রেহতাব মাতবরের বউ - পর্ব ০৩ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প


‘মাতবর সাহেব, আপনার মতন মানুষই হয় না। এতো বিনয়ী। আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে আমি মুগ্ধ। আপনার কাছে আমি মানুষটা একদম সূর্যের মতো সত্য। কাজটা সফল হইলে আয়ের ত্রিশ ভাগ আপনার। এই আমার, মীর্জা করিমের জবান। এই জবানের নড়চড় হইবো না, ইনশাআল্লাহ্।’

রেহতাব মৃদু হাসে। হাঁটুর ওপরে থাকা ডান হাতের আঙুল গুলো নাড়িয়ে দৃঢ় স্বরে বলে, ‘ইনশাআল্লাহ্।’

করিম সাহেব উঠতে উঠতে বলেন, ‘তাইলে আজ উঠি মাতবর সাহেব। আপনারে আর পেরেশানি না করি।’

রেহতাবও উঠে দাঁড়ায়। পিঠের পেছনে দু’হাত গেঁথে সমানতালে এগোয় মীর্জা করিমের সাথে। করিম সাহেব দুয়ারের কাছে এসে চাপাস্বরে বলে,

'মাতবর সাহেব, আমার অনুরোধটা যদি একটু ভাইবা দেখতেন?’

রেহতাব কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাবে বলে, ‘অন্য একদিন এই ব্যাপারে কথা বলবো। সোহেব, মীর্জা সাহেবকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে আয়।’

সোহেব দাঁড়িয়ে ছিলো দুয়ারের কাছে। ‘জি, মালিক।’

মীর্জা করিম যেতেই রেহতাবের বন্ধুত্বপূর্ণ মৃদু হাসির ‘স’ও রইল না। নির্বিকার মুখে গিয়ে বসল চেয়ারে। গোল টেবিলে রাখা বইটা উঠিয়ে নিলো হাতে। বেশিক্ষণ পড়তে পারল না। চোখ দুটো বুজে এলো। বিস্তৃত আকাশের বুকে চাঁদ ডুবে সূর্য ওঠার সময় বেশি দূরে নেই। রাতের আঁধার এই কাটবে বলে। বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে থাকা রেহতাবের ক্লান্ত, নির্ঘুম চোখ দুটো বুজে আছে। ঊরুতে উল্টিয়ে রাখা একটি ইংরেজি বই। বইয়ের নাম— ‘ওয়ার ওভ থ্রোন’। ইংল্যান্ডের আগের ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা। দুর্দান্ত লেখকের লেখার হাত। বিশ্লেষণ, বর্ণনা পড়লে মনে হয় লেখক নিজের চোখের সামনে কাহিনী দেখে লিখে সাজিয়েছেন। এতটাই বাস্তবিক, জীবন্ত। অবসর সময়তেও কোনো না কোনো কাজে রেহতাব ব্যস্ত থাকে। আরাম করে দীর্ঘসময় বই পড়াটা ঠিক হয়ে ওঠে না। প্রতিদিন পাঁচ-দশ মিনিট পড়েই একটা বই শেষ করতে যত মাসের প্রয়োজন হয়, এরচেয়েও বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়ে রেহতাবের। ‘ওয়ার ওভ থ্রোন’ সে পড়তে ধরেছিল গত বছরের বৈশাখে। গুনে গুনে এক বছর শেষ। বইটি প্রায় শেষের দিকে এলেও, আরও কিছু মাস সম্ভবত লাগবে।

‘মালিক!’

সোহেবের ডাকে রেহতাব চোখ মেলে চায় না। সঙ্গে সঙ্গে জবাবও দেয় না। তার মাথাটা ধরেছে ভীষণ। কড়া লিকারের একটা চা হলে ভালো হতো। বাড়িতে থাকলে এই ভাবনাটুকু মাথায় আসার আগে চা তার সামনে হাজির হয়ে যেতো। তপোবর্ণা চিন্তায় অস্থির হতো। মিহি কণ্ঠে শুধাতো,

‘শুনছেন? মাথাটা মালিশ করে দিই, আপনার?’

রেহতাবের বন্ধ চোখের পাতায় ভাসল চাঁদের মতন সুন্দর একটা মুখ। এতো নিখুঁত ওই মুখের একেকটি গড়ন। যেন বিধাতা বেশ যত্ন নিয়ে, সময় নিয়ে নিজ হাতে বানিয়েছেন। এইমুহূর্তে সোহেব ঢোক গিলে পুনরায় ডাকল,

‘মালিক!’

রেহতাব প্রত্যুত্তরে নাকমুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ করল,

 ‘উম? কী হয়েছে?’

সাথে সাথে সোহেবের জবাব না পেয়ে রেহতাব চোখ মেলে চায়। সোহেব তখন দ্বিধা ছেড়ে কাছে এগিয়ে আসে। জানায়,

‘ছোটো সাহেব ফিরেছেন। কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে পৌঁছেছেন। আর—’

রেহতাব নির্বিকার ভাবে ডান ভ্রু তুলতেই, সোহেব দ্রুত কণ্ঠে রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোর ছোটোখাটো বিবরণ করে। যেভাবে তাদের লোকেরা জানিয়েছে। রেহতাব কিছু সময় চুপ থেকে গভীর কণ্ঠে জানতে চায়, 

‘ও ঠিকাছে?’

সোহেবের ভেতরটা বিষে নীল হয়ে গেল। প্রেমে পড়লে মানুষ দিনকানা, রাতকানা… সবরকম কানা হয় তা আবারো প্রমাণিত। বছর দুয়েক আগে তাদের গ্রামের চৌকাঠে এক ভণ্ড বাবা নামক প্রেমগুরু বসতেন। যোয়ান ছেলেরা তার কাছে প্রেমের বিদ্যা নিতে যেতো। আগ্রহের বসে সোহেবও রোজ গিয়ে সবার সাথে মিশে প্রেমের বিদ্যা নিতো। ওই প্রেমগুরুই বলেছিলেন,

‘সদ্য প্রেমে পড়া পুরুষ আর ধান খাওয়া গোরু..দুটোই সমান।’

তার মালিকের ক্ষেত্রেও বুঝি এক। খান বাড়ির সাথে তাদের সম্পর্ক এমনিতেই খারাপ। এবারে আরও অবনতির দিকে নেমেছে। জনসম্মুখে এতো ফসল পুড়ানোর ফলাফল নিশ্চয়ই ভালো হবে না। গ্রামে নির্ঘাত বৈঠক বসবে, আলোচনা হবে। সম্ভবত চাপে পড়ে তাদের দায়ভারও নিতে হতে পারে। অথচ এতো ঝামেলা, সবকিছু এড়িয়ে তার মালিকের প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে, ‘ও ঠিক আছে?’ তো থাকবে না? রণবীরের মতন এক পাঠাকে তো সুরক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। যার পাশে ওই পাঠা আছে, তার আবার কী হবে? এতকিছু সোহেব মনে মনেই আওড়ানোর স্পর্ধা রাখে। চোখমুখে এতো কথার একটুও প্রতিফলন ঘটতে দেয়নি। বাধ্য ছেলের মতন জানাল,

‘মালকিন ঠিক আছে, মালিক। কিন্তু…’

রেহতাব তখন চিন্তিত। কপালে চার পাঁচেক ভাঁজ পড়েছে। তপোবর্ণার ওপর তার রাগ, অভিমান তো চিন্তার উর্ধ্বে নয়। সে বিড়বিড়িয়ে বলে,

‘গ্রামে ফিরব। গাড়ি বের কর।’

জুবায়ের এসে দাঁড়িয়েছিল সোহেবের পাশে। মালিকের ক্লান্ত মুখ দেখে সাহস করে বলল,

‘মালিক, একটু ঘুমিয়ে নিতেন আগে?’

রেহতাব চোখ তুলে তাকাল। ওই তাকানোতেই শুকনো হাসে জুবায়ের। ফাঁকা গলায় হেসে বলল,

‘মানে আমি কইতেছিলাম মালিক, বাড়ি ফিরা ঘুমাইলে আপনার ঘুমটা ভালো হইবো।’

রেহতাব দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। নাকমুখ শব্দ করল অস্পষ্ট ভাবে, ‘উম।’

সোহেব, জুবায়ের আলগোছে চোখাচোখি করে বেরিয়ে গেল। তাদের হৃদয় তখন বিষের নীল বেদনায় রাঙা। বিয়ের পর মালিক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তাদের আর ভালো পায় না।

—————

রাতের রহস্যময় গাঢ় অন্ধকার কেটে ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণ এসে ছুঁয়েছে মাতবর বাড়ির প্রধান ফটক। দুইপাল্লা, ভারী এবং হাতির সমান উঁচু ফটক লোহার কড়িকাঠ দিয়ে তৈরি। বিশাল সেই ফটকের গায়ে ঘন কালো রঙ। প্রত্যেক মাসে বার্নিশ করে তাজা নতুনের মতন রাখা হয়েছে। ধুলোময়লা মাত্র নেই। স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। দরজার মাথায় খোদাই করে আরবি হরফে প্রতিকচিহ্ন হিসেবে লেখা—‘মাতবর বাড়ি।’ নামের গোটাগোটা অক্ষরগুলো স্বর্ণের রঙের। সূর্যের আলোয় জীবন্ত হয়ে জ্বলজ্বল করছে। স্বীকৃতি দিচ্ছে আভিজাত্যের, প্রভাবশালীত্বের—আকাশসম অভিলাষী দাপটের। বাইরে থেকে দেখলেই অনুমান করা যায় এখানের প্রধান এমন কেউ, যাঁর কথা মানে আইন, শৃঙ্খলতা…বাধ্যতা। 

আপাতত অবাধ্যের মতোই রাজকীয় ফটকের সামনে বসে দাঁত মাজছে বুলবুল। ওর পরনের লুঙ্গিটার বেহাল অবস্থা। গায়ে কোনোরকমে পুরাতন এক ফতুয়া জড়ানো। ঘুমঘুম চোখজোড়া ভালোভাবে তাকাতে পারছে না। এহেন দৃশ্য সাতসকাল বেলা দেখতেই রঞ্জতের মাথাটা ব্যথা করতে শুরু করল। তার ভালো ঘুম হয়নি। হওয়ার কথাও না। একদিকে জখ মিত ভাতিজার চিন্তা, অপরদিকে মালিকের অবাধ্য হওয়ার ভয় কুড়েকুড়ে খাচ্ছে ভেতরটা। মালিক কবে গ্রামে ফিরবেন, জানা নেই তার। তবে যখনই ফিরুক, শাস্তি তো বরাদ্দ প্রায়। নিয়মনীতির ভাঙন মোটেও বরদাস্ত করেন না। সেখানে রাতের আঁধারে সদরদরজা মেলে দিয়ে এতোগুলো লোকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিয়েছে। অগত্যা আজ তার মেজাজ মোটামুটি আগুনের মতো গরম। বুলবুলের এমন কার্যক্রম অন্যদিন এড়িয়ে গেলেও, আজ আর এড়ালেন না। বরঞ্চ লাঠিটা তুলে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে ওর পেছনে এসে দাঁড়ালেন। উঁচু করে রাখা পাছাটায় ঝড়ের বেগে ছোঁয় তার লাঠির আঘাত। বুলবুল আর্তনাদ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আহাম্মকের মতো কিছুক্ষণ দেখল রঞ্জতের নির্ঘুম মুখটা। পরমুহূর্তেই খ্যাঁক করে ওঠে,

‘পাগল হইয়া গেছো? মার লা কেনে তুমি আমারে? আমি কি তোমার মাইয়ার জামাই যে যখনতখন মার বা!’

রঞ্জত মুখটা বিকৃতি করে ফেলল, ‘যেই না চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা। আয়নায় চেহারা দেখোস নিজের? আমার মাইয়ার জামাই হবি? লম্পটের ঘরে লম্পট, অসভ্যের ঘরে অসভ্য— তুই কী মানুষ হবি না? এহানে বইসা তোর দাঁত মাজা লাগব কেনো?’

থমথমে মুখ করে ফেলা বুলবুল ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার কোন বাড়া ভাতে আমি ছাই দিছি কউ দেহি? সাতসকাল বেলায় আইসা আমারে ঝাড়তেছো, মারতেছো! আল্লাহর এই পবিত্র বান্দা —আমি তোমার এই অত্যাচার মুখ বুইজা মাইন্না নিলেও আমার আল্লাহ মাইনা নেব না। বুইঝো!’

রঞ্জত চোখমুখ কুঁচকে কুকুর তাড়ানোর মতন হাত নাড়িয়ে বললেন, ‘যা সামনে থেইকা সর তুই। যেদিন মালিকের সামনে পড়বি, ওইদিন বুঝবি ঠ্যালা। কত ধানে কত চাল হাড়েহাড়ে টের পাবি। জিপটা একেবারে তোর ওপরে চড়াই দেবে নে। এই দুয়ার কী তোর দাঁত মাজার জায়গা? ফকিন্নির ঘরে ফকিন্নি।’

বুলবুলের মন খারাপ হলো। ফিসফিস করে বলল, ‘তুমিতো বড়োলোক— তোমার মাইয়াডারে আমারে দেও, তাইলে আমিও আর ফকিন্নি থাকমু না।’

রঞ্জত প্রত্যুত্তরে লাঠিটা উঠাতেই বুলবুল দৌড়ে পালাল। বুলবুলের জন্ম মাতবর বাড়িতেই। মাতবর বাড়ির হয়ে কাজ করছে ছোটো থেকেই। ওর মা শারমিন ঝুমা, এই বাড়ির কাজের লোক শতাব্দী ধরে। বিশ্বস্ত একজন। কাজের লোকদের মধ্যে খুব মান্যগণ্য করা হয় তাকে। মায়ের সুবাদে বুলবুলও বড়ো হয়েছে খোলামেলা স্বভাবে। এই আধবুড়োটা বাদে সবাই তাকে বেশ আদর, স্নেহ করে। বুলবুল চাকরবাকর হলেও, এই বাড়িকে চুপিসারে মনের এক কোণেতে নিজের বাড়িই মনে করে। করবে না? জন্ম এখানে, বড়ো হওয়া এখানে… এমনকি জন্মের সময়তে তাকে নাকি মালিক কোলেও নিয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন, শতাব্দ। স্কুলের হেডমাস্টার বলেছেন, এটা বাংলার ক্ল্যাসিক্যাল নাম। আলাদাই মাধুর্যতা আছে এই নামের। নাম শুনলেই, মানুষ গুরুত্ব দেবে, মান্য করবে। নামে নাকি মানুষের ব্যক্তিত্ব অল্প হলেও ফুটে ওঠে। ভাবলেই খুশিতে বুলবুলের ম রে যেতে ইচ্ছে করে। তার এতো সুন্দর নাম! অথচ সবাই ডাকে বুলবুল। শতাব্দ নাকি কঠিন নাম। পানির মতন এমন সহজ, সরল…সুন্দর নামটা উচ্চারণ করতে পারে না! এটা কোনো কথা হলো? যত্তসব! 

পিছু রঞ্জত চ্যাঁচিয়ে ডাকলেন, ‘এই ছ্যাম্রা, ওদিকে কই যাস? তোর লইজ্ঞা কাজ আছে অনেক। তাড়াতাড়ি আয়।’

বুলবুল অদূর থেকেই পাল্টা শুধাল, ‘আগে ওয়াদা করো, ওই লাঠি তুলবা না।’
‘তুল্মু না। তুই আয় রে বাপ।’

বুলবুল চটজলদি দৌড়ে গিয়ে চড়ে বসে রঞ্জতের পিঠে। তার বয়স্ক গলাটা জড়িয়ে ধরে। যোয়ান ছেলের ভারে মৃদু ঝুঁকে গেলেও শেষমেশ ওকে পিঠে নিয়েই হাঁটা ধরলেন রঞ্জত। 

'মালকিন কইছিলেন লাইব্রেরি যাইতে। তার কিছু বই লাগব।’

রঞ্জত ভড়কে যায়, ‘আহম্মকের ঘরে আহম্মক, তুই আগে কবি না? কহন কইছে?’

বুলবুল হেসে ফেলল শব্দ করে। মালকিনরে এতো ভয় পাওয়ার কী আছে? সবাই জমের মতন ভয় পায়। অথচ মালকিন তো খুব মিষ্টি। বুলবুল বলল,

‘গতকাল দুপুরে। আইজ বিকালে যাইব।’
‘মালকিনও যাইব?’
 
বুলবুল মাথা দোলাল। কিন্তু তার মন বলছে, আজ মালকিন যেতে পারবে না। গতকাল এমন ঝামেলা হলো। আজ মালিকের ফেরার সম্ভাবনা গাঢ়। একই ব্যাপার রঞ্জতও বুঝেছে। ভয়ে কেঁপে উঠছে তার হৃৎপিণ্ড। 

—————

কোহিনূর বেগম ফজরের নামাজ শেষে আর ঘুমাতে পারেন না। অনেকটা সময় ধরে জায়নামাজে বসে তবজি গুনেন। আজও ব্যতিক্রম নয়। তবে আজ আর তার মন বসছে না। ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করছে। অশান্ত লাগছে ভেতরটা। অশান্তি নিয়ে ইবাদতে বসলে মন পানির মতন শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আজ হচ্ছে না! পীড়া হচ্ছে, বিশ্রী এক পীড়া। পুরনো দাগের ভেতরে যেন আবার আঘাত করা হয়েছে। সেই কী যন্ত্রণা! অগত্যা তিনি তবজিতে চুমু খেয়ে জায়নামাজ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ান। একটু হাঁটার চেষ্টা করেন। তার ঘরটা বেশ যত্ন করে বানানো হয়েছে। নিচ তলার ভেতরের গভীরে খোলা ময়দানের মতন বানানো এই ঘরে আলো-বাতাসের ত্রুটি নেই। জানালা দিয়ে দেখা যায় পেছনের বড়ো পুকুরটা। পুকুরের জল পরিষ্কার। একসময় মাছ চাষ হলেও, এখন হয় না। যত্নে রাখা হয়। এরজন্য পানিটা সাদা ফকফকে। সূর্যের কিরণ গিয়ে ছুঁয়েছে পুকুরে জল। এসময়ে পায়ের শব্দ শুনে ফিরে চান। দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে তপোবর্ণা। সিল্কের লাল রঙের একটা শাড়ি পরনে। মাথায় ঘোমটা টানা। সদ্য গোসল সেরেছে। সাতসকালে এমন পরিপাটি, অল্পবয়সী সুন্দরী পুত্রবধূ দেখলে এভাবেই মনটা ভালো হয়ে যায় কোহিনূর বেগমের। তপোবর্ণার পেছনে চাঁদ, রূপালি। ওদের হাতে চা-পানি। কোহিনূর বেগম শুধান,

‘বিলেত ফেরা নবাবজাদা কী উঠেছে, বড়ো বউমা?’ 

তপোবর্ণা শ্বাশুড়ির প্রশ্নের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারে না। সচরাচর প্রত্যেকটি প্রশ্নের জবাব তার কাছে প্রস্তুত থাকে। তবে ওই লাটসাহেব যে এসেছে কখন তাইতো জানে না সে। এমন ভোরসকালে উঠেছে কি-না কীভাবে জানবে? দ্রুত বাঁকা চোখে চাঁদের দিকে চাইতেই চাঁদ কাছে এসে চাপাস্বরে খুলে বলে,

‘মধ্য রাইতে আইছে সাহেব। এহনো ওঠেনাই। দরজায় খিল দেয়া। কী যেন একটা টানায়া রাখছে দরজার বাইরে। ইংরেজিতে লেখা। আমি কিচ্ছু বুঝিনাই মালকিন।’

তপোবর্ণা রূপালির হাত থেকে পিরিচ সমেত চায়ের কাপটা নিয়ে এগিয়ে গেল কোহিনূর বেগমের কাছে। এগিয়ে ধরা চায়ের কাপটা নিতেই— শাশুড়ির প্রশ্নের জবাবে তপোবর্ণা বলল,

‘এখনো ঘুমিয়ে আছে।’

কোহিনূর বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তার চোখমুখ ক্লান্ত। বোধহয় রাতে ভালো ঘুম হয়নি। তপোবর্ণা নরম কণ্ঠে শুধায়,

‘রাতে কী ঘুম হয়নি, মা?’

সকালের চা-টা কোহিনূর বেগম তপোবর্ণার হাতেই খান —যবে থেকে তপোবর্ণা বউ হয়ে এই বাড়িতে প্রবেশ করেছে। তবে থেকে এই বাড়ির দায়িত্বও তপোবর্ণার কাঁধে। এমন নয় যে বাড়িতে আর পুত্রবধূ নেই। আছে, তবে মাতবর বাড়ির কিছু নিয়মকানুন রয়েছে যা যুগযুগ ধরে পালন করে এসেছেন। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে…বাড়ির বড়ো বউয়ের হাতেই থাকবে সকল কিছুর দায়িত্ব, বাড়ির চাবিকাঠি। কোহিনূর বেগমের বয়স হয়েছে। দুর্বল পা-জোড়া বেশিক্ষণ চালাতে পারেন না। মাঝেমধ্যে মনে হয় পা জোড়া অবশ। কিছুই অনুভব করতে পারেন না। এই অবস্থায়, পুত্রবধূরাই তার একমাত্র আস্থা, ভরসা। তার ওপর পুত্রবধূ হিসেবে তপোবর্ণা অন্যরকম, অন্যান্য। তিনি অনেক আগেই আলমারির চাবিও বুঝিয়ে দিয়েছেন। নিরাশ করেনি তপোবর্ণা। শুধু একটু…দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ভদ্রমহিলা। রসিয়ে বলেন,

‘কীভাবে হবে, মা? আপনি আমায় শান্তির ঘুম কী ঘুমাতে দেন? আমার জীবনে অশান্তির তো অভাব নাই। এর ওপর আপনি নতুন যোগ হয়েছেন। আপনার কাণ্ডকারখানা তো দেয়ালে খোদাই করে সাজিয়ে রাখবার মতন।’

তপোবর্ণার চোখ দুটো ছোটো ছোটো হয়ে আসে। তবে সে বেশ বাধ্য ভাবে নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে নেয়,

‘আমার ভুল হয়েছে। ওমন আর হবে না, মা।’

কোহিনূর বেগম চেয়ারে গিয়ে বসেছেন। পূর্বে সহস্রবার বার শোনা কথাগুলো ফের শুনে বিরক্তই হলেন,

‘একই কথা বলতে বলতে তুমি বিরক্ত না হলেও, আমি হয়েছি।’

তপোবর্ণা শাশুড়ির মনোরঞ্জনের জন্য বাধ্য পুত্রবধূর মতন নতুন শব্দের ব্যবহার করে, 

‘খুব সম্ভবত এমন কাজ আমি আগেও করেছি, গতকালও করেছি। এতে আমি লজ্জিত। আমার কারণে বাড়ির সম্মান নষ্ট হচ্ছে। মা, আমি চেষ্টা করবো এমনটা না করার—’

কোহিনূর বেগম যেন পুনরায় বিশ্বাস করবেন এমন ভঙ্গিতে তপোবর্ণার চোখে চাইতেই, তপোবর্ণা বলে,

’যদি আমাদের পেছনে না লাগে।’

কোহিনূর বেগম বেজার মুখে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। চায়ের কাপে চুমুক বসান। বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘জানি না আমি কিছু। রেহতাব আসুক। যা করার ওই করবে।’

তপোবর্ণা মাথা দুলিয়ে কোহিনূর বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো দ্রুত। তার র ক্ত লাল রঙের শাড়ির আঁচল মাথা থেকে পড়ে গেছে কিছুক্ষণ হবে। চিন্তায় মগ্ন সে হেঁটে চলেছে বিশাল বারান্দা জুড়ে। লম্বা চুলগুলো ছাড়া। কোমরের নিচে তারা হাঁটার তালে নৃত্য জুড়েছে। আঁচল ছুঁয়েছে বারান্দার জমিন। দু’হাত ভরতি সোনার চুড়ি গুলো হঠাৎ হঠাৎ শব্দ তুলছে। রূপালি মালকিনের অন্যমনস্কতা বুঝে বলে,

'মালকিন, আজ মালিকের ফেরার সম্ভাবনা আছে।’

তপোবর্ণার চিন্তা যেন ফানুস। মুহূর্তে বাতাসে উড়ে গেল। সে খুব উৎসুক হয়ে ফিরে তাকাল। এক সুন্দর পাথরের মূর্তিতে যেন হঠাৎ প্রাণ ঢুকেছে। এমনই মনে হলো রূপালির। সূর্যের কিরণ এসে ছুঁয়েছে তপোবর্ণার জ্বলজ্বল করা পাথরের নাকফুল। তখনকার নির্বিকার ভাব আর নেই তপোবর্ণার। অথৈ জলের মতনই প্রাণে থৈথৈ করছে তার সর্বাঙ্গ। খুব চঞ্চল কণ্ঠে বলল,

‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। ঘরটা পরিষ্কার করতে হবে ভালোভাবে। সামান্য ময়লাও সহ্য করতে পারেন না। বিরক্ত হোন। বাজারে পাঠাতে হবে নুহুলকে। টাটকা সবজি সকাল সকাল না গেলে পাওয়া দুষ্কর। আমি একটা লিস্ট করে দিচ্ছি। নুহুলকে দিয়ে এসব আনিয়ে ফেল।’

একই দৃশ্য সহস্ররূপে দেখবার পরও চাঁদের আশ্চর্যতা যায় না। তার মালকিনের স্বামী প্রীতির মাত্রা একটু বেশিই না? ওর কাছে মোটেও সাধারণ মনে হয় না। ওর সতেরো বছরের জীবনে এমন স্বামী ভক্ত মেয়েমানুষ ও দুটো দেখেনি। অবশ্য যেসব কাণ্ডকারখানা এর আগে করেছে ওসব শুনলে মানুষের এমন চিন্তা আসাটাই বুঝি স্বাভাবিক। চাঁদের মনে পড়ল মাস ছয়েক আগের ঘটনা।
·
·
·
চলবে......................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp