আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৬৪ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

আদিল মির্জাস বিলাভড - নাবিলা ইষ্ক
          বাংলাদেশ থেকে জরুরি বার্তা এসেছে। কী এমন বার্তা ছিল, রোযা জানে না! তবে আদিল মির্জা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেনি। রাতারাতি দেশে ফিরেছে। তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সূর্য দিগন্তের ওপারে লুকিয়ে আছে। চারপাশ আধো-অন্ধকারে আচ্ছন্ন, কুয়াশার ঘন চাদরে ঢাকা পড়ে আছে চতুর্দিক। মৃদু বাতাসে নাচছে সারিসারি গাছগাছালির ডালপালা গুলো। মির্জা ভবনের প্রধান ফটকের বিশাল লোহার দরজাটি খুলে দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। তবে গাড়িগুলো ভেতরে প্রবেশ করেনি। একে একে সারিবদ্ধ হয়ে থেমে আছে ফটকের কাছেই।

রোযার বুকে মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হৃদি। আলুথালু ভঙ্গিতে ছোটো দুহাত দিয়ে যতটুকু পেরেছে, জড়িয়ে রেখেছে মায়ের শরীর। রোযা চোখজোড়া বুজে মাথাটা এলিয়ে রেখেছিল সিটে। ডান হাতখানা অনবরত বুলিয়ে যাচ্ছিল বুকে থাকা মেয়ের মাথায়। এমন সময় গাড়িটা হঠাৎ থেমে যাওয়ায় চোখ মেলে তাকাল। আদিল ততক্ষণে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। রোযা আড়চোখে দেখল তার ব্যস্ত, দাম্ভিক অবয়বটা। দৃষ্টি ঘোরাল আশপাশে। এখানে থামিয়েছে কেন? এখান থেকেই বুঝি রওনা হবে? এতো তাড়া! কী হয়েছে ঠিক? রোযার অভিমান, রাগ আর জেদ মিলেমিশে তড়তড় করে বেড়ে উঠল। তবু মুখে কিছু বলল না। কুলূপ এঁটে থাকল। শুধু মুখটা ঘুরিয়ে রাখল অন্যদিকে। তখনই তার পাশের দরজা খোলার শব্দ হলো। রোযা তাকাল না, তারপরও অনুভব করতে পারল, আদিল তার সমান উচ্চতায় ঝুঁকে এসেছে। তাতে কেঁপে উঠল চোখের পাপড়ি। শব্দ করল হৃৎপিণ্ড!

রুক্ষ, শীতল হাতখানা ছুঁয়ে গেল রোযার নরম গাল। অথচ সেই স্পর্শে কী আশ্চর্য উষ্ণতা! চাইলেও মাথাটা সরিয়ে নিতে পারল না রোযা। বরং ইচ্ছে হলো, বিড়ালের ন্যায় নিজের গালটা আরও একটু বাড়িয়ে দেয় সেই হাতের তালুর নিচে। গালে স্থির থাকা হাতটা ধীরে ধীরে সরে এসে আলতো করে ধরল তার চিবুক। পরক্ষণেই সামান্য জোর প্রয়োগে নিজের দিকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য করল আদিল। চোখাচোখি হলো দুজনের। রোযার টলমলে দৃষ্টির বিপরীতে আদিলের ধূসর চোখজোড়া ধারালো, শীতল। পিনপতন নীরবতা ভেঙে গম্ভীর কণ্ঠে বলল সে - 

‘বেরুচ্ছি, ব্যস্ত থাকব। আজ নাও ফিরতে পারি।’

রোযা কিছু বলে না। তার টলমলে চোখজোড়ায় রাজ্যের জেদ। আদিল হঠাৎ মাথা নুইয়ে সামান্য দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে ভেজা চোখদুটোয় ঠোঁট ছোঁয়াল। তাতে চোখ বুজতে বাধ্য হলো রোযা। সাথে সাথে এক ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। আদিলের স্বর ফিসফিসিয়ে এল -

‘জানতেও চান, আবার জেনে রেগেও যান। কী করব আমি? হুম?’

রোযা এবারও নিশ্চুপ রয়। চোখজোড়াও মেলে তাকায় না। আদিল বলে যায়, ‘কথা বলবেন না?’

উত্তর না পেয়ে আদিলের মুখ নুইয়ে এল রোযার ঘাড়ের কাছে। ফর্সা ঘাড়ে নাক ছুঁইয়ে গভীর করে শ্বাস নিল সে। পরের কথাগুলো বেরিয়ে এল অদ্ভুত এক অস্থিরতার সহিত -

‘আপনার কণ্ঠ না শুনে যেতে পারছি না। কিছু একটা বলে দিন, তাড়া আছে আমার। বকাঝকা দিলেও চলবে।’

রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাল নিজের ঘাড়ের কাছে নুইয়ে থাকা এলোমেলো চুলে ঢাকা মাথাটার পানে। বিন্দুমাত্র লজ্জা, অনুতপ্ততা নেই লোকটার। এমনভাবে সব জানাল যেন কতো সম্মানের কাজ করেছে! অবশেষে মুখ খুলল সে -

‘আপনার বিন্দুমাত্র লজ্জা…’

বাকিটুকু আর বলা হয় না। আদিল হাওয়ার বেগে মাথা তুলে নিজের শুষ্ক ঠোঁটজোড়া দিয়ে পিষে ফেলে রোযার নরম, উষ্ণ, ব্যস্ত ঠোঁটজোড়া। ক্রমাগত আক্রমণে রোযার মাথাটা পিছিয়ে গিয়ে মিশেছে সিটের সাথে। আদিলও তাকে অনুসরণ করে ঝুঁকে এসেছে। রোযা শক্ত করে চোখ বুজে নিয়েছে। দুর্বল বা হাতে কোনোরকমে ঘুমন্ত মেয়ের মুখখানা এক হাতে আড়াল করে রাখল। অন্য হাতটা নিজের অজান্তেই খামচে ধরল আদিলের শার্ট। 

আদিল তাড়াহুড়ো করে না, সময় নেয়। অনেকটা সময় পর নিজেই সরে এল। যাওয়ার আগে খুব রূঢ়ভাবে রোযার নরম, ভেজা গালে নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িভরা গালটা আলতো করে ঘষে দিল। অপ্রত্যাশিত সেই তীক্ষ্ণ স্পর্শে থরথর করে কেঁপে উঠল রোযা। আরও জোড়ালো ভাবে মিশে গেল সিটের সাথে। চোখ বুজেও অনুভব করল আদিল সরে গিয়েছে। দরজা লাগিয়েছে। জানালার কাঁচ অল্প খোলা। রোযা শুনতে পারছে থমথমে সেই কণ্ঠ যা মির্জা ভবনে কম্পন তুলতে সক্ষম -

'আমার অনুপস্থিতি, আমার অনুমতি ব্যতীত কোনো গাড়ি না প্রবেশ করতে পারবে, আর না বেরুতে। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?'

ক্লান্ত, ধ্রুব সাথে সাথে উচ্চকণ্ঠে জবাবে বলে, 'ইয়েস বস।'

রোযা নিজেকে বেশ স্বাভাবিক করে নিয়েছে। আড়চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে আর দেখতে পেল না। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকুল হয়ে পড়ল তার দৃষ্টি। জানলার কাঁচ পুরোপুরি নামিয়ে মাথাটা দ্রুত বাইরে বের করে তাকাল পেছনে। ততক্ষণে তার গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে মির্জা ভবনের ভেতরে। আদিল তখন ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের গাড়িতে উঠে বসেছে। তবে তার গাড়ি ছাড়েনি তখুনি। অপেক্ষা করছে দরজা বন্ধ হওয়ার। 
রোযা ততক্ষণ দৃষ্টি ফেরাতে পারল না, যতক্ষণ না লোহার বিশাল দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। অবশেষে মাথাটা ভেতরে এনে এলিয়ে দিল সিটে। শক্ত করে চোখ বুজে নিল। বুকের ভেতরটা অদৃশ্য শূন্যতায় ডুবে যেতে শুরু করেছে। তার সমস্ত রাগ, জেদ, অভিমান, সবকিছু কোথায় যেন হারিয়ে গেল একমুহূর্তে। তাদের জায়গা দখল করে নিল অন্যরকম এক যন্ত্রণা। 

না, সত্য বলতে রোযা রেগে নেই। সে ঠিকঠাক রাগতে পারছে না। ভেতর থেকে রাগ আসছেই না। সবইতো জানতো কমবেশ। তারপরও যত গভীরে জানছে তাতে রাগা উচিত ছিল তো! তুলকালাম করা উচিত ছিল তার। কেউ তাকে চোখে চোখে রেখেছে, অনুসরণ করেছে, তার জীবনকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করেছে! এমনকি, এমনকি ওই কফিশপটাও কিনে নিয়েছে লোকটা! এতকিছু করে এসেছে! না জানি আরও ভয়াবহ কাজ করেছে অগোচরে!

এতগুলো বছর রোযার জীবনের সমস্ত সিঁকল আদিল মির্জার হাতেই ছিল। পুতুলের মতো চালিয়েছে তাকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ রেখে গেছে। এত কিছু জানার পরও কেন রোযার রাগ হচ্ছে না? কেন বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে যাওয়ার বদলে হৃৎপিণ্ড আরও জোরে লাফাতে শুরু করেছে? কেন তার চোখ, তার হৃদয় এখনো একই নাম জপে যাচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে সে আরও বাজেভাবে প্রেমে পড়ছে? আরও গভীরভাবে ডুবে যাচ্ছে! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। রোযার বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল সেই ধূসর চোখজোড়া। যে চোখের একটিমাত্র দৃষ্টিই রোযার সমস্ত শরীর অবশ করে দিতে যথেষ্ট! হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ এলোমেলো করে দিতে যথেষ্ট! 

—————

অনেকক্ষণ যাবৎ শান্ত আড়চোখে আদিলের নির্বিকার চোখমুখ দেখে এবার ডেকে ওঠে, ‘বস?’

আদিল দৃষ্টি না তুলেই সাড়া দিল, ‘হুম?’

‘ম্যাডামকে আজ আগের মতো লাগল। তিনি কি রাগ হয়েছেন? আর তা কি কোনোভাবে সিরিয়াস?’

এলেন মনে মনে বকল ছেলেটাকে! পু*কি ভরা সাহস অন্যখানে দেখাক! তার পাশে বসে দেখাতে কে বলেছে? এখন বস যদি তার ওপরও চড়াও হন? এলেন নিজের শ্বাস আটকে রাখল। শান্তর প্রশ্নের পর গাড়ির ভেতর নেমে এল পিনপতন নীরবতা। উত্তর না পেয়ে শান্ত আবারও বলে গেল -

‘আমার ভীষণ খচখচ লাগছে। আমি স্বপ্নেও তাকে আর আগের মতো কল্পনা করতে পারি না।’

কীবোর্ডে চলমান আদিলের আঙুল থেমে গেল। ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল শান্তর দিকে। শান্তর চোখমুখে স্পষ্ট বসের জন্য রাজ্যের চিন্তা -

'সিরিয়াস হওয়ার আগে ম্যাডামের রাগ ভাঙালে ভালো হতো না, বস? পরে যদি আরও সিরিয়াস হোন? ম্যাডাম যেই জেদি! তাকে আমার ভয় লাগে।’

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা বয়ে গেল। যা ভাঙল এক খসখসে কণ্ঠের মৃদু হাসির আওয়াজে। চমকে উঠল শান্ত, এলেনও। আদিলের চোখ তখনো হাসছে -

‘স্বাভাবিক!’

শান্ত বুঝল না। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থেকে বলল, ‘হুম?’

‘যাকে আমিই ভয় পাই, তাকে তোদের ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক না।’

বুঝল শান্ত। হাসলও সাথে সাথে। তার চিন্তা কিছুটা কমল এতে। পরিস্থিতি তবে ওতটা বাজে না। আদিল পুনরায় ব্যস্ত হলো ল্যাপটপে। গাড়ি তখন সড়কপথে হাইস্পিডে ছুটছে। ওভাবেই বলল সে -

‘আই নো হার বেটার দ্যান শি নোজ হারসেল্ফ। রাগ হয়নি। জেদ ধরে আছে সত্য জেনে।’

এলেন না বলে পারে না, ‘তবে কি দরকার সত্য জানানোর?’

আদিলের জবাব আসে সময় নিয়ে। গাড়ির ভেতর সেই কণ্ঠস্বর বেজে বেড়ায় অনেকটা সময় ধরে। 
‘দরকার আছে। আমি যা করেছি, যা যা করব, এবং যা যা করতে পারি…. শি নিডস টু, হ্যাভ টু নো দ্যাম। আই ওয়ান্ট হার টু নো এভ্রিথিং অ্যাবাউট মি, এভরি ফেইস অফ মি। হাউ ক্রেজি আই ক্যান বি, হাউ ফার আই ক্যান গো ফর হার, হাউ মাচ আই ক্যান ডু ফর হার।’

—————

নিজের বাড়ির ঘ্রাণে অন্যরকম এক শান্তি মিশে থাকে। বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই রোযার মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠেছিল। হালকা হালকা লাগছিল। নিজের ঘরে ফিরে প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিল সে। পরক্ষণেই নরম, চিরচেনা বিছানায় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। লম্বা ঘুম। বেলা গড়িয়ে গেলেও ঘুম ভাঙেনি তার। ঝলমলে রোদের আলোয় রুমটা জ্বলজ্বল করছে। জানালার পর্দা সরানো, কাঁচও খোলা। বাইরে থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কিচিরমিচির। কোমল অথচ উজ্জ্বল সূর্যালোক তির্যকভাবে এসে পড়েছে গোলাকৃতির সাদা বিছানায়। কম্ফর্টারের নিচে ঘুমিয়ে থাকা রোযার মুখটাও বাদ যায়নি সেই আলো থেকে। আলোর তীব্রতায় চোখমুখ কুঁচকে নরম বালিশে মুখ গুঁজল সে। ঠিক তখুনি ডাক পড়ল। চেনা কণ্ঠ, নূরজাহান ডাকছে। কণ্ঠ অন্যরকম লাগছে। অচেতন অবস্থায় রোযা শুনেও যেন শুনছে না।

‘ম্যাডাম…’

রোযা গুঙিয়ে মুখ আরও গভীর ভাবে ডোবাল নরম বালিশে। ওঠার তাগিদ দেখা গেল না তার মধ্যে। ফের ডাক পড়ল। এবার চোখ মেলে তাকাতে বাধ্য হয় রোযা। বিছানার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে নূরজাহান। তার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। রোযা ঘুমজড়ানো চোখে চাইতেই নূরজাহান তাড়া দিল -

‘ম্যাডাম, তাড়াতাড়ি আসুন। আপনার জন্য কিছু এসেছে।’

রোযার ঘুম ছুটল। প্রথমে শুধু মাথাটা তুলে তাকাল। নূরজাহানের উচ্ছ্বাসে জর্জরিত মুখ দেখে এযাত্রায় উঠে বসতে বসতে শুধাল -

‘কী হয়েছে? কি এসেছে?'

নূরজাহানের মুখ থেকে হাসি সরছে না, 'নিচে এসেই দেখুন না!'

নূরজাহানের এমন চোখমুখ, উত্তেজিত আচরণে কৌতূহলী হয়ে পড়ে রোযা নিজেও। তড়িঘড়ি করে জুতোজোড়ায় কোনোরকমে পা গলিয়ে কদম বাড়াল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মেয়েকে খোঁজে তার চোখদুটো। ওইতো তার বাচ্চাটা লিভিংরুমের কার্পেটের ওপর বসে তিতান-থোরকে নিয়ে খেলছে। তিতানের মাথায় ছোট্ট একটি ক্যাপ পরাতে পরাতে তাকে ইংরেজি শেখাচ্ছে মিষ্টি কণ্ঠে -

‘বল তো, এটা কী? দিস ইজ আ ক্যাপ। সে, ক্যায়ায়াপ? তিতান, সে উইদ মিই!’

প্রত্যুত্তরে বোবা প্রাণীটা সমানে ঘেউঘেউ করে চলেছে। হৃদি খুশি হয়ে যাচ্ছে এতে। কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সমানে। যেন সত্যিই ওর শেখানো কথাগুলোই বলছে তিতান। এমন দৃশ্যে হেসে ফেলল রোযা। হাসির আওয়াজে ব্যস্ত হৃদি মাথা তুলে তাকাতেই উচ্ছ্বাস নিয়ে ডেকে উঠল -

‘মাম্মা!’

ব্যস, খেলাধুলা ফেলে দৌড়ে এল বাচ্চাটা। রোযা দ্রুত সিঁড়িগুলো বেয়ে নিচে নেমে আসে। ছুটে আসা মেয়েকে কোলে তুলে নেয় একপলকে। বুকে জড়িয়ে ছোট্ট মুখজুড়ে একের পর এক চুমু এঁকে আদুরে গলায় শুধায় -

‘খেয়েছে আমার মাম্মা?’

হৃদি দুহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করে বলে -

‘হু, আমি খেয়েছি।’

নূরজাহান মৃদু কাশল। বাইরে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিল, যা রোযা এতক্ষণে একেবারেই ভুলে বসেছিল। মেয়েকে কোলে নিয়েই রোযা কদম বাড়াল দুয়ারের দিকে। কিন্তু দুয়ারের কাছাকাছি আসতেই রীতিমতো চমকে গেল সে। তার হতবিহ্বল দৃষ্টি আটকে গেল বিশাল ফুলের তোড়াটার ওপর। এত বড়ো ফুলের তোড়া! প্রায় মানুষের সমান লম্বা। রঙিন ফুলে ঠাসা। ততক্ষণে হৃদি গলগল করে নেমে গেল মায়ের কোল থেকে। ফুলের তোড়ায় তার মোটেও আগ্রহ নেই। ছুটেছে তিতান আর থোরের পেছনে। তাদের পেছনে ছুটেছে ক্লান্ত। 

রোযা তখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল ফুলের তোড়াটার দিকে নিবদ্ধ তার বিস্মিত দৃষ্টি। স্তব্ধতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল অবশেষে। সামনে দাঁড়াতেই লাল ফিতের বাঁধনে আটকানো ছোট্ট কার্ডটিতে চোখ পড়ল। কার্ডের ওপর ইংরেজিতে ফুটে আছে ভীষণ সুন্দর, পরিপাটি হাতের লেখা। 

    - To my beloved wife, Rose-a.

লাফিয়ে উঠল রোযার হৃৎপিণ্ড। ক্রমাগত লাফাতেই থাকল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেল, অথচ থামার কোনো লক্ষণ নেই। নূরজাহান মিটিমিটি হাসছে। হাসছেন মরিয়ম বেগমও। ধ্রুব অবশ্য যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃষ্টি নত রেখেই বিনীত স্বরে বলল -

‘ম্যাডাম, ভেতরে দিয়ে আসব?’

রোযার ঘোর কাটল। সময় নিয়ে মাথা দোলাল সে। পুনরায় দৃষ্টি ফেরাল দানবাকৃতির ফুলের তোড়াটার দিকে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল ফুলগুলো। ছুঁলো কার্ডে লেখা শব্দগুলোও। ধ্রুব এগিয়ে এসেছে। রোযা একটু সরতেই, দুহাতে তুলে নিল ফুলের তোড়াটা। সেটি নিয়ে ভেতরে ঢুকল। সোজা তিনতলার বেডরুমে রেখে এল। রোযা স্থির দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই। তার দৃষ্টি তখনো ফুলের তোড়া থাকা জায়গাটির ওপরেই। চোখের পাতায় শুধু ভাসল কার্ডের লেখাটুকুই। 

—————

সূর্য ডুবেছে বহু আগে। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করছে চাঁদ। কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢেকে আছে বারিধারার সড়কপথ। অলিগলিতে নেই কোনো কুকুরের আনাগোনা। চারপাশজুড়ে পিনপতন নীরবতা। তেমনই এক নির্জন গলিতে দেখা গেল একটি অবয়ব। দ্রুত পায়ে হাঁটছে। পরনে জিন্স, হুডি। হুডির আড়ালে মাথা ঢাকা, মুখে মাস্ক। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর অবশেষে একটি চাপানের দোকান খুঁজে পেল। নির্দ্বিধায় বসে পড়ল বেঞ্চে। হুডি কিংবা মাস্ক কোনোটিই সঙ্গে সঙ্গে খুলল না। শুধু বলল -

‘চাচা, চা দিয়েন।’

বলতে বলতে পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই ভেসে এল বাড়ি থেকে আসা অজস্র কলের নোটিফিকেশন। হোয়াটসঅ্যাপে জমে আছে অগুনতি মেসেজ। সেসবের দিকে ফিরেও তাকাল না সে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঢুকে পড়ল ফেসবুকে। সার্চ অপশনের একেবারে ওপরে এখনো একটি নাম পড়ে আছে -

'Ayat Talukder Roza.'

যে আইডি থেকে আর কোনো পোস্ট হয় না। একাউন্ট আর চালানো হয় না। জেনেও সে বারবার চেক করে বেড়ায়। আজও অন্যমনস্কভাবে সার্চে ঢুকেছিল। তবে পরমুহূর্তেই থমকে গেল। আইডি থেকে নতুন পোস্ট হয়েছে—এমন দেখাচ্ছে।
আঙুলগুলো দ্রুত ক্লিক করল নামের ওপর। প্রবেশ করল আইডিতে। পরমুহূর্তেই তার মুখের সমস্ত আনন্দ নিভে গেল। গলা শুকিয়ে এল। আঙুলগুলো কেঁপে উঠল। 

একটি ছবি পোস্ট হয়েছে ক্যাপশন ব্যতীত। বড়ো এক বেলকনিতে বিশাল আকারের লম্বা ফুলের তোড়া দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক পাতলা গড়নের শরীর। পরনে ফ্লোর স্পর্শ করা শুভ্র রঙা গাউন। ছবিতে প্রোফাইলের একপাশ দেখা যাচ্ছে। যা আবার লম্বা চুলগুলোর আড়াল হয়ে আছে। হাতে ধরা ছোট্ট কার্ডটিতে স্পষ্ট লেখা -

'To my beloved wife.'

বুকের ভেতরটা মুচড়ে, কেমন যেন করে উঠল। ঠিক তখুনি অল্পবয়সী এক ছেলে এসে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিল তার দিকে।

‘ভাই, আপনার চা।’

লোকটা সেদিকে তাকালও না। মাথার ভেতর তখন একটাই দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে, রোযা, ফুলের তোড়া, আর সেই কার্ড।পরমুহূর্তেই এক ঝটকায় ছেলেটির হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে আছড়ে ফেলল। ঝনঝন শব্দে কাপটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গুড়িয়ে গেল। গরম চা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। হট্টগোলের মধ্যে হুডিটা মাথা থেকে খুলে পড়ে গেল। দোকানের সাদা আলোয় স্পষ্ট হলো জিহাদের ব্যথিত মুখ। রক্তাভ চোখ। দাঁতে দাঁত পিষে র ক্তাক্ত চোখে দেখল ছবিটা। রাগান্বিত সে আর কিছু ভাবল না। অচেনা নাম্বার থেকে আসা ওই মেসেজের রিপ্লাইটা দিল এযাত্রায় -

‘আমি রাজি। কোথায় দেখা করতে হবে?’

—————

আজ ফিরবে না বলে গিয়েছে। অথচ পরদিনও আদিল মির্জার ছায়া দেখা গেল না। রোযা বেশ রাত পর্যন্ত কনকনে শীতের মধ্যে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রইল প্রতীক্ষায়। গায়ের চাদরটা শরীরে টেনেটুনে জড়িয়ে, চেয়ার পেতে বসে থাকল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বারবার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি গাড়িগুলো প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকবে! এই বুঝি দূর থেকে ভেসে আসবে পরিচিত গাড়ির শব্দ! কিন্তু না। এল না। এতটাই কি ব্যস্ত? একটা কলও করা যায়নি? একটা ফুলের তোড়া দিয়েই কেচ্ছা খতম? অভিমান জমে ভারী হয়ে উঠল বুকের ভেতরটা। হঠাৎ নূরজাহান এসে তাকে টেনে নিয়ে না গেলে রোযা সম্ভবত জেদ ধরেই সারারাত বেলকনিতে বসে থাকত। 

দু’মগ কফি বানিয়ে এনেছে নূরজাহান। একটা মগ রোযার হাতে দিয়ে অন্যটা নিয়ে পাশেই বসল। ভীষণ কাছ থেকে দেখল সুন্দর, জেদি মুখখানি। ঠোঁটের কোণে জমল সন্তুষ্টির হাসি। রোযা খেয়াল করে বিরক্ত হলো। তেতে উঠল ওমনি -

‘হাসছেন কেন, নূরজাহান?’

নূরজাহানের হাসি আরও চওড়া হয়। হঠাৎ মাথাটা নুইয়ে এনে আস্তে করে বলে -

‘হাসছি না। আমি ব্লাশ করছি, ম্যাডাম। আপনাদের এমন গভীর প্রেম দেখে।’

রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকায়, 'প্রেম! আর উনার সাথে? আমার স্বপ্নে!’

মিটিমিটি হেসে নূরজাহান বলে গেল, 'একজন অপেক্ষায় বসে থাকে বাইরে, এই কনকনে শীতে। অন্যজন গার্ড দিয়ে খবর পাঠায়, যেন তার স্ত্রীকে ঘরে যাওয়ার জন্য মানানো হয়।’

রোযা চমকে গেল। দ্বিধা নিয়ে নূরজাহানের মুখের দিকে চেয়ে আওড়াল, 'কে…?’

‘কিছুক্ষণ আগেই ক্লান্ত এল। বলল, বস আমায় আদেশ করেছে ওপরে গিয়ে আপনাকে রুমে নিতে।’

সিসিটিভিতে দেখেছে তবে! দেখার সময় আছে, বাড়িতে ফেরার নেই? কল দেওয়ার সময় নেই? যত্তসব ঢং! মনে মনে এতকিছু বললেও রোযার চোখেমুখে তখন অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা। নূরজাহান সেই মুখ দেখে মুগ্ধ হলো। সে মুখের মুগ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিতে বলল -

‘ম্যাডাম, আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ রেডি হয়ে গিয়েছে প্রায়!’

রোযা সবে কফিতে চুমুক দিয়েছিল। একঢোক গিলে কৌতূহল নিয়ে তাকাল। শুধাল রয়েসয়ে -

‘কী সারপ্রাইজ?’

নূরজাহান প্রথমে ইঙ্গিতে-ইঙ্গিতে কথাটা রহস্যময় রাখার চেষ্টা করলেও একসময় আর ধৈর্য রাখতে পারল না। পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল সবটা। শুনে শুধু আশ্চর্য নয়, পুরোপুরি থমকে গেল রোযা। বাবা-মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রথমবার সে পা রেখেছিল প্রধান মির্জা ম্যানশনে। সেখান থেকে ফেরার পর কথায় কথায় বলেছিল, এমন চমৎকার রাজকীয় ম্যানশন বসবাসের জন্য, ফেলে রাখার জন্য নয়। আদিল যে কথাটা এতটা গুরুত্ব দিয়ে নেবে, তা কল্পনাতেও আনেনি যে!

অথচ সেই কথার ভিত্তিতেই ওই ম্যানশনের সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়েছিল। পুরোনো রাজকীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন করে বসবাসের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। যার কাজ শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। এই পুরো সপ্তাহজুড়ে ম্যানশনে উঠেছে একের পর এক নতুন ফার্নিচার। ঘর সাজানোর শেষ প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। অর্থাৎ, খুব শীঘ্রই তারা ওই ম্যানশনে শিফট করবে!

‘ম্যাডাম?’

রোযার ধ্যান ভাঙল। দৃষ্টি তুলে তাকাতেই আচমকা তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল নূরজাহান। ছলছল করছে তার চোখজোড়া। বলার সময় কণ্ঠ কেঁপে উঠল -

‘আমরা তখনই অতীত থেকে মুক্তি পাই, যখন অতীতের সুখ বর্তমানেও নসীব হয়!’

নূরজাহান বলে যায়, ‘বাবা-মায়ের মৃত্যুর শোক তাকে ম্যানশনে থাকতে দেয়নি। তাদের স্মৃতি তাড়া করে বেরিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণায় ওই রাজকীয় বাড়িটায় থাকা সম্ভব হয়নি। এতগুলো বছর চলে গেল। নিরালায় পড়ে থাকা ওই ম্যানশন পুনরায় জ্বলে উঠবে, হাসিঠাট্টায় মেতে থাকবে, এতটুকুই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে ছিল।’

রোযার দৃষ্টি নুইয়ে এল। শুনতে পেল না নূরজাহানের বিড়বিড় করে বলা শেষ বাক্যটুকু -

‘ম্যাডাম! ধন্যবাদ। ধন্যবাদ, তার জীবনে আসার জন্য।’

‘কিছু বললেন নূরজাহান?’

নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে বোঝাল, কিছু না। চোখদুটো মুছে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন, দেখতে যেতে চান আপনার বাড়ি? বলব গাড়ি বের করতে?’

রোযার আঙুল চলে গেল নূরজাহানের নাকে। ওটা টিপে সে বলে, 'আপনার নয় নূরজাহান। আমাদের!’

নূরজাহানের চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। আওড়াল, ‘আমাদের।’

কিছু একটা ভেবে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল রোযা। দেয়াল ঘড়িতে দৃষ্টি বুলিয়ে বিড়বিড় করল, ‘আজ নিশ্চয়ই ফিরবে!’

নূরজাহান বুঝল না। শুধাল, ‘ম্যাডাম?’

রোযা সিঁড়ির দিকে ছুটতে নিয়ে বলে গেল, ‘গাড়ি বের করতে বলো। আমরা বেরোব। আর ভুলেও তাকে জানানো যেন না হয়!’

—————

গাড়ির ব্যাকসিটে ক্লান্ত হয়ে মাথাটা এলিয়ে রেখেছে আদিল। দেশে মাল আনাতে এবারে বেশ প্যারা খেতে হয়েছে! দু’ঘণ্টার একটা আলোচনা সেরে আপাতত সোজা বাসার দিকে রওনা হয়েছে। রাস্তাঘাট তীব্র কুয়াশার প্রলেপে ঢেকে আছে। ফাঁকা সড়কপথ জানিয়ে দিচ্ছে, রাত বেশ গভীর। মাথাটা এলিয়ে রেখেই হাতঘড়ির দিকে তাকাল একপল। একটা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি। তার পরনে কালো থ্রিপিস স্যুট। অন্ধকারে তা আরও কালো দেখাচ্ছে। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত মুখ! আদিল ডাকল -

‘শান্ত!’

‘জি, বস!’

আদিলের আদেশ পড়ে, ‘বাড়ি যা। ওয়াইফকে সময় দে। দুদিন রেস্ট নে।’

শান্ত নাছোড়বান্দা। আদেশ গায়ে মাখল না। হাতে থাকা ফোন স্ক্রিনে হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট। ঝুমুরকে দুটো চুমুর ইমোজি পাঠিয়ে বলে -

'বেশিক্ষণ তো না। আপনি বাড়িতে প্রবেশ করুন, আমি ফিরব।’

আদিল আর কথা বাড়ায় না। গাড়ি ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছে ইতোমধ্যে। শান্তর ধারালো চোখ মুহূর্তেই পরিবর্তনটা বুঝতে পারল। গাড়ি কম, গার্ড কম। ক্লান্তও নেই আশেপাশে। মুহূর্তে সচেতন হলো চোখেমুখ। ততক্ষণে গাড়ি থেমেছে। আদিল নেমেই চতুর্দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকাল বাড়ির দিকে। ওপরের বেলকনিতেও দৃষ্টি ফেলল। যাকে আশা করেছে তার কোনো চিহ্ন নেই। এখনো রেগে আছে? আদিল কদম বাড়াল ভেতরের দিকে। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে ধ্রুব। আদিল প্রশ্ন করতে করতে ঢুকল -

‘তোর ম্যাডাম কোথায়?’

ধ্রুব দ্রুত জানাল, ‘বেরিয়েছেন…’

কথা শেষ করতে পারল না সে। আদিলের লম্বাচওড়া দেহের ছায়া পড়ল তার ওপর। কণ্ঠ হিমালয় ছুঁল যেন -

‘কী!’

ধ্রুব দ্রুত বুঝিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম সন্ধ্যায় ম্যানশনে গিয়েছেন। সহিসালামতে পৌঁছেছেন। সঙ্গে ক্লান্ত, নূরজাহান আপাও আছেন।’

আদিলের হৃৎপিণ্ড শান্ত হলো এতে, 'আমাকে জানানো হয়নি কেনো?'

ধ্রুব মিইয়ে গেল। চোখ নামিয়ে আওড়াল, 'ম্যাডাম নিষেধাজ্ঞা দিলেন।'

আদিল আঙুল দিয়ে কপাল ডলে অবশেষে ভেতরের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল -

‘আমিরা কোথায়? ঘুমিয়েছে?’

মরিয়ম বেগম দোতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ওখান থেকে আস্তে করে জানালেন -

‘ঘুমুচ্ছে, স্যার।’

আদিল বেরুতে বেরুতে বলে গেল, 'টেক কেয়ার অভ হার।'

—————

এককালে এই রাজকীয় প্রাসাদ ছিল ঝলমলে। ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে রূপান্তরিত হয়েছিল মৃতপুরীতে। আজ পুনরায় অদূর থেকেই ঝলমল করছে। নতুন রঙে জ্বলজ্বল করা বিশাল দরজা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। তাদের গাড়িগুলো পৌঁছাতেই খুলে দেওয়া হয়েছে। আদিলের গাড়িটা ছিল সবার আগে। দ্রুতগতিতে প্রবেশ করল ভেতরে। দু’ধারে সারি সারি গাছপালা, বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে চওড়া রাস্তা। এখান থেকে ম্যানশনটাকে ছোটো লাগছে। অর্থাৎ, এখনো বেশ দূরে সেই ম্যানশন। আদিলের দৃষ্টি ঘুরে বেড়াল চারপাশে। হাজারো স্মৃতি বিচরণ শুরু করল মস্তিষ্কে। 

গাড়ি বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে এসে থামল ম্যানশনের সামনে।
নতুন রঙে আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদটি। সহস্র বাতির আলোয় জ্বলজ্বল করছে চারপাশ। সামনের ওয়াটারফল থেকে জলধারা নেমে আসছে, বাতির আলোয় আরও স্বপ্নপুরী হয়ে উঠেছে আশপাশ। আদিল সঙ্গে সঙ্গে নামল না। নির্বাক চোখে চেয়ে রইল শুধু। শান্ত, এলেন আড়চোখে চাইছিল বসের চেহারার দিকে। শান্ত নিজেকে স্বাভাবিক করল। দাফন দিল মনের ভেতর জেগে ওঠা খারাপ অনুভূতিগুলোকে। নেমে এসে ব্যাকসিটের দরজা খুলে ধরল।
অবশেষে আদিল বেরোল। তাকাল জ্বলজ্বলে ম্যানশনের দিকে। বাঁদিকে দাঁড়িয়ে আছেন জুলেখা বেগম ও নূরজাহান। আনন্দে, আবেগে টলমল করছে তাঁদের চোখজোড়া। আদিলের কণ্ঠ গম্ভীর শোনাল -

‘কোথায়?’

জুলেখা বেগম চোখজোড়া মুছছেন। নূরজাহান বলল, 'ভেতরে।’

আদিল কদম বাড়াল। বন্ধ করে রাখা দরজা মেলে ভেতরে ঢুকতেই বুঝল, জায়গাটা আধো অন্ধকারে ডুবে আছে। কয়েক কদম এগিয়ে মাঝখানে দাঁড়াতেই ওপর থেকে বাতির সূক্ষ্ম আলো এসে পড়ল শুধু তার ওপর। বাদবাকিটা অন্ধকারে ডুবে রইল। কেউ শব্দ করে দরজা লাগাল। সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ, আদিল ছাড়া। শুনতে পেল রোযার কণ্ঠ। অন্ধকারের গভীর থেকে ফিসফিসিয়ে ভেসে আসছে। অধৈর্য হয়ে উঠল সে। পেছনে না ফিরেই আদেশ করল -

‘সামনে আসো।’

‘উহুঁ, কথা শুনবেন আমার। যা ইচ্ছে আমি করব, আপনি আমায় ছুঁতে পারবেন না।’

আদিলের ধূসর চোখদুটোর ধারালো দৃষ্টি ঘুরল চারপাশে। যেমন খুঁজছে -

‘সম্ভব না।’

‘এটা আপনার শাস্তি। বলুন!’

আদিল হার মানল। প্যান্টের পকেটে দু’হাত ভরে আওড়াল, 'আই'ল ট্রায়।'

এতেই সন্তুষ্ট হলো রোযা। আঁধারের সঙ্গে মিশে অদূর থেকে একদৃষ্টিতে দেখল লম্বাচওড়া, সুঠামদেহী শরীরটাকে। কদম বাড়াল। নূপুরের রিমঝিম আওয়াজে পিনপতন নীরবতা ভাঙল। শোনা গেল রিনরিনে কণ্ঠের প্রশ্ন -

‘যদি আমি বিবাহিত হতাম? তখন? কী করতেন?’

প্রশ্নের সম্মুখে আদিল মির্জা বেশ নির্বিকার। বলল, ‘তুমি উত্তরটা পছন্দ করবে না।’

রোযার কণ্ঠ কাঁপল, ‘ব-বলুন। জানতে চাচ্ছি।’

আদিলের জবাবটা বেশ সময় নিয়ে এল। গভীর শোনাল। এই রাতের আঁধারের চেয়েও। ভেসে বেড়াল প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে -

‘পরিস্থিতিই এমন বানাতাম যে স্বেচ্ছায় চলে যেতে তোমার জীবন থেকে। সারাজীবনের জন্য।’

রোযার শ্বাস আটকে এল। কদম থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে ফেলল। ফের আওড়াল -

‘বিয়ে হলে আমার স্বামী হতো। এতটুকু উচ্চারণ করতে পারছেন না?’

‘পারছি না। আমি ব্যতীত কেউ তোমার স্বামী হতো না। সম্ভব না!’

রোযা চোখ মেলে তাকাল আলোয় ফুটে ওঠা দৃঢ়, কাটকাট চোখমুখের দিকে। ঠোঁটের হাসি চাপিয়ে অপলক ওই মুখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে গেল -

‘এক বাচ্চার মা-ও তো হতে পারতাম।’

দৃশ্যমানভাবে শক্ত হলো আদিলের চোয়াল। ঘনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে তাকে চোখ বন্ধ করতে দেখা গেল। রোযা ভাবল, এমন প্রশ্নের জবাব হয় না। তবে আদিলের জবাব এল -

'আই উড হ্যাভ বিন আ গুড ফাদার টু দ্যাট চাইল্ড। কিন্তু তা সম্ভব না। এই জীবনে না। ইন দিস লাইফ, ইউ বিলং অনলি টু মি। অ্যান্ড দি ওনলি চাইল্ড ইউ’ল এভার ক্যারি উইল বি মাইন।'

রোযার শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে বুকে। প্রশান্তিতে ভরে যায় অন্তর। অন্যদিকে, আদিল প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়েছে। খসখসে গলায় বলে -

‘হয়েছে, এবার সামনে আসো। রোযা—আ...’

উত্তর এল না। কেবল শোনা গেল নূপুরের মিহি ঝংকার। পরপর মাথা ঘোরাতেই আদিল দেখতে পেল অপরূপ সুন্দরী এক হুরপরীকে। সাক্ষাৎ আসমান থেকে জমিনে নেমে আসা পরী। পরনের রাজকীয় লেহেঙ্গাটি তালে তালে দুলছে। দীর্ঘ চুল নেমে ছুঁয়েছে নিতম্ব। আদিল হাত বাড়াতে চাইতেই রোযা সতর্ক করে -

‘উহুঁ, ছোঁবেন না।’

অগত্যা আদিল ঢোক গিলে প্যান্টের পকেটে থাকা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখল। রোযা নিজেই এগিয়ে এসে মিশে গেল তার শক্ত বুকের সঙ্গে। তাকাল চোখের মণিতে -

‘আপনি একটা খারাপ লোক। আগা থেকে গোড়া—পুরোটাই বাজে লোক।’

আদিল নিশ্চুপ। শুধু চেয়ে রইল শিকার করতে উদ্যত সিংহের চোখে। রোযা তার শরীরে গা এলিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরল তার চারপাশে। বলে গেল -

‘বাট… বাট আই ডোন্ট মাইন্ড।'

আদিল একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। রোযার কণ্ঠ ভেসে বেড়াল -

'আই ডোন্ট মাইন্ড এনিথিং এনিমোর।'

আদিল আর পারল না। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। দুহাতে টেনে ধরল তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলা শরীরটা। বুকের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে সিংহের গর্জন তোলার আগেই দপ করে নিভে গেল রিনরিনে কণ্ঠে ভেসে আসা আগাম বাক্যগুলো কর্ণগোচর হতেই -

    ‘পারব না শুধু বাঁচতে কভু তুমি ছাড়া,
     আমি নিঃস্ব হয়ে যাব তুমি ছাড়া…
      আমি পাগল হয়ে যাব তুমি ছাড়া
       আমি ধ্বংস হয়ে যাব তুমি ছাড়া। 
     আমি সময়কে থামিয়ে দিব,
       তুমি ছাড়া…..’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp