অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ৬৩ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প

অন্তর্নিহিত কালকূট
           আজ আমের ফাউন্ডেশনে এসেছেন রাশেদ আমের। দীর্ঘ বিরতির পর। অনেকটা বাধ্য হয়েই। দলের যা অবস্থা; তাতে এখন আর ঘরে বসে থাকা সাজেনা। নয়তো এ'কদিন প্রয়োজন ছাড়া নিজের ঘর থেকে অবধি বের হননি তিনি। জাফরই সামলেছে সবটা। কিন্তু অফিসে আসার পর থেকেই চুপচাপ বসে আছেন নিজেয সেই চেয়ারটাতে। কাজে মন দিতে গেলেই সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই মননিবেশ করতে পারছেন না। রাশেদ আজ প্রথমবারের মতো অনুধাবন করলেন তার বয়স হচ্ছে। চিন্তাশক্তি লোপ পাচ্ছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে রাশেদ আমেরের বজ্র শরীর, তীক্ষ্ম মস্তিষ্ক। সবকিছুই কেমন যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই!

দরজায় টোকা পড়তেই হালকা নড়ে উঠলেন রাশেদ। চিন্তায় ছেদ ঘটল। তাকিয়ে দেখলেন ইন্সপেক্টর আজিজ দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই সে নরম গলায় বলল, 'আসতে পারি?'

মাথা ঝাঁকালেন রাশেদ। মুখে কিছু বললেন না। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে রাশেদের দিকে দেখল আজিজ। গভীরভাবে। আজিজের অনুসন্ধানী চোখজোড়া অনেকক্ষণ খুঁজল সেই তেজস্বী রাশেদ আমেরকে। সে অপরাধ জগতের সম্রাট। এই সত্যি জানা সত্ত্বেও যার তেজে আপনাআপনি নুইয়ে যেতো আজিজের চোখজোড়া; না চাইতেও অদ্ভুত শ্রদ্ধা জেগে উঠতো মনে। কোথায় সেই তেজ? অসামান্য ব্যক্তিত্বে ভরপুর সেই চেহারা? মানুষটার বিনাশ কোন একদিন ঘটবে তা আজিজ জানতো। কিন্তু এভাবে?

'বসুন।'

রাশেদের গলার আওয়াজে হুঁশ ফিরল আজিজের। সেই বজ্র দৃঢ় কন্ঠেও কোথাও একটা ভাটা পড়েছে বলে মনে হলো তার। সামান্য গলা ঝেড়ে চেয়ার টেনে বসল। চোখ সরায়নি রাশেদের দিক থেকে। রাশেদের দৃষ্টি সামনে রেখে দেওয়া ফাইলে। কিন্তু ফাইলে লেখা একটা শব্দও যে রাশেদ পড়ছেন না, তা অনায়াসে বুঝে ফেলল আজিজ। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার পরেই লোকটা নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার, নিজেকে শক্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু হচ্ছেনা। মনের আঘাতের কাছে আজ মস্তিষ্কেল ক্ষমতা বেশ দুর্বল বোধ হচ্ছে।

আজিজ বলল, 'রুদ্র কেমন আছে এখন?'

'ভালো।' 

'কুহুর ব্যপারটা শুনেছি আমি। এতো খারাপ অনুভূতি বহুদিন হয়নি।'

রাশেদ কিছু বললেন না। তাকালেনও না আজিজের দিকে। আজিজ টেবিলের ওপর দুহাত রেখে বলল, 'আমি আগেই বলেছিলাম আপনাকে। সবকিছু ধসে পড়তে খুব বেশিদিন লাগবেনা। দেখলেন? ফাটল ধরে গেছে। ধসে পড়ল বলে। কিন্তু আফসোস একটাই। আপনাদের এই পাপের যজ্ঞে প্রথম আহুতি একটা নিষ্পাপ মেয়েকে দেওয়া হল।'

রাশেদ ফাইলটা বন্ধ করে চোখ তুলে তাকালেন এবার। চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, 'আপনি কী আমাকে আমার অবস্থাটা মনে করিয়ে দিতে এসেছেন? যদি সেকারণে এসে থাকেন তাহলে বলব দরকার নেই। আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জ্ঞাত।'

আজিজ হালকা হেসে বলল, 'সে আমি জানি। আমি এসেছি আপনাকে কিছু কথা বলতে।'

'শুনছি।'

'সোলার সিস্টেমের পক্ষে টিকে থাকাটাযে অসম্ভব। সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন? ধ্বং/স যখন হতেই চলেছেন তখন একা হয়ে কী লাভ?'

'তাই আমাদের কাছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে যত প্রমাণ আছে, সব আপনার হাতে তুলে দিয়ে যাতে স্যারেন্ডার করি। শাস্তি যথাসম্ভব কম হবে। তাইতো?' আজিজের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন রাশেদ।

আজিজ উত্তর দিলোনা। রাশেদের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল কেবল। যার অর্থ রাশেদ ঠিক বলছে। রাশেদ আবার বললেন, 'এ কথাগুলো আমায় বলেছেন, বলেছেন। রুদ্রক‍ে বলবেন না। অযথা অপমানিত হতে হবে। চা-কফি কী খাবেন বলুন। আনিয়ে দিচ্ছি। খেয়ে চলে যান।'

আজিজ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এখনো এসব বলছেন?'

রাশেদ আজিজের কথার উত্তর না দিয়ে হাঁক ছেড়ে কফি আনতে বললেন। আজিজ বুঝল, এরা ওর কথা শুনবেনা। অনেকটা আন্দাজ করেছিল এমনটাই হবে। শুধু একটা শেষ চেষ্টা করতে এসেছিল। কিন্তু যথারীতি ব্যর্থ হল। আজিজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আজ আসছি। কফি অন্যদিন খাব। তবে আমার কথাগুলো ভেবে দেখলে পারতেন।'

রাশেদ বলল, 'ঐযে বললেন, পাপের যজ্ঞ। যজ্ঞ যখন শুরু হয়েই গেছে, আর প্রথম আহুতি যখন আমার নিজের মেয়ের হয়েছে তখন যজ্ঞফল না পাওয়া অবধি থামার প্রশ্নই ওঠেনা।'

আজিজ খানিকটা থমকে গেল। রাশেদে কথাগুলো বেশ ভারী ছিল। তবে ভঙ্গিটা দুর্বল। রাশেদ নিজস্ব সেই বজ্র কন্ঠে বললে হয়তো কেঁপে উঠতো আজিজ।

'আসছি।' কোনমতে শব্দটা উচ্চারণ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল আজিজ। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছতেই রাশেদ বলে উঠলেন, 'চিন্তা করবেন না। তথ্যগুলো আজ না হলেও একদিন নিশ্চয়ই পুলিশের হাতে যাবে। যেদিন যাবে সেদিন আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাকি দলগুলোও ধসে পড়বে। তবে সে সময়টা এখন নয়, আর সে পুলিশটাও আপনি নন। আপনি সৎ সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এতো বিশাল একটা জগতে ধ্বং/স যজ্ঞ ঘটালে হলে সৎ হওয়ার সাথে সাথে ভীষণ জেদি কাউকে প্রয়োজন। যেটা আপনি নন। ভালো থাকবেন।'

আজিজ ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রাশেদের দিকে। ফিরে গেল মনে অসংখ্য সংশয় আর প্রশ্ন নিয়ে।

—————

রুদ্রও বের হচ্ছে আজ। শরীর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি ওর। তবুও বের হবে। প্রিয়তা বারবার নিষেধ করার সত্ত্বেও শোনেনি। শুধু বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ আছে ওর। বের হওয়া জরুরি। প্রিয়তা জানে এক্ষেত্রে রুদ্র ওর কথা শুনবেনা। তাই বেশি জোর করেনি। রুদ্রকে ওর জ্যাকেটটা পরিয়ে দিতে দিতে প্রিয়তা আরেকবার বলল, 'এ শরীর নিয়ে বের হতেই হবে?'

মাথা ঝাঁকাল রুদ্র। মুখে কিছু বলল না। প্রিয়তা দীর্ঘশ্বাস চাপল। জ্যাকেট পরানো শেষ করে বলল, 'নীরবের সঙ্গে কিছু করার কথা ভাবছেন নাতো?'

রুদ্র বেশ গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিল, 'এখনই না। তবে একবার আমার মুখোমুখি ওকে হতেই হবে। জবাব দিতে হবে, যেকোন পরিস্থিতিতে ধরে রাখার সাহস যখন নেই। ছেড়েই যখন দেবে। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে সে হাত ধরল কেন?'

প্রিয়তা রুদ্রর কলার ঠিক করে দিচ্ছিল। সে কাজ থামিয়ে দিয়ে তাকাল রুদ্রর চোখের দিকে। নিচু গলায় বলল, 'ভালোবাসলেই কী সব পরিস্থিতিতে হাত ধরে থাকা যায়?'

রুদ্র মৃদু হাসল। প্রিয়তার দু কাঁধে হাত রেখে বলল, 'শুধুমাত্র ভালোবাসলেই সব পরিস্থিতিতে হাত ধরে থাকা যায় প্রিয়। নিজেকেই দেখো।'

প্রিয়তা রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেই মলিন হাসল। রুদ্র বরাবরের মতোই খুব সময় নিয়ে চুমু খেলো প্রিয়তার কপালে। বলল, 'সাবধানে থেকো। আর আমার রাজকন্যার খেয়াল রেখো।'

এবারও আপত্তি জানাল প্রিয়তা। গাল ফুলিয়ে বলল, 'রাজপুত্র।'

'আচ্ছা দুটোই।'

'যাহ্।'

প্রিয়তাকে লজ্জা পেতে দেখে হাসল রুদ্র। গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল, 'আসি।'

প্রিয়তা মাথা ঝাঁকাল। বরাবরের মতো পা উঁচু করে রুদ্রর গালে চুমু খেয়ে বিদায় দিল তাকে।

—————

রাশেদের কেবিনটাতে ত্রিকোণ ভঙ্গিতে বসে আছেন রাশেদ, রুদ্র এবং জাফর। প্রায় আধঘন্টা যাবত চুপচাপ বসে আছে তিনজনই। পরিবেশটা স্তব্ধ, থমথমে। পরপর তিনটে সিগারেট শেষ করে ফেলেছেন রাশেদ। চতুর্থ সিগারেট হাতে নিয়ে বললেন, 'নোটিস পেয়েছো?'

রুদ্র হালকা নড়ে উঠলো। গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল এতক্ষণ। নোটিস টা ওর হাতেই ছিল। আরেকবার নোটিসটার দিকে চোখ বুলিয়ে তাকাল রাশেদের দিকে। মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাল, হ্যাঁ দেখেছে। রাশেদ ঠোঁটের মাঝে সিগারেটটা চেপে ধরে বললেন, 'এটা তাদের নোটিস যাদের কাছ থেকে আমরা মাল ডেলিভারী নিতাম। যারা আমাদের কাছ থেকে মালগুলো নিতো তারাও নোটিস্ পাঠাবে। খুব দ্রুত। আর টাকাগুলো আমাদের দিতে হবে।'

জাফর কপালে চিন্তার ভাজ ফেলে বলল, 'হুসাইন আলী সেদিন কল করেছিল। মাল দিতে পারছিনা কেন জানতে চেয়েছেন। আমি কোনমতে বুঝিয়েছি বাইরে থেকে আমাদের হাতে মাল এসে পৌঁছয়নি এখনো। সময় লাগবে। কিন্তু আমার মনে হয়না বিশ্বাস করেছে। তার কথা শুনে মনে হয়েছে ভেতরকার খবরাখবর সে জানে।'

রুদ্র বলল, 'মনে হওয়ার কিছু নেই। উনি সবই জানেন। ওনাকে চেনোনা তুমি কাকা। এমনি এমনি এজগতের সেরা অস্ত্র ব্যবসায়ী নয় সে। ভয়ংকর লোক। সবটা জেনেই কল করেছে।'

' ওনার সঙ্গে হওয়া সেই চুক্তির কথা মনে আছে তোর রুদ্র? কিন্তু ফান্ডে যে টাকাগুলো আছে তাতেতো_'

'পুরো আমের ফাউন্ডেশন ফাঁকা হয়ে যাবে।' গম্ভীর কন্ঠে জাফরের অসম্পূর্ণ কথাকে সম্পূর্ণ করল রুদ্র। অতঃপর কাগজগুলোতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে বলল, 'শুধু তাই নয়, আমাদের মিলস্ আর ফ্যাক্টরিগুলোও নিলামে তুলতে হবে। তাতেও সবটাকা জোগাড় হবে কি-না যথেষ্ট সন্দেহ আছে।'

পলকহীন চোখে রইল জাফর। মাথা কাজ করছেনা তার। কোনরকমে বলল, 'যদি সময়মতো টাকা না দেই?'

'এই লাইনে এমন ঘটনা ঘটলে কী হয় সেটা তোমার অজানা নয়, কাকা।' অদ্ভুত শান্ত স্বরে জানাল রুদ্র।

নিমেষেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল জাফরের মুখ। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেশ পুরনো কিন্তু প্রচলিত একটা নিয়ম আছে। এরকম ঘটনা ঘটলে সেসকল কালোবাজারের মালিকরা একত্রে দল গঠন করে। এবং প্রতারণাকারী দলকে সমূলে উপড়ে ফেলে। সমন্বিতভাবে গঠিত দলগুলোর ক্ষমতা প্রচুর। ঐ অবস্থায় পাতালে গিয়ে লুকিয়েও কেউ বাঁচতে পারেনা। মৃ-ত্যু তখন নিশ্চিত। এটাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য। এক্ষেত্রে কেউ কোনরকম সাহায্য করবে না। কেননা লাভ ছাড়া এখানে কেউ এক পাও ফেলেনা। এক পাও না। অর্থাৎ সময়ের মধ্যে টাকা দিতে না পারলে সমূলে ধ্বংস হবে সোলার সিস্টেম।

রুদ্র আরও বলল, ' আর যারা আমাদের কাছ থেকে মান কেনে তাদের সকলকেই সামলে রাখা যাবে। কিন্তু হুসাইন আলীকে না। নিজের স্বার্থ ছাড়া একচুলও নড়েনা বুড়োটা। আর স্বার্থে আঘাত লাগলে কতটা জঘন্য হতে পারে তুমি কল্পণাও করতে পারছ না। শুধু তুমি কেন? বেশিরভাগ লোকই তা পারবেনা।'

নিজেকে সামলে নিয়ে জাফর বলল, 'কিন্তু কিছুতো একটা করতে হবে। এভাবে সবটা শেষ হয়ে যেতে দিতে পারিনা আমরা।'

রুদ্র গম্ভীর মুখ করে ভ্রু কুঁচকে বসে রইল কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু অবস্থা পরিবর্তনের কোন উপায় নেই। কিছু একটা বলার জন্যে রাশেদের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ও। অনেক বছর হল এই জগতে আছে। অনেক ওঠানামা হয়েছে। অনেক সমস্যায় পড়েছে। এমন অনেক মিটিংও হয়েছে। কিন্তু রাশেদকে এভাবে কখনও দেখেনি। কপালে ভ্রুকুটি। অন্যমনস্ক। হাতে জ্ব-লতে থাকা সিগারেট অর্ধেকের বেশি পু-ড়ে লম্বাটে ছাই হয়ে জমে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে একটা কথাও শুনছেন না উনি। অর্থাৎ, রাশেদ পরিস্থিতিকে হাতের বাইরে মনে করছেন? বুঝে গেছেন এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই! সবকিছু শেষ! ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল রুদ্র। রাশেদ আমের হাল ছেড়ে দিয়েছেন! এর অর্থ জানে ও। কিন্তু মানতে পারছেনা। এভাবে সব শেষ হয়ে যেতে পারেনা। কিছু একটা করতে হবে। রুদ্র জীভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকল, 'বাবা?'

রাশেদ জবাব দিলেন না। নড়লেনও না। একই ভঙ্গিতে বসে আছেন। ব্যপারটা জাফরও খেয়াল করল। অবাকও হলো। রুদ্র আরেকটু জোরে ডাকল, 'বাবা?'

অদ্ভুত ভঙ্গিতে চমকে উঠলেন রাশেদ। নির্বোধের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রুদ্রর দিকে। অতঃপর সামলালেন নিজেকে। পু-ড়তে থাকা সিগারেটটার দিকে একবার তাকিয়ে অ‍্যাশট্রেতে গুঁজে রাখলেন। শিরদাঁড়া সোজা করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, 'বলো, শুনছি।'

রুদ্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রাশেদের দিকে। যা বলতে চাইছিল তা আর বলল না। কথা ঘুরিয়ে বলল, 'আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি কিছু করা যায় কি-না।'

রাশেদ জবাব দিলেন না। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বললেন, 'উচ্ছ্বাস কোথায়?'

জাফর চিন্তিত কন্ঠে বলল, 'জানিনা, ভাইজান। ইদানিং বাড়িতে খুব একটা পাওয়া যায়না ওকে। কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে ও-ই জানে। আমি একটা ফোন করে দেখছি।'

রাশেদ কিছু বললেন না। জাফর কল করল উচ্ছ্বাসকে। কিন্তু এখনো তাকে লাইন পেলো না। রুদ্র গম্ভীরমুখ করে ভাবছে কিছু একটা। তারমধ্যেই রাশেদ বললেন, 'ফান্ডে কত আছে, আর কার কার কাছ থেকে কত টাকা পাওনা আছে চেক করে দেখো। মোট এমাউন্ট টা বলো আমাকে।'

রুদ্র বলল, 'আমি ইকবা_ মানে আমরা দেখে নিচ্ছি।'

ইকবালের নাম নিতে গিয়েও থেমে গেল রুদ্র। আগে টাকা পয়সার হিসেব, দেখাশোনা সব ইকবাল করতো। লোকটা যেন হঠাৎ কর্পূরের মতোই উবে গেল। সোলার সিস্টেমের সঙ্গে বহু বছরের সম্পর্ক ছিল তার। হঠাৎ কেন এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল লোকটা? কেন তথ্যপাচার করেছিল? আর হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল? আদোও বেঁচে আছে কি-না। সবটাই রহস্য।

রাশেদ আবার বললেন, 'পাশের ঘরে তিন নম্বর আলমারির প্রথম ড্রয়ারে কিছু কাগজ আছে। সেখানে আরও কিছু ফাইল আছে। ওগুলো বের করে দেখে নিও। ওখানে বেশ কিছু টাকা আর লেনদেনের হিসেব রাখা আছে। ওগুলোর কথা আমি ছাড়া আর কেউ জানতোনা।'

জাফর বলল, 'আপনি তো আছেনই ভাইজান। আমাদের দেখার কী দরকার? '

'কোন কিছুই শাশ্বত নয়। সেটা এখনো বুঝিস নি? কখনও ভেবেছিলি এই দিন আসবে? এসেছেতো! এখন এমন অনেক কিছুই হবে যা কেউ কখনও ভাবেনি। তাই শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে হবে সবাইকে। যেকোনো ঘটনাকে মেনে নেওয়ার জন্যে। যেকোন মুহুর্তে যা কিছু ঘটে যেতে পারে। যা কেউ হয়তো কল্পনাও করছেনা।'

রুদ্র কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাশেদের দিকে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। কারো দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল চুপচাপ। 

—————

সদা প্রাণোচ্ছ্বল আমের ভিলা হঠাৎ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমের পরিবারের বাইরের জগতটা যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক, অন্দরমহলে সবসময়ই ঝলমলে আলো ছিল। কিছুদিন আগেও বাড়িটা কতো হাসিখুশি ছিল। বিয়ের আনন্দ, কেনাকাটা, দুষ্টুমিতে মেতে ছিল গোটা পরিবার। কিন্তু সেই আনন্দের উজ্জ্বল সূর্যে গ্রহন লেগে গেল। ভয়ানক গ্রহন। এই গ্রহন কবে কাটবে, আদোও কাটবে কি-না। কারো জানা নেই। ভেতরে ভেতরে এক দীর্ঘশ্বাস চেপে কুহুর ঘরের ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো প্রিয়তা। কুহু বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। খোলা জানালা দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে।

নীরবের বাবা-মা যেদিন বিয়েটা ভেঙ্গে চলে গেলেন, সেদিনের পর থেকে নীরবেরও আর দেখা পাওয়া গেলোনা। ওরা ভেবেছিল নীরব আসবে। আর যাই হোক নীরব কুহুর কাছ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবেনা। এই অবস্থাতেতো না-ই। কিন্তু ওদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। এতকিছুর ঘটে যাওয়ার পরেও নীরব আর একটাবারও এলোনা আমের ভিলায়। দেখা দেওয়াতো দূর, একটাবায খোঁজ অবধি নিলোনা কুহুর। ওরা বুঝে গেল বাবা-মার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে নীরব। ও নিজেও চায়না কুহুকে বিয়ে করতে। সেটা আরও নিশ্চিত হলো যখন দেখল, ফোনেও কোনরকম যোগাযোগ করা যাচ্ছেনা ওর সাথে। বাস্তব দৃষ্টিতে দেখলে বেশিরভাগ ছেলের সিদ্ধান্ত হয়তো এমনই হতো। কিন্তু নীরবকে সত্যিই অন্যরকম মনে হয়েছিল সবার। সকলেই চেয়ে আলাদা। কিন্তু ওও যে এরকমভাবে মাঝপথে কুহুর হাত ছেড়ে দেবে সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। লোকে ঠিকই বলে, একমাত্র সংকটকালেই মানুষের বাস্তবিক চেহারা প্রকাশ পায়। বাকিটাতো শুধুই মুখোশ। 

দুটো দিন কাটতেই কুহুও কীভাবে যেন ব্যপারটা বুঝে গেল। ছটফট করতে করতে ভীষণ কেঁদেছিল মেয়েটা সেদিন। প্রিয়তা, জ্যোতি, উচ্ছ্বাস মিলে সারাক্ষণ চেষ্টা করে যাচ্ছে মেয়েটাকে স্বাভাবিক রাখার। ওর জীবনের তিক্ত সত্যগুলোকে ভুলিয়ে রাখার। কিন্তু বিশেষ কোন লাভ হচ্ছেনা। যত দিন যাচ্ছে ততই ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছে মেয়েটা। সেই শিশুসুলভ চোখদুটোর নিচে কালি পড়ে গেছে, চুপসে গেছে সুন্দর মুখটা। কদিনেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেন। রুদ্র খুব একটা আসেনা কুহুর সামনে। কুহুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয় ওর। ভাই হিসেবে চরম ব্যর্থ মপে হয়। তাইতো মনে মনে এক ভয়ানক প্রতিজ্ঞা করে রেখেছে। যতদিন না সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পারছে, কুহুর সামনে আগের মতো মাথা উঁচু কর‍ে দাঁড়াবেনা সে। কখনই না।

প্রিয়তার ভাবনার মাঝেই উচ্ছ্বাস কুহুর ঘরে এসে ঢুকল। কুহুকে ভালোভাবে একবার দেখে নিয়ে প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাঁচাল। অর্থাৎ, কী অবস্থা? প্রিয়তা কাঁধ ঝাকাল। উচ্ছ্বাস আস্তে আস্তে গিয়ে বসল কুহুর পাশে। প্রিয়তাও বসল। কুহুর কোন প্রতিক্রিয়া হলোনা তাতে। ও এখনো তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। উচ্ছ্বাস বলল, 'জন্মদিনে ড্রয়িং সেট চাই, ড্রয়িং সেট চাই করেতো মাথা খাচ্ছিলি। এইযে এতোগুলো ড্রয়িংসেট এনে রেখে দিলাম। সেগুলোর দিকেতো ফিরেও তাকাচ্ছিস না। আমার টাকাগুলো জলে গেল! এইজন্যই কারো ভালো করতে নেই। এই শেষ। আর যদি কখনও করেছি।'

কুহু কিছুই বলল না। উচ্ছ্বাস খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বলল, 'কথা বলবিনা? একদিকে ভালোই হয়েছে, বুঝলে বউমণি। এমনিতেও ওর ঐ ডান্সিং ল্যাঙ্গুয়েজের এক লাইন বুঝতে আমার পাঁচ মিনিট লেগে যেতো। তারচেয়ে সাইলেন্ট বেটার। বলো?'

প্রিয়তা কুহুর মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলল, 'আচ্ছা। ওর ড্রয়িং সেটগুলো না হয় পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমি যে এতো কষ্ট করে কক্সবাজারে রোদে ঘুরে ঘুরে এতোগুলো ঝিনুকের মালা কিনে আনলাম। পরে দেখাবেনা আমায়?'

কুহুর কোন সাড়া পাওয়া গেলোনা। প্রিয়তা আবার বলল, 'তুমি বলেছিলেনা? জন্মদিনের উপহার হিসেবে একটা পুচকে সোনা দিতে? সেও খুব শীঘ্রই আসবে। তুমি শুনেও কিছু বললে না যে? খুশি হওনি?'

কুহু এবারও নিরুত্তর, প্রতিক্রিয়াহীন। হাল ছাড়ল প্রিয়তা আর উচ্ছ্বাস। এরমধ্যেই কুহুর জন্যে খাবার নিয়ে এলো জ্যোতি। চোখের ইশারায় জানতে চাইল কোন উন্নতি হলো কি-না। প্রিয়তা চোখের ইশারাতেই নিরাশ করল জ্যোতিকে। জ্যোতি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে খাবারের ট্রে টি-টেবিলে রাখল। কুহুকে খাওয়ানোর প্রস্তুতি নেবে, তখনই ওদের সবাইকে চমকে দিয়ে কুহুর ঘরে এসে উপস্থিত হলেন রাশেদ আমের। ওনাকে দেখে কুহু বাদে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে গেল। তিনজনই যে ভীষণ অবাক হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এ'কদিন মেয়ের সামনে ভুল করেও আসেন নি সে। ঘরে ভেতরে খানিকটা এগিয়ে এলেন রাশেদ। টি-টেবিলে রাখা খাবারের দিকে একবার তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, 'ওক আমি খাইয়ে দিচ্ছি। তোমাদের এখানে থাকতে হবেনা। তোমরা যাও।'

আরেকদফা অবাক হল প্রিয়তা, উচ্ছ্বাস আর জ্যোতি। এমন কিছু আশা করেনি মোটেই। কিন্তু রাশেদের আদেশ মেনে মাথা নিচু করে চুপচাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে। রাশেদ কুহুর দিকে তাকিয়ে দেখল কুহু এখনো সেভাবেই বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় মেয়েটা রাশেদের কাছ থেকে সামান্য সময় পেলে খুশিতে লাফিয়ে উঠতো। আর আজ রাশেদ নিজে ওর রুমে এসেছে, অথচ মেয়েটা নড়ছেও না। বুকের মধ্যে ভীষণ ভারী কষ্ট অনুভব করলেন রাশেদ। মনে হলো যেন এতোদিন দূরে সরে থাকা বার্ধক্য একসঙ্গে তার শরীরে এসে বাসা বেঁধেছে। লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিয়ে বসল কুহুর পাশে। আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ডাকল, 'কুহু, মা?'

নিজের কন্ঠস্বর নিজের কাছেই কেমন অদ্ভুত লাগল রাশেদের। কুহুও কেমন নড়ে উঠল। কিন্তু ফিরে তাকাল না রাশেদের দিকে। রাশেদ বুকে ব্যথা বাড়ছে। ইদানিং বেশ ঘনঘনই ব্যথা হচ্ছে বুকে। কাউকে বুঝতে দিচ্ছেনা সে। কিন্তু শরীর ঠিক যাচ্ছেনা তার। নিজেকে স্বাভাবিক করে সে আবার বলল, 'বাবার সাথে কথা বলবিনা, মা? এতো অভিমান?'

বাবার ভাঙা কন্ঠের করুণ আহ্বান উপেক্ষা করতে পারল না কুহু। ফিরে তাকাল রাশেদের দিকে। মুহূর্তেই চোখভর্তি জল এসে জমা হল। বহু আকাঙ্ক্ষিত বাবার কোমল স্নেহ পেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলল মেয়ে রাশেদ বলল, 'বাবাকে ক্ষমা করে দিও, মা। তোমার বাবাই তোমার সবচেয়ে বড় অপরাধী।'

বিছানায় ভর দিয়ে এগিয়ে এলো কুহু। ঝাঁপিয়ে পড়ল রাশেদের বুকে। নিঃশব্দ কান্নায় নিজের সকল কষ্ট, দুঃখ, অভিযোগ, অভিমান ঢেলে দিল বাবার বুকে। জানল না, ওর বিলিয়ে দেওয়া দুঃখ, কষ্ট, অভিযোগ, অভিমানের ভারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এক অনুতপ্ত পিতার বৃদ্ধ বক্ষ। কিন্তু নীরবে তা মেনে নিলেন রাশেদ। সন্তানের সমস্ত যন্ত্রণার ভার বয়ে বেড়ানোতেও যেন বাবারা অদ্ভুত সুখ খুঁজে পান। রাশেদও পাচ্ছেন। সে সুখের মাপদন্ড হয়না। আজ বহুবছর পর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে দু ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিলেন সোলার সিস্টেমের সেই দৃঢ়, গম্ভীর, বজ্রকন্ঠী কর্ণধার।
          দ্য সোলার সিস্টেম। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে সফল এবং প্রতাপশালী একটি দল। নামের মতোই অদ্ভুত তেজ আর নিয়ন্ত্রণ শক্তি নিয়েই যেন জন্মেছিল এই দলটি। জন্মের সময় থেকেই কারো ধার না ধারা, বেপরোয়া, ঘাড়বাঁকা, সেচ্ছাচারী এক দল ছিল সোলার সিস্টেম। রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বড়সর ব্যবসায়ী কেউই কখনও বাগে আনতে পারতো না এই দলটিকে। অনেক আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয়, ঘাউড়া। শক্তিশালী এই ঘাউড়া দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, রফিক আমের। নামকরণও সেই করেন। তবে এই অভেদ্য অন্ধকার সাম্রাজ্যের শুরুটা হুট করেই ছিলোনা—

​বিংশ শতাব্দীর দিকের কথা। ঐসময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন নজীব আমের। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই আভিজাত্যের প্রতীক ছিল আমের পরিবার। নজীব আমের ব্রিটিশ রাজের অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের লজিস্টিক সাপ্লাই দেওয়ার সুবাদে তিনিই প্রথম গান লাইসেন্স ও আগ্নেয়াস্ত্রের ডিলারশিপ পান। ১৯৪০ সালের পরের দিকে জাপানি আগ্রাসনের ভয়ে ব্রিটিশরা যখন পিছু হটছিল, নজীব আমের সেই সুযোগে মিত্রবাহিনীর পরিত্যক্ত এবং ব্ল্যাক মার্কেটের অস্ত্রের একটি বিশাল মজুদ গড়ে তোলেন। তার দূরদর্শী মস্তিষ্ক এটা বুঝে ফেলেছিল যে ভবিষ্যতে জমিদারি প্রথা থাকবে না। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন, অস্ত্রের ক্ষমতা চিরস্থায়ী। কোন পরিস্থিতিতেই তা শেষ হওয়ার নয়। তাই তিনি অন্য পথে এগোন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলকে চমৎকারভাবে কাজে লাগান তিনি।

জমিদার হিসেবে নজীব আমের ব্রিটিশদের থেকে অস্ত্র মেরামতের ছোট একটি ওয়ার্কশপের অনুমতি পেয়েছিলেন। এই ওয়ার্কশপে যুদ্ধের ময়দান থেকে আসা নষ্ট বা পুরনো অস্ত্রগুলো জমা হতো। তিনি নথিপত্রে সেগুলোকে পুরোপুরি অকেজো দেখিয়ে দিয়ে, আড়ালে তা ঠিক করে নিজের গোপন ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিতেন। 
এছাড়া ১৯৪২ সালের দিকে জাপানিরা বার্মা সীমান্ত দিয়ে ধেয়ে আসছে এমন আতঙ্কে ব্রিটিশরা অনেক সময় দুর্গম এলাকার ছোট ক্যাম্প বা অস্ত্রাগার গুটিয়ে নিচ্ছিল। নজীব আমের সেইসব ক্যাম্পের পরিত্যক্ত লোহালক্কড় কেনার দোহাই দিয়ে সচল অস্ত্র ও গোলাবারুদ ট্রাকে করে নিজের জমিদার বাড়িতে সরিয়ে ফেলেন। যুদ্ধের শেষ দিকে অনেক ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈনিক সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যেতেন। নজীব আমেরের লোকবল এই ডিজার্টারদের থেকে আধুনিক স্টেন গান আর রাইফেল পানির দরে কিনে নিতেন। ফলে, ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়, নজীবের কাছে ছিল তৎকালীন আধুনিক সব অস্ত্রের বিশাল এক ব্যক্তিগত ভাণ্ডার। যা কেবল একটি জমিদার বাড়ির মাটির নিচেই সম্ভব ছিল।

​এইসবকিছুর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকতো তার মেঝ ও ছোট ছেলে হাশেম আমের আর শামসুল আমের। বড় ছেলে রবিউল তখন লন্ডনে লিঙ্কনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি শেষ করছে। কিন্তু র*ক্তের ব্যবসার এই শুরুর লগ্নেই নিয়তি যেন প্রথম সতর্কবার্তা দিয়ে যায় তাদের। ১৯৪৭ সালের দিকে দেশভাগের সময় এক দাঙ্গার মধ্যে মারা যায় তার ছোট ছেলে শামসুর আমের। পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা বুঝতে পেরে হাশেম তখন নজীব আমেরের সঙ্গে মজুদ অস্ত্র বিক্রির পরামর্শ করে। দেশময় দাঙ্গা থাকার ফলে অস্ত্রের চাহিদা ছিল তখন ব্যাপক। সে সুযোগে ওরা বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করে নিজেদের সম্পদ দ্বিগুণ করতে শুরু করে।

​দেশভাগের পর জমিদারী উচ্ছেদ আইন আসার আগেই রবিউল আমের ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসে দেশে। তার ছেলে রফিকের বয়স তখন নয়। তার স্ত্রী তখন ছোট রফিককে নিয়ে থাকতো বাপের বাড়িতেই। রবিউল আসায় ফিরে আসে তারাও। বাবার পরামর্শে রবিউল আর হাশেম সব স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে গোটা পরিবার নিয়ে ঢাকা চলে আসে। ধানমন্ডিতে বিশাল বাংলো কেনে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আভিজাত্য বজায় রেখেই গোটা আমের পরিবারের বসবাস শুরু হয় ধানমন্ডিতে। 
কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই শারীরিক অসুস্থতায় মারা যায় নজীব আমের। রবিউল আমের তখন ঢাকা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রভাবশালী ব্যারিস্টার হিসেবে পরিচিতি ঘটে তার। অন্যদিকে হাশেমের ছিল ইম্পোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা। দুজন মিলে আইনের আড়ালে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও আমলাদের সাথে গঠন করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নজীব আমেরের জমিয়ে যাওয়া সব সম্পদকে একটি পাওয়ার স্ট্রাকচারে রূপান্তরিত করে দুই ভাই। এসবের মধ্যেই অ*স্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায় আমের পরিবারের। যদিও তা ছিল গোপন কথা। বাহিরের জগত শুধু নয়, আমেরদের অন্দরমহলের মহিলারাও অনেকাংশে অজ্ঞাত ছিলেন যে তাদের প্রাসাদের ভিত গড়ে উঠছে বা*রুদ আর লা*শের ওপর। নিভৃত শয়নকক্ষে তখন হয়তো দামী আতরের চেয়েও উগ্র ছিল অস্ত্রের তেল আর লোহার গন্ধ। কিন্তু পুরুষরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছিল এই অন্ধকার জগতের জালে।

​১৯৬৫ সালের দিকের কথা, রফিক আমের সহ আমেরদের তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন; হাশেমের ছেলেরাও তখন সিন্ডিকেটের অংশ। তখনও ওরা সরাসরি অস্ত্র বেচতো না। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি আর লাহোরের বড় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সাথে লিগ্যাল ইমপোর্ট চুক্তির আড়ালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেমি-অটোমেটিক ও আধুনিক অস্ত্রের চোরাচালান রুট তৈরি করে ফেলে। বিষয়গুলো ওরা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো যে কোনো অপরাধী ধরা পড়লে রবিউল আমেরের কোর্ট রুমের বাইরে যাওয়ার সাহস পেত না। তবে সেসছরই প্রথমদিকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় রফিক আমের। তার স্ত্রীর নাম ছিল, রেহানা। পরেরবছর শেষদিকে, ১৯৬৬ সালে জন্ম নেয় আমের পরিবারের আরেক দুর্ধর্ষ শক্তি, রাশেদ আমের।

​তবে খেলাটা ঘোরে ১৯৭০ সালের পরের দিকে। যখন আমের পরিবারের এই আভিজাত্য পরিচালনার ভার এসে পরে রফিক আমেরের ঘাড়ে। সেই প্রথম তার বাবার নেটওয়ার্ককে একটি আধুনিক কর্পোরেট মাফিয়া রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন।

​রফিক আমের লোকটা ছিলেন অসম্ভব গম্ভীর এবং স্বল্পভাষী এক মানুষ। তিনি গম্ভীরতায় বিশ্বাস করলেও দয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তার একরোখা জেদ ছিল প্রবাদপ্রতিম। একবার যা বলতেন, তার অন্যথা হওয়ার উপায় ছিল না। তার আভিজাত্য তাকে সাধারণ ক্রিমিনালদের থেকে আলাদা রাখত। দামী স্যুটের পকেটে সব সময় একটি সিল্কের রুমাল রাখতো সে। কিন্তু সেই হাতেই লেগে থাকতো অনেক মানুষের তাজা র*ক্ত। তার বহু ভয়াবহ দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের নজির পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে সারা দেশ যখন যুদ্ধে অস্থির, সেসময় রফিক আমের এক ভয়াবহ ডাবল গেম খেলেন। তার আভিজাত্যের কারণে পাকিস্তানি মেজরেরা তাকে বিশ্বাস করতেন। রফিকও সে বিশ্বাস ভাঙার মতো কিছু করতেন না সরাসরি। ফলস্বরূপ বহু গোপন তথ্য তার হাতে চলে আসতো খুব সহজেই। রফিক সেই তথ্যগুলো ব্যবহার করেছিলেন নিজের স্বার্থে, কখনও মুক্তিবাহিনীর স্বার্থে। শোনা যায় বহু অস্ত্র দিয়েও সেই সাহায্যকে আরও বিস্তৃত করেছিল তরুণ রফিক। যদিও এর কোনরকম অফিশিয়াল ক্রেডিট নেননি এই আমের যুবক।

​রফিক আমেরের চরিত্রের আরেকটা ভয়ংকর দিক ছিল উনি নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতেন শতবার চিন্তা করার পর। তার মতে, প্রত্যক্ষ শত্রুর চেয়ে বেশি ভয়ংকর সেসব শত্রু যারা বন্ধু বেশে পাশে থাকে। বুকে জড়িয়ে পিঠে ছু*রি মারা তাদের বৈশিষ্ট্য। নিজের সমগ্র চিত্ত দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতাকে ঘৃণা করতো সে। তবে সে ঘৃণা হুট করে আসেনি।
১৯৭২ সালের কথা। দেশ স্বাধীনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ গেছে কেবল। রবিউল আমের আর হাশেম আমেরের ছেলে জাওয়াদ আমের চট্টগ্রাম থেকে ফিরছিল জাওয়াদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে। বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল মেয়েটি। সেইসময় আমের পরিবারের দীর্ঘদিনের অতিবিশ্বস্ত ম্যানেজার কামাল, অর্থের লোভে দস্যুদের সাথে হাত মিলিয়ে মাঝপথে হামলা করে ওদের ওপর। কামাল নিজের হাতেই তার অন্নদাতা রবিউল আমেরকে গু*লিতে ঝাঁজরা করে দেয় দেহরক্ষীসহ। সেইসঙ্গে রফিকের কলিজার টুকরো ছোট ভাই জাওয়াদকে নৃশংসভাবে জ*বাই করে দস্যুরা। সেখানেই থামেনি, জাওয়াদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ধ*র্ষ*ণ করে পেট ফেঁ*ড়ে খুন করে তারা। গোটা আমের পরিবারের ওপর পাহাড় ধ্বসে পড়েছিল সেদিন। রফিকের মাও শোক সহ্য করতে না পেরে সেরাতেই প্রাণ ত্যাগ করলেন। কান্নার গুঞ্জনে ভরে উঠেছিল আমেরদের অন্দরমহল। ছয় বছর বয়সী শিশু রাশেদ সেদিন অবুঝ চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল নিজ পরিবারের বিধ্বস্ততা।
আসলে দস্যুদের ঐ দলটার জন্যে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আমেররা। তাদের পথের কাঁটা বলা যায়। ভয়ংকর চাপা এক শত্রুতা তৈরী হচ্ছিলো ধীরে ধীরে। যদিও রবিউল আমের কয়েকবার প্রাণদান দিয়েছে তাদের। কিন্তু তাতে শত্রুতায় ভাটা পড়েনি। অতীতের সেই সব প্রাণদান আর পথের কাঁটা সরানোর খেলাটাই যেন ফিরে এসেছিল স্বজনদের বীভৎস লাশের মিছিলে। যুদ্ধ পরবর্তী এই অস্থিতিশীল অবস্থার সুযোগ নিয়েই এই অঘটনটা ঘটিয়েছে তারা। যদিও কামালের সহায়তা না পেলে এ কাজ কোনদিনও সম্ভব হতো না।

রফিক সেদিন আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিল, এই পৃথিবীতে দয়া নয়, কেবল নিষ্ঠুরতাই আভিজাত্য টিকিয়ে রাখতে পারে। সেই নিষ্ঠুরতাকে ধারণ করেই, তিনদিনের মধ্যে কামালকে খুঁজে বের করে তার শরীরের প্রতিটি হাড় নিজের হাতে চূর্ণ করেছিল রফিক। সেই দস্যু দলটি বহুদিন পলাতক থাকলেও বাঁচতে পারেনি আমেরদের হাত থেকে। মাসখানেকের মধ্যেই তাদের একে একে খুঁজে বের করে নৃশংসভাবে হত্যা করে পেট কে*টে কে*টে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেই শোনা যায়।

​সেই ভয়ংকর ঘটনার পর থেকেই রফিকের জন্যে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল জগতের সবচেয়ে বড় পাপ। যার ক্ষমা কেবল নৃ*শং*স মৃত্যু। প্রচলিত আছে, একবার তার দলের এক সদস্য সামান্য তথ্যের বিনিময়ে বিপক্ষ দলের থেকে টাকা নিয়েছিল। রফিক তাকে এমনি মারেননি; বরং তাকে দিয়েই তার নিজের পরিবারের ওপর হামলা চালাতে বাধ্য করেন। শেষে তাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে, সেই কবরের ওপর নিজের বাগানের গোলাপ গাছ রোপণ করেছিলেন।

​তবে এরপর ধানমন্ডি আর বেশিদিন থাকল না আমের পরিবার। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গুলশানে তখন নতুন বসতি গড়লেন রফিক আমের। তখন বাংলাদেশ এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানগুলোর সেই ঘোলাটে সময়কে রফিক ব্যবহার করলেন সুযোগ হিসেবে। সেনানিয়ন্ত্রিত শাসনে তখন ছোটখাটো অপরাধীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সেসময় রফিক প্রশাসনের ভেতরে থাকা নিজের বাবার পুরনো ব্যারিস্টারি কানেকশন কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিলেন। বিশৃঙ্খলাই ব্যবসার সেরা সময়, একথা খুব ভালোভাবেই জানতেন রফিক। সেই সময়কেই তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন দুর্দান্তভাবে। আর এই গোটা খেলায় রফিকের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি ছিল মধ্যযুগীয়। একবার তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী সামরিক গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য পাচারের চেষ্টা করলো। রফিক তাকে বুড়িগঙ্গার এক নির্জন চরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে তার চোখের মণি উপড়ে ফেলেছিল। সেবছরই আরেক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন রেহানা। যার নাম জাফর আমের।

​১৯৮২ সাল অবধি এভাবেই চলছিল সব। কিন্তু দেশের অবস্থা তখন আরও অস্থির। গতবছর প্রেসিডেন্ট হত্যার পর, নতুন প্রেসিডেন্ট তৈরি হলে দুর্বল শাসন আর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে আন্ডারওয়ার্ল্ড তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু মার্চের দিকে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে জারি করা হয় সামরিক শাসন। ঐসময় দেশের অবস্থা এবং প্রশাসনিক স্ট্রাকচার দেখে রফিক অনুভব করলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাড়ার মাস্তান দিয়ে সাম্রাজ্য টেকানো অসম্ভব। ক্ষমতার অখণ্ডতার জন্য প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল এবং সংগঠিত শক্তি। নিজের লাইব্রেরিতে একদিন গ্রহ-নক্ষত্রের বিন্যাস দেখতে দেখতেই তার মাথায় খেলে যায় এক অন্য চিন্তা। তিনি জানেন, মহাবিশ্বে সূর্য এক অসীম ক্ষমতার উৎস আর গ্রহরা তার চারদিকে ঘূর্ণয়মান গুটি সরূপ। ঠিক সেভাবেই তার রাজত্বও চলবে। একই নিয়মে। 

১৯৮২ সালের ২৪শে জুন, তিনি নিজের আটজন সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এবং বিশ্বস্ত অনুচরকে ডাকলেন। যাদের মধ্যে ছিল সাবেক ফৌজি থেকে শুরু করে ধূর্ত চোরাচালানি। ঢাকার গোটা ক্রাইম এরিয়াকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করলেন তিনি। আর আটজনকে সেই আট অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়ে তাদের নাম দিলেন, প্লানেটস। আর নিজেকে ঘোষণা করলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, দ্য সান। সেই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ২৪শে জুন জন্ম নিল ‘দ্য সোলার সিস্টেম’। রফিকের কাছে এই নাম ছিল আভিজাত্য আর একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতীক। যার মাধ্যমে অন্ধকার জগতের এক নতুন যাত্রা শুরু করেছিল সে।

​এই রক্তক্ষয়ী লিগ্যাসিতে ১৯৮৫ সালে অভিষেক ঘটে ২০ বছর বয়সী রাশেদ আমেরের। রফিক আমেরের বড় ছেলে। আমের পরিবারের পুরো আভিজাত্য যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতো রাশেদ আমেরের সর্বাঙ্গজুড়ে। তার চলন, বাচনভঙ্গি, সৌন্দর্য, তেজ সবকিছুই চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতো সবাইকে। ঐ বয়সেই তার চেহারার নেতৃত্বসুলভ তেজ দেখে যে কেউ দমে যেতো। 
তখন দেশজুড়ে চলছে সরকার বিরোধী গণআন্দোলনের প্রথম ঢেউ। রাশেদ তা দিয়েই বাবার নিষ্ঠুরতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। রাজপথ যখন মিছিলে উত্তাল, রাশেদ তখন সেই রাজনৈতিক গন্ডগোলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল। দেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে অত্যাধুনিক চাইনিজ ও সোভিয়েত অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার একক বাজার তৈরি করল সে। ১৯৮৭ সালের অবরোধ আর রাজপথের মিছিলে যখন দেশ উত্তাল, রাশেদ তখন প্রতিটি বড় দলের ক্যাডারদের হাতে আধুনিক সোভিয়েত ও চাইনিজ অস্ত্র পৌঁছে দিল।
রাশেদের জেদ ছিল আগুনের মতো। একবার এক সীমান্ত রক্ষী কর্মকর্তা আমেরদের অস্ত্রের ট্রাক আটকে দিলে, রাশেদ সেই কর্মকর্তার পুরো পরিবারকে জিম্মি করে নেয়। এবং শেষমেশ তাকে দিয়ে নিজের হাতেই সেই ট্রাকের দরজা খোলাতে বাধ্য করে। রাশেদের এহেন তেজ, দৃঢ়তা, জেদি মনোভাব দেখে স্বস্তি পেতো রফিক। বোঝাই যেতো, সোলার সিস্টেমকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যাবে এই ছেলে। তবে রাশেদ জানত না, এই সাম্রাজ্যের রাজদণ্ড যেমন বংশপরম্পরায় আসছে, তার পূর্বপুরুষদের পাপের দেনাটাও অলক্ষ্যে তারই দিকে ধেয়ে আসছে।

​১৯৮৮ সালটি ছিল আমের পরিবারের জন্য চূড়ান্ত বিজয়ের বছর। সেই বছরের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় তখন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ পানির নিচে। প্রশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রফিক ও রাশেদ আমের তখন দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অন্ধকার ডিলিংটি সম্পন্ন করেন। বন্যার্তদের ত্রাণের কার্গোর আড়ালে সমুদ্রপথে দেশে ঢোকে হাজার হাজার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। অন্যদিকে বন্যার সেই নিস্তব্ধতার সুযোগে রাশেদ ঢাকার শেষ বিদ্রোহী গ্যাংটিকেও মিরপুরের এক পরিত্যক্ত গোডাউনে আটকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে। ১৯৮৮ এর শেষ নাগাদ যখন পানি নামতে শুরু করল, তখন দেখা গেল বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সোলার সিস্টেমের ওপরে অন্যকোন শক্তি নেই। সেই সালেই গুলশানে তৈরী হল আন্ডারওয়ার্ল্ড রাজ্যের রাজপ্রাসাদ। আভিজাত্য আর বিলাসীতায় পূর্ণ এক বাংলো। আমের ভিলা।

​তখন দ্য সোলার সিস্টেম কেবল আর একটি দল নয়, বরং রাষ্ট্রের সমান্তরালে চলা এক অদৃশ্য মহীরুহ। পারিবারিক এবং অভ্যন্তরীণ একতাই যেন আরও মজবুত করছিল এদেরকে। কিন্তু এই প্রাসাদের প্রতিটা ইটে মিশে থাকা অভিশাপ আর হাহাকারগুলো হয়তো সেদিনও প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিল আগামীর কোনো বিভৎস দিনের অপেক্ষায়।

******

১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাস। রাশেদ তখন চব্বিশ পেরোনো তাগড়া যুবক। সরকার বিরোধী আন্দোলও তখন তুঙ্গে, ঢাকা শহর মিছিলে মিছিলে অস্থির। রাশেদ তখন ফিল্ড পর্যায়ে সোলার সিস্টেম এর নিয়ন্ত্রণ সামলাচ্ছে। তার ছোট ভাই, জাফর আমেরের বয়স তখন কেবল সতেরো। কিন্তু বড় ভাইয়ের ভীষণ ন্যাওটা সে। বেশিরভাগ সময়টাই রাশেদের সঙ্গে লেপ্টে থাকতে চায়। আমের পরিবারের পারম্পরিক পারিবারিক দৃঢ়তা অক্ষুন্ন দেখে বরাবরই স্বস্তি পায় রফিক আমের। সে জানে, যতদিন এই একতা থাকবে। ততদিন তারাও থাকবে। অপরাজেয়, অটুট।

সেই সময়কারই এক গুমোট দুপুরের কথা। পুরান ঢাকার জরাজীর্ণ এক গুদামে পৌঁছন রাশেদ আমের। জীবনের অন্যতম এক ঝুঁকিপূর্ণ ডিলিংয়ের কাজ করছিলেন সে তখন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এক লট শুল্কমুক্ত মেশিনারি পার্টস এর আড়ালে এসেছে কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। যার চালান হাতবদল হবে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সাথে। রাশেদ তার দামী স্যুটের হাতা গুটিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ম্যাপটা দেখছিলেন। ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের সাইরেন আর টিয়ার শেলের বিকট শব্দ শোনা গেল। ধোঁয়ায় চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসায় রাশেদ তার কোমরের পিস্তলটা আড়ালে চেপে ধরে পেছনের এক সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে এলো বাহিরে।

​গলিটা ছিল সরু আর ধোঁয়ায় ঢাকা। মিছিল হচ্ছিলো বাইরে। পুলিশি হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়েছে। চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া শুরু রাশেদের। গাড়িটাও তার উল্টোদিকে পার্ক করা। বহুকষ্টে আশেপাশে তাকাল সে। দিশা না পেয়ে একরকম বাধ্য হয়েই পাশের একটা বাড়ির দিকে ছুটে গেল। গিয়ে আশ্রয় নিল খোলা বারান্দার ছায়ায়। নিজের সিল্কের রুমালটা বের করে চেপে ধরল দুচোখে। ওভাবে থেকেই নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল সে। ঠিক তখনই তার কানে এল এক জোড়া চুড়ির রিনরিন শব্দ।

​রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে রুমাল সরিয়ে চোখ তুলল। এক অপূর্ব সুন্দরী রমনী দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। সতেরো কী আঠারো হবে বয়স। অতি সাধারণ সে নারী। কোনো জমকালো সাজ নেই, সাধারণ সুতি কামিজ আর কানে ছোট সোনার টপ। তার হাতের আস্তিনে সাদা আটা লেগে আছে। বোধহয় রান্নাঘরে রুটি বেলছিল, বাইরের শোরগোল শুনে দরজায় উঁকি দিয়েছে।
​কিছুক্ষণ ভয়ার্ত চোখে রাশেদের দিকে তাকিয়ে রইল মেয়েটি। তারপর মায়াবী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কী মিছিলে ছিলেন? চোখ ধুয়ে দেব?'

​রাশেদ আমের! যার সামনে বাঘা বাঘা অপরাধীরা কথা বলতে গিয়ে তোতলায়, সে মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। সে দেখল মেয়েটির চোখে এক অকৃত্রিম মায়া। রাশেদ গম্ভীর গলায় বলল, 'না। একটু পানি হবে?'

​মেয়েটি হন্তদন্ত হয়ে ভেতর থেকে এক ঘটি জল নিয়ে এল। রাশেদ যখন ঘটিটা হাতে নিল, তার আঙুলের ডগায় আলতো করে লাগল আটা মাখা হাতের স্পর্শ। রাশেদ চোখ ধুয়ে ঘটি নামিয়ে রাখল। তারপর স্থির হয়ে তাকাল মেয়েটির দিকে। সে অনুভব করল, এই মেয়েটির সাধারণত্ব তাকে এক অদ্ভুতভাবে টানছে। এক অদ্ভুত শান্তি দিচ্ছে। যা তার দামী আর কৃত্রিম জগতের কোথাও নেই। এরমধ্যেই কোথা থেকে ছুটে এলো জাফর। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ' ভাইজান! ঠিক আছেন আপনি? ভয় পেয়ে গেছিলাম খুব। ঐ গলি দিয়ে চলেন। গাড়ি ঘুরিয়ে ওদিকে নিয়ে গেছে আমাদের লোক। ইজিলি বেড়িয়ে যেতে পারব।'

রাশেদ মাথা নেড়ে এগোতে নিয়েও থেমে গেল। পেছন ঘুরে দেখল মেয়েটা এখনো ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে দেখছে তাকে। কন্ঠের গাম্ভীর্য বজায় রেখেই রাশেদ জিজ্ঞেস করল, 'আপনার নাম?'

মেয়েটি হালকা নড়ে উঠল। তারপর নিচু স্বরে বলল, 'তটিনী।'

এক চিলতে রহস্যময় হাসি খেলে গেল রাশেদের ঠোঁটে। সে বলল, ' আমি রাশেদ আমের। নামটা মনে রেখো তটিনী, দরকার পরবে।'

ঐ সপ্তাহ কেটে যায় সেই ডিলিংয়ের প্রসেস করতে করতেই।সেই গোপন অস্ত্রের ডিলিংটি ছিল মূলত আন্দোলনের দাবানলে বারুদ ঢেলে দেওয়া। সে সুকৌশলে সরকারের প্রতিপক্ষ দলগুলোর হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে দিয়ে রাজপথের শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। যার ফলে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কাজটি তারা করেছিল নিজের স্বার্থেই। কারণ রফিক এবং রাশেদ দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, একটি বড় ক্ষমতার পতন মানেই সোলার সিস্টেমের জন্য এক বিশাল শূন্যস্থান দখল করার নতুন সুযোগ।

সেই ঝামেলা মিটিয়েই একদিন একদিন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শেষে রুম ফাঁকা হতেই রাশেদ রফিককে বলল, 'আব্বা, জরুরি কথা ছিল আমার আপনার সাথে।'

নিশ্চিন্তে চুরুটে টান দিচ্ছিলেন রফিক আমের। ছেলের কথায় ধোঁয়া ছেড়ে তাকালেন। ভ্রুকুটি করে বলল, ' কী কথা?'

' বিয়ে করতে চাইছি আমি।'

তার গম্ভীর, রক্ষণশীল ছেলের মুখে হঠাৎ এরূপ কথা শুনে চমকে উঠল রফিক। বাকি পারিবারিক দুএকজন যারা উপস্থিত ছিল তারাও বিষম খেল। রাশেদের মুখে এহেন কথা! রফিক গলা ঝেড়ে বললেন, 'সবে পঁচিশ হচ্ছে তোমার। এখনই বিয়ে করতে চাও?'

রাশেদ যান্ত্রিক স্বরে বলল, 'দাদা শুনেছিলাম বিশ বছর বয়সেই বিয়ে করেছিলেন। আপনি যখন জন্মেছিলেন তখন তার বয়স ছিল একুশ। আর যখন আমি জন্মেছিলাম তখন আপনার বয়স_'

'থাক!' রফিক হতবাক চোখে চাইলেন। ছেলেকে সে চিনতে পারছিল না সেদিন। হঠাৎ এমন বিয়ে পাগল হল কেন? তাও ছেলের মন রক্ষার্থে বললেন, ' মেয়ে দেখছি আমি।'

' দেখতে হবেনা। মেয়ে আমি দেখেছি।'

শক্তপোক্ত, নিষ্ঠুর রফিক আমের ছেলের একের পর এক নিক্ষিপ্ত বো*মায় হতবাক হতেও ভুলে যাচ্ছিল সেদিন। তার এমন ব্যক্তিত্বের ছেলে নিজে মেয়ে পছন্দ করে ফেলেছে, এতো আশ্চর্য! ততটাই অবাক হয়েছে বাকিরাও। তাদের বিস্ময়কে বিন্দুমাত্র দাম না দিয়ে রাশেদ বলল, 'পুরান ঢাকাতে বাড়ি মেয়ের।'

এ পর্যায়ে হেসে ফেলল রফিক। সম্মতি জানিয়ে বলে, 'তাহলে আর কী? ঠিকানা দাও। আমরা যাই প্রস্তাব নিয়ে।'

ব্যস্! আমের ভিলাজুড়ে রাশেদ আমেরের বিবাহের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল। এ বিয়ের খবরে সবচেয়ে বেশি খুশি হল জাফর। সারা বাড়ি মাথায় করল সে। তার ভাইজানের বিয়ে বলে কথা! রেহানাও খুশি হল। আমের অন্দরমহলে সে বড় একা। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এবার তারও সঙ্গী হবে একজন।

—————

​বিয়েটা হলো ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তটিনীর পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাবটা গিয়েছিল এক বিরাট ব্যবসায়ী পরিবার থেকে। তারা জানত, রফিক আমের একজন নামকরা সাবেক ব্যারিস্টারের ছেলে এবং রাশেদ তাদের বিশাল ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসার হাল ধরেছে। তাদের কাছে আমের ভিলা মানে ছিল আভিজাত্য আর সম্মানের এক শীর্ষবিন্দু।

বেশ ধুমধাম করেই রাশেদ-তটিনীর বিয়ে হয়েছিল। গোটা আমের ভিলা ঝলমল করছিল সেদিন।
​বাসর রাতে রাশেদ যখন নিজকক্ষে ঢুকলেন। তটিনী তখন লাল বেনারসিতে মোড়ানো অবস্থায় বিছানার এক কোণে বসেছিল। রাশেদকে দেখামাত্র লাজে রাঙা হল সে। প্রচন্ড জড়তা নিয়ে বিছানা থেকে নেমে পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেল সে। কিন্তু বাঁধা দিল রাশেদ। নরম কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলল, 'আমের বাড়ির মেয়ে-বউরা কখনও কারো সামনে নত হয়না। নিজের স্বামীর সামনেও না।'

তটিনী মাথা নাড়ে। সে রাতে সেই সিল্কের রুমালটা বের করে তটিনীকে দিল রাশেদ। তটিনী মুচকি হেসে বলল, 'আপনি সেদিন অনেক ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন আমাকে। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কোনো পলিটিক্যাল ক্যাডার।'

​রাশেদ হাসল। তটিনীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর গলায় বলল, 'আমি শুধুই একজন ব্যবসায়ী, তটিনী। তবে আমার ব্যবসার জগৎটা অনেক বড়, কিন্তু সে জগৎ এখন তুমি ছাড়া অসম্পূর্ণ।'

​তটিনী লজ্জা আর মুগ্ধতায় মুড়ে রাশেদের বুকে মাথা রাখল। সে টেরও পেল না, তার স্বামী যে হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করছে। সেই হাত কয়েক ঘণ্টা আগেই এক নির্জন ডেরায় কাউকে মরণকামড় বসিয়ে এসেছে। 
আমের ভিলার প্রতিটি কোণ যখন তটিনীর হাসিতে মুখরিত হতো, রাশেদ তখন গভীর রাতে বৈঠকঘরে রফিকের আমেরের সঙ্গে বসে সোলার সিস্টেমের নতুন মারণাস্ত্রের চালান নিয়ে পরিকল্পনা করত। তটিনী জানত না, আমেরদের এই বিপুল সম্পদ আর জৌলুসের নিচে চাপা পড়ে আছে শত শত মানুষের রক্ত আর হাহাকার। সে কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী রাশেদ আমেরকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু তার অগোচরেই সে জড়িয়ে গিয়েছিল এক অন্ধকার রাজবংশের সাথে। যার কর্মফলের হিসেব কোনোদিন ভুল হওয়ার নয়। তটিনীর এই সরল বিশ্বাসই বোধ হয় আমের ভিলার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল।

রাশেদ আমের ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে ছিল ভীষণ-ই আনাড়ি লোক। নতুন দাম্পত্যেও সে কখনই সে কখনই মুখ ফুটে বলেনি ভালোবাসার কথা। কখনও কোন উপহার কিংবা ফুল দিয়ে জাহির করেনি নিজেকে। সর্বদাই গম্ভীর এক বলয়ে সে ঢেকে রাখতো নিজেকে। কিন্তু তার যত্ন আর ভালোবাসাগুলো ছিল ভীষণ গোপন। যা তটিনী টের পেয়ে যেতো। মাঝরাতে ফিরে ঘুমন্ত পেলে মাথায় চুমু খাওয়া, পছন্দের কোন খাবার এনে বিছানার কোনে রেখে দেওয়া, অসুস্থ হলে কোন না কোন বাহানায় দ্রুত বাড়ি ফেরা। তটিনীর মতো স্বামীভক্ত নারীর কাছে এই যেন অনেককিছু ছিল। রাশেদ গোপনে ভালোবাসলেও, তটিনী মনখুলে প্রকাশ্যে ভালোবাসতো তাকে।
 এরমধ্যে আগষ্টের শেষের দিকে টের পাওয়া গেল তটিনী গর্ভবতী। রাশেদ আমেরের প্রথম সন্তান এসেছে তার গর্ভে। সেদিক আরও একবার খুশিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল গোটা আমের পরিবার। রফিক আমেরও প্রচন্ড খুশি হয়ে একজোড়া সোনার বালা উপহার দিল তাকে। আমের পবিবারের আরেক উত্তরাধিকারী আসছে বলে কথা। ওপরদিকে রাশেদের অনুভূতি দেখে বোঝা যাচ্ছিল না। অথচ মাঝরাতে তটিনীর পেট ছুঁয়ে নিজের অস্তিত্বকে অনুভবের চেষ্টা তার ঠিকই ছিল। 

—————

১৯৯০ সালের শেষের দিক। সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে একটা থমথমে অস্থিরতা। প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে ঢাকার অপরাধ জগতের মানচিত্র হুট করেই বদলে গেল অনেকটা। সে নিয়ে ভীষণ চাপে ছিল সোলার সিস্টেম। প্রচন্ড ব্যস্ত ছিল রফিক এবং রাশেদ।

তটিনী তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গোটা আমের পরিবার খুবই যত্নে রাখতো তটিনীকে। রেহানা কিছুতেই কাজে হাত লাগাতে দিতোনা। জাফর দায়িত্ব নিয়ে নিয়ে তটিনীর পছন্দের খাবার কিনে আনতো। সে অবস্থাতেও ওর প্রতি রাশেদের যত্ন ছিল সুপ্ত। তটিনী হয়তো আপেল খেতে চেয়েছে, রাশেদ নিজে গিয়ে বাজার থেকে সেরা ফলটা নিয়ে আসত। কিন্তু তটিনীর সামনে গিয়ে সেটা দেওয়ার বদলে কাজের লোককে দিয়ে পাঠিয়ে দিত। তটিনী বুঝত, রাশেদ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বে ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা নেই। 
কিন্তু সমস্যা ছিল ভিন্ন। এতোমাস একসঙ্গে থেকে, আমের ভিলায় কাটিয়ে তটিনী ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল কিছু একটা গন্ডগোল আছে এই পরিবারে। এরা যা দেখায়, তা এরা না। এদের এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে চরম অস্বাভাবিক কিছু। একটু একটু করে তার আভাস পাচ্ছিল তটিনী। কিছু সংকেত, কিছু কিছু বাস্তবতা টের পেয়ে গা হিম হয়ে উঠতো ওর। সবটাই কেমন প্রচ্ছন্নভাবে ও জেনে ফেলেছিল একটু একটু করে।

সত্যটা সামনে এল খুব অনাড়ম্বরভাবে। ডিসেম্বর মাসের এক বৃষ্টিভেজা রাতে রাশেদ সারারাত বাড়ি ফিরল না। গর্ভবতী তটিনী স্বামীর চিন্তায় ঘুমোতে পারল না সারারাত। ছটফট করে ঘুরে বেড়াল এদিক-ওদিক। একেতো অকালবৃষ্টি। তার ওপর হাড় কাঁপানো শীত। চিন্তা হবারই কথা। সেদিন রাশেদ বাসায় ফিরল বেশ ভোরে। তটিনী তখন সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রাশেদের জন্য অপেক্ষা করছিল। রাশেদ তখনও খেয়াল করেনি তটিনী সেখানে। সে তার ভেজা ওভারকোটটা খুলে সোফায় ছুড়ে মারল। কোটের পকেট থেকে একটা ভারী ধাতব শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল রাশেদের পিস্তলটা। একই সাথে কোটের হাতা থেকে কয়েক ফোঁটা গাঢ় রক্ত সাদা মার্বেলের মেঝেতে টপ টপ করে পড়ল।

​তটিনী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে এতকাল জানত রাশেদ বড় কোনো শিপিং বা ইমপোর্ট ব্যবসার মালিক। কিন্তু মেঝেতে পড়ে থাকা সেই আগ্নেয়াস্ত্র আর রক্তের দাগটা স্পষ্ট জানিয়ে দিল এদের সঙ্গে মিশে থাকা অপরাধ অবৈধতা। রাশেদ তটিনীকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু থমকানোটা এক মুহূর্তেরই ছিল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পিস্তলটা তুলে নিয়ে পুনরায় পকেটে ভরল সে। রাশেদের চোখে কোনো ভয় বা লুকানোর চেষ্টা ছিল না তখন। তটিনীও কোন শব্দ করল না। কেবল ছলছলে চোখে তাকিয়ে রইল। যা বোঝার সে বুঝে গেছে। এতোদিনের অস্পষ্ট সত্যিটাও আজ স্পষ্ট ওর কাছে।

দুজনেই চুপচাপ ঘরে ফিরে এলো। তটিনী শান্ত, নিশ্চুপ। কোন প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা নেই তার। অভিমানে মিইয়ে গেছে সে তখন। রাশেদও চুপ থাকল। তটিনীর নিশ্চুপতা আরও অপরাধী করে তুলল তাকে। রাশেদ কেবল বলল, ' ক্ষমা করে দিও, তটিনী। সত্যিটা তোমাকে জানানোর ইচ্ছা ছিলোনা আমার কখনও। কিন্তু এটাও জানতাম, চিরকাল লুকোতেও পারব না। তবে নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। আমেরদের সমস্ত অন্ধকার কেবল বাহিরের জগতের জন্যে। অন্ধকারমহলে সেই অন্ধকারের ছায়া কোনদিন পড়বেনা।'

দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে তটিনী শুধু একটা বাক্যই বলল, 'অন্যকে জ্বালানো দেশলাইয়ের কাঠিও শুরুতে তা-ই ভাবে। তার মাথায় থাকা বারুদ সবাইকে পোড়ালেও, তাকে কখনও পোড়াবে না। কিন্তু বাস্তবতা আপনি জানেন।'

রাশেদ সেকথার জবাব দিতে পারেনি সে রাতে। কিন্তু তটিনীর সঙ্গে তার এক অদৃশ্য মানসিক দূরত্ব শুরু হয় সে রাত থেকেই। তবে সেইসময় থেকে তটিনীর শুধু মনে হতো সে বাঁচবেনা। বোধহয় সন্তান জন্মদানের সময় কিছু হয়ে যাবে তার। নিজের সেই ভয়ের কথা রাশেদকেও সে জানিয়েছে বহুবার। ওপরে ওপরে তেমন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও, প্রতিবার তটিনীর এমন কথায় আত্মা কেপে উঠতো রাশেদের। কখনও মুখ ফুটে না বললেও তার অন্তর জানতো, কতটা ভালোবাসে সে তটিনীকে। তটিনীর কিছু হলে রাশেদ তা মানতে পারবেনা।

—————

এরপর পৃথিবীর বুকে নেমে আসে সেই অদ্ভুত দিনটি, ১৯৯১ সালের ১৪ এপ্রিল। মাঝরাত থেকে প্রচণ্ড ভ্যাঁপসা গরম পড়লেও ভোররাতে থেকে শুরু হল তুমুল ঝড়। প্রচন্ড কালবৈশাখীর তান্ডবে তখন লন্ডভন্ড গোটা শহর। সে তান্ডবের মধ্যেই প্রসবযন্ত্রণা শুরু হল তটিনীর। বাড়িতে মেয়ে বলতে রেহানা আর কাজের মেয়ে দুটি। তারা তটিনীকে নিয়ে ঘরে রইল। রাশেদ আর জাফর করিডরে পাইচারি করছে। পাছে কিছু দরকার পরে। রফিক আমের নিচে বসার ঘরে অপেক্ষা করছে সুসংবাদের। এদিকে প্রসব বেদনা ভয়ংকর রূপ নিল তটিনীর। প্রচণ্ড ব্যথার সঙ্গে জটিলতাও দেখা দিল। কিন্তু এই ভয়ংকর ঝড়ের রাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উপায় কী? এদিকে যন্ত্রণায় বারবার বিকট চিৎকার করছে মেয়েটা।

আমের ভিলা তখন অস্থির। রাশেদ আমের অস্থির পায়ে করিডোরে পায়চারি করছেন। বাইরে যে ঝড় বইছে, তার চেয়েও বড় এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে রাশেদের মনের ভেতর। যে মানুষটি নিস্পৃহভাবে শত শত মানুষের মৃত্যু পরোয়ানা লিখেছে, সেই রাশেদ আজ স্ত্রীর চিৎকারে কেঁপে উঠছে ভেতর থেকে। প্রিয়তমাকে হারানোর ভয়ে বারবার শিড়দাঁড়া ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তার

ঝড় কমার বদলে বাড়ছে তীব্রবেগে। অনেকের ধারণা এমন ভয়ংকর কালবৈশাখী বহুবছর দেখেনি যেন। আমের ভিলার বিশালাকার জানলার কাঁচগুলো বাতাসের ধাক্কায় হাহাকার করে উঠছে। বাইরে বিদ্যুতের তীব্র চমকানি আর বজ্রপাতের শব্দে মনে হচ্ছিল যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। প্রকৃতির যেন কোন প্রলয়কে বরণ করার জন্যে নিজেই সজ্জিত হয়েছে এমন প্রলয়ঙ্করী রূপে।

অবশেষে ১৪ এপ্রিল, তান্ডবের সেই রাতে, ভোর চারটা পনেরো মিনিটে জন্ম নিল আমের পরিবারের আরেক বংশধর। শিশুর কান্নার তীব্র আওয়াজে পায়ের তলা কেঁপে উঠল রাশেদের। রেহানা ডাকতেই ছুটে গেল সে ভেতরে। তটিনী জ্ঞান হারিয়েছে। রেহানা কাঁদতে কাঁদতে সদ্যজাত শিশুকে কোলে নিয়ে এলো রাশেদের কাছে। এগিয়ে দিল তোয়ালে পেঁচানো নবজাতকে। রাশেদ ধীরেসুস্থে কোলে নিল নিজের ঔরসজাতকে। দেখল শিশুটির চোখ দুটো। অদ্ভুত তীক্ষ্ণ আর তেজদীপ্ত সেই চাউনি। ঠিক যেন বাইরের ওই কালবৈশাখীর মতোই অশান্ত। সেই ছোট্ট শরীর থেকে ঠিকরে বের হচ্ছিল এক অদ্ভুত তেজ। দীর্ঘক্ষণ স্থিরচোখে তাকিয়ে রইল ছোট্ট মুখটার দিকে। মনে হল যেন ঘোর লেগে গেছে তার। সে হাত উঁচিয়ে নিজের আরও কাছে আনলো তার সন্তানকে। অতঃপর খুবই আস্তে, ফিসফিসিয়ে বলল, ' আমের পরিবারে তোমাকে স্বাগত, ছোট আমের।'

রাশেদের সেই ঘোর কাটল রফিকের আগমনে। দৃঢ় কদমে ভেতরে প্রবেশ করল সে। জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল রাশেদের কোলে থাকা নিজের ছোট্ট বংশধরের দিকে। জোরে দুটো শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলেন রফিক আমের। হাত বাড়িয়ে চাইলেন নিজের নাতিকে। রাশেদ আরেকপলক দেখে, দিল রফিকের হাতে। অনেকটা সময় নাতিকে মনভরে দেখলেন রফিক। অবাক হলেন। সর্বাঙ্গে এতো তেজ নিয়ে জন্মানো যায়? সে এগিয়ে গেলেন জানালার দিকে। বাইরে তখনও প্রলয়ঙ্করী ঝড়। রফিক তাকিয়ে দেখল সেই তান্ডবকে। হালকা হেসে নাবজাতকের দিকে তাকিয়ে বলল, ' প্রলয় আর তান্ডবের মধ্যেই জন্মেছো তুমি, ছোট আমের। এটাই হবে তোমার বৈশিষ্ট্য। তাই তোমার নাম দিলাম, রুদ্র। রুদ্র আমের।'
          ১৯৯১ সালের ১৪ই এপ্রিলের সেই ভোরটা ছিল এক প্রলয়ংকরী সন্ধিক্ষণ। রুদ্রর জন্মই হয়েছিল তান্ডবের গর্ভে। প্রকৃতি, দেশ, অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুই তখন অস্থির। তবে আমের ভিলার অন্দরমহলে সব তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। ধ্বংসের সংকেত নিয়ে আসা সেই ভোর হয়ে উঠেছিল পরম উৎসবের। বাইরের বদলাতে থাকা ক্ষমতা আর বিশৃঙ্খলার বিপরীতে সেদিন জন্ম নিল এক নতুন সূর্য, রুদ্র আমের। যে সূর্যের আলো যেমন সব আলোকিত করে। তার উত্তাপে সবকিছু ছাই করে দেওয়ার সম্ভাবনাও এড়াতে পারে না বৈশাখের সেই তপ্ত বাতাস।

​রেহানা বেগম অতি সযত্নে উষ্ণ ভেজা কাপড়ে মুছে দিলেন ছোট আমেরকে। গায়ের রক্ত মুছতেই যেন এক অপার্থিব দ্যুতি ছিটকে বেরোল ওর শরীর থেকে। রুদ্রর চামড়া তখন দুধের মতো ফকফকা সাদা। জন্মসূত্রে পাওয়া সেই তীক্ষ্ণ চাউনি দিয়ে শিশুটি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল তার আভিজাত্য ঘেরা জন্মস্থানকে। নাতির জৌলুস দেখে রেহানার চোখ ভিজে এল। বুক ফেটে বের হল দীর্ঘশ্বাস। এই পাপপূর্ণ বংশের অন্ধকারে জন্ম নিয়ে আলোর পথে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব হবে এই শিশুর? নাকি তার সন্তানদের মতো নাতিকেও গ্রাস করবে এই কালো সাম্রাজ্য? রেহানা নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট স্বরে বললেন, 'তোমার বাপ-কাকাকে এই বংশের পাপ থেকে আমি আগলে রাখতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে সেই অন্ধকারে ডুবতে দেখার আগেই যেন আমার মরণ হয় দাদু। যেন মরণ হয়।'

প্রকৃতি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসল সেদিন। যে পাপের বোঝা রেহানা বইতে চাইছিলেন না, সেই পাপই অলঙ্কার হয়ে ধরা দিয়েছিল ওই সদ্যজাতের রক্তিম অবয়বে। আমের ভিলার দেওয়ালগুলো জানে, প্রতিটি নতুন জন্মের আনন্দ এখানে এক আসন্ন ধ্বংসের পূর্বাভাস মাত্র।

—————

​পরিষ্কার করার পর সবাই আরও একবার করে কোলে নিল ছোট আমেরকে। বাড়ির কর্মচারী থেকে পরিচারক সবার মধ্যেই নতুন ছোট সাহেবকে নিয়ে এক শিহরণ জাগানো আনন্দ। রাশেদ আমের তখনো স্থবির। তার মস্তিষ্ক তখনো ঘোরে আছে। সে এখন বাবা! এই ধ্রুব সত্যটা নিজেকে বিশ্বাস করাতেই লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। ছাব্বিশ বছরে এমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়নি তার কখনও।

​তটিনীর জ্ঞান ফিরলে রেহানা পরম মমতায় রুদ্রকে তার কোলে তুলে দিলেন। ক্লান্ত চোখে নিজের সন্তানকে দেখে দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তটিনীর। বুকের ভেতর এক প্রবল হাহাকার আর মাতৃত্বের টান একাকার হয়ে মিশে গেল। সন্তানের মাথায় পরম আবেশে চুমু খেয়ে অস্ফুট স্বরে ফুঁপিয়ে উঠল, 'রাজা! আমার রাজা বাচ্চা!'

​সকালের আবহওয়া স্থিতিশীল হতেই প্রবল উত্তেজনায় জাফর ছুটল মিষ্টির দোকানে। পুরো এলাকাজুড়ে মিষ্টি বিলি করল। আনন্দে চোখমুখ জ্বলজ্বল করছিল তার। রফিক আমেরও দুদিনের জন্য সব কাজের বিরতি ঘোষণা দিলেন। রেহানার তদারকিতে শুরু হলো এলাহি রান্নাবান্না। উৎসবের আমেজে ছেয়ে গেল গোটা আমের ভিলা। বাইরে দেশ রসাতলে যাক বা না যাক, আমেরদের সাম্রাজ্যে তখন এক নতুন আধিপত্যের সূর্যোদয় ঘটেছে।

​কিন্তু সেই সুখের আবহাওয়া টিকল না বেশিক্ষণ। হঠাৎই খবর এলো, তাদের তেজগাঁওয়ের গোডাউনে হামলা হয়েছে। রফিক আমের সঙ্গে সঙ্গে কাজের বিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন। বেরিয়ে গেলেন নিজের কার্যালয়ে। যাওয়ার আগে রাশেদকে হুকুম দিয়ে গেলেন, দল নিয়ে শীঘ্রই ফিল্ডে নামতে। সদ্য বাবা হওয়ার ঘোর থেকে বের হওয়ার আগেই আরেক ধ্বংসযজ্ঞের অংশ হতে ছুটতে হলো রাশেদকে।

​তটিনী তখনো অপেক্ষা করছে রাশেদের আগমনের। জ্ঞান ফেরার পর তখনো ঠিকভাবে দেখা হয়নি স্বামীর সাথে। নিজের সন্তানকে দেখার পর রাশেদের অনুভূতি কী? জানতে খুব ইচ্ছা করছে তটিনীর। ছেলেকে কোলে তোলা অবস্থায় রাশেদকে কেমন দেখতে লাগে, সেটা একপলক দেখার জন্য চাতকের মতো চেয়ে আছে সে। সন্তানলাভের এই মহিমান্বিত মুহূর্তে রাশেদের কাছ থেকে একটু সোহাগ, একটু সান্নিধ্য চায় তটিনী। গত চার মাস ধরে তাদের মাঝে যে মানসিক দূরত্ব দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তটিনী চাইল আজ যেন সেই ব্যবধানটুকু ঘুচে যায়।

​অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাশেদ কক্ষে প্রবেশ করলেন। তটিনীর ঠোঁটে হাসি ফুটতে গিয়েও মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল। সে দেখল রাশেদ তার কাছে না এসে সরাসরি যাচ্ছে ড্রয়ারের দিকে। ড্রয়ার খুলে নিজের অ*স্ত্রটা বের করল সে। শার্ট তুলে প্যান্টের পেছনে সেটি গুঁজতে গুঁজতে বেরোতে গিয়েও থমকে গেলেন রাশেদ। পিছন ফিরে দেখলেন তটিনী অসহায়, ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। রাশেদের পাষাণ বুকে কেউ যেন তীব্র আঘাত করল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন তার স্ত্রীর দিকে। আলতো করে তটিনীর গাল ছুঁয়ে মৃদু স্বরে বললেন, 'সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসব আমি।'

​কথাটা বলেই ঝুঁকে চুমু খেলেন তটিনীর কপালে। তারপর অতি সাবধানে স্পর্শ করলেন সন্তানের নরম গাল। পরক্ষণেই উল্টোঘুরে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তটিনীর চোখে জমা জল গাল গড়িয়ে নিচে নামল। সদ্যজাত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল রাশেদের চলে যাওয়া পথের দিকে।
রক্তের ঋণ বোধহয় এভাবেই শুরু হয়। নতুন প্রাণ আসার আনন্দ শেষ হওয়ার আগেই আরেক প্রাণহরণের পরোয়ানা জারি হয়ে যায় এই বংশের ভাগ্যে।

—————

​রাশেদ আমের পুনরায় নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন সন্ধ্যার অনেকটা পরে। দেখলেন তটিনী বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, পাশেই তাদের সন্তান। একজন পরিচারিকা ছিল তটিনীর পাশে, রাশেদকে দেখামাত্র মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেল সে। তটিনী এক পলক তাকাল স্বামীর দিকে, কিন্তু পরক্ষণেই চাপা অভিমানে চোখ সরিয়ে নিল। রাশেদ তার অ*স্ত্র যথাস্থানে রাখলেন। অতঃপর স্নান সেরে বেরিয়ে এলেন শুদ্ধ হয়ে। ধীরে পায়ে গিয়ে বসল বিছানার এক কোণে। একবার তটিনী আর একবার তার ঘুমন্ত সন্তানের দিকে তাকালেন উনি। তটিনী পুনরায় তাকাল রাশেদের দিকে; রাশেদ এবার মলিন কিন্তু মায়াবী এক হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
​এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না তটিনী। তার ঠোঁট ভেঙে কান্না এলো। বিগত চার মাসের জমানো সব অভিমান, অবহেলা আর যন্ত্রণার সেই ভারী মেঘ একসঙ্গে ঝরঝর করে বৃষ্টি হয়ে ঝরল। রাশেদ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে গেলেন। দুহাতে স্ত্রীর গাল ধরে বললেন, 'কান্না থামাও তটিনী। এই তো আমি এসেছি।'

​রাশেদ জানেন, তটিনী নারী হিসেবে চঞ্চলা ও বুদ্ধিমতী হলেও; তার স্বামীভক্তি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাইতো ভয়াবহ সেই সত্যিটা জানার পর একনিমেষে দূরত্ব বাড়িয়ে দিলেও, কখনও ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। রাশেদের ওই তেজদীপ্ত চেহারা তাকে সব ভুলিয়ে দেয়। রাশেদের সামান্য ছোঁয়াতেই তটিনী মোমের মতো গলে যায়। আর রাশেদ? মুখে না বললেও উনি তটিনীকে ঠিক কতখানি ভালোবাসেন, তা পৃথিবীর কেউ অনুমান অবধি করতে পারবে না।

​তটিনী নাক টেনে কান্না নিয়ন্ত্রণ করল। অতঃপর ছোট রুদ্রকে সযত্নে তুলে এগিয়ে দিল রাশেদের কোলে। রাশেদ দ্বিতীয়বারের মতো নিজের অস্তিত্বের চিহ্নকে দুহাতে তুলে নিলেন। দৃশ্যটা এতটাই মোহনীয় ছিল যে তটিনী মুহূর্তেই সব তিক্ততা ভুলে গেল। কোমল গলায় জিজ্ঞেস করল, 'ওকে আদর করেছিলেন?'

​রাশেদ এদিক-ওদিক মাথা নাড়লেন। তটিনী ইশারা করে বলল, 'করুন না। আপনারই ছেলে।'

​খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল রাশেদকে। তারপর লম্বা এক শ্বাস টেনে ঝুঁকে প্রথমবার উনি চুমু খেলেন তার সন্তানের কচি মুখে। এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো রাশেদের। তার পাপেপূর্ণ অন্ধকার হৃদয়টা যেন হঠাৎ এক ছটাক আলোয় হালকা হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধরফর করে উঠল তার। সে ঢোক গিলে অবাক চোখে তাকাল তটিনীর দিকে। তটিনী হাসল।

​রাশেদ রুদ্রকে আলতো করে বিছানায় নামিয়ে রাখলেন। তটিনী সন্তানের কচি আঙুলগুলো নাড়তে নাড়তে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল ছেলের মুখপানে। মৃদু স্বরে বলল, 'আমের পরিবারের পুরুষরা এত রূপ আর তেজ নিয়ে কি পৃথিবীর চোখে ধোঁকা দিতেই জন্মায়? নাকি তাদের পাপের অন্ধকার এতটাই গভীর যে তা ঢাকতে এমন অলৌকিক রূপের প্রয়োজন হয়?'

​রাশেদ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকেই একটা ম্লান হাসি হাসলেন, 'তুমি আমায় এখনো ক্ষমা করতে পারোনি তাইনা, তটিনী? পারার কথাও না। তোমার মতো পুণ্যবতীর সাথে মিথ্যাচার করে আমি আমার পাপের পাল্লা বহুগুণ ভারী করে ফেলেছি।'

​'পুণ্যবতী? সব সত্যি জেনেও আমি আপনাকে ভালোবাসি। ছেড়ে যেতে পারিনি। আপনার সন্তানের মা হয়েছি, আপনার সংসার করছি। আমাকে কি আদৌ পুণ্যবতী বলা যায়, আমের সাহেব?"

​' তোমার শুদ্ধতার কাছে আমার কলঙ্ক চাঁদের ওই দাগের মতো। খুবই ক্ষুদ্র।"

​' কিন্তু সে দাগ এড়ানোও যায় না।'

​তটিনীর এমন কঠিন সত্যকথায় রাশেদ চুপ হয়ে গেলেন। বলার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না। নিস্তব্ধতায় ছেলের আঙুল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে খানিক বাদে বললেন, 'আব্বা ওর নাম রেখেছেন রুদ্র। শুনেছো?'

​' শুনেছি।'

​' পছন্দ হয়নি তোমার?'

​' ওমা! কেন হবে না? আব্বা এত ভালোবেসে নামটা রেখেছেন।'

​' তোমার নিজের কোনো পছন্দ আছে তটিনী?'

​তটিনী রাশেদের দিকে তাকাল। চোখে সামান্য আশা ঝলকে উঠল ওর। উৎসাহ নিয়ে বলল, 'আছে। আমি... আমি ওকে ‘রাজা’ বলে ডাকি? আমার রাজা।'

​'রাজা?' রাশেদ মুচকি হাসলেন। তটিনীর এক হাত নিজের শক্ত মুঠোয় নিয়ে বললেন, 'ওর ডাকনাম রাজাই হবে। বাড়িতে সবাই ওকে রাজা বলেই ডাকবে।'

​এতক্ষণে হেসে উঠল তটিনী। এগিয়ে গিয়ে মাথা রাখল রাশেদের চওড়া বুকে। ঘুমন্ত রাজার দিকে চেয়ে থেকেই রাশেদ তটিনীর চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেলেন। দীর্ঘক্ষণ এভাবেই পার হলো দুজনের। নীরবতা কাটিয়ে হঠাৎ তটিনী বলে উঠল, 'নিজের সদ্যজাত সন্তানের কথা ভেবে কি এসব ছেড়ে দেওয়া যায় না আমের সাহেব? অন্তত এবার একটা সুন্দর-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন। আমাদের রাজার জন্য। নয়তো আমার এই নিষ্পাপ শিশুটাও একদিন আপনাদের এই পাপের ভারে তলিয়ে যাবে। আমি তা সহ্য করতে পারব না।'

​রাশেদ কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। তার স্থির দৃষ্টি তখনো রাজার দিকে। উত্তর না পেয়ে মাথা তুলল তটিনী। কাতর গলায় আবার বলল, 'ফিরে আসুন না, আমের সাহেব।'

​কিন্তু রাশেদ নির্বাক। সেদিন সরাসরি "সম্ভব না" কথাটা না বললেও রাশেদের এই পাথরচাপা নীরবতাই বলে দিল সে ফিরবে না। অথবা সেখান থেকে ফেরা যায় না। নিরাশ হয়ে তটিনী সরে এল। রাশেদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, 'আপনাদের পাপের ভার আমি আমার ছেলের কাঁধে পড়তে দেব না, আমের সাহেব। কখনো না। আমার সবটুকু আলো দিয়ে আমি আমার রাজাকে আগলে রাখব। আপনাদের অন্ধকারের ছায়াটুকুও পড়তে দেব না ওর ওপর।'

​উত্তরে রাশেদ কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না। তার নিস্তব্ধতা যেন বলে দিচ্ছিল। তিনিও মনে মনে ঠিক এটাই চান।

******

রুদ্র আমের এক অদ্ভুত দ্বৈততার মধ্যে বড় হচ্ছিল। আমের ভিলার অন্দরমহলে সবাই তাকে রাজা বলে ডাকতো। রাশেদ, জাফর, রেহানা সবার মুখেই ছিল তটিনীর দেওয়া এই আদুরে নামখানা। তটিনীর আঁচলের ছায়ায় সে ছিল এক কোমল রাজপুত্র।
কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন রফিক আমের। সে সর্বদাই রাজাকে ডাকতো তার দেওয়া সম্পূর্ণ নামে, রুদ্র আমের। সারাক্ষণ চমৎকার চঞ্চলতায় ছটফট করা রুদ্র রাজা ডাক শুনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠতো। কিন্তু রফিকের কন্ঠে সেই গম্ভীর "রুদ্র আমের" ডাক শোনামাত্রই কেমন আড়ষ্ঠ হয়ে যেতো শিশুটি। তা যেন আরও স্পষ্ট করে দিতো এই গোটা সম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার এই শিশু।

​রফিক আমেরের কাছে রুদ্র ছিল এক শাণিত তলোয়ার। যার শাণ শিশুকাল থেকেই অতিযত্নে বজায় রাখতে হবে। যখন বাড়ির বাকিরা রাজার শৈশব নিয়ে আহ্লাদে মেতে থাকতো; রফিক তখন শিশুটির তীক্ষ্ম চোখে খুঁজতেন আমের বংশের সেই আদিম তেজ। কখনো কখনো গম্ভীর মুখে রুদ্রকে নিজের কোলে বসিয়ে রাখতেন তিনি। শিশুটি ছটফট করলে শক্ত হাতে তার কাঁধ চেপে ধরতেন। যেন নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিতেন, স্থিরতা আর গাম্ভীর্যই হলো শিকারির আসল অস্ত্র। রফিকের সেই নিথর চোখের শাসন রাজার অবোধ মনে এক অদ্ভুত ভয়ের জন্ম দিত। অথচ সেই কোলেই জাপ্টে বসে থাকতো রাজা। যেন ভয়টা তার পছন্দ হয়েছে।

—————

​১৯৯৩ সালের এক কনকনে শীতের রাতে রাশেদ আমের তার মা'কে হারালেন। মারা গেলেন রেহানা বেগম। নিউমোনিয়ায় গভীর সংক্রমণেই প্রাণ ত্যাগ করলেন তিনি। অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি তাকে। তটিনীর একমাত্র ভরসাস্থলটি হারিয়ে গেল সেবছর। রেহানা যাওয়ার আগে তটিনীর হাতটা শক্ত করে ধরে শুধু বলে গিয়েছিলেন, 'রাজাকে আগলে রাখিস মা। এ বাড়ির পুরুষদের পরমায়ু খুব কম। এই বিষাক্ত হাওয়া আমাদের রাজার গায়ে লাগতে দিস না।'

​রেহানার সেই নিথর দেহের সামনে বসে হু হু করে কেঁদেছিল তটিনী। জাফর কেঁদে হালকা হলেও রাশেদ আমের তা পারলেন না। কেমন স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। অন্যদিকে রফিক আমের যেন আরও বেশি পাথর হয়ে গেলেন। রাশেদ দেখলেন, তার বাবার কান্নার কোনো ভাষা নেই। শুধু এক অদ্ভুত শূন্যতা আছে। সেই শোকাতুর পরিবেশেও রফিক আমের একবারের জন্যও দুর্বল হলেন না। বরং ছোট রাজাকে মায়ের কান্নায় কাঁদতে দেকে নিজের কাছে টেনে নিলেন তিনি। পাথুরে গলায় বললেন, ' কাঁদে না, রুদ্র আমের। মনে রেখো, শোকই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।'

দুই বছরের শিশু ঐ কঠিন কথা বুঝলনা ঠিকই। কিন্তু ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে রইল দাদার দিকে।

​রেহানা বেগমের সেই মৃত্যুর শোক কাটাতে অনেকটা সময় লাগল আমের পরিবারের। এরমধ্যে তটিনী বহুবার, বহুভাবে রাশেদকে অনুরোধ করেছে, আকুতি জানিয়েছি এই পাপের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে। বারবার বলেছে, 'ছেড়ে দিন। দয়া করে সব ছেড়ে দিন। আমাদের ছেলেটার ভবিষ্যতের জন্যে হলেও এই জগত থেকে বেরিয়ে আসুক। আমরা দূরে কোথাও চলে যাব। সুস্থ জীবন কাটাব।'

​রাশেদ শুরুতে একদম চুপ থাকলেও একপর্যায়ে গিয়ে বলতে শুরু করলেন, সে চেষ্টা করছে। কখনও বা বলতেন, 'আমাকে খানিকটা সময় দাও তটিনী। সবকিছু একটু গুছিয়ে নেই। এরপর সত্যিই ছেড়ে দেব।'

​কিন্তু রাশেদ ভালোভাবেই জানতেন, তখনও তেমন কিছুর সম্ভাবনা নেই। প্রথমত, বংশ পরম্পরায় বহন করে আসা এই পাপের অভ্যাস তগবগে তরুণ র*ক্তের পক্ষে ছাড়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, এ জগত ছাড়া ততটা সহজ না, যতটা মুখে বলা। শুধুমাত্র তটিনীকে সামাল দেওয়ার জন্যেই এসব বলেতো সে। একপর্যায়ে তটিনীও তা বুঝেও ফেলল। জেনে গেল কোন লাভ নেই। মনে এক আকাশ দুঃখ আর অভিমান চেপে রেখেই তাকে মেনে নিতে হল সবটা।

—————

​অন্যদিকে রাজা বেড়ে উঠতে লাগল এক অবিশ্বাস্য প্রাণচ্ছলতা নিয়ে। আমের ভিলার চত্বরে সে ছিল এক ছটফটে হরিণের মতো। তার গায়ের সেই জন্মকালীন ফকফকা সাদা রঙ সময়ের সাথে বদলে গিয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় হতে শুরু করল। ওর দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতো ওর দেখভালের জন্যে রাখা পরিচারিকা থেকে শুরু করে আমের ভিলার সকল কর্মচারীও। তারা সবাই রাজাকে ডাকতো 'ছোট সাহেব' বলে। ওকে একবেলা খাওয়ানোর জন্যে আধঘণ্টা যাবত গোটা আমের ভিলাময় ছুটতে হতো তাদের। গোসলের সময় এলে ছেলেটা ঘাপটি মেরে থাকতো বিশাল আমের ভিলার কোন এক কোণে। সেখানে থেকে তাকে খুঁজে বের করতে গিয়ে সকলের হাড়মাশ এক হয়ে যেতো। অতঃপর ধরে এনে গোসল করানো আরেক যুদ্ধ। তাদের বিভিন্ন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটানো, এটা ওটা নিয়ে দৌড়ে পালানো ওর স্বভাব ছিল। কারো কথা কানে না তুলে নিজের যা ভালো লাগতো তাই করতো। বেকায়দায় দৌড়ে একেক জায়গা পড়েটরে গিয়ে ব্যথাও পেতো বেশ। কিন্তু তাতে তার কিছুই হতোনা। উঠে আবার ছুট লাগাতো।

একদিন বাগানের মালি যখন ওকে ধরতে গিয়ে নাকাল হয়ে হাফাতে বসল, রাজা ফোয়ারার আড়ালে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। কচি স্বরে বলল, 'মালি কাকা, তুমি তো বুড়ো হয়ে গেছো! ধরতে পারোনা!' 
মালি হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। আমের ভিলার এই দেওয়ালের ভেতরে রাজার অবাধ রাজত্ব যেন এক রঙিন রূপকথা মত ছিল।

​এতোকিছুর পরেও কেউ একটু বকাও দিতে পারতোনা রাজাকে। কারণ দুটো ছিল। এক, তার ঐ জগতসুন্দর মুখের ভুবনভোলানো হাসি। ধরা পড়লেই সেই হাসিটা দিতো সে। যে একবার সেই হাসি দেখতো, তার জগতের সব গুলিয়ে যেতো। তটিনী ছেলের সেই ভুবনভোলানো মুখটা দেখেই ভুলে থাকতো হৃদয়ে লুকানো সব দুঃখকে।
দুই, রফিক আমের। নাতিকে নিয়ে সে ছিল ভীষণ স্পর্শকাতর। কেউ ভুলেও কিছু বলতে পারতোনা তার রুদ্র আমেরকে। সে সাহস কেউ করলে ভীষণ রেগে যেতেত রফিক। ফলে, দাদা ছিল রাজার প্রিয় মানুষ। রফিক প্রায়ই দূর থেকে রাজার চঞ্চলতা লক্ষ্য করতেন। যখনই রাজার হাসিতে অন্দরমহল মুখরিত হতো, রফিকের মুখে ফুটে উঠতো এক রহস্যময় হাসি। রাজার অবাধ স্বাধীনতার পেছনে ছিল রফিকের প্রচ্ছন্ন মদদ। যেন কেউ তার সিংহের ছানাকে শৃঙ্খলিত করতে না পারে। 
অন্যদিকে ছেলের চঞ্চলতা দেখে ভীষণ অবাক হতেন রাশেদ আমের। কারণ সে বরাবরই শান্ত, গম্ভীর। তার ঔরসজাত এতো চঞ্চলতা কোথায় পেল?

​রাজার সব দুষ্টুমির মূল প্রশ্রয়দাতা ছিল তার নিজের কাকা, জাফর আমের। জাফর তখন টগবগে যুবক। আমের ভিলার অন্ধকার জগতের সেনাপতি। কিন্তু রাজার কাছে সে ছিল শুধুই তার, জাফর কাকা। একবার জাফর যখন নিজের ৯এমএম পি*স্ত*লটা পরিষ্কার করছিল বসার ঘরে বসে। হঠাৎ রাজা পেছন থেকে এসে ছোঁ মেরে ম্যাগাজিনটা নিয়ে দৌড় দিল। জাফর তখন পেছনে ছুটতে ছুটতে নাটকীয় স্বরে বলল, 'এই চোর! চোর! রাজা চোর! ধর! ধর!'
​রাজার সে কী খিলখিলে হাসি। সেই ম্যাগাজিনটা দিয়ে বাগানের ফোয়ারার ভেতর বসে পানিতে খেলেছে সে। জাফর সেদিন ধমক দেওয়া তো দূরে থাক, হো হো করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যপারটা খেয়াল করেছিল রাশেদ। ঐটুকু শিশুর নরম ছোট্ট আঙুল অস্ত্রের অংশ কেমন স্বাচ্ছন্দ্যে নাড়ছে! দেখামাত্র শরীর শিরশির করে উঠেছিল তার। প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছিল, এর হাতে একদিন এই অ*স্ত্রই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

অপরদিকে ​তটিনী সবসময়ই চাইতো রাজার মনে দয়া আর মায়ার বীজ বুনে দিতে। যাতে রক্তের নিষ্ঠুরতা ছেলের মধ্যে কোনভাবেই বিকশিত না হয়। নিজের দুঃখ ভুলতে অবসরে আবার ছবি আঁকতে শুরু করল তটিনী। তার চমৎকার অঙ্কনগুলো দুহাত গালে রেখে বসে বসে দেখতো রাজা। সরল চোখে দৃষ্টিতে ঝলকে উঠতো মায়ের গুনের প্রতি প্রশংসা। মায়ের দেখাদেখি সেও মাঝেমাঝে চেষ্টা করতো, কিন্তু হয়ে উঠতো না। উল্টে রংয়ে মাখামাখি অবস্থা হতো। তা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠতো তটিনী। তিনি রাজাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই আমের ভিলার বাগানের এক কোণে বসতেন। পাখিদের খাবার খাওয়ানো শেখাতেন। রাজা খুবই আনন্দ পেতো পশুপাখিকে নিজ হাতে খাইয়ে। 
একবার আমের ভিলার গেটে এক ভিখারি শিশুকে দেখে রাজার খুব মায়া হল। বেচারার করুণ মুখ দেখে ওর মনে হল তার খেলার কিছু নেই। সেকারণে মন খারাপ। সে তার সবচেয়ে প্রিয় লাল গাড়িটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দিয়ে এল শিশুটিকে। তটিনী মুগ্ধ চোখে দেখল সে দৃশ্য। আবেগে চোখে জল চলে এলো তার। সে ভাবতো, রাজার ভেতরে এই যে কোমলতা, এটাই একদিন আমের বংশের এই নিষ্ঠুর ধারাবাহিকতা ভেঙে চুরমার করে দেবে। রাজা যখন বাড়িতে আসা আহত কোনো বিড়ালছানাকে পরম যত্নে সেবা করত; তটিনী তা দেখে রাশেদকে বলতো, 'দেখবেন, আমার রাজা কোনদিন আপনাদের মতো হবেনা। আপনাদের বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পাপের খণ্ডন ওর হাত ধরেই হবে। এই পাপের ধারাবাহিকতার শেষ ওর হাতেই হবে। হতেই হবে।'

​তটিনীর বিশ্বাস ছিল, প্রেম দিয়ে সব জয় করা সম্ভব। এমনকি আমেরদের রক্তে মিশে থাকা হিংস্রতাও। আর সে অসাধ্য সাধন তার ছেলেই করবে।

******

কিন্তু পাপরাজ্যে কালোছায়া পিছু ছাড়েনা কখনও। ঘনিয়ে আসা দিনগুলো হচ্ছিলো আরও ভয়ংকর। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সাল। এই দুই বছর বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে এক বিষাক্ত রূপান্তর ঘটল। চিরাচরিত অস্ত্র ব্যবসার পাশাপাশি হঠাৎ করেই ধেয়ে এল সাদা পাউডার বা হেরোইনের জোয়ার। এই নতুন সাম্রাজ্যের নেপথ্যে ছিলেন প্রশাসনের প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব, খান সাহেব। খান সাহেবের লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট। সোলার সিস্টেমের মতো পুরনো দাপুটে দলগুলোকেগুলোকে কোণঠাসা করে দিয়ে পুরো ঢাকা শহরকে ড্রা*গ ট্রানজিটের আখড়ায় পরিণত করা।

রফিক আমের ছিলেন এই ডার্টি মানির ঘোর বিরোধী লোক। ড্রাগ ব্যবসা এবং ড্রাগ দুটোই ছিল তার দুচোখের বিষ। তার চাচা হাশেম আমের এই মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে একদিন নর্দমার ধারে মরে পড়ে ছিলেন। একই দিনে ছেলে, ভাই এবং অন্তঃস্বত্তা পুত্রবধু হারানোর শোকে ভয়ানক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল হাশেম। ফল, সেই করুণ মৃত্যু। সেই দৃশ্য রফিক কোনোদিন ভুলতে পারেননি। উনি ঘৃণা করতেন এই কারবারের সবকিছুকেই। সেসময় তিনি জরুরি এক মিটিং বসান বৈঠকঘরে। সেখানে রাশেদকে সাফ জানিয়ে দিলেন, 'সোলার সিস্টেম কলিজা ফু*টোর ব্যবসা করে তা ঠিক। কিন্তু মগজ পঁচানোর ব্যবসা আমরা না করব, আর না করতে দেব। খান আটঘাট বেঁধে নেমেছে। যেকোন কিছুর মূল্যে ঐ বিষ ঢাকাজুড়ে ছড়ানো থেকে আটকাতে হবে আমাদের। সে দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। এবিষয়ে তোমার চেয়ে বেশি ভরসা আমি আর কাউকে করিনা। জাফরকে নিয়ে কাজে লেগে পড়ো।'

রফিক আমেরের আদেশে ​রাশেদ আমের এক দুর্ধর্ষ আর্মড টিম তৈরী করলেন নিজ দায়িত্বে। রাশেদ আর জাফর মিলে সোলার সিস্টেমের ক্যাডারদের নির্দেশ দিলেন আমেরদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিটি গলি মাদকমুক্ত রাখতে। ১৯৯৫ সালের এক রাতে রাশেদ খবর পান যে খান সাহেবের প্রধান জল্লাদ, কিলার কালাম তেজগাঁওয়ের এক পরিত্যক্ত গুদামে হেরোইনের বিশাল চালান নামিয়েছে। রাশেদ আমের জাফরসহ তার টিম নিয়ে কোনো সতর্কতা ছাড়াই অতর্কিতে হামলা চালায় সেখানে। বিধ্বস্ত করে দেয় ওদের। কালামের কপালে পি*স্ত*ল ঠেকিয়ে রাশেদ সেদিন শীতল গলায় বলেছিলেন, 'আব্বা বারবার সতর্ক করেছিল। খান কিছুতেই শুনলোনা তার কথা। তার মূল্য এবার তোকে চোকাতে হবে। তাও অপাড়ে গিয়ে।'

সেই রাতেই কিলার কালামসহ চারজন ক্যাডারের লাশ পাওয়া গিয়েছিল রেললাইনের ধারে। ​পরেরদিন খবরের কাগজে ফলাও করে প্রচার হয়েছিল এ ঘটনা। এই ঘটনার পর থেকেই খান আর আমেরদের মধ্যে এক অদৃশ্য অথচ ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। 

—————

১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি ড্রাগ সিন্ডিকেটের সাথে আমেরদের সংঘাত এক চূড়ান্ত রূপ নিল। অবশেষে ব্যবসার স্বার্থে খানেরা সোলার সিস্টেমের সঙ্গে এক চুক্তি করতে চাইলো। চমৎকার লাভজনক এক ড্রা*গ ব্যবসার নীল নকশা দেখিয়ে একত্রে ব্যবসার লোভ দেখালো রফিক আমেরকে।
কিন্তু রফিক আমের সেই প্রস্তাব শুধু প্রত্যাখ্যানই করলেন না, বরং তার গোয়েন্দা জাল ব্যবহার করে ড্রা*গ সিন্ডিকেটের কয়েক কোটি টাকার চালান পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিলেন। যা খানদের বুকে সরাসরি ছু*রি চালানোর সমান ছিল।

​১৯৯৬-এর ক্ষমতার পালাবদলের পর খান সাহেবের রাজনৈতিক শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। রাশেদ বুঝতে পারছিলেন রফিক সরাসরি আগ্নেয়গিরির মুখে হাত দিয়েছেন। কিন্তু রফিক আমের ছিলেন একগুঁয়ে। তিনি মনে করতেন, আমেরদের প্রতাপের সামনে এই পাউডার বিক্রেতারা নস্যি। কিন্তু রাশেদের মন অদ্ভুতভাবে খচখচ করছিল আগাম কোন অঘটনের আভাসে। জাফরকে বলে আমের ভিলার নিরাপত্তা দ্বিগুণ করলেও রাশেদ তখনও টের পায়নি, ড্রাগ মাফিয়ারা কতটা গভীরে ঘুণ ধরিয়েছে।

—————

রাজার বয়স তখন পাঁচ। আমের ভিলার সেই চঞ্চল ছেলের জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। স্কুলে হাতেখড়ি। দুষ্টু আর চঞ্চল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ মেধাবীও ছিল রাজা। খুব দ্রুতই স্পষ্ট কথা বলা শিখে ফেলেছিল সে। যেকোন কিছু বললে যেন মস্তিষ্কে গেঁথে থাকতো তার। বড়রা অনেকসময় ভুলে গেলেও, সে কখনও ভুলতো না। বুদ্ধি আর জ্ঞানে সময়ের আগেই অনেকটা বিকশিত হয়ে উঠেছিল এই ছোট আমের।

রাশেদ শহরের নামকরা এক স্কুলেই ভর্তি করলেন তাকে। পরিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয়ে থেকে তটিনী প্রতিদিন ছোট রাজাকে নিয়ে যেতে শুরু করল স্কুলে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে রফিক আমের জানালেন, রাজাকে তিনি নিজে পড়াবেন। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও সন্ধ্যার দুঘন্টা সে বরাদ্দ রাখলেন তার আদরের নাতির জন্যে। রাজাও খুশি ছিল সে সিদ্ধান্তে। কারণ অতি চঞ্চল ছোট রাজা, রফিকের সান্নিধ্যে গেলে অজান্তেই কেমন শান্ত, গম্ভীর হয়ে যেতো।

​প্রতিদিন বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসত, রাজা কাধে রঙিন ছোট ব্যাগ ঝুলিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পৌঁছতো দাদুভাইয়ের সেই গুমোট লাইব্রেরি ঘরে। সেখানে ওক কাঠের বিশাল টেবিলের একদিকে বসতেন রফিক সাহেব, পাশে ছোট্ট রাজা। দাদু আর নাতির এই একান্ত পাঠশালা ছিল আমের ভিলার সবচেয়ে নিভৃত এক দৃশ্য। রফিক সাহেব রুদ্রকে বর্ণমালা শেখাতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর পড়ানোর শৈলী ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি যখন রুদ্রর ছোট্ট হাতের ওপর নিজের ভারী পাথুরে হাতটা রেখে 'অ-আ' লেখাতেন। তখন রুদ্রর আঙুলের দৃঢ়তা দেখে রফিক সাহেব তৃপ্তির হাসি হাসতেন। বুঝতেন কতটা ধারাল এই হাত।

পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য কথা বলতেন রফিক রুদ্রর সঙ্গে। এমনি এককথায় রফিক রাজাকে বলেছিলেন, 'মানুষের মুখের ভাষা নয়, চোখে ভাষা পড়তে শেখো। সেটাই জীবনে বেশি কাজে লাগে।'

রাজা তাকিয়ে ছিল বিভ্রান্ত চোখে। ঠোঁট ফুলিয়ে প্রশ্ন করেছিল, 'চোখও কথা বলে দাদু? আমারতো বলতে পারেনা। তোমারটাওতো চুপ।'

রফিক রাজার ছোট্ট চিবুকটা ধরে বলেছিলেন, ' সবার চোখই কথা বলতে পারে, দাদুভাই। মানুষ তার মুখ দিয়ে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে। কিন্তু চোখ কোনোদিন মিথ্যা বলতে পারে না। চোখের সেই মিথ্যা ধরার ক্ষমতা যদি একবার অর্জন করতে পারো। কেউ কোনদিন তোমাকে হারাতে পারবেনা।'

এরপর থেকে তিনি রুদ্রকে শোনাতেন যে এই দুনিয়ায় চেনা শত্রুর চেয়ে চেনা মানুষের হাসিমুখ অনেক বেশি ভয়ংকর। রফিক মতে যে মানুষটা কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি তাকাতে পারে না, জানবে তার মনের গহীনে কোনো বড় পাপ বা ষড়যন্ত্র বাসা বেঁধেছে। আবার যারা অতিরিক্ত মায়াবী চোখে পলকহীন তাকিয়ে থাকে, বুঝতে হবে তারা তোমাকে মাপছে। তোমার দুর্বলতা খুঁজছে।

​রফিক সাহেব রুদ্রর মনে বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি এক চরম ঘৃণা তৈরি করে দিতেন। তিনি তাকে বোঝাতেন; যখন চোখ হাসে না কিন্তু ঠোঁট হাসে, সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত হাসি। বিশ্বাসঘাতকরা চোখের পাতা না কাঁপিয়ে হাসতে জানে। তাদের চোখের মণির ভেতরে এক ধরনের স্থির শীতলতা থাকে। রফিক নাতিকে সতর্ক করে বলতেন, বিশ্বাস শব্দটা নিজের ছায়ার জন্যেও নয়। কারণ বিশ্বাসঘাতকতা সবসময় পরিচিত কোনো চোখের আড়াল থেকেই ধেয়ে আসে। 
তিনি রাজাকে প্রায়ই বলতেন, 'শত্রু সামনে থাকলে সে যোদ্ধা। কিন্তু সেই শত্রু যদি পেছনে থাকে তাহলে সে বিশ্বাসঘাতক। যোদ্ধাকে সম্মান করা যায়, কিন্তু বিশ্বাসঘাতককে সমূলে বিনাশ করে দিতে হয়।'

ছোট্ট রাজা তার সরল চোখে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকতো নিজের দাদার দিকে। ঐটুকু শিশু কী বুঝতো তা কেউ জানেনা। তবে সে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে শুনতো একেকটা শব্দ। যেন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি শুনছে। শুধু মাঝেমাঝে আবদার করতো, 'দাদুভাই, আমি বড় হয়ে তোমার মতো অনেক বড় একটা চশমা পরব। তখন আমিও সবার চোখের মিথ্যা ধরে ফেলব, তাই না?'

রফিক আমের হাসতেন। উনি যখন অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন, তার চোখ দুটো শিকারি চিলের মতো অপরপক্ষের চোখের মণির সামান্যতম নড়াচড়াটুকুও পর্যবেক্ষণ করতেন। রফিক রুদ্রর মধ্যে নিজের সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টা বুনে দিতে চেয়েছিলেন বোধহয়।

******

১৯৯৭ সালের মে মাসটা ছিল আমের পরিবারের জন্যে আরও একটি দুর্ভাগ্যের সময়। রাশেদ আমেরের তাদরকিকে, রফিক আমেরে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ছিল ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য। চারটি অত্যাধুনিক অস্ত্রধারী দেহরক্ষী এবং একটি বুলেটপ্রুফ গ্লাস লাগানো ল্যান্ড ক্রুজার। সবকিছুই ছিল তাঁর আভিজাত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব দেখে রফিক হেসে বলতেন, ' মৃত্যুকে আমি ভয় করিনা রাশেদ। তবে পরাজয়ের ভয় আছে। এতো বছরের এই জগতে বহু সম্রাজ্য গড়েছে, আবার ভেঙ্গেও পড়েছে। এখানে যতদ্রুত সম্রাজ্য তৈরী হয়, তারচেয়েও দ্রুত হয় ধ্বংস। কিন্তু সোলার সিস্টেমের এই আমের সম্রাজ্য এখনো টিকে আছে। কেন জানো? অভ্যন্তরীণ একতা। বাইরে যত ভয়ংকর পরিস্থিতিই হোক। আমেররা কখনও নিজেদের একতা ভাঙেনি। একে অপরের সঙ্গ ছাড়েনি। আর যতদিন এই ধারা বজায় থাকবে, আমেরদের ধ্বংস সম্ভব না।'

জাফর আবেগি হয়ে বলতো, ' কিন্তু আপনার ছায়া ছাড়া সোলার সিস্টেম কীভাবে চলবে?'

রফিক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতেন, ' কারো জন্যে কিছু থেমে থাকেনা জাফর। আমি আর কী ছিলাম? ভবিষ্যতে এমন কেউ সোলার সিস্টেমের হাল ধরবে, যে হবে আমার চেয়েও তুখোড়, নিষ্ঠুর, প্রলয়ঙ্করী। যার নামটাই যথেষ্ট হবে গোটা অন্ধকার জগতকে কাঁপিয়ে তোলার জন্যে।'

রাশেদ জানতেন কথাটা সে রাজাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে। কিন্তু রাশেদ তা চাইতেন না। এই পাপের জগতের পাপ থেকে সে দূরে রাখতে চায় তার সন্তানকে। এক্ষেত্রে সে বরাবরই তটিনীর পক্ষে ছিল।

—————

অপরদিকে ড্রাগ সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা খান সাহেব এবং প্রশাসনিক পাওয়ার জানতো, রফিক আমেরকে সরাতে হলে কেবল ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। নিখুঁত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

​৭ তারিখ সন্ধ্যায় রফিক সাহেব নিজের তেজগাঁও অফিস থেকে ফিরছিলেন। তার সামনে এবং পেছনে ছিল আরও দুটি পাহারাদার জিপ। তেজগাঁও রেলক্রসিংয়ের জ্যামে যখন কাফেলাটি আটকা পড়ল, তখন চারদিকে ঝমঝমে বৃষ্টি। রেলওয়ের সিগন্যাল ম্যান ভুল সংকেত দিয়ে পুরো রাস্তাটি অবরুদ্ধ করে দিল হঠাৎ। সে ছিল খানদের সিক্রেট ইনফরমার। রফিক সাহেবের দেহরক্ষীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশের একটি উঁচু ভবন থেকে স্নাইপাররা প্রথম গুলিটি চালায় তার চালকের মাথা লক্ষ্য করে। সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটি সামনের জ্যামে পিষ্ট হয়ে যায়। রফিকের ​নিরাপত্তা বলয়টি মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, যখন পাশের একটি তেলের লরিতে ঘাতকরা ইচ্ছাকৃতভাবে বি*ষ্ফোর*ণ ঘটালো। আগুনের শিখা আর বৃষ্টির ঝাপটার মাঝে রফিক সাহেবের ব্যক্তিগত বডিগার্ডরা যখন পজিশন নিচ্ছিল, তখন পাশ থেকেই ধেয়ে এল খান সাহেবের, কিলার স্কোয়াড। এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত অ্যামবুশ। রফিককে মারার জন্যেই তৈরী হয়েছিল সুপরিকল্পিতভাবে। ভেতরে থাকা তিনজন দেহরক্ষী পাল্টা গুলি চালানোর আগেই জীবন্ত দগ্ধ হলেন। ল্যান্ড ক্রুজারের ভেতরে রফিক সাহেবের সাথে থাকা প্রধান দেহরক্ষী, যে গত দশ বছর তাঁর সব সংকটে পাশে ছিল, সে জানালার কাঁচ চূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে রফিক সাহেবকে আড়াল করতে নিজের শরীরটা ঢাল হিসেবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু অ্যান্টি-ম্যাটেরিয়াল রাইফেলের বুলেট সেই ঢালকেও বিদীর্ণ করে চলে যায়। ​বাকি দেহরক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে পজিশন নেওয়ার চেষ্টা করতেই পাশের অন্ধকার গলি থেকে ধেয়ে আসা ব্রাশফায়ারে তারা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল। রফিক আমেরের সবচেয়ে দক্ষ ক্যাডারটি যখন নিজের একে-৪৭ বের করতে গেল, তখন স্নাইপারের একটি নিখুঁত বুলেট তার খুলি উড়িয়ে দিল। রাস্তার কাদা আর বৃষ্টির জলের ওপর দেহরক্ষীদের নিথর দেহগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রইল। 
কিন্তু রফিক আমের তখনো অবিচল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাঁচের টুকরো ঢুকে রক্ত ঝরলেও তিনি তাঁর পকেট থেকে বের করলেন সোনার কারুকাজ করা নিজের রিভলভার। কিন্তু ঘাতকরা তাকে কোনো সুযোগ দিলোনা সেবার। খান সাহেবের পাঠানো কিলার স্কোয়াডের লীডার নিজে ল্যান্ড ক্রুজারের দরজা টেনে খুলল। রফিক সাহেব তার সেই তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি দিয়ে শেষবারের মতো লীডারের দিকে তাকালেন। ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত সেই মুখে মৃত্যুর বিন্দুমাত্র ভয় নেই।

​লীডার কোনো কথা বলেনি। রফিক আমেরের মতো এক বিশাল ব্যক্তিত্বকে মারার সময় কোনো নাটকীয়তা সাজানোর সাহস তার ছিল না। সে শুধু দেখল রফিক সাহেবের সেই শান্ত ধীরস্থির ভাব। মরার আগ মুহূর্তেও যার শরীরে কোনো কম্পন নেই। লীডার তার অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে ঝাঁজরা করে দিল রফিক আমেরের বুক।  
রফিক আমেরের সেই বলিষ্ঠ দেহটি ল্যান্ড ক্রুজারের দামী লেদার সিট থেকে গড়িয়ে ধুলো আর কাদার মধ্যে পড়ে গেল। তাঁর আভিজাত্য মাখা সাদা পাঞ্জাবিটি তখন রক্তের বন্যায় কালো হয়ে গেছে।

—————

চারজন বডিগার্ডসহ রফিক আমেরের লাশ আমের ভিলার বাগানে এসে পৌঁছলো ভোরবেলা। গুলশানের প্রতিবেশিসহ আমের ভিলার কর্মচারী-পরিচারিকাদের হাহাকার দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই দিনটি। 
রাশেদ আমের শান্ত, শীতল চোখে তাকিয়ে কেবল দেখছিলেন তার আব্বার ক্ষতবিক্ষত, ঝাঝরা হয়ে যাওয়া শরীরটা। গোটা শরীর অদ্ভুত শক্ত, শিথীল হয়ে ছিল তার। জাফরের আর্তনাদ ছিল কখনও ক্রোধের, কখনও হাহাকারের। তটিনী ছোট রাজাকে বুকে জড়িয়ে সদর দরজার সিঁড়িতে বসে ছিলেন। তার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না সেই ভয়ংকর সত্য। ভয়ে, আতঙ্কে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল সে তখন। মায়ের কান্নায় ঘাবড়ে গিয়ে রাজাও তটিনীর গলায় মুখ গুজে কেঁদে গেছে। সে তখনও বোঝেনি, তাকে রুদ্র আমের বলে ডাকা সেই নিষ্ঠুর ব্যক্তি, তার দাদুভাই আর পৃথিবীতে নেই।

—————

দাফনের কাজ শেষ করার বিভিন্ন আইনি ঝামেলা মিটিয়ে রাশেদ আর জাফর যখন ঘরে ফিরল, তখন মাঝরাত। রাজা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। কিন্তু তটিনীর চোখে ঘুম নেই। নিস্তব্ধ ঘরে বসে বসে বারবার শরীর শিউরে উঠছে তার। বুক ফেটে কান্না আসছে। 
হঠাৎ রাশেদ আমের এলো রুমে। কিন্তু কোনদিকে না তাকিয়ে চলে গেল সেই ড্রয়ারের কাছে। দ্রুতহাতে নিজের এক্সট্রা ম্যাগাজিন তুলে পকেটে ভরল। তার চোখদুটো সেদিন ছিল অসম্ভব শীতল, র*ক্তাভ। আতঙ্কে দ্রুত উঠে দাঁড়াল তটিনী। বিস্ফোরিত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'কোথায় যাচ্ছেন?'

জবাব না দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন রাশেদ। কিন্তু পথ আটকালো তটিনী। জীবনে প্রথমবার রাশেদকে বাঁধা দিয়ে বলল, 'যাবেন না। দোহাই লাগে। আজ না।'

'যেতে হবে।'

কঠোর স্বরে কথাটা বলে তটিনীর মাথায় গাঢ় চুমু খেলো রাশেদ। অতঃপর নির্দয়ের মতো তটিনীর হাত সরিয়ে চলে গেল। তটিনী পেছনে ছুটেও পারল না রাশেদকে আটকাতে। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে। 
কিন্তু সেদিকে ফিরে দেখার সময় নেই রাশেদের। সোলার সিস্টেমের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এজেন্টস্ ইতিমধ্যে সেই কিলার স্কোয়াডের অবস্থান জেনে গেছে। সেখানে যেতে হবে তাকে এবং জাফরকে। হিসেব মেটাতে হবে। রাশেদ চায়নি সেদিন জাফরকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ভাইজানকে একা ছাড়তে নারাজ জাফর কোন বারণ শোনেনি।

ভোর তখন চারটে বাজে। তখনও ঝুম বৃষ্টি। মগবাজারের এক পরিত্যক্ত লেদ কারখানার ভেতর সেই কিলার স্কোয়াড তখনও রফিক আমেরের খুনের সাফল্য উদযাপন করছিল। তারা ভাবতেও পারেনি, রাশেদ আমেরের নেটওয়ার্ক এত দ্রুত তাদের গর্ত খুঁজে বের করবে। রাশেদ এবং জাফরের নেতৃত্বে সোলার সিস্টেমের বিশজন সশস্ত্র ক্যাডার নিঃশব্দে কারখানাটি ঘিরে ফেলল। কোনো ঘোষণা বা সতর্কবার্তা ছাড়াই চারপাশ থেকে একসাথে বারোটি গ্রে*নেড আছড়ে পড়ল কারখানার টিনের চাল চিরে। বিষ্ফোরণ আর আগুনের ধোঁয়ার মাঝে ঘাতকরা দিশেহারা হয়ে গেল। অস্ত্র তোলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ক্যাডারদের ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তারা। আগুনে ক্ষতবিক্ষত লীডারকে জীবন্ত ধরা হলো। জাফর তাকে টেনে নিয়ে গেল রাশেদ আমেরের সামনে। প্রতিরক্ষা হেতু রাশেদের বাহুতে ছো*রাঘাত করে পালাতে চাইছিল লীডার। কিন্তু লাভ হয়নি জাফর দু' ঘা মেরে কুপকাত করে দিয়েছে। নিজের গু*লিতে একইভাবে লীডারকে ঝাঁঝরা করে দিলেন রাশেদ আমের। মাত্র চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বুঝিয়ে দিলেন, আমেরদের র*ক্তে হাত দিলে তার পরিণতি কী হয়।

পরপর দুটো বিভৎস এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনা সেবার নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ঢাকা শহরকে। আইনি সব ঝামেলা এবং জটিলতা সেবার খুবই চতুরতার সঙ্গে পাড় করেছিলেন রাশেদ আমের।

পরের দিন রাতে, রাশেদের বাহুর সেই ক্ষতের পরিচর্যা করতে করতে তটিনী ছলছলে চোখে তাকিয়ে বলল, 'আর কবে? আর কী হলে আপনি ছাড়বেন এসব? আর কতটা ভয়, আতঙ্ক, মানসিক যন্ত্রণা দিলে আপনার দয়া হবে আমার ওপর? আর কবে ছাড়বেন আপনি এইসব, আমি মরার পর?'

রাশেদের আত্মা কেঁপে ওঠে কথাটা শুনে। তটিনীর মৃ*ত্যু! এই ভাবনাটুকুই তারজন্যে দমবন্ধকর। কিন্তু বাহিরে সেই প্রতিক্রিয়া দেখালেন না রাশেদ। কিন্তু এবার তটিনীকে পুরোপুরি নিরাশও করলেন না। গম্ভীর কন্ঠে বললেন, 'কিছু কাজ বাকি বয়ে গেছে তটিনী। সে কাজটুকু শেষ করতে দাও। এরপর দেখছি কী করা যায়। কথা দিচ্ছি, আমি ভেবে দেখব।'

তটিনী তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ' সেসময় আসতে আসতে আমিওনা হারিয়ে যাই।'

রাশেদ চুপ থাকলেন। যদিও এবার মিথ্যা আশ্বাস দেয়নি সে তটিনীকে। কিন্তু কাজ বাকি আছে। পিতার হ*ত্যাকারী অ*স্ত্রের বিনাশ করেছে সে। কিন্তু হ*ত্যাকারীর বিনাশ তখনও বাকি! রফিক আমেরের মতো ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে দেওয়ার সাহস খান সাহেব পেয়েছিলেন প্রশাসনের ভেতরকার শক্ত খুঁটির জোরে। খানসহ সেই খুঁটিকেই উপড়ে ফেলবে সে। তারজন্য প্রয়োজন নিখুঁত কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনার। 

*****

​১৯৯৭ সালের আগস্ট মাস। রফিক আমেরের স্মরণে একটা ফাউন্ডেশনের নির্মাণ করলেন রাশেদ আমের। আমের ফাউন্ডেশন। এটার কেন্দ্রীয় অফিস তৈরী হল গুলশান-২ এ। সকলের চোখে এটা ছিল একটি চ্যারিটি ট্রাস্ট। কিন্তু রাশেদ আমের একে ব্যবহার করলেন নিজের একটি উচ্চতর গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি তৈরী করলেন বিশেষ সাদা টাকার জোগান। যা দিয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একাংশকে গোপনে কিনে ফেলতে শুরু করলেন উনি।
১৯৯৮ সালে মার্চের শেষের দিকে আমের ফাউন্ডেশনের গোয়েন্দা সেল খুঁজে বের করল খান সাহেবের প্রধান প্রশাসনিক সেইসব ঢালকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মঈনুল হোসেন এবং ডিআইজি আশরাফ। তারাই খুব চতুরতার সঙ্গে ধীরে ধীরে জোগাড় করল তাদের দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ। রাশেদ সেবার সরাসরি আক্রমণে গেলেন না। বরং ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সেমিনারের আয়োজন করলেন। সেই সেমিনারে এমন সব আমলাকে দাওয়াত দিলেন যারা মঈনুল ও আশরাফের প্রতিদ্বন্দ্বী। সেখানে গোপনে পৌঁছে দেওয়া হলো তাদের ড্রাগ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার যাবতীয় অডিও টেপ ও নথিপত্র। যা ছিল সোলার সিস্টেমের এক মাস্টারস্ট্রোক চাল।
অক্টোবরের দিকে রাশেদ আমেরের সুনিপুণ দাবার চালে প্রশাসনের ভেতরে এক শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। ডিআইজি আশরাফকে বরখাস্ত করা হয় সেমাসে, সেইসঙ্গে সচিব মঈনুল হোসেনকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়। খান সাহেব তার প্রধান দুই প্রশাসনিক স্তম্ভকে হারিয়ে সবদিক থেকে অনিরাপদ এবং দিশেহারা হয়ে পরে। আত্মরক্ষার শেষমেশ পলাতক হতে হয় তাকে।

—————

সেসছর পরপর দুটো সুখবর বয়ে এলো আমের ভিলায়। অক্টোবরে জানা গেল তটিনী দ্বিতীয়বারের মতো অন্তঃস্বত্তা। আর ডিসেম্বরে বেশ আয়োজন করেই বিয়ে হল জাফর আমেরের। বিয়েটা লাভ ম্যারেজ ছিল। গুলশান এলাকারই এক কন্যাকে ভালোবেসেছিল জাফর। প্রস্তাব দেওয়ায় সে মেয়ের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক উত্তর আসে। মাস দুয়েক প্রেম করার পর ধরা পড়ে যায় রাশেদ আমেরের কাছে। রাশেদ আমের তখন ঘোষণা করলেন, আমের বংশের ছেলেদের এসব ছোকছোকানি চলবে না। যদি চাওতো বিয়ে করে ঘরে তুলে ফেলো। নয়তো হাত ঝেড়ে পিছিয়ে এসো। অগত্যা প্রাণপ্রিয় বড় ভাইয়ের আদেশকে শিরধার্য করে পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করে আনলো সে।

অন্যদিকে বিগত দুবছরে রাজার পৃথিবীজুড়ে কেবল ছিল তটিনী নামের সেই নারীটি। রুদ্রর মা। রাশেদ কিংবা জাফর তাদের কাজের চাপে সময় দিতে পারতোনা ওকে। দাদা-দাদিও নেই। সারাদিন বিশাল আমের ভিলায় তটিনী-ই ছিল ওর জগৎ। তটিনীও তার সমগ্রটা দিয়ে দিয়েছিল নিজের একমাত্র সন্তানকে। সকাল থেকে রাত অবধি সারাক্ষণ রুদ্রর সঙ্গেই লেপটে থাকতো সে। সকালে রাশেদকে বিদায় দেওয়ার পর ওকে ঘুম থেকে তুলে ফ্রেশ করানো, সারাবাড়ি ছুটে ছুটে খাওয়ানো, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বাড়ি নিয়ে এসে ধরে বেঁধে গোসল করানো, দুপুরের খাবার খাওয়ানো। ভিলার বাইরে যাওয়া নিষেধ হওয়াতে রাজার খেলার সঙ্গী ছিলোনা কোন। সে অভাব পূরণ করে তটিনী নিজেই খেলতো রাজার সঙ্গে। বাগানের বিশাল দোলনায় বসে দুজন একসঙ্গে দুলতো, কানামাছি খেলতো, সারা আমের ভিলায় জুড়ে দৌড়ে একে অপরকে ধরার খেলা খেলতো। ছবি আকতে গিয়ে কখনও সুন্দর ছবি আঁকতো। কখনও রাজা নিজেকেসহ রঙে মাখিয়ে ফেলতো সবকিছু। অতঃপর মায়ের দিকে চেয়ে মুখ চেপে হেসে ফেলতো। বাড়ির পরিচারিকারা মুগ্ধ চোখে দেখতো সেই দৃশ্য। মন ভরে যেতো তাদের। রাজা আর তটিনীর হাসির শব্দে আমের ভিলায় মুখোরিত হয়ে উঠতো।
সন্ধ্যায় পড়তে বসানোর সময় অন্য বাচ্চাদের মতো জোর করতে হতোনা ওকে। পড়তে ভালোবাসতো রুদ্র। স্কুলের সবচেয়ে সেরা ছাত্র ছিল সে। শিক্ষকদের ভীষণ পছন্দের। প্রচণ্ড দুষ্টু আর ছটফটে হওয়ার সত্তেও শিক্ষক থেকে সহপাঠী সকলেই রুদ্রকে ভীষণ ভালোবাসতো।

রাশেদ সেসময় ব্যস্ততায় থাকলেও ছেলের প্রতি ভালোবাসায় কমতি থাকতোনা তার। প্রতিদিনই রাতে বাড়ি ফিরে ঘুমন্ত, কখনও জাগ্রত ছেলের কপালে চুমু না খাওয়া অবধি অন্যকাজে যেতে পারতোনা। রাজা কিছু চেয়েছে শুনলে যেকোন মূল্যে তা এনে হাজির করতেন রাশেদ। দামি কোন রত্নের মতো ছেলেকে আগলে রাখতেন।

মাঝেমাঝে এই ঝলমলে শিশুটির ভবিষ্যৎ ভেবে মন বিষণ্ন হয়ে উঠতো তটিনীর। মায়ের মলিন মুখ সহ্য হতোনা রুদ্রর। অমন দেখলেই সে ছুটে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকতো। তটিনী চাইতো রুদ্র বড় হোক। তার ধারণাকে সঠিক প্রমাণ করে একজন সৎ মানুষ তৈরী হোক।
তটিনী যখন জানল সে প্রেগনেন্ট। রুদ্রকে জিজ্ঞেস করল, 'রাজা? কী চাই বলোতো তোমার? ছোট ভাই নাকি বোন?'

রাজা ভীষণ উৎসাহ নিয়ে বলতো তার একটা ছোট বোন চাই। পুতুলের মতো ছোট্ট একটা বোন। তটিনীও মনে মনে এক কন্যা সন্তানের কামনাই করছিল সেবার।

*****

এরপর এলো ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। অবশেষে রাশেদ খোঁজ পায় খান সাহেব এবং তার গুমোট আস্তানার। সে নিজের দলসহ মধ্যরাতে হামলা চালান সেখানে। অতর্কিত হামলায় নিমেষেই ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হল খানসহ গোটা দলকে। এবার আর কোনো লাশের চিহ্ন রাখলেন না রাশেদ। খান সাহেব চিরতরে নিখোঁজ হয়ে গেলে। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে বাতাসের খানের রহস্যময় নিখোঁজ হওয়ার খবর বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। রাশেদ আমের তখন মস্তবড় এক ভার থেকে মুক্ত।

সেবছর এপ্রিলেই আমের ভিলাকে নরম ঝলমলে আলোতে ভরিয়ে দিয়ে, তটিনীর কোল আরও একবার পূর্ণ করে জন্ম নিল এক কন্যা শিশু। তটিনী এবং রাজা দুজনের ইচ্ছাই পূরণ হল। রুদ্রর খুশি তখন আকাশ ছোঁয়া। সারাবাড়ি লাফিয়ে ঝাপিয়ে বেড়িয়েছে সে তার বোন আসার আনন্দে।

জাফরের স্ত্রী নওরীন যখন ছোট্ট কুহুকে রাশেদ আমের কোলে তুলে দিল। হাতদুটো থরথর করে কাঁপছিল রাশেদের। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠছিল। তটিনীর মতোই নিষ্পাপ স্নিগ্ধতা নিয়ে জন্মেছে তাদের মেয়ে। এতো শুদ্ধতা, এতো পবিত্রতা রাশেদ এর আগে কোনদিন অনুভব করেনি। বহুবছর পর চোখে জল এলো রাশেদ আমেরের। সদ্যজাত মেয়ের কপালে দীর্ঘ এক চুমু খাওয়ার সময় সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আর না। এবার এই অন্ধকার জগতের অন্ধকার ছাড়তে হবে তাকে। তার জীবনের এই নতুন নিষ্পাপ আলোর জন্যে ছাড়তে হবে। এমনিতেও তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে। এজগতে থাকার আর কোন কারণ নেই।
কিন্তু রাশেদ তখনও জানতেন না, কর্মফলের হিসেব তখনও বাকি ছিল। সে অন্ধকার ছাড়তে চাইলেও, অন্ধকার এতো সহজে মুক্তি দেবেনা তাকে!

তটিনী ভীষণ ভালোবেসে তার মেয়ের নাম রাখলো, কুহু। কিন্তু কুহু জন্মের পর থেকেই কোন শব্দ করে কান্না বা আওয়াজ না করায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। এদিকে তটিনীও অসুস্থ। দুজনকেই দেখানো হলো। সেখানে পরীক্ষা করে জানা গেল, কুহুর বাইলেটারাল ভোকাল কর্ড প্যারালাইসিস আছে। ফলসরূপ সে কখনই কথা বলতে পারবেনা। সমস্যাটা স্নায়বিক হওয়ার এর কোন চিকিৎসাও ছিলোনা। বিষয়টাতে ভয়ানক দুঃখ পায় তারা। সকলের মনে অন্ধকার ছেঁয়ে গেলেও ভাগ্যকে মেনে নেয় ওরা। রাজ্যের এই নিশ্চুপ রাজকুমারীকেই তারা উৎসবে মুখরিত হয়ে স্বাগত জানায় আমের ভিলাতে।

—————

তার ঠিক দুদিন পর জাফরকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন রাশেদ আমের। উনি জানালেন, সোলার সিস্টেমের পাট এবার চোকাতে চান তিনি। এখন মাথায় আর কোন বোঝা নেই। ছাড়া সম্ভব। তবে আমের ফাউন্ডেশনকে বাস্তবিক অর্থেই একটা চ্যারিটি ট্রাস্ট হিসেবে চালাবে সে। বাবার স্মৃতি আর নিজের সততা দুটোই বজায় থাকবে। সে অনুযায়ী ধীরে ধীরে সব গুছিয়ে ফেলতে বললেন রাশেদ জাফরকে।

জাফর চমকে উঠেছিল রাশেদের হঠাৎ এমন ঘোষণা শুনে। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে ছিল সে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে মেনে নেয় ভাইয়ের কথা। রাশেদের কথা তার কাছে বেদবাক্যের সমান।

তবে সেকথা তটিনীকে জানায়নি রাশেদ। উনি চেয়েছিলেন সব ছেড়ে একেবারে শুদ্ধ হয়ে চমকে দেবেন প্রিয়তমাকে। তটিনী কী তখন ঠিক আগের মতো ঝলমলে হাসি হাসবে? কতদিন সেভাবে হাসেনা মেয়েটা! সেই হাসি দেখার জন্যে মন ছটফট করে তার।

******

প্রায় একসপ্তাহ জুড়ে আমের ভিলায় ছিল কুহু আগমনের আনন্দের আমেজ। তটিনীর শরীর তখনও ভালো যাচ্ছেনা। বেশ অসুস্থ সে। রুদ্রর ঘরও তখন আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। ছোট বোনের আগমনে আনন্দিত রুদ্রকে তটিনী নতুন এক দায়িত্ব দিয়েছে। বোনকে আগলে রাখার দায়িত্ব। তটিনী বলেছে, সে যেন সবসময় বোনের ঢাল হয়ে থাকে। রাজা সানন্দে সেই দায়িত্ব শিকার করেছে। সে কত দায়িত্ববান তা প্রকাশে প্রায়ই পাহারাদারের মতো সে দাঁড়িয়ে থাকে বোনের মাথার কাছে।

একদিন সকাল সকাল কুহুকে ফিডিং করাচ্ছিল তটিনী। ভোরে উঠেই কান্না করছিল সে। রাশেদ বারান্দায় ছিল তখন। রুমে এসে দেখল, চোখমুখ ভীষণ শুকিয়ে আছে তটিনীর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ অসুস্থ অনুভব করছে সে। রাশেদ ব্যস্ত হয়ে তটিনীর পাশে বসলেন। কপালে হাত রেখে বললেন, 'বেশি অসুস্থ লাগছে তোমার?'

তটিনী ক্লান্ত গলায় বলল, 'মাথা ধরছে মনে হয়।'

' ঔষধ দেব?'

' আরেকটু দেখি।'

রাশেদ চিন্তিত কন্ঠে বললেন. 'তোমাকে আমার ঠিক লাগছেনা তটিনী। বিকেলে ডক্টরের কাছে যাবে আমার সাথে।'

তটিনী মুচকি হাসল। কুহুকে দেখিয়ে বলল, 'কী মিষ্টি হয়েছে মেয়েটা। তাইনা?'

' ঠিক তোমার মতো।'

তটিনী হালকা লজ্জা পেল। মেয়ের মুখে চুমু খেয়ে তা আড়াল করে বলল, 'ওকে সারাজীবন ভীষণ আগলে রাখবেন, আমের সাহেব। আর যাই হোক, আমার এই নিষ্পাপ কোমল ফুলটার গায়ে যেন কোনদিন কোন আঁচড় না লাগে।'

রাশেদ মৃদু হেসে ছোট্ট মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, 'চিন্তা করোনা। ওর গায়ে কখনও কোন আঁচ আসতে দেবনা আমি। যদি আসে, সে আঁচ সবার আগে আমাকে ছাই করবে।'

—————

ঘন্টা দুই পাড় হয় এরমধ্যে। কুহু আবার ঘুমিয়েছে। এদিকে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছেন রাশেদ আমেরও। তটিনী মুচকি হেসে দেখলো বাপ-বেটিকে। রাশেদের কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল তটিনী বহুদিন পর। জানেনা কেন? আজ শুধু তাকিয়ে দেখতেই ইচ্ছে করছে স্বামীকে। এরমধ্যেই রাশেদের চা দিয়ে গেল পরিচারিকা। কিন্তু রাশেদ তখন ঘুমে। ডাকতে ইচ্ছা হলোনা তটিনীর। কী সুন্দর ঘুমোচ্ছে। এদিকে ওরও মাথা ধরেছে। তাই নিজেই চুপচাপ চা-টা খেয়ে নিল স্বামীকে সন্তানকে দেখতে দেখতে। একটু পরে আবার রুদ্রকে জাগিয়ে, রেডি করে স্কুলে পাঠাতে হবে। ছেলেটা একবিন্দু চলতে পারেনা ওকে ছাড়া।

—————

রাশেদের ঘুম ভাঙল মেয়ের নাড়াচাড়ার আওয়াজে। রাশেদ ভ্রুকুটি করে চেয়ে দেখলেন কুহু নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ লাল করে ফেলেছে। চমকে উঠল সে। দ্রুত উঠে কোলে নিল নিজের কান্নারত মেয়েকে। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে দেখল কাত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে তটিনী। কিন্তু মেয়েকে রেখে এমন ঘুম! বেশি অসুস্থ নাকি মেয়েটা? কুহুকে শান্ত করে পাশে আস্তে করে শোয়ালেন রাশেদ। এগিয়ে গিয়ে তটিনীর গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলেন তিনি। একদম ঠান্ডা হয়ে আছে শরীর। শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল রাশেদ আমেরের। ঢোক গিলে ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, তটিনীর শরীরে কোন মুভমেন্ট নেই। নিঃশ্বাসেরও না। ভয় পেলেন রাশেদ আমের। জীবনে প্রথমবার মারাত্মক ভয় পেলেন। হুরমুড়িয়ে বিছানা থেকে নামলেন উনি। তাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলেন। জোরে শ্বাস নিতে নিতে এলোমেলোভাবে তাকালেন চারপাশে। তার সাহস হলোনা নিজের হাতে পরীক্ষা করে দেখার যে তটিনী আছে কিনা। কিন্তু পরক্ষণেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল তার। উনি দ্রুত তটিনীর কাছে গিয়ে ঝুঁকলেন। তটিনীর গাল চাপড়ে কাঁপা গলায় ডাকলেন, 'তটিনী? এই তটিনী? এই? ওঠো? বের হতে হবে আমাকে। শার্ট-প্যান্ট বের করে দাও। ওঠো!'

কিন্তু নড়ল না তটিনী। হন্তদন্ত হয়ে রাশেদের বাইরে যাওয়ার জিনিস রেডি করল না। রাশেদ আবার ডাকল, 'এই! রাজা স্কুলে যাবেতো। খাওয়াবেনা ওকে? ওঠো! কুহু কাঁদছে দেখেছো?'

কিন্তু তটিনী সাড়া দিলোনা আর। যা চিৎকার করে রাশেদকে জানিয়ে দিল, সে আর কোনদিন সাড়া দেবেনা। কখনও না। রাশেদ জমে গেলেন। স্থির হয়ে গেলেন নিজের জায়গায়। অন্তঃস্থল থেকে যেন সবকিছু শূণ্য হয়ে গেল তার। গোটা দুনিয়া এক নিমেষেই অর্থহীন হয়ে গেল। তটিনী চলে গেল তাকে ফেলে! এভাবে চলে গেল? তবে যে সে এক পাপমুক্ত স্বাভাবিক জীবন কাটানোর আয়োজন করছিল, তার কী হবে? কার সাথে কাটাবে সেই জীবন? তার কানে বারবার বেজে উঠল তটিনীর বলা সেই কথা, 'সেসময় আসতে আসতে আমিওনা হারিয়ে যাই।'

রাশেদের বুকের ভেতর ভয়ানক জ্বালা করে উঠল। তীব্র কান্না সেখানেই কোথাও আটকে রইল জমাট বেঁধে। এই বিভৎস সত্য তাকে ফালাফালা করে দিলো যে, তার তটিনী আর নেই! সে আর ফিরবেনা! কোন আবদার, আকাঙ্ক্ষা, অভিমান করবেনা। রাশেদের সামান্য ভালোবাসায় তটিনী আর গলে যাবেনা। কোনদিন না।

—————

আমের ভিলায় তীব্র কান্নার গুঞ্জন নিয়ে এলো সে সকাল। নওরীন, জাফরসহ ঘরের প্রত্যেক পরিচারিকা কেঁদে ভাসালো তটিনীর মৃত্যুতে। বিশাল কিন্তু নিস্তব্ধ আমের ভিলার ঝলমলে হাসি ছিল তটিনী। যা সেদিন মুছে গেল চিরকালের মতো। ভিলার কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রত্যেক পরিচারিকার সঙ্গে ভীষণ প্রাণচ্ছল ব্যবহার আর মিষ্টি ভাষায় কথা বলতো সে। তারাও ভীষণ ভালোবাসতো মালকিনকে। নওরীন অল্পদিনের জন্যে এলেও তটিনী-ই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। অল্পদিনেই ভীষণ আপন করে নিয়েছিল মেয়েটা তাকে। বিয়ের পরেরদিন সকালে ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেছিল, 'আজ থেকে আমি তোমার বড় বোন বুঝলে? এই বাড়িতে আমরা একে অপরের একাকিত্বের সাথি।'

মুখে ওড়না চেপে হু হু করে কেঁদে ফেলল নওরীন। অমন প্রাণে মানুষটার প্রাণটাই আর নেই! ভালোমানুষেরা এতো দ্রুত কেন?

কাঁদলেন না কেবল রাশেদ আমের। স্ত্রীর লাশের পাশে এক অনুভূতিহীন মূর্তির মতো বসে রইলেন তিনি। পাথরের মতো স্থির চোখে চেয়ে রইলেন তটিনীর নিথর দেহের দিকে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দাঙ্গার মধ্যে আচমকা দেখা হওয়া সেই প্রাণচ্ছল অষ্টাদশী তটিনী থেকে শুরু করে তার দুই সন্তানের মা অবধি। যে এখন নিষ্প্রাণ হয়ে শুয়ে আছে তারই সামনে। আর কোনদিনও উঠবেনা সে।

রাজা যখন উঠে এলো, তখন মাকে এভাবে ঘুমোতে দেখে ভীষণ অবাক হল সে। মাতো রোজ ওকে ঘুম থেকে তোলে। আজ নিজেই ঘুমিয়ে আছে কেন? আরও অবাক হল ওর মায়ের আশেপাশে সবাইকে এভাবে কাঁদতে দেখে। সবাই কাঁদে কেন? কী হয়েছে? ও তটিনীকে ডাকল। বহুবার ডাকল। কিন্তু রাজাকে অবাক করে দিয়ে এবার আর তার মা উঠল না। রুদ্র বলল ওর ক্ষিদে পেয়েছে। সত্যিই পেয়েছে। অনেক বেলা হয়েছে। এখনো খায়নি কিছু। সে তটিনীর শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জানাল সে কথা, 'মা, ও মা। ওঠোনা। আমার খিদে পেয়েছে। ওঠো। খাব।'

কিন্তু তটিনী বরাবরের মতো এবার আর ব্যস্ত হয়ে খাবার নিয়ে এলোনা। লোকমা হাতে তুলে রুদ্রর পেছন পেছন ছুটল না। তা দেখে ভীষণ অবাক হল রুদ্র। ওর মা ওর ডাক শুনছেনা! খিদে পেয়েছে শুনেও খাওয়াচ্ছেনা! এও সম্ভব? এ হয় নাকি? এবার ঘর কাঁপিয়ে কেঁদ উঠল রাজা। হাউমাউ করে কাঁদল। নওরীন ছোট্ট দুধের শিশু কুহুকে সামলাবে নাকি রুদ্রকে তার তাল পেলোনা। এমন হাহাকারময় পরিবেশে উপস্থিত সকলেই কেঁদে ফেলল। শেষমেশ না পেরে নওরীন বুকে পাথর চেপে রাজাকে বলল, 'মারা গেছে তোমার মা আব্বু। এভাবে কাঁদেনা। একটু শান্ত হও।'

কিন্তু রুদ্র শান্ত হওয়ার বদলে আরও অশান্ত হল। ওর মা মারা গেছে! অসম্ভব কথাবার্তা! মায়েরা এতো তাড়াতাড়ি মারা যায় নাকি? রুদ্রতো এখনো নিজের হাতে খেতে পারেনা, নিজে নিজে গোসল করতে পারেনা, ওর খেলারও কেউ নেই। এখনই ওর মা মরবে কীভাবে? মরা মানেতো মাটির নিচে চলে যাওয়া। দাদাভাই যেভাবে গেছে। ওর মা ওকে রেখে একা একা সেখানে কখনই যাবেনা। কিন্তু কাউকে ও সেকথা মানাতে পারল না। রাশেদও কোন কথার জবাব দিচ্ছেনা। কেমন স্থির, নিশ্চুপ হয়ে আছে। শেষমেশ স্থির রাশেদকে ঝাঁকিয়ে রাজা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, 'বাবা, মাকে মাটির নিচে পাঠাবে না কিন্তু। খবরদার পাঠাবে না। ওখানে পাঠালে আল্লাহ আর আসতে দেয়না। দাদুভাইকে আটকে রেখেছে দেখেছোনা? মাকেও রেখে দেবে। তুমি কিন্তু ভুলেও সেখানে মাকে দেবেনা। মা ভয় পাবে অনেক। আমিও ভয় পাই মাকে ছাড়া। দেবেনা কিন্তু, দেবেনা। বলো দেবেনা।'

বলতে বলতে ঠোঁটমুখ ফুলিয়ে কেঁদে উঠল রাজা। মুখ-ঠোঁট লাল হয়ে উঠেছে ওর। লালচে নাকের পাটা ফুলে উঠছে অসহায়ের মতো। তীক্ষ্ম অথচ সরল চোখজোড়া জলে টাইটুম্বুর।
কিন্তু প্রথমবারের মতো রাজার কোন আবদার রাশেদ রাখতে পারলেন না। সব নিয়মকানুন মেনে দাফন করে আসা হল তটিনীকে। রেখে আসা হল মাটির নিচে। নেওয়ার সময় রাজা কিছুতেই তার মাকে কাউকে ধরতে দেবেনা। সে চারপাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'নেবে না আমার মাকে। খবরদার বলছি ধরবেনা। আমার মা আমাকে ছাড়া একা ভয় পায়। আমিও যাব। বলেছিনা মাকে ধরবেনা। যাও সরো।'

নওরীন আর কিছু পরিচারিকা মিলে বহুকষ্টে আটকে রাখল ওকে। একে অভুক্ত, তারওপর বিরতিহীন কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেল আট বছরের সদ্য মা হারা ছেলেটা। নিজের জন্মমাসেই সে হারিয়ে ফেলল তার জীবনের একমাত্র কোমলতাকে।

গোটা প্রক্রিয়ার সময়টা যত পার হচ্ছিল রাশেদের চোখেমুখে ভিন্ন কিছু দেখতে পাচ্ছিল জাফর। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কেমন প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটছিল রাশেদের। চোখদুটো হয়ে উঠেছিল রক্তাভ লাল, শরীর শক্ত-স্থির। প্রলয়ের পূর্বক্ষণের মতোই থমথমে ভাব। সব শেষ করে সন্ধ্যা নামতেই রাশেদ এসে বসলেন আমের ভিলার হলরুমের সোফায়। পাশে এসে বসল জাফর। ভাইজানকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারল না জাফর। দীর্ঘশ্বাস চাপল শুধু। তটিনীকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতো সে। তটিনীও বেশ স্নেহে রাখতো তাকে। তার এভাবে চলে যাওয়া নিজেও এখানো মেনে নিতে পারছেনা জাফর। 
কিন্তু রাশেদকে দেখে মনে হচ্ছিলো ভেতরে অঙ্গার পুড়ে রেখেছে কেউ। যেকোন সময় বিস্ফোরণ ঘটবে। কিন্তু কেন? হঠাৎ কী উপলব্ধি করেছে সে? বিষাদের স্থানে এই বিধ্বংস কীসের?

সেই ভাবনার মধ্যেই চিন্তিত অবস্থায় দ্রুত নিচে নেমে এলো নওরীন। তখনও রাশেদের কানে তটিনীর বলা কথাগুলোই বেজে চলেছে বিষাক্ত কোন সূচাঘাতের মতো, 'আর কবে ছাড়বেন আপনি এইসব, আমি মরার পর?'
পৃথিবীর অন্যকিছুতে মন নেই তার। আর না আছে কোন সংযোগ। তা দেখে নওরীন হতাশ হয়ে রাশেদকে বলল, 'ভাইজান, বাচ্চাটা সকাল থেকে না খাওয়া। এতো চেষ্টা করেও একটু পানি অবধি গেলাতে পারিনি। কাঁদতে কাঁদতে এখন গলা দিয়ে শব্দও বের হচ্ছেনা। খারাপভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে এবার ও। আপনি না গেলে বোধহয় খাবেনা রাজা। যদি_'

নওরীনকে থেমে যেতে হলো। কারণ গোটা হলরুমকে কাঁপিয়ে দিয়ে রাশেদ আমেরের বজ্রকন্ঠ বলে উঠল, 'রাজা নয়! রুদ্র। রুদ্র আমের। রাজা বলে কেউ নেই আর। আজকের পর থেকে কেউ আর ওকে রাজা বলে ডাকবেনা। কেউ না। এটা আমার আদেশ।'
          তটিনীর দাফনের সঙ্গে সেদিন রাজাকেও দাফন করা হল। তটিনীর সাথে বিলীন হয়ে গেল তার দেওয়া সেই আদুরে নামটার অস্তিত্বও। সেই সন্ধ্যায় রাশেদের সেই বজ্রকন্ঠী আদেশে থমকে গিয়েছিল আমের ভিলার হলরুম। জাফর-নওরীনের সঙ্গে সঙ্গে ভিলার পরিচারিকা আর কর্মচারীরাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেখানে তটিনীর বিদায়ের পর, রাশেদ আমেরের তার সকল স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখার কথা। সেখানে স্ত্রীর কবরের মাটি শরীর থেকে ধুয়ে যাওয়ার আগেই সে তার সবচেয়ে আদুরে স্মৃতি মুছে ফেলার আদেশ দিল? কিন্তু কেন? 
সেই সন্ধ্যায় আরেকটা ঘোষণা দিলেন রাশেদ আমের। বাড়ির সকল পরিচারিকা এবং কর্মচারীকে ডেকে একগড়ে বরখাস্ত করে দিলেন। জাফরকে আদেশ দিলেন নতুন লোক নিয়োগের। এবং নিয়োগপূর্বে তাদের পরিচয় যাচাইবাছাইয়ের প্রক্রিয়া হল আরও কঠোর এবং নিখুঁত। অনেক কর্মচারী হাতেপায়ে ধরে গেল, কান্নাকাটি করল। পেটে লাথি পড়বে তাদের এভাবে হুট করে কাজ গেলে। তারমধ্যে অনেকেই আমের ভিলার বহু পুরোনো বিশ্বস্ত লোক ছিল। কিন্তু রাশেদ আমের বিন্দুমাত্র গললেন না। হঠাৎই যেন ভয়ংকর এক নিষ্ঠুরতা গ্রাস করেছিল তাকে। যেখানে দয়ামায়ার কোন স্থান নেই। ব্যপারটা যদিও জাফরের পছন্দ হয়নি। এদের অনেকেই আমের পরিবারের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। তাদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা! কিন্তু ভাইজানের আদেশ। তাই কোনরকম তর্ক ছাড়াই মাথা পেতে নিয়েছে সে।

সেদিন রাতে জীবনের দীর্ঘতম শাওয়ার নিলেন রাশেদ আমের। তটিনীর কবরের মাটি যখন তার গা ধুয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল; মিলিয়ে যাওয়া সেই মাটির মতোই বিলীন হয়ে যাচ্ছিল তার বাস্তবিক অস্তিত্ব। শাওয়ার সেড়ে বেরিয়ে আর আর শার্ট পড়লেন না রাশেদ। কাবার্ড খুলে অনেক ভেতরের প্রায় আনটাচড সেকশন থেকে বের করলেন সাদা রঙের একটা পাঞ্জাবী। অতি যত্নে ভাজ করে রাখা ছিল তা। ওনাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকিতে এই পাঞ্জাবীটা উপহার দিয়েছিল তটিনী তাকে। তটিনী সাদা রঙ ভীষণ পছন্দ করতো, সেইসঙ্গে পাঞ্জাবীও। অথচ দুটোর একটাও পছন্দনা রাশেদের। উনি পাঞ্জাবী পছন্দ করেন না। সাদাতো একদমই না। তবুও প্রিয়তমা স্ত্রীর মন রাখতে সেবছর ঈদে পাঞ্জাবীটা পড়েছেলেন উনি। পরে তটিনী বুঝেছিল, রাশেদের পাঞ্জাবী এবং সাদা রং পছন্দ না। তাই আর কখনও ও সাদা কিছু উপহার দেয়নি রাশেদকে। এমনকি তটিনী নিজেও আর কোনদিন সাদা পড়েনি রাশেদের পছন্দ নয় বলে। অথচ আজ সেই অপছন্দের সাদা কাফনেই মেয়েটাকে মুড়িয়ে রেখে এসেছে মাটির নিচে। জীবনের কী অদ্ভুত শ্লেষ! 
রাশেদ সেচ্ছায় সেদিন আবার ধারণ করলেন সেই সাদা পাঞ্জাবী। শুধু তাই নয়, পরেরদিন সকালবেলাতেই নিজের সব পোশাক বিদায় করলেন কক্ষ থেকে। নিজের কর্মচারীকে হুকুম দিলেন; বিভিন্ন রকমের সাদা রঙের পাঞ্জাবী কিনে আনতে। যেমন সাদাই হোক, সব যেন সাদাই হয়। জীবনের বাকিটা সময় উনি শুধুমাত্র সাদা পাঞ্জাবী-ই পড়বেন।

এরমধ্যে ঘটল আরেক বিপদ। কেউ একফোঁটা পানিও খাওয়াতো পারলোনা রুদ্রকে। মায়ের মৃত্যু সে কোনভাবেই সে মানেনা। এসব মিথ্যা! যাতা বললেই হলো নাকি? টানা দেড়দিন সম্পূর্ণ পানাহার ত্যাগ আর বিরতিহীন কান্নার ফলে মারাত্মক ডিহাইড্রেশনে অসুস্থ হয়ে পড়ল রুদ্র। এতোটাই অসুস্থ হল যে ওকে জরুরি অবস্থায় ভর্তি করতে হল হসপিটালে। প্রাণ বাঁচাতে স্যালাইন দিতে হল। পুরো পাঁচ-ছয় ঘন্টার কসরতের পর বাচ্চাটার অবস্থা স্থিতিশীল করতে পারলেন ডক্টর এবং নার্সরা। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছিল জাফর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, গোটা একদিন হসপিটালে ভর্তি থাকার পরেও রাশেদ একটাবারও গেলোনা রুদ্রকে দেখতে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসার সব ব্যবস্থা, দৌড়দৌড়ি; জাফর এবং দুজন কর্মচারীকে মিলেই করতে হল।
এইবার যারপরনাই অবাক হলো জাফর! রুদ্রতো রাশেদের কলিজার টুকরো ছিল। তার প্রতি এতো অনিহা? কেবল স্ত্রী শোকে? যে ছেলের সামান্য কান্না সহ্য করতে পারতেন না, সে ছেলের এমন ভয়ানক অবস্থায় এতো নির্বিকার থাকার মতো কঠোর কীকরে হলেন রাশেদ আমের?

অন্যদিকে বাড়িতে ন'দিনের দুধের শিশুকে নিয়ে নওরীনের অবস্থা নাজেহাল। শুভ্র-লালচে ফুলের মতো স্নিগ্ধ শিশুটি প্রায় সারাদিন শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কান্না করে। সে কান্নায় শব্দ হয়না। কিন্তু সমগ্র মুখ লালবর্ণ ধারণ করে। খাওয়াতে, ঘুম পাড়াতে ভীষণ কষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই তখন যেন বিশাল এক যুদ্ধ।

—————

এইসব মিলিয়ে তটিনীর মৃত্যুর পর ভয়ানক অস্থির তিনটি দিন কাটল আমের ভিলায়। চতুর্থ দিন রাশেদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। ঘরবন্দি নিস্তব্ধতা থেকে বেরিয়ে এলেন উনি। পরনে সাদা পাঞ্জাবী, চোখেমুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য, লালচে চোখ। যেন একই শরীরে অন্যকোন রাশেদ আমেরের আবির্ভাব ঘটেছে। সবার আগে নিজের মেয়েকেই কোলে নিলেন রাশেদ। অতি যত্নে আদর করে শান্ত করলেন ছোট্ট কুহুকে। সেদিনই উনি অল্প বয়সী আরও দুজন মেয়ে নিয়োগ করলেন কুহুর দেখাশোনার জন্যে। ভীষণ কড়া গলায় সতর্ক করলেন, 'আমার মেয়ের পালন এবং যত্নে নূন্যতম খামতি যেন না হয়। আমের ভিলার রাজকন্যা ও। সদ্যফোটা কোন ফুলের চেয়েও অনেক বেশি যত্নে বড় হবে সে। এতে যদি বিন্দুমাত্র কোন চুখ হয়। তার পরিণতি সুখকর হবেনা।'

এরপর উনি পৌঁছলেন নিজের ছেলের ঘরে। রুদ্র তখন বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে আট বছরের শিশুটি। শরীর এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। থেকে থেকে কান্না পায় শুধু।
রাশেদ দরজায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে। হঠাৎই গম্ভীর, বজ্র স্বরে ডাকলেন, 'রুদ্র!'

নড়ে উঠল রুদ্র। এই আট বছরে প্রথমবার রাশেদ তাকে "রুদ্র" বলে ডাকল। এই নামে তাকে কেবল স্কুলে ডাকা হয়। এতোদিন পর বাবাকে পেয়ে ঝট করে উঠে বসল রুদ্র। রাশেদ বসলেন বিছানায়। রুদ্রর সরল চোখজোড়া জলে টাইটুম্বুর হয়ে গেল। হাঁটুতে ভর দিয়ে এগিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল ও। কিন্তু সদ্য মা হারা ছেলেটাকে কোনরকম সান্ত্বনার বাণী শোনালেন না রাশেদ। উল্টে ধীরে কিন্তু শক্ত হাতে ছাড়িয়ে নিলেন রুদ্রকে। সোজা করে বসালেন। রুদ্র নরম বাহুদয় নিজের শক্ত হাতের দৃঢ়মুষ্ঠিতে ধরে বললেন, 'কান্না থামাও!'

কিন্তু কান্না থামল না রুদ্রর। রাশেদ একটু জোর গলায় বলল, 'কান্না থামাতে বলেছি আমি!'

রুদ্র কান্না রোধ করে তাকাল বাবার দিকে। ভাঙা গলায় বলল, ' মা_'

' মা নেই। মারা গেছে সে। আর যে মারা যায় তার স্মৃতি মনে রাখা যায়, কাজে না। জীবনে যারা লম্বা পথ পারি দেয়, চলার পথে তারা বহু কাছের মানুষ হারায়। এটাই নিয়ম, আর এটাই স্বাভাবিক। আমিও হারিয়েছি। তাকিয়ে দেখ; বাবা, মা, দাদা, কাকা, আর এখন স্ত্রী, এরা কেউ নেই আমার কাছে। আমি কাঁদছি? সব কাজ ফেলে গুটিয়ে বসে আছি?'

রুদ্র ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে শুনল রাশেদের এই নিষ্ঠুর বাণীগুলো। রাশেদ দৃঢ়ভাবে চোখ রাখল রুদ্রর বিভ্রান্ত চোখে, 'একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো আজ। মানুষের মৃত্যুর শোক কবরস্থানের গেইটের পেছনেই ফেলে আসতে হয়। এর বাইরে আসলে সেটা শোক না, দুর্বলতা হয়ে যায়। জীবন তার নিজস্ব ছন্দে চলে। এইযে ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া না করে, নিজের যত্ন না নিয়ে অসুস্থ হচ্ছো; কোন আশায়? কেউ তোমাকে যত্ন করে খাওয়াবে? সেবা করবে? কেন? কার দায় আছে এসব করার? এতোদিন মা ছিল, তাই করতো। এখন সে নেই। আর কারো করার দায়ও নেই, মেনে নাও সেটা। জীবন তোমার, শরীর তোমার। তার খেয়াল রাখার দায়টাও তোমার। এ পৃথিবীতে কেউ কারো নয় রুদ্র আমের। সবাইকে সবকিছু নিজের প্রয়োজন মেটাতেই করে। এইসব আবেগ, মোহ, মায়া বাদ দাও। বড় হচ্ছো তুমি এখন। নিজেকে নিজে গড়তে শেখো। আমি আর যেন না শুনি তুমি খাওয়াদাওয়া কিংবা কান্নাকাটির জন্যে অসুস্থ হয়েছো। মনে থাকবে?'

রুদ্র তখনও থম মেরে তাকিয়ে আছে। রাশেদ প্রায় ধমকে উঠল, 'মনে থাকবে?'

সজোরে নড়ে উঠল রুদ্র। ওর সরু, নরম শরীরটা গুটিয়ে ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল। রাশেদ ছেড়ে দিল রুদ্রর বাহু। লাল হয়ে গেছে লাল ফর্সা বাহুদয়। রাশেদ গম্ভীর স্বরে বললেন, 'রাতে খাবার এলে খেয়ে ভালোভাবে খেয়ে নেবে। এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে যেন আমাকে আর কোন কথা বলতে না হয়।'

কথাটা বলে রুদ্রর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন রাশেদ। রুদ্র তখনও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। রাশেদ কখনও ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি, এমন রূঢ় ব্যবহার করেনি। রুদ্রও সবসময়ই বেশ খোলামেলা ছিল রাশেদের সঙ্গে। কিন্তু আজ ও প্রথমবার রাশেদকে ভয় পেয়েছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে। এমন ভয় যা হয়তো আর কখনও কাটবেনা।

*****

১৯৯৯ সালের সেই অভিশপ্ত এপ্রিলের পর রাশেদ আমেরের ভেতর থেকে 'মানুষ' সত্তাটা যেন হঠাৎ বিদায় নিল। তটিনীর প্রস্থান তাকে যেন এক রক্তপিপাসু শিকারে রূপান্তরিত করল। ওই বছর এক নজিরবিহীন বিভৎস তান্ডবের সাক্ষী হলো গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ড। 

রাশেদ খুব শীতল কিন্তু নৃশংস ধারায় কাজ করল সেবছর। আমের ফাউন্ডেশনে সে ডাকলেন সোলার সিস্টেমের ক্যাডারদের। তখন দলে নতুন নতুন জয়েন করেছিল ইকবাল নামের এক তরুণ। বয়স কুড়ির মতো। অল্প সময়েই নিজের কাজ আর অসাধারণ হিসেব কৌশলের মাধ্যমে সোলার সিস্টেমের বেশ বিশ্বস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে পরিণত হয়েছিল। ইকবালসহ বাকি ক্যাডারদের সঙ্গে জাফরকে নিয়ে এক মিটিংয়ের বসেন রাশেদ। সেখানে এক শীতল পরিকল্পনায় ঢাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা নিজের এজেন্টদের মাধ্যমে পাঁচটি প্রধান ড্রাগ সিন্ডিকেটের অবস্থান জোগাড় করে। এরপর নিষ্ঠুর এক পরিকল্পনার মাধ্যমে একে একে ধ্বংস করতে শুরু করলেন সেসব সিন্ডিকেটকে। পাঁচটি ড্রাগ সিন্ডিকেটকে ক*সাই*খানার মতো জ*বাই করতে শুরু করলেন উনি।

​প্রথম হামলা চালালেন খানদের প্রধান দুর্গ, দয়াগঞ্জের এক পরিত্যক্ত টেক্সটাইল মিে।। রাশেদ এবং সোলার সিস্টেমের সব ক্যাডাররা মাঝরাতে পৌঁছলেন সেখানে। ওরা কোনো অত্যাধুনিক রাইফেল নয়, বরং ট্যাকটিক্যাল ছুরি আর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল নিয়ে গিয়েছিল সেই অপারেশনে। ওরা এমন নিস্তব্ধতায় পাহারাদারদের গলা কাটল যে, ভেতরে থাকা ড্রাগ ডিলাররা টেরই পায়নি মৃত্যু তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আচমকা হামলায় ওরা নাস্তানাবুঁত করে দিয়েছিল গোটা দেশটাকে। মূল ডিলারকে ধরার পর সোজা গু*লি করলেন না। বরং ধীরস্থি‍রভাবে ল্যাবরেটরিতে থাকা কেমিক্যাল দিয়ে ওর শরীরটা পু*ড়িয়ে দিলেন। জ্বলন্ত মানুষের আর্তনাদ আর ড্রাগের পোড়া গন্ধে মিলের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। রাশেদ তখন শান্তভাবে নিজের হাতের রক্তের দাগ মুছছিলেন রুমাশ দিয়ে। তার সেই নির্বিকার চাহনি দেখে তার নিজের ক্যাডাররাই ভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল। এতো কীসের ক্ষোভ রাশেদের!

​দ্বিতীয় টার্গেট ছিল কামরাঙ্গীরচরের কুখ্যাত কালা মানিক। সে ভাবত জলপথে সে নিরাপদ। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেই জলপথেই রাশেদ এলেন যমদূত হয়ে। মাঝনদীতে মানিকের ট্রলারটিকে ঘিরে ধরল রাশেদের স্পিডবোটগুলো। সোলার সিস্টেমের ক্যাডাররা কুঠার আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ট্রলারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ছিন্নভিন্ন দেহাংশগুলো যখন বুড়িগঙ্গার কালো জলে ভাসছিল। মানিকের জিভ কেটে, তাকে জীবন্ত অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। ওই রাতে নদীর জল থেকে মানুষের চর্বি আর রক্তের একটা বমি ভাব উদ্রেককারী গন্ধ বের হচ্ছিল।

​মাস্টার ছিল রাশেদের তৃতীয় টার্গেট। সেই সিন্ডিকেটটি ছিল প্রশাসনিক কবজায়। রাশেদ কোনো রাখঢাক না করে ভরদুপুরে গাবতলীর বাস টার্মিনাল এলাকায় মাস্টারের কনভয় আটকালেন। রাস্তার মাঝখানে গ্রেনেড লাঞ্চার দিয়ে মাস্টারের গাড়িটি উড়িয়ে দিলেন তিনি। আগুনের গোলক থেকে মাস্টারের ক্যাডাররা যখন দগ্ধ অবস্থায় আর্তনাদ করতে করতে বেরিয়ে আসছিল, দূর থেকে একটি সিগারেট ধরিয়ে দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করে দেখছিলেন রাশেদ।

​এরমধ্যে তেঁজগাও রেললাইনের ধারের ‘হায়েনা’ গ্রুপটি ছিল সবচেয়ে ধূর্ত। রাশেদ তাদের মারার জন্য ব্যবহার করলেন এক বেভৎস পদ্ধতি। তিনি ভীষণ গোপন এবং ভয়ংকর রিস্কি গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে খবর জোগাড় করলেন কবে সিন্ডিকেটের সবগুলো ওদের আস্তানা নামক গুদামে একসঙ্গে হবে। একসঙ্গে হওয়ার দিনটির খবরও পেয়েছিলেন তিনি। সেইদিনই গোটা গুদামটা ভয়ানকভাবে পুড়ে গেল। ভেতরের লোক পুড়ে প্রায় ছাই হয়ে গিয়েছিল সে ঘটনায়।

বছরের শেষ বিনাশটি ছিল খানের খাস লোক জহিরের। জহির ছিল এই পাঁচটি সিন্ডিকেটের মূল মাথা। এই লোকটাকে বাগে আনতে বেশ কশরত করতে হয়েছিল সোলার সিস্টেমকে। তিনমাস চেষ্টার পর অবশেষে জহিরকে বন্দি করে ওরই হে*রোইননের গুদামে নিয়ে আটকানো হয়।রাশেদ জহিরের নখের ভেতর সুচ ফুটিয়ে ওর জানা প্রতিটি ড্রা*গ রুটের হদিস নিয়েছিলেন। জহির যখন যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাচ্ছিল, তখন রাশেদ তার চোখে গরম অ্যাসিড ঢেলে দিলেন। এরপর কয়েক মণ ড্রাগের স্তূপের ওপর জহিরকে শুইয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন সেখানে। রাশেদ সেই গুদাম থেকে বের হওয়ার সময় একবারও পিছু ফিরে তাকাননি। বিশাল সেই লেলিহান শিখা কেবল কয়েকশ কোটি টাকার ড্রাগ নয়, একটি আস্ত মাফিয়া সাম্রাজ্যকে ছাই করে দিচ্ছিল।

​১৯৯৯ সালের সেই শেষ ছয়মাস দেশে ঘনঘন আগুন লাগার ব্যপারটা সবার কাছেই বেশ আশ্চর্যের ছিল। কেউ কেউ ভাবছিল কাকতলীয়। কেউ কেউ রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জুড়ে হিসেব মিলিয়েছে। কেউবা আফসোস নিয়ে বলেছে, এদেশে জন্মানোটাই পাপ। তবে আসল সত্যি কেবল এই অন্ধকার জগতের মানুষগুলোই জানতো। অনেক সত্য প্রশাসন নিজেও আড়াল করেছিল তাদের কিছু পাতি নেতা, এমপি এবং মন্ত্রীর মুখোশ রক্ষায়।

******

প্রলয়ের পর সব যেমন শান্ত-স্থির হয়ে যায়, বিভৎস সেই বিনাশের পর ২০০০ সালটা আসতেই রাশেদ আমেরও ভীষণ শান্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু জাফর স্পষ্ট টের পেয়েছিল, রাশেদ আগের মতো শান্ত হয়ে গেলেও এক অদ্ভুত বদল ঘটেছ তার মধ্যে। তার ভাইজান আর আগের মতো নেই। সমস্ত জগতের মায়া থেকে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে মানুষটা। সে প্রতিটা কথা বলতেন ভীষণ মেপে মেপে, কন্ঠে ছিল এক দৃঢ় বজ্রতা। কারো প্রতি বিশেষ কোন মায়ার অস্তিত্ব নেই। সকলেই যেন তার দাবার একেকটা গু*টি। আবেগহীন, বাস্তববাদী, তেজি আর গম্ভীর এক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠল তার। অন্তত সবাইকে তিনি তাই দেখাতেন।

ঐ কয়েকমাসে বারবার অসুস্থ হয়েছে রুদ্র। দু'বার হাসপাতালেও নিতে হয়েছে। কিন্তু রাশেদ কোনরকম কোন সহানুভূতি দেখায়নি ছেলের প্রতি। অথচ রুদ্র আমের বাড়ির সেই আদুরে রাজপুত্র ছিল যার একবেলা জ্বর এলে দিনে দু'বার ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতেন রাশেদ। শুরুর দিকে নওরীন রুদ্রকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেও তা টের পেতেই কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন রাশেদ। স্পষ্টভাবে আদেশ দিলেন, রুদ্রর নিজস্ব কোন কাজে রুদ্র ছাড়া অন্যকেউ হাত দেবেনা। সে আদেশের অন্যথা হওয়া যাবেনা। হঠাৎ এই পরিবর্তনগুলো মানতে পারছিলনা ছোট্ট রুদ্র। ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছিল বাচ্চাটা। বাবার সঙ্গে ধীরে ধীরে তৈরী হচ্ছিলো এক অদ্ভুত মানসিক দূরত্ব।

রুদ্রর তখন ক্লাস ফোরের নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে। ও ভীষণ দুষ্টু থাকলেও মারকুটে কখনও ছিলোনা। তটিনীর মোড়ানো সেই কোমলতার প্রভাবে কারো গায়ে হাত তুলতে পারতোনা ও। কিন্তু তটিনীর যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর চঞ্চলতাটুকুও চলে যায় একনিমেষে। ফলসরূপ ও হয়ে ওঠে ভীষণই শান্ত এক বাচ্চা। কিন্তু সেইসঙ্গে ভেতরে অদ্ভুত এক জেদও ছিল। যেটা ওর, সেটা ওরই। নিজের জায়গা সে কাউকে ছাড়বেনা। ফলে, প্রথম বেঞ্চে বসা নিয়ে একজন ছেলের সঙ্গে মারাত্মক মারামারি হল ওর। কিন্তু রুদ্রতো মারতে জানতোনা। ফলে মারার বদলে মার খেল সে। ঠোঁট ফাটিয়ে বাড়ি ফিরতে হল ওকে। জীবনে প্রথমবার মার খেয়ে বাড়ি ফিরে ভীষণ কান্না করল ও। ওর কান্নায় অস্থির হয়ে উঠল, নওরীন আর জাফর। কিন্তু কোনভাবেই থামাতে পারল না। রাশেদ ফিরে রুদ্রকে কাঁদতে দেখে গম্ভীর আওয়াজে প্রশ্ন করলেন, 'কী হয়েছে? কাঁদছো কেন? ঠোঁট কাটল কীভাবে?'

রুদ্র দৌড়ে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বাবার কাছে নালিশ জানালো। ভাবল রাশেদ হয়তো ওকে আগলে নেবে, সান্ত্বনা দেবে। ঐ ছেলেকে গিয়ে বকে দিয়ে আসবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাশেদ ঠাঁটিয়ে এক চড় মারলেন রুদ্রর কচি গালে। মুহুর্তেই লাল হয়ে গেল রুদ্রর মুখের বা পাশটা। রুদ্র হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। যার শরীরে কখনও কেউ ফুলের টোকা দেওয়ারও সাহস পায়নি। সে আজ পরপর দুবার মাল খেলো!

রাশেদ ধমক দিয়ে বললেন, ' কান্না থামাও! কাওয়ার্ড তুমি? দুর্বল? বিকলাঙ্গ? কেউ তোমাকে মেরে চলে যায় কীকরে?'

বলে রুদ্রর নরম হাতদুটো শক্ত করে সামনে ধরেন রাশেদ। ঝাকিয়ে বললেন, ' এই হাতদুটো কী করছিল তখন? শুধু বসে বসে খাওয়ার জন্যে রেখেছো এদের? কালকে স্কুলে গিয়ে সবার আগে তাকে মারবে। সেটাও সবার সামনে। ওর ঠোঁট কেটে যেন এরচেয়ে দ্বিগুন রক্ত বের হয়। সেইখবর আমার কাছে এসে দেওয়ার পরেই কিছু খেতে পাবে তুমি। এর আগে তোমার খাওয়া বন্ধ।'

রুদ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। রাশেদের এমন ঘোষণা শুনে আঁতকে উঠল সবাই। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। এর আগে জগতের কোন বাবা তার নিজের সন্তানকে এমন অদ্ভুত আদেশ দিয়েছে কি-না জানা নেই কারো। জাফর কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেল রাশেদের ধারাল চাহনীতে। নিজের ভাইয়ের এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড আর সিদ্ধান্তের মানে বুঝে উঠতে পারছেনা সে।

এদিকে পরেরদিন ঘটল ভিন্ন ঘটনা। রুদ্র বাবার ভয়ে তার সেই সহপাঠীকে মারতে গেল ঠিকই। কিন্তু ওকে মারতে আসতে দেখে, সেই ছেলের সঙ্গে আরও কিছু সাঙ্গপাঙ্গ এসে যোগ দিল। বরাবরই ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং শিক্ষকদের ভীষণ প্রিয় হওয়াতে মনে মনে কয়েকজনের বেশ হিংসে আর ক্ষোভ ছিল রুদ্রর ওপর। সেই ক্ষোভটাই মিটিয়ে ফেলল সেই সুযোগে। চারপাঁচজন মিলে একসঙ্গে মা*রল ওকে। ফলে রুদ্র সেদিনও মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরল।
ব্যপারটায় ভয়ানক চটে গেলেন রাশেদ আমের। কোনদিকে না তাকিয়ে রুদ্রর হাতের বাহু ধরে টেনে নিয়ে গেলেন দোতলার স্টোর রুমে। জাফর, নওরীন বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোন লাভ হলোনা। উল্টে রাশেদ হুমকি দিয়ে দিলেন, যাতে ভুলেও কেউ এদিকে না আসে। রুদ্রর অতি ভয়ে ঘর কাঁপানো কান্নাতেও কোন লাভ হলো না। 
নির্দয়ভাবে স্টোররুমের ফ্লোরে ওকে ফেললেন রাশেদ। সেখানে রাখা পুরোনো একটা চিকন বেত খুঁজে এনে নির্মমভাবে আঘাত করতে শুরু করলেন। রূঢ় কন্ঠে বললেন, 'আমেরদের রক্ত যার ধমনীতে বইছে সে এমন দুর্বল, মেরুদন্ডহীন হতে পারেনা! কোন সাহসে মার খেয়ে এসেছো তুমি? কোন সাহসে?'

দুহাতে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল রুদ্র। সজোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ' ওরা অনেকগুলো ছিলো, বাবা।'

কথাটাতে রাগ কমার বদলে যেন আরও বেড়ে গেল রাশেদের। বেতের প্রহারগুলো আরও তীব্র আর গভীর হল। রুদ্র অতি যত্নে তৈরী হওয়া কচি, নরম, লালফর্সা ত্বকের ওপর একের পর এক রক্তিম রেখা তৈরী হল, কিছু জায়গায় চামড়া ফেঁটে গেল। রুদ্র চিৎকারের আওয়াজে পুরো আমের ভিলাই কেঁপে উঠেছিল সেদিন। জাফর, নওরীন চেয়েও যেতে পারেনি রুদ্রকে আগলাতে। বেদনায় অস্থির হয়ে উঠেছিল তারা। আর সার্ভেন্টসদের বাঁধা দেওয়াতো দূর সাহসও নেই সেদিকে চোখ তুলে দেখার। কিন্তু ঐটুকু শিশুর এমন আর্তনাদ শুনে কান্না পেয়ে গেল তাদেরও।

রুদ্রর কচি শরীরে বেশ কয়েকবার বেত্রাঘাত করে থামলেন রাশেদ। জীবনে প্রথম, তারওপর এমন নির্মমভাবে আঘাত পেয়ে নেতিয়ে পড়ল ছোট্ট রুদ্র। কিন্তু ওকে সেই সুযোগটাও দিলেন না রাশেদ। বেতটা পাশে ফেলে টেনে বসালেন ওকে। তখনও হাঁপাচ্ছেন উনি। রাশেদ রুদ্রর মুখোমুখি বসে ওর নরম গাল চেপে ধরে নিজের মুখোমুখি করলেন। নির্দয়ভাবে বললেন, 'আজ বৃহস্পতিবার। শনিবারদিন আমি যেন শুনতে পাই আমার ছেলে ঐ পাঁচজনকেই মেরে বাড়ি ফিরেছে। নয়তো আজকের চেয়েও বেশি আঘাত করা হবে তোমাকে। ততদিন, যতদিন না তুমি কাজটা ঠিকঠাক করতে পারছো। আর হ্যাঁ, একা যাবে!'

শেষের শব্দদুটো বেশ দৃঢ়ভাবে বললেন রাশেদ আমের। রুদ্র কান্নায় ফুলে ওঠা চোখদুটো দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল রাশেদের দিকে। এটা ওর বাবা না। জীবনের আটটা বছর সে বাবাকে দেখে এসছে, তার সঙ্গে এর কোন মিল নেই। জীবনে প্রথমবার রাশেদকে ভীষণ ভয় পেল রুদ্র। ফ্লোর ঘেষে পিছিয়ে এককোণে গুটিয়ে ফোঁপাতে লাগল। রাশেদ পাত্তা না দিয়ে বলল, 'তার আগ অবধি তোমার রুমে যাওয়া বারণ। এখানেই থাকবে তুমি। আর না তোমার ক্ষতের কোন পরিচর্যা হবে। আর কথায় কথায় কান্না শুরু করবেনা। কাঁদতে দেখলে মানুষ করুণা করে। আর যা দেখিয়ে মানুষের করুণা কামানো যায় তা দুর্বলতা। তোমার মধ্যে আর যাই থাক, দুর্বলতা কখনোই থাকবেনা।'

কথাটা বলে ক্রন্দনরত রুদ্রকে স্টোররুমে একা ফেলে বেরিয়ে এলেন রাশেদ আমের। করিডরজুড়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করছিল জাফর। চোখদুটো ছলছল করছিল তার। রাশেদকে দেখামাত্র জাফর ব্যস্তপায়ে এগিয়ে গেল। অনেকটা সাহস জুগিয়ে বলল, 'ভাইজান! ছেলেটা এখনো বাচ্চা, নাজুক। এভাবে মারাটা কী ঠিক হল?'

রাশেদ ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকাল জাফরের দিকে। গম্ভীর আওয়াজে বলল, 'লোহা আর মাটি নরম থাকা অবস্থাতে পিটিয়ে, মাড়িয়ে আকার দিতে হয় হয় জাফর। একবার শক্ত হয়ে গেলে তাকে আর আকার দেওয়া যায়না। সে চেষ্টা করলেও তা ভেঙ্গে যায়।'

—————

মার খেয়ে রাতে জ্বর চল আসে রুদ্রর। রাশেদ আমের কড়াভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কেউ ভুলেও ওর ক্ষত পরিচর্যার সাহস না দেখায়। যদিও রুদ্র পরেরদিন সকালে উঠে দেখেছিল ওর গায়ে মলম লাগানো। জ্বরটাও নেই।

রুদ্র আসলে দুর্বল বা ভীতু ছিলোনা। ওর সমস্যা ছিল, ও কাউকে মারতে অভ্যস্ত ছিলোনা। তটিনীর কোমলতায় ও এতোটাই মুড়িয়ে বড় হয়েছিল যে কাউকে আঘাত করার কথা কখনও কল্পনাও করেনি। কিন্তু রাশেদের অমন ভয়ংকর মার, আর পরপর দুদিন মার খাওয়ায় ফলে কোমল ফুলটার মধ্যেও যেন হঠাৎ জন্ম নেয় কচি এক কাঁটা। জেদ চেপে যায় রুদ্রর মাথায়।
শনিবার স্কুলে গিয়ে কোন পূর্বাভাস ছাড়াই গিয়ে নাক বরাবর ঘু*ষি মেরে দেয় সেই ছেলেটাকে। বাকি চারজনও তেড়ে এলে বেশ ভয়ানক হাতাহাতি হয় ওদের মধ্য। তবে এবার রুদ্র মার খাওয়ার চেয়ে মারল বেশি। ভয় আর জেদের মিশ্রণে অদ্ভুত এক আক্রোশ জন্মালো ওর ভেতরে। নিজে আঘাত পেয়েও একেকজনের নাক, ঠোঁট ফাঁটিয়ে দিল। এতোটাই বড় ঝামেলা হলযে শিক্ষকদের এসে তা ছাড়াতে হলো।

সেদিন রুদ্র ফিরে জানানোর আগেই রাশেদের কাছে কল এলো রুদ্রর শিক্ষকের। সে জানাল, কী ভয়ংকর কাজ করেছে সে আজ স্কুলে। শিক্ষক অবাক হয়ে বলল, 'চারবছর যাবত দেখছি ওকে আমের সাহেব। ও ভীষণ দুষ্টু ছিল তা সত্যি, বাট অলসো হি ওয়াজ দ্য মোস্ট ডিসেন্ট বয় ইন দ্য ক্লাস। অমন ভদ্র একটা ছেলে, হঠাৎ পরপর তিনদিন ফাইট করেছে স্কুলে। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম ব্যপারটা হিট অব দ্য মুমেন্টে হয়ে গেছে। বাচ্চামানুষ। বাট নাও ইটস্ থিংস টু ওয়ারি এবাউট। আমার মনে হয় ম্যামের ডেথের পরপরই ও ধীরে ধীরে এমন হয়ে যাচ্ছে। ইউ শ্যুড টেইক মোর কেয়ার অফ হিম।'

ফোনের এপাশে রাশেদের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল ছোট্ট এক রহস্যময় হাসি। কিন্তু মুখে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলেছিলেন, ' আমি দেখছি ব্যপারটা।'

*****

সোলার সিস্টেম বাধাহীন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে আমের ফাউন্ডেশনের আড়ালকেই সবচেয়ে বেশি কার্যকারি মনে হল রাশেদ আমেরের। সে কাজে আমের ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমকে আর বিস্তৃত পরিসরে ছড়ানোর চিন্তা করলেন রাশেদ। তখন ফাউন্ডেশন এবং সোলার সিস্টেম উভয়েরই মাথায় ছিল; রাশেদ আমের, জাফর আমের, ইকবালসহ আরও দু'তিনজন। বিভিন্ন আলোচনা এবং বিশ্লেষণে পর গুলশান ও বনানীর দুস্থ মানুষদের জন্য তিনি স্কুল, হাসপাতাল এবং লঙ্গরখানা তৈরির পরিকল্পনা করলেন। ফাউন্ডেশনের ব্যানারে শহরের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত নিমন্ত্রণ করতে শুরু করলেন তিনি। ফলসরূপ, সমাজের ওপরতলায় এক অস্পৃশ্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলো তার। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন এক আধুনিক দানবীর। সকলে ভালোবেসে তাকে রাশেদ বাবা বলে ডাকতে শুরু করে দিল।

অথচ, ফাউন্ডেশনের ব্যানারটি ছিল মূলত সোলার সিস্টেম এর কার্যক্রম আড়াল করার এক নিখুঁত পর্দা। ফাউন্ডেশনের ত্রাণবাহী ট্রাক আর অ্যাম্বুলেন্সগুলো ব্যবহৃত হতো সোলার সিস্টেমের অস্ত্র এবং জরুরি মালামাল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোর কাজে। প্রশাসনের কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে, ফাউন্ডেশনের সিল মারা গাড়ির ভেতরে লুকিয়ে আছে বিধ্বংসি আধুনিক সব অস্ত্র। ফাউন্ডেশনে আসা অনুদান এবং বিভিন্ন প্রজেক্টের আড়ালে সোলার সিস্টেমের অবৈধ উপার্জনকে সাদা করা হতো। কিছু অনুদান বাস্তবিক হতো ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগই ছিল বড় বড় ব্যবসায়ীদের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে আদায় করা চাঁদা। যা ফাউন্ডেশনে ডোনেশন হিসেবে যুক্ত হতো। এরকমভাবেই মানি লন্ড্রিং এর মাধ্যমে কালো টাকাগুলোকে সাদা করা হতো। ফাউন্ডেশনের অধীনে থাকা বিভিন্ন অনাথাশ্রম বা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে রাশেদ তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন কিশোরদের বেছে নিতেন। তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সোলার সিস্টেমের দুর্ধর্ষ শ্যাডো মেম্বার হিসেবে গড়ে তোলা হতো। তার কাজকর্মও স্বাভাবিক চলছিল; অন্যদিকে অসহায়, দরিদ্র মানুষের সহায়তাও হচ্ছিলো।

এভাবেই একদিকে তার সোলার সিস্টেমের কার্যক্রম চলছিল খুব স্মুথলি। অন্যদিকে গুলশান বনানীজুড়ে রাশেদ প্রতি মানুষের সম্মান এবং ভালোবাসাও বাড়ছিল একই গতিতে।
কয়েকমাস আগেও যে এই অন্ধকার জগত থেকে নিজের সব পোটলাপাটলি গুটিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করছিল, সে হঠাৎই গোটা রাজ্যত্বেই নিজের একক অধিকার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে নেমে পড়েছে। কেন? তার উত্তর ছিলোনা কারো কারো কাছে।

*****

আমের ভিলার দুটি শিশু বেড়ে উঠছিল দুটো ভিন্ন প্রক্রিয়াতে। কুহু সার্ভেন্টদের ঘেরা প্রবল যত্নময় জীবন কাটাচ্ছিল। নওরীনেরও কন্যা সন্তান হয়েছে এরমধ্যে। পরিচারিকাদের সহায়তায় দুই শিশুকে বেশ ভালোভাবেই ভালোভাবেই সামলাতে পারছিল সে।

অন্যদিকে রুদ্রর জীবন বদলে যাচ্ছিল ভীষণ নিষ্ঠুরভাবে। ওর জীবন থেকে সকল রকমের কোমলতা, স্নিগ্ধতা, আবেগ হারিয়ে যাচ্ছিল খুব ধীরে ধীরে। রাশেদের শেখানোর পদ্ধতি ছিল নিখুঁত এবং মনস্তাত্ত্বিক। সোলার সিস্টেমের পরবর্তী সুযোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে শারীরিকভাবে গড়ে তোলার আগে, মানসিকভাবে ওকে প্রস্তুত করাই ছিল রাশেদের প্রধান লক্ষ্য।

শুরু করেছিলেন উনি আবেগ দিয়ে। রুদ্রকে কোনকিছুর সঙ্গে বেশি এটাচড থাকতে দিতেন না রাশেদ আমের। যদি ভুলক্রমেও রুদ্র কোনকিছুর প্রতি এটাচড হয়ে পড়তো সেটা রুদ্রর হাত দিয়েই নষ্ট করাতেন রাশেদ। বলতেন, 'মায়া মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যাদের পিছুটান থাকে তারা কখনও জীবনে এগোতে পারেনা। যাই ঘটে যাক, কখনও কিছুর মায়ায় আবদ্ধ হবেনা তুমি।'

এমন বিভৎস ভয়ংকর কান্ড বোধহয় পৃথিবীতে বেশ বিরল। ঐ নয়বছরের বাচ্চাটা যখন নিজেরই পছন্দের জিনিসগুলো নিজের হাতে ভাঙতো কিংবা পুড়িয়ে দিতো, তখন বুক ভেঙেচুড়ে কান্না পেতো ওর। ভীষণ একা, অসহায় লাগতো। অথচ ওকে সান্ত্বনা দিতেও আশেপাশেও ঘেষতে দেওয়া হতোনা কাউকে। একবার, দুবার, তিনবার, বারবার; একটা পর্যায়ে গিয়ে সেই অনুভূতি আর কাজ করতোনা রুদ্রর ভেতর। প্রিয় জিনিসগুলো নষ্ট হতে দেখতে দেখতে প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার অনুভূতিটাই ভোঁতা হয়ে গেল খুব ধীরে ধীরে। কোনকিছুতেই কিছু যায় আসেনা, এমন একটা ব্যপার তৈরী হচ্ছিলো ওর মধ্যে ঐ বয়সেই। এমন একটা পর্যায় চলে এলো, যখন আর কোনকিছু প্রিয়ই লাগল না।

রুদ্রর মধ্য থেকে সেই দয়ালু সত্তাকেও উনি নিষ্ঠুর পন্থায় মুছে ফেললেন। অন্যকে আঘাত করা নিয়ে ওর মধ্যে যে সংকোচ বোধ ছিল তাও মিলিয়ে গেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। প্রথমে রাশেদ বাধ্য করতো, ওর গায়ে কেউ হাত তুললে তাকে গিয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে প্রহার করতে। একপর্যায়ে সেটা ওর অভ্যাসে পরিণত হল। আর সেই অভ্যাস এতোটাই বাজে রূপ ধারণ করল যে একপর্যায়ে কাউকে আর মারতে হতোনা ওকে, কেবল কোনভাবে বিরক্ত বা অফেন্ড করে বসলেই কষিয়ে দু ঘা লাগিয়ে দিতো রুদ্র। ক্লাসের সবচেয়ে ডিসেন্ট ছেলেটাই সবচেয়ে এগ্রেসিভ ওয়ানে পরিণত হলো। ওর সঙ্গে লাগতেও ভয় পেতো বাকি ছাত্ররা। ওর মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে কথাটা গেঁথে গেল, ওর মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার, ওকে বিরক্ত করার, ওকে অফেন্ড করার অধিকার। কেউ তা করলে, অবশ্যই শাস্তি ডিজার্ভ করে।

রুদ্রর ভেতর থেকে দয়াবোধকে নির্মূল করার জন্যে অনেক ভয়ানক সব কর্মকাণ্ড ওকে দিয়ে করাতেন রাশেদ। এমন সব কাজ যার কথা চিন্তা করলেও সাধারণ মানুষজনের কলিজা কেঁপে উঠবে। যেমন, বছর দুই যাবত আমের ভিলার গার্ডেনজুড়ে ঘোরাফেরা করতো এক কুকুর। পোষা না হলেও কুকুরটার সঙ্গে ভালোই সখ্যতা ছিল রুদ্রর। একদিন কোন এক অসুখে মারা গেল কুকুরটি। সেদিন আবার কেঁদে ফেলেছিল রুদ্র। এতো ঘটনার পরেও সেই কান্না রাশেদের পছন্দ হয়নি। রাশেদ তখন রুদ্রকে নিয়ে গেলেন সেই মৃত কুকুরের সামনে। তিনি রুদ্রর হাতে একটা ধারাল ছুরি দিয়ে বললেন, ' এটা শুধুই এখন মাংসের দলা রুদ্র। পিস অফ মিট। এরসঙ্গে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। কাটো এটাকে। এরপ্রতি কোন মায়া রাখা এখন অনর্থক।'

রাশেদের সঙ্গে রুদ্রর সম্পর্কটা তখন তীব্র ভয়ের। তুমি থেকে আপনি সম্বোধনে চলে গেছে বহু আগে। কথা অমান্য করার ফল জানে রুদ্র। সেই অমানবিক মার। রুদ্রর ছোট হাত দুটো সেদিন কাঁপছিল, বমি আসছিল তার। কিন্তু বাবার ওই নিস্পৃহ চাহনির সামনে সে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। এমন আরও অসংখ্য ঘটনা তিলে তিলে মেরে ফেলছিল রুদ্রর ভেতরে থাকা দয়া নামক অনুভূতির শেষ বিন্দুটুকুও।

এছাড়াও প্রতি সপ্তাহে অন্ধকার বেসমেন্টে সারারাত আটকে রেখে রুদ্রর মধ্যে থাকা ভয়টাকেও মেরে ফেলেছিলেন রাশেদ অতি যত্নে। রাশেদ খুব সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে রুদ্রর মনস্তাত্ত্বিক গঠন তৈরী করছিলেন নিজ কৌশলে। যার ফলে রুদ্র হয়েছিল আবেগহীন, অনুভূতিহীন, ভীতিহীন, একরোখা, বেপরোয়া একজন মানুষ।

শারীরিকভাবে রুদ্রকে প্রথমে কৌশলী এবং কঠোর তৈরীর চিন্তা ছিল রাশেদের। ছোট থেকে ছোটতম ভুলের জন্যে হাত-পা বেঁধে চিকন বেত দিয়ে ভীষণ মারা হতো ওকে। শরীরের চামড়া ফেটে ফেটে র*ক্ত বেরিয়ে যেতো। রাশেদের ইচ্ছা কেবল রুদ্রকে শাস্তি দেওয়া ছিলোনা, সেইসঙ্গ ওর সহ্য এবং ধৈর্য্য শক্তিকে চরমে নিয়ে যাওয়ার সুপ্ত প্রতিজ্ঞাও ছিল। নিজের সেই ট্রেনিংয়ে একপর্যায়ে রাশেদ এক নতুন কিছু যোগ করলেন। রুদ্রকে মারার পর ওর হাত কখনও খুলে দিতেন না উনি। রুদ্রর জন্যে আদেশ ছিল ওকে নিজের চেষ্টায় খুলতে হবে সেই বাঁধন।‍ শুরুর দিকে রুদ্র কিছুতেই পারতোনা খুলতে। সেইপর্যায়ে রাশেদ তাকে সাহায্য করলেন। খুলে দিয়ে নয়, কৌশল বলে। 
রাশেদ বলতেন, 'নিজেকে এতোটা ছুটন্ত, প্রবল, গতিশীল বানাবে; পৃথিবীর কোন বন্ধ যেন তোমাকে বাঁধতে না পারে। উল্টে যে বন্ধন তোমাকে বাঁধতে চেষ্টা করবে, তাকেই যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে হয়।'

চেষ্টা করতে করতে একপর্যায়ে এই বাঁধন খোলায় পারদর্শী হয়ে উঠল রুদ্র। অদ্ভূতভাবে যেকোন রকমের বাঁধন সহজেই খুলে ফেলতো ও। কিন্তু সময় লেগে যেতো। যা রাশেদ পছন্দ করতেন না। সেই সময় রোধেই আরও নিষ্ঠুর উপায় অবলম্বন করলেন রাশেদ। রুদ্র যতক্ষণ সে বাঁধন খুলতে না পারতো ততক্ষণ মারা হতো তাকে। মার খেয়ে খেয়ে প্রায় প্রতিরাতেই জ্বর চলে আসতো রুদ্রর। মার খাওয়া কমানো, সেইসঙ্গে তীব্র জেদের বশেই ধীরে ধীরে সময় কম লাগতে শুরু করে রুদ্র। সে প্রক্রিয়া চলতে চলতে একপর্যায়ে অল্প সময়েই জটিল সব বাঁধন থেকে মুক্ত করে ফেলতো নিজেকে। একপর্যায়ে রুদ্রর কাছে এটা খেলার মতো মনে হতো। মার খেতে হলেও পরবর্তী কাজটা মজাদার। 

তবে এসবের মধ্যে বাপ-ছেলের সম্পর্কের দূরত্ব বেড়েছিল বিশাল। রুদ্রর মনে রাশেদের প্রতি ভয় ছাড়া অন্যকোন অনূভুতি ছিলোনা। সময়ের সাথে সে ভয় বদলে গিয়েছিল নির্বিকারত্বে। রাশেদ রুদ্রর শরীরে ক্ষতের পরিচর্যা করতে সবসময়ই খুবই কঠোরভাবে নিষেধ করতেন সবাইকে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা কেউ শুনতোনা বোধহয়। সারারাত জ্বরের ঘোরে বেঘোরে ঘুমোনোর পর সকালে উঠে রুদ্র সবসময়েই দেখতো ওর শরীরে মলম লাগানোই আছে। জ্বরটাও থাকতোনা।

এইসবকিছুর মধ্যে কান্না রুদ্রর জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল ২০০১ সালের চৌদ্দ-ই এপ্রিল। রুদ্রর জন্মদিন। দশ বছর পূর্ণ হয়েছিল সেদিন ওর। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে স্কুলের র‍্যালি এবং প্রোগ্রাম অ‍্যাটেন করতে গিয়েছিল রুদ্র। কিন্তু স্কুল থেকে ফিরে শার্ট খুলতে গিয়ে এক অঘটন ঘটে যায়। বেখেয়ালে ছিড়ে যায় রুদ্রর গলায় থাকা সিলভার চেইনে ঝুলানো সিলিন্ডার আকৃতির লকেটটা। যার মধ্যে ইনফিনিট সাইন খোদাই করা আছে। রুদ্র স্তব্ধ হয়ে যায়। পৃথিবীর অন্য যেকোন বস্তু হলে কিচ্ছু যায় আসতোনা রুদ্রর। সেসব থেকে আবেগ, অনুভূতি অনেক আগেই চলে গেছে ওর। কিন্তু এই লকেট! এটা শুধু একটা লকেট না। ওর কাছে থাকা ওর মায়ের শেষ স্মৃতি। 
ওর এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ওর পঞ্চম জন্মদিনে এই লকেটটা পড়িয়ে দিয়েছিল তটিনী ওকে। কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, 'শুভ জন্মদিন, আমার রাজা।'

রুদ্র খুশিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মায়ের উষ্ণ বুকে। খিলখিল করে হেসেছিল। তটিনী ওকে বুকে জড়িয়ে রেখে বলেছিল, 'এই লকেটে থাকা অসীম চিহ্নের মতো তুইও একদিন অসীম হবি দেখে নিস। জীবনে অনেক বড় হবি তুই। একজন বড় ডাক্তার হবি। মানুষ হিসেবেও এতো বড় হবি যে, সবাই সবসময় মনে রাখবে তোর নাম। তুই পৃথিবীতে না থাকলেও, তোর নামটা থেকে যাবে। ঠিক থেকে যাবে।'

সেদিন নিজের আবেগের বাঁধ আর ধরে রাখতে পারেনি রুদ্র। মায়ের অন্তিম চিন্থ ছেড়াতে, ছেড়া চেইনওয়ালা লকেটটা ধরে প্রচুর কান্না করল। রাশেদ বুঝলেন এখনো এই ছেলের মধ্যে আবেগের ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট আছে। যা থাকলে চলবেনা। তিনি রুদ্রকে টেনেহিঁচড়ে আবার সেই স্টোররুমে নিয়ে গিয়ে বাঁধলেন একটা চেয়ারের পায়ার সঙ্গে। লকেটটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'ভাঙো।'

রুদ্র হতভম্ব চোখে তাকিয়ে ছিল রাশেদের দিকে। রাশেদ ঘর কাঁপানো ধমক দিয়ে বললেন, 'ভাঙতে বলেছি এটা আমি!'

জীবনে প্রথমবার রাশেদের অবাদ্ধ হতে চেয়েছিল রুদ্র। কিন্তু সম্ভব হয়নি। রাশেদ ওকে বাধ্য করেছে নিজের হাতে সেই লকেটটা ভাঙতে। সেটা ভাঙতে গিয়ে রুদ্রর মনে হচ্ছিলো যেন নিজের শরীরের কোন অঙ্গকে ভেঙ্গে ফেলছে ও। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল মায়ের মুখটা। তটিনীর সঙ্গে কাটানো সকল মুহূর্ত। স্তম্ভিত রুদ্রকে রাশেদ কঠোর গলায় বলেছিলেন, 'আমার দিকে তাকাও।'

রুদ্র তখনও ঘোরে ছিল। রাশেদ জোরে ধমক দিয়ে বললেন, 'তাকাও!'

কেঁপে ওঠে রুদ্র। তাকায় রাশেদের চোখের দিকে। রুদ্রর চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় রাশেদ বলেছিলেন, 'জীবনে কখনও কোনকিছুকে এতোটা প্রিয় বানাবেনা, যতটা প্রিয় বানালে হারানোর ভয় থাকে। হারানোর ভয় মানেই দুর্বলতা। আর দুর্বলতার অপর নাম ধ্বংস।'

নিজের মায়ের সেই স্মৃতি নষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে রুদ্র নিজের মধ্যকার অবশিষ্ট আবেগটুকুও নষ্ট করে ফেলল। সেদিনের পর থেকে রুদ্রকে আর কখনও কাঁদতে দেখা যায়নি।

******

মাস দুই পর হঠাৎ আরেক বিপদ নেমে আসে আমের ভিলার ওপর। এক ফিল্ড অপারেশনে বেশ গুরত্বর আহত হয় জাফর। যদিও আঘাতটা এসেছিল রাশেদের দিকে। কিন্তু রাশেদকে বাঁচাতে নিজেই তপ্ত বু*লে*টের সামনে নিজেকে পেতে দেয় জাফর। গু*লিটা বেশ বেকায়দাতেই লেগেছিল। ফলে দুদিন অবধি জাফরের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হল। সেবার প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল জাফর। সেই ঘটনা নওরীনের ওপর বেশ ভালোভাবেই প্রভাব ফেলেছিল। ও আগেই অনেকটা জেনে ফেলেছিল আমেরদের অভ্যন্তরীণ পাপ সম্পর্কে। এ নিয়ে প্রায় অনেকদিন যাবতই জাফরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি, মনমালিন্য চলছিল তার। সে বারবার বলছিল এসব ছেড়ে দিয়ে আমের ভিলা থেকে বেরিয়ে আসতে। তাদের এখন সন্তান হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে হয়তো। এমন অনিশ্চয়তায় জীবন চলতে পারেনা। কিন্তু জাফর কানে তুলতোনা সেকথা। এমনকি এই ঝামেলার কথা রাশেদের কানেও কখনও আসতে দিতোনা। 

কিন্তু এরপর আর মেনে নিতে পারল না নওরীন। তার কাছে তার জীবন, তার মেয়ের জীবনের গুরুত্ব অনেক। জাফর পুরোপুরি সুস্থ হতেই জাফরকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, 'আমি আমের ভিলা ছাড়ছি। এমন অনিশ্চয়তার জীবনে আমি আমার মেয়ে নিয়ে থাকতে পারব না। যদি তুমি আমাদের সঙ্গ চাও, তাহলে তোমাকে এসব ছেড়ে আসতে হবে আমার সঙ্গে। কিন্তু আমি আর এখানে থাকবনা।'

জাফর যায়নি নওরীনের সঙ্গে। আর না নওরীনকে আটকেছে। প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের সিদ্ধান্তে জীবন কাটানোর। রাশেদ মুক্ত করে দিয়েছিলেন জাফরকে। বলেছিলেন সে জাফরকে তার প্রাপ্য সব বুঝিয়ে দিয়ে সাহায্য করবে নতুন করে সব শুরু করতে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিরাপদ সুখী জীবন কাটাতে। বলেছিলেন, 'বারবার আমার প্রাণ বাঁচিয়ে তুই শুধু নিজের ঋণ শোধ করিসনি। আমাকেও ঋণী করে দিয়েছিস তোর কাছে। এখন তুই আমাকে ছেড়ে গেলে তা স্বার্থপরতা হবেনা।'

কিন্তু জাফর শুনলোনা সে কথা। উল্টে রাশেদের পা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, 'আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক দেনা-পাওনার নয় ভাইজান। আপনি আমার বটবৃক্ষ, আমার আশ্রয়। এই পুরো পৃথিবীতে আপনার চেয়ে বেশি প্রিয় আমার কাছে আর কিচ্ছু নেই। প্রাণ থাকতে আমি আপনাকে ছাড়বোনা। আর আমাকে আপনার সেবা করে যাওয়ার শান্তি থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আপনার নিজেরও নেই।'

এরপর আর নওরীনের সাথে একসঙ্গে বাস করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি জাফরের। মাঝেমধ্যে যাওয়া আসা করলেও কখনও ঠিকঠাক সংসার করা আর হয়ে ওঠেনি।

তবে নওরীন চলে যাওয়ায় কুহুর দেখাশোনা নিয়ে খানিক বিড়ম্বনা তৈরী হল। তাই রাশেদ আরও একজন মহিলা নিয়ে এলেন কুহুর দেখাশোনার জন্যে। তবে সেই মহিলার সঙ্গে ছিল সাত বছর বয়সী এক ছোট্ট মেয়ে। সেই মহিলা শুরুতে পতিতালয়ে কাজ করতো। তার স্বামী-ই তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল ঐ অন্ধকার পল্লীতে। নিজের গ্রাম ছেড়ে বহুদূরে আসা সেই অশিক্ষিত মেয়েটা ওটাকেই জীবন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত গর্ভবতী হয়ে জন্ম হয় তার এই মেয়ের। 
মা হয়ে মেয়েকে নিয়ে সেই পাপাচারে থাকতে পারছিল না সে। এদিকে মেয়েটাও আস্তে আস্তে বড় হচ্ছিলো। কোনদিন হয়তো ওরা তার ছোট্ট মেয়েকেও ধরে বসিয়ে দেবে সেই ধান্দায়। সেই ভয়ের একপর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে আসে সে। কিন্তু এইদেশে এতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জানোয়ারের মধ্যে এক যুবতী মেয়ের, তার বাড়তে থাকা মেয়েকে নিয়ে একা বাস করা সহজ না। চিল-শকুনে ছিড়ে খাওয়ার জন্য সবসময় লেলিয়ে থাকতো পেছনে। তাই শেষ ভরসা হিসেবে আমের ফাউন্ডেশনেরই দ্বারস্থ হয়েছিল উনি। সেখান থেকেই রাশেদ আমের ওদের নিয়ে আসেন আমের ভিলায়। ভাবনা ছিল, কুহুর দেখাশোনাও হবে, এদের নিরাপদ এক আশ্রয়ও হবে।

ছোট্ট মেয়েটার নাম ছিল জ্যোতি। দেখতে যেমন মিষ্টি, সরল। ওর আচরণ কথাবার্তাতেও আমের ভিলার সকলে খুব প্রসন্ন থাকতো। কুহু তখন গুটিগুটি পায়ে হেঁটে বেয়ায় সারা বাড়ি। জ্যোতি সারাক্ষণ ছোট্ট কুহুকে নিয়ে মাতিয়ে রাখতো আমের ভিলাকে। প্রথম প্রথম বেশ সংকোচে থাকলেও, বাড়িতে লোক কম থাকায় সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল। ফলে অল্প সময়েই রাশেদ এবং জাফরের বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছিল জ্যোতি।

জ্যোতি যখন রুদ্রকে দেখেছিল, রুদ্রর বয়স তখন সাড়ে দশ। ছেলেটাকে ভীষণ অদ্ভুত লাগতো জ্যোতির। কখনও সেভাবে হাসেনা, কাঁদেনা। সদা গম্ভীর, প্রয়োজনের বেশি একটাও শব্দ উচ্চারণ করেনা। রাশেদ মাঝেমাঝেই এমন ভয়ংকরভাবে মারে, অথচ ঠিকঠাক একটু চিৎকারও করেনা। ঐ বয়সেই পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে কেমন উদাসীন। রুদ্র ছিল জ্যোতিল নিকট ভীষণ কৌতূহলের এক বস্তু।  

ওদের প্রথম কথা হয়েছিল কুহুর সুত্রেই। সবকিছু নিয়ে উদাসীন থাকলেও কুহুর প্রতি কখনও উদাসীন হতে পারেনি রুদ্র। মায়ের দিয়ে যাওয়া সেই রক্ষাকারীর ভূমিকা রুদ্র ভোলেনি। রুদ্রর এই একমাত্র দুর্বলতা, যা খণ্ডানোর চেষ্টা রাশেদ কোনদিনও করেননি। 
স্কুল থেকে কুহুর জন্যে ছোট মেল্টিং চকলেট নিয়ে এসেছিল রুদ্র। এসে দেখে জ্যোতি খেলছে কুহুকে নিয়ে। জ্যোতিকে দেখেই ভ্রুকুটি করে ফেলেছিল রুদ্র। বোনকে চকলেট দিয়ে রুদ্র হুমকির স্বরে জ্যোতিকে বলেছিল, 'সাবধানে খেলবি ওর সাথে। ও ব্যথা পেলে থাপ্পড় দিয়ে কান ফাটিয়ে দেব একদম।'

জ্যোতি বোকার মতো তাকিয়ে ছিল। প্রথম দেখাতেই কেউ কারো সঙ্গে এইভাবে কথা বলে বুঝি? সেই ঘটনার পর থেকে ছেলেটাকে নিয়ে কৌতূহল আরও কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছিল মেয়েটার।

*****

সময় এভাবেই চলতে থাকতে। আমের ফাউন্ডেশন তার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিস্তার করতে থাকে, আর তার আড়ালে সোলার সিস্টেমের কার্যক্রমও চলতে থাকে বেশ চমৎকারভাবে। তবে তটিনীর মৃত্যুর সেই ঘটনার পর থেকে, রাশেদ একটা বিশেষ নীতি মেনে চলতেন। নির্দোষ কারো প্রাণ নেওয়া কিংবা ক্ষতি করা সোলার সিস্টেমের জন্যে নিষেধ ছিল। এছাড়াও প্রয়োজন না পড়লে শত্রুবধও ছিল কড়াভাব্র নিষিদ্ধ। মাফিয়া জগতে এমন অদ্ভুত নিয়মের কথা কেউ হয়তো কখনো শোনেনি। 
কিন্তু হঠাৎই এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে রুদ্ররাশেদের সম্পর্কে। রাশেদের প্রতি রুদ্রর সেই নির্বিকারত্ব কোন অজানা কারণেই মিলিয়ে যায়। বাবার সব শাসন, আঘাত, কড়া শব্দ মন থেকেই গ্রহন করতে শুরু করে ও। কোন বাধ্যবাধকতা ছাড়াই। কেন? তা রুদ্র ছাড়া কেউ জানেনা।

—————

রুদ্র সেবছর ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছে। ফার্স্ট মিডের পর প্যারেন্টস্ মিটিংয়ে নালিশ এলো রুদ্রর কিছু অবাঞ্ছিত ব্যবহার নিয়ে। যথারীতি ছাদে নিয়ে গিয়ে বেঁধে বেধড়ক মারলেন রাশেদ ওকে। রুদ্র কেবল ভ্রু কুঁচকে মুখ বুজে শয়ে গেল সেই মার। মাঝেমাঝে যৎসামান্য কুঁকিয়ে উঠল শুধু। আড়াল থেকে সেই দৃশ্য দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল জ্যোতি। ছেলেটাকে ওভাবে মার খেতে দেখে ভীষণ মায়া হচ্ছিলো ওর। শেষে সহ্য না হওয়ায় দৌড়ে চলে গেছে ঘরে।
কাজ পড়ে যাওয়ায় রাশেদ আর বাঁধন খোলার জন্যে অপেক্ষা করতে পারলেন না। ভীষণ কড়া রোদের নিচে বাঁধা অবস্থাতেই রুদ্রকে রেখে সে চলে গেল। মনে তিনি জানতেন, এ বাঁধন রুদ্রকে বেশিক্ষণ বেঁধে রাখতে পারবেনা।

রুদ্র যখন বন্ধন ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল। তখনই গুটি গুটি পায়ে ছাদে এসে উপস্থিত হয় রুদ্রর সমবয়সী একটি ছেলে। সারা শরীর জুড়ে সংকোচ তার। যেন এক পৃথিবী থেকে তুলে তাকে অন্যকোন পৃথিবীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রঙ। মুখজুড়ে অদ্ভুত সরলতা। রুদ্রকে দেখে ড্যাবড্যবে তাকিয়ে থাকে সে। যেন ভীষণ অদ্ভুত কিছু দেখছে। অদ্ভুতই বটে। এমন কড়া রোদের নিচে জলজ্যান্ত একটা ছেলে বাঁধা। কীভাবে কষ্ট করছে মুক্ত হওয়ার জন্যে। সারা গায়ে আবার মারের দাগ। ভীষণ মায়া হয় ছেলেটার। সে যায় ওকে সাহায্য করার জন্যে। ছেলেটা হাত বাড়াতেই আগুন চোখে তাকায় রুদ্র। হুংকার দিয়ে বলে, 'তোকে বলেছি খুলতে?'

কথাটা বলে আরও কয়েক সেকেন্ডের চেষ্টাতেই বন্ধনমুক্ত করে ফেলল রুদ্র নিজেকে। ছেলেটা চোখ বড় বড় দেখল আশ্চর্য সেই ঘটনা। 
রুদ্র ক্ষীপ্ত চোখে একবার ছেলেটাকে দেখেই হনহনে পায়ে পা বাড়াল নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে গেল ছেলেটার। সেও ছুট লাগাল রুদ্রর পেছনে। রুদ্র তখন সিঁড়ি বেয়ে নামছে। ছেলেটা পেছন পেছন মিনতির স্বরে বলল, 'আমি ভেবেছিলাম তুমি ফেঁসে আছো। তাই খুলতে গেছি। আর কখনও হবেনা। আমি বেঁধে দেই আবার? কিন্তু আমিতো খুলিওনি। যা খুলিনি তা বাঁধব কেন? কাউকে নালিশ করোনা।'

রুদ্র পাত্তাও দিলোনা। শরীরের কয়েক জায়গায় চামড়া ফেটে ভয়ংকর জ্বলছে। দ্রুত গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে বসে থাকবে ঠান্ডা পানির নিচে। তাও ঐ ছেলের ঘ্যানঘ্যানানি থামাতে বলল, 'আমি নালিশ করিনা।'

কথাটা বলার পরপরই বেখেয়ালে পা পিছলে গেল রুদ্রর। সঙ্গেসঙ্গে ছেলেটা ঝুঁকে ধরে ফেলল ওর হাত। রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, রোদে পোড়া মুখটাতে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে দুহাতে ধরে আছে ও রুদ্রর একটা হাত। রুদ্র সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, 'নাম কী?'

' টোকাই।' সরল স্বরে হেসে বলে উঠল সে।

চোখমুখ কুঁচকে উঠল রুদ্রর। কিন্তু সেকেন্ডের জন্যে। অতঃপর চোখ ঘুরিয়ে আবার নামতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। বিড়বিড় করে বলল, 'উদ্ভট!'

—————

টোকাইকে আসলে রাশেদ আমেরই নিয়ে এসেছিলেন আমের ভিলাতে। একদিন সন্ধ্যায় রাশেদ আমের ফাউন্ডেশনে নিজের কাজে মগ্ন ছিল। তখন ইকবালই নিয়ে এলো এই ছেলেকে। জানালো, পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়েছে ওর কাছে। হাতে কাজ নেই কোন। পেটের দায়ে ফেলনা টোকায় আর এদিক-ওদিক পকেটমারি করে বেড়ায়। রাশেদ দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন ছেলেটাকে। অতঃপর আমের ভিলার চা-নাস্তা দেওয়ার কাজে লাগিয়ে দিলেন ওকে। বললেন, 'ভদ্র ছেলের মতো কাজ করবে। যদি উল্টোপাল্টা কিছু ঘটাও, তাহলে ভীষণ পস্তাবে।'

ভয়ে মাথা নেড়েছিলো টোকাই। একটা কাজ পেয়েছে এই অনেক। রেললাইনে এমন কোন দিন নেই যেদিন ও মার খায়না। উনিশ থেকে বিশ হলেই বেধড়ক মারা হয় ওকে। তার বদলে একটা কাজ বা সামান্য টাকা দিয়ে গেলেত ওর মতো ছেলেদের আর পকেট মারতে হয়না। ও ভীষণ কৃতজ্ঞ হয় রাশেদ আমেরের প্রতি।

তিন-চারদিন রাশেদ খুব গভীরভাবে নীরবে লক্ষ্য করে টোকাইকে। হঠাৎই একদিন জাফরকে ডেকে বললেন, 'ছেলেটা ভালো। ওকে আমের ভিলায় নিয়ে গেলে কেমন হয়?'

জাফর ভীষণ অবাক হলেও বলল, 'আপনার যা ইচ্ছা, ভাইজান।'

ব্যস, আমের ভিলায় প্রবেশ করে আরো এক নতুন সদস্য। ছেলেটার মধ্যে রাশেদ কী দেখেছিল জানা নেই কারো। কিন্তু অদ্ভুত হলেও, টোকাইকে নিয়ে আসার পর বাড়ির ছেলের মতোই দেখা শুরু করলেন রাশেদ। ওকে নতুন রুম দিলেন। স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আর দিলেন সমাজের চোখে সভ্য এক নাম, উচ্ছ্বাস!

পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে উদাসীন রুদ্র উচ্ছ্বাসকে নিয়েও কখনও কোন হিংসেবোধ করতোনা। বাইরের একটা ছেলেকে হুট নিয়ে এসে ওর সমান সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিলোনা ওর। নিজের দুনিয়াতেই ব্যস্ত থাকতো ও। 

অন্যদিকে, উচ্ছ্বাসের কাছে ভীষণ অদ্ভুত লাগতো রুদ্রকে। ওর বয়সী ছেলেটা, অথচ ওর থেকে কতটা ভিন্ন আর শক্ত। গোটা বাড়িতে ওর সবার আগে ভাব হল জ্যোতির সঙ্গে। এরপর কুহু। এই দুজনের সঙ্গে ভাব হয়ে উঠতেই ধীরে ধীরে জড়তা কাটিয়ে মিশে যাচ্ছিল ও আমের ভিলার সঙ্গে। জাফর আর ইকবালও বেশ সহজ ব্যবহার করতো ওর সঙ্গে। বাড়ির এক সদস্যের মতোই পরিপূর্ণ সুযোগ সুবিধা পাচ্ছিল ও। আর ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছিল ওর ভিতরের ভিন্ন এক সত্তা। প্রাণখোলা হাসি, চঞ্চল চলন। কৌতুক, আর উচ্ছ্বলতা মিশে থাকতো ওর কথাবার্তায়। যা শুনে জ্যোতি আর কুহু খিলখিল করে হাসতো। আমের ভিলা বহুবছর পর আবার হাস্যজ্বল, তরতাজা হয়ে উঠল এই তিন শিশুর বদৌলতে। জাফর দেখে ভীষণ তৃপ্তি পেতো। মাঝেমাঝে নিজেও যোগ দিতো ওদের ছেলেমানুষীতে। রাশেদ আমের শুধু নির্লিপ্ত চোখে দেখতেন তার বদলে যাওয়া আমের ভিলাকে। কোন প্রতিক্রিয়া ছিলোনা তার।

একমাত্র রুদ্রর ওপরই তখনও কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি উচ্ছ্বাস। রুদ্র কখনও তেমন কথা বলতোনা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। আশেপাশে থাকলে কপালটা কুঁচকে রাখতো। ওর উদ্ভট কথাবার্তা শুনে কখনও চোখ রাঙিয়ে তাকাতো, কখনও বিড়বিড় করে বকা দিতো। উচ্ছ্বাসও বেশ সমঝে চলতো ওকে। 

কিন্তু একদিন আবার কোন এক কারণে মারা হল রুদ্রকে। তবে এবার শাস্তি হল ভিন্ন। বন্ধনরত অবস্থাতেই রাশেদ হুকুম দিলেন সন্ধ্যায় মাগরিবের আজান দেওয়ার আগে যেন রুদ্র বাঁধন না খোলে। রুদ্র মানল সেই শাস্তি। ফলে, সারাদিন ওভাবেই অভুক্ত অবস্থায় বন্দি পড়ে রইল ও। 
এদিকে রাশেদ বাড়ি থেকে বাইরে যেতেই সুযোগ পেল জ্যোতি আর উচ্ছ্বাস। জ্যোতি প্লেটে খাবার বেড়ে দিল, আর উচ্ছ্বাস সেই খাবার নিয়ে পৌঁছল রুদ্রর কাছে। মূর্তির মতো থম মেরে বসে থাকা রুদ্র উচ্ছ্বাসকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। উচ্ছ্বাস প্লেট নিয়ে বসল রুদ্রর পাশে। সামান্য ভয় নিয়েই এক লোকমা ভাত এগিয়ে দিল মুখে সামনে। রুদ্র ভ্রুকুটি রেখেই মুখ ঘুরিয়ে বলল, 'আ'ম ইন পানিশমেন্ট।'

উচ্ছ্বাস বলল, 'পানিশমেন্ট বন্দি থাকার, খেতে বারণ করেনি রাশেদ বাবা।'

'এসব নাটক করতে কে বলেছে?'

'খেয়ে নাওনা। তুমি খাওনি বলে আমি আর জ্যোতিও এখনো খাইনি।'

রুদ্রর কোঁচকানো ভ্রুজোড়া ধীরে ধীরে সোজা হয়। কিছু বলতে চেয়েও বলেনা ও। চুপচাপ হা করে। খুশি হয়ে যায় যায় উচ্ছ্বাস। সানন্দে ওকে খাইতে দিতে থাকে। দূরে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখে মৃদু হাসে জ্যোতি। খুব তৃপ্তি পায়।

—————

সেদিনের পর উচ্ছ্বাসকে দেখে আর ভ্রু কোঁচকাতো না রুদ্র। ওর উদ্ভট কথা কাজে বিরক্ত হতোনা। কিন্তু নিজে থেকে তেমন কথাবার্তাও বলতোনা। এভাবেই দিনকাল কেটে যাচ্ছিল বেশ। এরমধ্যে জ্যোতির মা মারা যায় ব্রেইন স্ট্রোক করে। মায়ের মৃত্যুর পর হাউমাউ করে কেঁদেছিল জ্যোতি। সেদিন প্রথমবার রুদ্রর মায়া হয় জ্যোতির জন্যে। মন কিছুটা নরম হয়। তবে বাহিরে নিজের সেই স্নেহটুকু কখনই দেখাতোনা রুদ্র।
অন্যদিকে জ্যোতির মায়ের মৃত্যুর পর রাশেদের জ্যোতির প্রতি স্নেহ, দায়িত্ববোধ বেড়ে যায় আরও কয়েকগুন।

এরমধ্যে একদিন আমের ভিলার পুলের পাশে বসেছিল রুদ্র। কী একটা কাজে ডাকতে এসেছিল উচ্ছ্বাস ওকে। রুদ্র উঠে দাঁড়ানোর সময় ভেজা ফ্লোরে পা পিছলে যায়। তড়িঘড়ি করে ওর হাতটা ধরে উচ্ছ্বাস। কিন্তু পতন ঠেকানো যায়না। দুজনেই একসঙ্গে পড়ে যায় পুলের পানিতে। বেকায়দায় পড়ায় দুজনেই খানিকটা হাবুডুবু খায়। অতঃপর সাঁতরে উঠে আসে ওপরে। ক্লান্ত বোধ করে ঘাসের ওপর একহাত দূরত্বে পাশাপাশি চিৎ হয়ে শুয়ে পরে দুজন। কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে দুজনেই দুজনের দিকে তাকায় গম্ভীর চোখে। উচ্ছ্বাস ভয় পায়, আজ রুদ্র ছাড়বেনা ওকে। এদিকে এদৃশ্য দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেসে কুটিকুটি হয় জ্যোতি আর কুহু। ওদের হাসির আওয়াজে উচ্ছ্বাস ঢোক গিলে নিজের পরিণতি ভেবে। কিন্তু ওদের অবাক করে দিয়ে হেসে ফেলে রুদ্রও। হো হো করে হেসে ওঠে। উচ্ছ্বাস থমকায় খানিক। অতঃপর নিজেও হেসে ওঠে।

সেদিনের পর রুদ্রকে 'তুই' বলার সুযোগ পায় রুদ্র। ওদের মধ্যে অদৃশ্য এক বন্ধও গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। প্রায় সারাক্ষণ রুদ্রর সঙ্গে সঙ্গে থাকাটাই অভ্যেস হয়ে যায় উচ্ছ্বাসের। আর রুদ্রর অভ্যাস হয়ে যায় ওকে সঙ্গে রাখাটা।

******

সময় তার নিজের গতিতে ছুটতে থাকল। গুলশানের উচ্চবিত্ত এবং ব্যবসায়ী সমাজের কাছে রাশেদ আমের হয়ে উঠলেন এক অলিখিত আইন। তিনি সেখানে এমন এক পরিবেশ তৈরি করলেন যা ছিল একাধারে ভীতিপ্রদ এবং নিরাপদ। গুলশানে স্বাভাবিক চোখে কোধ চাঁদাবাজি, ছিনতাই বা মাস্তানি চলত না। রাশেদ ঘোষণা করেছিলেন, 'আমার ফাউন্ডেশনের ছায়ায় থাকা এলাকায় কেউ অশান্তি করলে তার দায় আমার।'

বাস্তবে, সোলার সিস্টেমের ক্যাডাররা গুলশানের প্রতিটি মোড়ে সজাগ দৃষ্টি রাখত। ছোটখাটো অপরাধীদের রাশেদ এতটাই কঠিন সাজা দিতেন যে, বাইরে থেকে মনে হতো তিনি এক কঠোর নীতিবান মানুষ। গুলশানের বড় বড় ব্যবসায়ীদের কোনো ঝামেলা হলে তারা আদালতের বদলে রাশেদ আমেরের কাছে আসতো। রাশেদ শান্তভাবে বসে সমাধান করে দিতেন। ফলে পুলিশ বা প্রশাসনের চেয়েও রাশেদ আমেরের ওপর মানুষের আস্থা বেড়ে গেল। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় সবার কাছে তার নাম 'রাশেদ বাবা' হিসেবেই খোদাই হয়ে গেল।

রুদ্রর এসএসসির পর ওর বয়স যখন ষোল পেড়োলো, তখনই রাশেদ সিদ্ধান্ত নিলেন রুদ্র আর উচ্ছ্বাসকে সোলা সিস্টেমের সঙ্গে পরিচয় করাবেন উনি। ওনার সেই চিন্তা মোতাবেক একদিন আমের ভিলার বৈঠকঘরের এক মিটিংয়ে সরাসরি ডেকে পাঠানো হল রুদ্র আর উচ্ছ্বাসকে। যেখানে বাড়ির মেয়েরাসহ রুদ্র এবং উচ্ছ্বাসেরও যাওয়া নিষেধ ছিল। উচ্ছ্বাস অবাক হলেও রুদ্র বরাবরের মতোই নির্বিকার ছিল।

সেই মিটিংয়ে রাশেদ, জাফর, ইকবালসহ আরও কিছু সদস্য ছিল। সেখানেই ওদের প্রথম জানানো হল 'দ্য সোলার সিস্টেম' গ্রুপ সম্পর্কে। তাদের কাজ, প্রতিষ্ঠা, বিস্তার সম্পর্কে। সব শুনে উচ্ছ্বাস ভয়ানক চমকালো। স্তম্ভিত হয়ে কিছু বলার মতোও পেলোনা ও। কিন্তু রুদ্র ছিল অদ্ভুত শান্ত। ও অনেক আগেই টের পেয়েছিল কিছু একটা চলে এই আমের ভিলার চাকচিক্যের পেছনে। শুধু মনে মনে অপেক্ষা করছিল কবে ওকেও সেই রহস্যের সঙ্গে পরিচয় করানো হবে। রহস্যটা পছন্দ হয়েছে ওর। ভীষণ এক্সাইটিং আর এডভেঞ্চারাস্!

সেই মিটিং থেকে বেরিয়ে আড়ালে গিয়ে সিগারেট ধরায় রুদ্র আর উচ্ছ্বাস। তখন লুকিয়ে স্মোক করা শুরু করেছে দুজন। রেগুলার না, মাঝেমাঝে টানে। উচ্ছ্বাস তখনও হজম করতে পারেনি কিছু। ও বিস্ময় নিয়ে বলল, 'শালা... কী কাহিনী। কল্পনাও করিনি এইসব। এগুলো কী এখন থেকে আমারাও করব নাকি ভাই? কেউ ধরে পেছন দিয়ে ঠুসে দিলে?'

রুদ্র সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে হেসেছিল, 'করতে হলে মন্দ কী? কেউ ঠুসে দেবে নাকি আমরা ঠুসবো, তাতো সময় বলবে।'

—————

রুদ্র আর উচ্ছ্বাসের ট্রেনিংটাও শুরু হয়েছিল একসঙ্গে। ব*ন্দু*ক চালানো, বিভিন্ন করমের আনআর্মড ফাইটিং স্কিল শেখা। সোলার সিস্টেমের বিভিন্ন রুট, কাজকর্ম, অস্ত্র সবকিছু নিয়ে প্রপার ধারণা তৈরী। প্রথমবার রুদ্র যখন হাতে বন্দুক ধরে ওর সেই তীক্ষ্ম চোখে যেন অদ্ভুত আগুন জ্বলে উঠেছিল। অল্পসময়ের সব কিছুতে নিজেকে পারদর্শী প্রমাণ করে দিয়েছিল ওরা। বিশেষকরে রুদ্র। ও যেকোন অস্ত্র হাতে নিলে এমন মনে হতো যেন ওটা আলাদা কিছু না, ওর শরীরের একটা অঙ্গ। ব*ন্দু*কের গু*লিতে নিশানাভেদে রুদ্রর চেয়ে বেশি পারদর্শী আর কাউকে কখনও দেখেননি রাশেদ।
ওদেরকে দুবছরের দীর্ঘ প্রশিক্ষণে বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত করা হয় সোলার সিস্টেমের হাল ধরার জন্যে।

******

তটিনীর স্বপ্ন আর রুদ্রর ছোটবেলার সখ ডাক্তার হওয়া হলেও রুদ্র কর্মাস থেকেই এসএসসি, এইচএসসি শেষ করল। নিজস্ব স্বপ্ন বা সখ ও ত্যাগ করেছিল বহুবছর আগেই। রুদ্রকে প্রথমবার সরাসরি কোন মিশন লীডে পাঠানো হল ওর এইচএসসি পরীক্ষার পর। যখন ওর আঠারো বছর বয়স। রুদ্র যখন উচ্ছ্বাসকে নিয়ে বের হচ্ছিলো, তখন মুখটা অমাবশ্যার মতো অন্ধকার করে রেখেছিল জ্যোতি। বয়সন্ধিতে পা দিতেই রুদ্রর প্রেমে ভীষণ ভয়ংকরভাবে পড়ে যায় ও। ছোটবেলা থেকে কৌতূহল নিয়ে হোক কিংবা ভয় নিয়ে; ঐ একটা ছেলেকেই দেখে গেছে ও। কিশোরী হতেই ঐ ছেলেকেই মন দিয়ে ফেলেছে। তাইতো বাড়ির সকল পরিচারিকাকে নিষেধ করে রুদ্রর সব কাজ ও নিজে করে দেয় এখন। কফি দেওয়া থেকে শুরু করে, ঘর গুছিয়ে দেওয়া, জামাকাপড় ধুয়ে দেওয়া, কাপড় বের করে দেওয়া। রুদ্র যদিও এসবে খুব বিরক্ত হয়। কিন্তু পাত্তা দেয়না জ্যোতি। রুদ্রকে মনে রাজ্যে লালন করে সারাদিন গুনগুনিয়ে গান গায়, হাসে, ডায়েরিতে শতশত প্রেমপত্র লেখে। পঞ্চাদশী কিশোরীর সব জুড়ে কেবল রুদ্র, রুদ্র আর রুদ্র।

—————

খুলনার শিপইয়ার্ডে তখন লোনা বাতাসের ঝাপটা। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে ট্রলারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র। গায়ে কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেট। পাশে উচ্ছ্বাস। খুলনা থেকে এক বিশাল চালান নিয়ে আজ তাদের পৌঁছাতে হবে সিলেট অবধি। রুদ্রর প্রথম লিড মিশন। উচ্ছ্বাসেরও। ভেতর ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে উচ্ছ্বাসের। পেটের মধ্যে গুরগুর করছে। অথচ ওর পাশে দাঁড়ানো রোবটটা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন, অতিষ্ঠ হয়ে লেইট ট্রেনের অপেক্ষা করছে।
​রাশেদ আমের বিদায়বেলায় শুধু একটি কথাই বলেছিলেন রুদ্রকে, 'তোমার যাওয়ার খবর কারো কাছে লুকোনো থাকবেনা। ওরা চাইবে এই সুযোগের পরিপূর্ণ সদ ব্যবহার করতে। আমি চাই এটাকেই তুমি ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল প্রমাণ করো।'

—————

​সিলেটের নির্জন হাইওয়েতে গাড়ি যখন রূপসা ব্রিজের অন্ধকার চত্বর পার হচ্ছিল, তখনই গর্জে উঠল ওত পেতে থাকা শত্রুদলের গাড়িগুলো। ওরা ভেবেছিল বাঘ এবার এক কচি হরিণ পাঠিয়েছে, যাকে ছিঁড়ে খাওয়া সহজ হবে। কিন্তু রুদ্র আর উচ্ছ্বাস ছিল পুরোপুরি প্রস্তুত। হাইওয়ের নিঝুম রাস্তায় শুরু হলো এক নারকীয় তাণ্ডব।

​উচ্ছ্বাস তার টিম নিয়ে দক্ষ হাতে আক্রমণ সামাল দিচ্ছিল। রুদ্র নিজেও সাবমেশিন গান হাতে জিপের সানরুফ দিয়ে বেরিয়ে এসে আগুনের বৃষ্টি শুরু করল একপ্রকার। নিমিষেই ওদের দুটো জিপ ছিটকে পড়ল রাস্তার নিচে। 

কিন্তু আসল লড়াইটা শুরু হলো যখন রুদ্রর গাড়িকে এক কোণে ব্লক করে ফেলা হলো। ​রুদ্র গাড়ি থেকে নামল। সামনে তিনজন পেশিবহুল ঘাতক। দুজনকে রুদ্রর ক্ষিপ্রতা আর বেপরোয়া গুলিবৃষ্টি পিছু হটতে বাধ্য করল। কিন্তু তৃতীয়জন ছিল এক বিশালদেহী, ঘাড়ত্যাড়া ষণ্ডা। সে একটা রামদা নিয়ে রুদ্রর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। রুদ্র চিতার মতো ডজ দিয়ে লোকটার হাতের নিচ দিয়ে ঢুকে পড়ল এবং এক ঝটকায় তাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে তার ওপর চেপে বসল।
​বাকি দুজন তখন রুদ্রর রণচণ্ডী মূর্তি দেখে পালানোর পথ খুঁজছে। লোকটা তখনো দাঁত কিড়মিড় করে গালি দিচ্ছিল। 

রুদ্রর চোখে কোনো রাগ বা উত্তেজনা নেই। আছে কেবল এক হিমশীতল শূন্যতা। ও খুব ধীরস্থিরভাবে লোকটার কপালে নাইন এমএম পিস্তলের নলটা ঠেকাল। ​ঠান্ডা নল কপালে স্পর্শ করতেই ঘাতকটার সব দম্ভ মুহূর্তেই উবে গেল। সে আর্তনাদ করে ক্ষমা চাইতে চাইল। কিন্তু রুদ্র ওকে সে সুযোগ দিল না। খুব সাবলীলভাবে ট্রিগার চেপে দিল। 
​মধ্যরাতের হাইওয়েতে সেই শব্দই পুরো পৃথিবীর রঙ বদলে দিল রুদ্রর জন্য। লোকটার কপাল ফুঁড়ে বুলেট বের হওয়ার সময় এক ফোঁটা তপ্ত রক্ত ছিঁটে এসে লাগল রুদ্রর উজ্জ্বল শ্যাম গালে। ও চোখ বন্ধ করল না। বরং স্থিরভাবে তাকিয়ে রইল লোকটার নিথর চোখের দিকে।

​তটিনী বেঁচে থাকলে হয়তো সেদিন আর্তনাদ করতেন। কিন্তু সে আজ ভীষণ দূরে।
উচ্ছ্বাস দৌড়ে এসে দাঁড়াল রুদ্রর পাশে। স্থির চোখে তাকিয়ে দেখল বিন্দুমাত্র হাত কাঁপছে না ছেলেটার। বরং পকেট থেকে রুমাল বের করে খুব আয়েশে গালের সেই রক্তের দাগটা মুছে ফেলল। জীবনের প্রথম হত্যার পরেও কেউ এতো নির্বিকার কীকরে থাকে, জানা ছিলোনা উচ্ছ্বাসের।

*****

দ্য সোলার সিস্টেমের প্রতিষ্ঠা আর আমেরদের আভিজাত্যের ধারা এভাবেই চলছিল। তবে রাশেদ আমেরের নির্দোষদের হত্যার নিষেধাজ্ঞা যে একেবারে সবসময়ই বহাল থাকতো ব্যপারটা তাও না। তাদের পথে মারাত্মক কোন বাঁধা হয়ে আসা, কিংবা তাদের জন্যে অপ্রতিরোধ্য বিপদ হয়ে আসা কেউ যদি সৎ কিংবা নির্দোষও হতো, তাকে সরিয়ে ফেলা হতো। ব্যপারটা রাশেদ আমেরের পছন্দ না হলেও, সোলার সিস্টেম এবং আমের আভিজাত্য রক্ষার উদ্দেশ্যে তা তিনি করতেন।

তেমনি আভিজাত্য রক্ষার বলি হয়েছিলেন, ওসি আশফাক রহমান নামক একজন। সেবছর ট্রান্সফার হয়ে নতুন এসেছিলেন উনি। আশফাক আমের ফাউন্ডেশনের একটি ত্রাণবাহী ট্রাক দুর্ঘটনাবশত তল্লাশি করে বসেন। যেখান থেকে বড় একটি চালান ধরা পড়ে। সেই ঘটনার পর তিনি শুধু গুদাম অবধিই থামেননি। বরং তদন্ত করতে করতে এমন এক নথির হদিস পেয়ে যান, যা সরাসরি সোলার সিস্টেমের অর্থের উৎস আর আমের ফাউন্ডেশনের সংযোগ প্রমাণ করে দিতে সক্ষম ছিল।

খবর পাওয়ামাত্র রাশেদ খবর নেন সেই ওসি সম্পর্কে। সকল খবরাখবর নিয়ে রাশেদের বুঝত এক মিনিটও লাগেনি আশফাককে টাকা দিয়ে কিংবা হুমকি দিয়ে টলানো যাবেনা। অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী এই লোকের মতো সৎ এবং নিষ্ঠাবান অফিসার পাওয়া এই দেশে ভীষণ দুষ্কর। তাই সোলার সিস্টেমকে নিরাপদ রাখতে সেটাই করতে হবে যা উনি করতে পছন্দ করেন না।

সেইসব প্রমাণ সে ফাঁস করার আগেই খুব কৌশলে রাশেদ আশফাককে তুলে নিয়ে আসেন তার গোপন এক গোডাউনে। একপ্রকার অতর্কিতে হাত-পা বেঁধে নিয়ে আসা হয় তাকে। লাভ হবেনা জেনেও টাকার বিনিময়ে তথ্য-প্রমাণ ফিরিয়ে দেওয়ার অফার দিলেন রাশেদ আমের। উত্তরে আশফাক রাজিতো হয়ইনি, উল্টে মেঝেতে থুথু মেরে বলেছে, 'আমি জানি আজ আমি জীবিত ফিরব না। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন আমের সাহেব। পাপ যত শক্তিধর, প্রভাবশালীই হোক, তার পতন অনিবার্য। ততটাই নিষ্ঠুরভাবে পতন হয় তার। মরেও আমি সেই পতনের অপেক্ষায় থাকব।'

রাশেদ গম্ভীর স্বরে বললেন, 'এখনো এতো বিশ্বাস?'

' আমাদের মতো লোকেরা এই বিশ্বাস নিয়েই নিজের সততায় অটল থাকে। আপনাদের মতো জানোয়াররা তা বুঝবেনা।'

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে পা দিয়ে ঠেলে শুইয়ে দেয় আশফাককে। অতঃপর নিজের বন্দুকটা সোজা তাক করে তার কপাল বরাবর। একসেকেন্ডও না ভেবে ট্রিগার চেপে দেয়। রক্ত ছিটকে গু*লিটা পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাশেদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল ওসির খোলা, স্থির চোখের দিকে। যেন স্পষ্ট পড়তে পারছিল সেই নিথর শরীরের অভিশাপ।

ওসির সেই লাশ পাওয়া গিয়েছিল গুলশানেরই লেকের এক পাড়ে। সে নিয়ে বেশ শোরগোল হয়েছিল দেশজুড়ে। শোরগোল থামার সাথে সাথে মানুষ ভুলেও গেছে তা। কিন্তু রাশেদ ভুলতে পারেনি নিজের করা সেই পাপের। গোপনে আশফাকের পরিবারকে সবরকমের সাহায্য তিনি করে গেছেন সেই ঘটনার পর থেকে। আশফাকের অনুপস্থিতিতে তার পরিবার আর্থিক কিংবা নিরাপত্তা সংকটে না ভোগে তার পূর্ণ খেয়াল রেখেছে। কিন্তু আশফাকের মৃত্যুর শোক তার পরিবারের জীবন থেকে কীকরে কাটাবেন? সেই বটবৃক্ষের অভাব কীভাবে মেটাবেন? তার জীবনের অনেক কলঙ্কের মধ্যে অন্যতম কলঙ্ক ছিল তা।

—————

এতোসব কিছুর মধ্যে রুদ্র আর উচ্ছ্বাসের বাড়তে থাকা প্রচ্ছন্ন ঘনিষ্ঠতা শান্তি দিতো রাশেদ আমেরকে। এতোবছর যাবত এতো ভাঙা-গড়া সম্রাজ্যের মধ্যেও আমের সম্রাজ্য অটল অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল একটাই কারণে। অভ্যন্তরীণ দৃঢ় একতা। অসংখ্য শত্রুর আঘাতের পরেও ওরা বিন্দুমাত্র টলেনি, কারণ আমেররা একে ওপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল সুদৃঢ়ভাবে। এদের ভেতরকার বন্ধন ছিল অটুট। সেই অটুট বন্ধনই এমন অপারাজেয় করে রেখেছিল দ্য সোলার সিস্টেম গ্রুপকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp