মৌনচন্দ্রা - পর্ব ০৪ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          তারপর কেটে গেল ছয়টা মাস। হাতে হালকা চোট ও মাথায় ছয়টা সেলাইতে মোটামুটি ভালো সময়ই সাফার করেছি আমি। দিন যত যাচ্ছিল, ঢাকার বাতাস আমাকে যেন ডিপ্রেশনের রোগী বানিয়ে ছাড়ছিল। ওই কলেজে আমার বাবা ম্যাথ প্রোফেসর, আমার ক্লাসমেট আমার বাবার সহধর্মিণী। 

আমি একটা দিনই ক্লাসে গিয়েছিলাম। বাবা ক্লাসে ঢুকলেন, সাথে সাথে সুরমাও। পরনে শাড়ি তার। চোখ-মুখে লজ্জারুণ হাসি। আমি ক্লাস করতে পারলাম না, বের হয়ে গেলাম পেছনের দরজা দিয়ে। বাবা হয়তো ভেবেছেন, অভিমান ভেঙে যাবে, আমিও চলে আসব। অথচ বাবা জানেন না, অভিমান করার জন্য যেই সম্পর্কটুকু থাকা লাগে, আত্মার যেই টানটা প্রয়োজন পড়ে—তা আমি সেই দিন বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর সাথে সাথে সেখানেই ফেলে এসেছি। 

আমি খালামণির বাসায়ও থাকতে পারলাম না। খালাতো বোন শান্তা আপা রাজশাহীতে পড়াশোনা করছে। আমি টিসি নিয়ে সেখানের এক কলেজে গিয়ে ভর্তি হলাম। 

আমি আমার মায়ের একটা চমৎকার ও গোপন গুণ পেয়েছি। সেটা হলো, মানিয়ে নেওয়ার শক্তি। আমি একমাসেই এমন পরিবর্তন নিয়ে এলাম নিজের মাঝে, সবাই চমকে গেল, খুশি হলো। তাদের ধারণা আমি এখন স্বাভাবিক, তারা মনে করে আমি আমার লাইফ নিয়ে সিরিয়াস হয়েছি। অথচ তারা যা জানে না, তা হলো—আমি দিনকে দিন আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মবাদী হয়ে উঠছি। বুকের ভেতর যেই আগুনটা আমার জ্বলছে, তা প্রতিনিয়ত এই কাপুরুষগুলোকে শাপ দিয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেকে ভালো রাখব, আমি সুস্থ থাকব, আমি নিজেকে সুউচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাব। আর তারপর দেখব পিছে পড়ে থাকা এই অমানুষগুলোকে—তারা কি ভালো আছে, যারা আমাকে সর্বোচ্চ অপমান করেছে?

ইয়ারচেঞ্জ এক্সাম হচ্ছে। সকালে উঠে পড়া রিভাইজ করতে করতে নাশতা বানাচ্ছিলাম। শান্তা আপা আমাকে দেখে মিষ্টি করে হেসে বলল, 
-“শুভ সকাল, আমার পদ্মফুল। আরে রে... তুই রান্না করতে করতেও পড়ছিস? এত পড়ে কী হবে? একদিন তো মরেই যাওয়া লাগবে।”

শান্তা আপা ভীষণ কুল ও চিল টাইপের মানুষ। আমি স্মিত হেসে বললাম, 
-“সুপ্রভাত, আপা। মৃত্যু যেদিন আসবে, সেদিন আসবেই। আমার ফিউচার সিকিউর করার দায়িত্ব আমার। পরোটার সাথে ডিমভাজি খাবে নাকি ফ্রিজ থেকে মাংস গরম করব?”

আপা দুটো ডিম ফ্রিজ থেকে বের করে আমাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, 
-“তুই পড়তে বোস, পদ্ম। আমি বাকিটা করে দিচ্ছি। যা।”

আমি হাসলাম কেবল৷ কিছু বললাম না। আজ ম্যাথ এক্সাম। আমি ম্যাথে বরাবরই ভালো ছিলাম। তবে কী থেকে যে কী হয়! 

অযথা অকারণে বুকের ভেতর অস্থিরতা কাজ করছিল বলে আমি নাশতা না করেই কলেজে চলে এলাম। পেপার দিলো, প্রশ্নও দিলো। আমি দেখলাম। সব পারি। সব কমন। সব ঠিকাছে। তারপর আচমকা আমি উঠে দাঁড়ালাম। টিচারের কাছে ফাঁকা খাতাটা জমা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কলেজ থেকে। রিকশায় ঘুরতে লাগলাম অন্যমনস্ক হয়ে। কলেজ থেকে কুড়ি মিনিটের দূরত্বে একটা বিল আছে। আমি সেখানে গিয়ে বসে রইলাম সন্ধ্যা অবধি।

সে সন্ধ্যায় নেমে এলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো জলোচ্ছ্বাস। টিউশনির টাকায় নতুন ফোন কিনেছি, পাশের একটা ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে কিছু এমবি রিচার্জ করে বাড়ি ফিরলাম। ইমেইল, ফাইল, ব্যাকআপ সব সেট করলাম। এরপর প্লেস্টোরে গিয়ে অ্যাপ নামাতে লাগলাম। কী লিখে কী সার্চ করেছিলাম, জানা নেই.. তবে আমি একটা অদ্ভুত এপ্লিকেশন ফোনে ইনস্টল করে নিলাম। বড়োই বিচিত্র, উত্তেজনাপূর্ণ।

এটা একটা চিঠির অ্যাপ। রেজিস্ট্রেশন করতেই হোম পেইজে অসংখ্য খোলা চিঠি পেয়ে গেলাম। আমি গভীর মনোযোগের সাথে সেগুলো পড়তে লাগলাম। পড়তে পড়তে খেয়াল করলাম, মানুষ পরিচয় আড়ালে রেখে অচেনা মানুষকে উৎসর্গ করে কত অনায়াসে নিজের মনের কথা খুলে-মেলে বলে যাচ্ছে... যার সাথে কোনো পরিচয় নেই, ভবিষ্যতে মুখোমুখি হবার সম্ভাবনাটাও নেই, তাকে সম্ভবত মনখুলেই সব জানানো যায়। 

এই অ্যাপের প্রোফাইলে কারো ছবি থাকে না, নামও অধিকাংশ ফেইক থাকে, বায়োতে দুয়েকটা কবিতা আর এ-ই তো। নিজেদের হবি অ্যাটাচ করে দেওয়া লাগে, সেগুলোর সাথে যাদের ম্যাচ হয়, তাদের প্রোফাইল অটো-ম্যাচ অপশনে সাজেস্ট করে। এভাবেই একদিন আমি তাকে পেলাম। আমার প্রথম পত্রদাতা.. 

তখন আমার আকাশটা অসম্ভব মলিন। ইয়ারচেঞ্জ এক্সামের পর বেশ লম্বা একটা ছুটি শেষে পুনরায় ব্যস্ততম দিনে হাতপা মেলে শুয়ে আছি। সময়টা দুইটা নাগাদ। মধ্যরাতের আকাশের ঝলমলে তারাদের ভিড়েও চাঁদের একাকিত্ব দেখছিলাম। আচমকা নোটিফিকেশনে ফোন হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম, 'Someone wants to be your penpal. Letter arrived in one hours.' 

থমকে গেলাম আমি, উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপতে লাগল। আমি এই অ্যাপের নিয়ম বুঝতে পারলাম। দূরত্বের হিসেব করে সময় নিয়ে চিঠিটা আসবে। ঠিক যেন সেই পুরোনো দিনের মতো। এই একটা ঘন্টা আমার কোনোভাবেই কাটল না। আর তারপর যখন চিঠিটা এলো, আমি দেখতে আলস্য করলাম। পড়লে তো পড়েই ফেললাম, ফুরিয়ে গেল। এরপর কী করব?

কিছু বিষয় পরবর্তী সময়ের জন্য ফেলে রাখা ভীষণ প্রয়োজন। কিছু জিনিস সামনের মুহূর্তটাকে আনন্দময় করার জন্য গুছিয়ে রাখা ভীষণ প্রয়োজন। আমি যখন খুব মন খারাপ নিয়ে মন্দবাসাকে উৎসর্গ করে দুঃখবিলাস করব, তখন আমি তাকে পড়ব। 

দিনটা চলে এলো দুইদিন পরই। মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। আমি সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। হাঁসফাঁস লাগছিল বেশ। বুকের ভেতরে অদ্ভুত জ্বালা করছিল। মাথার ভেতরে ভোঁতা যন্ত্রণা আর নিঃশ্বাসেরা যেন গলাতেই আটকে। ঘামতে লাগলাম দরদর করে। এমতাবস্থায় আমার প্যানিক অ্যাটাক হলো। শান্তা আপা দৌড়ে রুমে এসে আমাকে সামলে নিল। আমি শান্ত হলাম তিন ঘন্টা পর। আপা এরপর আমার রুমেই ঘুমিয়ে পড়ল তখন। 

সেদিন আমি ফোন হাতে নিয়ে সেই অপাঠ্য চিঠিটা ওপেন করলাম। প্রথমেই যা চোখে পড়ল, তা হলো—বেশ ছোট চিঠি। পরবর্তী চোখ জ্বলজ্বলে হয়ে উঠল মার্জিত কিছু শব্দে।

—————

I'm just bored with the social medias & want someone to make a long, meaningful conversation. I'm a good listener too. We can even talk about our fantasies, favourite moments of the day, memories.
Sounds good to you? If so, please write back to me & Let's talk. Life is too short to be bored & die, right? 

পুনশ্চ: চিঠি পাঠাবার সময় সিস্টেম বলছে, বাংলায় না লিখলে নাকি আপনি বুঝবেনই না। সত্যিই এমন নাকি? 
পুনশ্চ ২: আপনার নামটা সুন্দর, আরাধ্যা। বড্ড পরিচিত, তবে কোথায় শুনেছি, তা ঠিক মনে করতে পারছি না।

Mezbaah.
May 18, 2017 3:47 AM
Dhaka, Bangladesh 

—————

আমি সবকিছু ফেলে কেবল ওই বাক্যটাতেই আটকে গেলাম, “Life Is Too Short To Be Bored & Die!” 

আসলেই তো তাই! তাই-না?
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp