সিলেটে জ্যৈষ্ঠমাস শুরু হলো সবে। কালবৈশাখি ঝড়ে এখনো সবুজ-শ্যামল সিলেটের ভেজা হয়নি যদিও তবুও মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। জনজীবন শান্ত করে এক-আধবার অন্তরিক্ষে দু-চারটে আবছা মেঘের আনাগোনা ঠিক হয়।
আজও হয়েছে। ভোর হতেই কী এক সর্বনাশা বর্ষার যে শুরু হলো! থামবার কোনো নাম নেই তার। কেউ দেখলে বলবে না জৈষ্ঠ্য চলছে। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবী জুড়ে গান গাইছে এক টুকরো আষাঢ়।
হসপিটালের করিডোরে মেজবাহ্ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনেই দাঁড়ানো সিকান্দার। চেয়ারগুলোর একটাতে টুপু বেগম, রূপসা বেগম, কবির শেখ, দোলন শেখ, হিমেল রয়েছে। গতকাল রাত পুরোটাই উনারা জেগে কাটিয়েছেন আসনগুলোতে বসে। কেউ কেউ হেঁটেছেন করিডোর ধরে। এই পাশটা পুরোপুরি শেখ বাড়ির ক্ষমতায় ডুবন্ত বলে সাধারণ মানুষ কিংবা অপ্রয়োজনীয় কোলাহল ছুঁতে পারেনি।
ঘড়ির কাটা সাতটায় গিয়ে ঠেকেছে সবে। করিডোর দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখা গেলো রাহাতকে। টি-শার্ট আটকে গিয়েছে ওর পিঠে। বৃষ্টিতে ছাতা অব্দি মেলার সুযোগ হয়নি হয়ত। চোখে-মুখে বেজায় আতঙ্ক। বেপরোয়ার মতো চোখ ঘুরিয়ে অনির্দিষ্টে ছুঁড়ে মারল প্রশ্ন,
“কী খবর উনার? জ্ঞান ফিরেছে কি?”
দোলন শেখের সবে এসেছিলো ঝিমুনি। দুই একবার তো চোখও বন্ধ করে ফেলেছিলেন। আচমকা পুত্রের কথায় তিনি সজাগ হয়ে উঠলেন। ভারি চোখের পল্লব হালকা হয়ে গেলো। তাজ্জব চোখে ছেলের দিকে তাকালেন তিনি। এই ছেলে না ক্রিকেটের টুর্নামেন্টের জন্য সিলেটের বাহিরে গিয়েছিলো? এর এখানে কী কাজ? এই সাতসকালে পৌঁছালো কী করে? কে-ই বা ওকে খবর দিয়েছিল? কী অদ্ভুত!
“তুমি? তুমি জানলে কী করে তোমার ভাবীর কথা? তুমি না ক্রিকেট টুর্নামেন্টে গিয়েছিলে?”
রাহাত বুক চেপে শ্বাস নিচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে এসেছে বলেই হয়ত শ্বাস নিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে তার।
সিকান্দার আলগোছে গিয়ে টুপু বেগমের পাশে থাকা পানির বোতলটা তুলে নিলো। এগিয়ে দিলো রাহাতের দিকে,
“পানিটা খাও। এরপর বসে কথা বলো।”
রাতের এই মুহূর্তে পানির প্রয়োজনই ছিলো সবচেয়ে বেশি। সিকান্দারটা ঠিক সময়ে কীভাবে যে বুঝে যায় সব! ও হাত বাড়িয়ে বোতল নিলো। তীব্র তৃষ্ণায় ঢকঢক করেই বেশ অনেকটা পানি গিলে নিলো। এই বাতাস মাথায় নিয়ে কীভাবে যে তার ছুটে আসতে হয়েছে! ভাগ্য ভালো সঙ্গে গাড়ি রেখেছিলো। নয়ত সম্ভবই হতো না আসা।
“কী হইলো? বললা না তো, কীভাবে খবর পেলে?” দোলন শেখের কণ্ঠে আগ্রহ আর বিরক্তি যেন একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে। তিনি কাজ ছেড়ে আসার বিষয়টা ঠিক যেন পছন্দ করলেন না।
রাহাত বুক ছেড়ে শ্বাস নিলো। ধপ করে বসল টুপুর পাশে।
“খবর কীভাবে পেলাম তা জানার চেয়েও জানা প্রয়োজন অসুস্থ মানুষটা কেমন আছেন। তোমরা দেখছি কেউ কিচ্ছু বলছো না! ফুপি, ছোটোম্মা কিছু বলো? তোমরাও দেখছি চুপ করে আছো।”
“ওরা কী বলবে? অসুস্থ মানুষতো আর এক রাতেই ভালো হয় না, তাই না? কিন্তু তুমি কেন খেলা ছেড়ে এলে। বলেছিলে না টুর্নামেন্টে না জিতলে ফাইনালে যাওয়া প্রায় অসম্ভব?”
“বলেছিলাম।”
“তাহলে সেই খেলা রেখে আসলে কী করে? আমরা কি এখানে লোকবল কম পড়েছিলাম?”
“বাড়ির একজন মানুষের এই হাল। আমি সেখানে না এসে বসে বসে দেখব লোকবল বেশি রয়েছে না কম। এরপর ঠিক করব আসব কি-না?”
“কিন্তু খেলাটাতো তোমার স্বপ্ন ছিলো?”
“আর ভাবী আমাদের দায়িত্ব। আব্বু তুমি ভুলে যাচ্ছ ঐ মানুষটা বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তুমি কিংবা আম্মু অসুস্থ হলে আমি যেমন আসতাম, উনার বেলাতেও তা-ই। এখানে আমার আসতেই হতো। স্বপ্নের চেয়েও দায়িত্ব পালন করা অধিক দরকারী।”
রাহাতের কণ্ঠ কাঠকাঠ। দোলন শেখের মেজাজ চড়াও হলো। তবে মেজবাহ্ উপস্থিত বলে তিনি সেই চওড়া মেজাজ প্রকাশ করলেন না। ছেলের দিকে তীব্র অসন্তুষ্ট নিয়ে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিলেন। মেজবাহ্ না থাকলে দু'টো বাজে কথা ঠিকই শোনাতেন। বাড়ির বউ মাথা ফেটে হসপিটালে ভর্তি বলে সকলের ছুটে আসতে হবে। রাজ্যসম মানুষ না এলে মনে হচ্ছে বউ ভালো হবে না। এত লোক দেখানো দরদ উনার পছন্দ নয়। উনারা কি কম করতেন পুত্রবধূর জন্য? মেয়েটার জন্য বাড়ির ছেলেগুলোর যেন ভীমরতি পেয়েছে। যত্তসব!
হিমেল এতক্ষণ যাবত নিজের ভাইয়ের চঞ্চলতা দেখছিলো। বাবার মতো ওরও ভাইয়ের বাড়াবাড়ি পছন্দ হলো না ঠিক। কপাল কুঁচকে বলেই বসল, “আমার স্ত্রী আর বাড়াবাড়ি যেন তোদের বেশি। এত আগ বাড়ানো দরদ ভালো নয়।”
মেজবাহ্ পারিবারিক আলাপে এতক্ষণ মাথা দেয়নি। মুখ ফুটে টু শব্দও করেনি। কিন্তু হিমেলের কথা যেন তার সারারাতের জমে থাকা রাগে ঘি ঢালল। ও তেঁড়ে এলো প্রায়,
“ভালো নয় কেন? খারাপই বা কেন? তুই বউ পেটাবি আর তোর বউকে আমরা মানুষের মতো মনে করলেই সমস্যা, তাই না? কাপুরুষ একটা।”
হিমেলও বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো তৎক্ষণাৎ, “তুই কথায় কথায় তেঁড়ে আসিস কেন? তোর গায়েও বা কথাটা লাগল কেন? চোরের মনে খুব পুলিশ পুলিশ। বুঝি না ভেবেছিস কিছু?”
মেজবাহ্ এবার সত্যি সত্যি হিমেলের কলার ধরে ফেলল। সারারাত নির্ঘুম থাকার ফলে চোখদুটো ওর হলদে হয়ে আছে প্রায়। তিন কাপ চা ব্যতীত পেটে পড়েনি কিছুই। এর মাঝে এসব কথায় ওর শরীরের তেজ বাড়বে বৈ কমবেতো না।
সিকান্দার এগিয়ে এলো, এগিয়ে গেলো রাহাতও। টেনেহিঁচড়ে কোনোরকমে অমন শক্তিশালী শরীরের মেজবাহকে ওরা ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
কবির শেখ নিজের অশান্ত ছেলের দিকে নরম চোখেই তাকিয়ে রইলেন। ছেলেটা হয়েছে কার মতো? হুটহাট এমন রেগে যায় কেন? হিমেলের কথাতো সহ্যই করতে পারে না! কী অদ্ভুত!
সিকান্দার মেজবাহ্'র হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বেশ বুঝিয়ে বলল,”ভাই ছেড়ে দেন। আশেপাশে কেউ এটা দেখলে তিলকে তাল করে ছাড়বে। পারিবারিক বিষয় দেয়ালের ভেতরে সমাধান হবে। মানুষ এসব দেখলে আপনার সম্মান নষ্ট হবে।”
মেজবাহ্ হিংস্র বাঘের মতো রাগে ফুঁসছে। দাঁত কিড়মিড় করে কলারটা প্রায় ধাক্কা দিয়ে ছাড়তে ছাড়তে বলল,
“ওকে আমার সামনে থেকে সরা। এই কাপুরুষটাকে দেখলেই আমি জানে মে রে ফেলব।”
কবির শেখ এতক্ষণ মুখ না খুললেও এবার আর পুত্রের এমন ঔদ্ধত্য মেনে নিলেন না। রাশভারি ভঙ্গিতে পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বড়ো ভাইয়ের গায়ে বারংবার হাত দেওয়াটাও পুরুষত্ব নয়। সব সম্পর্কের একটা গণ্ডি রয়েছে।”
“ও বড়ো ভাইয়ের মতো থাকলে আমারতো সীমা লঙ্ঘন করতে হতো না, আব্বু। আজকের রিমঝিমের অবস্থার জন্য যদি ও দায়ী হয়ে থাকে এবং তা যদি আমি জানি তবে দুঃখীত আব্বু, আমি কারো কোনো পদক্ষেপের আশায় বসে খাকব না। নিজেরটা নিজেই বুঝে নিবো।”
“আমার স্ত্রী’কে আমি এমন করে মা র তে যাবই বা কেন? মানলাম ওকে কয়েকবার চ ড় দিয়ে ফেলেছি এর আগে। তার মানে এই নয় যে এভাবে মে রে ফেলব, মেজবাহ্!” হিমেলের কণ্ঠে অবিশ্বাস্যকর সুর। যেন কস্মিনকালেও সে এত বড়ো দুর্ঘটনা ঘটানোর কথা ভাবেইনি।
মেজবাহ্ চোখ আগের মতোই রাখল রক্তগরম প্রায়। মুখ বিকৃতি করে ফিরে তাকাল অন্যদিকে। তার যেন রুচিতেই কুলোচ্ছে না এর সাথে কথা বলতে।
বাড়ির ছেলেরদের এহেন কীর্তিতে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল রূপসা আর টুপু। ভাগ্যিস তাহমিনা বেগম নেই! নয়ত পুরো হসপিটাল আা শেখ বাড়ির সিনেমা দেখতে পেতো। মহিলার চিৎকার করার ক্ষমতাতো আর কম নেই।
রিমঝিমের কেবিন থেকে একটি নার্স বেরিয়ে এলো। কালো মুখে মিষ্টি হাসি টেনে রূপসাদের দিকে তাকিয়ে জানালো, “আপনাদের রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। আস্তে ধীরে গিয়ে দেখা করুন।”
রিমঝিমের জ্ঞান আসার কথাটি কানে পৌঁছাতেই সর্বপ্রথম রাহাত এগিয়ে গেলো কেবিনের দিকে। কারো থেকে একটিবার অনুমতি নেয়নি। রাহাতের পেছন পেছন সকলেই ছুটে গেলো। কেবল গেলো না মেজবাহ্।
জায়গাটুকু খালি হতেই সে উল্টোদিকে মোড় ঘুরল। হাঁটা আরম্ভ করল সিঁড়ির দিকে।
সিকান্দার বুঝে উঠতে পারল না মানুষটাকে। সারারাত এমন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়েছিলো ভাবীর জন্য। অথচ এখন জ্ঞান ফেরার কথা শুনেও কোনো হেলদোল দেখালো না? মানুষটা এমন কেন? মনের ভেতর যে কী লুকিয়ে রাখে বোঝা দায়।
“ভাই, ভাবীকে দেখবেন না?”
মেজবাহ্ পা থামিয়ে শ্বাস ফেলল, “না। বাড়ি ফিরব।”
“কেন ভাই? হিমেল ভাইয়ের জন্য যেতে চাচ্ছেন না?”
মেজবাহ্'র কণ্ঠ শক্ত হয়ে ওঠল। ধাঁরালো স্বরে বলল, “মেজবাহ্ কারো জন্য কিছু করে না। যা করে, যতটুকু করে, কেবল নিজের জন্য করে।”
—————
ঢাকার আবহাওয়াও বিশেষ ভালো নয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। প্রেমা মুখে আইসক্রিম নিয়ে হাঁটছে। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ রয়েছে। প্রাইভেট পড়ে এসেছে সে। রিকশা নেই বলে হেঁটেই বাড়ি ফেরার মতলব করেছে। স্কার্টটা কাঁদায় মাখবে বলে খানিক উঁচু করে ধরে বা'হাতে। এই স্কার্টটা ইমন ভাই এনেছিলো চট্টগ্রাম থেকে। কালো রঙের জমিনে শালিক বসে আছে শুকনো ডালে। ইমন ভাইয়ের রুচি এত সুন্দর। কোনো পোশাক আনলে সেটা দেখতেই ইচ্ছে করবে যেন। যদিও প্রেমা শ্যামলা রঙের তবে এই কালো স্কার্ট আর নীলচে ফতুয়ায় বেশ ফুটেছে তাকে। জোড়া ভ্রু'র নিচে দু'টো ছোটো ছোটো চোখে মেয়েটিকে মিষ্টি লাগে বটে।
প্রেমার দৃষ্টি পথেই ছিলো। ধ্যান ছিলো পিচ্ছিল কাঁদাতে। কোনো ভাবে না আবার তার পায়ে লেগে যায়!
তখনই সে খেয়াল করল মাথাে উপর একটি ছাতা। নিরিবিলি রাস্তায় তাকে ছাতা ধরার মানুষটি কে? তড়াক করে চমকালো সে। পেছন ঘুরতে গিয়ে একটি শক্তপোক্ত বুকে মাথাটাও বারি খেলো। সিগারেটের উটকো গন্ধটা ওর নাকে এসে লাগতেই বুঝে ফেলল মানুষটিকে। কপাল কুঁচকে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে,
“নোমান ভাই, তুমি আমার থেকে হাত চারেক দূরে থাকবে সবসময়। এত বাজে গন্ধ তোমার শরীরে। মোষের মতো গন্ধ।”
নোমান কাঁধ ঝাঁকালো। যেন গায়েই লাগল না তার কথাটি। অবলীলায় প্রেমার বাম হাতটি মুঠোয় নিয়ে হাঁটতে শুরু করল,
“মোষের গা-ও শুঁকতে যাস তুই, প্রেমা? ছি ছি ছি!”
“ভাইয়া, তুমি কিন্তু বেশি বেশি করো।”
“কত বেশি?”
“অনেকবেশি। সবসময় বিরক্ত করতে ভালো লাগে তোমার?”
“বিরক্তটাই দেখলি? এই যে তোর জন্য ছাতা নিয়ে এলাম, সেটা দেখলি না?”
নোমানের কথায় হুঁশ ফিরল প্রেমার। সত্যিই তো! নোমান ভাই সত্যি সত্যি ছাতা নিয়ে এসেছে তার জন্য! ও চমকে গেলো। চোখ পড়ল নোমানের চোখে। তামাটে বর্ণের নোমানের চোখগুলো যেন কেমন কালচে। মণিগুলো জ্বলজ্বলে। শিরশির বাতাস এসে লাগছে তার গায়ে। মনে মনে কিছুটা অপরাধী হলো। মুখ ফুটে ধন্যবাদ জানাতে চাইল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি মেয়েলি স্বর ডাকল নোমানকে,
“এ্যাই নোমান, ছাতাটা দে, লম্পট। কোন মেয়ের হাত ধরে হাঁটছিস আবার? ছাতাটা দে অমানুষ, আমি ভিজে যাচ্ছি। আমার ছাতা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? নোমাইন্যাআআ..”
মেয়ের চিৎকারে ফুঁসে উঠল নোমান। প্রেমার অবস্থাতো আরও বেহাল। চোখদুটো যেন বেরিয়ে আসবে ওর বিস্ময়ে। এই লোক আর কখনো শোধরানোর নয়। চরিত্রহীন একটা।
—————
বৃষ্টিতে শিকদার বাড়িতে দু'টো দল হয়। একটি দলে থাকে টুইটুবানি ও জোহরা যারা টেলিভিশনে কোনো সিনেমায় ডুব মারে। আরেকটি দল হলো যাবের শিকদার আর প্রেমার। যারা রেডিওতে গান শুনতে ভালোবাসে।
এই সন্ধ্যেতেও ব্যাতিক্রম ঘটেনি। টেলিভিশন নিয়ে বসেছে জোহরা আর টুইটুবানি। ইমন ভাই গিয়েছে বাহিরে। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়েছে। মানুষটার ঘরে যেন এক দণ্ড থাকার মন নেই। সবসময় বাহিরে বাহিরে কাটানোর বাসনা।
“মেঝো আপা, রিয়াজ ভাইয়ের সিনেমা দেন। উনারে বড়ো মনের মতো লাগে।”
জোহরা রিমোর্ট নিয়ে চ্যানেল বদলাচ্ছিলো। লাজুক কণ্ঠে পাশ থেকে টুইটুবানি বড়ো অনুরোধ করে বলল। সিনেমা যেন ওর ভাতের চেয়েও বেশি।
জোহরা আঁড়চোখে তাকল, “আজ রিমোট আমার হাতে তাই আমি বুঝব কী দেখা যায়, না দেখা যায়। যেদিন তোর হাতে থাকে সেদিন তুই দিস কি আমার কথামতো?”
জোহরার বাঁকা কথা মুখ ভেংচালো সে, “আমি ছোটো মানুষ, আপনে কি ছোটো? একটা মানুষ ভালো কইরা অনুরোধ করলেও তার মান রাখেন না।”
“এত মান রাখতে পারব না। চুপ করে থাকবি। আমি যা দেখব, তুইও তা দেখবি।”
“আপনে তো দেহেন আবোলতাবোল জিনিস। আপনার রুচি তেমন একটা ভালো না।”
মুখের উপর করা টুইটুবানির মন্তব্যে ফুঁসে ওঠল জোহরা। ধমকে বলল,
“উঠ এখান থেকে। উঠ। সিনেমার জন্য তুই আমার রুচি নিয়ে কথা বললি? আর আসিস আমার পাউডার, স্নু মাখতে। আসিস।”
“আসমু না। আব্বা বলছে কিনে দিবে আমাকে।”
“দেখব কবে কিনে দেয়। গত বছর থেকেতো কেবল শুনছিই।”
“আব্বা না কিনে দিলে ইমন ভাই দিবো।”
জোহরা তেমন পাত্তা দিলো না টুইটুবানির কথায়। পাল্টাতে লাগল চ্যানেল। আচমকা তার চোখ থেমে গেলো সংবাদের একটি চ্যানেলে।
যাবের শিকদারের ঘর অন্ধকার। ভেজা মাটির ঘ্রাণ ঘরময় ছড়িয়ে গিয়েছে।
পাশে বাজছে রেডিওটা। বাহিরে এক খন্ড অন্ধকার পৃথিবীতে জুড়ে আছে ঝিরঝির হাওয়ার মোলায়েম বৃষ্টি। আবছা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে তার হাতের সাদা-কালো ছবিটা। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষালি পায়ের উপর দু'টো ছোটো ছোটো পা। হাঁটা শিখছে বোধহয় বাচ্চাটি বাবার উপর ভরসা করে। পৃথিবীতে সে প্রথম পা ফেলার আগে পা রেখেছিলো বাবার পায়ের উপর।
যাবের শিকদার ছবিটি বুকে চেপে ধরলেন। ধরা গলায় রেডিও'র সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাইতে আরম্ভ করলেন—
"আয়রে আমার সাথে আয় এখনি,
কোথাও ঘুরে আসি শহর ছেড়ে..
ছেলেবেলার মত বায়না করে,
কাজ থেকে নে না তুই আমায় কেড়ে।
আয় খুকু আয়,
আয় খুকু আয়..."
—————
মেজবাহ্'র চোখের সাদা অংশটি লাল হয়ে আছে। ঘুম পরিপূর্ণ হয়নি বলেই হয়ত এমন লালচে হয়েছে। আপাতত সে বিরক্ত সিকান্দারের উপর। আচমকা কেউ এসে ঘুম থেকে উঠায়? মানুষের তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে! এই ছেলে কি কোনো বুদ্ধি নেই?
গতকাল রাতে নির্ঘুম ছিলো সে, সকাল থেকে ব্যবসায়িক কাজে ডুবে ছিলো। বিকেলের দিকে এসে গোসল সেরে ঘুমিয়েছিলো। তিন ঘন্টাও হয়নি। এর মাঝেই এই ছেলে এসে উঠিয়ে দিলো? এর কি মাথার তার ছেঁড়া?
“ভাই, আপনি ঘুমাইছিলেন?” সিকান্দারের থতমত খাওয়া স্বর শুনতেই মেজবাহ্'র রাগ বাড়ল। দরাজ গলায় বলল,
“নাহ্, নাচছিলাম। ফাজিল কোথাকার। একটা মানুষকে এভাবে কেউ ডাকে? মেরে ফেলতে চাস? তাহলে অন্য ভাবে মেরে ফেল। এভাবে কেন?”
সিকান্দার অতিরিক্ত চিন্তিত। সেই চিন্তাতে নখ কামড়াচ্ছে, “আসলে ভাই একটা খারাপ সংবাদ আছে।”
উদোম, ফর্সা শরীরে নেমে দাঁড়াল মেজবাহ্ খাট ছেড়ে। ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে নিজের কাপে নিতে নিতে বলল, “যার জীবনে তুই আছিস তার জীবনে এরচেয়ে বেশি দুঃসংবাদ কী হতে পারে?”
“ভাই!” অভিমানী কণ্ঠ ছিটকে এলো যেন সিকান্দারের মুখ থেকে। মেজবাহ্ ধমকে উঠল, “চুপ কর ব্যাটা। বউয়ের মতো অভিমার করে ডাকছিস কেন? আধ-দামড়া ছেলে কি-না ন্যাকা স্বরে ডাকছে। স্বাভাবিক ভাবে বল। গা কেমন শিরশির করে ওঠল আমার। নোংরা ছেলে কোথাকার।”
সিকান্দার যদিও খুবই দরকারী কথা বলতে এসেছিলো কিন্তু মেজবাহ্'র ধমকে হেসে ফেলল। দুষ্টু চোখে মেজবাহ্'র সুন্দর, উন্মুক্ত শরীরটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এমন সুন্দর দেহ দেখলে কণ্ঠটা কেমন যেন হয়ে যায়, ভাই।”
সিকান্দার দুষ্টুমিতে ভড়কালো মেজবাহ্। টেবিল থেকে বন্দুকটা নিয়ে সিকান্দারের দিকে তাঁক করল, “অসভ্য ছেলে একটা। আর কখনো আমার ঘরে আসবি না। বের হ।”
সিকান্দার আরও উঁচু শব্দে হেসে উঠল। দু-হাত উঁচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“আচ্ছা পরের বার আসলেও আর দেখব না। দেখলেও লুকিয়ে দেখব, আপনাকে বলব না। কসম।”
“আবার!”
“আচ্ছা আচ্ছা আর বলছি না। তবে ভাই একটা তো কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছে।”
চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে টেবিলের সাথে হেলান দিলো মেজবাহ্, “কী সেটা? ভণিতা না করে বল!”
সিকান্দার বলল না। বরং বেডরুমে থাকা টেলিভিশনটা অন করল। চ্যানেল পাল্টে পাল্টে থামল একটা সংবাদ চ্যানেলে। সংবাদপাঠ করছেন একজন পুরুষ। কয়দা করে শিরোনামে বলছেন,
“বাড়ির ভেতরেই কি অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মেজবাহ্ শেখ? সততার বুলির পেছনে সবটাই কি অসত্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নগ্নতা?”
থেমে গেলো মেজবাহ্’র হাত। টেলিভিশনে একটা অস্বচ্ছ ছবি দেখা যাচ্ছে। যেখানে একটি আধ হাত ঘোমটা টানা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পেছনটা দেখা যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে মেজবাহ্'র অবয়ব। আরেকটি ছবি আজ সকালেরই। হসপিটালে ভাইয়ের কলার ধরে রাখা দৃশ্যের।
সিকান্দার শিরোনামের দিক চোখ রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “কী করবেন ভাই? থানাতে যাবেন না-কি তুলে আনবেন?”
মেজবাহ্'র মাথায় সেসব যেন পরে এলো। প্রথম এলো অন্য ভাবনা। তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করল, “কখন থেকে এটা শিরোনাম চলছে?”
“প্রায় দেড় ঘন্টা”
“মেয়েটা দেখে ফেলেছে তবে?” প্রশ্নটা আবছা ভাবেই সিকান্দার বুঝল। ঠিকঠাক বুঝলোও না হয়ত।
মেজবাহ্ ছুটে চলে গিয়েছে ড্রয়িং রুমে। দ্রুত টেলিফোন তুলে নিয়েছে হাতে। এইসব সংবাদ ছাপানো কিংবা ছড়ানো সবাইকে পুঁতে ফেলতে তার দুই মিনিট লাগবে কেবল। কিন্তু চিন্তাতো অন্য জায়গায়। মেয়েটা যদি ভুল বুঝে ফেলে? তবে সে বোঝাবে কী করে? তার সর্বনাশ যে অন্য কারো চোখের জলে আটকে আছে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………