ে যেতাম আরকি।”
ছেলেটার অন্তরিকতায় মুগ্ধ হলো শুক্লা। গত বছর একটা সাক্ষাৎকারে মেজবাহ্'র এই সেক্রেটারি ছেলেটার সাথে বেশ কথাটথা হয় শুক্লার। এরপর থেকে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময় করে তারা। কিছুক্ষণ আগে যখন মাইক্রোবাসের খোঁজে সব জায়গায় ফোন করছিলো তখন তার মনে পড়ল মেজবাহ্ শেখের নাম্বারটির কথা। প্রায় আড়াই বছর আগে নাম্বারটি জোগাড় করেছিলো। হয়ত ছয়মাসে একবার কোনো অজুহাতে কল করার অনুমতি পায় সে। আজ এই অত্যন্ত প্রয়োজনের দিন তার মেজবাহ্ শেখের কথাই মনে পড়েছিলো। টেলিফোন করতেই ফোন তুলেছিলো সে। অসুবিধার কথা শুনতেই সিকান্দারকে পাঠিয়ে দিয়েছে। কত দারুণ মানুষ সে! তারতো এতটা করার প্রয়োজন ছিলো না শুক্লার জন্য। শুক্লা সাধারণ একজনই ধরা যায়! অথচ সে তবুওতো করল!
শুক্লার মনটা ভালো লাগায় ভরে উঠল। উৎফুল্লতা ছড়িয়ে গেলো তার কণ্ঠনালি অব্দি, “খালু, খালুর বোন, বোন জামাই, মেয়ে..”
কথা শেষ করতে পারল না শুক্লা। তার তাকেই শাহানা বেগম ডাকলেন বাড়ির ভেতর থেকে।
সিকান্দারেরও হাতে সময় নেই। ভাইকে রেখে সে আলাদা কোথাও এত সময় ব্যয় করে না। তাই বাকি সদস্যদের কথা না শুনেই সে বিদায় জানালো। বিদায় জানিয়ে ড্রাইভারকে বেশ বুঝিয়ে শুনিয়ে বেরিয়ে গেলো।
শুক্লাদের বাড়ির ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়েছে সকলে। ইমনের অসুস্থ শরীর বেশ দুর্বল। কিন্তু খালুর কথা তার কান অব্দি পৌঁছানোর পরেই একটা চাপা রাগ ভেতরে ঢুকেছে দানবের মতো। এই লোকের বাড়িতে সে একটা রাতও আর কাটাতে পারবে না। এই অসুস্থ শরীর নিয়েই তৈরি হয়েছে। সকলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
শুক্লা এলো। যাবের শিকদারের থমথমে মুখটির দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল, “খালু, রাতটা থেকে গেলেই হতো! টুইটুবানি, জোহরা মেয়ে মানুষ। তার উপর ইমন ভাই এতটা অসুস্থ।”
যাবের শিকদারের ভেতরে যা-ই চলুক সেটার প্রভাব কখনোই কারো উপর পড়ে না। তাই শুক্লার আব্বার কথার রাগও শুক্লার উপর পড়ল না। বরং তিনি বেশ নম্র স্বরে জানালেন,
“না মাগো, ফিরে যাই। বাড়ি ছেড়ে কোথাও মনও টেকে না।” বেশ কায়দা করেই আগের প্রসঙ্গ পুরোপুরি মুছে ফেললেন যাবের শিকদার। চাইলেই তিনি কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটি তুলতে পারতেন কিন্তু তুললেন না। এমন করে তা অগোচরে নিয়ে গেলেন যেন এমন কিছু ঘটেইনি।
কথায় ফোঁড়ন কাটলে জোহরার ফুপি ঝুমা বেগম, “কীভাবে থাকবো? তোমার আব্বার যেই কথার শ্রী! এসব সহ্য করে থাকা যায়?”
শুক্লা অপরাধীর মতো নিচু স্বরে ক্ষমা চাইল, “আন্টি, আব্বুতো আসলে আমাদের ভীষণ স্নেহ করেন তাই আরকি।”
“তো? আমরাও তো কিছু কম হারাইনি। কথা উঠলে অনেক কিছুই উঠানো যায়। আমার ভাবির মতো মানুষটা…”
ঝুমা বেগম কথা সমাপ্ত করতে পারলেন না। তার আগেই যাবের শিকদারের সুক্ষ্ম স্বরের নিষেধাজ্ঞা ভেসে এলো,
“ঝুমা, থাম। কোথায়, কতটুকু বলতে হয় তা না তুই জানিস আর না তোর স্বামী।”
রহমান খান অন্যান্য সময় হলে নিশ্চয় ঝাঁঝালো গলায় প্রতিবাদ করতেন কিন্তু এবার করলেন না মোটেও। কারণ তার একটা কথার সুতো ধরেই তর্কাতর্কি তুঙ্গে উঠেছিলো। এখন কথা বলা মানেই বিপদ।
“আমি ওভাবে বুঝাতে চাইনি, ভাইজান।”
“কোনো ভাবেই তোর বোঝাতে হবে না, ঝুমা। আমার কাছে জোহরাও যা, শুক্লাও তা। দু'জনই আমার সন্তান। ওদের সামনে এসব রেষারেষি সম্পর্কের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। ওরা সাংসারিক হওয়ার পর তো আর তখন বোনে বোনে, ভাইয়ে বোনে যোগাযোগই রাখবে না। আমরা অবিভাবক হয়ে এসব শিক্ষা দিতে পারি না।”
যাবের শিকদারের কথা খুবই ঠান্ডা। তবে একেকটা কথা এত বুদ্ধিদীপ্ত ও জ্ঞানী যে শুক্লার ভীষণ ভালো লাগল। ওর খালুকে বরাবরই ভালো লাগতো। এত দারুণ করে কথা বলেন খালু! হয়ত উকিল বলেই উনার আলাদাই বাচনভঙ্গি। কথা বললে সকলের শুনতেই ইচ্ছে করবে। এত যৌক্তিক!
শিকদার পরিবার বিদায় নিলো। একটাবারও সেই বিদায়ে উপস্থিত হননি ইকবাল হোসেন। থাকতেও বলেননি। নিজের ঘরে গিয়ে যে বসেছেন আর বেরই হননি!
মাইক্রোবাসটি পথের ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যেতে নিলেই ফুঁপিয়ে উঠলেন শাহানা। আঁচলে মুখ চেপে নিলেন তৎক্ষণাৎ। শুক্লা নিজের মায়ের দিকে তাকালো। তার করার কিছু নেই। কেবল মায়ের জন্য মায়া করা ছাড়া। এ জীবনে কিছু ভুল কখনো কখনো কিছু মানুষকে সারাজীবনের মতো নত করে ফেলে। যেমন নত করেছে খালুকে। নয়ত খালুর মতো মানুষ কখনো তার বাবার এতগুলো কথা মাথা পেতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারতেন না।
—————
বাহিরের কোনো কোলাহল ছুঁতে পারে না শেখ বাড়ির ভিটেকে। এত রাজকীয় প্রাচুর্যতায় মোড়ানো বাড়িটা যেন মনে হয় ব্যস্ত পৃথিবীটার থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে সেই বাড়ি। কিন্তু বাড়িটির ভেতরেই সম্পর্কের রয়েছে ছন্দপতন। পাশাপাশি থেকেও যেন কেউ কারো পাশেই নেই।
আজ খাবার টেবিলে অনুপস্থিত ছিলো মেজবাহ্। ঝামেলার পর যে আর উপস্থিত হতো না সে তা সকলেই অবগত ছিলো। তবুও খারাপতো লাগেই। বাড়ির একটা ছেলে এইসব ঝামেলার জন্য বাড়িতে অব্দি থাকে না। তা-ও রাতে যা একটু খেতে বসত একসাথে, সেটিও ছেড়ে দিয়েছে বোধহয়। রেণুকা বেগম তাই আজ খাবার টেবিলে টু শব্দও করেননি। যতবার হিমেলের বউকে দেখলেন ততবারই উনার মেজাজ উগ্র হয়েছিলো। কিন্তু তা-ও টু শব্দ করেননি। পাছে ছেলের কানে এসব কথা গেলে মায়ের মুখ দেখাও বন্ধ করে দিবে ছেলেটি।
খাবার টেবিল পরিষ্কার করছে রিমঝিম। সকলে খেয়েদেয়ে চলে গিয়েছে যার যার ঘরে। রয়ে গিয়েছে কেবল সে, টুপু আর রূপসা। রূপসার আজ খেতে বসতে দেরি হয়ে গিয়েছে বলেই সে খাচ্ছে এখনও।
টুপু ডাল বসিয়েছে চুলোয়। গরম করে রেখে দেবে রেফ্রিজারেটরে। যদিও শেখ বাড়ির কেউই আর বাসি ডালটুকু ছুঁয়েও দেখবেন না তবুও সে রেখে দিলো। খাবার অপচয় সে পছন্দ করে না। এই খাবারের জন্যই তো শেখ বাড়ির ভিটে কামড়ে পড়ে আছে। তাই সে জানে এই ভাতের মর্ম কতটুকু।
রূপসা খাবার খেতে খেতে রিমঝিমের দিকে একবার হালকা ভাবে তাকালেন। তার স্বামীর কথাটি কানে বাজছে এখনও। লোকটা একদমই পছন্দ করেন না বাড়ির বউদের অবহেলা। তাই বার বার রূপসাকে বলে দিবেন রিমঝিমের যত্ন নিতে। কিন্তু রূপসা সেসব পারে না। সারাজীবন ধনীর ঘরের দুলালি হয়ে থেকেছে। কারো সাথে যেচে কথা বলেননি। তিনি কীভাবে নিজ থেকে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলবেন?
অজুহাত পেয়েও গেলেন। তার গ্লাসটি খালি। পানির মগটা কিছুটা দূরেই। রূপসা বেগম মিছিমিছি খাবারের প্রতি মনোযোগ রেখে বউকে ডাকলেন,
“রিমঝিম, মগটা দাও তো। পানি খাবো।”
রিমঝিম ন্যাকড়া দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করছিলো। ছোটো চাচীর ডাকে থেমে গেলো তার হাত। চট করে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ছোটো চাচীর দিকে। মানুষটাতো তাকে কখনোই তেমন ডাকে না। তাই অবাকই হলো। দ্রুত ন্যাকড়াটা ফেলে ব্যতিব্যস্ত স্বরে জবাব দিলো,
“দিচ্ছি চাচীম্মা। হাতটা ধুয়ে আসি।”
রূপসার ধুয়ে আসার অনুমতি দিতে হলো না। তার আগেই রিমঝিম ছুটে গেলো হাত ধুতে। ধুয়ে এসে পানির মগ থেকে পানি ঢেলে দিলো কাঁচের গ্লাসটায়। রূপসা বেগম দেখল কেবল রিমঝিমের এই তড়িঘড়ি। মেয়েটাকে যেন সে কত রাজকার্য দিয়ে দিয়েছে এমন মনযোগ দিয়ে করছে কাজ!
রূপসা হাসলো। তার স্বামী এতদূর থেকেও এই রিমঝিমকে ঢের বোঝে। বোঝে না কেবল সে।
“আস্তে ধীরে করো। তোমার শরীরতো অসুস্থ ছিলো। ভালো হয়েছে?”
রিমঝিম ঘোমটা টানল মাথার। ঘাড় কাঁত করে জানাল ঠিক হয়েছে। রূপসা বেগম কথা আগানোর কিছুই পেলো না আর। একই বাড়িতে থাকে ওরা অথচ কখনো মেয়েটার কিছুই জানা হয়নি তার। তাই ভাবলো প্রশ্ন করবে কিছু ব্যক্তিগত। সেই ভাবনা অনুযায়ীই ধীর স্বরে বলল,
“রিমঝিম, তুমিতো পড়াশোনা করেছো তাই না?”
“জি।”
“কতটুকু?”
“স্নাতক তৃতীয় বর্ষ।”
“ইশ, আরেকটা বর্ষ থেকে পরীক্ষা দিলে না কেন!”
“ঐ যে, উনি যে চান না।”
“তুমি দেখেশুনে ওকেই পেলে? ও কত রগচটা জানতে না?”
রিমঝিম মাথা নাড়াল। অর্থাৎ সে জানতো না।
রুপসা বেগম হতাশ শ্বাস ফেলল, “এ বাড়ির বেশিরভাগ ছেলেরাই বউপ্রেমী। ও কার মতো হলো!”
টুপু রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে সবে। সব ছেলেদের বউপ্রেমী কথাটা শুনতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। উদাস নয়নে তাকালেন রূপসার দিকে। মনে প্রশ্ন জাগল বড়ো। সত্যি সত্যি কি সবাই বউ প্রেমী? তাহলে একজন বছরের পর বছর যাবত বিদেশ কেন রয়েছে?
—————
রাত তিনটে। প্রেমা দাঁড়িয়ে আছে তাদের রান্নাঘরের পাশে থাকা ছোটো বারান্দায়। ঘুম আসছে না কিছুতেই। মনটা উচাটন বড়ো। যেদিন বাবারা গেলেন সেদিনই যা একটু খোঁজ পেয়েছিলো ইমন ভাইয়ের। এরপর যে কী খবর তার!
“এ্যই প্রেমা, ঘুমাসনি?” আচমকা পুরুষালি কণ্ঠে চমকে যায় প্রেমা। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের বারান্দায় তাকালো। এই বারান্দাটা থেকে পাশের বারান্দাটা একদম গা ঘেঁষা। সে তাকাতেই খেয়াল করল সেই বারান্দাটিতে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছেলে। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল তার। সিগারেট ফুঁকছে সে। সেই সিগারেটের হালকা লালাভ আলোটা দেখা যাচ্ছে অন্ধকারেও।
প্রেমা বুকে থুতু দিলো। নোমান ভাইটা কি ভূত না-কি? হুটহাট এভাবে চমকে দেওয়ার মানে কী?
ওপাশের বারান্দা থেকে নোমান নামের ছেলেটা বোধহয় প্রেমার এই ভড়কে যাওয়া ঠিক খেয়াল করল। খেয়াল করেই রাক্ষুসি হাসিতে ফেঁটে পড়ল,
“কিরে প্রেমা! তুই এত ভীতু? আমার কণ্ঠ শুনেও ভয় পাস?”
প্রেমার রাগ হলো। নোমান ভাইটার এসব চালচলন তার পছন্দ নয়। নেহাৎ বয়সে বড়ো বলে সে ভদ্রতা বজায় রাখে সবসময়। আজও তা-ই রাখল। রাগ গিলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“ভয় পাবো না? কত রাত হয়েছে সেই খেয়াল আছে তোমার?”
“কত রাত হয়েছে?”
“তিনটে, সাড়ে তিনটে হবে।”
“তাহলে তুই ঘুমুচ্ছিস না কেন?”
“ঘুম আসছিলো না।”
“কেন? কারো কথা ভাবছিস না-কি?” কৌতূহলী শোনালো নোমানের কণ্ঠটা। এখনও অভিজ্ঞদের মতো ফুঁকছে সিগারেট।
প্রেমা সিগারেট সহ্য করতে পারে না, সহ্য করতে পারে না নোমান ভাইয়ের এমন কথার ধাঁতও। কিন্তু তবুও সহ্য করে নিতে হলো। মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ভাইয়ার কী অবস্থা তা-ই ভাবছিলাম।”
“আরে ইমন শালার কৈ মাছের জান। মরবে না ও।”
প্রেমা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। কোনো ছেলে নিজের মামাতো ভাইকে এমন করে শালা ডাকে? কেবল সমবয়সী আর বন্ধু বলেই শালা ডাকা উচিত?
একদমই পছন্দ হলো না প্রেমার এই কথার ধরণটি। ক্ষুব্ধ হলো সে,
“এসব কী ভাষা ভাইয়া?”
“ভালোবাসা মানে ভালোওও ভাআআষাআআ এসব।” কথাটি ছোটো শিশুদের মতো টেনে টেনে বলল নোমান।
“তাই বলে শালা বলবে?”
“বললে সমস্যা কী? শালা হতে পারে না? ধর ও আমার শালা হলো আর তুই হলি… “
নোমান কথা শেষ করার আগেই পথের ধারটা আলোকিত হয়ে উঠল। বারান্দা গলিয়ে সেই আলো এসে পড়ল নোমান ও প্রেমার মুখে। প্রেমার শ্যামলাটে মুখটির কপালের ভাঁজগুলো বোঝা গেলো এতক্ষণে।
সর্বপ্রথম প্রেমার নজর হলো তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো গাড়িটির দিকে। প্রেমা আগ্রহ নিয়ে তাকাতেই দেখল এই মাঝরাতে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে পুতুল ধরণের একটি মেয়ে।
আরেকটু খেয়াল করতেই বুঝল পুতুলটি তার মেঝো আপা। প্রেমা ভূতগ্রস্তের মতো চমকে উচ্চারণ করল,
“মেঝো আপা!”
এরপরই শব্দ হলো তার ছুটে যাওয়ার। দরজাও খুলল। অন্ধকার বাড়িটায় সেই শব্দ শোনা গেলো স্পষ্ট।
নোমান তাকিয়ে রইল পথে দাঁড়ানো সেই পুতুলগুলোর দিকে। আনমনেই…
·
·
·
চলবে……………………………………………………