কালান্তরের কন্যা - পর্ব ১৭ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
          কাজলীদের রান্নাঘরের কোণে ছোট্ট একটা কুঠুরি আছে। দেখতে অনেকটা স্টোর রুমের মতো। 

ওদের বাড়িটার অবস্থা দেখলে যে কারোরই প্রথমে তালি দেওয়া কাপড়ের কথা মনে পড়বে। ভাঙাচোরা অংশগুলো জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে খাড়া করে রাখা হয়েছে। শোয়ার দুটি ঘর আর বাথরুমটা পাকা হলেও, রান্নাঘরটি সম্পূর্ণ টিনের তৈরি। মূল ঘরের দেয়ালের সঙ্গে কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে ওটাকে দাঁড় করানো হয়েছে। সিমেন্টের প্রলেপ দেয়া রান্নাঘরের মেঝে সময়ের আবর্তে কালচে হয়ে গেছে। পাপোশ হিসেবে বিছিয়ে রাখা হয়েছে চটের বস্তা।

ওদের বাড়িটা প্রায় দশ শতাংশ জমির ওপর। ঝিলপাড়ে যারা নিজেদের নিজস্ব জমিতে বাড়ি বানিয়ে থাকে, তারা সবাই এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। সবাই একই গোষ্ঠীর মানুষ, কোনো না কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে তাদের বংশ পরস্পর মিলে যায়। একমাত্র কাজলীরাই সম্পূর্ণ বাইরের মানুষ।

গল্পটা বেশ পুরোনো। এখানে দুই কাঠা জমি ছিল এক প্রবাসী ভদ্রলোকের। সেই প্রবাসীর ছোট মেয়েকে একসময় প্রাইভেট পড়াতেন কাজলীর দাদা। পরবর্তীতে প্রবাসীর পুরো পরিবার যখন স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা তাড়াহুড়ো করে কম দামে জমিটা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। দামটা হাতের নাগালের মধ্যে থাকায় কাজলীর দাদা নিজের কষ্টার্জিত জীবনের সবটুকু সঞ্চয় এক করে দশ শতাংশ জায়গা কিনে নিয়েছিলেন। বাকি অংশটুকু কিনে নিয়েছিল সওদাগররা।

বস্তিতে নিজেদের নিজস্ব জমি থাকা সত্ত্বেও কাজলীরা কোনোদিন গৃহমালিকের সম্মান পায়নি। চারপাশের বিত্তবান আর প্রভাবশালী মানুষদের ভিড়ে দারিদ্র্যের কারণে সমাজ ওদের সবসময় সাধারণ উচ্ছেদযোগ্য ভাড়াটিয়াদের মতোই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এসেছে। 

বাইরের তীব্র রোদ আর দমবন্ধ করা পচা দুর্গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে টিনগুলো কোনোমতে টেনেটুনে, জোড়াতালি দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের ভেতর ঢুকলেন জোহরা। কপাল বেয়ে নেমে আসা নোনতা ঘামটুকু হাতের উল্টো পিঠে মুছতে মুছতে চারদিকে তাকালেন। 

 কোথাও কাজলীকে দেখতে না পেয়ে ক্যাটক্যাট করে উঠলেন, “কাজলী কই? ঘরে দেখি না যে ওরে?”

হুইলচেয়ারে বসা মারিয়াম জানালার বাইরে চোখ রেখে উদাসীন গলায় বলল, “কই জানি গেছে, জানি না।”

“ওরে আমি কতবার না করছি ঘরের বাইরে এক পা-ও না বেরোইতে!”

“ও তো তোমার কথা হুনতেই বইয়া থাহে! কোনোদিন হুনছে ও তোমার কথা?”

বলতে বলতে মারিয়াম নিজের পা দুটো বিছানার উপর সোজা করে ছড়িয়ে দিল। বুকের ভেতরটা গত রাত থেকেই কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে; কোনো কিছুতেই মন থিতু হচ্ছে না, কোথাও একটুও শান্তি পাচ্ছে না। 

 শেষ রাতের দিকে একটা ভয়ানক কুৎসিত স্বপ্ন দেখে ধড়ফড় করে জেগে উঠেছিল। 

স্বপ্নে দেখে, কোল আলো করে ওর একটা ফুটফুটে সন্তান এসেছে। হাসপাতালের নার্স যখন বাচ্চাটাকে কোলে এনে দেয়, মারিয়াম বাচ্চার গায়ের নরম কাঁথাটা সরিয়ে মুখটা দেখামাত্রই আতঙ্কে শিউরে ওঠে। শিশুর বদলে একটা কুচকুচে কালো পাথর পড়ে আছে!

তখন থেকেই ওর মন-মেজাজ খারাপ। তার ওপর আজ সকাল থেকে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। মাথার ওপর ঝুলতে থাকা ফ্যানটা বাতাস দেওয়ার চেয়ে ঘড়ঘড় শব্দই করছে বেশি। গায়ের পাতলা সুতির মেক্সিটা বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। একদিকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপ। শরীরে যে এখনো প্রাণটুকু টিকে আছে, সেটাই অনেক।

সুমাইয়া হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে বলল, “নানু, ঝুনু দাদি আপনারে ডাকতাছে।”

জোহরা অবাক হয়ে বললেন, “কেন? কী অইছে?”

মারিয়াম জানালার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল। সুমাইয়া মাথা নেড়ে বলল, “জানি না। কী জানি একটা হইছে।”

এক বুক শঙ্কা নিয়ে জোহরা দ্রুত ঘরের বাইরে পা বাড়ালেন। কাজলী আবার নতুন কোনো ঝামেলা পাকিয়ে বসেনি তো! মায়ের এভাবে চলে যাওয়া দেখে মারিয়ামের ভেতরের অস্থিরতা এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। ও হুইলচেয়ারে বসেই ছটফট করতে করতে চিৎকার করে বলল, “আমারে লইয়া যাও আম্মা! আমারেও লগে লইয়া যাও!”

জোহরা ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে গেছেন।

 ঝুনুবিবির বাড়ির উঠানটায় পা রাখতেই দেখলেন, চারপাশটা মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করছে। একটা ধুন্ধুমার ঝগড়াঝাঁটি বাঁধবে সেই আশায় বস্তির একপাল মানুষ হাঁ করে উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশের কোথাও কাজলী নেই। কাজলীই যদি না থাকে, তবে ওনাকে ডাকল কেন? ঝুনুবিবির ঠিক পাশেই ঝিলমিল আপা কোমরে কাপড় গুঁজে মারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোহরার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল, পায়ের গতিটাও আপনা-আপনিই থিতিয়ে এলো। কী হয়েছে এখানে?

জোহরাকে আসতে দেখেই ঝুনুবিবি গলার রগ ফুলিয়ে চিল্লিয়ে উঠলেন, “জোহরা! এতদিন যা নচ্ছাড়পনা করছ সব সহ্য করছি। কিন্তু এখন যেডা কানে আইছে, সেইডা কিন্তু আমি কোনোমতেই মাইনা নিমু না।”

জোহরা কিছুটা থতমত খেয়ে বললেন, “কী করছি? আমারে ডাকছেন ক্যান?”

“তোমার মাইয়ার ডেঙ্গুর চিকিৎসা কে করাইছে?”

কথাটা শুনে জোহরা একটু থমকালেন। মনের ভেতরের খটকাটা চাপা দিয়ে জোর গলায় বললেন, “ক্যান? আমরাই করছি। আমাগোর মাইয়া, চিকিৎসা আমরা করুম না তো কে করব?”

ঝুনুবিবি তাচ্ছিল্য করে খ্যাকখ্যাক করে হাসলেন, “এই কতাও এহন আমাগোর বিশ্বাস করতে হইব? পাঁচশো ট্যাহার দরকার পড়লে যে বেডি সবার ঘরে ঘরে ট্যাহার লাইগা হাত পাইতা ঘোরে, হে নাকি এহন মাইয়ার ডেঙ্গুর চিকিৎসা করাইছে! তাও আবার নামী-দামী পাইভেট হাসপাতালে! তা অত ট্যাহা আইল কই থিকা।”

জোহরাও দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি তেজ দেখিয়ে বললেন, “ওর কেমনে চিকিৎসা অইছে, কার ট্যাহায় অইছে ওইডা জাইনা আপনার কী? আমার মাইয়ার চিকিৎসা আমি চুরি কইরা করছি, না ভিক্কা কইরা করছি, ওইডা আমার বেপার।”

ঝুনুবিবি বুড়ো আঙুল ঝাঁকিয়ে, চোখমুখ বিকৃত করে খেঁকিয়ে উঠলেন, “তোর ওই ছেনাল মাইয়ার চিকিৎসা কেমনে করছস, সেইডা জানতে আমার বা* ছেঁড়া গেল! তোরা আমার সোনার টুকরা পোলার থিকা ট্যাহা নিছস ক্যান? এ ফকিন্নি! এ মা**! এ হিজড়া মাতারি! তোগোর কি একটু লজ্জাশরমও লাগে না?”

কথাটা শুনে জোহরা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। এক্কেবারে হতভম্ব হয়ে বললেন, “কার থাইকা ট্যাহা নিছি?”

“নাটক দেহাইস না জোহরা! আমার আশিকের থাইকা তোরা ট্যাহা নেস নাই?”

জোহরা কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে ঝুনুবিবির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতর জমানো থমথমে ভাবটা চট করে কেটে গেল। তিনি হুট করেই হেসে ফেললেন। আশেপাশের উৎসুক মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “কী কইলেন? আশিক দিছে? আপনের ছ্যামড়া আশিকের থাইকা ট্যাহা নিছি?”

তিনি আরও এক দফা হাসলেন। 

ঝুনুবিবি রাগে, বিস্ময়ে ক্ষণিকের জন্য বাকহারা হয়ে রইলেন। এটা কোন জোহরা?

জোহরা হঠাৎ নিজের হাসি থামিয়ে দিলেন। মুখাবয়ব কঠিন করে জীবনে প্রথমবার ঝুনুবিবির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, “আমার ছেড়ি যদি মইরাও যাইত তাও আশিকের থাইকা ট্যাহা নিতাম না। ওর মতো পিশাচ কেউয়ের চিকিৎসা করাইতে পারে না৷ খালি মারতেই পারে।”

ঝুনুবিবি রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন, “জোহরা মুখ সামলা, জিভ টাইন্যা ছিইড়া ফালামু।”

জোহরা বিন্দুমাত্র না দমে পাল্টা জবাব দিলেন, “আপনিও তাইলে বুইঝা শুইনা কথা কন। মিচা কথা তুইলা দিতাছেন কেন? হাচা কথা কইয়া পারলে কিছু কইরা দেখান।”

“আশিক তাইলে হাসপাতালে গেছিলো কেন?”

 ঝুনুবিবির গলায় এবার কিছুটা সংশয়ের সুর ফুটে উঠল।

জোহরা ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “কহন গেছে?”

প্রশ্নটা শুনে ঝুনুবিবি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ির দিকে চাইলেন। বৃদ্ধা আত্মবিশ্বাস নিয়ে গলা উঁচিয়ে বললেন, “তোমার ছেড়ির ডেঙ্গুর সময়৷ আমি নিজের চোখে দেখছি আশিক কাজলীর ধারে বইয়া আছলো। আমি তহন উইমেন হাসপাতালে আছিলাম।”

জোহরা বেরোতেই একই সময় কাজলী বাড়ি ফিরেছিল। মারিয়ামের মুখ থেকে যখন ও শুনল, ঝুনুবিবি জোহরাকে ডেকে পাঠিয়েছে, ওর বুকের ভেতরটা ভয়ে দুরুদুরু করে উঠল। কাঁধের ব্যাগটা ঘরে রেখেই মুখের নিকাব খুলে তড়িঘড়ি করে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। উদ্বিগ্ন মারিয়াম ওর হাত চেপে ধরে অনুরোধের সুরে বলল, “আমারে লইয়া যা৷”

কাজলী ওর হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল, “তুই থাক আপা৷ তোর শরীর ভালা না।”

মারিয়াম এবার প্রায় কেঁদেই দিল, “এইনে আমি মইরা যামু চিন্তায়৷ আমারে লইয়া যা। আল্লাহর দোহাই লইয়া যা।”

বোনের আকুতি-মিনতি দেখে কাজলী আর না করতে পারল না। ও দ্রুত মারিয়ামের হুইলচেয়ারটা ঠেলে ঝুনুবিবির বাড়ির উঠানের দিকে হাঁটা ধরল। যখন ওরা উঠানটার কাছাকাছি এসে পৌঁছাল, দূর থেকেই শেষ কথাগুলো কাজলীর কানে গেল। 

 ও ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে বুড়িকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনের চোখ আছে? দেখছেন যে?”

বলতে বলতে কাজলী হুইলচেয়ারটা একপাশে রেখে সবার সামনে এসে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল৷ 

বৃদ্ধা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, “কী কইলি তুই? আমার চোখ নাই?”

কাজলী বুড়ির চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, “না, নাই। এই চোখ দিয়া যখন ভালো কিছু দেখতেই পারেন না, একেবারে বন্ধ কইরা দেন না কেন?”

তারপর ঝুনুবিবির দিকে তাকিয়ে বলল, “বুড়ির কথা আপনি কেমনে বিশ্বাস করলেন? আমার প্রতি আপনার রাগ থাকতে পারে, সেজন্য এই মাথা খারাপ বুড়ির আজগুবি কথাও বিশ্বাস করতে হইব? তাইলে তো উনার মুখের সব কথাই আপনার বিশ্বাস করা উচিত। উনি আপনারে নিয়া হাটে-বাজারে কী কী বইলা বেড়ায়, জানেন তো? বিলপাড়ের কচুবনে নাকি আপনারে কোন এক বেডার লগে দেখা যায়! চাচা বাড়িতে না থাকলে আপনার ঘরে নাকি গভীর রাইতে কাঞ্চন চাচা আয়! বুড়ির কথাই যদি সত্য হয়, তাইলে এগুলোও সত্য?”

কথাটা শোনামাত্রই ঝুনুবিবি অপমানে, রাগে রি রি করে উঠলেন। বৃদ্ধা সত্যিই যে কুৎসা রটায়, সেটা বস্তির সবারই জানা। শুধু ঝুনুবিবিকে নয়, সুযোগ পেলেই সবাইকে নিয়েই এমন আন্দাজে নোংরা কথা বলেন। 

 ঝুনুবিবি অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কী কইলি তুই? আবার ক! তোর বুকে উইঠা পাড়া মাইরা এক্কেবারে দম বাইর কইরা দিমু!”

কাজলী ঠাণ্ডা গলায় বলল, “আমি কমু কেন? বুড়িই তো বলে৷ বিশ্বাস না হইলে জিগান, জিগান বস্তির মানুষরে।”

এরপর জোহরার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “ঘরে যাও, আম্মা। হাঁটো।”

বলেই কাজলী যেই না মারিয়ামের হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে চলে যাবে, অমনি পেছন থেকে ঝুনুবিবি বললেন, “তাইলে এত ট্যাহা তোরা কই পাইলি কাজলী? প্রাইভেট হাসপাতালে তো অনেক টেহা লাগে। কই পাইছস এত টেহা?”

কাজলী থমকে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “সেটা জেনে আপনার কী কাজ?”

“কী এমন গোপন কাম করছস যে মুখে কওন যায় না? মা-বইন সব মিইলা কি শরীর বন্ধক রাখছস?”

 কাজলীর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝুনুবিবির চোখের দিকে চোখ রেখে কাঠকাঠ গলায় বলল, “সবাইরে নিজের ছেলের মতো লম্পট মনে করেন?”

হুইলচেয়ারে বসা মারিয়ামও এবার নিজেকে সামলাতে না পেরে ফোড়ন কাটল, “আপনের নিজের গু কালা দেইখা কি দুনিয়ার সবার গু কালা হইব?”

ঝিলমিল আপা মুখ ভেঙচিয়ে বলল, “তোগোর গু তাইলে গোলাপি?”

ভিড়ের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন ঠোঁট চেপে ফিক করে হেসে উঠল। কাজলী বিরক্তি নিয়ে মারিয়ামের দিকে তাকাল। এই এক স্বভাব আপার, গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, তবুও পেটে যা আসে মুখে বলে ফেলে। কিসের মধ্যে কী কথা টেনে আনল!

ঠিক তখন ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মুরব্বি গোছের মানুষ এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বললেন, “দেখ কাজলী, তুই আমগোর বস্তির মাইয়া। তোরে আর তোদের পরিবাররে আমরা অনেক বছর ধইরা ভালা কইরা চিনি৷ তোদের তো পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নাই৷ কোনো পুরুষ গার্জিয়ানও নাই৷ তোদের ঘরে শেষ সম্বল বেঁচার মতোও কিছু আছিলো না৷ যা আছিল, সবই তো অভাবের তাড়নায় বেইচা দিছস৷ বস্তির মানুষই তো সেসব কিনছে৷ তাইলে রাতারাতি এত টাকা তোরা কই পাইলি? আকাশ থিকা পড়ছে?”

কাজলী মুরব্বির দিকে তাকিয়ে বলল, “যখন আমরা না খাইয়া কষ্টে থাকি, যখন আমগোর ওপর অন্যায়-অত্যাচার হয়, তখন তো আপনারা কেউ খোঁজ নেন না৷ তাইলে এখন টাকার খোঁজে এত মাথা ঘামাইতেছেন কেন চাচা?”

মুরব্বি মুখটা কালো করে বললেন, “তাইলে মাইনসের কথাই ঠিক। তুই বড়লোকের বাড়ি ছাত্র পড়াতে যাওয়ার নাম কইরা আসলে ধনী বেডা ধরতে যাচ। ওরাই তোরে গোপনে এত টাকাপয়সা দেয়।”

কাজলী হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই অন্ধ ও ঈর্ষাতুর সমাজকে সত্য বোঝানো বৃথা। ও ক্লান্ত গলায় বলল, “আপনাদের যা ইচ্ছা তাই ভাবেন। তাতে আমার যায় আসে না। আম্মা, চলো।”

জোহরা না ঘুরে উল্টো টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠলেন, “আমার ছেড়িরে তোমরা এহনো চিনো নাই। আমার ছেড়ির মতো পাক-পবিত্র ছেড়ি এই গোটা বস্তিতে আর একটাও নাই। ও জীবনে কারো দয়া নেয় নাই। ওর নখের যোগ্যতাও তোমরার কারো নাই। আমরা কারো থাইকা হাত পাইতা চাইয়া ট্যাহা নেই নাই৷ নিজে যেচে আমরারে সাহায্য করছে। আমার ছেড়ি ওই ট্যাহাও সুদে-আসলে ফেরত দিয়া দিব।”

মায়ের মুখে এমন কথা শুনে কাজলীর মনের গহীনে এক টুকরো নরম মেঘ ভেসে বেড়াতে লাগল। ও প্রচণ্ড বিস্ময় নিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জোহরাকে ও কখনো এভাবে প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে দেখেনি! মায়ের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শোনার ভাগ্যও ওর কোনোদিন হয়নি!

 কাজলী যদি তখন জানত জোহরা এর ঠিক পরক্ষণেই ইউসুফের নাম প্রকাশ করে দেবেন, তবে ও যেকোনো মূল্যে মায়ের মুখটা চেপে ধরত। জামিলের কাছ থেকে ও আগেই শুনেছে, ইউসুফ বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এই সত্যটা যদি সবার সামনে প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে ইউসুফের সম্মানহানি হবে। 

জোহরা ততক্ষণে নিজের আবেগের তোড়ে ভেসে গেছেন। তিনি বুক ফুলিয়ে চড়া গলায় সবাইকে শুনিয়ে বলে দিলেন, “আমরা কোনো পাপ করি নাই যে ডরায়া মুখ বন্ধ রাখতে হইব। আমার মাইয়ার চিকিৎসার ট্যাহা ওই ধলা বিল্ডিঙের কুরেশি বাড়ির ছেড়া দিছে। তোমরা কাজলীরে হিংসা করো, ওরে দুইচোখে দেখতে পারো না; কিন্তু বড়ঘরের রুচিশীল মানুষরা ওরে পছন্দ করে, ওরে বিশ্বাস করে। আমার ছেড়ির মনের ভিতরে কোনো কাদা নাই যে সেইডা ওরা জানে। আমার ছেড়ি এই জমানার লাখে একটা।”

জোহরা কথা শেষ করতেই চারপাশের হৈচৈপূর্ণ জটলাটায় এক লহমায় পিনপতন নীরবতা নেমে এলো! কুরেশি বাড়ির ছেলে! তার মানে আল মুরতাজার একমাত্র উত্তরসূরি, ইউসুফ আল মুরতাজা কুরেশি? যারা কখনো ভুলেও বস্তির ত্রিসীমানায় পা মাড়ায় না, সবসময় বস্তিবাসীকে এড়িয়ে চলাই যাদের স্বভাব এবং শহরের নামী-দামী অভিজাত মানুষরা যাদের আত্মীয়; সেই বাড়ির রাজপুত্রের মতো দেখতে ছেলেটা কাজলীর চিকিৎসার খরচ চালিয়েছে? 

উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক জনতার একজনও কথাটি হজম করতে পারল না।

ঝুনুবিবি বিস্ময়ে থতমত খেয়ে বললেন, “কী কইলি? তোর ছেড়ি কি এহন কুরেশি পোলারে ধরছে? ওই পোলার লগে ওর পেম চলে?”

কাজলী ভীষণ রাগ নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ওরা তো চাইলে অন্য কোনো অজুহাতও দিতে পারত! বড় ভাই টাকা পাঠিয়েছে বললেও তো চলত! কিন্তু জোহরা সরল মনে, বস্তিবাসীর সামনে বড়ঘরের মানুষ তাদের পাশে আছে এই অহংকারটুকু জাহির করতে গিয়ে সত্যটাই ফাঁস করে দিলেন!

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কুরেশি বাড়ির কাজের মেয়েটার হাত-পা কেমন যেন ঝিম মেরে এলো। ইউসুফের মতো নিষ্পাপ, সরল সোজা ছেলেটাকে এই ডাইনিগুলো এভাবে কেলেঙ্কারিতে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে! 

আর এক মুহূর্তও সে ওখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। চটজলদি পা চালিয়ে দ্রুত কুরেশি বাড়ির দিকে রওনা হলো। দৌড়াতে দৌড়াতে কুরেশি বাড়ির পুকুরঘাটের পাশে আড্ডারত মানুষগুলোর মাঝে গিয়ে পৌঁছাল। সাবিনাকে উদ্দেশ্য করে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “খালাম্মা, বস্তিতে ঝামেলা লাগছে৷ কাজলী আর কাজলীর মা ইউসুফ ভাইরে নিয়া বদনাম রটাইতাছে। বস্তির সবার সামনে চিল্লাইয়া কইতাছে, ইউসুফ ভাই নাকি কাজলীর লগে প্রেম করে, ওরে লাখ লাখ টাকা দেয়!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp