তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো - পর্ব ০৭ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          অনেকদিন হয়ে গেছে কলরবের সাথে কথা হয়েছে, একবারই। আর কল দেওয়ার সাহস হয়নি। এখন তো ও বিবাহিত, কথা বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না। কিন্তু ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে নিহিনের। একবার, শুধু একবার। একবার দেখা তো করা যেতেই পারে। কিন্তু ও একা চাইলেই তো হবে না। কলরবও তো পারত একবার কল করতে, এখন তো নিহিনের ফোন নাম্বার আছে ওর কাছে, কিন্তু তা তো করেনি। তাই আবার কল দিয়ে, দেখা করতে চেয়ে বেহায়াপনা করার কোনো মানে হয় না। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো বুকের ভেতর থেকে। না এসব নিয়ে ভাবতে থাকলে হবে না, মিড টার্মের পর ক্লাস শুরু হয়ে কতদিন কেটেও গেছে অথচ অর্ধেক খাতাও দেখা হয়নি এখনো, রাত ৮ টা বাজে, এখন খাতা দেখা শুরু করলে বেশ কিছু খাতা দেখা যাবে। খাতা দেখতে বসে পড়ল নিহিন। কিছুক্ষণ পর ওর বড় বোন মোহনার কল এলো,

“হ্যালো নিহিন..”

“আপু বলো।”

“ফেসবুকের ইনবক্সে ওই ছেলেটার ছবি পাঠিয়েছি, দেখ হিরোর মতো দেখতে।”

“ঠিক আছে আপু, আমি পরে দেখে নেব। এখন একটু ব্যস্ত, খাতা দেখছি।”

“না, এসব বাহানা শুনতে চাই না আমি। তুই এখনই দেখবি।”

“বাহানা না, আমি সিরিয়াসলি খাতা দেখছিরে বাবা।”

“এত কথা শুনতে চাই না। ওরা তোর ছবি দেখেই তোকে খুব পছন্দ করে ফেলেছে, এবার তোকে সামনাসামনি দেখতে চায়, তার আগে তোর দেখা প্রয়োজন। এখনি দেখে আমাকে জানা কেমন লাগল, আমি অনলাইনেই আছি।”

একথা বলেই মোহনা ফোনটা রেখে দিলো। অগত্যা ফেসবুকে লগইন করল নিহিন। তা নাহলে মোহনা আবার তুলকালাম বাধাবে। ইনবক্সে ঢুকতেই মোহনার মেসেজটার পাশ কাটিয়ে একটা মেসেজ রিকোয়েস্টে চোখ আটকে গেল নিহিনের, নিশ্বাস বন্ধ হবার যোগাড়! মেসেজটা ছিল এরকম, “হ্যালো, কলরব বলছি” কিন্তু প্রোফাইল নাম “সাদমান সাদিফ। প্রোফাইলে ঢুকল নিহিন। প্রোফাইল দেখে বুঝতে পারল এটা কলরবের প্রোফাইল। আর অবাক হলো এটা দেখে যে সাব্বির মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। একসেপ্ট করে দেখতে পেল আর ২০ মিনিট আগে কলরব অনলাইনে ছিল। ইশ, কেন আরো ২০ মিনিট আগে এলো না! সাব্বির অনলাইনেই ছিল। নিহিন ওকে নক করল,

“দোস্ত, সাদমান সাদিফ কে? চিনিস?”

“আরে চিনি মানে, আমার পেয়ারের লোক। কিন্তু ক্যান? তুই ভাইরে পাইলি কই?”

“আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে, তোকে মিউচুয়াল দেখলাম।

“ “ওহ, অ্যাড করতে পারিস.. খুব ভালো মানুষ।”

“আচ্ছা, তোর কেমন পেয়ারের লোক সে?”

“আসলে সে আমার বস ছিল। কিন্তু রিলেশন ভাই ভাই, একলগে সিগ্রেট খাই টাইপ ভাই। এখন অবশ্য সে আমাদের অফিসে নাই। কিন্তু সম্পর্ক আছে আগের মতই।”

“হারামি, কুত্তা, ফাউল।”

“একি! গালি দেস ক্যান?”

“যখন তোরে বললাম কলরবকে খুঁজে দিতে তখন বললি এ নামে কেউ নেই আর এখন বলো ভাই ভাই সম্পর্ক?”

সাব্বির আকাশ থেকে পড়ল। বলল,

“মানে?”

“তোর সাদমান সদিফই তো কলরব।”

“তুই কি শিওর?”

“শিওর মানে? আমি ওকে দেখে চিনবো না?”

সাব্বির সঙ্গে সঙ্গে কল করল নিহিনকে। নিহিন ফোন রিসিভ করতেই বলল,

“দোস্ত তোকে কি কলরব পরি বলে ডাকত?”

“হ্যাঁ। তুই কী করে জানলি?”

অবাক হয়ে বলল নিহিন। সাব্বির খুব এক্সাইটেড গলায় বলল,

“দোস্ত আসলে কর্পোরেট লাইফটাই তো এমন আমরা কারো ডাকনাম ধরে ডাকি না, জানিও না। গুড্ডু, লাড্ডু, চিংকু, পিংকু কত নামই তো থাকে, কলরব নামটাও সাদমান ভাইয়ের ওই টাইপ কোনো নাম হবে। জীবনেও শুনিনি, বুঝবো কীভাবে? ওর পুরো নামটা যদি তুই সেদিন বলতে পারতি, সেদিনই পেয়ে যেতি। ইশ, কতবার যে ওর মুখে তোর কথা শুনেছি কিন্তু ও কখনো কাহিনি বলেনি, কীভাবে তোর সাথে সম্পর্ক হয়েছিল, কীভাবে ব্রেকআপ হয়েছিল কিছুই বলেনি কোনোদিন, আর তোর নামটাও বলেনি কোনোদিন, জিজ্ঞেস করলেই বলত, “ওর বিয়ে হয়ে গেছে, কী লাভ এখন ওর নাম ধাম মানুষকে বলে। তাই কাউকেই ওর নাম বলি না। ও আমার পরি, এ নামটাই নাহয় জানুক সবাই। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে তুই ওর স্বামী, কিংবা তোর বড় ভাই ওর স্বামী। কী লাভ ঝামেলা করে। আমি চাই ও ভালো থাকুক।”

নিহিনের কেন যেন কান্না পাচ্ছে। ও পরি ছিল তার! সে তার পরির জন্য কত ভাবত! নিহিন কোনো কথা বলছে না, চুপচাপ শুনছে। সাব্বির আবার বলল,

“তোর প্রেমকাহিনি তোর মুখে তো আগেই শুনেছিলাম, কিন্তু একবারও দুইটা স্টোরি রিলেট করা থাক দূরে চিন্তাও করিনি। আর তুই একবারও বলিসনি ও তোকে পরি বলে ডাকত। যাই হোক ফরগেট ইট। আগে বল, তুই কি জানিস সাদমান ভাই তোকে কতটা ভালোবাসে?”

কী বলবে বুঝতে পারছে না নিহিন। আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ওর কন্ঠটা, “কী বলছিস! এসব ও বলত? কিন্তু ও তো ম্যারিড। এসব বলবে কেন?”

“বলছে তোরে? তোর জন্য সে আজ পর্যন্ত বিয়ে করেনি।”

অবাক হলো নিহিন! হিসেব মিলছে না কিছুতেই। বলল,

“কী বলছিস তুই? তোকে আর তিথিকে সেদিন বলেছিলাম না কলরব কে কল করেছিলাম, সেদিন তো আমি ওর ছেলের কণ্ঠ শুনেছি। জিজ্ঞেস করলাম কে কথা বলছে, ও বলল ওর ছেলে।”

“কল্প? কল্প ওরই ছেলে। জন্মের দুই ঘণ্টা পর থেকে যাকে কোলে নিয়ে আজ পর্যন্ত বাবার আদর দিয়ে এত বড় করেছে সে কি নিজের ছেলে না?”

“কী বলছিস!”

“ঠিকই বলছি। তোকে এতটাই ভালোবাসে যে অন্য কাউকে নিয়ে থাকা সম্ভব না তার পক্ষে, তাই বিয়েই করেনি। কিন্তু বাবা হতে চেয়েছিল তাই বাচ্চা অ্যাডপ্ট করেছে। আর আমরা দু’একজন ছাড়া কেউ জানেও না যে কল্প অ্যাডপ্টেড, সবাই জানে ও সাদমান ভাইয়ের নিজের ছেলে, এমনকি ওর আত্মীয়স্বজনরাও। সবাইকে এটা জানানোর কারণ হলো ভাই কল্পকে কখনোই জানতে দিতে চায় না যে ও তার নিজের ছেলে না।”

নিহিনের মাথা ঘুরছে, কী শুনছে এসব! কী করবে এখন? কল করবে কলরবকে? নাকি ওর বাসায় চলে যাবে সাব্বিরকে নিয়ে? সাব্বির নিশ্চই ওর বাসা চেনে। না এটা ঠিক হবে না, তাহলে কী করবে? কেন এত অস্থির লাগছে, এত কেন পাগল পাগল লাগছে? কিছুতেই কান্না থামাতে পারছে না নিহিন। মাঝে মাঝে মানুষ এত কেন অসহায় হয়ে পড়ে? মানুষের চেয়ে অসহায় প্রাণী বোধহয় আর একটিও নেই এ পৃথিবীতে!
·
·
·
চলবে...................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp