ভোরের হাওয়াটা গা কাঁপানো। গাড়ির জানালা খোলা থাকায় একটা শীত শীত ভাব জেঁকে ধরে আছে গায়ে। সিকান্দারের তো এক-দু'বার হাত ঘুরে যাচ্ছিলো শীতে। এই উষ্ম, গ্রীষ্মকালেও এই ভোরের বাতাসটা গায়ে এসে লাগার মতোই তীব্র ঠাণ্ডার। তবে মেজবাহ্ কিচ্ছুটি বলল না, নড়ল না। চুপচাপ বসে আছে এক মনে। চোখগুলো তার কিছুটা লাল দেখাচ্ছে। সারারাত বেশ ঝক্কি পোহানো হলো কিনা। একবার থানায় যাওয়া, এরপর চ্যানেলের সাংবাদিকদের খোঁজ নেওয়া। সিকান্দার বেশ কয়েকবার তাকে ফিরে যেতে বললেও সে বাড়ি ফিরতে নারাজ। অবশ্য এটাও বা স্বাভাবিক নয় কি?
সিকান্দার মেজবাহ্'র সাথে কাজ করে আজ ছয় বছর। এই ছয় বছরে সে মেজবাহ্'কে যেমন দেখেছে এমন একজন মানুষের চরিত্র নিয়ে অন্তত কালি ছোঁড়াটা উচিত হয়নি। জঘন্যতম অপরাধ হয়েছে।
সিকান্দারের দৃষ্টি ছুটন্ত পথের বাঁকে। তবে খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, “ভাই, আজকের দিনের মাঝেই আমি সেই সাংবাদিকের খোঁজ ঠিক বের করব। আপনি গিয়ে ঘুম দিবেন। উঠে দেখবেন আপনার অপরাধী হাজির।”
“হুহ্।” মেজবাহ্ বেশ ছোটো স্বরে উত্তর দিলো। যেন ভেতরে উত্তর দেওয়ার আগ্রহটুকু নেই। সিকান্দারের খারাপ লাগলো। ভাইকে স্বাভাবিক করার জন্য পুনরায় বলল,
“আমি জানি আপনার মন খারাপ ভাই। কিন্তু বলব এসব বিষয় গায়ে মাখবেন না। বুঝতে পারছি চরিত্রের বিষয়টা খুব ভয়াবহ। তবুও বলব শান্ত থাকতে।”
“আমি অব্দি বিষয়টা থাকলে আমি শান্তই থাকতাম। কিন্তু আরও একটি মেয়েকেও জড়ানো হয়েছে ব্যাপারটায়। একবার ভাবতে পারিস, সেই মেয়ে যখন জানবে এই সংবাদটা তার কেমন লাগবে ঠিক? আমিতো ছাড়ব না, সিকান্দার। এই ঘটনার সাথে জড়ানো প্রত্যেকটা মানুষকে আমি ধ্বংস করে দিবো। কথা এখন আর মেজবাহ্ শেখ অব্দি নেই। কথা চলে গিয়েছে আমার বাড়ির মেয়ে-বউদের সম্মান নিয়ে। আমি এই অধিকার কাউকে দিইনি। দিবোও না। শাস্তি আমি দিবোই।”
কথা শেষ করে মেজবাহ্ এবার সিকান্দারের দিকে মুখ ফেরাল। তাকে অত্যাধিক গম্ভীর দেখাচ্ছে। কথাও বলছে খুব গাম্ভীর্যের সঙ্গে। যেমন করে দলের মিটিং-এ বলে তেমন। সিকান্দার বুঝল বিষয়টা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবে নিয়েছে ভাই। না নিয়েও বা কী করার? রাজনীতির মাঠটা এতটাই নোংরা যে মা, বোনও ছাড় পায় না। জঘন্য বিষয়।
শেখ বাড়ির বিরাট লোহার গেইটটা মেজবাহ্ শেখের গাড়িগুলোকে দেখতেই খুলে দিলো দারোয়ানরা। একে একে তিনটি গাড়ি এসেই থামল। ছেলেগুলো নেমে দাঁড়িয়েছে পরপর। একটি ছেলে এসে মেজবাহ্'র দিকের দরজাটা খুলে দিলো। ছেলেটির নাম লিমন। মধ্য স্বাস্থ্যের শরীর। কালো গায়ের বর্ণ।
মেজবাহ্ নামতেই খুব সাবধানে গাড়ির দরজাটা আটকে দিলো ও। মেজবাহ্'র দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে বেশ অনুগত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কয়টার দিকে আসব আবার, ভাই? না-কি সিকান্দার বলবে? আজ আপনি একটু ঘুমান। আমরা দেখে নিবো।”
মেজবাহ্ কিছু বলার আগেই সিকান্দার গাড়ির ওপাশ থেকে নামতে নামতেই বলল, “ভাইকে বিরক্ত করিস না। আমরা দেখে নিবো ব্যাপারটা।”
মেজবাহ্ বেশ জোরে একটা শ্বাস ফেলল। গাড়ি থেকে নামা প্রত্যেকের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
“তোরা আজ সবাই বিশ্রাম কর। আমি ডাকব পরে।”
“না ভাই, এই সময়ে কি ঘুম আসব না-কি! আপনি আমাদের বলবেন কী করতে হবে। আমরা করব।”
“একবার বলেছি যেটা সেটাই হবে। একটা কথা উনিশ-বিশ যেন না-হয়। সিকান্দার বন্দুকটা গাড়িতেই আছে। আমার টেবিলে রেখে আসবি। আর তুইও এখন বিশ্রাম করবি।” কথা শেষ করে এক মুহূর্ত দাঁড়াল না মেজবাহ্। এত হন্তদন্ত পায়ে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেলো যেন তার রাজকার্য বাকি।
লিমন প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। ভাই সাধারনত এত রুষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলে না যে! তাই মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যায় ওরা।
সিকান্দার বিষয়টা পাশ কাটানোর জন্য বন্দুকটা পকেটে ভরতে ভরতে বলল, “লিমইন্যা, ঘুম দে গিয়া। সারা রাত ডাকাইতের মতো জাইগা ছিলাম। আমি তোদের ডাকব দরকারে। ভাইয়ের সব কথা মানতে হবে এমন কোনো কথা নাই। যা তোরা।”
সিকান্দারের কণ্ঠে আশ্বাস পেলো লিমন। সকলকে ইশারা করল যার যার অবস্থানে যেতে। সিকান্দারও একবার ট্রিপ্লেক্স বাড়িটির দিকে তাকিয়ে আলগোছে মেজবাহ্'র বাড়িটায় ঢুকে পড়ল। যদিও আগে গেস্টহাউস ছিলো এটা তবে এখন মেজবাহ্'র বাসস্থানই বটে!
মেজবাহ্ পাঞ্জাবির বোতাম গুলো খুলে ফেলেছে ঘরে আসতে আসতেই। কনুই অব্দি থাকা গোটানো হাতাটা খুলতে খুলতে ঘরে ঢুকতেই কিছুটা অবাক হলো সে। বিছানায় বসে থাকতে দেখল তার আম্মা রেণুকা বেগমকে। বেশ শাড়িটাড়ি পরিহিত সুস্থ রুচির নারী ওর মা। আধুনিকা বলা যায়। চুলগুলো এখনো বেশ কালো। তবে ঘাড় অব্দি।
চোখে সোনালি রঙের চিকন ফ্রেমের পাওয়ারের চশমা। ছিপছিপে গড়ন। ফর্সা শরীর, টিকালো নাক। মেজবাহ্ নিচের উচ্চতা, নাকটা মায়ের মতোই পেয়েছে। গায়ের রঙটা ধবধবে ফর্সা যদিও নয় তবে ও উজ্জ্বল ফর্সা বটেই।
মা’কে দেখেও অবাক হওয়াটা প্রকাশ করল না সে। যেন মায়ের ও বাড়ি ছেড়ে এ বাড়িতে থাকাটা বেশ স্বাভাবিক। এমন ভঙ্গিতেই হাতের ঘড়িটা খুলে রাখতে রাখতে বলল,
“ঘুমোওনি, আম্মা? নাকি ভোরে উঠলে?”
রেণুকা বেগম বেশ সাবলীল ভাবে হাতে থাকা এতক্ষণের বইটি নামিয়ে রাখলেন ছেলের বিছানায়। শুভ্র সাদা বিছানায় কালো বইটা অন্যরকম লাগল।
“তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভোর হলো ফিরতে তোমার?”
“কাজ ছিলো।”
“সন্তান বড়ো হলে জবাবদিহিতা চাইতে নেই, জানি। তোমার আব্বাতো বারবার নিষেধই করবেন আমি যেন তোমার ব্যক্তিগত জীবনে কথা না বলি। একটা বয়সের পর সন্তানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলাও অস্বস্তিজনক। তবে মেজবাহ্, মাঝে মাঝে বলতেই হয় না চাইতেও। আমি আজ একটু সেসব নিয়েই বলতে এসেছি। তুমি কি অনুমতি দিচ্ছো বলার? শুনতে না চাইলে বিশেষ জোর নেই।”
রেণুকা বেগমের বাচনভঙ্গি গোছানো। ছেলের সাথে কথা বলার সময় তো তা আরও গোছানো থাকে। মেজবাহ্ সেই গোছানো ভঙ্গির অনুমতির উপরতো আর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ফেলতে পারে না। তাই ক্লান্ত থাকা সত্বেও সে মায়ের পাশে এসে বসল। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি আসল আপোসেই। মায়ের হাতটা নিজের দুটো হাতের মুঠোয় নিলো আলগোছে, “আম্মা, আর কখনো এভাবে অনুমতি নিবে না। আমি তোমাকে পূর্ণ অধিকার দিয়েছি আমার বিষয়ে কথা বলার। যদি তুমি সেই কথা নিজের বিবেকে সঠিক মনে করো তবে নির্দ্বিধায় বলবে।”
রেণুকা বেগমও হাসলেন। ছেলেটি তার মহা চতুর। নির্ঘাত বুঝেছে মা-বাবা চিন্তা করছেন তাই এমন মনভোলানো কথা বলতে এসেছে পাশে বসে। অন্য সময় হলে মোটেও শুনতো না। নিজের মনমর্জির মালিক সে। যা ইচ্ছে তা-ই করে। তবে কিছু কিছু সময় শিশুটির মতো মা-বাবার স্নেহতলে এসে বসে।
ছেলের পিঠে হাত বুলালেন রেণুকা বেগম। ধিমে গতিতে বললেন,
“তোমার বড়ো চাচীতো বেশ হম্বিতম্বি করেছেন গতকাল। আজ রিমঝিমের ডিসচার্জ হবে। তোমার বড়ো চাচী ওকে বাড়িতে আনতে নিষেধ করেছেন। বলেছেন যে মেয়ে বাড়ির ছেলেদের চরিত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ সেই মেয়ে বাড়িতেই থাকবে না।”
খুব ধীরস্থিরে কথাগুলো বলে থামলেন উনি। ছেলের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষাতেই বোধহয় এই সাময়িক বিরতি নিয়েছেন। মেজবাহ্ নিজের মায়ের অঙ্গভঙ্গি দেখলে সহজেই বুঝতে পারে কথা কতটুকু। এখনও বুঝল। মায়ের কথা আরও বাকি। তাই সে প্রতিক্রিয়া দেখাল না। স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
“এরপর?”
“আমি চাই তুমি এসব বিষয়ে কথা না বলো। আমি তোমার বড়োচাচীকে বলেছি বউ বাড়িতে ঢুকবে। তোমার দাদী, ছোটোম্মাও বলেছে। তোমার দাদাজান, আব্বাও আছেন। এই বিষয়টা আমরা সামলে নিবো। তুমি কিছু বলো না। অন্তত বাড়িতে তোমাকে নিয়ে কেউ কুরুচিপূর্ণ কথা বললে মা হিসেবে তা আমি সহ্য করতে পারি না। বুঝেছো তো?”
“বুঝলাম।”
“তুমি যাবে না তো?”
“যাব না।”
রেণুকা বেগম ভীষণ খুশি হলেন ছেলের কথায়। পিঠে হাত বুলালেন আরও, “তুমি বউমার সাথে তেমন কথা বলো না আর। যেহেতু দেশব্যাপী এটা দৃষ্টিকটু হয়ে ছড়িয়েছে তাই দূরে থাকাই ভালো।”
“আম্মা, দেশব্যাপী কী কথা হচ্ছে তা দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। আমার কথা হলো তোমরা কী ভাবছো? আর কেউ না জানলেও তো তোমার জানার কথা কেন মেজবাহ্ শেখ ঐ মেয়েটির জন্য কথা বলে?”
“জানি, জানি। কিন্তু সবার দেখার দৃষ্টি যে এক নয়।”
“না হোক। অন্তর যার যেমন সে তেমন করেই সব হিসেব করে, আম্মা। আমি সেসব হিসেব ধরি না। আমি চাই এ মেয়ে হয় সংসারে নিজের অধিকার বুঝুক নয়ত অধিকার ছাড়ুক।”
“কী বলো তুমি? কোথায় যাবে ও? দিন-দুঃখিনী মেয়ে। যাওয়ার জায়গা নেই বলেই তো আছে এখানে।”
“উনি যদি এই বাড়ি ছাড়েন তবে উনার ব্যবস্থা আমি করে দিবো। স্বয়ং মেজবাহ্ শেখ উনার জীবনের ভার নিবে। উনি ছাড়ুক একবার।”
“আবার তুমি এসব বলছো? এসব দৃষ্টিকটু দেখায়! তাছাড়া ওটা তোমার বড়ো ভাইয়ের সংসার। ভাঙার কথা ভাবাও পাপ।”
“সংসার যদি কারো জাহান্নাম হয় তবে ভাঙার পথটাই উত্তম, আম্মা। তুমি অন্তত সংসারের দোহাই দিয়ে একটি মেয়েকে মরতে দিতে পারো না। আশা করি না তোমার কাছ থেকে সেটা।” দুরন্ত গতিতে কথা শেষ করেই মায়ের পাশ থেকে উঠে গেলো ছেলেটা। জামাকাপড় নিয়ে চলে গেলো গোসলে।
রেণুকা বেগম বিছানাতে বসেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি চান না সংসারটা ভাঙুক। ছেলের জন্য চিন্তা হয় যে বড়ো! ছেলেটা মনে মনে কী না কী ভেবে বসে আছে কে জানে? বয়স তো একত্রিশ পেরিয়ে যাচ্ছে বলে অথচ বিয়ের নামগন্ধ নেই। মায়ের মনে এতটুকু দুশ্চিন্তা যে হবেই।
—————
প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে সংবাদপত্রে চোখ বোলান যাবের শিকদার। পায়ের উপর পা তুলে চা খেতে খেতে দেখে নেন প্রতিটি পাতা। উকিল বলে কথা, দেশের মানুষ নিয়ে একটু খোঁজ যে রাখতেই হয়!
জোহরা হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গিয়ে একবার দেখে নিলো নাস্তার বিষয়টা। সকালে ভারি খাবার হয় শিকদার বাড়িতে। আজ হচ্ছে বউয়াভাত আর ভর্তা। ইমন ভাইয়ের বিশেষ পছন্দের খাবার। টুইটুবানি সপ্তাহে একেকদিন একেকজনের পছন্দের খাবার তৈরি করে বেশ আনন্দ নিয়ে।
জোহরা ডাল ভর্তা আর আলুভর্তাটা করে দিলো। টুইটুবানি যদিও পছন্দ করে না ওদের রান্নাঘরে আসাটা। তবুও জোহরা যতটুকু পারে চেষ্টা করে সাহায্য করার।
“মেজো আপা, আপনে যানতো এইখান থেইকা। ছোটো আপারে উঠান। রান্নাঘরের গরম সহ্য হয় না আপনাগো। কথা হুনেন না একটুও আপনেরা।”
জোহরা আলু কচলাচ্ছে মন দিয়ে। অন্যমনস্ক গলায় বলল, “তোর সহ্য হলে আমাদেরও হবে। চুপ করে কাজ কর।”
“কালা হইলে আব্বারই তো যৌতুক দিয়া বিয়া দেওন লাগবো। আব্বার কথা ভাইবা কই আমি।”
জোহরা ভ্রু দু'টি কুঁচকে ফেলল। ভর্তাটা গুছিয়ে হাত ধুতে ধুতে বলল, “যৌতুক কে দেয় এখন? তাছাড়া সেসব দিয়ে আমি বিয়ে করবও না।”
“আপনের দেওনও লাগব না। মাশাআল্লাহ্ দিলে যেই চুল আর সুরুত! মাইনষে মাগনা নিবো। আমার মতো হইলে চিন্তা আছিলো।”
“তোর মতো মানে? তোর কি সমস্যা আবার?”
“আপনেও না! সব কথা খুইলা কইতে হয়? বুঝবার পারেন না? গায়ের রঙডা দেখছেন আমার? কে নিবো কন? আমি অবশ্য বিয়া করতামও না। আমি বিয়া করলে আব্বারে কে দেখব? আমি এইহানেই আজীবন থাইক্যা যামু। সিনেমা করমু আর আব্বার যত্ন নিমু।”
“তোকে বলেছি না এসব বলতে না? তুই কত মিষ্টি জানিস? আমি তোকে লাল টুকটুকে বউ সাজিয়ে বিয়ে দিবো দেখিস। কথা দিলাম।”
টুইটুবানি একটু তেড়ছা ভাবে তাকালো এবার, “আপনে? আর বিয়া? সামাইন্য পাউডারই দেন না আবার বিয়া।”
টুইটুবানির কথা শুনে নাকের পাঁটা ফুলে উঠল জোহরার। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
“আমার সব পাউডার তুই সবসময় শেষ করিস আর এখন এই দোষ দিলি? আর আসিস আমার পাউডার ধরতে।”
“হইছে হইছে, আর ধরতাম না। ইমন ভাই নাইলে আব্বারে বলমু আইনা দিতে।”
“কত বছর ধরে এক কথা বলছিস, হ্যাঁ? এগুলো বলে বলে আমার সব জিনিস ব্যবহার করছিস।”
“এত কিপটা আপনে, মেজো আপা! আমারতো মাঝে মাঝে মনে হয় আপনে মনে হয় দুলাভাইরে না খাওয়াইয়াই রাখবেন।”
টুইটুবানি দমবার পাত্রী নয়। মুখের উপর নানান ধরণের কথা বলে জোহরার ধৈর্যর পরীক্ষা নিতেই থাকবে তাই জোহরা একবার চোখ রাঙিয়ে বেরিয়ে গেলো। জোহরাকে ওভাবে বের হতে দেখে ইমন রান্নাঘরে একবার উঁকি দিলো। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কিরে? ও এভাবে বের হলো কেন? কিছু বলেছিস না-কি?”
ইমন ভাইয়ের জেরায় অভিমানে ঠোঁট বাঁকালো টুইটুবানি। বিড়বিড় করে বলল, “হ, খালি আমিই বলি। আর কেউতো কিছু বলে না আমায়।”
টুইটুবানির অভিমানী স্বভাবটা অনেক। ইমন হেসে ফেলল,
“তুই কি আবার কিছু বলিস না-কি। পৃথিবীতে তোর চেয়ে শান্ত মেয়ে আর দু'টো নেই।”
“তুমি আমার লগে মশকরা করো, ইমন ভাই?”
ইমন দুহাত তুলে ফেলল ধরা পড়া অপরাধীর মতো। মুখ নামিয়ে আলাভোলা ভাবে তাকিয়ে বলল, “আমার ঘাড়ে ক'টা মাথা আছে বল?”
“আমারে একটা পাউডার আইনা দিবা। মোজো আপা কথা শুনায় অনেক। তার পাউডার আমি আর ধরব না।”
“আর কী লাগবে?”
“ছুনুও।”
“আর?”
“তিব্বত ছুনু আইনো। আর দুইডা লাল ফিতা।”
“আর?”
তীর্যক ভাবে তাকাল এবার টুইটুবানি। সন্দিহান স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “মজা করতাছো?”
ইমন দু'পা এগিয়ে এলো। পকেট থেকে টাকা বের করে রাখল থালাবাসনের ঝুরিতে,
“যা লাগবে নিয়ে আসিস। এই যে টাকা দিয়ে গেলাম, কেমন? আর তোর মেজো আপার সাথে তর্ক করিস না কিন্তু এত। ওর মাঝে মাঝে মাথায় ছাঁট উঠে। দেখা যাবে তখন রেগে দুটো কিল-ঘুষি লাগিয়ে দিবে তোকে। আমি আর বাবা কিন্তু বিচার করতে পারব না তখন। ওর এই রোগটা যাচ্ছেতাই।”
খাবার টেবিলে ঝিমুনি কেটে খাবার চিবুচ্ছে প্রেমা। বাকিদেন চোখে ঝিমুনি নেই তেমন। আজ যাবের শিকদারের মনযোগ সংবাদপত্রে কিছুটা বেশিই। এত ধ্যানে ডুবে রয়েছেন যে খাবারের প্লেটে একবারও হাত দেননি।
টুইটুবানি গুছিয়ে রেখেছে সবার সামনে সবটা। আব্বাকে খেতে না দেখে তার বিজ্ঞ মনটা ছটফট করল, “আব্বা, খান। খাবার যে ঠান্ডা হইয়া গেলো।”
“খাচ্ছিতো, দাঁড়া।” যাবের শিকদারের ধ্যান তখনও সংবাদপত্রে।
ইমন বাবার এত মনযোগ দেখে কৌতূহলী হলো, “আজ কি কোনো বিশেষ সংবাদ ছাপানো হয়েছে? এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছো, বাবা?”
যাবের শিকদার কপাল কুঁচকে রেখেই ছেলের দিকে একবার তাকালেন। বেশ মগ্ন হয়ে বললেন,
“সিলেটের ঐ তরুণ নেতাটা আছে না? মেজবাহ্ শেখ যে? ওকে নিয়ে খবর ছেপেছে।”
ইমনের হাত থেমে গেলো প্লেটেই। থেমে গেলো বাকিদের হাবভাবও। ইমন থমথমে হয়ে গেলো সেকেন্ডেই, “কী ছেপেছে? কী করেছে ঐ চতুর লোকটা?”
“বাড়ির ভেতরে ভাবীর সাথে না-কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে! শিরোনাম পড়েই তো গা গোলাচ্ছে। এ-ও সম্ভব!”
“অসম্ভব। এমনতো মনেই হয় না।” ঝিমুনি ভেঙে আচমকাই বলে উঠল প্রেমা। এতটাই আচমকা যে সবাই ওর দিকে তাকালো প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে।
জোহরা আড়চোখে তাকিয়ে সন্ধানী গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুই এতটা শিওর কীভাবে?”
প্রেমা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। আমতা-আমতা করল খানিক, “উনাকে নিয়ে তোমার সাথে বসেই তো ইন্টারভিউ দেখেছি কতগুলো। কত সংবাদও পড়েছি ভালো ভালো। কখনো তো মনে হলো না এই লোক এমন। আমাদের কলেজেও তো এসেছিল না গতবার? কত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলল!”
—————
হসপিটালের বেডে রুগ্ন শরীর নিয়ে শুয়ে আছে রিমঝিম। একবার উঠে বসেছিলো। ছোটো কাঁচটার বাহিরে তখন দেখেছিলো বেশ কয়েকজন লোককে। হয়ত পাহারায় দাঁড় করিয়েছে ওদের। যতই হোক, শেখ বাড়ির বউ বলে কথা। বাহ্যিক জাঁকজমকের অপূর্ণতা থাকার কথা নয়।
রিমঝিমের আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝেই খয়েরী রঙের টি-শার্ট পরা রাহাত এসে ঢুকল কেবিনটায়। গোসল সেরে এসেছে বোধহয়। বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে তাকে। গতকাল থেকে এ ছেলেটাকেই ও সবচেয়ে বেশিবার দেখেছে। হসপিটালেই পড়ে ছিলো ছেলেটা।
রিমঝিমের হুট করে মনে পড়ল রাহাতের খেলার কথা। ও তো টুর্নামেন্টে গিয়েছিলো। তাহলে এখানে কী?
“তোমার তো টুর্নামেন্টে থাকার কথা, রাহাত? এখানে কেন? খেলা কি এত দ্রুত শেষ?”
রাহাত ওর হাতের ফলের প্যাকেট টা থেকে ফলগুলো বের করে ধুচ্ছিলো। আচমকা রিমঝিমের কথায় ওর ধ্যান ভাঙে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার রিমঝিমকে দেখে নিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে করতে বলল,
“খেলা জীবনে অনেক করা যাবে। আপনি সুস্থ হোন।”
রিমঝিম চমকে উঠল। তবে কি ছেলেটা খেলা রেখেই চলে এসেছে?
হত-বিহবল হয়ে পড়ল ও, “তুমি খেলা রেখে চলে এসেছো? এই বছর তোমার জন্য এই টুর্নামেন্ট কত প্রয়োজন ছিলো! কেন আসতে গেলে?”
“কেন আসব আবার? আপনার জন্য এসেছি।”
“আমিতো মরে যাইনি, রাহাত।”
“মরে গেলে আসতাম না। আপনার খাটিয়ার ভার অন্তত আমি নিতে পারতাম না। বেঁচে আছেন বলেই এসেছি।” একরোখা স্বরে উত্তর দিলো রাহাত। এরপর আলগোছে কাটা আপেলগুলো প্লেটে সাজিয়ে এনে রিমঝিমের হাতের কাছে রাখল।
থমথমে চোখে তাকিয়ে রইল রিমঝিম। দেখল সবটা। শেখ বাড়ির প্রতিটা ছেলের ভেতর এই জেদ বিষয়টা বেশ রয়েছে। এদের সাথে কথা বললে বাঁকা উত্তরটা সবার আগে পাওয়া যায়। এরা যেন প্রস্তুতই থাকে এইসব উত্তর দেওয়ার জন্য।
“আপেল গুলো খান। দাঁড়ানোর ক্ষমতাও তো মনে হচ্ছে নেই। ফলমূল খেয়ে শক্তি জোগান আবার স্বামীর হাতে মার খাওয়ার জন্য।”
রাহাতের খোঁচামারা কথায় আশ্চর্য হলো রিমঝিম। মুহূর্তেই কণ্ঠ ধরা দিলো রাগ, “তোমার ভাবী হই আমি। এভাবে কথা বলতে পারেন না।”
“আগে আমার ভাই আপনাকে বউ হিসেবে মানুক! এরপরতো ভাবী!” বেশ অবহেলা করেই বলল রাহাত। যেন এরচেয়ে অবহেলার নেই কিচ্ছুটি। নিজের পরিচয়ের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে মনঃক্ষুণ্ন হলো রিমঝিমের। সে পাশ ঘুরতেই বাহিরের হৈচৈ এসে কানে লাগল। কাঁচের ফাঁক গলিয়ে দেখতে পেলো বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এখানে আসার প্রয়াস চালাচ্ছে।
রাহাত এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো বাহিরে। রিমঝিমের কাছে বিষয়টা খটকারই লাগল। আজ অব্দি শেখ বাড়ির বাহিরে তাকে নিয়ে কোনো খবর হয়নি। তাকে কেউ জানে না। কখনো তাকে নিয়ে কথা হয়নি। অথচ এত সাংবাদিক চলে এলো তার অসুস্থতার খবর শুনে? সে তো তেমন বিশেষ কেউ নয়!
আলগোছে উঠে দাঁড়াল রিমঝিম। ওড়না দিয়ে খানিক ঘোমটা টেনে কাঁচটার সামনে দাড়াল বিষয়টা বোঝার জন্য।
রাহাত তো বেশ হম্বিতম্বি করে একাকার করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। চিৎকার, চেঁচামেচিতে ভরে গিয়েছে হসপিটাল।
সাংবাদিকরা তখনও প্রশ্ন ছুঁড়ছ অনর্গল। সেই অনর্গল প্রশ্নের মাঝে একটি প্রশ্ন এসে সোজা বিঁধল রিমঝিমের কানে,
“মেজবাহ্ শেখ ও তার ভাবীর ভেতরের সম্পর্কটি নিয়েই জানতে চাই আমরা। ভাবীর আড়ালে কি অন্য কোনো সম্পর্ক সত্যিই পুষে রেখেছেন মেজবাহ্ শেখ?”
রিমঝিমের পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো। সর্বনাশের বাতাস আগাম এসে লাগল তার গায়ে।
—————
রেণুকা বেগম নারী উদ্যোগক্তাদের পরিচিত মুখ। ক্লাবে আজ উনার বিশেষ মিটিং ছিলো। শেখ বাড়ির মানুষগুলোর জন্য এখন বিশেষ ভালো সময় নয় বিধায় যতটুকু পারছেন উনারা বাড়ি থেকে না বের হওয়ার কথাই ভাবছেন। তবে রেণুকা বেগমকে বের হতে হয়েছিলো। তিনি আবার নিজের কাজের বিষয়ে বেশ সচেতন। বের হওয়ার পর কোনো বিপত্তি না বাঁধলেও বিপত্তি বাঁধলো বিকেলে ফেরার সময়। ক্লাব থেকে বের হতেই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। সিকিউরিটি গার্ড দু'জনের সামনে দেখতে পেলেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিকদের। ওরা পারছে না সিকিউরিটি গার্ডদের টপকে চলে আসবে ভেতরে। উনার ক্লাবে আসার কথাটা নিশ্চয় কেউ পাব্লিক করেছেন। নয়ত এমনটাতো হওয়ার কথা নয়!
সাংবাদিকদের অগ্রসর পা ঠেকাতে পারল না সিকিউরিটি গার্ডরা
ওরা রেণুকা বেগমকে জেঁকে ধরলেন মৌমাছির মতো। কেউ কেউ সংবাদ লাইভ টেলিকাস্ট করছিলেন বলে রেণুকা বেগম সিকিউরিটি গার্ডদের চোখের ইশারায় রুক্ষ হতে নিষেধ করলেন।
তন্মধ্যেই ভেসে এলো প্রশ্ন, “আপনার ছেলে, তরুণ নেতা বলে নিশ্চয় গর্ব করতেন। এখন কেমন অনুভব হচ্ছে? দেশব্যাপী যেই গুঞ্জন ছড়িয়েছে তা নিয়ে আপনার মতামত কী?”
রেণুকা বেগম ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের নারী। রাজনীতি তিনিও নেহাৎ কম জানেন না। এমন উগ্র প্রশ্নের বিপরীতে তিনি রইলেন বর্ষার ভেজা মাটির মতনই নরম,
“দেশব্যাপী অনেক ধরণের মানুষ, অনেক ধরণের মত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে কারো বাড়ির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করে কে বা কারা এইসব মিথ্যে সংবাদ প্রচার করেছে তা জানাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কিছু বলতে হলে আমি সেই নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে বলব।”
“নোংরামো প্রকাশ পেয়েছে সেটাকে নিরাপত্তার ঘাটতি বলে কাটাচ্ছেন কি, ম্যাম?”
“নোংরামো? কোনটা? একজন ভাবী তার দেবরের সাথে কথা বলতে পারেন না? এটা নোংরামো হয়ে গেলো? আপনাদের ঘরে নেই এমন ভাবী, বোন, মা? তারা আপনাদের সাথে একা কথা বললে সেই ছবি ছাপালেই নোংরা হয়ে গেলো?”
“আমরা যতটুকু জানি ছবিটা মাঝরাতের তোলা তাও আপনাদের বাড়ির বাহিরের। সে সময় কী কথা থাকতে পারে একজন অবিবাহিত দেবর ও ভাবীর মাঝে?”
“সেই কথা নিশ্চয় জনগণকে জানানোর কাজ আমার নয়? আর তাছাড়া একজন মা'কে কেমন প্রশ্ন করতে হয় সেই ডিসিপ্লিনও আপনাদের জানা নেই। বিশেষ করে আপনার..” কথাটি বলে একটু থেমে লোকটার বুকে লাগানো নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে নামটা দেখলেন রেণুকা বেগম। তারপর দেখলেন চ্যানেলের নামটা। পুনরায় বললেন,
“মিস্টার শাহাবুদ্দিন হক, রাইট? চ্যানেলটা মনে রাখলাম। আপনার সাথে কথা ডিউ রইল। সব উত্তর পরবর্তীতে দিবো।”
এই কথাটি ধীরেই বললেন। এরপর হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন সেখান থেকে। উঠে বসলেন গাড়িতে। উনার সেক্রেটারি লোকটা গাড়ির সামনে ছুটে আসতেই তিনি গাড়ির কাঁচ নামালেন। চোখের ইশারায় পেছনের সাংবাদিকদের দেখিয়ে বললেন,
“প্রত্যেকটা চ্যানেলের নাম নোট করে মেজবাহ্'কে পাঠাও। তিলকে তাল বানানো প্রতিটা চ্যানেল যেন জনসম্মুখে ক্ষমা চায় সেই ব্যবস্থা করে ওকে বাড়ি ফিরতে বলবে। এর আগে নয়। বলবে এটা ওর মায়ের নির্দেশ।”
সেক্রেটারি জয়নাল উদ্দিন আর কথা বলতে পারলেন না। রেণুকা বেগম গাড়ির কাঁচ উঠিয়ে দিলেন। ড্রাইভারকে নির্দেশ করলেন গাড়ি হসপিটালের দিকে নেওয়ার জন্য।
—————
হাউজিং এস্টেটের পূর্ব দিকের এলাকা হলো আম্বরখানা। সেখানে মেজবাহ্'দের একটি গুদামঘর রয়েছে। ওদের ব্যবসার জন্য এখানে বড়ো একটি গুদামঘর রয়েছে যেটা ওদেরই জমির উপরে। গুদামঘর পেরিয়ে রয়েছে আরেকটি ঘর। বাহিরে শোরগোল নেই বললেই চলে। সারাক্ষণ কয়েকজন থাকেই গুদামঘরের দায়িত্বে। বাহিরে সন্ধ্যা প্রায়। কাক ডাকা থেমেছে সেই কখন। গুদামঘরের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে চিৎকার পাওয়া যাচ্ছে। এরপর আবারও চারপাশটা থমথমে।
মেজবাহ্ বসে আছে কাঠের চেয়ারটার উপরে। পায়ের উপর পা তুলে। হাতে থাকা পি স্ত লটা ঘোরাচ্ছে পরপর। সামনের দিকে তুখোর নজর।
“পিঠে নয়, পিঠে নয়। পশ্চাৎ দেশে হবে। এমন জায়গায় দাগ ফেলতে হবে যেন দুঃখ করে দাগও দেখাতে না পারে।”
এত অবলীলায় মারতে বলল যেন দুধভাত কাজ সেটি।
দুটো চ্যানেলের তিনজনকে হাঁটু ভেঙে বসিয়ে রাখা হয়েছে মেজবাহ্'র সামনে। এরাই বেশি বিকৃত করেছে সংবাদ। রস মিশিয়ে মানুষের চরিত্র নিয়ে খেলেছে। মেজবাহ্'র চোখে সেই অপমানের আগুন ধিক্ ধিক্ করে জ্বলছে।
“ভাই, হাড্ডি-গুড্ডিতে দিবো নাকি দুই একটা? ভেঙে দিবো হাত-পা?” লিমন ফুঁসতে ফুঁসতে জিজ্ঞেস করল। সিকান্দার কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেজবাহ্'র সঙ্গেই। ওদের দলের লিমন, হৃদয় আর অমল নামের ছেলে তিনটেয় সেবা করছে।
“না, না, ভাঙার দরকার নাই। চাপা মাইর হবে। বুক ফাটবে কিন্তু মুখ ফাটবে না, এমন।”
লিমন নির্দেশ পেতেই যেন না কাঠের মোটা লাঠিটা আরেকটু উপরে তুলবে কার আগেই চ্যানেলের একটা মধ্যবয়স্ক লোক বলে উঠল,
“আমরাতো ছাপাতে চাইনি। আমাদের কাছে নির্দেশ আসাতেই তো ছাপিয়েছিলাম।”
“সোনারা পথে আসছে, ভাই। তা কে আপনাদের নির্দেশ দিয়েছে স্যার?” সিকান্দার ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলল।
মেজবাহ্ তীর্যক নয়নে তাকালো। লিমনকে ইশারা করে বলল,
“দড়ি গুলো খুলে উনাদের চেয়ারে বসানোর ব্যবস্থা কর, লিমন। প্রথমেই যদি এভাবে মেনে যেত তাহলেতো আর আমাকে এত পরিশ্রম করতে হতো না। যা লিমন চায়ের ব্যবস্থা কর।”
মেজবাহ্'র নির্দেশ পেতেই সকলের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। চেয়ার টেনে টেনে বসালো প্রত্যেককে। বেশি কিছুই করা হয়নি। কেবল দু'টো করে বারি পরতেই মুখ দিয়ে কথা বের করেছে এরা। শাহবুদ্দিন হক নামের মধ্যবয়স্ক লোকটাতো চেয়ারে বসতেই পারলেন না। মুখ দিয়ে শব্দ করে উঠলেন ব্যথায়। চোখ-মুখও খিঁচিয়ে নিলেন।
সিকান্দার পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো লোকটার দিকে সাথে দিলো একটি ব্যথার ঔষুধ,
“খান, স্যার এটা খান। পোঁদের ব্যথা সেরে যাবে এক্কেবারে। মাঝে মাঝে টনটন করবে যদিও। লিমনটার হাতে শক্তি যাচ্ছেতাই। এজন্য তো বলেছিলাম ভালোই ভালোই সব বলতে। কিন্তু আপনারা? মেজবাহ্ শেখের আম্মার মুখের সামনে গিয়েও হেনস্তা করতে ভুলেননি। ডিউটি করার চেয়ে বেশি হেনস্তা করার মতলব ছিলো তাই না? নিশ্চয় বিপরীত দলের নেতারাও টাকা ঢালছে? তাই চাটতে শুরু করে দিয়েছেন। এজন্য একটু মালিশ দেওয়া হলো।”
মেজবাহ্ শেখ মিছিমিছি ধমক দিলো সিকান্দারকে, “আহ্, সিকান্দার! ভদ্রতা জানিস না? বড়োদের সাথে এভাবে কথা বলে?”
এরপর থেমে লোকটার দিকে তাকিয়ে বেশ মায়া মায়া কণ্ঠে বলল,
“আপনি ওর কথা ধরবেন না, স্যার। বলুনতো এইসব খোঁজ কে পাঠিয়ে ছিলো? ভালো ভালোই বলুন। নয়ত সিকান্দারটা বেফাঁস কথাই বলবে।”
শাহাবুদ্দিন হক পারছেন না সপাটে চড় বসাতে। কিন্তু ক্ষমতায় কি আর পারা যায়? তাই হার মেনে নিলেন,
“ঢাকা থেকে পেয়েছিলাম এই খবরটা।”
মেজবাহ্'র ভ্রু দু'টি কুঞ্চিত হয়, “ঢাকা?”
শাহাবুদ্দিনের পাশের ছেলেটা বলে, “হ্যাঁ। আমরা ঠিকানা দিবো। আপনারা তাদের ধরুন। আমাদের কোনো দোষ নেই।”
মেজবাহ্ লিমনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“উনাদের তোর দায়িত্বে রেখে যাচ্ছি, লিমন। আমি না বলা অব্দি ছাড়বি না।”
পরক্ষণেই সিকান্দারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ঠিকানা নিয়ে বের হ সিকান্দার। ঢাকা রওনা দিবো এখুনিই। মেজবাহ্ শেখের সাথে এ খেলায় যে নেমেছে তার শেষ আমি দেখে ছাড়ব। গাড়ি বের কর।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………