মাই মিস্টিরিয়াস প্রিন্স - পর্ব ৬৬ - মৌমিতা মৌ - ধারাবাহিক গল্প


"উনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমার কিছু হলে সর্বপ্রথম উনিই পাগল হবেন।"

পাগল? না, একে তো উন্মাদনা বলে। উন্মাদনা! 

চোখ বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে অনন্যার ফ্যাকাশে ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে একটাই শব্দ বের করতে পেরেছিলো! "প্রিন্স!"

আর কিছু ভাবার সুযোগ পায়নি অনন্যা। শরীরের প্রতিটি কোষে যন্ত্রণার স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল তার। চোখের সামনে অন্ধকার নামতে বেশি সময় লাগেনি। রাস্তার মাঝে, এক টুকরো নিস্তব্ধতা হয়ে পড়ে রইলো সে। আর কৌশিক? শুধু একটা শব্দ। প্রিন্স! দূর থেকে ভেসে আসা সেই মলিন এবং অস্পষ্ট ডাক একদম বাজ পড়ার মতো ধাক্কা দিয়েছিল কৌশিকের বুকের ভেতর। এই নাম সারা দুনিয়ায় কেবল একজনই তো ডাকে তাকে এভাবে।
শব্দটা শুনতেই কৌশিকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। চিন্তা, যুক্তি, সময় সব হারিয়ে ফেলে পায়ের তলায় মাটি সরিয়ে নিয়েছিল সেই ডাক।

ক্লাসরুমে ছাত্ররা তখন বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্যারের নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া, থেমে যাওয়া দেখে সবাই ঘাবড়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ মুখ চেয়ে স্যারের কিছু বলার অপেক্ষায় বসে ছিল। কৌশিক সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। বোর্ডের লেখাগুলো অসম্পূর্ণ রেখেই ছাত্রদের বিস্ময় মুখ উপেক্ষা করে দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিল।

পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে গিয়েছিল একটিই কথা,
"আজকের জন্য এতটুকুই।"
স্যারের মুখে এহেন কথা শুনে সকলের মুখ হতে আনন্দের চিৎকার শোনা গিয়েছিল সেসময়। সবাই হাসতে হাসতে সব গুছিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে।

চারতলা হতে নিচে নেমেই গাড়িতে বসে পড়ে কৌশিক। গাড়ির স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো ছুটছিল সে। বুকের ভেতরটায় চিনচিনে ব্যথা আঁকড়ে ধরেছিল তাকে। কোনো অজানা ব্যথা সেই স্থানটা খুবলে খাচ্ছিলো। চেনা রাস্তা কিন্তু অচেনা অস্থিরতা জাপটে ধরেছিল যে কিছু্ই বুঝতে পারছিলো না কৌশিক। কোথাও একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সামনে, একদম ঠিক প্রথম দিনের মতো।
ঠিক সেদিনের মতো, যখন না জেনেও যেখানে মনটা ডেকে নিয়েছে, সেখানেই গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে। নিজের অজান্তেই অনন্যাকে বিয়ে করতে হয়েছিল তাকে ঠিক সেরকম।

অনন্যার ফোনে থাকা এমার্জেন্সি কলে প্রথম নামটাই ছিল কৌশিকের। আইসিইউতে শুয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে অনন্যা। অস্ত্রোপচার জরুরি! দেরি হলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। আরণ্যকেরও জ্ঞান নেই। হসপিটালের করিডোরে নিস্তব্ধ আতঙ্ক। উদ্বেগে হাঁটাহাঁটি করছে নার্সরা। ঠিক তখনই বাতাস কাঁপিয়ে গাড়ির বিকট ব্রেকের শব্দ। হিসহিসে নিঃশ্বাস টেনে কৌশিক পা রাখলো হাসপাতালের ফ্লোরে। চোখের কোণে রক্তজবার মতো লাল ছায়া, চিবুক শক্ত, কপালের শিরা টানটান। কৌশিককে একঝলক দেখলেই বোঝা যায়, ওর ভেতরে একটা ঝড় বইছে। চোখের পাতার নিচে অশান্ত পানির মতো ঘুরছে শুধু একটাই মুখ অনন্যা। আকাশি মণির চোখজোড়া আজ ঝাপসা, লালচে, তীব্র উদ্বেগ আর আতঙ্কে পোড়া।

চুল এলোমেলো, জামার বোতাম অসম্পূর্ণ! আগুনের মতো ছুটে এসেছে ভেতরে। পায়ের শব্দও মেঝেতে ছায়া ফেলে জানিয়ে দিচ্ছে এই মানুষটা তার ভালোবাসার জন্য দুনিয়া ধ্বংস করে দিতেও সক্ষম। ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে।

"অনন্যা শিকদার! কোথায় ও?"

কাউন্টারের লোকটা নাম শুনে ধারণা করতে পারলো না কে এই ব্যক্তি! অনন্যা শিকদার নামটা কি কোনো ফেমাস কোনো মেয়ের নাকি যে বললেই সে চিনে যাবে? লোকটা চিন্তিত হয়ে বললো,
"আপনি কি একটু আগে এক্সিডেন্ট যে হয়েছে তার কথা বলছেন? উমম সে তো আইসিইউতে কিন্তু অপারেশন শুরু করা হয়নি। ফরম ফিলাপ ও করা হয়নি, টাকা জমা দিতে হবে। এই নিন!"

লোকটা একটা কাগজ এগিয়ে দিলো। কৌশিক কাগজটা হাতে নিয়ে দুমড়েমুচড়ে লোকটার দিকে ছুড়ে মারলো। দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,
"কোথায় আছে ও?"

লোকটা এক মুহূর্ত স্তব্ধ। এই রকম আগুন চোখে প্রশ্ন কেউ করে? কৌশিক দু’হাত দিয়ে ডেস্কে একটা থাপ দিয়ে উঠতেই লোকটা প্রায় কাঁপতে কাঁপতে আইসিইউর দিকটা দেখিয়ে দিলো। এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে কৌশিক ছুটে গেলো সেই দিকে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল আইসিইউর দরজা। কাঁচের ওপাশে অল্প করে হলেও দেখা গেলো, অনন্যার নিস্তব্ধ শরীর, অসংখ্য তারের সংযোগ, মেশিনের একঘেয়ে শব্দ। এই দৃশ্য কৌশিকের মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটালো। মাথা ঠিক রইলো না তার। আইসিইউর দরজা দিয়ে একটা ডাক্তার তাড়াহুড়ো করে প্রবেশ করতে নিয়েছিল। কৌশিক প্রচন্ড উন্মাদনায় ডাক্তারকে টেনে ধরলো। কৌশিকের দৃষ্টিতে তখনো প্রচন্ড ঝড় বইছে ।

কৌশিকের বজ্রকণ্ঠ শুনে ডাক্তার পর্যন্ত শিউরে উঠলো।
"অপারেশন শুরু হয়নি কেন? একটা মিনিটও দেরি করলে আপনাদের এই হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেব আমি! অনন্যার কিছু হলে একজনকেও আমি ছাড়বো না।"

ডাক্তারের চোখে মুখে আতঙ্ক। উনি যথাসম্ভব শান্ত হতে বললেন কৌশিককে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ডাক্তারের কলার টেনে ধরলো কৌশিক। চড়া রাগে চিৎকার করে বললো,
"ইউ ইডিয়ট! এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। টাকা লাগলে আমি দেবো। তাও যাতে ওই মেয়েটা সুস্থ স্বাভাবিক থাকে। এই বিষয়ে আমি শিউরিটি চাই।"

"দেখুন, হসপিটালের নিয়ম অনুযায়ী ফরম ফিলাপ করুন। আমরাও রোগীদের সুস্থ স্বাভাবিক দেখতে চাই। বড়সড় এক্সিডেন্ট হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উনি বাঁচবে নাকি বাঁচবে না...."

ডাক্তার আর কিছু বলতে পারলো না। কৌশিক ডাক্তারের গলা চেপে উপরে তুলে ধরলো। কাতরাতে লাগলো ডাক্তার। কৌশিক বাঁকা হাসলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঘায়েল করে দিলো সামনের উপস্থিত সবাইকে।জোর গলায় চেঁচিয়ে বললো,
"অনন্যা যদি না বাঁচে। তোকে সেই মূহুর্তে আমি নিঃশেষ করে ফেলবো। রেডি থাক।"

ডাক্তারকে এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে দিলো কৌশিক। আশপাশের নার্স, ওয়ার্ডবয়, অনান্য রোগীর আত্মীয়স্বজন সবাই থমকে গেলো এই দৃশ্য দেখে। মুহূর্তের মধ্যেই করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো উত্তেজনার ঝড়। কারও মুখে কথা নেই। কেবল শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে সকলে।

কৌশিক কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। চোখেমুখে অগ্নি ঝরছে। কাগজপত্র, অনুমতি সব আনুষ্ঠানিকতা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফের আইসিইউর দিকে পা বাড়ালো। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎই তার পা থেমে গেলো একজনকে দেখে। সামনে থেকে বেরিয়ে এসেছে আরণ্যক। মুখ থমথমে। চোখে অস্বস্তি আর ক্লান্তি। কৌশিকের কপাল ভাঁজ পড়লো। আরণ্যক? এখানে? এই হাসপাতালেই? তার মানে অনন্যা বন্ধু বলতে আরণ্যককে বুঝিয়ে ছিল?

মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা বিদ্যুৎরেখার মতো ছুটে গেলো। সন্দেহ আর রাগ একসাথে চেপে বসলো বুকের উপর। আরণ্যক কিছুটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে নার্সকে কিছু জিজ্ঞেস করছিল। কৌশিক আর এক ফোঁটাও অপেক্ষা করলো না। দৌড়ে গিয়ে আরণ্যকের শার্টের কলার এক হাতে টেনে ধরলো। আরণ্যক থমকে গেলো। পেছনে ফিরে তাকাতেই কৌশিকের চোখের আগুনে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো তার।

দুজনের চোখের মাঝে মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত নীরবতা জমে উঠলো! প্রশ্ন, রাগ আর অস্থিরতা! আরণ্যককে টানতে টানতে নিয়ে গেলো রিসিপশনের দিকে। রাগী দৃষ্টিতে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক। আরণ্যক ঢোক গিললো। কৌশিক দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো,
"কি হয়েছিল ঘটনাস্থলে?"

"আমি নিজেই জানি না। আমি ক্যাফেতে ছিলাম। বাইরে এসেই দেখি এইসব!"

কৌশিক আবারো বললো,
"কীভাবে হয়েছে এক্সিডেন্ট?"

"আমি জানি না বলছি! আমি অনন্যার এই অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম।"

কৌশিক আবারো কঠিন গলায় বললো,
"কি হয়েছিল?"

"জানি না…!"
আরণ্যকের কণ্ঠ গিলে ফেললো আতঙ্ক।
আর কিছু বলার আগেই কৌশিকের মুষ্টির আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়লো সে মেঝেতে। চারপাশে হঠাৎ ধোঁয়ার ঘন আস্তরণ নেমে আসলো। ওদের দুজনকে ঢেকে ফেললো এক অদৃশ্য অন্ধকার। আরণ্যক চোখ মেলে চারপাশ দেখার চেষ্টা করলো। কিন্তু তার আগেই কৌশিক ঝাঁপিয়ে পড়লো। কৌশিকের দৃষ্টিতে তখন আর কোনো স্বাভাবিকতা নেই। রাগ, দুঃখ আর ভালোবাসার উন্মাদনা একসাথে জমাট বেঁধেছে। পায়ের আঘাতে আরণ্যক ছিটকে পড়লো এক কোণে। উঠে দাঁড়াতে চাইলো, কিন্তু শরীর তখন আর সায় দিচ্ছে না।
হাত জোড় করে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে বললো,
"স্যার, বিশ্বাস করুন। আমি কিছুই জানি না।"

কিন্তু আরণ্যকের অসহায় কণ্ঠ কৌশিকের কর্ণে পৌঁছায়নি। সে তখন নিজের যন্ত্রণায় অন্ধ! ভেতরের সব রাগ, অনন্যার জন্য অস্থির ভালোবাসা একসাথে ফেটে পড়ছিল। আরণ্যকের শরীরে এলোপাথাড়ি আঘাত পড়তেই থাকলো। আচমকা ছিটকে পড়া ফোনটা পকেট থেকে মাটিতে লুটিয়ে এলো। খানিকের মধ্যে কৌশিকের পা পড়লো ফোনের উপর। ভেঙে ফেটে পড়লো স্ক্রিন।
তবু তাতে আলো জ্বলে উঠতে দেখা গেলো। ফুটে উঠলো এক পরিচিত নাম। কৌশিকের ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ঘাড় বাঁকিয়ে নিচুতে ঝুঁকে তাকালো সে। ভাঙা স্ক্রিনের রেখার ফাঁক দিয়ে দেখা গেলো ভেনোরার কল।

আরণ্যকের কপাল থেকে, ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্তের রেখা গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে।শেষ লাত্থিটা মেরে কৌশিক তাকে দূরে সরিয়ে দিলো।
ব্যথায় কুঁকড়ে পড়া আরণ্যককে উপেক্ষা করে কৌশিক ফোনটা কুড়িয়ে নিলো।
কলটি রিসিভ করে কানে লাগাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক চেনা কণ্ঠ,
"তুমি কোথায়? অনন্যা ঠিক আছে?"

শীতল, শান্ত এবং সন্দেহ জাগানো সেই স্বর কৌশিকের অন্তরে আরেক আগুন জ্বালিয়ে দিলো। সে ফোনটা দূরে ছুঁড়ে মারলো। সাথে সাথেই চারপাশের কালো ধোঁয়া হাওয়ায় মিলিয়ে পরিষ্কার হয়ে উঠলো। চারপাশের মানুষের এতে হেলদোল নেই। কালো ধোঁয়ার মাঝে কি চলছিল তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, আর না পেয়েছে কোনো শব্দ। কৌশিক দ্রুত আইসিইউর দিকটায় হাঁটা ধরলো। অপারেশন এখনো চলমান। 

কৌশিক অনবরত পায়চারি করছে, মাথা কাজ করছে না ওর। ঘণ্টাখানেক পরেই ছুটে এলো নোহারা আর নিক। অনন্যার ফোন থেকে নোহারাকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছু কাজে আটকে পড়ায় নোহারার দেরি হয়ে যায়, পথিমধ্যে ফোন কলের মাধ্যমে নিককেও সবটা খুলে বলে। পরিস্থিতির ঘনঘটা দেখে কারো মুখে কথা নেই। মাথায় চিন্তা চিন্তা ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে।

নিক একসময় ব্যাকুল হয়ে কৌশিককে প্রশ্ন করলো,
"কি হয়েছে? এত বড় এক্সিডেন্ট কীভাবে?"
কিন্তু কৌশিক একটাও উত্তর দিলো না।
তার চোখে তখন শুধু একটাই বিষয় ঘুরছে! ভেনোরা! ভেনোরা ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে করতে পারলো? মন বলছে, না না কৌশিক একদম নিশ্চিত! এই এক্সিডেন্টের নেপথ্যে সে ই আছে। ভেনোরা! কৌশিকের দু’হাত মুঠো হয়ে আছে। চিন্তার ভারে কাঁধ নুয়ে পড়েছে। দেয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় ঘুষি মারলো।
হাতের পেশিতে নীল ছোপ পড়ে গেল, তবুও থামলো না সে। এই কষ্ট, এই ক্রোধ তার নিজের বুকেই সে চাপা দিতে চাইলো। ভেতরে তখনো অনন্যার অপারেশন চলছে আর বাইরে কৌশিকের বুকের ভিতরেও এক অদৃশ্য ছুরি চলে যাচ্ছে বারবার। 

