ভোর হয়নি তখনও। শুনশান, নিশুতি রাতটা রানি কামিনীর কাটলো ভীষণ ব্যথায় জর্জরিত শরীর নিয়ে। ব্যথায় অস্ফুট আর্তনাদ করলেন বহুক্ষণ। কিন্তু প্রলেপ লাগানোর জন্য কেউ ছিলো না। কেউ আসেনি কাছটায়। কেউ মাথার পাশে বসে বলেনি, এই ব্যথার জীবনে তোমার পাশে আমি আছি।
তার একান্ত যন্ত্রণা দেখলো কেবল কক্ষের প্রাণহীন দেয়ালগুলো। আর দেখলো জানালা দিয়ে আসা চাঁদের জোছনা।
৩৫....
খা খা রোদ্দুর আকাশ জুড়ে। কোথাও সামান্য মেঘটুকুর দেখা নেই। যেন ভানুর অদম্য তেজ জ্বালিয়ে দিবে চারপাশটা। সেই রোদ ভেদ করেই রানি ছুটলেন তার রাজ্যের একটি গ্রামে। যেখানের মানুষের ভেতর দেখা দিয়েছে নতুন অসুখের উপসর্গ। তাকে হুঁশিয়ার করেছিলেন মন্ত্রীমশাই। বলেছেন— ছোঁয়াচে রোগ, রানি। আপনাকেও যদি সেই রোগ আক্রান্ত করে?
রানি জবাবে তার প্রখর গর্ব বজায় রেখেই জবাব দিয়েছিলেন, আমাকে কেবল একটি জিনিসই ছুঁতে পারে, তা হলো- আমার প্রজাদের দুঃখ। ওদের দুঃখের চেয়ে বেশি ছোঁয়াচে বোধকরি কিছু নেই।
মন্ত্রীমশাই আর কিছু বলতে পারলেন না। কারণ রানি একবার যা ধার্য করেন তা বাস্তবায়ন করেই থাকেন। তাছাড়া হয়তো রানি নারী হিসেবে অন্যান্য নারীর থেকে আলাদা কিংবা উনার আচরণ অপছন্দের কিন্তু উনার শত্রুরাও এটা স্বীকার করবেন যে রানি, রানি হিসেবে অনন্য। রাজ সভায় সবার আগে যেই মন্ত্রটি উচ্চারণ হয় তা হলো প্রজাদের কল্যাণ। রাজ সভার একজন সদস্য হিসেবে মন্ত্রীমশাইয়ের এটা অস্বীকার করার জো নেই যে রানি প্রজাদেরকে তার রণমুর্তি দেখালেও, সত্যিকার অর্থে প্রজাদের জন্য তিনি অসম্ভব বিনয়ী।
রানির সাথে রানি কয়েকজন দেহরক্ষীকে নিয়ে এলেন। সাথে এলো সেনাপতি, মন্ত্রী, বৈদ্য।
গ্রামটি একটু ভেতরে। সূর্যের তেজ ঢেকে যায় এই গ্রামটিতে। গাছের ছায়াদের সরব আনাগোনা। পথের বাঁকে বাঁকে বিলের সৌন্দর্য। রানি গ্রামে যখন প্রবেশ করলেন তখন মধ্যাহ্নের দ্বিতীয় প্রহর। তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। ঘোড়াগুলো এসে থামলো গ্রামের একটি বাজারে। লোকজন কেনা-বেচায় ব্যস্ত। ঘোড়ার পায়ের বহু শব্দ সেই কেনা-বেচায় বাঁধা দিলো। আকর্ষণ সৃষ্টি করলো শব্দের উৎস খোঁজার দিকে। এবং যখন পর পর কতগুলো দেহরক্ষীর ঘোড়াসহ, রাজ সভার বিভিন্ন সদস্যদের দেখা পেলো তখন সেই মানুষ গুলোর বিস্ময়ের সীমা রইলো না। সবার আগে এসে থামল রানির ঘোড়াটি। এরপর একে একে থামলো সব ঘোড়া। এই যে সবার ঘোড়ার আগে সর্বপ্রথম রানির ঘোড়াটি থাকে সেখানেও একটি কারণ রয়েছে। রানি মনে করেন কোনো বিপদ এলে সর্বপ্রথম সেই বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন তিনি নিজে। তা-ই জন্যই তো তাকে দেওয়া হয়েছে রানির আসন।
এখন তিনিই যদি সবার আগে বিপদের দিকে এগিয়ে দেন তার ছত্রছায়ায় থাকা মানুষদের তাহলে আর নামের প্রথমে রানি সম্বোধনের তাৎপর্য রইলো কোথায়?
বাজারের সকল মানুষ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কেউ কেউ তো নিজের অবস্থান থেকে এগিয়ে এলেন রানিদের কাছাকাছি। তখনও সকলের কাছে সবটা বোধগম্য হলো না। রানি কামিনীকাঞ্চনকে এখানের অনেকে দেখেওনি এর আগে। প্রাচুর্যের আড়ালে রানির যেই জৌলুশ তা সম্পর্কে গল্পই শুনে গিয়েছিল তারা। আজ হঠাৎ রানির আগমনে সেই গল্প তাদের কাছে জীবন্ত মনে হলো। এত সুন্দর মানুষটি তাদের রাজ্যের রানি, এ যেন স্বপ্নের মতনই অবিশ্বাস্য। সবার আগে মনে যেই প্রশ্নের উদয় হলো, তা ছিলো- এত সুন্দর দেখতেও মানুষ হয়?
বাজারে সাড়া পড়ে গেলো। রানি এসেছেন খবরটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেলো চারপাশে। তা আর বাজার অব্দিই সীমাবদ্ধ রইলো না। রানিরা একদিকে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই দিক দিক থেকে ছুটে আসতে লাগলো মানুষ। কখনো রাজ প্রাসাদের সামনে গিয়ে এই মানুষটিকে দেখার সুযোগ হবে না বলেই সকলে যেন সুযোগটি হাতছাড়া করতে পারল না।
রানি দাঁড়ালেন বাজারের দক্ষিণ দিকে। বাতাস বইছে মিহি। এই গ্রামটিতে যেন স্রষ্টার আলাদা দৃষ্টি রয়েছে। নয়তো এত রোদের উত্তপ্ততা যেখানে রাজ্যজুড়ে, সেখানে গ্রামটিতে গ্রাস করে আছে একটি গহীন শীতলতা।
দেহরক্ষী হাঁক ছেড়ে বললেন, "মহারানি হাজির হয়েছেন। আপনাদের সাক্ষাৎ চাচ্ছেন তিনি।"
অবশ্য দেহরক্ষীর হাঁকের আগেই বহু মানুষের জমায়েত হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে।
কথা বললেন প্রথমে মন্ত্রীমশাই,
"আপনাদের সাথে রানি কথা বলতে এসেছেন৷ আপনাদের সমস্যার কথা জানতে এসেছেন। আপনারা একে একে গুছিয়ে সমস্যা গুলো জানান আমাদের।"
মন্ত্রীমশাই যদিও সবাইকে সমস্যার কথা বলতে বলেছেন কিন্তু কেউ আর মুখ ফুটে তা বলতে এগিয়ে এলো না। বরং সবার ভেতরে একটি চাপা গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে। কেউ বলছেন রানির রূপ নিয়ে, কেউবা বলছেন রানির ক্রোধ নিয়ে। কেউ বলছেন রানির ভয়ঙ্কর বিচারের কথা, কেউবা বলছেন রানির ভাবমূর্তি নিয়ে।
আশানুরূপ কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মন্ত্রীমশাই বিরক্ত হলেন। বেশ বিরক্ত হয়ে চাপা স্বরে বললেন,
"এদের তো নিজেদের ভেতরই কথা শেষ হচ্ছে না, রানি, আপনার সাথে কী বলবে? এরচেয়ে আগে এদের জানিয়ে আসা উচিত ছিলো। তাহলে এরা নিজেদের সর্ব কথা সম্পূর্ণ করে প্রস্তুত থাকতে পারতো।"
মন্ত্রীমশাইয়ের চাপা কণ্ঠের কথাটি রানির কর্ণগোচর হলো। তিনি কঠিন চোখে তাকালেন তাই। যার অর্থ, আর একটি বাক্যও যেন না বলে সে।
অতঃপর নিজেই এগিয়ে এলেন দু-কদম। তার বরাবরের সেই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
"প্রণিপাত সকলকে। আমি সংবাদ পেয়েছিলাম এই গ্রামটিতে নতুন একটি ব্যাধির উৎপত্তি হয়েছে। যা ছড়িয়ে পড়ছে একে একে। যার জন্য সকলে আতঙ্কিত। আমি সেজন্য এখানে এসেছি রোগটি সম্বন্ধে জানতে এবং আপনাদের আশ্বস্ত করতে। আপনারা আমাকে না জানালে আমি কীভাবে সাহায্য করবো বলুন?"
তখনও সবাই চুপ। কিন্তু রানি বিরক্ত হলেন না মোটেও। আবারও বললেন,
"আমাকে খুলে বলুন সমস্যাগুলো। আমি এসেছি সমাধান করতে। আমাকে ভরসা করুন এবং বলুন।"
এবার উপস্থিত জমায়েতের গুঞ্জন গাঢ়তম হয়ে নির্ধারিত হলো সেখানের বয়োজ্যেষ্ঠ একজন রানির সাথে কথা বলবেন। তবে রানি সম্বন্ধে আগে শোনা বহু কথা তাদের ভেতর ভয়ের উদয় করেছে। শুনেছে রানি প্রচণ্ড হিংস্র। যদি কথায় কোনো ভুলচুক হয় তবে কি তিনি রেগে যাবেন না? যদি রেগে গিয়ে প্রাণ নিয়ে নেন? এই ধারণা থেকে এতক্ষণ কেউ টু শব্দটুকু করেনি। যা রানি বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তার এই ভরসা দেওয়া এবং তার আন্তরিক বাক্যে প্রজাদের সাহস সঞ্চিত হয়েছে।
বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোকটি এসে কুর্নিশ করলেন। জোর হাতে বললেন,
"প্রণিপাত, রানি। আমি এই গ্রামেরই একজন। আমিই জানাতে চাই আমাদের সমস্যা সম্বন্ধে।"
"বলুন। আমি শুনছি।"
রানির নরম এই আন্তরিকতায় ভরসা পেলেন লোকটি। বললেন,
"গত বেশ কিছু মাস আগে আমাদের গ্রামের একজন বালককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। দু'দিন আমরা তার খোঁজ করি। বালকটির নাম ঋষি। বালকটির পরিবার ঠিক করেও ছিলেন আপনার নিকট এই তথ্যটি প্রেরণ করবেন। কিন্তু বালকটি নিখোঁজ হওয়ার তৃতীয় দিনই একটি অতি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। বালকটিকে পাওয়া যায় আমাদেরই গ্রামের পূর্বদিকের একটি দিঘির কিনারায়। জ্ঞান ছিলো না তার। যখন জ্ঞান ফিরে, তখন বালকটির কিছুই মনে নেই। আমরা সে নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি। বালকটিকে ফিরে পেয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম সকলে। কিন্তু এরপরই কয়েকদিন যেতেই দেখা দিলো বালকটির অসুস্থতা। তার জ্বর আসে এবং জ্বরের সাথে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষতর সৃষ্টি হয়। তার পরিবার তাকে গ্রামের বৈদ্যর কাছে নিয়ে যায়। বৈদ্য কিছু জড়িবুটি দিয়ে দেন। কিন্তু বালকটির ক্ষত ঠিক হওয়ার নাম নেয় না। উল্টো শরীরের ক্ষত দিনকে দিনকে ছড়াতে লাগলো আর বাড়তে লাগলো। এরই সপ্তাহখানেক পর সেই একই লক্ষ্মণ দেখা দেয় গ্রামের বৈদ্য ও বালকটির পরিবারের ভেতর। বৈদ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকেন। কোনো উপায়ন্তর হয় না। এরপর একে একে রোগটি ছড়াতে শুরু করলেই আমরা বুঝতে পারি এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ।"
রানির মনে সন্দহের উদয় হলো। ভ্রু দু'টি কুঞ্চিত করে বললেন,
"আপনারা চিন্তা করবেন না। আমরা গ্রামের দিকে একটি দাতব্যচিকিৎসালয় তৈরি করার ব্যবস্থা করছি। এবং কিছু বৈদ্য, সেবিকা পাঠাবো। আপনারা সাবধানে থাকবেন সকলে।"
রানির এই সিদ্ধান্তে যেন স্বস্তি পেলো মানুষজন।
এরপর আর ছোটোখাটো সমস্যার কথা আলোচনা হলো। রানি নীরবেই সব শুনলেন। সবশেষে বিদায় নেওয়ার পালা এলো। রানি আশ্বস্ত করলেন তিনি আবার আসবেন। তখন ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষদের সাথেও দেখা করবেন।
গ্রামবাসী উৎফুল্ল হলো। নিজেদের ভেতর ফিসফিসিয়ে রানির এহেন মমতাময়ী রূপ নিয়ে কথা শুরু করলো।
রানি হেঁটে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে উঠলেন। বাকিদের অনুমতি দিতে তারাও উঠে গেলেন। মন্ত্রীমশাই তো যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
"এবার দয়াময়ের নাম নিয়ে একবার বের হয়ে নিই, আর এখানে আমি আসছি না। এই জেনেশুনে বিপদে কেউ ঝাঁপ দেয়? রানির না-হয় কেউ নেই কিন্তু আমার তো স্বামী, সংসার আছে।"
সেনাপতি নিকটে থাকায় শুনতে পারল সেই কথা। মন্ত্রী ভয়ে যে ভুলভাল বকছে তা শুনে হেসে ফেলল সে। চাপা কণ্ঠে মন্ত্রীর কথাটিকে শুধরে দিয়ে বলল,
"মন্ত্রীমশাই, আপনি পুরুষ। আপনার স্বামী নয়, সংসারে স্ত্রী রয়েছে। ভয়ের চোটে ভুলভাল বলছেন।"
মন্ত্রীমশাই দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠলেন। কিন্তু আর কিছু বলে সময় ব্যয় করতে চাইলেন না। তার কাছে বর্তমানে এই গ্রামটি থেকে বের হওয়াই প্রধান লক্ষ্য। মানুষের মুখের কথায় রোগের যে বর্ণনা শুনেছেন, তা বুকে আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। এ আবার কেমন রোগ! রানিকে বলবেন তিনি— যেন বৈদ্যর খোঁজ না করে গ্রহাচার্যের খোঁজ করেন। রাজ ঠাকুরকে দিয়ে দেবতার যজ্ঞের আয়োজন করেন। এ কোনো রোগ নয়। নিশ্চয় কোনো অভিশাপ পড়েছে গ্রামটিতে।
রাজ বৈদ্যকেও চিন্তিত দেখা গেলো। হয়তো কস্মিনকালেও তিনি এহেন ব্যাধির কথা শুনেননি।
যেমন সশব্দে এসেছিলেন রানি, তেমন সশব্দেই বিদেয় নিলেন। পিছে রেখে গেলেন ঘোড়ার পায়ের ধ্বনি ও উড়ন্ত ধূলো।
৩৬.....
আজ রাত হলেও রাজপ্রাসাদে বিশ্রাম নেই। একটি চাপা চিন্তা প্রাসাদের প্রাচীর জুড়ে। একটি কক্ষে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বৈদ্য নিয়ে আলোচনা করছেন রাজ বৈদ্য।
রানি ছিলেন স্নানাগারে। দীর্ঘ সময় ধরে স্নান করে ফিরেছেন কক্ষে। তার ভেজা চুলগুলো ভীষণ সুন্দর তবে এই চুল দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না। কেবল একান্তই কাছের কিছু দাসীদেরই হয়।
অন্যান্য দিনের মতন আজও দাসীরা রানির চুলে ধূপের ধোঁয়া ছড়াতে ব্যস্ত। চন্দনের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে শরীর থেকে।
স্নানের পর তার শরীরে থাকে একদম নরম একটি বস্ত্র। শুভ্র রঙের সেই বস্ত্রে তাকে দেখায় স্বর্গের দেবী। পৌরাণিক কোনো নারী চরিত্র যেন সে! ভেজা চুল, শুভ্র বস্ত্র তাকে অনন্য মাত্রায় সুন্দর করে তুলেছে। মনে হচ্ছে যেন— রাজহংসীর মানবী রূপ।
সেনাপতির কণ্ঠস্বর পাওয়া গেলো। আসার অনুমতি চাচ্ছে সে। এবং রানি অকপটেই অনুমতি দিলেন।
দাসীরা তা নিয়ে চোখে চোখে ইশারায় টিটকারি করলেন। তাদের ইশারা ছিলো খুবই গভীর। অন্য ধরণের ইঙ্গিতপূর্ণ।
সেনাপতি হ্যাব্রো কক্ষে প্রবেশ করার সাথে সাথে রানি সকলকে বেরিয়ে যেতে বললেন। সকলে বেরিয়েও গেলো। বাহিরে গিয়ে চাপা কণ্ঠে হাসাহাসি করলো। মুখরোচক কথা বলল। ইনিয়েবিনিয়ে বুঝালো, স্নানের পর রানির সেনাপতির সঙ্গ প্রয়োজন হয়।
সেনাপতির হাতে আজও বিরাট একটি বস্তু। বস্তুটি নীরবে এসে রাখলেন প্রাচীর ঘেঁষে। কুর্নিশ করলেন গাঢ় স্বরে। বললেন,
"আপনার জন্য আবারও উপহার এসেছে, রানি।"
রানি তখন আরশির সামনে বসা। গায়ে কিছু একটা মাখছিলেন যার সুগন্ধ পুরো কক্ষ জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, "তৈলচিত্র এটিও?"
"হ্যাঁ।"
"আচ্ছা। তা বৈদ্যদের কোনো সিদ্ধান্ত এসে পৌঁছেছে কি?"
"হ্যাঁ।"
"কী সেটা?"
"আমাদের এই প্রাচ্যের সবচেয়ে গুণী বৈদ্যকে তারা চাচ্ছেন।"
"বেশ তো! কোন রাজ্যের বৈদ্য? আমি নিজে আমন্ত্রণ পত্র পাঠাবো নাহয়!"
"আসলে..." সেনাপতিকে একটু দিকভ্রান্ত দেখালো।
রানি আরশিতেই সেনাপতির প্রতিবিম্বর দিকে তাকালেন। আগ্রহী কণ্ঠে বললেন, "আসলে কী?"
"রানি, বৈদ্যরা চাচ্ছেন ক্যামিলাস রাজ্যের রাজ বৈদ্যকে। কারণ উনি বেশ গুণী ও খ্যাতিনামা।"
রানি স্থির তাকিয়েই রইলেন। সেনাপতি কাচুমাচু করছেন।
বেশ কতক্ষণ নীরব থেকে রানি বললেন, "আচ্ছা আমি ভেবে দেখছি। প্রজার দরকারে যা প্রয়োজন তা তো করতেই হবে। তুমি যাও এখন।"
আবারও কুর্নিশ করে সেনাপতি বেরিয়ে গেলেন। রানি উঠে দাঁড়ালেন আসন ছেড়ে। উচ্চস্বরে আদেশ দিলেন, তিনি না বলা অব্দি যেন কেউ কক্ষে আর প্রবেশ না করে।
আদেশ দিয়েই ঝটপট করে গিয়ে তৈলচিত্রটি হাতে তুলে নিলেন। বেশ বড়ো একটি চিত্র। চিত্রের উপরে থাকা কাপড়টি সরালেন আলগোছে। আজ কক্ষের হলদেটে ও রূপোলী আলোয় চিত্রটি যেন জীবন্ত ও ঝলমলিয়ে উঠল!
চিত্রটি কেমন ঘোলাটে। একটি বিরাট আসন জুড়ে বসে আছেন একজন নারী। রাজকীয় তার সাজসজ্জা! ঠোঁটে লাল রঞ্জক, চোখে সুরমা, গালের ডান দিকে একটি তিল। পায়ে আলতা, নুপুর। সবই আছে। সাথে পায়ের নিচে ঝড়ে পড়ে আছে নাম না জানা একটি সাদা ফুল। ফুলটিও সতেজ কিন্তু মূর্ছা যাওয়া।
নারীর চোখটি শূন্য, রিক্ত। এত অধিক সাজসজ্জা এবং আড়ম্বরপূর্নতা নিয়েও নারীটির কোথাও যেন একটি প্রগাঢ় শূন্যতা! মুখটি চন্দ্রের মতন উজ্জ্বল অথচ ডান গালের তিলটি সেই উজ্জ্বলতার একনিষ্ঠ কলঙ্কের মতনই জ্বলজ্বলে ও প্রাচুর্য খসে পড়া দুঃখের প্রতীক।
শিল্পী কতটা গাঢ় ভাবে এই চিত্রটিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন তা চিত্রটির প্রতিটি কোণার নিখুঁত বিন্যাসই প্রমাণ। পায়ের কাছের ফুলটি কীসের প্রতীক? নারীটির অকাল ঝড়ে পড়ার প্রতীক কি? এই রিক্ত, শূন্য, জ্বলজ্বল করা চোখ— এটি চিত্রশিল্পীর গুণের স্বচ্ছ প্রমাণ যেন। কত যত্ন করেই শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন নারীটির সমগ্র বৈরাগ্য, বিষন্নতা ও একাকীত্বকে। রানি ভেবে ভেবে হয়রান হলেন। এমন করে কেই-বা তাকে জানলো? কেই-বা তাকে বুঝলো?
চিত্রশিল্পী সেদিন এঁকেছিলে রানির অগ্নিদগ্ধ গর্ব, নিঃশব্দ শক্তিকে। আজ এঁকেছেন রানির অচৈতন্য বৈরাগ্যবাদ, অনির্দিষ্ট বসন্তহীন হওয়ার দৃশ্য। এই চিত্র তারই প্রতিবিম্ব। কিন্তু কে এভাবে রানির সত্যিকার সত্তাকে বুঝলো? বহিঃপ্রকাশ করছেও তা ধীরে ধীরে?
এবার তিনি আবারও উন্মাদ হন পরিচয় জানতে। চিত্রটির চারপাশ হাতড়ে খুঁজে বের করেন ফুলের উপর থাকা একটি লিখা, "Untimely Widowhood"।
রানি চমকে উঠলেন। বৈধব্য শব্দটি তার ভিত নড়বড়ে করে তুলল।
ঠিক সেই শব্দ দু'টির নিচেই দু'টো বাক্য লিখা। একদম টানা, হালকা বাক্যগুলো। লিখা আছে—
"সুখের অকাল বৈধব্যে,
ঝড়ে গিয়েছে একটি পুষ্প।"
·
·
·
চলবে..................................................................................