আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০১ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প


          খুব মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভাঙল তনিমার। কাছেই কোথায় যেন অজস্র পাখি ডাকছে। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল স্নিগ্ধ ভোর নামছে পৃথিবীতে। আকাশের পূর্ব কোণে উজ্জ্বল রক্তিম আলো। সামনে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল তনিমা। এত সুন্দর সবুজে ছাওয়া প্রান্তর। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে রাখা যেন। প্রান্তর জুড়ে কত রঙের ফুলের গাছ। আকাশের রঙ ফর্সা হচ্ছে ধীরে ধীরে। ভোরের নরম আলোয় দেখা যাচ্ছে প্রান্তর জুড়ে নাচের ভঙ্গিতে উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য বর্ণিল প্রজাপতি। তার জানালার নিচেই এত সুন্দর এই জায়গাটা আগে কখনো চোখে পড়েনি কেন তার, কে জানে?
রুদ্ধশ্বাসে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে থাকার পর সম্বিত ফিরল তনিমার। অতি দ্রুত পায়ে জুতো পরে নিয়ে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

দরজা খুলে হতবাক হয়ে গেল তনিমা। লিফট কোথায় গেল? রাতারাতি লিফট গায়েব হয়ে গেল? সিঁড়িগুলোও কেমন যেন অন্যরকম বলে মনে হচ্ছে। ওদের বাসার সিঁড়িগুলো তো এমন ছিল না! এমন প্যাঁচানো প্যাঁচানো সিঁড়ি কোথা থেকে এলো?

এত কিছু চিন্তা করার সময় নেই, লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে ছুটে এই নতুন ধরণের সিঁড়ি দিয়েই নামতে শুরু করে দিলো তনিমা। রোদ চড়ে যাওয়ার আগেই ঘুরে আসতে হবে সবুজ মাঠটা থেকে। চারতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেট দিয়ে বেরিয়ে ছুটে যাচ্ছিল তনিমা। ওই তো ওপাশে দেখা যাচ্ছে প্রান্তরটা, আর তার ওপর হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতির ওড়াওড়ি।

ছুটে যেতে গিয়ে আচমকাই অদৃশ্য কিছুতে বাধা পেয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল তনিমা। আর সেই সাথে চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল সেই অপরূপ প্রান্তরটাও।

ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসল তনিমা। স্বপ্ন এত প্রাণবন্তও হয়! কোথায় যেন পড়েছিল, স্বপ্নের রঙ সবসময় সাদা কালো হয়। অথচ তনিমার স্বপ্ন সবসময়ই সম্পূর্ণ রঙিন, সেই ছোটোবেলা থেকেই। কিছুক্ষণ সময় লাগল তনিমার, নিজেকে ধাতস্থ করতে। জানালা দিয়ে নীলাভ কালচে আলো মেশানো তরল অন্ধকার ঢুকছে চুইয়ে চুইয়ে।

কয়টা বাজে? এখন কি সকাল হচ্ছে, নাকি সন্ধ্যা? বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে হাতে নিল তনিমা। সময় দেখাচ্ছে ছয়টা পঞ্চান্ন। তাহলে এখন সন্ধ্যাই হবে। সকাল ছয়টা পঞ্চান্ন মিনিটে তো ঝকঝকে আলো হয়ে যায় এই ঘর। চারটা মিসড কল উঠে আছে। তিনটা সৌরভের, আরেকটা অর্পার। কী মনে করে অর্পার মিসড কলটাই আগে ব্যাক করল সে।

“কী, বাসায় গিয়েই ঘুম? বাবারে বাবা, কি ঘুমকাতুরেই হয় মানুষ!”

“কাজের কথা বল।” শুষ্ক স্বরে বলল তনিমা।

“বাবারে, কত কাজের মানুষ রে তুই!”

বিরক্ত হয়ে ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল তনিমা।
“তুই কি আর কিছু বলবি?”

“না রে মা, আর কিছু বলব না! তুই দয়া করে হোয়াটস এপ গ্রুপে ঢুকে দেখ।”

“কী দেখব?”

“দেখবি, আমি মারা গেছি! কাল বাদ জোহর আমার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, সেই খবর!”

 উফ, এত বাজে কথাও বলতে পারে অর্পাটা!
“আমি ফোন রাখলাম।”

“হ্যাঁ, সেই ভালো! ফোনটা রাখ, আর হোয়াটস এপ গ্রুপে ঢুকে মেসেজ চেক করে আমাকে ফিডব্যাক দে। চার মিনিট সময় দিলাম তোকে আমি!”

কল কেটে দিয়ে হোয়াটস এপ গ্রুপে ঢুকল তনিমা। যা দেখল, তাতে সত্যি সত্যিই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড় হলো তনিমার।
দু সপ্তাহ পর ওদের গ্রুপ এসাইনমেন্ট সাবমিট করার ডেট দিয়েছেন জিকে স্যার। জিকে স্যারের এসাইনমেন্ট হেলাফেলা করে করবার উপায় নেই কোনো। স্টেজের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে চামড়া ছিলে ফেলবেন। এমন মোলায়েম করে ছিলবেন যেন যার চামড়া ছিলে ফেলা হচ্ছে সেও যেন হাসি হাসি মুখ করে রাখতে বাধ্য হয়। মুখ কালো করে রাখার কোনো ব্যাপার নেই উনার কাছে। ফেলও করিয়ে দেবেন হাসিমুখে, অনার্সও দেবেন হাসিমুখে।
যে পরীক্ষা দিচ্ছে স্যারের হাসি দেখে তার বোঝার কোনো উপায় থাকবে না যে সে কি ফেল মার্ক পাচ্ছে, নাকি অনার্স মার্কস পাচ্ছে।
এসাইনমেন্ট করতে ভয় পায় না তনিমা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দুদিন পর তার মেহেদি, তিনদিন পর গায়ে হলুদ, চার দিন পর তার বিয়ে।
একা একা এসাইনমেন্ট হলে সে কোনো কিছুই চিন্তা করত না। কিন্তু গ্রুপ এসাইনমেন্টে গ্রুপের সবার সাথে বসার একটা ব্যাপার থাকে।
তাদের এই মাস্টার্স প্রোগ্রাম মূলত চাকরিজীবীদের জন্য। আর সেই জন্যই সপ্তাহে মাত্র একদিনই ক্লাস থাকে। আর সেটা থাকে শুক্রবার। তাদের ক্লাসমেটদের প্রত্যেকেই যার যার চাকরি অথবা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সপ্তাহের মাঝখানে ক্যাম্পাসে যাওয়ার তেমন একটা সুযোগ পায় না কেউই। ওই শুক্রবারটাই ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে লাইব্রেরিতে বসে গ্রুপ এসাইনমেন্টগুলো রেডি করা হয়। এটাও এমনিতে এমন কোনো ব্যাপার ছিল না তনিমার জন্য। কিন্তু বিয়ের পর নতুন বউদের অনেক জায়গায় দাওয়াত থাকে, জানে তনিমা। নতুন সংসারে নতুন জায়গায় গিয়ে শুক্রবার সারা দিন ভার্সিটিতে কাটিয়ে আসাটাকে ও বাড়ির মানুষ কেমন চোখে দেখবে তাই বা কে জানে?

রিং বাজছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে অর্পার নাম। কল রিসিভ করে বিরক্তি চেপে ফোন কানে লাগিয়ে শীতল স্বরে বলল তনিমা,
“হ্যাঁ বল!”

“আমি আর কী বলব? তুই বল কী করবি তুই!”

“তুই আমাকে কী করতে বলিস?”

“আমি বলি কী, এই সেমিস্টারটা স্কিপ কর তুই!”

“মানে?” ভ্রূ কুঁচকে গেল তনিমার।

“মানে, তুমি এমনিতেও পারবা না নতুন নতুন বিয়ের পর এত স্ট্রেস নিতে! দেখা যাবে তোর একার জন্য আমাদের ফুল গ্রুপের পারফম্যান্স খারাপ হচ্ছে! গ্রুপ এসাইনমেন্টের মার্কসও ডাউনফল করবে। তার চেয়ে বেটার না, এক সেমিস্টার স্কিপ করে নেক্সটের জন্য ভালো করে প্রিপারেশন নেওয়া?”

দাঁতে দাঁত চেপে শুনে যাচ্ছিল তনিমা।
“রাজিবও বলছিল…”

বরফশীতল স্বরে বলল তনিমা,
“কী বলছিল রাজিব?”

তনিমার গলার স্বর শুনে খানিকটা দমে গেল অর্পা।
“বলছিল যে…”

বাধা দিয়ে বলল তনিমা,
“তোরা কি আমাকে নিয়ে খুব গসিপ করিস?”

অর্পা বাঁকা স্বরে বলল,
“তুই নিজেকে কী মনে করিস?”

থমকে গেল তনিমা।
“মানে?”

“তুমি এমন কে যে তোমাকে নিয়ে আমরা গসিপ করতে যাব?”

দরজায় টোকা পড়ছে। আম্মু নিশ্চয়ই। কথা সংক্ষিপ্ত করতে চাইল তনিমা,
“যাই হোক। আমি রাখছি।”

‘আর, এসাইনমেন্টের ব্যাপারটা?”

“ওটা যেমন আছে, তেমনই থাকবে। আমি আমার পার্টটুকু করব। নেক্সট ফ্রাইডেতে রিডিং রুমে বসে যার যার পার্ট প্রেজেন্ট করব। মানে, বরাবর যেমন করে এসেছি!”

“আর ইউ শিওর?” অর্পার গলায় সন্দেহের সুর।

“সেন্ট পারসেন্ট!”

দরজায় টোকার তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। ফ্রিকোয়েন্সি দ্রুততর হচ্ছে। দুই টোকার মধ্যবর্তী ব্যবধান কমে আসছে। “আমি রাখছি” বলে কল কেটে দিয়ে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা খুলল তনিমা। দরজা খুলতেই আম্মু প্রবল বেগে ঘরে ঢুকে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিলো তনিমার গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝতে না পেরে গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল তনিমা। গাল জ্বালা করছে। কানের মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। গাল আর কানের চামড়ার নিচে রক্তের উষ্ণ প্রবাহ অনুভব করছে তনিমা। ফোনে রিং বাজছে। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠেছে সৌরভের নাম। সেদিকে এক নজর তাকিয়ে দেখে যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল আম্মু, ঠিক তেমন করেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে না পেরে হতভম্ব ভাবটা না কাটলেও কলটা রিসিভ করে কানে ঠেকাল তনিমা।

“হ্যালো” বলার পর শোনা গেল সৌরভের গম্ভীর কণ্ঠ,
“কার সাথে কথা বলছিলে?”

হতভম্ব ভাবটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল তনিমা, “অর্পার সাথে!”

“আমি তোমাকে কয়েকবার কল করেছিলাম…”

“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুমি তো জানো অফিস থেকে ফিরে অনেক ক্লান্ত লাগে আমার…”

“মিসড কল দেখে ব্যাক করতে পারতে…”

“তার আগেই অর্পার কল ঢুকেছিল…”

“ব্যাপারটা আসলে তা নয়, ব্যাপারটা প্রায়োরিটির…”

হাল ছেড়ে দিলো তনিমা,
“আচ্ছা, আই এম স্যরি!”

“আন্টির সাথে কথা হয়েছে?”

“কী ব্যাপারে?”

“কিছু বলেনি আন্টি তোমাকে?”

“না তো!”
“আচ্ছা, বলবে বোধহয়! এখন আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?”

“কী ব্যাপারে? এমন রহস্য করে কথা বলছ কেন?”

“এবাউট ইওর পাস্ট!”

“কী ধরণের পাস্ট?”

“তুমি কি কিছুই বুঝতে পারছ না, নাকি বুঝতে পেরেও না বোঝার অভিনয় করছ?”

“তুমি আসলে ঠিক কী বলতে চাচ্ছ, ক্লিয়ার করে বলবে?”

“তোমার কি এমন কোনো অতীত ছিল, যা আমার জানা প্রয়োজন?”

‘না তো!”

“শিওর?”

“সেন্ট পারসেন্ট!”

“বিয়ে তো তুমি নিজের ইচ্ছায় করছ? কোনো ধরণের ফ্যামিলি প্রেশার বা এই ধরণের কোনো কারণে তো করছ না?”

“অফ কোর্স নট!”

“ঠিক আছে! যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে হচ্ছে আমাদের বিয়েটা। আমি আম্মুকে বুঝিয়ে বলব। সিচুয়েশন আমি হ্যান্ডল করতে চেষ্টা করছি।”

অর্পা অবাক হয়ে বলল,
“কী সিচুয়েশন? কী বলছ তুমি?”

“তুমি গিয়ে আন্টিকে জিজ্ঞেস কর! আমি রাখছি।”

কিছু বোঝার আগেই কল কেটে দিলো সৌরভ। তনিমা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রওনা দিলো আম্মুর ঘরের উদ্দেশ্যে। আম্মু আব্বুর মুখ থমথমে হয়ে আছে। তনিমা গিয়ে তাকাতেই ওর ছোটো ভাই তুহিন ওর দিকে তাকাল তীব্র দৃষ্টিতে। ওর চোখে প্রবল ঘৃণা। নিজের অপরাধ কী না জেনেও অপরাধবোধে কুঁকড়ে উঠল তনিমা। ভয়ে ভয়ে কোনো মতে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”

তুহিন শুধু বলল,
“ছি আপু! ছি!”

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তুহিন, ওর পিছু পিছু আব্বুও। তনিমা বিমূঢ় হয়ে তাকাল আম্মুর দিকে। আম্মু কাঁদছিল। চোখ মুছে বলল,
“তোর যদি অন্য কোথাও পছন্দ থাকত, তুই তো আমাদের আগেই জানাতে পারতি!”

“আমি কখন বললাম আমার অন্য কোথাও পছন্দ আছে?”

“সৌরভের ভাই সৌমিকের ফোনে আজকে তোর কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছে একটা ছেলে। সৌরভের মা আমাকে তার স্ক্রিনশট পাঠিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। ইস, ছি ছি, কী লজ্জা, কী লজ্জা! আমি এখন সবাইকে মুখ দেখাব কীভাবে?”

“কোথায় স্ক্রিনশট? দেখাও দেখি!”

চোখ মুছে ফোন এনে তনিমার হাতে দিলো আম্মু। স্ক্রিনশট দেখে মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল তনিমার। মেসেজগুলো পাঠিয়েছে অপু, তনিমার সাথে ওর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বা আছে তার প্রমাণ স্বরূপ। স্কিন কালারের টি শার্ট পরে, লাল গাউন পরে মোহনীয় ভঙ্গিতে তনিমার শুয়ে থাকা, বসে থাকা কয়েকটা ছবি। কোনো সন্দেহ নেই ছবিগুলো তনিমারই। কিন্তু কথা হচ্ছে এই ছবিগুলো অপু পেল কোথায়? মাথা ঘুরে উঠল তনিমার। ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল সে। কাতর গলায় বলল,
“আম্মু, বিশ্বাস কর…”

“কী বিশ্বাস করব? বিশ্বাস করার মতো কিছু বাকি রাখছিস? এটাই তো বলবি যে এগুলো তোর ছবি না? এডিট করে বানানো?”

“না, এমন কোনো কিছুই আমি বলব না! এগুলো আমারই ছবি! কিন্তু…”

“কিন্তু কী?”

“এই ছেলের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই! কখনো কোনো দিন ছিলও না!”

“আর কত মিথ্যা বলবি? সম্পর্ক না থাকলে ও পেল কোথায় তোর এমন ছবি? নিশ্চয়ই তুই দিয়েছিস!”

“আমি দিইনি…”

“তাহলে পেল কোথায়?”

“আম্মু, বিশ্বাস কর, এখানে একটা গেম হয়েছে…”

“কী গেম হয়েছে? মডেলিং করার জন্য ফটোসেশন ছিল কোনো? এই তো বলবি?”

“না…”

“ভালো মেয়েরা এইভাবে পোজ দিয়ে ছবি তোলে কখনো?”

“আম্মু…”

“আমি জানি না আমি কী করব, কী বলব! মাথায় কিছুই আসছে না আমার!”

“আম্মু, প্লিজ ট্রাস্ট মি…”

“আমি না হয় করলাম ট্রাস্ট, কিন্তু বাকি দুনিয়া? দুনিয়ার কথাও নাহয় বাদই দিলাম, তোর আব্বু?”

“আম্মু…”

“আমার আর তোর চেহারা দেখতে ইচ্ছা করছে না!”

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আম্মু। তনিমা কিছুক্ষণ কী করবে বুঝতে না পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে চলে গেল নিজের ঘরে। টেবিলে দুহাত কনুই পর্যন্ত বিছিয়ে দিয়ে কপাল টিপে ধরে বসে রইল তনিমা। মাথাটা প্রচণ্ড ধরেছে। ইস, কেউ কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে দিত যদি! চোখ বন্ধ করল তনিমা। চোখের সামনে ভেসে উঠল সাড়ে চার বছর আগের একটা রাতের স্মৃতি। প্রম নাইট শেষ করে তারা সবাই মিলে একসাথে হ্যাং আউট করতে গিয়েছিল সুস্মিতার বাসায়। এক এক করে সবাই চলে গেলেও রয়ে গিয়েছিল তারা চারজন। সারা রাত জেগে আড্ডা দিতে দিতে মজা করার অংশ হিসেবেই সুস্মিতার ডিজিটাল ক্যামেরায় ফটোসেশন করতে শুরু করেছিল ওরা। সুস্মিতার আম্মু আব্বু বাসায় ছিল না বলে হইচইয়ের মাত্রাটা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেদিন। কোন কুক্ষণে যেন কার মাথায় ভর করেছিল একটা দুষ্টুমি বুদ্ধি। সাধারণ পোশাক পরে ফটোসেশন করা শেষ হয়ে গেলে সুস্মিতার ক্লজেট থেকে বের হয়েছিল এক্সক্লুসিভ সব ড্রেস। অবশ্য সুস্মিতার জন্য এসব ড্রেস থাকা তেমন কোনো ব্যাপার না। যাদের ছোটোবেলা থেকে মা বাবার সাথে ফরেন ট্যুর দিয়ে, পার্টি করে অভ্যাস আছে, যার নিজস্ব ডিজিটাল ক্যামেরা থাকে, আইফোন থাকে, তার এসব ড্রেস থাকতেই পারে, ফরেন ট্যুরগুলোতে পরার জন্য। আর কেউ তেমন আগ্রহ না দেখালেও আগ্রহ নিয়েই পরেছিল তনিমা। রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় ছোটোবেলা থেকেই ওর আগ্রহ ছিল এমন সব ড্রেসের প্রতি। কতদিন কল্পনায় দেখেছে এমন একটা রেড গাউন পরে কাশ্মীরের সাদা বরফের ওপর হাঁটছে ও! বলতে নেই, তনিমার ফিগারটাও খুবই দারুণ। লাল গাউনটা এত সুন্দর মানিয়েছে ওকে! সুস্মিতার ছবি তোলার হাতটাও ছিল ভালো। ওদের তিন হাজার স্কয়ার ফিটের এপার্টমেন্টের পুরোটা জুড়েই এ কোণায় ও কোণায় ছড়িয়ে রাখা বিভিন্ন শো পিস আর আর্টিস্টিক সব ফার্নিচারের সামনে বসিয়ে দাঁড় করিয়ে দারুণ এস্থেটিক সব ছবি তুলে দিয়েছিল ও তনিমার। রেড গাউনে ফটোশ্যুট শেষ করে নিজে থেকেই দিয়েছিল এই স্কিন কালারটি শার্টটা। দেখে আঁতকে উঠেছিল তনিমা,
“এটা পরলে তো মনে হবে কিছুই পরিনি আমি!”

অভয় দিয়েছিল সুস্মিতা,
“আরে এসব ছবি কি আর কোথাও দিতে যাচ্ছি নাকি আমি? এগুলো তো নিজেরা দেখার জন্য! পরে ডিলিট করে দিলেই হবে!”

অবশেষে সুস্মিতার কথাতেই সেই স্কিন কালারের টি শার্ট পরে ওর শিখিয়ে দেওয়া পোজ দিয়ে সাহসী কয়েকটা ছবি তুলেছিল তনিমা। সকালে বাসায় ফিরে আসার আগে ওর ক্যামেরা থেকে মেমোরি কার্ড খুলে ল্যাপটপে নিয়ে দেখেছিল ছবিগুলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল,
“অনেক সুন্দর হয়েছে। এখন ডিলিট করে দে প্লিজ?”

“হ্যাঁ, এখনই দিচ্ছি!”

সেই ছবি যে ডিলিট হয়নি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। অল্প বয়সে হাসি খেলার অংশ হিসেবে শখ করে তোলা কয়েকটা ছবি এখন মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। কিন্তু কথা হলো, অপু ছবিগুলো পেল কোথায়? সুস্মিতা দিয়েছে? জেনে শুনে সুস্মিতা এমন সর্বনাশ করবে তার? কেন? মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে তীব্র ব্যথায়। এখন কি রান্নাঘরে গিয়ে একটু কফি বানানো যাবে? মনে হয় না। বাসার পরিস্থিতি থমথমে।  তার কাছে কি অপুর কোনো কন্ট্যাক্ট নাম্বার আছে? অপুকে কল করে কি জিজ্ঞেস করা যাবে কেন এমন একটা সর্বনাশ করল তার?
·
·
·
চলবে.....................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp