‘ড্যাড… হোয়াট অ্যাবাউট ডলফিন্স? আই ওয়ানা সি ওয়ান! অ্যান্ড অ্যান্ড, আই ওয়ানা সুইম। আই ওয়ান্ট টু সি ইউ ডুইং সার্ফিং টু!’
হৃদি বাবার কোলেই বসে উচ্ছ্বসিত চোখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। একের পর এক আবদার তার। আদিল মেয়ের কথায় ফিরে তাকায়। শান্তকে ইশারা করতেই সে ইয়টের ক্যাপ্টেনকে ডেকে আনতে লোক পাঠাল। রোযা ততক্ষণে ‘সার্ফিং’ কথাটার অর্থ বুঝে গেছে। ওই তো—সমুদ্রের বুকে কাঠের একটা বোর্ডের ওপর দাঁড়িয়ে স্রোত আর ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে বেড়ানো! কী ভয়ানক ব্যাপার! আদিল জানে ওসব করতে? জানতেই পারে। বড়লোক বাবার আদরের একমাত্র সন্তান ছিল সে। ছোটবেলা থেকেই নিশ্চয়ই কত কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছে। রোযা চটজলদি বলে ওঠে হঠাৎ -
‘না মা, সার্ফিং না। তোমার ড্যাডের কাঁধে ইঞ্জুরি আছে।’
হৃদির মুখটা সঙ্গে সঙ্গে লটকে গেল। ঠোঁট উল্টে মায়ের দিকে ফিরে বলল -
‘ভুলে গিয়েছিলাম। আর বলব না। কিন্তু মম, তুমি ড্যাডকে সার্ফিং করতে দেখোনি, না? ড্যাড লুকস হ্যান্ডসাম অ্যাট দ্যাট টাইম। উই হ্যাভ পিকচার্স। আমি তোমাকে দেখাব।’
মা-মেয়ে পুরোপুরি এড়িয়ে গেল আদিল মির্জাকে।রোযা আবার প্রশ্ন করে গেল -
‘মালদ্বীপ এসেছিলে আগে?’
‘উহুঁ।’
‘তাহলে কোথায় করেছে সার্ফিং?’
‘প্যারিসে। সুইজারল্যান্ডে। আরও অনেক কান্ট্রিতে। আমরা আগে কোথাও গেলে ড্যাড প্রায়ই সমুদ্রে মার্ফি করত। রাইট, ড্যাড?'
মেয়ের চঞ্চল মুখে ঠোঁট ছুঁয়ে আদিল আওড়ায়, ‘রাইট…’
আওড়াতে আওড়াতে আদিল তাকায় বাপাশে। রোযা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। উড়ছে তার লম্বা চুল, শাড়ির আঁচল। হাসছে মেয়ের মিষ্টি মিষ্টি কথায়। আদিল নিজের দৃষ্টি দীর্ঘসময় আর ফেরাতে পারে না।
সূর্যের ঝলমলে আলো এসে পড়েছে ডেকের ওপরে। সোনালি রঙে ঝিলমিল করছে সব। সমুদ্রের শব্দে মুখরিত চারিপাশ। ইয়টের ক্যাপ্টেন মাহবুব চৌধুরী ওপরে উঠে এলেন। এসে দেখছেন, শান্ত আর এলেন ডেকের ওপর বসে হাতের কুস্তি খেলছে। ডান হাতের সঙ্গে ডান হাতের লড়াই। তাদের সামনেই আদিল বসে আছে। পাশে ভীষণ রূপবতী এক নারী, আর তার কোলে মিষ্টি এক বাচ্চা। মাহবুব সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নুইয়ে নিলেন। গলা পরিষ্কার করে সালাম জানালেন। প্রত্যুত্তরে ভেসে এল আদিলের কণ্ঠ -
'সব ঠিকঠাক?’
মাহবুব সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, 'জি, বস। সমুদ্রে নামার ব্যবস্থা করেছি। আর আপনি চাইলে সার্ফিংও করতে পারবেন।’
রোযা বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে শান্ত আর এলেনের কুস্তি দেখছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তার উচ্ছ্বাস মিইয়ে গেল। দুজনের একজনও হারছে না। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেই যাচ্ছে।
‘শান্ত! ফাতরামি করলে কিন্তু একেবারে সমুদ্রে চোবাব তোরে!’
এলেনের কথার বিপরীতে শান্ত সরল হাসল মাত্র। পরমুহূর্তেই বাটপারি করে জিতে গেল। ব্যস, শান্তর উচ্ছ্বাসের আর শেষ রইল না। রোযা আড়চোখে আদিলের দিকে একবার তাকিয়ে আবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। হঠাৎই বলে বসল -
'আসুন, আমরাও কুস্তি খেলি। আমি জিতলে যা বলব, আপনি করবেন।’
রোযার কথা কানে যেতেই ইয়টজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এল কিছুক্ষণের জন্য। পরক্ষণেই শান্ত আর এলেনের গগনকাঁপানো হাসির শব্দে তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই দুজন বেলুনের মতো চুপসে গেল। মুহূর্তেই আগের মতো নির্বিকার মুখ করে রেখেছে যেন একটু আগে ওরা দুজন হাসেনি। রোযা পুনরায় ঘুরে তাকাল আদিলের মুখের দিকে। প্রত্যাশা নিয়ে শুধাল -
'কী হলো, খেলবেন?’
অবশেষে মুখ খুলল আদিল, 'আর আমি জিতলে?’
'আপনি যা বলবেন, তাই হবে।’
আদিলের চোখ হাসছে। তারা দুজন মুখোমুখি বসে ডেকের ওপর কনুই রাখল। আদিলের বিশাল হাতের থাবায় রোযার হাতটা প্রায় আড়াল হয়ে গেল। তাতেও রোযার আগ্রহে ভাটা পড়ে না। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিতে গিয়েই বোঝে পুরুষালি হাতটা একচুলও নাড়াতে পারেনি। পরমুহূর্তেই বিনাদ্বিধায় দুহাত লাগাল। দুহাতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে আদিলের হাতটা বাঁ দিকে নেওয়ার কসরত করে গেল রীতিমতো।
আশ্চর্যজনকভাবে হাতটা নড়লই না। যখন বুঝল, দুহাত দিয়েও সে আদিলের এক হাতের সঙ্গে কুস্তিতে পারছে না, তখনই বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। শরীরের সব শক্তি প্রয়োগ করায় চোখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। গলার শিরা পর্যন্ত ফুলে ভেসে উঠেছে। তারপরও আদিলের হাত একচুলও নড়াতে পারল না। আদিল একই ভঙ্গিতে বসে আছে। উল্টো সে নিজের শক্তিই প্রয়োগ করছে না। রোযার নরম-সরল দুহাতের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে -
'ব্যথা পাবা…।’
রোযা সে কথা কানে তুললে তো! প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েই গেল ব্যাঙের মতন লাফিয়ে। একপর্যায়ে আশপাশে তাকিয়ে দেখল, শান্ত আর এলেন সরে গেছে। সঙ্গে হৃদিকে নিয়ে গেছে। ঠিক তখনই আদিল এক মসৃণ ভঙ্গিতে রোযাকে হারিয়ে দিতে উদ্যত হয়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল এক আশ্চর্যজনক ঘটনা।আচমকা রোযা মুখ বাড়িয়ে আদিলের ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁটজোড়া চেপে ধরল সেকেন্ডের জন্য। সঙ্গে সঙ্গে থমকে পড়ে আদিল মির্জার দুনিয়া। হতবাক হয়ে রোযার দিকে তাকাতেই সুযোগটা লুফে নেয় রোযা। দুহাতে আদিলের হাতটা বেঁকিয়ে শেষমেশ ডেকের ওপর নামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে -
'হেরে গেছেন! জিতেছি আমি!’
আদিল দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। দাম্ভিক লোকটাকে হুড়মুড়িয়ে কাছে আসতে দেখেই রোযা সচেতন হয়ে ওঠে। অতচ জিতেও হারার মতো মূল্য চুকাতে হলো তাকে। জিতে লাভের চেয়ে বুঝি লসই হয়ে গেল!
—————
সময়টা এখন ডিসেম্বর। তবে জানুয়ারি আসতে আর বেশি দেরি নেই। গতকাল ঝলমলে একটি দিন ছিল। আজ অবশ্য মালদ্বীপের আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। তবু দুপুর পর্যন্ত নীলসাদাটে আকাশ ছিল। নীল সমুদ্র আর নীল আকাশ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। দুপুর গড়িয়ে যেতেই কালো মেঘে ঢেকে গেল নীলাভ আকাশ। খণ্ড খণ্ড কালো মেঘের গর্জনে সমুদ্রের উত্তাল স্রোতও যেন কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।
সমুদ্রের সেই উচ্ছ্বাস রোযা দেখছে কেবিনের বারান্দায় বসে। সেখানে ছোট্ট একটি টেবিল আর চেয়ার পাতা। কিছুক্ষণ আগেই এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসেছে সে। মগে ধীরে-সুস্থে চুমুক দিচ্ছে। বাতাস ছুটেছে বেশ। উড়িয়ে দিচ্ছে তার খোঁপায় আটকে থাকা এলোমেলো চুল আর শাড়ির অগোছালো আঁচল। রোযা সুন্দরভাবে শাড়ি পরতে জানত। বুঝদার হওয়ার পর থেকেই মা তাকে শিখিয়েছিলেন। শাড়ি পরার ক্ষেত্রে হাতও ছিল বেশ পাকা। তা আরও দু’ধাপ ওপরে উঠেছে ইদানীং, প্রতিদিন শাড়ি পরতে পরতে। আদিল তেমন কথাবার্তা না বললেও, তাকে শাড়িতে ভালো লাগে কথাটা কয়েকবারই বলে ফেলেছে। বোঝাই যাচ্ছে, সে চায় রোযা যেন প্রতিদিন শাড়ি পরে রানী ভিক্টোরিয়ার মতো সেজেগুজে বসে থাকে। প্রথমে আদিলের জন্য পরলেও এখন রোযার নিজের কাছেও শাড়িটা প্রতিদিন পরার মতো কিছুই মনে হয়। পরতেও তো তার তেমন সময় কিংবা সেফটিপিন, কিছুরই প্রয়োজন পড়ে না। সামলাতে পারে বেশ! ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক বসিয়ে রোযা তাকাল উত্তর দিকে।
ব্যক্তিগত এক নির্জন দ্বীপের কাছে এসে থেমেছে তাদের ইয়চট। এখান থেকে নির্জন, নীরব ভিলাটি দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত এমন আবহাওয়ার জন্য সমুদ্রের বুকে আর বেশিক্ষণ থাকবে না তারা! ভাবতে ভাবতেই হাঁচি দিয়ে উঠে রোযা। ঠান্ডা লেগেছে তার। গতকাল বেশ খানিকটা সময় সমুদ্রে নেমে সাঁতার কেটেছিল। হৃদিকে অবশ্য বেশিক্ষণ পানিতে থাকতে দেয়নি। তবে নিজে বেশ ডুবেছিল। সঙ্গে আদিলও নেমেছিল স্ত্রী আর মেয়ের নিরাপত্তার জন্য। সেই থেকেই হাঁচি-কাশি লেগে আছে রোযার। ক্রমান্বয়ে কাশতে কাশতে চোখমুখ লাল করে ফেলেছিল। তা দেখে আদিল যেমন ভীষণ খেপে গিয়েছিল তেমনি চিন্তায় তাকে অস্থির হতেও দেখেছে রোযা। বেশ কঠোরভাবেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছিল, যে কয়দিন তারা এখানে থাকবে, রোযা আর সমুদ্রে নামতে পারবে না। তা রোযা মানলে তো?
আদিলের কথা ভাবতে ভাবতে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। ঠিক আকাশের বুকে বসবাস করা নক্ষত্রের মতন। গতকাল থেকে রোযা কাশি দিলেই লোকটার চোখমুখের অমূল্ পরিবর্তন লক্ষ্য করে যাচ্ছে। তা দেখে রোযার সদ্য কঠিন, ভয়ংকরী প্রেমে পড়া হৃদয় ধড়ফড়িয়ে ওঠে আনন্দে। বাবামায়ের পরে কেউ যে তার এমন সাধারণ ঠান্ডা-কাশিতে মাথা ঘামাতে পারে স্বপ্নেও কখনো কল্পনাতে আনেনি। মানুষটার তার নিজের প্রতি এতো ভালোবাসা দেখে, কীভাবে নিজেকে থামাবে ডোবা থেকে? যত দিন যাচ্ছে এই প্রেমনেশায় আরও গভীর ভাবে ডুবছে রোযা। হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করতে থাকে মানুষটা আশেপাশে থাকলে। তার দৃষ্টি, সব চিন্তাভাবনা তাকে ঘিরেই থাকে ওসময় জুড়ে। রোযা ক্রমাগত অসহায় হয়ে পড়ে নিজের কাছেই। কফির মগটা টেবিলের ওপরে রেখে রোযা বা-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে বুক। চোখ বুজতেই কানে এসে বিঁধে থমথমে সেই কণ্ঠ, যা শোনার জন্য একরকম উতলাই হয়ে থাকে রোযা -
‘ঔষধ খেয়েছে তোর ম্যাডাম?’
প্রত্যুত্তরে ক্লান্তর জবাব অস্পষ্ট শোনালেও আদিলের ভারি কদমের আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। কেবিনে প্রবেশ করতে করতে ডাকছে, ‘রোজ-আ…’
সে ডাকে রোযার হৃৎপিণ্ডের ধড়ফড়ানো বেড়ে যায় যে। চোখদুটো আরও শক্ত করে বুজে কুঁজো হয়ে পড়ে রীতিমতো। আদিল কেবিন ঘুরেফিরে এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দার কাছে। রোযাকে ওভাবে দেখেই তার থমথমে মুখের পরিবর্তন ঘটে। রাজ্যের চিন্তার ভাঁজ পড়ে কপালে। কদমের গতি বাড়ে, কণ্ঠ পরিবর্তন হয় একনিমিষেই -
‘শরীর খারাপ লাগছে? পেট ব্যথা করছে নাকি?’
বলতে বলতে আদিল দু-পায়ের পাতায় ভর দিয়ে বসে রোযার সামনে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় মাথার বাম পাশটা। রোযা ওভাবেই ছেড়ে দেয় নিজের শরসমস্ত নিয়ন্ত্রণ, ভার। সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ে আদিলের শক্তপোক্ত বুকে। বুকের ভাঁজে ভাঁজে মিশে নীরব হয়ে রয়। আদিল হতবিহ্বল হলেও পরমুহূর্তে পিঠ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে গেল, খসখসে মিহি স্বরে নিজের মতো -
‘খারাপ লাগা চেপে রেখ না। বুক ধরে ছিলে কেন? বুক ব্যথা করছে? ডক্টর ডাকি।’
রোযা স্বাভাবিক হয়েছে। আদিলের শরীরে নিজের ভার রেখে মাথা তুলে তাকায় ধূসর চোখ দুটোতে। বড্ড কাছ থেকে। হঠাৎ ধমকায় সে -
‘আপনি এসেছেন ভ্যাকেশনে। আপনি অসুস্থ মানুষ। গু লি খেয়ে এসেছেন রেস্ট নিতে। আপনি বারবার নিচে ওই বুড়োদের সাথে কীসের কথা বলেন মনিটরের সামনে বসে?’
আদিল মির্জাকে এমনভাবে ধমকানোর সাহস সম্ভবত পৃথিবীতে একজনেরই আছে। সে আবার ঠিক তারই বুকের ভাঁজে মিশে আছে মাসুম বিড়ালের মতো। অথচ কথার ধাঁচ দেখ! আদিলের চোখদুটো হাসল। স্ত্রীর ধমকানো সুরে বেশ বাধ্য গলায় জবাবে বলে -
‘আপনার হাসবেন্ড গু লি কাঁধে খেয়েছে, মিসেস মির্জা। মুখের ভেতরে না!’
রোযা চোখ রাঙায়। আদেশের মতো করে বলে, ‘মুখ খুলুন তবে। দেখিই।’
আদিলের ঠোঁটের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে ওঠে হাসির আভাস।
‘কী হলো, হা করুন!’
আদিল মুখ খোলে। চোয়াল আলগা করে ছোটোখাটো হা করার আগেই রোযার ঠোঁটদুটো শব্দ করে এক গভীর চুমু খায় তার দু ঠোঁটের ফাঁকে। তাজ্জব আদিলের চোখমুখ নরম দুহাতের ভাঁজে নিয়ে বুলিয়ে দিয়ে রোযা নিজের মতো বলে যায় অনেককিছু। ফলে লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয় আদিলের অস্বাভাবিক চোখমুখ। অনুভূতিতে বুজে এসেছে যার চোখ। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়েছে, ভেসে উঠেছে গলার রগগুলো।
‘হাতের ক্ষত এখনো কাঁচা। আপনি নিজের ভালো বোঝেন না কেন? দেখি, ঘুরে বসুন। কাঁধটা দেখি। সকালে যখন ড্রেসিং পরিবর্তন করে দিলাম, তখনও হালকা রক্ত ভেসে উঠেছিল। এমন হতো না, যদি আপনি ঘাউড়ামি করে সমুদ্রে না নামতেন।’
রোযার নরম শক্তির ইশারায় ঘুরে বসল। তবে ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়েই থাকল সুন্দর, ঝলমলে মুখের দিকে। রোযা শার্টের বোতামগুলো খুলে ভীষণ সাবধানের সাথে ছুঁলো ব্যান্ডেজ করা জায়গাটুকু। পর্যবেক্ষণ করল কিছুক্ষণ। মুখ নামিয়ে ক্ষ ত জুড়ে ঠোঁট স্পর্শ করতেই চোখ বুজল আদিল। একমুহূর্তের জন্য মাত্র। পরমুহূর্তেই পাগলাটে হাওয়ার গতিতে ফিরেই চেয়ারের সাথে চেপে ধরল শীর্ণ শরীরটা। মুখ নামিয়ে নিজের রুক্ষ ঠোঁটের ভাঁজে ভাঁজে চেপে ধরল গোলাপি ঠোঁটজোড়া। উন্মাদ হয়ে গেল রীতিমতো। সমুদ্রের স্রোতের সাথে ভেসে বেড়াল সমুদ্রের থেকেও গভীর কণ্ঠ -
‘ইটস বার্নিং থ্রু মি—ইওর অ্যাফেকশন, ইওর টাচ… ইটস বার্নিং মি। ক্যান ইউ ফিল? ক্যান ইউ টেল, রো-জা… আমি পুড়ে যাচ্ছি।’
অথচ রোযার মনে হলো, সেই পুড়ে যাচ্ছে। তাকেই বুঝি মানুষটা নিজের তাপে পুড়িয়ে ফেলবে।
—————
শান্তর সঙ্গে ইয়ট ঘুরে ফিরেছে হৃদি। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। কেবিনে প্রবেশ করেই দু-চোখ ডলতে ডলতে সমানে ডাকছে -
'মম… মম!’
রোযা তড়িঘড়ি করে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এল। হাঁটতে হাঁটতে শাড়ির কুঁচি ঠিকঠাক করার পাশাপাশি চুলগুলোও গুছিয়ে নিল। মায়ের সান্নিধ্য পেতেই হৃদি পুরোপুরি ফুলের মতো নেতিয়ে গেল। দুহাত ছড়িয়ে দিতেই তাকে কোলে তুলে নিল রোযা। মেয়ের মাথার একপাশে ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করল -
'দেখতে পেয়েছো ডলফিন?’
ঘুমের তাড়নায় হৃদির উচ্ছ্বাস মিইয়ে গিয়েছে। রোযার ঘাড়ে চোখেমুখ ডুবিয়ে প্রত্যুত্তরে কেবল মাথা দোলাল। রোযা মেয়েকে গভীরভাবে বুকে জড়িয়ে পিঠ বুলিয়ে কেবিনের ভেতর পদচারণ করতে করতে তাকে ঘুম পাড়াতে লাগল। আড়চোখে বারান্দার দিকেও ঘনঘন তাকাল। আদিল তার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কানের কাছে ফোন ধরা, গম্ভীর স্বরে কথা বলছে। কথাগুলো অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
রোযা যেভাবে তার শার্ট নামিয়ে দিয়েছিল, এখনও সেভাবেই রয়েছে। সুঠাম, চওড়া পিঠের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও, আরও কয়েকবার তাকাল। কিছুক্ষণ পর আদিল বারান্দা থেকে বেরিয়ে এল। কেবিনে প্রবেশের পর থেকেই ধারালো দৃষ্টিতে রোযাকে আবদ্ধ করে রাখল। রোযা সেদিকে ধ্যান দিতে চাইল না। অথচ মন কথা শুনলে তো! আড়চোখে চেয়ে চেয়ে বারবার চোখাচোখি হতে থাকল তাদের। এইপর্যায়ে এগিয়ে এল আদিল। হৃদিকে নিজের কোলে নিয়ে নিল। ফাঁকা হাতের আঙুল দিয়ে রোযার গাল বুলিয়ে বলল -
'ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসো, নামব।’
রোযা চোখদুটো নাড়িয়ে মাথা দোলাল। আদিল মেয়েকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। বারান্দা থেকে কেবিনে প্রবেশ করছে বাতাসের ছটা। তীব্র গতিতে বাতাস বেড়েছে, মেঘের গর্জন আরও জোড়াল হয়েছে। এই বুঝি নামবে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।
—————
সমুদ্র সামনে। সমুদ্রজল ধেয়ে এলেও আদিল মির্জাকে ছুঁতে পারল না। সটানভাবে দাঁড়ানো তার একহাতে প্যান্টের পকেটে। অন্যহাতে সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরা। সমুদ্রের আওয়াজের পাশাপাশি শুধু শান্তর কণ্ঠ ভেসে বেড়াচ্ছে। বিস্তারিত সবটা শুনেও আদিলের চোখমুখে আহামরি পরিবর্তন না এলেও, কপালের ভাঁজ বাড়ল। এলেন বলে গেল পরপরই -
‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর তো যাও একটু বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। তার ভাই তো বলদ। পুরাই গোরু। ও কি নিয়মিত ঘাস খায়?’
শান্ত নাকমুখ কুঁচকে আওড়াল, ‘গোরুকে অপমান করিস না।’
ক্লান্ত অত্যন্ত সতর্ক হয়ে বলে, ‘বস, ম্যাডামের বাবার বাড়িতে এই নিয়ে দুবার হামলা করার চেষ্টা চালিয়েছে।’
আদিল সময় নিল। ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে অবশেষে আদেশ ছুঁড়ল, ‘সিকিউরিটি বাড়িয়ে দে। আর নৈবেদ্যকে সতর্ক থাকতে বল —’
ততক্ষণে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে। মেয়েলি কণ্ঠের ডাক পড়ল সাথে সাথে। রোযা দাঁড়িয়ে আছে ছাউনির নিচে। হাত নাড়িয়ে ডাকছে। আদিল সেদিকে চেয়ে থেকেই ফের বলল -
‘সতর্ক থাকতে বল। আঁচও যেন না আসে তাদের ওপর। দেশে ফিরে ওদের আমি দা ফনের ব্যবস্থা করব।’
শেষের কথাটুকু শুনে শান্তিতে ভরে উঠল শান্তর মন। অনেক সহ্য করেছে হারামি গুলোকে। এদের চ্যাপ্টার এবার ক্লোজ করার পালা। আনন্দে গুনগুন করে গানের দুটো লাইন গেয়ে বসের উদ্দেশ্যে বলতে চাইল কিছু। অথচ আদিল শোনার জন্য দাঁড়াল না। সে ইতোমধ্যে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছে। শান্তর চোখমুখে আনন্দ থাকলেও অভিনয় করে বলল -
‘বসও পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে…’
ক্লান্তও একপল চেয়ে বিড়বিড় করে, ‘ভালোবাসলে সিংহও হুংকার দিতে ভুলে যায়। আর ভালোবাসার বিপরীতে যখন ভালোবাসাই পায়, তখন সেই সিংহ দুহাঁটু গেড়ে মাথা নুইয়ে বসে।’
ক্লান্ত অন্যমনস্ক ছিল। তাই খেয়াল করতে পারেনি। হঠাৎ ধাক্কায় দু কদম এগিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে। শান্ত, ক্লান্তকে সমুদ্রে ফেলে শব্দ করে হাসছিল। অথচ পরমুহূর্তেই তাকে ধাক্কা মে রে সমুদ্রে ফেলল এলেন। শান্তর চোখমুখে পানি ঢুকেছে। পরনের কোট খুলে ও দৌড়ে লাগাল পালাতে চাওয়া এলেনের দিকে। হাসতে হাসতে ক্লান্তও ছুটেছে ওদের পেছনে। শান্ত আর ক্লান্ত দুজন মিলে ধরল এলেনকে। কাঁধের ওপরে ওকে তুলে ফিরে এলো সমুদ্রের বুকে। ওকে কাঁধে নিয়েই দুজন ঝাপিয়ে পড়ল স্রোতের ভাঁজে ভাঁজে। সমুদ্রের গর্জন, বৃষ্টির আওয়াজের সাথে মিশে গেল তাদের খিলখিল করে হাসতে থাকা শব্দ।
—————
ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে আদিল হালকা পাতলা ভিজেছে। রোযা দ্রুতো তাকে বসিয়েছে সোফায়। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে দিতে দিতে অসন্তুষ্ট হয়ে বলে গেল -
‘আপনার কমনসেন্স নিজের ক্ষেত্রে কাজ করে না, না? ক্ষ ত কাঁচা। আবার ব্যান্ডেজ ভিজলে কী অবস্থাটা হবে ভাবুন!’
আদিল উত্তর করল না। রোযা মাথা মুছে তোয়ালে নিয়ে ভেতরে গিয়েছে ফের। আদিলও অনুসরণ করল সে পথ। মাস্টার বেডরুমে হৃদি ঘুমুচ্ছে। বেডরুমের সাথে লাগানো খোলা বারান্দাটা বড়সড়। সামনের দৃশ্যটা নীলসাগরের বুকে ঝুম বৃষ্টির। রোযা এসে দাঁড়িয়েছে। তার শাড়ির বড়ো আঁচল উড়ছে বাতাসে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য হাজার বার দেখেও দেখবার তৃষ্ণা মেটে না। বাতাসের সাথে বৃষ্টির ফোঁটা চোখমুখ স্পর্শ করতেই রোযা হেসে ফেলল। প্রাণ খুলে হাসছিল সে। উড়ছিল তার লম্বা চুল। মুগ্ধ চোখে নীল সমুদ্রে চেয়ে মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে আওড়াল -
‘এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হয় না।’
আদিল প্রকৃতির চমৎকার দৃশ্য নয়, তার ব্যক্তিগত পৃথিবীর হাস্যোজ্বল মুখখানি দেখছিল, মুগ্ধ চোখে। ধূসর চোখের মণিতে ভাসছিল সুন্দর একটি মুখ। কানে বাজছিল রিনরিনে কণ্ঠের প্রাণবন্ত হাসির আওয়াজ। আদিলের কণ্ঠ সমুদ্রের থেকেও গভীর শোনাল -
‘আমার স্ত্রীর হাসিমুখের চেয়ে সুন্দর আর কিছু হয় না।’
রোযার দুনিয়া থমকাল বুঝি! গলায় আটকে রইল শ্বাসপ্রশ্বাস। অনুভব করল অস্বাভাবিক গতিতে হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। আদিল এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক পেছনে। দুহাতের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে ফিসফিস করল -
‘নাথিং ইন দিস ওয়ার্ল্ড ক্যান বি মোর বিউটিফুল দ্যান ইউ, মাই ওয়াইফ…মাই বিলাভড!’
রোযা শরীরের লোম দাঁড়াল, কেঁপে উঠল অস্তিত্ব। চোখ বুজে কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে গেল -
‘আপনার চোখে সমস্যা আছে।’
রোযার কানের খুব কাছে গম্ভীর কণ্ঠে আদিল ফিসফিসিয়ে গেল। তার চোখের তীব্রতা মুহূর্তেই হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়ে ফেলল -
‘দেয়ার ক্যান নেভার বি এনিথিং রং উইথ দি আইজ অব অ্যান অবসেসড লাভার।’
রোযা বিস্ফারিত চোখজোড়া মেলে তাকাল। ওতে জাগল হাজারো প্রশ্ন। ব্যাকুল ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল সে। আদিলের চোখমুখে আকুল হয়ে চেয়ে রইল সেই প্রশ্নের উত্তরের আশায়। আদিল বিপরীতে শুধু মাথাটা নোয়াল নিজের। মুখের খুব কাছে গিয়ে ছুঁলো ছোটো, নিখুঁত নাকটা। তারপর গাল, চোখ…। সেসব খানে ধীরে ধীরে ঠোঁটও ছোঁয়াল আদিল। রোযার ছলছলে, টলমলে মণিতে চেয়ে আরও নামাল নিজের কণ্ঠ -
‘সেদিন, সেদিন এই আদিল মির্জা জীবনে যা কখনো করেনি, ঠিক তাই-ই করেছিল। উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র তোমার জন্য। এক অপরিচিত মেয়ের জন্য আড়ালে সে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল…’
রোযার শ্বাস আটকে রইল। আদিলের চোখে সে নিজের সর্বনাশ ব্যতীত এইমুহূর্তে আর কিছু দেখতে পেলো না।
— অতীতের শুরু…
ঝকঝকে রাস্তা পিষে ছুটে চলেছে দামি কালো গাড়িগুলোর বহর। সামনে-পেছনে মোট সাতটি গাড়ি পুরো রাস্তা দাপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গতি অস্বাভাবিক দ্রুত, যেন প্রতিটি সেকেন্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে তারা। গন্তব্য –মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেট।
ব্যাকসিটে পায়ের ওপরে পা তুলে বসা আদিল মির্জার ঊরুতে ল্যাপটপ, স্ক্রিনে ভাসছে কোম্পানির ওয়েবসাইট। এযাত্রায় একবার হাতঘড়ির দিকে দৃষ্টি ফেলল। আর মাত্র দু মিনিট বাকি মিটিং শুরু হওয়ার। ঠিক দু মিনিট পূর্ণ হতেই গাড়ির বহর এসে থামল কোম্পানির পার্কিং লটে। সামনেই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আনোয়ার খন্দকার। এরই মধ্যে শান্ত তড়িঘড়ি করে ব্যাকসিটের দরজা খুলে ধরেছে। আদিল ধীর পায়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। কালো জুতোজোড়া চকচক করছে পড়ন্ত বিকেলের আলোয়। পরনে নিখুঁতভাবে মানিয়ে বসা কালো স্যুট। দুহাতে চকচকে কালো গ্লাভস। পরিপাটি করে পেছনে আঁচড়ানো চুল আর ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি, চারপাশের পরিবেশকে মুহূর্তেই তার নিয়ন্ত্রণচলে গেল।
আদিল হাঁটা ধরতেই তার পেছনে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলল শান্ত, এলেন ও আনোয়ার খন্দকার। মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেটের গ্রাউন্ড ফ্লোরে প্রবেশ করতেই প্রথমেই চোখে পড়ছে সুবিশাল রিসেপশন জোন। মালিকের উপস্থিতি টের পেয়ে অফিসে থাকা প্রত্যেকে যার যার স্থান থেকে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, তবে মাথা নোয়ানো -
'গুড ইভনিং, স্যার।'
আদিলের কদম থামে না, দৃষ্টিও নড়ে না। কারও দিকে আলাদা করে না তাকিয়েই সে এগিয়ে এল এলিভেটরের সামনে। এটি আদিলের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তিগত এলিভেটর। মুহূর্তেই দরজা খুলে গেল। আদিল প্রবেশ করতেই তার সঙ্গে ভেতরে ঢুকল শান্ত, এলেন ও আনোয়ার খন্দকার। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনোয়ার খন্দকার নিচু স্বরে জরুরি মিটিংয়ের আপডেট দিতে শুরু করলেন। আজকের মিটিংটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার এক প্রভাবশালী ক্লায়েন্টের সঙ্গে বৈঠক। আর এই আলোচনার ওপর নির্ভর করছে মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেটের নতুন এক বিশাল চুক্তির ভবিষ্যৎ।
গুরুত্বপূর্ণ এই মিটিং চলল টানা দু ঘণ্টা। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে শহরজুড়ে। একে একে জ্বলে উঠেছে সড়কের পথবাতিগুলো। দূরে, আকাশের বুকে রঙিন আলো ছড়িয়ে ফুটে উঠছে ফায়ারওয়ার্কস। মুহূর্তে মুহূর্তে আতশবাজির বিকট শব্দ ভেসে আসছে চতুর্দিক থেকে। নতুন বছরের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি মাত্র। বারোটা বাজলেই শুরু হবে নতুন একটি বছর। শহরের বুকজুড়ে আনন্দ। আলো, শব্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে পুরো শহর মুড়িয়ে আছে। আদিল তার ব্যক্তিগত কেবিনের কাঁচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। না ফিরে তাকিয়েও অনুভব করতে পেরেছে আনোয়ার খন্দকারের উপস্থিতি। আনোয়ার খন্দকারকে কিছুক্ষণ দ্বিধা করতে দেখা গেল। একপর্যায়ে কণ্ঠ নামিয়ে একরকম ফিসফিস করে শুধালেন -
‘বস, রয়্যাল কেফে থেকে কফি এনে দেব?’
ইঙ্গিতটা বুঝল আদিল। ধীরে মাথা ঘুরিয়ে নির্বাক দৃষ্টি ফেলল ভদ্রলোকের ওপর। সেই এক পলকের দৃষ্টিতেই আনোয়ার সাহেবের ঘাড়ের পেছনের ছোট ছোট চুলগুলো ভয়ে খাড়া হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে আর একটি শব্দও বেরোল না। নিঃশব্দে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন তিনি। আদিল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না এতে। নির্বিকার ভঙ্গিতে গিয়ে বসে নিজের চেয়ারে। সামনে টেবিলের ওপর একগুচ্ছ ফাইল সাজানো। সেগুলোই একের পর এক খুলে মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করে। আনোয়ার খন্দকার দাঁড়িয়েই আছেন। আড়চোখে বারবার পর্যবেক্ষণ করছেন আদিলের নির্বিকার চোখ-মুখ। তার অনুমান ভুল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কখনো না। তিনি আদিলকে এই জীবনে কোনো মেয়ের দিকে আলাদা করে তাকাতেও দেখেননি। সেখানে কাউকে অনুসরণ করা তো অনেক দূরের কথা! তবে…ছেলেটা চাইছে কী?
সময় নিজের গতিতেই এগিয়ে চলে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে জানিয়ে দিচ্ছে, নতুন বছর শুরু হতে আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি। অবশেষে আদিল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হ্যাঙার থেকে নিজের কোটটি নিয়ে পরতে পরতে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে পিছু নিল শান্ত ও এলেন। গ্রাউন্ড ফ্লোরে তখন অপেক্ষা করছিলেন আনোয়ার খন্দকার। এলিভেটরের দরজা খুলে বেরোতেই আদিল হাঁটতে হাঁটতেই শান্তকে সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিল। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই শান্ত আর এলেন ভিন্ন ভিন্ন কাজে বেরিয়ে পড়ল। আনোয়ার খন্দকার পিছু নিলেন আদিলের। উঠে বসলেন গাড়িতে, আদিলের পাশে। গাড়িগুলো ছুটল বাড়িধারার মেইনরোড ধরে।
বাসস্ট্যান্ডের বেশ কাছেই দ্য রয়্যাল ক্যাফে। নতুন বছর উপলক্ষে চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে জায়গাটি। দু-একজন কাস্টমার ছাড়া ক্যাফেতে তেমন ভিড় নেই। গাড়ি থামানোর নির্দেশ আদিল দেয়নি। ক্যাফের একপাশে এসে গাড়িটি নিজ উদ্যোগেই থেমে আছে। জানালার কাঁচ তোলা। বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায় না। ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে। নতুন বছর উপলক্ষে ক্যাফের কর্মচারীরাও আজ বেশ সাজগোজ করে এসেছে। অন্যমনষ্ক ধূসর চোখজোড়া কয়েকজনের মধ্যে চোখ বুলিয়েও সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল না। আদিল ধীরেসুস্থে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। আনোয়ার খন্দকারের ওপর রুষ্ট হলো। তবে তার চেয়েও বেশি রুষ্ট হচ্ছে নিজের ওপর। সচরাচরের চেয়েও গম্ভীর হয়ে উঠল মুখ। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল একটি মাত্র শব্দ -
‘ড্রাইভ।’
আনোয়ার সাহেব গাড়ি চালানোর ইশারা করতে গিয়ে আরেকবার আড়চোখে ক্যাফের দিকে তাকালেন। মুহূর্তেই জ্বলজ্বল করে উঠল তার চোখদুটো। ইনিয়ে-বিনিয়ে বললেন -
‘বস, ক্যাফের কর্মচারীগুলো কী ভদ্র, দেখুন!’
আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আনোয়ার খন্দকার ভড়কালেন তবু দমলেন না। ঠোঁট টেনেটুনে হাসি এনে রেখেছেন। অবশেষে আদিল তাকাল ফের। এক পলক, এই এক পলকে থমকে গেল তার দুনিয়া। স্থির হয়ে এল দৃষ্টি। এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতেও ভুলে গেল। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি। ক্যাফের সাদা আলো পড়েছে শরীরের ওপরে। কালো শাড়ি পরনে। গায়ের রংটা আরও ফুটে উঠেছে এতে। হাসছে মেয়েটা। প্রাণ খোলা, উচ্ছ্বাসে মাখানো হাসি। একটি বাগানজুড়ে হাজারো ফুল একসঙ্গে ফুটে উঠলেও হয়তো এমন প্রাণবন্ত দৃশ্য তৈরি হবার না। শান্ত বাতাস এসে তার খোলা চুলগুলো উড়িয়ে মুখের ওপর এনে ফেলছিল। মেয়েটি হাসতে হাসতেই দুহাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে নিচ্ছিল এলোমেলো ভাবে। গোলাপি ঠোঁটজোড়া নেড়ে কাউকে কিছু বলছে সে। আদিল আর কিছু শুনতে পাচ্ছিল না। আর কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। হিপনোটাইজড মানুষের মতো গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল সে। তার দৃষ্টির কোনো নড়চড় হলো না। পলক পড়ল না চোখের। শুধু সেই মেয়েটির দিকেই স্থির হয়ে রইল আদিল মির্জার দৃষ্টি। ভেসে বেড়াল তার কণ্ঠে উচ্চারিত নামটা -
‘আয়ত…তালুকদার…’
‘রোজ-আয়া…’
আনোয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন আদিলেন পেছনে। ঘড়ি দেখে নিয়েছেন। রাতের একটা। ক্যাফে বন্ধ করার সময়। রোযা নামের মেয়েটির সাথে একটি পুরুষ আছে। ভ্যাবলার মতন দেখতে। দুবার চেয়ে ভদ্রলোক আস্তে করে জানালেন -
‘ফিয়ন্সে ওটা। একেবারে ইডিয়ট একটা।’
আদিলের ধারালো, একগুঁয়ে চোখের সামনে দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রমশ। ছেলেটা রোযার ফর্সা হাতটা টেনে নিয়েছে নিজের হাতের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে এল আদিলের হাত।
মুষ্টিবদ্ধ আঙুলের ওপর শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল কেমন!ধূসর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে এতটাই ভয়ংকর দেখাল যে, আনোয়ার খন্দকার পর্যন্ত একবার তার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিছুটা এগোতেই ছেলেটার ফোন বেজে উঠে। সে রোযার হাত ছেড়ে কল রিসিভ করে। ফোনের ওপাশে কাউকে কিছু জানাতে জানাতেই রোযা তাকে কিছু বলে বোধহয়। পরক্ষণেই ছেলেটা উল্টোপথ ধরে চলে যাচ্ছে। হাউ ইরেসপন্সিবল! রোযা একা। নিজের পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
বারিধারার রাস্তাগুলো ততক্ষণে বেশ নির্জন হয়ে এসেছে। দুটো স্ট্রিটলাইট নষ্ট। আশপাশে কয়েকটা গলির মোড়। আদিল চোখ বন্ধ করে আছে। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে এক মুহূর্ত। গাড়িতে হেলান দিয়ে বসেছে। আনোয়ার সাহেবও কিছু না বলে সামনে তাকিয়ে রইলেন। এক মুহূর্ত পর তিনি হাতের ইশারায় গাড়িটিকে মেয়েটির পিছু নিতে বললেন।
দূরত্ব বজায় রেখেই গাড়ি এগিয়ে চলল। পুরোটা সময় আদিলের দৃষ্টি স্থির ছিল অদূরে হাঁটতে থাকা মেয়েটির ওপর।
জানালার কাঁচটা সামান্য নামানো। হঠাৎ—উত্তর দিক থেকে তিন-চারজন লম্বাচুল পুরুষ দৌড়ে এল। তাদের হাতে চাকু।
মুহূর্তের মধ্যেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরল নিরিবিলি হাঁটতে থাকা রোযাকে। অবাক হওয়ার বদলে রোযাকে দেখা গেল ঠান্ডা মাথায় প্রতিরোধ করতে। একজনকে চড় মেরে, আরেকজনকে লাথি দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে সে।
কিন্তু চারজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শক্তির সঙ্গে একা কতক্ষণই বা লড়বে? রোযার কণ্ঠ এবার রাতের নীরবতা ভেঙে উঠল!
সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে সে। হাওয়ার বেগে আদিলের হাত দরজার দিকে চলে গেল। তারপরপরই নিজেকেই থামাল সে। চোয়াল শক্ত করে আদেশ দিল -
‘গার্ড পাঠান, চাচা।’
আনোয়ার খন্দকার যেন সেই আদেশের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
হাত নামিয়ে ইশারা করতেই তাদের গার্ডরা ছুটে গেল সেখানে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চারজনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলো।রোযাকে আশ্চর্যরকম স্বাভাবিক লাগছিল। সম্ভবত সাহায্যকারীদের ধন্যবাদ জানাচ্ছিল সে। বলতে বলতেই হঠাৎ এদিকে উশখুশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল -
‘থ্যাংক ইউ, স্যার! থ্যাংক ইউ ফর ইউর হেল্প!’
মিষ্টি একটা কণ্ঠ। আদিল স্থির হয়। কণ্ঠটা যদি স্যার এর বদলে তাকে নাম ধরে ডাকত? আদিল? কেমন শোনাত? ওদিকে রোযা ততক্ষণে আটক চারজনের দিকে ফিরে তাদের দু-একটা চড় বসিয়ে দিয়েছে -
‘ছোটোলোক, বদমাশ, নরকে পুড়ে ম র।’
তারপর মাটিতে পড়ে থাকা পার্সটা তুলে নিয়ে আবার হাঁটা ধরেছে নিজের পথে। যেন কিছুই হয়নি। যেন এই সামান্য ঘটনা তার জীবনে একটুও প্রভাব ফেলেনি। অথচ আদিলের চোখে তখনও ভাসছে স্ট্রিটলাইটের আলোয় দেখা দৃশ্যটা। রোযার ফর্সা, মসৃণ গালে আঙুলের দাগ। হাতেও আঘাতের চিহ্ন। দৃশ্যটা তার চোখের সামনে থেকে সরল না। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল সে। ভেতরটা দাউদাউ করে উঠছে। অসহ্য এক অগ্নিদাহে পুড়ে যেতে লাগল বুকের ভেতরটা। আটক চারজনকে নিয়ে গার্ডদের একজন এসে গাড়ির জানালার সামনে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করল -
‘ছেড়ে দেব, বস?'
আদিল নীরব রইল। মাত্র এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল। পকেট থেকে ধীরে গ্লাভস বের করল। সেটা হাতে পরতে দেখেই আনোয়ার খন্দকার চমকে উঠলেন।
‘আদিল—’
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না তিনি। আদিল ইতিমধ্যেই এগিয়ে গেছে। হাতের সংক্ষিপ্ত এক ইশারায় অন্ধকার পাশের গলির দিকে নির্দেশ করল সে। গার্ডরা চারজনকে নিয়ে সেদিকে সরে গিয়েছে। নির্জন রাতের নীরবতা ভেঙে কেবল মা র ধরের শব্দ ভেসে এল। হাড্ডি-গুড্ডি ভাঙার আওয়াজে পিনপতন নীরবতা সরে যাচ্ছে। মুখের ভেতর কাপড় গুঁজেও তাদের গোঙানো থামানো যায়নি। চারজনের নড়েচড় পুরোপুরি যখন দমে যায়, থামল আদিল। গ্লাভস পরা হাত থেকে টপটপ করে র ক্ত ঝরছে। একটানে গ্লাভস দুটো খুলে ফেলে দিল এখানেই। বেরিয়ে এল গলি থেকে। মানবশূন্য রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে ধীরে একটি সিগারেট ধরাল। আনোয়ার খন্দকার আজ বেশ থতমত খেয়ে গেছেন।
এমন প্রতিক্রিয়া তিনি স্বপ্নেও আশা করেননি। কিছুই আর স্বাভাবিক নেই। নিশুতি রাতের গভীরতার চেয়েও গভীর শোনাল আদিলের পরের কথাগুলো -
‘দ্যাট ক্যাফে…’
একটা দীর্ঘ টান দিল সে সিগারেটে। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে নির্বাক কণ্ঠে আদেশ করল -
'বাই ইট।’
আনোয়ার সাহেব চমকে গিয়ে ফের স্বাভাবিক হতেও পারলেন না। পরের বাক্যে তার দুনিয়াই নড়ে উঠল -
‘ন্যানি হিসেবে মিস রোযাকে মির্জা ভবনে চাই। তার ব্যবস্থা করুন চাচা।’
আনন্দ সাহেব মুখ খুলতেও পারেননি আদিলের কণ্ঠ পড়ল ফের -
‘ক্যাফেতে ছবি তুলেছিল। ছবিগুলো আমি চাই।’
অতীতের শেষ….
·
·
·
চলবে……………………………………………………