প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেল। অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো নিভতেই কৌশিকের বুকের ভেতর বাজ পড়লো। দরজা ঠেলে বাইরে এলেন ডাক্তার। চোখে মুখে ক্লান্তি আর আতঙ্ক! কৌশিকের চোখে চোখ পড়তেই কিছুক্ষণ থমকে গেলেন তিনি। কিছু বলার সাহস খুঁজে পাচ্ছেন না।

ধীরে, ভারী স্বরে বললেন,
"অপারেশন শেষ হয়েছে তবে পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।"

ডাক্তারের কণ্ঠে শোনা গেল দীর্ঘ নিঃশ্বাস। এরপর তিনি পেশাদার ভঙ্গিতে বললেন,
"পেশিয়েন্টের পিঠে এবং মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লেগেছে। পিছন দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের কারণে স্পাইনাল কর্ডের উপর হাড়ের একটি অংশ সরে গিয়েছিল। হাড়ের সেই অংশ ঠিক জায়গায় বসাতে আমাদের প্রচুর সময় লেগেছে।"

একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
"সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাথায়। পিছনের অংশে শক্ত ধাক্কা লাগার কারণে ব্রেইনের একটি অংশ থেঁতলে গিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও হয়েছিল। সেই রক্ত বের করে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিষ্কার করে, মাথার ভেতর একাধিক সেলাই করতে হয়েছে।"

ডাক্তার থামলেন। চোখ নামিয়ে কৌশিকের দিকে তাকালেন।
"সত্যি বলতে, আমরা যতটা পেরেছি করেছি। কিন্তু এখন সব অনন্যার শরীরের উপর নির্ভর করছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা খুবই সংকটপূর্ণ। অনন্যা এখন আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে আছে। জ্ঞান ফিরে এলে তখন বুঝতে পারবো ওর নিউরো রেসপন্স ঠিক আছে কিনা।"

ডাক্তারের কণ্ঠে পেশাগত শীতলতা ছিল, কিন্তু দৃষ্টিতে ছিল আতঙ্ক। আতঙ্ক সাধারণত কৌশিকের জন্য ই। তখন যেভাবে মারধর করছিলো এখন কিছু না করলেই হয়।
তিনি কম্পিত গলায় বললেন,
"আপনারা চাইলে দেখে আসতে পারেন। তবে একবারেই পেশিয়েন্টকে খুব বেশি চাপ দেবেন না।"

কৌশিক নীরব হয়ে সমস্ত কথা শুনছিল। বুকের ভেতর শ্বাস জমে উঠছিল, সে বাতাসে তা ছেড়ে দিল। মুখে একটাও শব্দ হলো না। দূর থেকেই আইসিইউর কাঁচের ভেতর তাকিয়ে দেখতে পেলো, নিথর, নিস্তব্ধ, যন্ত্রণায় বিবর্ণ অনন্যা শুয়ে আছে। শরীর জুড়ে নীল-কালো ছোপ, সম্পূর্ণ মাথা জুড়ে ব্যান্ডেজ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। অনন্যার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে একটা নিস্তেজ ফুল যার এভাবে থাকার কথা ছিল না কিন্তু তাও! তাও নিস্তেজ ফুলের মতোই পড়ে আছে অনন্যা।

নোহারা আর নিক ভেতরে ঢুকে অনন্যার পাশে বসে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু কৌশিক আর পা বাড়াতে পারলো না। শরীরটা কাঠের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে। কাঁধের সমস্ত ভার দ্বিগুণ হয়ে বসলো। অজান্তেই মনে হলো এ ঘটনার পেছনে সে-ই দায়ী।

ডাক্তার চলে যাচ্ছিলেন। কৌশিক শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলো, "অনন্যার কন্ডিশন কীরকম?"

ডাক্তার দাঁড়িয়ে পড়লেন। এক নিঃশ্বাসে বললেন, "আমরা যতটা সম্ভব করেছি। কিন্তু এখন কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। রোগী এখনও রেসপন্স করছেন না। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা! হয়তো কয়েকদিন খুব সংকটপূর্ণ।"

একটু থেমে ডাক্তার ঘুরে কৌশিকের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, 
"যদি রোগী এই পরিস্থিতি থেকেও ফিরে আসে, শরীরের কিছু স্থায়ী ক্ষতি থাকতে পারে। বিশেষ করে চলাফেরা স্পাইনাল ইনজুরি থেকে পরিপূর্ণ সেরে উঠা খুব কঠিন। আর মাথার আঘাত মেমোরি লসের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।"

শব্দগুলো শিলার মতো নেমে এলো কৌশিকের মাথায়। কোলাহল ভিড়ের মাঝেও কানে কেবল ডাক্তারি সেই বাক্যগুলোই প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।

"চলাফেরায় সমস্যা হবে! মেমোরি লসও হতে পারে!"

এই বাক্যটাই বুকের ভেতর ছুরির মতো গেঁথে গেল কৌশিকের।

*****

ভেনোরা বিপরীত দিকের জঙ্গলের বাড়িটিতে বসে আছে‌। দু’হাত থরথরিয়ে কাঁপছে তার। মনে একটাই আশঙ্কা! যদি কিয়ান জানতে পারে, অনন্যার এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে তার হাত, তবে ছিঁড়ে ফেলবে ভেনোরাকে। কিন্তু এতো দিনের বন্ধুত্ব থেকেও দুদিনের মেয়েটা কীভাবে আপন হয়ে গেলো? এসব ভাবলে শরীরটা জ্বলে ভেনোরার!

দ্বিতীয়ত, আরণ্যকের উপর ভেনোরার রাগ হচ্ছে। এই নির্বোধ বালকের কারণে সব পরিকল্পনা উল্টে গেছে। সে বুঝে পাচ্ছে না ফোনটা কিয়ানের হাতে কীভাবে গেল? ভেনোরা বুঝতে পেরেছে, তখন ফোনের অপর প্রান্তে ছিল কিয়ান। সে চেনে কিয়ানকে। কিয়ানের নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত ওর মুখস্থ। কিন্তু ভেনোরার কী দোষ? ভেনোরা সবসময়েই কিয়ানের ভালো চেয়ে এসেছে। কিয়ানকে বেঁচে থাকার জন্য অনন্যাকে যেতে হবে। অনন্যা থাকলে কিয়ান থাকতে পারবে না। কোনোমতেই না। এই কারণেই ছক এঁকেছিল ভেনোরা।
যে অনন্যার শরীরে আশ্রয় নিয়েছে প্রিন্সেস আরিসার বিভীষিকা, সে প্রতিমুহূর্তে কিয়ানকে শেষ করতে উন্মুখ। কিন্তু যদি অনন্যাই না থাকে, তবে আরিসার অস্তিত্বও থাকবে না। সব হিসেব নিখুঁত ছিল। তবু কোথাও যেন সব গুঞ্জিয়ে উঠছে। সব কেমন জানি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভেনোরা অনুধাবন করতে পারছে, হাতে সময় খুব বেশি নেই। ঝড় আসবে।
আর সেই ঝড় সবকিছু ভেঙে নিয়ে যাবে। কিন্তু যাই হয়ে যাক কিয়ানের কোনো ক্ষতি না হোক!
.
.
.
চলবে......................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp