ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ০৫ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          টুপু বেগম রান্নাঘরের তদারকি করছেন। শেখ বাড়িতে কাজের লোকদের অভাব নেই যদিও তবে রান্নাবান্নার বিষয়ে বাড়ির কোনো না কোনো বউ ঠিক তদারকিতে উপস্থিত থাকবেই। তবে বেশিরভাগ এই দায়িত্বটা পড়ে টুপু বেগম অথবা রিমঝিমের উপর। বাড়িতে এতগুলো মানুষ থাকতেও এই দু'জনকেই তদারকির দায়িত্বটা পালন করতে হয়। 

 রান্নাঘরের সেই ডুবন্ত ব্যস্ততার মাঝেই কিছু ভাঙার শব্দ হতেই কানখাড়া হয়ে ওঠে কাজের লোকদের। শব্দটা এসে লাগে টুপু'র কানেও। এমন শব্দ সম্পর্কে পূর্বপরিচিত বলেই হয়ত উৎসুক হয়ে ওঠে রান্নাঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে। চোখ চাওয়াচাওয়ি করে একে অপরের। ঠোঁট টিপে হেসে চোখের ইশারায় কথাও বলে নেয় এরা। টুপু উপস্থিত বিধায় মুখ খুলে কিছু বলবার সাহস হয় না। নয়ত বেশ আলোচনা জমে যেত এখানটায়। 
টুপু আঁড়চোখে এদের দিকে তাকায়। মুখ-চোখে তার খেলতে শুরু করে অস্বস্তি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশ করে,
 “দ্রুত রান্না শেষ করো। রাতের খাবারে কিছু কমতি হলে জানোতো কী হবে? রান্নায় মনোযোগ দাও।”

 টুপু রেগে কথা বলতে পারে না। ওর কণ্ঠটা জন্মলগ্ন হতেই মোলায়েম, নম্র। নম্র হবে না-ই বা কেন? জন্মলগ্নেই যেই কন্যার মা মারা যায় সে কন্যার কণ্ঠ শোনার জন্য আর থাকেই বা কে? তাই হয়ত অদৃষ্টের ইশারাতেই নবজাতক টুপুও মলিন কণ্ঠ নিয়েই বেড়ে উঠেছে।
  নির্দেশনা দিয়ে আলগোছে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো টুপু। ওর এসব ঝগড়াঝাঁটি পছন্দ নয়। আতঙ্ক লাগে। হয়ত বিতৃষ্ণাও। এই বাড়িটায় চিল্লাফাল্লা হয় না যদিও তবে মাঝে মাঝে যতটুকু চিৎকার বা উচ্চকণ্ঠ শোনা যায় সেটা ওর বড়ো ভাবি তাহমিনা বেগম আর হিমেলেরই। তা-ও কার উপর চিৎকার করে? রিমঝিমের উপর। বাড়ির সবচেয়ে নাজুক সদস্য মেয়েটা। টুপুরতো মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর চেয়েও অসহায় বোধহয় ঐ অনাথ মেয়েটা।

 টুপু ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই দেখল ঝড় থেমে গিয়েছে। রিমঝিম গুটিয়ে বসে আছে সোফাতে। একটি কাজের মেয়ে নিচে পড়ে থাকা কাঁচের ভাঙা টুকরো গুলো তুলছে মনযোগ দিয়ে। রিমঝিমের বিপরীত সোফাটিতেই এসে বসেছেন তাহমিনা বেগম। মুখমন্ডলে কী ভীষণ বিরক্তি তার! ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হিমেল ততক্ষণে চলে গিয়েছে নিজের ঘরে। 
 টুপু খেয়াল করল রিমঝিমের গালে দাগটাকে। এবং সেই দাগটিকে দেখেই শিরশির করে উঠল তার শরীর। আঁতকে ওঠল সে,
“বড়ো ভাবি, হিমেল আবারও কি রিমঝিমের গায়ে হাত দিয়েছে?”

 ননদের প্রশ্ন বিরক্ত করল বোধহয় তাহমিনা বেগমকে। তার কপালের তিনটি ভাঁজ আরও দৃশ্যমান হলো সেই বিরক্তিতে, “দেখতেই তো পাচ্ছো, টুপু! আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?”

 “ভাবি, আপনি হিমেলকে কিছু বলেন। মেজবাহ্ নিষেধ করে দিয়েছিলো না মেয়ে-বউদের গায়ে যেন বাড়ির ছেলেরা হাত না তোলে!”

  টুপুর নরম কণ্ঠের খবরদারিতে তাহমিনা বেগমের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো প্রায়। 
“কী বলব? আমার কথা শোনে সে? একেতো নিজেই পছন্দ করে এই মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছিলো। তা-ও না-হয় মেনে নিলাম। সেই নিজের পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ের পরপরই আর তার বনিবনা হয়না। আবার হাত তোলে। আমি কী বলব এখানে?”

  “কিন্তু এটাতো উচিত না, ভাবি। মেয়েটার দিনদুনিয়ায় এই বাড়ির মানুষগুলো ছাড়া আছেই বা কে? তাছাড়া এই কথা যদি মেজবাহ্'র কান অব্দি পৌঁছায় তাহলে তো সর্বনাশ হবে।”

  “মেজবাহ্, মেজবাহ্ জপো না তো, টুপু। যাও নিজের কাজে যাও। আমি আছি আমার জ্বালায়। এই মেয়েরওতো সংসারে মন নেই। বিয়ে করে আসার পর একটাবার বুঝতে চেয়েছে আমার ছেলে কী চায়, না চায়? কতবার বলেছি ও বাহির থেকে এলেই কিছু বলবে না। নিশ্চয় ও কিছু বলেছে বা করেছে। আমার ছেলেও তো আর এমনি এমনি হাত তোলার মানুষ নয়।”

 বড়ো ভাবির এমন উত্তপ্ত মেজাজে দমে এলো টুপু। মুখ ছোটো হয়ে এলো তার। ইচ্ছে করল রিমঝিমের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে। মেয়েটা কেমন অসহায়ের মতো বসে আছে সোফাটায়। একটু প্রতিবাদও করছে না! টুপুরতো মাঝে মাঝে মনে হয় তার চেয়েও বেশি অসহায় হলো রিমঝিম। তবুওতো সে মাঝে মাঝে দু'টো কথা মুখ ফুটে বলে কিন্তু এই মেয়েটা এই বাড়িতে পা দেওয়ার পর কখনো মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনি। যদিও সে জানে না বিয়ের আগে মেয়েটা এমনই নিশ্চুপ ছিলো নাকি তখন প্রতিবাদের ভাষা ছিলো তার। অবশ্য ভাগ্যতো দু'জনের কিছুটা একই ধরণের তাই বোধহয় রিমঝিমের জন্য টুপুর মায়াটা একটু বেশিই হয়।
 
 টুপু আলগোছে চলে যেতেই তাহমিনা বেগম একবার রিমঝিমকে দেখলেন। কয়েক সেকেন্ডের মতো রিমঝিমকে প্রত্যক্ষ করে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে কাজের মেয়েটাকে আদেশ করলেন,
 “ওকে একটা বরফ এনে দাও রেফ্রিজারেটর থেকে। গালে ঘষুক। বেসন, ডাল বেটে ওর মুখে লাগিয়ে দাও। চড়ের দাগটা চলে যাবে। নয়ত আরেক কাণ্ড বাঁধাবে এই মেয়ে খাবারের সময়তে। মেজবাহ্ তো অন্ধ হয়েই আছে এ বলতে।”
 শেষের বাক্যটা কিছুটা ধীরে বললেও রিমঝিমের কানে এসে পৌঁছালো ঠিক। নারীর চরিত্রের সঙ্গে এমন বাক্য সংঘর্ষিত বলেই হয়ত তার এতক্ষণে চোখ থেকে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এতটাই নিঃশব্দে যে ঘূণাক্ষরেই টের পায়নি কেউ। একমাত্র তার শাড়ির আঁচলটি বাদে।

—————

  সূর্য ডুবে এসেছে। বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে বৈশাখের উত্তপ্ত রোদটুকু। ধূলো উড়েছে পায়ের জুতো ছেড়ে খানিক উপরে। মেজবাহ্'র গাড়ি এসে থেমেছে নূরজাহান ক্লিনিকের সামনেই। গাড়ি থামতেই সর্বপ্রথম সিকান্দার নেমেছে। ও বোধহয় অপেক্ষাতেই ছিলো কখন গাড়িটা থামবে। নেমেই গিয়ে খুলে দিলো মেজবাহ্'র দিকের দরজাটা। ওদের গাড়ির পেছনে আরও একটি গাড়ি রয়েছে। গাড়ি জুড়ে থাকা পাঁচজন ছেলেও পরপরই নেমে এসে দাঁড়িয়েছে মেজবাহ্'র গাড়ির সামনে। 
 হুট করেই শান্ত রাস্তায় এতগুলো লোক দেখে হসপিটালের দারোয়ানগুলোসহ ভেতরের মানুষরাও কিছুটা অবাক হয়েছে। কৌতূহল নিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে সকলে তাকালো তাই। কে এমন এসেছে এতগুলো লোকবল নিয়ে! 

পরক্ষণেই গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো মেজবাহ্ শেখকে। মাথা ভর্তি চুলগুলো উল্টিয়ে আচড়ানো। যথারীতি মুখ-মন্ডলে স্পষ্ট ভাব। এই সন্ধ্যেতেও ভীষণ ফুরফুরে লাগছে তাকে। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, পিঠে ছড়িয়ে রাখা গাঢ় নীল রঙের চাদরটা! সিলেটের বাচ্চা থেকে বুড়ো এমন কেউ নেই যে চেনে না এই লোকটাকে। 

 মেজবাহ্ শেখকে দেখতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে গেলো। আশেপাশে থাকা লোকজনগুলো হুড়মুড়িয়ে কাছে ঘেঁষতে চাইলেই মেজবাহ্'র পাশে থাকা ওর দলবলগুলো আটকে দিলো তাদেরকে। মেজবাহ্ রুষ্ট হলো না মোটেও। সবার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, 
 “এটা হসপিটাল আপনারা এমন ভিড় জমাবেন না, হৈচৈ করবেন না। রোগীদের অসুবিধা হবে। আমি আপনাদেরই ঘরের ছেলে। এই মাটির ছেলেই। আমাকে দেখে এমন করবেন না।”

 ভিড় বেড়ে গেলো ক্রমশই। ভিড়ের ভেতরে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। এই ছেলেটার কথাগুলোতে এত মাধুর্যতা! কেমন করে ঘরের ছেলে বলল!

 হসপিটালের রিসেপশনিস্টদের সিনিয়র অফিসার ছুটে এলেন। কোন শুভক্ষণে মেজবাহ্ শেখ এখানটায় পা রেখেছেন! তার কিছু কম যেন না হয় দেখতেই ছুটে আসলেন। 
 “স্যার, কোনো অসুবিধা? আপনার কোনো আত্মীয় কি এখানে এডমিট? আমাদের কেবল নাম বলুন আমরা তাকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করব।”

  হড়বড়িয়ে কথা বলে থামলেন লোকটা। উনাকে দিশেহারা দেখাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে কী বললে মেজবাহ্ শেখের মন জয় করা যাবে তা যেন তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। খাতিরদারির পেছনে যেন কোনো কমতি না থাকে। 

 মেজবাহ্ থেমেছে হসপিটালের ভেতরটায় এসে। দুটো হাত পেছনে রেখে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল অফিসারটার মুখে। জলদগম্ভীর স্বরে বলল,
“এই হসপিটালে ভর্তি থাকা প্রত্যেকেই আমার আত্মীয়। প্রত্যেকেরই যেন সুচিকিৎসা নিশ্চিত হয় তা দেখবেন। তাছাড়া এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। আমার জনগণকে ভালো রাখবেন আপনারা, তাহলে এমনিতেই আমার কাছে ভালো হয়ে যাবেন।”

  অফিসারটা মাথা নাড়ালেন। সিকান্দার আগেই খোঁজ নিয়েছিলো কোথায় আছে ইমনদের কেবিন তাই সেই মোতাবেক সে আগে আগে হাঁটছে। তার পেছনেই আসছে মেজবাহ্ ও তার দলবল। অফিসারও সঙ্গে আছেন। যদিও তিনি বুঝতে পারছেন না মেজবাহ্ শেখের এমন কোন মানুষ ভর্তি আছে হসপিটালে যে সে স্বয়ং চলে আসছে। গত বছর তো ওর বড়ো চাচা ভর্তি ছিলো এখানেই তবুও এই লোকের একদিনও পা পড়েনি। তাহলে এরচেয়েও আপন আর কে আছে?

 যাবের শিকদারের হাতে ফাইল সমূহ। চোখ-মুখ কুঁচকে হন্তদন্ত হয়ে তিনি ছুটছেন। ছুটতে গিয়ে ধাক্কা খেলেন মেজবাহ্'র সঙ্গে। ব্যস্ততার মাঝে তিনি খেয়ালই করলেন না ধাক্কা খাওয়া ব্যক্তিটিকে। তবে মেজবাহ্ নরম রইল। হসপিটালে মানুষের আপন মানুষগুলোই যুদ্ধ করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সেই মুহূর্তে কারো মাথাই ঠিক থাকার নয়।
 যাবের শিকদার ব্যস্ত স্বরেই বললেন, “দুঃখিত দুঃখিত, খেয়াল করিনি।”
 
 সিকান্দার থেমে গিয়েছে। হয়ত কিছু বলত ও। কিন্তু মেজবাহ্ হাতের ইশারায় এগিয়ে যেতে বলে যাবের শিকদারের পিঠে হাত রেখে শান্ত ভাবে বলল,
 “ধীরেসুস্থে যাবেন। আপনি নিজেও ব্যথা পেতেন পারতেন হয়ত!”

যাবের শিকদার নরম চোখে চারপাশের লোকবলকে দেখলেন। চোখ গিয়ে ঠেকল মেজবাহ্'র দিকে। এতক্ষণ তিনি খেয়াল করেননি মেজবাহ্কে। এখন দেখতেই চমকে গেলেন প্রায়। মেজবাহ্কে চেনে না এমন কেউ তো নেই। সংবাদপত্রে দু'দিন পর পরই ছেলেটার ছবি ছাপে। বড়ো বড়ো শিরোনামে তাে তার দুর্ধর্ষতার কথা লিখা হয়। তার বল, তার অহংকার নিয়ে কথা হয় কোর্টে অব্দি। 

  যাবের শিকদার কিছু বলবেন তার আগেই পেছন থেকে ছুটে আসে একটি মেয়েলি কণ্ঠ। জোহরা তাড়া দিয়ে বাবাকে ডাকে, 
“বাবা, সবাই অপেক্ষা করছেতো। আসো..”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp