আমার মা নেই। দু-বছর আগে স্ট্রোক করে মারা গেছেন। বাবা-মায়ের সাংসারিক কলহ সেই শুরু থেকেই। ছোটবেলায় অবশ্য ভয় পেতাম, কান্না করতাম। তারপর আস্তে-ধীরে সয়ে গেছে। শক্ত হয়ে গেছিলাম আমি। এতই শক্ত হয়ে গেছিলাম যে, মায়ের মৃত্যুশোকে পর্যন্ত কাঁদিনি। লাশের পাশে বসে কল দিয়ে যাচ্ছিলাম আত্মীয়দের। দেখে যেতে বলছিলাম মা'কে শেষবারের মতো। শক্তমনেই মা'কে গোসল করিয়েছিলাম। একফোটা জলও চোখ দিয়ে পড়েনি।
মাকে হারানোর আফসোস আমার আছে। তবে ব্যথা নেই। ভেবেছিলাম পাষাণ হয়ে গেছি। বুকের ভেতর যেই হৃৎপিণ্ড নামক জিনিসটা আছে না? ভেবেছিলাম তা পাথর হয়ে গেছে।
সেদিন বাবা আর সুরমাকে একসাথে দেখে আমার ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। আমার বাবা ছিলেন আমাদের কলেজের ম্যাথ প্রফেসর। সুরমা প্রতিদিন তাই আমার সাথে বাসায় চলে আসত, এসে পড়ত। তবে পেছনে যে এসব চলছিল.. আমি টের পাইনি। আচ্ছা.. মা বেঁচে থাকলে কি এমন হতে পারত?
বুক ফেটে কান্না পেল আমার। কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে শুধালাম,
-“কেন?”
উত্তরটা সুরমাই দিলো,
-“জানিসই তো আরু, ভালোবাসা জাত-পাত, ধর্ম, বয়স.. কিচ্ছু মানে না। স্যার তো আমাদের কলেজের ম্যাক্স মেয়েরই ক্রাশ ছিল। আমারও.. তারপর ভালোবেসে..”
থামিয়ে দিলাম সুরমাকে। শক্তচোখে তাকিয়ে বললাম,
-“তোর থেকে শুনতে চাইনি। বাবা? বাবা, বলো!”
বাবা আমাকে দেখে কেবল একটা কথাই বলল,
-“তুমি আমার মেয়ে, আমার লাইফের একটা অংশ কেবল; গোটা লাইফ না। তোমাকে এসব বিষয়ে জবাবদিহিতা করার প্রয়োজনবোধ করছি না।”
আমি এক সেকেন্ডও ওখানে থাকলাম না। রুমে এসে কল দিলাম শোহানকে। একশত-এর ঊর্ধ্বে কল, সে রিসিভ করতে পারল না। সারারাত তাকে কলে ট্রাই করে গেলাম। রিসিভড হলো না। সম্ভবত ব্যস্ত। আমি রাতটা কোনোমতে পাড় করে ভোর হতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। নিজ উদ্যোগে বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে চলে গেলাম সোজা চট্টগ্রামে। সেখানেই গিয়েই খেলাম প্রথম ধোঁকাটা।
বাংলালিংকে “বন্ধু তুমি আমার” সার্ভিসটা তখন বেশ জনপ্রিয়। নাম, বয়স, জেন্ডার, জেলা এসব দিয়ে প্রোফাইল খোলা যেত। সেভাবেই একদিন শোহানকে পেয়েছিলাম আমি। সাতদিনের চ্যাটে মনে হলো, সে আমার কতই না আপন! দুইজন দুইজনের নাম্বার শেয়ার করলাম। শুরু হলো দুরুদুরু বুক নিয়ে রাতের পর রাত জেগে কথা বলা। এখন এই একটা মানুষই আমার সবচেয়ে আপন। এই মানুষটাকে ছাড়া আর কাউকে ভরসা করতে পারি না। তাই তো ছুটে এসেছি চট্টগ্রামে।
আমি যখন চট্টগ্রামে পৌঁছালাম, তখন বাজে দুপুর দুটো। গতরাত থেকে না-খাওয়া পেট, অনির্দিষ্ট গন্তব্য ও কাঁপতে থাকা বুক নিয়ে আমি আবারও কল দিলাম শোহানকে। এবার রিসিভ হলো। চাপা স্বরে সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“আরু, তোমাকে বলেছিলাম আমি গ্রামে এসেছি। বাবার বাসায়। কল দিও না। তারপরও কেন দিচ্ছো এত? কী হয়েছে?”
শোহান চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম শহরে একা থাকত বলে এতদিন অফটাইমের সবটুকুই কথা হতো। বাবার কাছে উইকেন্ডে যায়, তখন কথা হয় না। শোহান গতকাল যে গ্রামে গিয়েছে, ভুলেই গেছিলাম। আমি অসহায় গলায় বললাম,
-“তোমাকে ভালোবাসি, শোহান।”
শোহান কিছুক্ষণ চুপ থাকল। একটু আগে যতটা ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল, এখন তার চেয়েও আস্তে করে বলল,
-“আমিও ভালোবাসি, আরু।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
-“আমি চট্টগ্রামে চলে এসেছি, শোহান। চলো বিয়ে করি।”
যেন তার মাথায় বাজ পড়ল! অবাক, বিস্ময়, চমক, রাগ, তেজ সব মিশিয়ে শোহান বলে উঠল,
-“প্লিজ টেল মি আরু, তুমি প্র্যাংক করছো!”
-“না। প্র্যাংক করছি না। আমি সত্যিই চট্টগ্রামে।”
-“বাবার সাথে এসেছো?”
-“না। একা।”
-“পাগল হয়ে গেছো তুমি? বয়স কত তোমার? দুইদিনের প্রেমে বিয়ে করতে চলে আসছো? এই? গাঁধা তুমি?”
আমি কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বসে পড়লাম। কান্নাভেজা গলায় বললাম,
-“আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই, শোহান। এমন বোলো না। একটা মানুষকে চেনার জন্য তিনটা দেখা যথেষ্ট। আমাকে তো চেনো, তাই না? বলো? আমি তোমার বাড়ির এক কোণায় পড়ে থাকব। আমাকে নাও, প্লিজ! প্লিজ বিয়ে করো।”
শোহানের রাগ তবু কমল না, সে জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার বয়স কত? আঠারো হয়েছে?”
-“হয়নি। সতেরো কেবল! বিয়ে করাটা সম্ভব নয়? সম্ভব তো! তুমিই না বলেছিলে...”
আমার কথার মাঝখানেই সে আবার বলে উঠল,
-“সম্ভব না।”
-“কেন সম্ভব না?”
আমি থামলাম, পরক্ষণে আবারও বলে উঠলাম,
-“আমি এতদূর এসেছি। প্লিজ দেখা করো আমার সাথে।”
-“তুমি চলে যাও।”
-“আমি কই যাব? কার কাছে যাব? জানো কী হয়েছে! আমার বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। তা-ও আবার আমারই বান্ধবীকে! আমি প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছি, শোহান। আই নিড ইউ।”
অঝোরে কান্না করতে লাগলাম ফুটপাতের ধারে বসে। শোহান আমার সেই কান্নাকে তোয়াক্কা না করে হিসহিসিয়ে বলল,
-“আর কোনো কল যেন না আসে আমার ফোনে। আমি তোমাকে এই মুহূর্তে ব্লক করে দেবো।”
ওর কথা! ওর শব্দ! মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা যেন ছুরিকাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। বড়ো অসহায় লাগছে নিজেকে। এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় লাগছে নিজেকে। আমি অনুনয় করতে লাগলাম,
-“শোহান, প্লিজ...”
শোহানের শক্ত গলা,
-“আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।”
-“কেন?”
এ-বার ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা মেয়েলি আওয়াজ, যা আমার গোটা দুনিয়াকে এফোড়-ওফোড় করে ফেলতে সক্ষম। আমি ভেঙে গুড়িয়ে গেলাম। সেই মেয়েটা বলল,
-“আপনি কার সাথে কথা বলছেন, আশিক? কাকে বিয়ে করবেন না? কী আশ্চর্য! কী বলছেন এসব? ফোন আমাকে দিন তো! দিচ্ছেন না কেন? দিন!”
মেয়েটা সম্ভবত হাতাহাতির পর্যায়ে এসে শোহানের থেকে ফোন নিয়ে নিয়েছে। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“হ্যালো! কে?”
আমার কান্না ততক্ষণে থেমে গেছে। বয়সের প্রেক্ষিতে মানুষ বড়ো হয় না। বড়ো হতে দুয়েকটা ধাক্কাই যথেষ্ট। সম্ভবত সেই ধাক্কার ফেইজে এসে বসে আছি আমি। বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার। আমি ভাঙা গলায় সেভাবেই প্রত্যুত্তর করলাম,
-“আমি? আমি আরাধ্যা।”
-“আশিকের সাথে কেমন পরিচয়?”
আমি চমকে গিয়ে বললাম,
-“আশিক! আশিক কে? আমি শোহানকে কল দিয়েছি। ও শোহান...”
মেয়েটা রুঢ়ভাবে বলল,
-“এটা শোহানের নাম্বার না, আরাধ্যা। ভুল নাম্বারে কল করেছেন। এরপর থেকে কাউকে কল দিলে ভালো করে দেখে নেবেন।”
মেয়েটার কথা বলা শেষ হতেই ওপাশ থেকে শোহান... সরি! আশিক বলল,
-“চিনি না, রং নাম্বার! রং নাম্বার থেকে কল দিয়ে বলছে বিয়ে করবে। এজন্য আমিও বললাম, বিয়ে করতে পারব না।”
সম্ভবত এ কথায় শান্ত হয়েছে মেয়েটা। আমি শান্ত হতে পারলাম না। ওর অকস্মাৎ পালটে যাওয়া যেন আমার বুকের ভেতরে তীব্র জলোচ্ছ্বাস। সবটা লণ্ডভণ্ড করে ছাড়ল! আমাকে ভেঙে দেওয়ার শেষ অস্ত্রটা এবার মেয়েটা নিজেই চালালো,
-“এই নাম্বারে আর কল দেবেন না, আরাধ্যা। আমি রিমি, আশিকের স্ত্রী।”
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………