আজ খান বাড়ি মানুষদের মধ্যে যেন একেবারেই ভিন্ন রকমের উৎসবের আমেজ। বাড়ির পুরুষেরা আজ সেজেছে বরযাত্রী, আর মহিলারা পুরোপুরি মেয়েপক্ষের ভূমিকায়। রিসোর্টের গেটের ঠিক বাইরেই বরযাত্রীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। তার দু'পাশে হাসি খুশি ভঙ্গিতে অবস্থান নিয়েছেন আরমান খান ও আসান খান। অন্যদিকে মেয়েপক্ষের হয়ে কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছে শিফা, সাফা,অবন্তিকা, আয়ারা ও জায়রা তাদের পাশেই রয়েছেন সাথী বেগম ও নাজিরা বেগম।
সাথী বেগম প্রথমে কিছুতেই আসতে চাইছিলেন না। কিন্তু নাজিরা বেগমও নাছোড়বান্দা—প্রায় জোর করেই তাকে টেনে-হিঁচড়ে মেয়েদের দলে দাঁড় করিয়েছেন।
তাদের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন আমান খান ও আফসানা বেগম। বাড়ির মুরুব্বি হিসেবে বরযাত্রীদের এই হাসি-ঠাট্টার লড়াইয়ে সরাসরি জড়াননি তারা। বরং দূর থেকেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে পুরো দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করছেন।
এদিকে বরযাত্রীদের প্রত্যেকের হাতেই শোভা পাচ্ছে রীতিমতো হুমকিসূচক সাইনবোর্ড—
“টাকা দাও, মেয়ে নাও!”
“টাকা নাই, মেয়ে নাই!”
সব মিলিয়ে গেটের সামনে যেন বিয়ের আসর নয়, বরং দুই পক্ষের মধ্যে এক মহা-রণক্ষেত্রের প্রস্তুতি! একদিকে বরযাত্রীদের দুর্ধর্ষ দাবি, অন্যদিকে মেয়েপক্ষের পাল্টা প্রতিরোধ—কে কাকে শেষ পর্যন্ত নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
হঠাৎই জারিফ গলা উঁচিয়ে বলে উঠল,
— “টাকাও দেব না, মেয়েও রাখব না!”
জারিফের মুখে ‘মেয়ে’ শব্দটা উচ্চারিত হওয়ামাত্রই অভ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। চোখের সেই তীক্ষ্ণ, রক্তচক্ষু দৃষ্টি দেখেই জারিফের গলার স্বর মুহূর্তে নরম হয়ে গেল।
তৎক্ষণাৎ নিজেকে শুধরে নিয়ে কৃত্রিম হাসি হেসে বলল,
— “ভাবি! ভাবি!”
তারপর অভ্রের আড়ালে গিয়ে একেবারে ফিসফিসিয়ে বলল,
— “সরি ভাই!”
অভ্র অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল।এবার নিয়ম অনুযায়ী অভ্রকে মিষ্টি খাওয়ানোর পালা। অবন্তিকা মিষ্টির টুকরো হাতে নিয়ে অভ্রের দিকে এগিয়ে দিতেই জারিফ আচমকাই বিদ্যুৎগতিতে হাত বাড়িয়ে অবন্তিকার হাত ধরেই মিষ্টিটা সোজা নিজের মুখে পুরে দিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় অবন্তিকা হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে উঠল,
— “এইইইই, এটা কিন্তু ঠিক না!”
জারিফ নির্বিকার মুখে চিবোতে চিবোতেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “কেন? ঠিক না কেন?”
অবন্তিকা বিরক্তিতে মুখ ফুলিয়ে বলল,
— “এটা ভাইয়ার জন্য ছিল!”
জারিফ গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,
— “তো? আমি খেয়ে ফেলেছি। তোমার কি তাতে কম পরে গেলো বিচ্ছু!"
জারিফের এমন নির্লজ্জ, বেহায়াপনা-মাখা জবাবে অবন্তিকা আর কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করল না।এবার সাফা আরেকটি মিষ্টি অভ্রের দিকে বাড়িয়ে দিতে না দিতেই এবার জায়ানও টুপ করে সেটি মুখে পুরে নিল। এতে অবন্তিকা আর সাফা দুজনেরই এমন বিরক্তি চরমে উঠল যে, এরপর আর অভ্রের দিকে মিষ্টি বাড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা রইল না।
তবে পরমুহূর্তেই অবন্তিকা আর সাফা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একরাশ দুরভিসন্ধিমাখা হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দিল।সে চোখের ইশারার অর্থ তারা দুজনেই খুব ভালো করেই জানত —অভ্রকে মিষ্টি দিতে গেলেই এই দুইজন হেংলার মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে!
তবে তাদের এই বীরত্বের পরিণতি কী হতে চলেছে, সেটার সাক্ষী হতে আর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না।
এবার সাফা আর দেরি না করে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করল,
— “যেহেতু তিনবার বিয়ে করছেন, সেহেতু তিন লাখ টাকা তো লাগবেই লাগবে!”
কথাটা বলেই সাফা চোখের ইশারায় চারপাশের সবাইকে সংকেত দিল।পরক্ষণেই যেন পূর্বপরিকল্পিত কোনো স্লোগান—সবাই একসঙ্গে সমস্বরে গর্জে উঠল,
— “ঠিক! ঠিক! একদম ঠিক!”
চারপাশের হইচই আর উল্লাসে গেটের সামনের পরিবেশ মুহূর্তেই সরগরম হয়ে উঠল।
অভ্র নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। এতক্ষণকার কঠোর মুখাবয়বের আড়ালেও যে সে পরিস্থিতিটা বেশ উপভোগ করছে, সেই হাসিটুকুই তার স্পষ্ট প্রমাণ।
ঠিক তখনই জায়ান ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলে উঠল,
— “এত ছোটলোকি স্বভাব আমাদের নেই!”
জায়ানের কথা শুনে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে থেমে গেল। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
— “মানে?”
জায়ান তখন ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
— “এত কম ডিমান্ড! আমরা তো পাঁচ লাখ ভেবেছিলাম। তাই ডিল ক্যানসেল!”
সাফা সঙ্গে সঙ্গেই তেড়ে উঠে বলল,
— “এহ্! আসছে কোত্থেকে! এত বড়লোকি যখন দেখাচ্ছেন, তাহলে দশ লাখ দেন!”
একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে আবারও যোগ করল,
— “নাহ্, এটাও কম!”
এবার শিফা বিরক্তির ভান করে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
— “এই বাঁদরামিটা এবার বন্ধ করুন তো! দ্রুত টাকা বের করুন।”
সঙ্গে সঙ্গে জায়ান বলে উঠল,
— “আচ্ছা, গান শুনালে মানবে তো?”
সবাই কৌতূহলী চোখে তাকাতেই সে ঘোষণা করল,
— “তাহলে আমাদের সবার প্রিয়, শ্রদ্ধেয় আসান চাচ্চু গান শোনাবেন!”
কথাটা শুনে আসান খানও আর আপত্তি করলেন না। বরং গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে এলেন।
তারপর নাজিরা বেগমের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, মুখে দুষ্টুমি মেশানো হাসি টেনে গেয়ে উঠলেন,
— “সব সখিরে পার করিতে নেবো আনা আনা,
তোমার বেলা নেবো সখি, তোমার কানের সোনা...”
সখিগো ওওও আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি,
তোমার কাছে পয়সা নেবো না…।
গান শুনে নাজিরা বেগমের চোখ কপালে উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
— “চুপ করো! বাচ্চাদের সামনে কী বলছো? দিন দিন বুড়ো হচ্ছো, নাকি জোয়ান,অথচ কাণ্ডজ্ঞান একটুও বাড়ছে না!”
আসান খান যেন কথাটাকে নিজের পুরুষত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলেন,
— “এই! একদম আমাকে বুড়ো বলবে না, বলে দিলাম! আমি কিন্তু এখনও তাগড়া জোয়ান—একেবারে ঘোড়ার মতো শক্ত-সমর্থ!”
তার এমন আত্মপক্ষসমর্থনে চারপাশে মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেল।আসান খানের শেষ কথাটা কানে যেতেই চারপাশ থেকে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
— “উউউউউ!”
মুহূর্তেই হাসি-ঠাট্টা, উল্লাস আর হৈ-হুল্লোড়ে মুখর হয়ে উঠল পুরো পরিবেশ।
অভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। জারিফের দিকে ইশারা করতেই জারিফও যেন আগে থেকেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিন লাখ টাকা দিয়ে দিল তারা। এ নিয়ে কোনো দর-কষাকষির প্রশ্নই নেই—প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তারা আগেই নিয়ে এসেছিল।
—————
আজকের বিশেষ আয়োজনটাও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। পাশাপাশি দুটো আলাদা স্টেজে বসানো হয়েছে দুই জোড়া দম্পতিকে। বিশেষ এই দিনে কাউকেই একসঙ্গে রাখা হয়নি। আয়াত আর মাহাদীর বিয়ে যেহেতু ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে, তাই তারা এখন বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জায়গায় বসে আছে।
এবার পালা অভ্র আর রাহার। অভ্র স্টেজে এসে বসেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। অথচ এখনো তার সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘ফেইরী টেইল’-এর কোনো দেখা নেই।কতবার যে রাহাকে বলেছে—
একটা ছবি পাঠা।ছবি না হলে অন্তত ভিডিও কল দে।
কিন্তু মেয়েটা প্রতিবারই একগাল রহস্যমাখা হাসি নিয়ে একই কথা বলেছে—সামনাসামনি দেখাবে।
তাই আজকের এই অপেক্ষাটুকুও যেন অভ্রের কাছে অন্যরকম এক উত্তেজনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন হবে তার সেই অপেক্ষার মানুষটা? কীভাবে সাজবে রাহা? তার চোখে কী অনুভূতি ফুটে উঠবে?অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো।
দূর থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল রাহাকে।
একেবারে গাঢ়, টুকটুকে লাল রঙের শাড়িতে নিজেকে নিখুঁতভাবে আবৃত করেছে সে। শাড়ির গাঢ় লাল আভা যেন তার সমস্ত সৌন্দর্যকে আরও তীব্র, আরও মোহনীয় করে তুলেছে। মাথার ওপর টানা বিশাল ঘোমটা মুখখানাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু ঘোমটার নিচ থেকে ধীর, সংযত পদক্ষেপে স্টেজের দিকে এগিয়ে আসছে সে।প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে যেন রাহার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন আরও দুর্বার হয়ে উঠছে।আজকের দিনটার কথা কতবার কল্পনা করেছে সে!কিন্তু কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের এই মুহূর্তটার যেন কোনো তুলনাই হয় না।রাহাকে এগিয়ে আসতে দেখেই চারপাশের সবাই একে একে দাঁড়িয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও হাসি-ঠাট্টায় মুখর হয়ে থাকা পরিবেশটা মুহূর্তেই যেন থমকে গেল। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল অন্যরকম এক আবেশ। সবার চোখ তখন কেবল সেই লাল শাড়িতে মোড়া ঘোমটায় ঢাকা মেয়েটির দিকে।
আর স্টেজের ওপর বসে থাকা অভ্র?
তার দৃষ্টি যেন পৃথিবীর আর কোনো কিছুকেই দেখতে পাচ্ছে না।শুধু সেই লাল ঘোমটা।
সেই ঘোমটার আড়ালে থাকা তার মানুষটা।
যার একটা ছবি পাওয়ার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করেছে, এখন তাকে নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সে।
রাহা স্টেজের একেবারে কাছে পৌঁছাতেই অভ্র আর স্থির থাকতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।রাহাও এক মুহূর্ত ইতস্তত করে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল।
অভ্রের হাতের মুঠোয় রাহার আঙুলগুলো ধরা পড়তেই—কিছু একটা যেন মনে পড়ল তার।
পরক্ষণেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই অভ্র রাহাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল।
চারপাশে আবারও শুরু হলো উল্লাস—
— “উউউউউ!”
— “ওওওওও!”
হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ল পুরো জায়গাজুড়ে।
রাহা বিস্ময়ে একেবারে জমে গেল।
এত মানুষের ভিড়ে অভ্র এমন কিছু করে বসবে—এটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।এত মানুষের সামনে অভ্রের এই বেপরোয়া ভালোবাসায় সে যেন একই সঙ্গে লজ্জিত এক আনন্দে আপ্লুত। লজ্জায় তার মুখটা মুহূর্তেই গরম হয়ে উঠল। ঘোমটার আড়ালে লুকিয়েও যেন সেই লজ্জা ঢেকে রাখা সম্ভব হলো না।অভ্র রাহাকে বুকের কাছে আগলে রেখে তার কানের একেবারে কাছে মুখ নিয়ে নিচু, দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— “আমি না বলেছিলাম, পরের বার থেকে কোনো ভুল হবে না।?”
মৃদু স্বরে রাহা বলে উঠল—
— “তাই বলে এখন!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল—
— “এখন, তখন, কখন—আমি এসব বুঝি না, জান। সবসময় তোমাকে আমি এভাবেই নিতে চাই।”
কথাগুলোতে ছিল এমন এক অকৃত্রিম অধিকার, এমন এক গভীর টান—যেন রাহাকে কাছে পাওয়ার এই অনুভূতিটুকুই তার কাছে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান।অবশেষে অভ্র ধীরে ধীরে রাহাকে নামিয়ে তার নির্ধারিত আসনে বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও তার সামনাসামনি এসে বসল।
তাদের ঠিক সামনেই রাখা হয়েছে লাল গোলাপের ফুলে সাজানো একটি ঝাড়। ফুলগুলোর আড়ালটুকু যেন দুজনকে ঘিরে তৈরি করেছে মায়াবী এক আবরণ।চারপাশে এত মানুষ।এত আলো।এত আয়োজন।অথচ সেই মুহূর্তে রাহার কাছে মনে হলো—এই পৃথিবীতে যেন শুধু তারা দুজনই আছে।
আজকের এই মুহূর্তটা নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়।আজ, সবার সামনে, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক কবুল বলবে তারা দুজন।দুটি জীবন।
অসংখ্য ঝড়, অভিমান, বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি আর প্রতিকূলতার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে এসে দাঁড়িয়েছে একই ঠিকানায়।রাহার শরীর কাঁপছে।
ভয়, উত্তেজনা, আনন্দ, আবেগ—সবকিছু একসঙ্গে এসে যেন তার বুকের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। হৃদপিণ্ডটা এত দ্রুত ছুটছে যে, মনে হচ্ছে বুকের পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।
কতটা পথ পেরিয়ে আজ তারা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে!কত কাঠখড় পুড়েছে।কত রাত অশ্রুসিক্ত হয়েছে।কতবার ভাগ্যের নিষ্ঠুর আঘাতে তাদের পথ আলাদা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কতবার মনে হয়েছে—এই সম্পর্কের শেষ বুঝি এখানেই।তবুও শেষ পর্যন্ত তারা হার মানেনি।
সব প্রতিকূলতা, সব অন্ধকার, সব বাধা অতিক্রম করে আজ তারা পাশাপাশি বসে আছে।একই মঞ্চে।একই মুহূর্তে।একই ভবিষ্যতের সামনে।
আর মাত্র কয়েকটি শব্দ।
মাত্র তিনটি ‘কবুল’—
যা তাদের এতদিনের ভালোবাসা, অপেক্ষা আর সংগ্রামকে সবার সামনে এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে দেবে।ঘোমটার আড়ালে রাহা চোখ বন্ধ করল।
কাজী সাহেব যখন রাহাকে কবুল বলার জন্য বললেন, তখনই যেন মেয়েটার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সমস্ত আবেগ একসঙ্গে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। আনন্দে, আবেগে চোখ দুটো মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। ঠোঁট কাঁপছে, বুক কাঁপছে—কথা বলার আগেই অশ্রুগুলো গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে আরমান খান আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারলেন না। তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে মেয়েকে সস্নেহে আগলে নিলেন। পিতার সেই পরিচিত, নিরাপদ আশ্রয়টুকু যেন মুহূর্তেই রাহার সমস্ত অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত করে দিল।
আরমান খান মেয়ের মাথায় হাত রেখে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
— “কাঁদিস না মা। সাহস রাখ। আজ তোর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা দিন। এতদিনের সব কষ্টের পর আজ তুই তোর মানুষটাকে নিজের করে নিচ্ছিস।”
রাহা বাবার দিকে তাকাল।চোখভরা পানির মাঝেও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।বাবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। যেন সেই হাতের মুঠোয় নিজের সমস্ত সাহসটুকু সঞ্চয় করে নিচ্ছে।
তারপর এক নিঃশ্বাসে, কাঁপতে থাকা অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল—
— “কবুল।”
একটু থামল।
আবার বলল—
— “কবুল।”
তৃতীয়বার—
— “কবুল।”
তিনটি শব্দ।
অথচ সেই তিনটি শব্দের ভেতর যেন লুকিয়ে রইল তাদের অগণিত অপেক্ষা, অসংখ্য কান্না, বিচ্ছেদ, অভিমান, লড়াই আর ভালোবাসার সমস্ত ইতিহাস।
এবার পালা অভ্রের।কাজী সাহেব তার দিকে ফিরে একই প্রশ্ন করলেন।অভ্র একবারও কারও দিকে তাকাল না।তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে থামল রাহার ওপর।ঘোমটার আড়ালে অশ্রুসিক্ত মুখটা যেন তার চোখের সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্য।
কাজী সাহেবের কথা শেষ হতেই অভ্র গরগর করে বলে উঠল—
— “কবুল,কবুল,কবুল”
কবুল বলা শেষ হতেই অভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।সামনের ফুলের মালার ঝাড়টা দ্রুত সরিয়ে রাহার দিকে এগিয়ে গেল। তার ঘোমটাটা ওপরের দিকে তুলে দিল।
তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে রাহার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
চুমু খেয়ে নিচু স্বরে বলল—
— “আমার ফেইরী টেইল। আমার অর্ধাঙ্গিনী।”
এই দুটি শব্দ যেন রাহার সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিল।
চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না সে।
অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল তার গাল বেয়ে।অভ্রও আর নিজেকে সামলে রাখল না।
দুজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
এ যেন শুধু একটি আলিঙ্গন নয়—
এ ছিল দীর্ঘ এক যুদ্ধের পর বিজয়ের আলিঙ্গন।
হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্কের পর ফিরে পাওয়ার আলিঙ্গন।
চারিপাশ থেকে ফুল ছিটাতে লাগলো তাদের উপর।
অসংখ্য বাধা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক টানাপোড়েন আর ভাগ্যের নির্মম পরীক্ষাকে পেছনে ফেলে অবশেষে তারা একে অপরকে সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে এবং ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক নিজেদের করে নিল।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথি ও খান বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষের চোখেই তখন আনন্দের অশ্রু।
কারও মুখে প্রশস্ত হাসি, কারও চোখে জল, কারও ঠোঁটে নীরব দোয়া।এত বাধা পেরিয়ে, এত ঝড় সামলে, অবশেষে তারা একই বন্ধনে আবদ্ধ।
—————
এরপরই শুরু হলো আরেক দফা হাসি-ঠাট্টা।
এবার নাকি হবে ‘আয়না দেখা’।
রাহার সামনে একটি আয়না ধরে অভ্রকে জিজ্ঞেস করা হলো—
আয়নায় কাকে দেখা যাচ্ছে?
অবন্তিকা মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি নিয়ে প্রশ্নটা করল।
অভ্র এক সেকেন্ডও না ভেবে গম্ভীর মুখে বলে উঠল
— “আমার ফুটবল টিমের সভাপতি কে।”
কথাটা কানে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে হাসির বিস্ফোরণ ঘটল।সবাই কথার আসল অর্থ বুঝে গেছে।রাহা তো লজ্জায় একেবারে কাবু।
সাফা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
— “রাহু রে! তুই তো শেষ বইন!”
অবন্তিকা মাথায় হাত দেওয়ার ভঙ্গি করে চোখ বড় বড় করে বলল—
— “তাই বলে দুই হালি আর তিনটা!”
তার কথায় হাসির রেশ আরও বেড়ে গেল।এবার আয়াতও সুযোগ হাতছাড়া করল না।
দুষ্টুমিভরা গলায় বলে উঠল—
— “আমি এগারো জনের খালামণি হবো! উফফ, সেই হবে!”
একটু থেমে নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল—
— “তাহলে আমার স্বামীর তো আমাকে ডাবল ফুটবল টিমের সভাপতি বানাতেই হবে!”
আয়াতের কথা শেষ হতেই চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।সবাই হেসে কুটিকুটি।
শুধু একজন বাদে।
মাহাদী।
সে একদৃষ্টিতে রাগী চোখে আয়াতের দিকে তাকিয়ে আছে।তার সেই দৃষ্টি দেখে আয়াতের হাসিটাও যেন আরও চওড়া হয়ে গেল।
—————
এতক্ষণে একে একে অধিকাংশ মেহমান খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিদায় নিয়েছেন। রিসোর্টের কোলাহল কমে এসেছে।এখন শুধু খান বাড়ির মানুষগুলোই বাকি। আয়াত আর মাহাদীকেও রেখে দেওয়া হয়েছে। আজকের রাতটাও তাদের জন্য বিশেষ—দুজনের বাসরঘর আবারও নতুন করে সাজানো হবে।সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসার সময় মাহাদীর মা বিদায় নেওয়ার আগে একবার সবার সামনে দাঁড়ালেন।
চোখেমুখে ক্লান্তি, অনুতাপ আর গভীর অপরাধবোধের ছাপ।
তিনি প্রথমে নিজের ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর খান বাড়ির সবার দিকে।
নরম, ভারী কণ্ঠে বলে গেলেন—
— “সাবধানে থেকো। আর কাল যেন বউমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেও।”
কথাটা বলেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা আরেকটি ভার আর ধরে রাখতে পারলেন না তিনি।
খান বাড়ির সবার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেন।
— “আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার স্বামীর কর্মকাণ্ডের জন্য আপনাদের কাছে আমি সত্যিই লজ্জিত।”
তার গলা ভারী হয়ে এলো।
— “আমি তার স্ত্রী হয়েও তার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই পাপিষ্ঠ মানুষটাকে চিনতে পারিনি। এতগুলো বছর তার পাশে থেকেও বুঝতে পারিনি, তার ভেতরে এতটা অন্ধকার জমে আছে।”
কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রু।
— “আর কীভাবেই বা বুঝতাম? এত বছর ধরে সে নিজেকে সবার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে—ভদ্রতা, সৌজন্য, সম্মান আর ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে নিজের আসল চেহারাটাকে এমন নিখুঁতভাবে আড়াল করে রেখেছে যে, সন্দেহ করার মতো সামান্যতম সুযোগও কাউকে দেয়নি।”
একটু থেমে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “তবুও অপরাধটা যে হয়েছে, তার দায় থেকে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারি না। আপনাদের যে কষ্ট হয়েছে, যে ক্ষতি হয়েছে—তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।”
কেউ তাকে দোষ দিল না।
কারণ সবাই জানে—কিছু মানুষ এত নিখুঁতভাবে মুখোশ পরে থাকে যে, বছরের পর বছর পাশে থেকেও তাদের আসল রূপ চিনে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে।আর আজ সেই মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে সত্য।তবুও সেই অন্ধকার অধ্যায়ের শেষে আজ খান বাড়ির ঘরে নেমে এসেছে এক নতুন আলো।
—————
সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে।
একটি টেবিলে বাড়ির বড়রা, আর অন্যটিতে ছোটদের জমজমাট আসর।সারাদিনের ব্যস্ততা, ছুটোছুটি, আয়োজন আর একের পর এক আবেগঘন মুহূর্তে সবাই কম-বেশি ক্লান্ত। তবুও খাওয়ার টেবিলে বসতেই আবারও ফিরে এসেছে সেই চেনা হাসি-ঠাট্টার আমেজ।
অভ্র একদিকে নিজে খাচ্ছে, অন্যদিকে যত্ন করে রাহাকে খাইয়ে দিচ্ছে। রাহাও কোনো আপত্তি না করে চুপচাপ অভ্রের হাতে খেয়ে নিচ্ছে।
সারাদিনে তাদের ওপর দিয়ে কম ধকল যায়নি।
খাওয়া শেষ হলেই একটু নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেওয়া যাবে—এই আশাতেই রাহা মনে মনে হিসাব কষছিল।
কিন্তু তার সেই গোপন পরিকল্পনা যে পাশের মানুষটা ইতোমধ্যেই ধরে ফেলেছে, সেটা বুঝতেই পারেনি সে।
হঠাৎ অভ্র ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি টেনে বলে উঠল—
— “উহু, একদম না। যা ভাবছিস, সেটা আজকে আর হবে না।”
রাহা চমকে তার দিকে তাকাল।
অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের খাবার খেতে খেতেই বলল—
— “কোনো রেস্ট পাবি না তুই। আজকে আমাকে তুই সামলাবি। এখন তোকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
একটু থেমে তার চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে যোগ করল—
— “কিছুক্ষণ পর তুই আমার খাবার হবি, জান। সো, বেশি করে খা। আর ডক্টর কিন্তু রেডি রেখেছি।”
কথাটা শেষ করেই এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খেতে লাগল, যেন সে কিছুই বলেনি।
আর রাহার অবস্থা?
লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার জোগাড়।
সে একবার ডানে তাকাচ্ছে, একবার বাঁয়ে। চোখ কোথাও স্থির করতে পারছে না। এক হাত দিয়ে অন্য হাতের আঙুলগুলো মোচড়াতে লাগল। গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
অভ্রের কথার অর্থ যে সে খুব ভালোভাবেই বুঝেছে, সেটা তার লজ্জায় নত হয়ে যাওয়া চোখই বলে দিচ্ছে।অভ্র মুচকি হেসে আবারও তাকে এক লোকমা এগিয়ে দিল।
— “মুখ খোল।”
রাহা আর কোনো কথা বলল না।
লজ্জায় মুখ নিচু করেই খাবারটা নিয়ে নিল।
অন্যদিকে মাহাদী বেশ কিছুক্ষণ ধরে খাবারের দিকে তাকিয়েই আছে। খাচ্ছে না দেখে আয়াতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
নিজের হাতে এক লোকমা খাবার নিয়ে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই—থুস করে!সরাসরি মাহাদীর মুখে ঢুকিয়ে দিল।মাহাদী চমকে উঠে—
— “আরে—”
বলতে মুখ খুলতেই আয়াত আবারও আরেক লোকমা গুঁজে দিল।মাহাদী এবার চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকাল।মুখভর্তি খাবার নিয়ে কোনোভাবে খাবারগুলো বের করে দেওয়ার চেষ্টা করতেই আয়াত সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে বলে উঠল—
— “খবরদার! খাবার ফেললে কিন্তু খবর করে দেব একদম, মাইজান। এখনই শাশুড়ি আম্মুকে সব বলে দেব!”
মাহাদী থমকে গেল।কয়েক সেকেন্ড আয়াতের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে নিরুপায়ের মতো মুখ বন্ধ করে খাবার চিবোতে লাগল।
আয়াত সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে বলল—
— “এই তো! ভালো ছেলে।”
তাদের এই কাণ্ড দেখে আশপাশের সবাই হেসে উঠল।মাহাদীর মুখের অসহায় অভিব্যক্তি দেখে হাসি যেন আর থামতেই চায় না কারও।
একপর্যায়ে খাওয়ার পর্বও শেষ হলো।
সবাই যখন কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বসেছে, তখনই রাহা হঠাৎ অভ্রের দিকে তাকিয়ে আবদার করে বসল।
— “আমি জারিফ আর জায়ানে ভাইয়াদের নাচ দেখতে চাই।”
অভ্র ভ্রু তুলে তাকাল।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে আরও নরম গলায় বলল—
— “ওরা তো আমার কথা শুনবে না। আপনি বললেই শুনবে।”
অভ্রের মুখে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
রাহার আবদার বলে কথা!
এদিকে জারিফ আর জায়ানের অবস্থা তখন করুণ।
মিষ্টি খাওয়ার পর থেকে তাদের পেটের যে বেহাল দশা হয়েছে, সেটা তারাই জানে। কতবার যে দুজনকে ওয়াশরুমে ছুটতে হয়েছে আর ফিরে আসতে হয়েছে—তার কোনো হিসাব নেই।
তার ওপর অবন্তিকা আগেই এসে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে গেছে।কারণ পুরো ঘটনাটাই ছিল তাদের পূর্বপরিকল্পিত দুষ্টুমি। তাই আগেভাগেই সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল।
এখন নাচের কথা শুনে দুজনের মুখের অবস্থা দেখে মনে হলো, জীবন থেকে আর কিছুই চায় না তারা।
জায়ান অসহায় মুখে সাফার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “আপনিও এমনটা করতে পারলেন?”
সাফা একটুও অনুতপ্ত না হয়ে গম্ভীর মুখে বলল—
— “হ্যাঁ, করেছি। আর বেশ করেছি।”
কথাটা বলেই সে নির্বিকার ভঙ্গিতে সেখান থেকে চলে গেল।জায়ান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।
অন্যদিকে জারিফ দাঁত কিড়মিড় করে সাফার পেছনে অবন্তিকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—
— “তোমায় আমি দেখে নেব, বিচ্ছু!”
তারপর পাশ ফিরে জায়ানের দিকে তাকাতেই দেখল, ব্যাটা আবার হাসছে!
জারিফ ভুরু কুঁচকে বলল—
— “তোর আবার কী হলো?”
জায়ান কোনো উত্তর না দিয়ে হাসতেই থাকল।
জারিফ এবার বিরক্ত হয়ে বলল—
— “পাতলা পায়খানা করার পর মানুষ হাসে তাও যে এসব করেছে তাকে দেখে। এই প্রথম দেখলাম ভাই!”
কয়েক মুহূর্ত থেমে নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আফসোসের সুরে বলে উঠল—
— “হায় কপাল! কী দিনকাল এলো!সর এখান থেকে!”
জায়ান হেসেই চলেছে।
—————
বসের আদেশ বলে কথা—সে আদেশ অমান্য করার সাধ্য কারও নেই!যদিও ততক্ষণে বাড়ির বড়রা একে একে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছেন। রিসোর্টে তখন শুধু বাড়ির ছেলে-মেয়েরাই রয়ে গেছে। কিন্তু অভ্রের আদেশ যখন এসেছে, তখন না চাইলেও সেটা মানতেই হবে।
জারিফ আর জায়ান দুজনেই মুখ গোমড়া করে, অনিচ্ছার চরম সীমায় পৌঁছে অবশেষে স্টেজে উঠে দাঁড়াল।মনে হচ্ছিল, নাচতে নয়—যেন তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে মঞ্চে তোলা হয়েছে!
অবন্তিকা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সঙ্গে সঙ্গে গান চালিয়ে দিল।গানের তালে তালে জারিফ আর জায়ানও বাধ্য ছেলের মতো নাচতে শুরু করল।
কিন্তু তাদের মুখের অভিব্যক্তি?একেবারে দেখার মতো!শরীর নাচছে ঠিকই, কিন্তু চোখেমুখে স্পষ্ট লেখা—‘এই অপমানের প্রতিশোধ একদিন না একদিন নেবই!’
অবন্তিকা তো মহা আনন্দে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা মোবাইলে রেকর্ড করতে শুরু করেছে।
এদিকে রাহা আর সাফার মাথায় তখন জন্ম নিল আরও ভয়ংকর এক দুষ্টু বুদ্ধি।
দুজন দুজনের দিকে তাকাল।
চোখাচোখি হতেই বোঝা গেল—কথা বলার আর প্রয়োজন নেই।প্ল্যান হয়ে গেছে।
অবন্তিকার রেকর্ড করা ভিডিওটা নিয়ে রাহা আর সাফা মুহূর্তের মধ্যেই সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিল।
তারপর,অপেক্ষা করার মতো সময়ই লাগল না।
মুহূর্তের মধ্যে ভিডিওতে একের পর এক ভিউ, লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার আসতে শুরু করল।
ভিডিওটা যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল।কেউ মজা করে কমেন্ট করছে।কেউ হাসির ইমোজি দিচ্ছে।কেউ আবার ভিডিও শেয়ার করে বন্ধুদের ট্যাগ করছে।
আর ওদিকে জারিফ-জায়ান কিছুই জানে না!
নাচ শেষ করে দুজন যখন হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেজ থেকে নামল, ঠিক তখনই তাদের দুজনের মোবাইল একসঙ্গে বেজে উঠতে শুরু করল।একটার পর একটা নোটিফিকেশন।মোবাইলের স্ক্রিন যেন নোটিফিকেশনের বন্যায় ডুবে যাচ্ছে।জারিফ আর জায়ান দুজনেই থমকে দাঁড়াল।
পরস্পরের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল।
তারপর প্রায় একই সঙ্গে মোবাইল বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখল।
ভিডিওটা দেখেই জারিফের মুখের ভাব বদলে গেল। ধীরে ধীরে মোবাইলটা নামিয়ে সে চারপাশে চোখ বুলাল। তারপর অবন্তিকার ওপর দৃষ্টি পড়তেই তার চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠল।
অবন্তিকা তখনও নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু জারিফের চোখের দৃষ্টি দেখে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
মাথা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল জারিফ।তারপর পাশ থেকে একটা মোটা, লম্বা বাঁশ দেখতে পেয়ে সেটা তুলে নিল।
চোখ দুটো রাগে এমনভাবে জ্বলছে, যেন এই মুহূর্তে অবন্তিকাকে ধরতে পারলেই সর্বনাশ করে ফেলবে।
বাঁশটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল সে।
অবন্তিকার চোখ বাঁশটার দিকে যেতেই তার মুখের হাসি উধাও।এক পা পিছিয়ে গেল।তারপর আরেক পা।জারিফ এগিয়ে আসছে।অবন্তিকা পিছিয়ে যাচ্ছে।
শেষমেশ তোতলাতে তোতলাতে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল—
— “না... না... আমি আজকে শেষ!”
এক মুহূর্ত পরেই প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল—
— “আআআআআআ!”
বলেই উল্টো দিকে ঘুরে ছুট লাগাল।
জারিফও আর এক সেকেন্ড দেরি করল না।
— “দাঁড়া! আজকে তোকে আমি খবর করেই ছাড়ব!”
বলতে বলতেই বাঁশ হাতে তার পেছনে ছুটল।
অবন্তিকা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে।পেছনে জারিফ।
একজনের মুখে আতঙ্ক, আরেকজনের মুখে প্রতিশোধের আগুন।পুরো রিসোর্টজুড়ে শুরু হয়ে গেল এক অদ্ভুত দৌড় প্রতিযোগিতা!
কখনো পুলের পাশ দিয়ে, কখনো বাগানের ভেতর দিয়ে, কখনো স্টেজের চারপাশ ঘুরে—
অবন্তিকা ছুটছে প্রাণ হাতে!
আর জারিফ?
সে যেন আজ কোনোভাবেই শিকারকে হাতছাড়া করবে না।
যেই না অবন্তিকাকে ধরে ফেলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে অভ্রের গম্ভীর অথচ নির্লিপ্ত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “ছাড় তো। ডিলেট করিয়ে দিয়েছি।”
অভ্রের কথা শুনে জারিফ আচমকাই থেমে গেল।
হাতে তখনও বাঁশ।সামনে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে অবন্তিকা।জারিফ ধীরে ধীরে অভ্রের দিকে তাকাল।তারপর মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আবার অবন্তিকার দিকে চোখ ফেরাল।
আর অবন্তিকা দূর থেকেই হাঁপাতে হাঁপাতে দুই হাত জোড় করে যেন নীরবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল।
আজকের মতো বেঁচে গেছে!
তখনই সবার চোখ গিয়ে আটকাল স্টেজের দিকে। দেখা গেল, আয়াত মাহাদীর হাত ধরে প্রায় টেনেহিঁচড়ে তাকে স্টেজে তুলে ফেলেছে। পরক্ষণেই গানের তালে বাজতে শুরু করা গানের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নাচ শুরু করে দিয়েছে সে। মাহাদী বেচারা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে বিমূঢ় মুখে—যেন তাকে জোর করে কোনো শাস্তির আসরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে!
মূলত অবন্তিকাকে যখন জারিফ বাঁশ হাতে নিয়ে দৌড়ানি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই রাহা আর সাফা মিলে সুযোগ বুঝে আয়াতকে ধরে। তাদের একটাই দাবি—নাচতেই হবে। আর এখন সেই দাবিরই বাস্তবায়ন চলছে। একে একে সবাইকে স্টেজে তুলে নাচানো হচ্ছে।
আয়াত-মাহাদীর পালা শেষ হতেই এবার সবার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অভ্র আর রাহার দিকে। সবাই মিলে তাদেরও স্টেজে ওঠানোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করল।
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলে উঠল, — “আমি আর নাচ? ইমপসিবল! একদম অসম্ভব। আর রাহাও না। আমরা একটু পর ঘরে এমনিই নাচব, তাই না জান?”
কথাটা বলেই রাহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল সে।
রাহা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটার মুখে যেন কোনো লাগামই নেই! কী বলছে, কার সামনে বলছে—এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তার। রাহার কান দুটো পর্যন্ত লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, কান দিয়েই বুঝি ধোঁয়া বের হচ্ছে!
পরিস্থিতি সামলাতে অভ্র আর দেরি করল না। জারিফ আর জায়ানকে ডেকে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
— “তোরা অবন্তিকা আর সাফাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তারপর নিজেরাও বাংলোতে চলে যাবি। বেশি রাত করিস না।”
অভ্রের আদেশ মানা ছাড়া উপায় নেই। জারিফ আর জায়ান দুজনেই মাথা নাড়ল।
অবন্তিকা যাওয়ার আগে সাফার সঙ্গে একবার চোখাচোখি করে রাহার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিল। তারপর রাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে গেল, — “বেস্ট অব লাক, দোস্ত। কাল কিন্তু সব শুনব!”
এদিকে রাহার মনে হচ্ছে, লজ্জায় তার কান দিয়ে সত্যিই ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই লোকটা কখনো কখনো কী যে বলে বসে! তাও আবার সবার সামনে!
কিছুক্ষণ পর দুজন মেয়ে এসে রাহা আর আয়াতকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে এলো। রাহা যাওয়ার আগে একবার অভ্রের দিকে তাকাল।
অভ্র শুধু চোখের ইশারায় তাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলল।রাহা আর আয়াত চলে গেল।
শেষ পর্যন্ত সেখানে রয়ে গেল শুধু অভ্র আর মাহাদী।
অভ্র ধীরে ধীরে মাহাদীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
কিছুক্ষণ আগের হাসি-ঠাট্টার লেশমাত্র নেই সেখানে। চোখ দুটো সরু হয়ে এসেছে, দৃষ্টিতে জমাট বেঁধেছে অদ্ভুত এক শীতলতা। যেন শকুনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে মাহাদীর মুখটা ভেদ করে তার অন্তর্গত প্রতিটি ভাবনা পড়ে নিতে চাইছে।
অভ্র ধীর, ভারী কণ্ঠে বলে উঠল, — “কী বলেছিলাম তোকে?”
মাহাদী নিশ্চুপ।অভ্র এক পা এগিয়ে এলো।
— “আমার জিনিস কীভাবে আমার করে নিতে হয়, সেটা কিন্তু আমি খুব ভালো করেই জানি। আর শেষ হাসিটা কে হাসবে—সেটাও সময়ই বলে দেবে।মনে আছে?”
একটু থেমে অভ্র স্বরটা কিছুটা স্বাভাবিক করে বলল, — “যাই হোক, তোর এখন বিয়ে হয়ে গেছে। আয়াত খুবই ভালো মেয়ে। তাকে মেনে নে। নিজের স্ত্রীকে তার প্রাপ্য সম্মান দে।”
কথাটা বলে অভ্র সামনের দিকে এগিয়ে যেতে নিল।
ঠিক তখনই মাহাদীর গম্ভীর কণ্ঠ পেছন থেকে ভেসে এলো—
— “এতটাই কি সহজ?”
অভ্র থেমে গেল।মাহাদীর কণ্ঠে জমে থাকা কষ্ট এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— “একজনকে ভালোবেসে... অন্য একজনকে আপন করে নেওয়া?"
অভ্র আর পিছন ঘুরল না।তার মুঠো শক্ত হয়ে এলো।কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখে দেওয়া যায় না।
মাহাদী আবারও বলতে লাগলো,
"কিছু অনুভূতি যুক্তি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
আর কিছু ভালোবাসা—চাইলেও অন্য কারও নামে লিখে দেওয়া যায় না।"
এবার অভ্র ধীর পায়ে মাহাদীর সামনে এসে দাঁড়াল। চোখের দৃষ্টিতে এবার আর কোনো রসিকতা নেই—শুধু তীক্ষ্ণ সতর্কতা আর কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে বলে উঠল,
— “তোকে বারণ করেছিলাম আমি। কতবার বলেছি? কী করিনি ?
তোকে থামানোর জন্য। তবুও তুই নিজের জেদ আর একগুঁয়েমি আঁকড়ে ধরে একই ভুলের দিকে এগিয়ে গেছিস।”
মাহাদী নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— “তোর আমার ওপর জেদ ছিল, তাই না? সেই জেদের বশেই আমার জানকে একটা বাজির গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলি। ভেবেছিলি, তোর খেলায় রাহাকে সামনে রেখে আমাকে হারিয়ে দিবি। কিন্তু একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নে—আমি সেটা হতে দিইনি, আর কোনোদিন হতে দেবও না।”
এক মুহূর্ত থেমে অভ্রের দৃষ্টি আরও কঠোর হয়ে উঠল।
— “কারণ রাহা কোনো গুটি নয়, মাহাদী। তাকে তুই কোনো দাবার ছকে সাজিয়ে নিজের চাল চালতে পারিস না। সে নিজেই রানি। আর রানিকে নিয়ে খেলা যারা খেলতে যায়, শেষ পর্যন্ত তাদের নিজের খেলাতেই মাত দিতে হয়।”
বলেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
আকাশজুড়ে হঠাৎ বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য সাদা আলোয় চারপাশটা ঝলসে উঠল, তারপর আবার ডুবে গেল ঘন অন্ধকারে। অভ্র দৃঢ় পদক্ষেপে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল মাহাদী।
অভ্র চোখের আড়ালে চলে যেতেই মাহাদী ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন আর ধরে রাখতে পারল না। ভাঙা, ভারী কণ্ঠে বলে উঠল,
— “খোদা, তুমি তো জানো... আমি আমার শুভ্র পরীকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম। হয়তো শুরুটা অন্য নিয়তে হয়েছিল, হয়তো প্রথমে আমার উদ্দেশ্যটা পবিত্র ছিল না। কিন্তু পরে তো সব বদলে গিয়েছিল। কখন যে সেই মিথ্যে উদ্দেশ্যের আড়ালে সত্যিকারের ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল, নিজেই বুঝতে পারিনি।”
একটু থেমে মাহাদীর চোখ দুটো বুজে এলো।
— “তাহলে আমি কীভাবে সেই জায়গাটা অন্য কাউকে দিয়ে দেব, বলো? যে জায়গাটা একবার আমার শুভ্র পরীর নামে লিখে দিয়েছি, সেখানে অন্য কাউকে আপন করে বসাব কীভাবে?”
তার কণ্ঠ ক্রমেই ভারী হয়ে এলো।
— “মানুষকে হয়তো বোঝানো যায় যে সময় সবকিছু বদলে দেয়... কিন্তু নিজের হৃদয়কে কীভাবে বোঝাব? কীভাবে তাকে বলব—যাকে ভালোবেসেছিলি, তাকে ভুলে যা? আমি যে পারছি না, খোদা... একটুও পারছি না।”
হঠাৎ বিকট শব্দে বজ্রপাত হল।আকাশের বুক কেঁপে উঠল।বৃষ্টির আগমনী বার্তা নিয়ে ঝোড়ো বাতাস ছুটে এলো চারপাশে। গাছের ডালপালা প্রচণ্ড দাপটে দুলতে লাগল। আকাশের কালো মেঘ যেন আরও ঘন হয়ে নেমে এলো মাথার ওপর।
মাহাদী তবুও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
বাতাস তার পোশাক এলোমেলো করে দিচ্ছে, চুল উড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ তার শরীরের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।মনে হচ্ছে, মাটির সঙ্গে তার পা দুটো শেকড়ের মতো গেঁথে গেছে।নড়তে চাইছে না।
সামনে এগোতে চাইছে না।অথচ শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে ধীরে ধীরে পা বাড়াল সে।পা দুটো যেন নিজের ভারই বহন করতে পারছে না। তবুও টলমল পায়ে, ভারাক্রান্ত শরীর আর আরও ভারী হৃদয় নিয়ে তাদের জন্য বরাদ্দ করা রুমের দিকে এগিয়ে গেল মাহাদী।
পেছনে রয়ে গেল ঝড়ো রাত, বিদ্যুতের ঝলকানি আর আকাশভাঙা বৃষ্টির অপেক্ষা।
আর তার বুকের গভীরে রয়ে গেল একটাই নাম—
তার শুভ্র পরী।
—————
অভ্র দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করতেই থমকে দাঁড়াল। একটা পরিচিত সুবাস নাকে এসে ঠেকল পুরো ঘরটা অসংখ্য ছোট ছোট ক্যান্ডেল লাইটের মৃদু, মায়াবী আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে আছে। চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রকমারি ফুলের পাপড়ি। সাদা চাদর লাল গোলাপের পাপড়ির উপর বসে আছে একটা লাল টকটকে জীবন্ত গোলাপ।যেন সাদা শুভ্রতার বুকজুড়ে ভালোবাসার লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে।
দরজা খোলার ক্ষীণ শব্দটুকুতেই রাহা যেন আঁতকে উঠল। অজান্তেই খপ করে মুঠোয় চেপে ধরল বিছানার চাদর। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন আচমকাই দ্রুত হয়ে উঠেছে। ঘোমটার আড়ালে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
অভ্র ধীর পায়ে এক পা, দুই পা করে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে রাহার শরীরের কাঁপন যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।তার আঙুলের মুঠো শক্ত হয়ে উঠছে, বুকের ভেতর অস্থির ঢেউ উঠছে। এতক্ষণ যে মুহূর্তটার কথা ভেবে এসেছে, সেটাই এখন বাস্তব হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে।অভ্র যত কাছে এগিয়ে আসছে,ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝখানে কেবল ক্যান্ডেল লাইটের মৃদু শিখা দুলছে আর রাহার দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ যেন ততই নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………