কালান্তরের কন্যা - পর্ব ১৮ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
          বস্তিবাসীকে কোনোমতে রুখে দিয়ে মারিয়ামের হুইলচেয়ারের হাতলদুটো শক্ত করে ধরে জোহরাকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল কাজলী। রোডে পা রাখতেই সামনের দৃশ্য দেখে হিমশীতল স্রোত ছড়িয়ে পড়ল ওর শিরা-উপশিরায়। 

কুরেশি পরিবার আসছে। সাথে বেশ কয়েকজন অচেনা মানুষ। পোশাক-আশাক দেখে মনে হচ্ছে রাজকুমারীর অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বিত্তশালী অতিথিরা।

কাজলীর পায়ের গতি মন্থর হয়ে এলো। ওর সিক্সথ সেন্স বলছে, কিছু একটা ঘটবে। জীবনে তো কম ঝড়ঝাপটা যায়নি, হারানোর বাকিই বা কী আছে? তবু অজানা আশঙ্কায় মন কুঁকড়ে গেল। ও জানে না ঠিক কী ঘটতে চলেছে, কিন্তু অবচেতন মন বলছে, খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে।

দূর থেকে কাজলী তার বোন আর অসুস্থ মাকে দেখে সাবিনার কপাল কুঁচকে কুৎসিত আকার ধারণ করল। অপমানে, ক্ষোভে তার সারা শরীর রি রি করছে। 

মেয়ের সম্ভ্রান্ত, প্রভাবশালী শ্বশুর-শাশুড়ি এই প্রথম বাড়িতে এসেছে। এসেই শুনল বাড়ির ছেলের সম্পর্কে এত বড় অপবাদ! কাজলীর মতো একটা চরিত্রহীন মেয়ে তার ছেলের চরিত্র নিয়ে এত বড় কথা ছড়ায়! এই ধৃষ্টতা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিবেন না। এসব যে গুজব, ছলচাতুরী সেটা প্রমাণ করতেই তিনি তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছেন।

কাজলীকে দেখে সাবিনার মনে হলো সামনে কোনো নোংরা ইঁদুর দাঁড়িয়ে আছে। ঘৃণায় তার হাত নিশপিশ করে উঠল। ইচ্ছে হলো এখনই গিয়ে মেয়েটার গালে শক্ত একটা চড় বসিয়ে দিতে।

সাবিনা ক্ষোভে ফেটে পড়ে কিছু একটা বলতে যাবেন, পাশ থেকে শবনম মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। আড়চোখে একবার শ্বশুর-শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে নিল ও। মানুষ দুটো ভীষণ গম্ভীর আর আত্মকেন্দ্রিক, সহজে কারও সাথে মেশেন না। মায়ের মুখ থেকে হাটে-বাজারের মতো চিল্লাচিল্লি, গালিগালাজ শুনলে তারা যে ফিরে গিয়ে বংশমর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, তা শবনম খুব ভালো করেই জানে।

নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে শবনম এক কদম এগিয়ে গেল। কাজলী ভদ্রতাসূচক সালাম দিলে সেটার কোনো উত্তর না দিয়ে, চিবুক শক্ত করে সরাসরি প্রশ্ন করল, “ইউসুফ আর তোমার মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, তার কোনো প্রমাণ তোমার কাছে আছে?”

এমন আকস্মিক প্রশ্নে কাজলী স্তব্ধ হয়ে গেল, ওর চোখ-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

ও কিছু বলার আগেই ইউসুফের বড় বোন সুরমা হিংস্র গলায় গর্জে উঠল, “সোজা কথায় উত্তর দিবি! প্রমাণ ছাড়া যদি একটা বাড়তি কথা বলিস, তোকে তোর পঙ্গু বোনসহ মাকে মাটিতে পুঁতে ফেলব।”

অপমানে কাজলীর মুখটা থমথম করে উঠল। ও নিজেকে সামলে স্পষ্ট গলায় জবাব দিল, “কীসের প্রমাণ? আমি তো একবারের জন্যও দাবি করিনি যে আপনাদের ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক আছে!”

কুরেশি পরিবারের সাথে কাজলীর মুখোমুখি হওয়ার খবরটা মুহূর্তের মধ্যে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো বস্তিতে। পলকের মধ্যে ঝুনুবিবির উঠান জনশূন্য হয়ে গেল। কৌতূহলী বস্তিবাসী দলে দলে এসে ভিড় জমাল রোডে।

সাবিনার পাশে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিল সিমরান। ও মনে মনে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়েছে। ইউসুফ যে বাড়ি থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সরিয়েছে এবং সেই টাকা কোনো এক মেয়ের পেছনে খরচ করেছে এ খবর কেবল তারই জানা। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না, সেই মেয়েটি কাজলী! 

সিমরানের বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। সত্যটা যদি প্রকাশ পেয়ে যায়, কুরেশিদের গায়ে কলঙ্ক লেগে যাবে। তাছাড়া, ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ যদি এই ঝামেলার ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দেয়, মুহূর্তেই সেই ভিডিও দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে যাবে। এমনিতেই কাজলীকে নিয়ে নানা কন্ট্রোভার্সি। সিমরান সতর্ক চোখে চারপাশে তাকাল। মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ইউসুফের আরেক বোন মারমুখো ভঙ্গিতে কাজলীর দিকে দুই পা এগিয়ে গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “পুরুষ মানুষ ছাড়া কি তোর একদিনও চলে না? নামের সাথে সবসময় কোনো না কোনো পুরুষকে জড়িয়ে রাখা চাই-ই চাই? এখন আমার ভাইটার পেছনে লেগেছিস? ও একটু নরম মনের দেখে ভেবেছিস পার পেয়ে যাবি? আমাদের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিবি, এত বড় সাহস তোর!”

এত ঝড়ঝাপটা আর অপবাদের ওপর দিয়ে যাওয়া কাজলীর স্নায়ু এখন আর সহজে উত্তেজিত হয় না। বারবার ভাঙতে ভাঙতে ওর ভেতরটা পাথর হয়ে গেছে। এখন আর কোনো কটু কথাই ওর গায়ে লাগে না। কুরেশি পরিবারের তর্জন-গর্জনও ওর কাছে বিড়ালের মিউমিউয়ের মতোই শোনাচ্ছে।

ওর আসল ভয়টা অন্য জায়গায়। মনে মনে ভয় পাচ্ছে, ইউসুফকে নিয়ে। লোকটা মায়ার খাতিরে টাকা দিয়ে ওর চিকিৎসা করিয়েছে, নতুন একটা জীবন দিয়েছে। যদি সেই মানুষটা ফেঁসে যায়? যদি সেই মানুষটার সম্মানহানি হয়? কাজলী আর যা-ই হোক, অকৃতজ্ঞ নয়।

ও নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু আড়াল করে নিরেট গলায় বলল, “আপনাদের ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনারা ভুল শুনেছেন।”

কাজলীর স্বীকারোক্তি শুনে সাবিনার বুকের ওপর থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। মুহূর্তে তার গলার জোর বেড়ে গেল। তিনি আড়চোখে আশ্বাসের দৃষ্টিতে শবনমের শ্বশুরের দিকে তাকালেন। চোখে-মুখে এমন একটা ভাব ফুটিয়ে বোঝাতে চাইলেন, তারা কতটা ধোয়া তুলসী পাতা। এখন কাজলীর মুখ থেকে যা বেরিয়েছে সেটাই আসল সত্য!

এরপরই তিরের মতো তীক্ষ্ণ চোখে কাজলীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফেটে পড়লেন, “এতক্ষণ তাইলে বস্তির মানুষজনের কাছে কী বলছস? মিথ্যা রটাইছস কেন? কী চাইছিলি? মতলবটা কী তোর?”

সবার মুখের ওপর একবার শান্ত দৃষ্টি বোলাল কাজলী। তারপর চিবুক শক্ত করে বলল, “কেউ একজন তিলকে তাল বানিয়ে আপনাদের কাছে গল্প সাজিয়েছে। আমি বা আমরা কেউ এমন কোনো কথা কোথাও বলিনি।”

ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলেন ঝুনুবিবি। পান-খাওয়া কালচে দাঁতগুলো বের করে, কোমরে হাত দিয়ে বললেন, “আহা রে, কী আমার সতী সাধ্বী রে! সম্পর্ক যদি না-ই থাহে, তয় ওই পোলার অত দরদ উথলাইয়া উঠল ক্যা? পাইভেট হাসপাতালের অত টাকার বিল যে উনার পোলা গুইন্যা গুইন্যা দিয়া আইলো, এইডা কি উনারা জানে? না জানলে জাইন্যা লন!”

দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনটা মাত্রই একটু নিভে আসছিল, ঝুনুবিবির কথা যেন সেই আগুনে এক বালতি ঘি ঢেলে দিল। চারপাশের ফিসফিসানি মুহূর্তেই জোরালো কোলাহলে রূপ নিল। অসহায়ত্ব ভর করল কাজলীর ওপর। যদি ও এখন হাসপাতালের বিল দেওয়ার কথা অস্বীকার করে, তবে জোহরা সবার সামনে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবে। আর যদি সত্যটা স্বীকার করে নেয়, তবে কুরেশিদের সামনে ফাঁস হয়ে যাবে ইউসুফের টাকা চুরির সত্যটা! ও গলার জোর যতটা সম্ভব বাড়িয়ে, নিজেকে ভেতর থেকে টেনেটুনে শক্ত রেখে বলল, “আমি বলছি তো, আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই! আপনারা কেন আমার কথা বিশ্বাস করছেন না? আপনাদের বাড়ির ছেলের সাথে আমার প্রেম-ভালোবাসা তো দূর, বন্ধুত্বও নেই। আপনাদের কেউ ভুল বুঝিয়েছে, প্লিজ আমাকে যেতে দেন।”

সুরমার খটকা লাগল ঝুনুবিবির কথায়। সে ঝট করে সাবিনার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় প্রশ্ন করল, “আম্মা, ইউসুফ কি বাড়ি থেকে বা আলমারির লকার থেকে বড় অঙ্কের কোনো টাকা-পয়সা সরাইছে? তোমার কিছু মনে পড়ে?”

সাবিনা জোর দিয়ে মাথা নেড়ে না করলেন, “না তো! ও তোর আব্বার ব্যাংক কার্ড নিয়ে শুধু নিজের কয়েকটা জামাকাপড় আর রাজকুমারীর জন্য একটা গিফট কিনছিল। এছাড়া তো বড় কোনো বাড়তি খরচ ওই কার্ডে দেখায় নাই। ব্যাংকের মেসেজ তো সব আমার ফোনেই আসে।”

ঝুনুবিবি সুরমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “তাইলে এই মা-ঝি মিইল্যা মিছা কথা কইছে! এতক্ষণ ধইরা তো এরা বস্তিশুদ্ধা মানুষের কাছে গলা ফাডাইয়া কীর্তন গাইতাছিল, আপনাদের বাড়ির পোলা নাকি হের মাইয়ারে যমের দুয়ার থেইকা ফিরাইয়া আনছে, লাখ লাখ ট্যাহা খরচ করছে!”

ঝুনুবিবির দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় খ্যাঁত করে উঠল জোহরা, “হাচা কথাই কইছি আমি! এতগুলা ট্যাহার ব্যাপার, নিজের থেইকা বানায়া বানায়া কইয়া আমার কী লাভ?”

এরপরই তিনি সুরমা আর সাবিনার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর কিছুটা নরম করে অনুনয়ের সুরে বললেন, “আপনাদের ছেড়া অসহায় গরীব মানুষরে বিপদে সাহায্য করছে, আল্লাহর ওয়াস্তে সওয়াব কামাইছে। মানুষের উপকার করা কি পাপ? এইহানে খারাপের তো কিছু দেহি না আম্মা! আপনেরা এমনে রাগ কইরা চিল্লাইতাছেন ক্যা?”

ভিড়ের মধ্য থেকে মুখ বাড়িয়ে উস্কানি দিল ঝিলমিল আপা, “জোহরা রে জোহরা, দুনিয়াডা অত সোজা না! বস্তিতে তো কত মানুষেরই কত অসুখ-বিসুখ অয়, কতজন হাসপাতালে পইড়া থাহে। তহন তো ওই বড়লোকের পোলারে সওয়াব কামাইতে দেহি নাই! তোমার মাইয়ার বেলাই তার সওয়াবের জোয়ার উথলাইয়া উঠল ক্যা? ভেতর-ভেতর কোনো মেলামেশা না থাকলে কেউ এই জমানায় এমনে ট্যাহা ঢালে না, বুঝলা?”

ঝিলমিল আপার মন্তব্যে সুরমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঝিলমিলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠল, “মুখ সামলে কথা বলুন! কীসের সম্পর্ক? কার সম্পর্ক? আমার ভাই বস্তির একটা ফালতু, চরিত্রহীন মেয়ের সাথে লটরপটর করবে? ওর কি রুচির এতই আকাল পড়েছে যে এর পেছনে টাকা ঢালবে?”

বলেই মাটিতে থুথু ফেলল সুরমা।

এতকিছুর মধ্যেও কাজলীর মুখের অবয়বে কোনো পরিবর্তন এলো না। ও সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন। কোনো অপমান, কোনো কটু কথাই ওকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না। ওর মাথায় কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, কীভাবে ইউসুফকে এই ঝামেলা থেকে বাঁচানো যায়৷ 

শবনমের হবু শ্বশুর এতক্ষণ অস্বস্তি নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোকের মতো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এমন নোংরা কাদা-ছোড়াছুড়ির মুখোমুখি হওয়ার অভ্যাস তার কখনোই ছিল না। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার উদ্দেশ্যে তিনি গলা ঝেড়ে, মৃদু কেশে বললেন, “বেয়াইন, আমার মনে হয় ব্যাপারটা আমরা একটু বেশিই বড় করে দেখছি। একজন সামর্থ্যবান মানুষ যদি অন্য কারও চিকিৎসার খরচ জোগায়, সেটা তো কোনো অপরাধ নয়। হয়তো ইউসুফ কাউকে না জানিয়ে, স্রেফ মানবিকতা থেকে একটা অসহায় মেয়েকে সাহায্য করেছে।”

‘কাউকে না জানিয়ে’… শব্দ তিনটে সাবিনার কানে সীসার মতো বিধল! তার নিজের ছেলে, যাকে তিনি আঁচলের নিচে আগলে বড় করেছেন, সে তার মাকে না জানিয়ে এত বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে? শবনমের শ্বশুরের সামনে তার মাতৃত্ব আর কর্তৃত্বের ইগোতে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। তিনি তৎক্ষণাৎ কৈফিয়তের সুরে, কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন, “না বেয়াই সাহেব, আপনি আমার ছেলেকে চেনেন না। ও আমারে না জানিয়ে দশটা টাকাও কোথাও খরচ করে না। আমার ছেলে যদি এমন কিছু করেই থাকত, তবে সবার আগে আমারে এসে জানাত। আপনি এদের চেনেন না, এরা নিজেদের স্বার্থে বানিয়ে বানিয়ে এমন হাজারটা গল্প রটাতে পারে!”

সাবিনার কথা শুনে জোহরা সমস্ত ভয়ডর উপেক্ষা করে দুপা এগিয়ে এসে বললেন, “ এক ফোঁটাও মিছা কথা কইতাছি না আম্মা! উইমেন হাসপাতালের সাত তলার ডান দিকের শেষ মাথার কেবিনে আমার ছেড়ি ভর্তি আছিল। বিশ্বাস না অইলে ওইখানে গিয়া খোঁজ লন, হসপিটালের খাতাপত্র দেহেন! নইলে আপনের পোলারে এইহানে ডাইকা জিগান। আপনাগো নিয়া মিছা কথা কইয়া কি আমাগো পেট ভরব?”

কেবিনে!সাবিনার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সাধারণ ওয়ার্ড আর কেবিনের খরচের তো আকাশ-পাতাল তফাত। এতগুলো টাকা তবে ইউসুফ কোথায় পাবে? ও তো বাড়ি বা আলমারির লকার থেকে কোনো টাকা সরায়নি! তিনি নিশ্চিত, এরা মিথ্যা বলছে!

কিছুক্ষণ আগেও যে ছেলের গুণগানে চারপাশ মুখরিত ছিল, এখন তার নাম বস্তির একটা মেয়ের চরিত্রের সাথে জড়িয়ে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে! এত চাপ সাবিনা আর সহ্য করতে পারছেন না। চোখের সামনে সবকিছু আচমকা ঝাপসা হয়ে এল, সামলাতে না পেরে তার পা দুটো কিছুটা টলে গেল।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সিমরান তড়িঘড়ি সাবিনার হাতটা শক্ত করে ধরে অনুনয়ের সুরে বলল, “আম্মা, প্লিজ শান্ত হও। ইউসুফ যদি চিকিৎসার খরচ দিয়েও থাকে, তাতে কী হয়েছে? আমাদের তো আল্লাহর দেওয়া অনেক আছে, ও না হয় একটা গরিব মানুষকে সাহায্যই করেছে। এটা তো ভালো কাজ। চলো, এখন বাড়ি চলো। যা কথা বলার আমরা বাড়ি গিয়ে শান্ত হয়ে বলব। এখানে আর লোক হাসানোর কোনো দরকার নেই।”

সাবিনা এক ঝটকায় সিমরানের হাত সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কী বলতেছস তুই? আমার ছেলে এত টাকা কোই পাবে? ও কি চুরি করবে? এরা দল বেঁধে মিথ্যা বলতেছে!”

সাবিনাকে এভাবে উত্তেজিত হতে দেখে আগুনের শিখা আরও উস্কে দিতে চারপাশের মানুষকে শুনিয়ে শুনিয়ে ঝুনুবিবি বললেন, “এদের ছাইড়েন না কইলাম! এদের চিনেন না আপনেরা! জোয়ান জোয়ান ধনীর দুলালগো মাথা চিবাইয়া খাইয়া এরা ট্যাহা কামায়। এদের তো এইডাই ব্যবসা! দেহেন গিয়া, আপনাগো সোনার পোলার মাথাও খাইয়া বইসা রইছে কি না! প্রেম-পিরিত কইরা বড়লোকের পোলাগো পকেট খালি করতে এই মা আর তার দুই মাইয়া এক্কেরে পাক্কা খেলোয়াড়।”

ভিড়ের মধ্য থেকে বস্তির এক ছোকরা বলে উঠল, “ইউসুফ ভাইরে তো আমি মাঝেমইধ্যেই কাজলী আপাগো ঘরের সামনে খাঁড়ায়ে থাকতে দেহি। একদিন ওনার হাতে ফুলও দেখছিলাম!”

চারপাশের ফিসফিসানি মুহূর্তেই তীব্র গুঞ্জনে রূপ নিল। পরিস্থিতি এখন আর চিকিৎসার খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই৷ জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। কুরেশি পরিবারের সবার চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে এল। 
 
 আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত কিছুর পরও কেউ ইউসুফকে নয়, সবাই মিলে কাজলীকেই দোষারোপ করছে। ইউসুফ যদি ওর বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করেও থাকে, সমাজ ধরে নিচ্ছে সেটা কাজলীরই কোনো পাতা ফাঁদ। তাদের কথার দৌড় বিছানা অবধি চলে গেছে! 

সবাই কুৎসিত সব কথার বাণে বিদ্ধ করতে লাগল কাজলীকে। কাজলী পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

অভিভাবকহীন একলা নারীর দিকে আঙুল তোলা এ সমাজের মজ্জাগত অধিকার। নারীর চরিত্র নিয়ে একটুখানি কথা ওঠার সুযোগ পেলেই চারপাশের সবাই নীতিবান বিচারক সেজে বসে। কাজলী মারিয়ামের হুইলচেয়ারের হাতলটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মানুষের যখন সহ্যের সমস্ত সীমা অতিক্রম হয়ে যায়, তখনই তারা ধর্মের কথা চিন্তা করে। অবচেতন মন আশ্রয় খোঁজে সৃষ্টিকর্তার চরণে। হঠাৎ করেই কাজলীর মানসপটে ভেসে উঠল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনগাথা।

স্কুলজীবনে ইসলাম শিক্ষা বইটা ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। নব্বইয়ের ওপরে নম্বর পেত সবসময়। নবীজির জীবনী ছিল ওর নখদর্পণে। 

যিনি সৃষ্টির সেরা নেয়ামত, যার পুত-পবিত্র চরিত্রে কোনো মলিনতার লেশমাত্র ছিল না, সেই দয়ার নবীকেই পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষগুলো ছাড় দেয়নি! মক্কার কাফেররা তাঁকে জাদুকর বলেছে, পাগল বলে উপহাস করেছে; তায়েফের ময়দানে পাথরের নির্মম আঘাতে তাঁর পবিত্র শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়েছে। চারপাশের মানুষ যখন তাঁর ওপর অপবাদের পাহাড় চাপিয়ে দিচ্ছিল, নিখাদ সোনাকে যখন তারা মিথ্যে বলে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখনও তো তিনি ধৈর্যের হিমালয় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দমে যাননি, বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে সত্যের আলো জ্বালিয়ে গেছেন।

সেসব মনে পড়তেই, কাজলীর ভেতরের সমস্ত হাহাকার, ক্ষোভ এক লহমায় শান্ত হয়ে গেল। সেও দমে যাবে না। অসুস্থ মা, পঙ্গু বোন আর নিজের জীবনের যে দায়িত্ব আল্লাহ তাকে দিয়েছে সেটা সে ঠিকঠাক পালন করবে৷ এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়, তর্ক করারও সময় নয়। এখন নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার সময়। এবং সেটাই ও মনপ্রাণ দিয়ে করবে। 

চোখের সামনে কাজলীকে নিয়ে কুৎসিত কথা শুনতে শুনতে মারিয়ামের মাথা ধরে আসে। ও রাগে-ক্ষোভে সাবিনাদের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় চেঁচিয়ে বলল, “আর কত আজেবাজে কথা শুনাইবেন আপনেরা? আমার বইনের কোনো দোষ নাই! আপনাদের ওই সোনার ছেলেই দিন-রাত আমার বোনের পেছনে পাগল হইয়া ঘোরে! আমার বোন তো ওরে কোনোদিন পাত্তাও দেয় নাই! তাকায়া একদিন হাসেও না। তাও বেহায়ার মতো ঘুরে।”

মারিয়ামের কথার বেপরোয়া ভঙ্গি দেখে অহংকারী কুরেশিরা ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল। সাবিনা ছেলের এমন প্রকাশ্য অবমাননা সহ্য করতে পারলেন না। ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বললেন, “যদি প্রমাণ হয় ইউসুফ কাজলীরে পছন্দ করে, ওর চিকিৎসার টাকা ও-ই দিছে, তবে আমিও সবার সামনে বলে রাখতেছি, নিজের গলায় জুতার মালা পরে আমি এই বস্তিতে ঘুরব। আর যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে তোরা তিন মা-মেয়ে মুখে চুনকালি মেখে আজকেই এই এলাকা ছেড়ে দূর হয়ে যাবি!”

বস্তির কুটিল, তামাশাপ্রিয় মানুষগুলো বাজির কথা শুনে উল্লাসে ফেটে পড়ল। তারা একবাক্যে হাততালি দিয়ে সাবিনাকে সমর্থন জানাল। অপমানে অন্ধ হয়ে যাওয়া জোহরাও সত্যের ওপর ভরসা রেখে, জেদের বশে বুক চিতিয়ে বলে উঠল, “রাজি! সত্য কোনোদিন চাপা থাহে না! ডাকেন আপনের পোলারে, তাইলেই আসল সত্য বেরোইব।”

তখন জটলার এক কোণে এসে দাঁড়াল আশিক আর তার দলবল। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা দেখার জন্য তাদের চোখ চকচক করছে।

মায়ের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন বাজি ধরা দেখে সিমরানের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। আম্মা এটা কী বলে বসলেন! শকুনের মতো সুযোগসন্ধানী মানুষগুলোর সামনে পুরো ব্যাপারটা এখন তাদের নিজেদের জন্যই একটা মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে। 

আসল সত্য তো এটাই, ইউসুফ টাকাটা বাড়ি থেকে না জানিয়ে সরিয়েছে এবং কাজলীকেও ভালোবাসে।

সুরমা ততক্ষণে ফোন বের করে ইউসুফকে বস্তিতে চলে আসার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে। 

সাবিনা রক্তচোখে কাজলীদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি আজ এর শেষ দেখেই ছাড়বেন। বেয়াইয়ের সামনে, পুরো বস্তির মানুষের সামনে তিনি কোনোভাবেই নিজেকে ছোট হতে দিবেন না। এই ছোটলোক মা-মেয়েদের মিথ্যুক প্রমাণ করে আজই এলাকা ছাড়া করবেন।

ইউসুফ তখন সাতকাহন রেস্টুরেন্টের বিশ্রামকক্ষে বসে মনোযোগ দিয়ে একটা হলুদ গোলাপের তোড়া বাঁধছিল। আজই ও ফুলগুলো জামিলকে দিয়ে আনিয়েছে কাজলীকে দেবে বলে। কাজলীর একটা পুরোনো, অব্যবহৃত ফেসবুক আইডির খোঁজ পেয়েছে ও। সেখানে কাজলীর দেওয়া পুরোনো সব স্ট্যাটাস ঘেঁটে দেখেছে, মেয়েটা প্রায়ই হলুদ গোলাপের ছবি শেয়ার করত। 

ফুলের তোড়াটার বাঁধন শেষ করতেই ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশের রূক্ষ গলা শুনে ও থতমত খেয়ে গেল। আপা ওকে বস্তিতে যেতে বলছে কেন? 

ইউসুফ দ্রুত পায়ে হেঁটে বস্তির ভেতরে ঢুকল। তাকে দূর থেকে আসতে দেখেই চারপাশের গুঞ্জন থেমে গেল। উৎসুক, কৌতূহলী চোখগুলো তার উপর এসে বিদ্ধ হলো।

 কাছাকাছি পৌঁছাতেই ইউসুফের পায়ের গতি কমে গেল ভিড়ের ঠিক মাঝখানে, কালো বোরকা আর হিজাবে আবৃত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাজলীকে দেখে। দুজনের চোখাচোখি হলো মুহূর্তের জন্য। কাজলীর কাজল-কালো চোখ দুটি বড্ড মলিন। ইউসুফের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। কী হয়েছে এখানে? কাজলী কি কোনো বিপদে পড়েছে? 

ধীর পায়ে ইউসুফ সবার সামনে এসে দাঁড়াতেই সাবিনা তিরের মতো ওর দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেলের বাহু শক্ত করে ধরে টেনে এনে সবার মাঝখানে দাঁড় করালেন। তারপর কাজলীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “একে চিনিস তুই? ভালো করে দেখে বল, এই মেয়েটাকে তুই চিনিস?”

পাশ থেকে সিমরান পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করার এবং ইউসুফকে সতর্ক করার জন্য বলল, “আম্মা, এটা কেমন প্রশ্ন করছ? ওরে কেন চিনবে না? ওরে তো এখন পুরো দেশই চেনে। আর একই এলাকায় থেকে ইউসুফ চিনবে না?”

একথা বলেই সিমরান ইউসুফের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। 

বড় বোন সুরমা জেরা করার ভঙ্গিতে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “সোজা কথার সোজা উত্তর দিবি ইউসুফ। এরা রটাচ্ছে, তুই নাকি দিন-রাত এই মেয়ের পিছু পিছু ঘুরিস? হাসপাতালে ভর্তি করে ওর লাখ লাখ টাকার চিকিৎসার খরচও নাকি তুই দিয়েছিস?”

ইউসুফ স্তব্ধ হয়ে চোখ তুলে কাজলীর দিকে তাকাল। কাজলী এবার আর ইউসুফের চোখের দিকে তাকাল না। ও নির্বিকার রোবটের মতো শূন্য দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। ভাগ্য ওকে টেনেহিঁচড়ে যে নরকের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে, ও সেখানেই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মারিয়াম, জোহরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইউসুফের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস৷ ইউসুফ ভালো ছেলে, ও কখনো মিথ্যা বলবে না। সবার সামনে সত্যটা স্বীকার করলেই অহংকারী কুরেশি পরিবারের মুখে চুনকালি পড়বে।

ইউসুফ অস্বস্তি নিয়ে মুখ খোলার উপক্রম করতেই সিমরান তড়িঘড়ি করে ফিসফিসিয়ে বলল, “আম্মা সবার সামনে বুক ফুলিয়ে বলেছে৷ তুই জীবনেও আম্মাকে না জানিয়ে কারও জন্য এত টাকা খরচ করবি না, আর অত টাকা তোর কাছে নেই-ও। তুই নাকি কাজলীর পেছনে ঘোরা তো দূর, ওর বাড়ির আশেপাশে কোনোদিন থুথুও ফেলবি না। যদি আম্মার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে আম্মা নাকি নিজের গলায় জুতার মালা পরে পুরো বস্তি ঘুরে বেড়াবে!”

ইউসুফ চমকে উঠল। ওর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। আঙুলের নখগুলো হাতের তালুর চামড়া ভেদ করতে চাইল। বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড়ানো ব্যথা শুরু হলো ওর। ও আবারও কাজলীর দিকে তাকাল। কাজলী তখনো পূর্বের মতোই নিথর, ভাবলেশহীন।

ইউসুফের নীরবতা দেখে সুরমা ভেতরে ভেতরে দমে গেল। ইউসুফ ওভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? সে ইউসুফের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে নিচু গলায় বলল, “কুরেশিদের ইজ্জতে বাজি লেগে গেছে ইউসুফ! কিছুই আমাদের হাতে নেই, সব তোর ওপর।”

সাবিনা তখনো নিজের অহংকারের বৃত্তে অন্ধ হয়ে বন্দি। তিনি শবনমের শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে গর্বের সাথে বললেন, “দেইখেন বেয়াই, এখুনি সব দুধের দুধ আর পানির পানি হয়ে বেরোবে। আমার নিজের পেটের ছেলেকে আমি চিনি না? ও আমার অনুমতি ছাড়া এক পা-ও কোথাও ফেলে না। সেখানে এরকম একটা মেয়ের পেছনে ঘুরঘুর করবে? অসম্ভব।”

ইউসুফের চোখের কোণগুলো লাল হয়ে উঠল। চারপাশের বাতাসটা আচমকা কেমন ভারী হয়ে এসেছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। যেন শরীরটা এখনই ভেঙে পড়বে।

সুরমা ইউসুফের মৌনতা আর লাল হয়ে যাওয়া চোখ দেখে এবার সত্যিই খুব ভয় পেয়ে গেল। সে ইউসুফের কাঁধটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে ব্যাকুল গলায় বলল, “ইউসুফ... ওই মেয়ে কি তোকে কোনো কিছু নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেছে? তুই ভয় পাস না ভাই। তোর একটা কথার ওপর আমাদের পুরো পরিবারের সম্মান, মাথা উঁচু বা নিচু হওয়া নির্ভর করছে। সত্যিটা বল, আমরা সবাই তোর সঙ্গে আছি!”

সিমরানও ইউসুফের একটা হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “কথা বল! সবসময় চুপ থাকা ভালো কিছু বয়ে আনে না। আম্মার দিকে একটু তাকিয়ে দেখ। মুখটা কেমন নীল হয়ে যাইতেছে। ওনার হার্টের সমস্যাটা আবার বাড়ছে। উনিশ-বিশ কিছু হলে কিন্তু অন দ্য স্পট আম্মা স্ট্রোক করে বসবেন।”

বস্তির যে দুই-চারজন মানুষ একটু চালাক প্রকৃতির, তারা ইউসুফের অবস্থা আর দুই বোনের ফিসফিসানি দেখেই পুরো কাহিনিটা ঠিক বুঝে গেল। সত্যটাও পরিষ্কার হয়ে উঠল। 
তবে বাকিরা তখনো কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে আছে।

নিজের অজান্তেই ইউসুফ আলতো করে মাথা নাড়াল। ওর কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। বুক ফেটে কান্না এলেও ও কোনোমতে জড়ানো গলায় উচ্চারণ করল, “না... আমাদের মধ্যে কিছু নেই। আমি কোনো টাকা দেইনি।”

কথাটা বলেই ইউসুফ অপরাধীর মতো, কাঁপাকাঁপা চোখে কাজলীর দিকে তাকাল। 

ইউসুফের কাপুরুষোচিত অস্বীকার শোনার পর কাজলীর ঠোঁটের কোণে হুট করেই হাসি ফুটে উঠল। ও নিজের মনেই খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “ভেড়া!”

একই সাথে ওর বাম চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে। ও মাথা তুলে মায়ের বাধ্য ছেলে ইউসুফের দিকে তাকাল। ওর চাহনিতে কোনো অভিযোগ নেই, বিস্ময়ও নেই।

এটাই তো স্বাভাবিক! যা হয়েছে, একদম ঠিক হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। এটা তো কোনো রূপকথার গল্প নয়, সিনেমাও নয়। এখানে সিনেমার মতো কোনো রাজপুত্র এসে তরবারি হাতে সব অন্যায়কে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয় না! 

বাস্তব জগতে সমাজের সামনে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে গলা উঁচিয়ে কোনো সর্বহারা মেয়ের পক্ষে সত্য বলার মতো মেরুদণ্ড বা ক্ষমতা আসলে কারও থাকে না। সবশেষে রক্তের টানই এখানে শেষ কথা বলে। কল্পনার বাইরে পুরুষ এমনই হয়। ঠিক ইউসুফের মতো। এরা কখনো বদলায় না। এরা ভীরু, কাপুরুষ আর পরিস্থিতির সাথে আপসকামী।

কাজলীর শূন্য ধারালো চোখের দিকে তাকিয়ে ইউসুফের ভেতরটা যন্ত্রণায় ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগল। ওর ইচ্ছে করছে বুক চিরে চিৎকার করে বলতে, “আমি কাজলীকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি আমি কাজলীকে।' 

কিন্তু পারছে না, কিছুতেই পারছে না। হাত-পা ঝিম ধরে অবশ হয়ে আসছে।

জোহরা ক্ষোভে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কাজলী ঝট করে হাত দিয়ে মায়ের মুখ চেপে ধরল। 

ঝুনুবিবি আহ্লাদে মেতে উঠলেন। তিনি পাশ থেকে ঝিলমিল আপাকে চোখের ইশারায় ডেকে বললেন, “ঐ ঝিলমিল! দৌড়ায়া যা, রান্নাঘর থেইকা পাতিল লইয়া আয়! মা ঝিগুলার মুখে আজ ভালো কইরা কালি মাখায়া বস্তি থেইকা খেদাইতে হইব। শয়তানের দল কোনখানের!”

কালি মাখানোর কথা শুনে সিমরান জোর গলায় প্রতিবাদ জানিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার! আপনারা কেউ ওদের গায়ে হাত দেবেন না! যা সমাধান হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। ওরা মিথ্যা বলেছিল, আমার ভাই নিজের মুখে সত্য বলে তা প্রমাণ করে দিয়েছে। ওদের মধ্যে কিচ্ছু নেই! আমরা ওদের মাফ করে দিলাম। কেউ যেন ওদের মুখে কালি না লাগায়।”

মুখে কালি লাগানোর কথা শুনে ইউসুফ ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। চোখ দুটি জ্বলে উঠল। 

সিমরান আড়ালে সুরমার শাড়ির আঁচল টেনে ইশারা করল। সুরমা আবারও ইউসুফের লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর অবশ হয়ে আসা চেহারার দিকে তাকাল। সিমরানের ইশারা আর ভাইয়ের ভেঙে পড়া অবয়ব দেখে সুরমা মুহূর্তেই পুরো সত্যটা জলের মতো বুঝে গেল। ইউসুফ আসলেই মেয়েটাকে পছন্দ করে এবং হাসপাতালের বিল ও-ই দিয়েছে! হয়তো চুরি করেছে! জোহরার কথাই সত্য! কিন্তু এমন কাদা-মাখা হাটে তো আর সেই সত্য স্বীকার করে নিজেদের বংশের ইজ্জত ধুলোয় মেশানো যাবে না। 

বস্তির মানুষ কাজলীকে আক্রমণ করলে হয়তো ইউসুফ অপরাধবোধ থেকে মত বদলে সত্যটা উগরে দিতে পারে! সেই ভয়ে দুই বোন মিলে চিৎকার-চেঁচামেচি করে, দাপট দেখিয়ে বস্তির মানুষদের কালি লাগানোর উন্মাদনা দমিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল।

তাদের চিৎকারে ঝুনুবিবিরা যখন দমে যাচ্ছিল, সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে কাজলী নিজে এগিয়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ইউসুফের প্রতি অভিমানে, ঘেন্নায় আগ বাড়িয়ে ঝিলমিল আপার হাত থেকে পাতিলটা কেড়ে নিল। তারপর নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে পাতিলের তলার কালো কালি নিয়ে নিজের পুরো মুখে মেখে নিল!

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অথচ চারপাশের বাতাসে শ্বাসরুদ্ধকর ভ্যাপসা গরম। বুক ভরে একটুখানি বাতাসের আশায় কাজলী ঘরের বাইরের বড়ই গাছটার নিচে, শ্যাওলা ধরা সিমেন্টের বেঞ্চিতে এসে বসেছে। ওর দুই হাতের মুঠোয় দুটো দুটো করে ছোট ছোট নুড়ি পাথর। মানসিক অস্থিরতায় ও মাঝেমধ্যে একটা পাথর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরছে। রাগে, অপমানে ওর পুরো শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে, শিরা-উপশিরাগুলো ছিঁড়ে যেতে চাইছে। মুখে এখনো কলঙ্কের কালি লেপ্টে আছে। 

মানুষ বলে, কষ্টের পর নাকি সুখ আসে। কিছু কেড়ে নিলে আল্লাহ নাকি তার চেয়েও উত্তম কিছু ফিরিয়ে দেন। ওর তো সবই কেড়ে নেয়া হয়েছে। দেয়ার কোনো নামই নেই। যে যৎসামান্য সম্মানটুকু নিয়ে ও বেঁচে ছিল, সেটাও এ কয়দিনে ধুলোয় মিশে গেছে। কী এমন মহামূল্যবান জিনিস দেওয়ার জন্য ওর জীবন থেকে এভাবে একে একে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হলো? আর কত পরীক্ষা দিতে হবে ওকে? 

হঠাৎ বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত অবস্থায় সামনে এসে দাঁড়াল ইউসুফ। দেখেই কাজলী চমকে উঠল। পরক্ষণেই রাগে ওর চোখ দুটো জ্বলে উঠল অঙ্গারের মতো। ঘৃণাভরা চোখে ইউসুফকে পাশ কাটিয়ে উঠে চলে যেতে চাইল। ইউসুফ ভাঙা কণ্ঠে আকুল হয়ে ডেকে উঠল, “কাজলী! কাজলী।”

কাজলী ঝট করে পেছনে ঘুরে হুশিয়ারি গলায় বলল, “খবরদার! আমার নাম আর মুখে আনবেন না। আমার পিছন পিছনও আসবেন না। তাহলে খুব খারাপ হবে।”

কাজলী হনহন করে সামনে হাঁটা ধরল। ইউসুফ তাও যখন অপরাধীর মতো ওর পিছু নিল, কাজলী আর নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরি চেপে রাখতে পারল না। ও আক্রোশে ঘুরে দাঁড়িয়ে ডান হাতের মুঠোয় থাকা নুড়ি পাথর দুটো সজোরে ছুঁড়ে মারল ইউসুফের দিকে। তারপর আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা চলে গেল বাড়ির ভেতর।

একবারের জন্যও পেছনে ফিরে দেখল না, ওর ছিটকে যাওয়া পাথরের আঘাতে ইউসুফের বাম চোখের ঠিক ওপরটা কেটে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করেছে! ইউসুফ ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে দুই হাত দিয়ে সারামুখে সেই রক্ত মেখে নিতে লাগল। ঠিক যেভাবে বিকেলে সবার সামনে কাজলী নিজের মুখ জুড়ে পাতিলের কালি মেখে নিয়েছিল!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp