সুদূরের এক বিলুপ্ত দেশে বয়ে চলা ল্যুমিস নদী কৌশিকের রাগ, ক্ষোভ অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। নদীর স্রোত আজ বড়ই অস্বাভাবিক। পানির ঢেউগুলো প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে আছড়ে পড়ছে দুই তীরে। কৌশিকের অভ্যন্তরীণ শক্তির উৎস ল্যুমিস নদী, তার অনুভূতির সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত এই নদী। কৌশিকের রাগের প্রতিটি তরঙ্গ ল্যুমিস নদীর পানির প্রতি ঢেউয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
তথাকথিত শান্ত আর নিরব নদীটি আজ যেন সমস্ত বাঁধ ভেঙে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। নদীর স্রোতের গর্জন আশেপাশের পরিবেশকে ভয়ানক আর শীতল আতংকে ভরিয়ে তুলেছে। ঘন কুয়াশার মতো নদীর কোলাহল গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর পাশে বসবাসরত মানুষেরা জানালা দিয়ে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে, কপালে চিন্তার ভাঁজ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। "আজ যদি এই নদী বন্যার রূপ নেয়? যদি এই স্রোত তাদের ঘরবাড়ি, ফসলের জমি আর জীবন-জীবিকা সবকিছু বয়ে নিয়ে যায়?" অনেক অনেক প্রশ্নে একেকজনের মুখে অসহায়তা আর ভয় ফুটে উঠছে।
শিশুরা মায়েদের আঁচলে লুকিয়ে পড়েছে, বৃদ্ধরা প্রার্থনার ঝুলি হাতে নিয়ে ঝুঁকে বসেছে। নদীর তীব্রতা দেখে মনে হচ্ছে, তার রাগ থামানোর মতো কোনো শক্তি নেই। আজকের রাতটি হয়তো অনেকের জন্য দীর্ঘতম হবে।
অনন্যার আঁখি পল্লব ভিজে উঠে ভারি হয়ে গেছে। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখটা এখন লালচে আভায় ভরে উঠেছে, অনুশোচনার বোঝায় মাথা নত। তার ভুলের পরিণাম আজ তাকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কৌশিকের জ্বলন্ত চক্ষুযুগল হঠাৎ ছাদ থেকে ঝুলে থাকা বাল্বের দিকে পড়লো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি প্রচণ্ড শব্দে বাল্বটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। বিস্ফোরণের হঠাৎ আওয়াজে চমকে উঠলো অনন্যা। উপরের দিকে তাকাতে নিলেও তাকাতে পারলো না। রুমটি অন্ধকার হয়ে যেতেই বোঝা হয়ে গেছে কী হয়েছিল কয়েক মুহূর্ত পূর্বে!
কৌশিক ঠান্ডা আর হিংস্র দৃষ্টিতে অনন্যার দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের সামান্য ইশারায় অর্ধভেজা দরজাটি সশব্দে বন্ধ করে দিলো। অনন্যা ছাড়া পাওয়ার সুযোগ বুঝে তড়িঘড়ি ছুটে গেলো দরজার দিকে। হাত দিয়ে দরজায় সজোরে আঘাত করতে লাগলো, কাঁপা কাঁপা গলায় চিৎকার করতে লাগলো, "কেউ আছে? কেউ শুনছে? নিক ভাইয়া! লারা!"
অনন্যার চিৎকার যেন ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়ে গেলো। কৌশিকের ঠোঁটে এক অশুভ বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। যেনো সে পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে। জোরালো এবং স্নায়ু শীতল করা গলায় কৌশিক বললো,
"অনন্যাআ! কেউ তোমার আওয়াজ শুনবে না। এই ঘর থেকে তোমার কণ্ঠ বেরোবে না, ডার্লিং। তোমার আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কারো কাছে পৌঁছাবে না।”
অনন্যার ভয়ার্ত চোখে স্যারের দিকে তাকালো , মাথা নিচু করে উষ্ণ ঢোক গিললো। পেছনে দাঁড়ানো কৌশিক স্যারকে দেখে মনে হচ্ছে সে আর আগের মানুষটি নেই। তার চোখ দুটো রক্তনীল, আগুনের মতো নীল শিখা নিয়ে জ্বলছে। এই চোখের দৃষ্টিতে অনন্যার শরীর শিউরে উঠলো। মনে হলো, লোকটি তাকে এক মুহূর্তে গ্রাস করবে। অনন্যা সামনে ফিরে চোখ বন্ধ করে পুরো পরিবারের মানুষের মুখগুলো মনে করতে লাগলো, সবশেষে খুব জোরে চিৎকার করলো সে। দরজা ধাক্কাতে লাগলো। সেদিনের বাঘ থেকেও বেশি এই লোকটা ভয়ংকর। এর চেয়ে জঙ্গলের বাঘটি তো শতগুণে ভালো ছিল।
কৌশিক অনন্যার চিৎকার শুনে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ ধীরে ধীরে নেমে গেলো নিচে পড়ে থাকা কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলোর দিকে। এক ইশারায় কাঁচের বড় টুকরো কৌশিকের হাতের মুঠিতে প্রবেশ করলো। কৌশিক বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে গেলো অনন্যার পেছনে। হাওয়ার শোঁ শোঁ আওয়াজের সাথে তার উপস্থিতি যেন ঘরের তাপমাত্রা আরও নিচে নামিয়ে দিলো। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, কাঁচের ধারালো অংশ দিয়ে অনন্যার কানের ঠিক পেছনে এক ক্ষুদ্র ছিদ্র করলো কৌশিক।
অনন্যা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় থমকে গিয়ে চিৎকার থামালো। দ্রুত পেছনে ঘুরে বোঝার চেষ্টা করলো কী ঘটেছে। তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে গেলো কানের দিকে। অনুভব করলো কিছু একটা ভিজে আর গরম, যা ধীরে ধীরে তার কানের পিছন বেয়ে নেমে আসছে।
কানের পাশ দিয়ে রক্তের সরু ধারা বইছে। নিজের হাতের তালুতে লাল রঙ দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। চোখ বড় বড় করে কৌশিকের দিকে তাকালো, কিন্তু স্যারের মুখে কোনো অনুশোচনার চিহ্ন নেই। ঠোঁটের আগায় সেই হিংস্র, নৃশংস হাসি।
রক্তে অনন্যার টিশার্ট ইতিমধ্যেই লাল বর্ণ ধারণ করে ফেলেছে। কৌশিকের হাত থেকে কাঁচের টুকরোটি পড়ে গেলো, সে আরো কাছে এসে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল অনন্যার ঠোঁটে আলতোভাবে স্পর্শ করালো, ধীরে সুস্থে আঙুল বুলিয়ে নেশাময় ঠোঁট ছোঁয়ালো অনন্যার ঠোঁটে। অনন্যার পিঠ দরজার দিকে সেটে গেছে। কৌশিক মেয়েটার হাত দুটো শক্ত করে ধরে উপরে উঠিয়ে নিলো। ঘন ঘন শ্বাস প্রশ্বাস চলছে দুজনের।
অনন্যা চোখ তুলে চাইলো। এক সেকেন্ড ও দেরি হলো না, সাথে সাথেই কৌশিক অনন্যার কপালে খুব জোরে ঠোঁট ছোঁয়ালো। ধীরে ধীরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়লো কৌশিক, উত্তপ্ত করলো সম্পূর্ণ পরিবেশ। অতঃপর ফিসফিসিয়ে বললো,
"ওহ, মাই ডার্লিং! একটু চুপ থাকতে পারো না? চুপচাপ থাকলে তোমাকে কষ্ট দিতাম না। কিন্তু তুমি তো অবাধ্য! মেয়েরা মোমের মতো গলে যায়, রগে রগে আমার স্পর্শ চায়। তুমি চাইলে না কেন? গাড়িতে আজকের দেওয়া চুমুতে রাগ করেছি বলে?
তাহলে শোনো, তোমার চিন্তা ভুল। সেই চুমুটা আমাকে অন্য কারো কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো, এজন্যই রেগে গিয়েছিলাম।
কিন্তু নাহ আমাকে ভুল বুঝবে না, আমি ওরকম নই। আই লাইক সামওয়ান স্পেসিফিক, মাই টাইপ! এন্ড....ইউ আর মাই টাইপ। তোমার চোখ, তোমার স্টাইল, তোমার একগুঁয়েমি, তোমার পাগলামি, তোমার ঝগড়ুটে স্বভাব,সবকিছুই।
তাহলে চলো, আজ তোমাকে নিয়ে একটা ভয়ংকর খেলা খেলবো আমি। তখন অধিকার চাইছিলে না? ওকে দিবো আমি। সম্পূর্ণ অধিকার দিবো আজ।"
অনন্যার চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সে কৌশিকের বুকে ধাক্কা দিয়ে বললো,
"আমি কিছু খেলতে চাই না, কোনো অধিকার চাই না ছাড়ুন আমাকে।"
কৌশিকের ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠলো। সে নিচু হয়ে হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে অনন্যার গাল এক হাত দিয়ে চেপে ধরলো, হিমশীতল গলায় বললো,
"কাঁদবে না। মেয়েদের এই কান্না আমার একদম পছন্দ নয়।"
অনন্যা ভয়ার্ত গলায় জবাব দিলো,
"তাহলে ছেড়ে দিচ্ছেন না কেনো? এভাবে অত্যাচার করার মানেটা কী?"
কৌশিক গম্ভীর হয়ে চোখ নামিয়ে বললো,
"ছাড়বো, অবশ্যই ছাড়বো। তবে তার আগে আমার কাজ শেষ হোক!"
অনন্যার গলার স্বর এবার চিৎকারে ফেটে পড়লো,
"আমি কোনো ভোগ্যপণ্য নই যে ভোগ করবেন, তারপর ছেড়ে দেবেন!"
এই কথায় কৌশিকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। তার নখ অনন্যার গালে ডেবে গেলো, আর রক্তের চিকন ধারা বয়ে যেতে লাগলো। সে অনন্যার মুখ আরো কাছে টেনে আনলো এবং ঠোঁটে গভীরভাবে কামড় বসালো। অনন্যা প্রথমে হতবাক হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত পর তার চেতনা ফিরে এলো, সে মরিয়া হয়ে কৌশিককে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করলো।
অনন্যার হাত কৌশিকের বুকে আঘাত করছিলো, আঁচড় বসাচ্ছিলো তার ঘাড়ে। কিন্তু কৌশিক থামলো না, তার কামড়ে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে অনন্যার। কৌশিকের হাত দুটো অনন্যার মুখ থেকে ধীরে ধীরে সংবেদনশীল অঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে পেটের দিকে এগোতে থাকলো।
অনন্যা প্রাণপণে কৌশিককে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। তার শরীর কাঁপছিলো, আর চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিলো। কৌশিকের শক্তি আর আচরণ দেখে মনে হচ্ছিলো, যেন সে আর মানুষ নেই, এক ভয়ংকর দানব হয়ে গেছে।
কৌশিক ধীরে ধীরে অনন্যার ঠোঁট ছেড়ে গালের রক্তাক্ত অংশে আলতো করে হাত রাখলো। দশ মিনিট ধরে অত্যাচার চালানোর পর অনন্যার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। কৌশিকের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, তার আঙুলগুলো দগ্ধ আগুনের মতো অনন্যার গালে স্পর্শ করছিল, যা ভালোবাসার আভাস দেওয়ার পরিবর্তে অনন্যার মনে ঘৃণার বীজ বুনছিল। অপর হাতটিও তার শরীরে ঘন ঘন ছুঁয়ে যাচ্ছিল, প্রতিটি ছোঁয়া যেন কাঁটার মতো বেঁধে যাচ্ছিল অনন্যার মনে।
অনন্যার চোখ থেকে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, ভেতরটা ক্রমশ দগ্ধ হচ্ছিল ঘৃণা আর দুঃখে। যে স্পর্শ কিছু সময় আগেও সুরক্ষার অনুভূতি দিত, সেই স্পর্শ আজ তাকে অপমানের গ্লানিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে।
নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো অনন্যা, মনে হচ্ছিল এই পরিস্থিতির জন্য একমাত্র সে-ই দায়ী। ভেতরে ভেতরে বারবার ভাবছিল, "কী এমন পাপ করেছি যে এই লোকটাকে আমার জীবনের সঙ্গী বানালাম? কোন অভিশপ্ত দিনে জন্মেছিলাম যে এমন এক ভাগ্যের মুখোমুখি হতে হলো?"
কৌশিক দীর্ঘক্ষণ অনন্যার গালে হাত বুলিয়ে অতঃপর ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
"অযৌক্তিক কথা বললে এভাবেই শাস্তি পাবে তুমি।"
কথাটা বলে গালে গভীর চুম্বন বসালো কৌশিক। অনন্যার খোলা চুলে হাত বসালো, চুলগুলো ধীরে ধীরে পেছনে ঠেলে দিলো, কানের পেছনে আলতো হাতে চুল গুঁজে দিলো। কানের ক্ষুদ্র ছিদ্রে আঙুল বুলিয়ে সেখানে ক্ষুদ্র চুমু বসালো কৌশিক, অনন্যা কাঁদতে কাঁদতে শিউরে উঠলো।
হঠাৎ আবারো হিংস্র চোখে হাত চালালো কৌশিক, অনন্যার টিশার্টের গলার অংশ টান মেরে অর্ধেক ছিঁড়ে ফেললো। দৃশ্যমান হলো আরো একটি টিশার্ট। হতবাকই হলো কৌশিক। শক্ত কণ্ঠে বললো,
"আরো একটা?"
কৌশিক আবারো একইভাবে টিশার্টটিকে ছিঁড়তে গেলে
ফোলা ফোলা রক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে অনন্যা চিৎকার করে বললো,
"প্রিন্স, থামো।"
চোখেমুখে গভীর কৌতূহল নিয়ে কৌশিক ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার হাত দুটো অজান্তেই থেমে গেলো, পাঞ্জা শক্ত হয়ে নিচে নেমে এলো। অনন্যার কণ্ঠস্বর, ভয় আর বেদনার মিশেলে, কৌশিকের ভেতর অদ্ভুত এক ধাক্কা দিলো।
অনন্যার ঠোঁট থেকে উচ্চারিত প্রিন্স শব্দটি কৌশিকের মনে যেনো গভীর ঢেউ তুলে দিলো। তার চোখের হিংস্র দৃষ্টি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেলো। ল্যুমিনাস নদীর ঝড়ো হাওয়া ধীরে ধীরে থেমে গেল, সেখানকার মানুষেরা উপরওয়ালার কাছে বারবার মাথা ঠুকলো।
কৌশিক বুকের ডান পাশে হাত দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো। শ্বাস ভারী হয়ে এলো তার, আর কণ্ঠস্বরে ফিসফিস করে ভেসে এলো, "প্রিন্সেস আরিসা..."
অনন্যা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। "প্রিন্সেস আরিসা?" নামটা তার কাছে একেবারেই অচেনা। কিন্তু কৌশিকের মুখের ভঙ্গি, তার চোখে ছাপা পড়া ভয়, সব কিছুই অনন্যাকে অদ্ভুত শূন্যতায় ফেলে দিলো।
কৌশিক ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো, কিন্তু অনন্যার পরিবর্তে সে যেন অন্য কারো মুখ দেখছে। এক অপরূপ সুন্দরী নারীর মুখমণ্ডল ধরা দিয়েছে চোখের ধারে, চারপাশে বেগুনী আলো। লম্বা, ঘন কালো চুল, অন্ধকারে চুলগুলো সাপের মতো নড়ছে। মেয়েটির রহস্যময় উপস্থিতি রুমটিতে এক ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করলো। কৌশিকের মুখটা ভয়ে আর হতাশায় বিকৃত হয়ে উঠলো।
"প্রিন্সেস আরিসা!" কৌশিকের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। "আপনার জন্যই আমার এই হাল! নিশ্চয়ই এসেছেন আমাকে শেষ করতে!"
কৌশিকের শ্বাসজ্ঞান অবাধ্য আচরণ করছিল। সে এক ঝটকায় পাশে পড়ে থাকা এক কাঁচের টুকরো তুলে নিলো। চোখে এক অদ্ভুত পাগলামির ছায়া আর ঠোঁটে বিকৃত হাসি।
কৌশিক চিৎকার করে বললো,
"পারবেন না আপনি,বারবার আমার হাতেই আপনার মৃত্যু হবে। বারবার আপনি আসবেন... আবার নিঃশেষ হয়ে যাবেন!"
অনন্যা আর নিজেকে থামাতে পারলো না। ফ্লোরে বসে, চোখে পানি আর কন্ঠে আক্রোশ নিয়ে বলে উঠলো,
"স্যার! আমি... আমি অনন্যা। অনন্যা শিকদার! আপনি কার কথা বলছেন? এখানে তো কেউ নেই!"
কৌশিক যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো। হাতে থাকা কাঁচের টুকরোটা খসিয়ে ফেলে দিলো। তারপর দু’হাত সামনে বাড়িয়ে শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠে বললো,
"শিকদার! আমার খুব শীত করছে। আমাকে জড়িয়ে ধরো, প্লিজ।"
অনন্যা হতবাক হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা তার জন্য বিভীষিকা হয়ে উঠেছিল, সে এখন ভেঙে পড়েছে। কি হলো কৌশিক স্যারের? হঠাৎ এমন অদ্ভুত আচরণ কেনো করছে লোকটা?
অনন্যা নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্তের দ্বিধার পর সব ভুলে, সব ভয় পেছনে ফেলে, কৌশিক স্যারকে জড়িয়ে ধরলো। কৌশিক জাপটে ধরে রাখলো অনন্যাকে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল, গলার স্বরও অস্পষ্ট শোনাচ্ছিলো। প্রচন্ড ভয়ে সে অনন্যার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, মনে হচ্ছে ভেতরের সমস্ত কষ্ট, পাগলামি আর অস্থিরতা থেকে মুক্তি চাচ্ছে কৌশিক।
অনন্যার মনে ভারী প্রশ্ন জমতে লাগলো। হঠাৎ স্যার এমন পাগলাটে আচরণ কেনো করলো? স্যারের সেই জ্বলন্ত দৃষ্টি, জোরজবরদস্তি করা, আর অলৌকিক কাজগুলো সব একে একে মাথায় ঘুরতে লাগলো। তারপর প্রিন্সেস আরিসা? আরিসা কে? স্যার তাকে এতো ভয় পান কেনো? সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। কৌশিকের শরীর ধীরে ধীরে গরম হয়ে পড়েছে, কপাল ঘেমে গেছে। অনন্যা বুঝতে পারছে কিন্তু কিছু করার নেই, স্যার যেভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে ছাড়ানোর ও উপায় নেই। এভাবেই যে কখন চোখে ঘুম এসে ভর করলো একদম খেয়াল নেই অনন্যার। ঢুলতে ঢুলতে অনন্যা হেলে পড়ছিল, তবে কৌশিকের সুবিধায় অনন্যা তার কাঁধে মাথা রাখতে পারলো।
.
.
.
চলবে.....................................................................