তুমি আমার বসন্ত - পর্ব ১২ - আমেনা আক্তার আখি - ধারাবাহিক গল্প

          তাবাসসুম ফুফুদের বাড়িতে এসেছে সপ্তাহখানিক। কেন জানি এবার তার এবাড়িতে ভালো ঠেকছে না। বারংবার নিজ গৃহে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। কেন করছে? কেনই বা ভালো লাগছে না, তার হেতু হিসেবে তাবাসসুম রুশান নামক অভদ্র, ঝগড়াটে পুরুষটাকে ধরে নিয়েছে। সে আসার দিন কেমন মায়া মায়া নিয়ে কথা বলছিল ওর সাথে। তাবাসসুমের মনে পড়ল সেদিনের ঘটনা। রুশানের আওয়াজ পিছন থেকে ভেসে আসতে তাবাসসুম পিছন ফিরে রুশানকে দেখে অবাক হয়েছিল ঠিকই। তবে কোথাও একটা ভালো লাগছিল। আনন্দ লাগছিল তার। রুশান তাবাসসুমের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলেছিল—

“চলে যাচ্ছেন আজকে?”

রুশান ততক্ষণে তাবাসসুমের পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে। তাবাসসুম একবার রুশানের পানে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর অত্যন্ত ভদ্র কন্ঠে বলেছিল—

“জ্বী।”

“ফিরবেন কবে?”

“ভার্সিটি ছুটি না হলে তো আসতে পারবো না।”

রুশান তখন নিশ্চুপ ছিল। শাফানকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে তাবাসসুমই তখন তাড়া দেখিয়ে রুশানের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিল। সহসা তখনই পিছন থেকে রুশান বলে উঠেছিল—

“অপেক্ষা করবো!”

তাবাসসুমের পা থেমে গিয়েছিল। রুশানের কন্ঠ তখন কেমন শোনাচ্ছিল। যেন কোনো প্রেমিকা তার প্রেমিককে রেখে বহুদূরে চলে যাচ্ছে আর সে বড্ড বিরহে বলছে অপেক্ষা করবো। তাবাসসুম ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে পিছনে তাকাতে রুশান হেসেছিল৷ হেসে বলেছিল—

“ঝগড়ার অপেক্ষা। আপনার সাথে ঝগড়া করাও একটা অভ্যাস হয়ে গেছে বুঝলেন?”

তাবাসসুম কোনো কথা বলেনি। কিছুক্ষণ রুশানের দিকে তাকিয়ে থেকে নিচে চলে এসেছিল।

সেদিনের ঘটনা মনে করেই বোধহয় তাবাসসুমের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝলক দেখা যাচ্ছিলো। তাবাসসুম ভাবনা থেকে বেরোতে বুঝল তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তাবাসসুম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে দেখল শাফান দাঁড়িয়ে আছে। শাফানকে দেখে তাবাসসুম মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

শাফানের বিয়ে ঠিক হয়েছে, এই কথাটা তাকে শাফান ভাই বলেননি। এই বাড়িতে এসেও কতবার জিজ্ঞেস করলো কার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে বললেন না। ফুফুকরও জিজ্ঞেস করেছে। বলেননি। শাফান ভাই নাকি বলতে না করেছেন। মেয়েটার নাম পর্যন্তও বলতে দেন নি। তাবাসসুম শাফানের সাথে কথা বলা অফ করে দিয়েছে তাই।

তাবাসসুমের ফুলে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে শাফান মিটমিটিয়ে হেসে বলল—

“কি ভাবছিলি?”

তাবাসসুম মুখ ভেঙিয়ে বলল—

“আপনাকে কেন বলবো? আপনি আপনার হবু বউয়ের নাম বলেছেন?”

শাফান ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল—

“শুনতে চাস আমার বউয়ের নাম?”

সঙ্গে সঙ্গে শাফানের পানে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো তাবাসসুম। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—

“হ্যাঁ।”

“বলতে পারি একটা শর্তে।”

“কি শর্ত?”

“কাল আমার সাথে তোকে শপিং এ যেতে হবে৷ আমার বউয়ের জন্য শপিং করবো৷”

“তো আপনার বউকে নিয়ে যান। আমি কেন যাবো?”

“কেন যাবি মানে? আমি কি মেয়েদের জিনিস কিনি নাকি? কিছুই তো চিনি না। তুই পছন্দ করে দিবি। আর বউকে তো সারপ্রাইজ দিবো৷ ওকে নিয়ে গেলে হবে?”

“আমি পছন্দ করে দিলে আপনার বউয়ের যদি পছন্দ না হয়?”

“সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই বল যাবি?”

তাবাসসুম কিছুক্ষণ ভেবে বলল—

“আচ্ছা যাবো৷ এখন আপনার বউয়ের নাম বলেন। সাথে ছবি দেখাবেন।”

“ছবি দেখানোর কথা ছিলনা। নামটা বলতে পারি।”

তাবাসসুম ব্যগ্রতা নিয়ে বলল—

“আচ্ছা নামটাই বলেন। সে ছবি আমি ফুফুর কাছ থেকেই দেখে নিতে পারবো।”

শাফাণ হাসল তাবাসসুম আগ্রহ, ব্যকুলতা দেখে। শাফান তাবাসুমের থেকে মুখ ফিরিয় আকাশের পানে তাকালো। ঠোঁটের কোণে হাসি। তাবাসসুম তাকিয়ে আছে শাফানের মুখের পানে। শাফান বলছে না দেখে তাবাসসুম পুনরায় ব্যগ্র কন্ঠে বলল—

“বলছেন না কেন?”

শাফান এবার দম ছেড়ে বলল—

“তার নাম নীলিমা, নীলাঞ্জনা। জানিস তাকে কিশোর বয়সে শাড়িতে প্রথম দেখেছিলাম। নীল শাড়িতে অভিমান মুখে বসে ছিল ছাদের মেঝেতে। সেদিনই কিছু একটা হয়ে গিয়েছিল আমার। তারপর তাতেই আটকে রইলাম। ওই অভিমানিনী আমার কিশোর বয়সে প্রথম প্রেম হয়ে এসেছিল। তারপর আমার অভিমানীকে এই অব্দি ভালোবেসে আসছি।”

তাবাসসুম মনোযোগ দিয়ে শাফানের পুরো কথা শুনলো। অতঃপর অবাক কন্ঠে বলল—

“সেই কিশোর বয়স থেকে প্রেম করছেন?”

শাফান হেসে বলল—

“প্রেম করছি না। ভালোবাসছি। আরেকটা মজার কথা শুনবি?”

“কি?”

“সে আদৌও জানেনা আমি তাকে ভালোবাসি। বুঝতে পারে নাকি সেটাও জানিনা। কোনোদিন বলাও হয়নি তাকে আমি ভালোবাসি।”

তাবাসসুম এবার যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময় নিয়ে বলল—

“কি! তাহলে তনু, ফুফু সবাই যে বলল আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে?”

“হ্যাঁ হয়েছে। তবে সে জানেনা।”

“মানে কি? মেয়েটা যদি আপনাকে ভালো না বাসে। পরে যদি আপনাকে বিয়ে না করতে চায়?”

“তবুও সে আমারই হবে।”

“যদি মেয়েটা অন্য কাউকে ভালোবাসে?”

“বাসেনা। তার প্রতিটা পদক্ষেপ এর হিসাব রাখি আমি।”

তাবাসসুম সহসা বলে উঠল—

“মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসেন?”

শাফান তাবাসসুমের পানে তাকালো এবার৷ চোখে চোখ রেখে বলল—

“আমার কথা শুনে কি মনে হচ্ছে?”

তাবাসসুম চোখ ফিরিয়ে নিল। এভাবে চোখের দিকে তাকিয়ে বলার কি আছে? তাবাসসুম কিছু বলে উঠাে পূর্বেই শাফান বলল—

“ঘরে যা এখন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।”

শাফান কথাটা বলতে তাবাসসুম বাধ্য মেয়ের মতো নিচে নেমে এলো। তাবাসসুম চলে যেতে শাফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

“তুই কি কিছুই বুছিস না?”

—————

তাবাসসুম ছাদ থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসেছে। সামনে বই খুলে রেখেছে। কিন্তু হাতে মোবাইল। পড়ায় মনোযোগ আসছে না। তাই গাধার মতো বই খুলে থেকে লাভ হবেনা ভেবে তাবাসসুম ফোন হাতে নিয়েছে। তাবাসসুম একবার ভাবলো তনুর সাথে কথা বলবে৷ রুশানের কথা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু মেয়েটা যে পরিমাণ ইঁচরে পাকা। রুশানের কথা জিজ্ঞেস করা যাবেনা তার কাছে। জিজ্ঞেস করলেই ওটা নিয়েই ক্ষ্যাপাতে থাকবে। তাবাসসুম ঠোঁট উল্টে ফোন স্ক্রল করতে লাগল। তখনই আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এলো। তাবাসসুম ভ্রু কুঁচকে নিলো। মেসেজ অপেন করতে দেখল, তাতে লেখা—

“শোনো বসন্ত কন্যা। এভাবে দাবানলে পোড়ানোর কোনো মানে হয়না। আর কতদিন পোড়াতে চাচ্ছো? এবার একটু শীতল স্পর্শ দিয়ে যাও তোমার।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp