এই পৃথিবীতে সমস্যার কোনো শেষ নেই। একেকজনের সমস্যা একেক রকম। লগ্নর বাবা রিটায়ার করার পর থেকে তার সমস্যা ছিল, তার কোনো কাজ নেই। এরপর সে নানান সৌখিন কাজ করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শুরু করল। কিন্তু হার্ট এটাকের পর থেকে তার সমস্যা পরিবর্তিত হলো মৃত্যুচিন্তায়। এখন তার সারাক্ষণ মনে হতে থাকে, যেকোনো মুহূর্তে তার মৃত্যু হবে। মৃত্যুর আগে তিনি তার জীবনের একমাত্র অপূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ করতে চান অর্থাৎ লগ্নর বিয়ে দিয়ে যেতে চান। কিন্তু লগ্নর ধারণা অন্যরকম। সে বিদেশে মাস্টার্স করতে যেতে চায়। সে বিদেশে গিয়ে কোনো বিদেশি ছেলে বিয়ে করে ফেলে কি না এই ভয়ে হয়তো আগেই বিয়ে দিতে চাইছেন।
এদিকে লগ্নর মায়ের সমস্যা সে কী রান্না করবে। প্রতিদিন সকাল হলেই সে এই এক চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়ে, বাড়ির সকলকে একে একে জিজ্ঞেস করতে থাকে কে কী খেতে চায়।
লগ্নর বড় বোন লাবণ্যর সমস্যা হচ্ছে, তার বাচ্চা কিছু খেতে চায় না। বাচ্চাকে খাওয়াতে গিয়ে তার যে পরিমাণ স্ট্রাগল করতে হয়, সারা জীবনেও সেই পরিমাণ স্ট্রাগল করেনি সে।
অন্যদিকে লগ্নর বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধবের সমস্যা বেকারত্ব। ব্যাচেলর শেষ করে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে সবাই। কারো কারো সংসারের হাল ধরতে হবে।
সবার সমস্যা সবার থেকে ভিন্ন। একজনের সমস্যা আরেকজনের কাছে হয়তো অর্থহীন। অথচ যার সমস্যা, তার কাছে সেটিই অসহনীয়। লগ্নর সমস্যাটাও অনেকের কাছে অর্থহীন তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সে। দিনাজপুরের এক মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা মেয়েটি জীবনে প্রথম বাড়ির বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতে শুরু করল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত সে। সেখানেই পরিচয় হিমেলের সাথে। পর্যায়ক্রমে গভীর প্রণয়। সারাক্ষণ দুজনকে একসাথে দেখা যেত। ক্যাম্পাসের সকলেই তাদের প্রেমের কথা জানত। বছরখানেক বাদেই হিমেল পাশ করে বেরিয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর থেকেই দূরে সরে যেতে লাগলো। সম্পর্কের অবনতি হতে লাগল। লগ্ন অনেক চেষ্টা করেছে, কোনোকিছুতেই হিমেলকে আগলে রাখতে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যে চোখের সামনে দিয়ে বিয়েও করে নিল। কিছুই করতে পারেনি। আসলে যে যাওয়ার সে তো চলেই যায়। বিচ্ছেদের তিন বছর পেরিয়ে গেছে। শোকও পুরোনো হয়ে গেছে। হিমেলের প্রতি কোনো অনুভূতি লগ্নর এখন আর নেই। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে লগ্ন নতুন কাউকে গ্রহণ করতে পারছে না। বাবা নিত্যনতুন বিয়ের প্রস্তাব আনছেন, কাউকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা ভাবতেও পারছে না।
এই মুহূর্তে সে একদমই বিয়ে করতে চায় না। সম্প্রতি তার ব্যাচেলর শেষ হয়েছে। এখন বিদেশে মাস্টার্স করতে যেতে চায়। এদিকে বাবাকেও কষ্ট দিতে চায় না। তাই বিয়েতেও মানা করতে পারেনি। উলটো নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করছে। একদিন তো বিয়ে করতেই হবে। বাবা থাকতেই না হয় করুক। তাতে বাবা অন্তত শান্তি পাবে। তবে লগ্নর একটাই শর্ত তাকে মাস্টার্স এবং পরবর্তীসময়ে চাকরি করতে দিতে হবে। বাবা নিশ্চয়তা দিয়েছেন এমনটাই হবে।
এদিকে তার সমস্যাটা মা-বোন থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব কেউই বুঝতে পারছে না। সবাই বলছে বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কীভাবে ঠিক হবে? বিয়েই কীভাবে সর্বরোগের মহৌষধ তা বোঝে না লগ্ন
ঘটক ফয়েজ উদ্দিন একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আনছিলেন। লগ্নর বাবা আতিকুর রহমান সেখান থেকে বাছাই করে মেয়েকে ছবি দেখাতেন। কিন্তু এই প্রথম একজনকে আতিকুর রহমানের অসম্ভব মনে ধরেছে। এতই পছন্দ হয়েছে যে তিনি নিজে ছেলেটির সাথে দেখা করেছেন। দেখা করে ভালো লাগা আরো বেড়ে গেছে। এই ছেলেটির কথা তিনি বিশেষভাবে বললেন। ছেলেটি মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। এখন মাইক্রোসফটে জব করে। চাকরিসূত্রে সান ফ্রান্সিসকো, ক্যালিফোর্নিয়াতে আছে। এখন ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় আছে। গ্রিনকার্ড হতে আরও বছরখানেক লাগবে। কিন্তু লগ্ন যেহেতু বিদেশে পড়তে যেতে চায় তাই বিয়ের পর লগ্নকে স্টুডেন্ট ভিসায় পাঠিয়ে দিতে তিনি রাজি। একবার শুধু দেখা করানোর অনুমতি চাইলেন। পছন্দ না হলে তিনি জোর করবেন না। বাবা এমনভাবে বলায় লগ্ন মানা করতে পারেনি।
আজ ছেলেপক্ষ লগ্নকে দেখতে আসবে। বাবা অনেকদিন ধরে বিয়ের কথা বললেও কাউকে কখনো বাড়ি পর্যন্ত আনেনি। এই প্রথম। এদিকে লগ্নর মনের খুঁতখুঁতে অনুভূতিটা যায় না। সব মিলিয়ে খুব চাপ অনুভব করছে সে।
বিলকিস বেগম লগ্নর ঘরে ঢুকে বিস্মিত হলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, ‘একি লগ্ন? তুই এখনো তৈরি হোসনি কেন? ছেলেপক্ষ তো কাছাকাছি চলে এসেছে।’
লগ্ন আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। আয়নাতে মায়ের দিকে
তাকিয়ে বলল, ‘আমি তৈরি আম্মা।’
‘তুই সালোয়ার কামিজ পরে ওদের সামনে যাবি? শাড়ি পরবি না?’
শাড়ি পরে সঙ সাজতে পারব না। একটু স্বাভাবিক থাকলে ক্ষতি কী মা? আমি তো তাদের বউ হয়ে যাইনি যে শাড়ি পরতে হবে। আমি এখনো তোমাদের মেয়ে।’
বিলকিস বেগম যারপরনাই বিরক্ত, ‘উফ! তোর বাবা তোকে এত লাই দিয়ে মাথায় তুলেছে। এখন সে বুঝবে। আমি কিছু জানি না।’
আতিকুর রহমান অবশ্য এ বিষয়টা বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। মেয়ে যেভাবে চায় সেভাবেই থাকুক। ওর স্বস্তিটাই তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
·
·
·
চলবে..........................................................................