আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৬১ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          মাহাদী ঘরে ঢুকতেই দেখল, পুরো ঘরটা একেবারে পরিপাটি ও সুসজ্জিত। সবকিছুই যেন নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় নিখুঁতভাবে সাজানো, অথচ বিছানাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা।আয়াত কোথায় গেল—এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই হঠাৎ তার চোখ গিয়ে আটকাল বারান্দার খোলা দরজার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে ঝলসে উঠল বিদ্যুতের তীব্র আলো। সেই আলোয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের শাড়িটা এক ঝলকে ঝিকমিক করে উঠল।

আয়াত আকাশের দিকে মুখ তুলে, চোখ দুটো বন্ধ করে, দু'হাত দু'দিকে প্রসারিত করে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবিরাম বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে আলতোভাবে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার মুখ, কপাল আর চুল। ঠান্ডা পানির সেই স্নিগ্ধ পরশে যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে সে।ঢাকায় আসার পর এই প্রথম এমনভাবে বৃষ্টিকে উপভোগ করছে আয়াত। শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা—সবকিছু ভুলে এই বৃষ্টির শীতল স্পর্শটুকু যেন প্রাণভরে অনুভব করছে।

মাহাদী কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ডাক দিল—

— এই মেয়ে! ভিতরে আয়।

আয়াত স্পষ্টই শুনল। কিন্তু শুনেও কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। বরং আগের মতোই চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

মাহাদীর কপালে বিরক্তির ভাঁজ আরও গভীর হলো।
মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল—

“কী এক ঘাড়ত্যাড়া মেয়ের পাল্লায় পড়েছি!”

শেষ পর্যন্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে নিজেই এগিয়ে গেল মাহাদী। বারান্দায় গিয়ে আয়াতের হাত ধরে টান দিতেই—

ধাম করে মাহাদীর বুকের ওপর আছড়ে পড়ল আয়াত!

ক্ষণকাল এভাবেই কেটে যেতেই।হঠাৎই আকাশ কাঁপিয়ে প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো। আচমকা সেই বিকট শব্দে চমকে উঠে আয়াত মাহাদীকে দু'হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ভয়ে তার চোখ দুটো আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে গেল।মাহাদীও কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। এখনও আয়াতকে সরিয়ে দেয়নি সে। অদ্ভুতভাবে, মেয়েটার এভাবে আঁকড়ে ধরাটা কেন যেন তার একটুও খারাপ লাগল না।
বরং অজান্তেই বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা অনুভূতি উঁকি দিল।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিল মাহাদী।
না..! সে তো আয়াতকে ভালোবাসে না।
আর ছয় মাস পরই তো এই সম্পর্কের ইতি টেনে দেবে সে।এই ভাবনাটা মনে আসতেই মাহাদী নিজেকে শক্ত করল। তারপর আয়াতকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিরক্তির সহিত বলল—

— এই মেয়ে! কিছু হলেই আমার ওপর ঢলে পড়িস কেন?

আয়াত একটুও বিচলিত না হয়ে ভীষণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—

— তো কার ওপর পড়ব?

মাহাদী ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল—

— আমি ছাড়া যার ইচ্ছা, তার ওপর।

আয়াত সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নেড়ে বলল—

— আচ্ছা, তাই করব।

মাহাদী থমকে গেল।

— কী?

আয়াতের ঠোঁটের কোণে মুচকি হেসে বলল—

— হ্যাঁ। আপনিই তো বললেন।ছয় মাস পর যখন আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন, তখন তো আর আপনার ওপর পড়ার সুযোগ থাকবে না। তাই এই ছয় মাস শুতে,বসতে, খেতে, শুধু আপনার ওপরেই পড়ব।

মাহাদীর মুখের বিরক্তিটা এবার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

— এমন নির্লজ্জামি করলে তোর মার্ক কেটে দেব।

আয়াত চোখ বড় বড় করে তাকাল।

মাহাদী গম্ভীর মুখে বলল—

— ভুলে যাস না, এখন আমি তোর টিচার।

আয়াত ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল—

— মার্ক কেটে ফেললে ফেলবেন। তাতে আপনার মান-সম্মান যাবে, আমার তো নয়! সবাই বলবে প্রফেসরের বউ হয়ে ফেইল করেছে , হু।
আজকে পুরো ভার্সিটি জেনে গেছে। কালকে গিয়ে কী করবেন, মাই জান?

কথাটা বলেই মাহাদীর কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে খিলখিল করে হেসে ভেতরে চলে গেল আয়াত।মাহাদী কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বিরক্তির সঙ্গে মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল পোশাক বদলাতে।

এদিকে আয়াতও নিজের ভেজা শাড়িটা বদলাতে নিল।শাড়িটা খুলে ব্লাউজের পেছনের হুকগুলো খুলতে গিয়েই বিপাকে পড়ল সে। একবার চেষ্টা করল—হলো না। আবার চেষ্টা করল—তবুও নয়। বারবার আঙুলের ডগা দিয়ে হুকটা ধরার চেষ্টা করেও কিছুতেই ঠিকমতো খুলতে পারছে না।

— উফফ! এটাও এখন খুলছে না!

একটা হুক কোনোভাবে খুললেও পরেরটায় গিয়ে আবার আটকে গেল। বিরক্তিতে আয়াতের কপালে ভাঁজ পড়ল।

ঠিক তখনই—

হুট করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মাহাদী।

আয়াত চমকে এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল।

আর মাহাদী যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।চোখের সামনে শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোট পরা আয়াতকে দেখেই মাহাদীর চোখ যেন বিস্ময়ে কপাল ছাড়িয়ে উঠল।এক নিমেষের জন্য তার মাথাটাই যেন শূন্য হয়ে গেল।

পরক্ষণেই—

— আআআআআ!

বিকট চিৎকার করে উঠল মাহাদী।

মাহাদীর এমন আকস্মিক চিৎকারে আয়াতও ভীষণভাবে চমকে গেল। কী হয়েছে বুঝতে না পেরে নিজের দিকে তাকাতেই পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করল সে।তড়িঘড়ি চারপাশে চোখ বুলিয়ে শরীর ঢাকার মতো কিছু খুঁজতে লাগল। কিন্তু তার আগেই মাহাদী বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

মাহাদীর বুকের ভেতর তখনও ধকধক করছে।
এটা কী দেখলাম আমি! ও গড! এই মেয়েটার কি বিন্দুমাত্র লজ্জা-শরম বলে কিছু নেই?
অস্বস্তিতে মাহাদী চোখ শক্ত করে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

এদিকে আয়াত দ্রুত একটা ওড়না তুলে নিজের শরীরটা ভালোভাবে আড়াল করে নিল। তারপর খানিকটা ইতস্তত করে বলল—

— এদিকে ঘুরুন।

মাহাদী ভ্রু কুঁচকে, এখনও পেছন ফিরে থেকেই বলল—

— কেন?

আয়াত নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিল—

— হেল্প লাগবে।

মাহাদী যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
এই মেয়েটা আমাকে দিয়ে এখন কী করাতে চায়!

মাহাদী বিরক্তিতে দাঁত চেপে বলল,

— আমি কোনো হেল্প করতে পারব না। যাদের লাজ-লজ্জার বালাই নেই, তাদের জন্য আমি এক আঙুলও নাড়াই না।

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল,

— আমি জানতাম নাকি আপনি ঠিক এই সময় বের হয়ে আসবেন? আর এই হুকটা কিছুতেই খুলছিল না। এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করতে করতে হাতই ব্যথা হয়ে গেছে। এতে আমার দোষটা কোথায়?

মাহাদী ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি হেসে বলল,

— না, না... তোর দোষ হবে কেন? সব দোষ তো আমারই! মনে হয় এই ঘরে আসাটাই আমার সবচেয়ে বড় দোষ।

আয়াত ঠোঁট ফুলিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর দুষ্টুমি ভরা চোখে বলল,

— ঠিক আছে, হেল্প না করলে কিন্তু আমি এই ওড়নাটা সরিয়ে আবার আপনার সামনেই এসে দাঁড়াব। তখন আবার চিৎকার করে পুরো রিসোর্ট মাথায় তুলবেন না যেন!

মাহাদী প্রায় লাফিয়ে উঠল।

— এই মেয়ে! একদম এক ইঞ্চিও সামনে আসবি না। যেখানে আছিস, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাক!

আয়াতের ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।

— তাহলে বুঝলাম... শেষ পর্যন্ত হেল্প করতেই হবে, মাই জান।

মাহাদী দুই হাত তুলে মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে মুখ তুলে বিড়বিড় করে বলল—

— আস্তাগফিরুল্লাহ! আয় মা, তোর কী হেল্প লাগবে তাড়াতাড়ি বল। করে দিয়ে আমি ধন্য হই!

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল—

— একদম কিন্তু টুনটুনি বরাবর মারব। ‘মা’ কী? বউ হই, বউ!

— এই চুপ! কী যা-তা বলছিস? কী করতে হবে, সেটা বল!

আয়াত আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে মাহাদীর দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল—

— এই হুকটা খুলে দিন।

মাহাদী অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে দিল।বৃষ্টিতে ভিজে আয়াতের পিঠ তখন পুরোপুরি সিক্ত। পোশাকের ভেজাভাব যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাহাদীর হাতও অজান্তেই কেঁপে উঠল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে হুকটির দিকে হাত বাড়াল সে।হুক খুলতে গিয়েই অসাবধানতাবশত তার আঙুলের ডগা আয়াতের ভেজা পিঠ ছুঁয়ে গেল।সঙ্গে সঙ্গেই দুজনের শরীরজুড়ে যেন অদৃশ্য এক শিহরণ বয়ে গেল।আয়াত আচমকা নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। মাহাদীর হাতও আচমকা থেমে গেল।কেউ কোনো কথা বলল না।শুধু বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দের মাঝখানে, সেই ক্ষণিকের স্পর্শটা দুজনের মাঝেই অস্বস্তিকর এক নীরবতা ছড়িয়ে দিল।

হুকটা খুলে দিতেই আয়াত আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর পোশাক বদলে বাইরে এসে দেখল, মাহাদী ডিভানের ওপর নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। মাথাটা পিছন দিকে হেলানো যেন গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে আছে।আয়াতের পায়ের শব্দ কানে যেতেই মাহাদী ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল।

আয়াত থমকে গেল।কিছুক্ষণ আগেও যে চোখ দুটো একেবারে স্বাভাবিক ছিল, এখন সেগুলো অস্বাভাবিক রকম লাল। দৃষ্টির গভীরে জমে আছে অদ্ভুত এক অস্থিরতা, যেন কিছুক্ষণের ব্যবধানে মানুষটার ভেতরেই কোনো এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে গেছে। পাশেই একটি খালি গ্লাস পরে আছে।

আয়াত বিস্মিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।

— আপনি ঠিক আছেন তো? কী হয়েছে আপনার?

মাহাদী কোনো উত্তর দিল না।শুধু স্থির দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইল।অস্থিরভাবে ঘাড়টা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে নিল।

মাহাদীর নীরব দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে আয়াতের বুকের ভেতরটাও অকারণে কেঁপে উঠল।

মাহাদী এক ঝটকায় আয়াতকে টেনে ডিভানে শুইয়ে দেয়। তারপর আবেগের তীব্রতায় তার বক্ষদেশে মুখ ডুবিয়ে দেয়।
আয়াত এমন আকস্মিক স্পর্শে মুহূর্তেই কুঁকড়ে যায়। শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ।

মাহাদীর থামার যেন কোনো নাম-গন্ধই নেই। আয়াত যতই তাকে থামানোর চেষ্টা করছে, বাধা দিচ্ছে, ততই যেন মাহাদীর আবেগ আরও প্রবল হয়ে উঠছে। তার প্রতিটি চেষ্টাই যেন মাহাদীর আকুলতাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

আয়াতের বাধায় বিরক্ত হয়ে মাহাদী একহাতেই তার দু’হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। এক টানে গলা থেকে ওড়নাটা খুলে মেঝেতে ফেলে দেয়। 
আয়াত ডিভানের পিছন দিকে হেঁচরিয়ে নিজের দেহটা নিয়ে যাচ্ছে আর মাহাদী আয়াতের পা ধরে একটানে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
এরপর নিজের দুই পা দিয়ে আয়াতের পা চেপে ধরে তাকে নড়াচড়ার সুযোগটুকুও দেয় না।

তবুও আয়াত বারবার মুখে বলে উঠছে—

— আমার আপনাকে ঠিক লাগছে না। ছাড়ুন। আপনি হুঁশে নেই।

মাহাদীর কণ্ঠ এবার কঠোর হয়ে ওঠে—

— জাস্ট শাট আপ। নো মোর টক।
ইউ আর মাই লিগ্যালি ওয়াইফ। সো লেট মি ডু মাই ওয়ার্ক।জাস্ট কো-অপারেট উইথ মি, বেবজ।

আয়াতের মনে হলো, এই তো কিছুক্ষণ আগেও মানুষটা একেবারে স্বাভাবিক ছিল! হঠাৎ তার কী হয়ে গেল? এতটা বদলে গেল কীভাবে?

মাহাদী কথাটি শেষ করেই আয়াতের ওষ্ঠ দখল করে নিল। আয়াত বারবার মাথা নাড়াতে লাগলে মাহাদী অন্য হাতে তার ঘাড় চেপে ধরে।
প্রথমদিকে কিছুটা ছটফট করলেও একসময় ধীরে ধীরে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেয়। আয়াত মাহাদীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।আয়াতের অস্থিরতা থেমে এলে মাহাদী তার হাত দুটো ছেড়ে দেয়। আর ঠিক তখনই আয়াত শক্ত করে মাহাদীর পিঠ জড়িয়ে ধরে।

মাহাদী জানে, আয়াতকে সে ভালোবাসে না। তার ভালোবাসা অন্য একজনের জন্য—যে অনুভূতিটা সে এতদিন বুকের গভীরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।

অথচ আয়াতকে ঘিরে আজ তার ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটার কোনো নাম সে নিজেও দিতে পারছে না। এটা ভালোবাসা নয়—হয়তো আকর্ষণ, হয়তো এক অদ্ভুত দুর্বলতা। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই পার্থক্যটা ভাবার মতো মানসিক অবস্থায় সে নেই।

আয়াতের চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে জানে না, এই মুহূর্তের পরিণতি কী হবে। জানে না, সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। অথচ আজ তার মনটাও যেন কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইছে না।

বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে সেই বৃষ্টির একটানা সুরে। আর নিজেদের ভেতরের অগণিত দ্বিধা, অস্বস্তি আর না-বলা প্রশ্নগুলোকে পাশে সরিয়ে—দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য নিজেদের জগতের বাইরে চলে গেল।

—————

— আমি ছোঁয়ার আগেই এত কাঁপছিস?

ঘোমটার আড়াল থেকেই রাহা ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিলো—

—আপনার উপস্থিতি এই আমিটাকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য কি যথেষ্ট নয়?

রাহার কণ্ঠে কাঁপন স্পষ্ট। কথাটা শুনে অভ্রর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সামান্য, রহস্যময় এক হাসি।

— তাই? তাহলে ছুঁয়ে দিলে কী করবি? নিজেকে সামলাতে পারবি তো?

রাহা আর কোনো প্রত্যুত্তর দিলো না। নিস্তব্ধ হয়ে রইল সে।

অভ্র ধীর পায়ে বিছানার ওপর বসতেই রাহা যেন আরও গুটিয়ে নিলো নিজেকে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে তার অস্বস্তি আর অজানা শিহরণ স্পষ্ট হয়ে উঠল।পরমুহূর্তেই অভ্র এক টানে রাহার ঘোমটা সরিয়ে নিয়ে দূরের ডিভানের ওপর ছুড়ে ফেলল।

রাহা সঙ্গে সঙ্গেই চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। যেন চোখ মেলে তাকালেই অভ্রর দৃষ্টির তীব্রতা সামলাতে পারবে না।

অভ্র তার আরও কাছে ঝুঁকে এলো কানের একেবারে কাছে মুখ নিয়ে নিচু, ভারী স্বরে বলতে লাগল—

— আজকে আর তোর রেহাই নেই, জান।

কথাটা বলেই অভ্র নিজের পকেট থেকে মসৃণ সিল্কের একটি লম্বা কাপড় বের করে টেবিলের ওপর রেখে দিলো। তারপর ধীরস্থির ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল—

— অজু করে আয়। নামাজটা পড়ে নিবি। আমি যাচ্ছি।

এইটুকু বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না অভ্র। ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

অভ্রর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই রাহা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। বুকের ভেতরটা তখনও অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ধুকপুক করছে।

আজ তার ভীষণ, ভীষণ লজ্জা করছে।

এমন লজ্জা, যে লজ্জায় অভ্রর চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে অভ্রর সেই দৃষ্টি, সেই নিচু স্বর—আর তাতেই মুখমণ্ডল আরও গাঢ় লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠছে।

অভ্র অজু করে ফিরে এলে রাহাও নীরবে উঠে অজু করে এলো।

ঘরের এক পাশে জায়নামাজ বিছানো হলো। সামনে অভ্র, তার থেকে সামান্য পেছনে রাহা। দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করল। কৃতজ্ঞতায় শুকরিয়া আদায় করল, আর তাদের অনাগত ভবিষ্যতের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কল্যাণ, শান্তি আর ভালোবাসায় পূর্ণ হয়—সেই প্রার্থনাই জানাল।

নামাজ শেষ হলো।

অভ্র কিছুক্ষণ নীরবে বসে কী যেন পড়ল। তারপর রাহার মাথার ওপর থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তার পুরো শরীরের দিকে ফুঁ দিয়ে দিলো।

রাহা বিস্মিত চোখে শুধু ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল অভ্রর দিকে। যেন এই মানুষটার আচরণ প্রতিবারই তাকে নতুন করে বিস্মিত করে।

অবশেষে রাহা উঠে জায়নামাজগুলো যত্ন করে ভাঁজ করে এক পাশে রেখে দিলো। তারপর অস্থির চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে পানি খুঁজতে লাগল। গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক ঢোক পানি না খেলে স্বস্তি মিলবে না।

তার ওপর শরীরজুড়ে ভারী শাড়ি আর গয়নার বোঝা—এসবও খুলতে হবে।

ঠিক তখনই চোখে পড়ল, অভ্র তার দিকে পানিভর্তি গ্লাস এগিয়ে ধরেছে।

রাহা এক মুহূর্ত অভ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা নিলো। তারপর ধীরে ধীরে পুরো পানিটুকু পান করে ফেলল। গ্লাসটা নামাতেই অভ্র সেটি হাতে নিয়ে পাশে রেখে এলো।

পরক্ষণেই আচমকা রাহার হাত ধরে এক টানে তাকে নিয়ে গেল ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নার সামনে। তারপর টুলে বসিয়ে নিজে তার ঠিক পেছনে দাঁড়াল।

আয়নায় দুজনের প্রতিবিম্ব পাশাপাশি ফুটে উঠতেই অভ্র মৃদু হেসে রাহার দিকে তাকাল।

— দেখ, আমার পরীকে। কত কিউট লাগছে! তাই না? বল।

রাহা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।

অভ্রর দৃষ্টি তখন আয়নায় আটকে থাকা রাহার প্রতিবিম্বে। কণ্ঠটা আরও নিচু, আরও গভীর হয়ে এলো—

— আজকে আমার ভালোবাসা সব তোকে উজাড় করে দিবো।

এক মুহূর্ত থেমে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল—

— এই জিহাদ খান অভ্রের ব্রত ভাঙবে আজ।

কথাগুলো বলতে বলতেই অভ্র ধীরে ধীরে রাহার হাতের চুড়িগুলো খুলে দিতে লাগল। একে একে গলার ভারী গয়না, তারপর কপালের টিকলিটাও সরিয়ে রাখল।

এতক্ষণে বাইরে যেন হঠাৎ বাতাসের বেগ বেড়ে গেছে। খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে শীতল বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ছে। সেই বাতাসে পর্দা দুলছে, আর ঘরের নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ছে।

অভ্র যখন রাহার চুলের ক্লিপটা খুলে দিলো, মুহূর্তেই ঘন কালো কেশরাশি নেমে এলো তার পিঠজুড়ে। বাতাসের ঝাপটায় চুলগুলো উড়ে এসে বারবার অভ্রর মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

অভ্র আলতো করে কয়েক গোছা চুল নিজের নাকের কাছে এনে চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিলো।

— উফ... ড্যাম! মাই ফেভারিট স্মেল।

তারপর রাহার চুলগুলো একপাশে সরিয়ে ফর্সা পিঠে আলতো করে একটি চুমু এঁকে দিলো।

মুহূর্তেই রাহার মনে হলো, শরীরের ভেতর দিয়ে যেন আকস্মিক কোনো বিদ্যুৎ-শিহরণ বয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অজানা অনুভূতিতে।

অপ্রস্তুত রাহা দ্রুত সরে অন্যদিকে যেতে চাইতেই অভ্র তার হাত ধরে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে জানালার দিকে ঘুরিয়ে নিজের কাছাকাছি আটকে দিলো।

অভ্রর কণ্ঠে তখন মিশে আছে দুষ্টু অধিকারবোধের ভারী সুর—

— আজ আর পালাই-পালাই করবি না, জান।

রাহা অস্পষ্ট, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল—

— আ... আমার ভয় করছে, অভ্র ভাই। প্লিজ... আজকে না।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তখন হাওয়ার দমকা ঝাপটার সঙ্গে জানালা পেরিয়ে ভেতরে এসে পড়ছে। ঠান্ডা জলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটা রাহার মুখ, গলা আর চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভেজা চুলগুলো গালের পাশে লেপ্টে আছে, আর সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে অভ্রর দৃষ্টি মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।

চোখের মণিতে জমে উঠল তীব্র আকুলতা। অথচ রাহার কাঁপতে থাকা মুখটা দেখেই তার সমস্ত আবেগের ওপর যেন সংযমের কঠিন পর্দা নেমে এলো।

অভ্র সেই অবস্থায় মুখ ফুটে বলে উঠল,

— হালকা হাওয়ার মতো, চাইছি এসো এখন...
করছে তোমায় দেখে অল্প বেইমানি মন...
লিখবো তোমার হাতে আমি আমার মরণ...

কণ্ঠে আকুলতা থাকলেও এবার তার আচরণে কোনো জোর নেই।
অভ্র রাহার চোখের দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বলল—

— আমি কোনো কষ্ট দেবো না, জান। একদম তোর বাধ্য হয়ে থাকব, দেখিস। প্লিজ জান, জাস্ট সে ইয়েস।

একটু থেমে আরও নরম হয়ে বলল—

— আজ শুধু একটা কথা বল... তুই কি আমাকে চাস? 

রাহা নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে, অথচ ঘরের ভেতর দুজনের মাঝখানের নীরবতাটাই যেন সবচেয়ে বেশি শব্দ করে উঠল।

রাহার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অভ্র তার গলার কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার প্রতিটি স্পর্শে রাহার শরীরজুড়ে যেন শিহরণের ঢেউ বয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল রাহাও।

তার অস্বাভাবিক কাঁপুনি টের পেয়ে অভ্রর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি।

তবুও সে প্রতিটি মুহূর্তে রাহার কাছে অনুমতি চাইতে থাকল। রাহার গলা থেকে বুকের ওপরিভাগ পর্যন্ত তার কোমল চুম্বনের ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির জলবিন্দুগুলোও যেন সেই উষ্ণতায় হারিয়ে যাচ্ছিল।

একসময় রাহার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
সে আচমকাই ঘুরে দাঁড়িয়ে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মাথাটা তার বুকে রেখে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল।

অভ্র ধীরে ধীরে তার কোমর থেকে হাত সরিয়ে পিঠের ওপর রাখল। তারপর রাহার কানের কাছে মুখ এনে আবারও সেই পরিচিত, নিচু স্বরে প্রশ্ন করল—

— মে আই, জান?

রাহা কিছু বলল না। শুধু চোখ বুজে অভ্রর বুকে আরও একটু গা এলিয়ে দিলো। তার নীরবতাতেই যেন লুকিয়ে রইল মনের কথাটা।আজ সে নিজেও এই মানুষটাকেই চায়—একদম খুব কাছ থেকে, আপন করে।
রাহার সম্মতি বুঝতে পেরে অভ্র মুহূর্তেই রাহাকে পাজাকোলে কোলে তুলে নিলো। তাকে বুকের সঙ্গে আগলে ধরে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে নিচু, ভারী স্বরে বলে উঠল—

— আজ তোকে গভীর থেকে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে দেবো। তোর শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে এই অভ্রর নাম লিখে দেবো।

কথাগুলোতে ছিল প্রবল আবেশ, দখলদারির মতো তীব্র এক আকুলতা।বিছানার ঠিক মাঝখানে রাহাকে আলতো করে শুইয়ে দিলো অভ্র। রাহা চোখ দুটো বন্ধ করে এখনও বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। বুকের ওঠানামায় তার অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অভ্র হুট করেই তার শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে সরিয়ে দিলো। মুহূর্তেই তার দৃষ্টির সামনে উন্মোচিত হলো রাহার কোমল, মোমের মতো স্নিগ্ধ অবয়ব। কোমরের সোনালি বন্ধনীটি আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠল।সেই দৃশ্যের দিকে অভ্র এমন এক নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন বহুদিনের তৃষ্ণার্ত চোখ আজ নিজের কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের দেখা পেয়েছে।
পরক্ষণেই সে ঝুঁকে এলো। রাহার শরীরে ভালোবাসার এক কোমল পরশ এঁকে দিলো—যেন সেই স্পর্শের মধ্য দিয়েই তার সমস্ত আকুলতা প্রকাশ করে দিতে চাইছে।

রাহা বিছানার চাদরটা শক্ত করে খামচে ধরল। অভ্রর একের পর এক চুম্বনে যেন পুরো শরীরজুড়ে শিহরণের ঢেউ বয়ে যেতে লাগল। রাহার ধনুকের মতো শরীর বারবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেঁকে উঠছে। এই অচেনা স্পর্শ যেন তার সমস্ত সংযম তছনছ করে দিচ্ছে—পাগল-পাগল লাগছে তার।

রাহার চোখ বন্ধ দেখে অভ্র নিচু, ভারী স্বরে বলল—

— চোখ খোল। আজকের পর আর কোনো লজ্জা থাকবে না। সব লজ্জা আমি নিয়ে নেব।

তবুও রাহা চোখ মেলে তাকাতে পারল না।

অভ্র আর অপেক্ষা করল না। হঠাৎই রাহার অধর দখল করে নিলো সে। রাহার তুলতুলে ওষ্ঠে তার চুম্বন হয়ে উঠল আরও গভীর, আরও বেপরোয়া। একইসঙ্গে তার হাতের স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ল রাহার শরীরজুড়ে।কিছুক্ষণ পর অভ্র ঠোঁট সরিয়ে আবার রাহার গলার কাছে মুখ নামিয়ে আনল। রাহার কোমল আঙুলগুলো অজান্তেই অভ্রর চুল আঁকড়ে ধরল। সেই স্পর্শ যেন তার আবেগকে আরও উসকে দিল।

রাহা তখন সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভ্রর দৃঢ় আলিঙ্গন থেকে সামান্য নড়তে চাইতেই সে তাকে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিল। চুম্বনের তীব্রতা ক্রমশ বেড়ে উঠল, সঙ্গে বেড়ে চলল তার অস্থির, বেপরোয়া স্পর্শও।

একসময় অভ্র নিজের পোশাকটাও একটানে সরিয়ে ফেলল।পরমুহূর্তেই সমস্ত দ্বিধা-সংকোচ ভুলে সে রাহার আরও কাছে ঝুঁকে পড়ল—বাইরের ঝড়-বৃষ্টির মতোই দুজনের মাঝের আবেশও তখন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছে।

ঝড়-বাদলের সেই রাতে মিল হলো একজোড়া কপোত-কপোতীর।কত বছরের সাধনা, কত দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কতদিনের জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে মিশে গেল সেই এক রাতের গভীরতায়।

একপর্যায়ে রাহার কণ্ঠে তীব্র প্রতিবাদের সুর ভেসে এলো—

— ছাড়, অভ্রের বাচ্চা!

অভ্র পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলে—

— আর একটু, জান। প্লিজ। নইলে আমি মরে যাব।

তবুও রাহার ছটফটানি দেখে অভ্র পাশ থেকে লাল ফিতাটা নিয়ে তার হাত দুটো বেঁধে দেয়। আর যেন কথা বলতে না পারে, নিজের ঠোঁট দিয়ে রাহার ঠোঁট চেপে ধরে আবারও নিজের কাজে মত্ত হয়ে যায়।

সময় বয়ে চলল আপন গতিতে। আর সেই রাতের পর তাদের সম্পর্কও পা রাখল এক নতুন অধ্যায়ে।

—————

সকালের মিষ্টি রোদের কোমল আলো চোখে পড়তেই রাহা বিরক্তিতে চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল। ঘুমজড়ানো শরীরটা নিয়ে এপাশ-ওপাশ ফিরতে চাইল সে, কিন্তু অভ্রের শক্ত, দৃঢ় বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাধ্য যেন তার নেই। অভ্রের বলিষ্ঠ পুরুষালি শরীরটাও এমনভাবে তাকে আগলে রেখেছে যে, সামান্য নড়াচড়া করাটুকুও রাহার জন্য দুরূহ হয়ে উঠেছে।

তবুও অনেক কষ্টে একটু নড়তেই হঠাৎ—

—আউচ!

ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে তৎক্ষণাৎ পেটে হাত চেপে ধরল রাহা।

ধীরে ধীরে চোখ মেলে চারপাশটা দেখতে গিয়েই তার দৃষ্টি থমকে গেল। একই ব্ল্যাংকটের নিচে তারা দুজন পাশাপাশি। শরীরে একটিও অতিরিক্ত আবরণ নেই।

মুহূর্তেই লজ্জার তীব্র স্রোত মুখমণ্ডল ছাপিয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে ব্ল্যাংকটটা টেনে মুখের ওপর তুলে নিল।

বুকের ভেতর ধুকপুক করা হৃদস্পন্দন সামলাতে সামলাতে বিড়বিড় করে বলল—

—অভ্র ভাই ওঠার আগেই আমাকেই ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে। নইলে এই অবস্থায় আমাকে দেখলে... আমি তো লজ্জায় মরে যাব!

পাশেই পড়ে থাকা একটি লং শার্ট কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিল রাহা। শার্টটা এতটাই লম্বা যে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। তারপর সাবধানে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল।

কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে যেই না মেঝেতে পা রাখল, অমনি ভারসাম্য হারিয়ে তার শরীরটা হেলে পড়ল।

মনে হলো, সারারাত যেন কেউ তার পুরো শরীরজুড়ে নির্মমভাবে হাতুড়ির আঘাত চালিয়েছে। শরীরের প্রতিটি অস্থি-সন্ধি, প্রতিটি পেশিতে জমে আছে অসহ্য ব্যথার ভার।

ব্যথায় মুখটা কুঁচকে গেল রাহার। এক হাত দিয়ে দেয়াল আঁকড়ে ধরে, অন্য হাত দিয়ে শরীর সামলে ধীরে ধীরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখল সে।

কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ কানে যেতেই অভ্র তড়াক করে চোখ মেলে তাকাল। দীর্ঘক্ষণ না ঘুমানোর কারণে চোখ দুটো রক্তাভ হয়ে আছে। রাহা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, অভ্র তখনও একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো লেগে এসেছিল।

শব্দটা শোনা মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে উঠে বসে রাহার কাছে এগিয়ে গেল অভ্র। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।

—আমাকে ডাকিসনি কেন তুই? এত পাকনামি করতে তোকে কে বলেছে?

রাহা লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আমতা-আমতা করে বলল—

—আমি... আমি ফ্রেশ হবো।

বলতে বলতেই এক হাত দিয়ে শার্টটা ক্রমাগত টেনে নিচ্ছে সে। যেন সামান্য কাপড়টুকু টেনে টেনে কোনোভাবে নিজের পুরো শরীরটাকেই আড়াল করে ফেলতে পারবে।

রাহার এমন কাণ্ড দেখে অভ্র ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল দুষ্টুমি মেশানো এক চিলতে হাসি।

—এটা তো আর লম্বা হবে না, জান। তুই চাইলে এর থেকেও ছোট একটা এনে দিতে পারি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp