মেজবাহর চিঠি এলো মধ্যরাতে। আমি জাগ্রত। প্লেলিস্টে বেজে যাচ্ছে প্রিয়সব গান...
Abhi na jao chhor kar, ki dil abhi bhara nahin..
অন্ধকারাচ্ছন্ন ছাদের একটা বেতের দোলনায় দুলতে দুলতে আমি পড়তে শুরু করলাম তার চিঠিটা। আবারও সম্বোধনবিহীন সূচনা।
—————
কবিতার মঞ্চ থেকে দুঃস্বপ্নের রাত অবধি এসে থেমেছে আমার গত দুই দিনের অনিশ্চিত সফর। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাই প্রায়শই আমি বাস্তবতা ঠাহর করতে অপারগ হই। এমন কিন্তু একদমই নয় যে আমার কাজ নেই, দায়িত্বের ধার ধারি না। কিন্তু জীবনটা ভোকাট্টা ঘুড়ির মতোই লাগে এখন। "যাচ্ছে যেভাবে যেদিকে যাক"। মাঝে মাঝে সুতো টেনে ধরি—আর মুশকিলটা ঠিক তখনই হয়, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দুঃখেরা এসে ভীড় করে।
ইংরেজি আমার খুব একটা পছন্দ না যদিও। শুধু কিছু আড়াল করার হলেই, ইংরেজি প্রিয় সঙ্গী হয়ে যায়। মনে হয়, একই আবেগ বাংলায় প্রকাশ করলে নিজের ভেতরটা বুঝি আগল খুলে দেখিয়ে ফেলছি। কিন্তু সে-ই কথাই ইংরেজিতে বললে অতটা লজ্জা বা অস্বস্তি আসে না, তবে মনের ভাবটা ঠিকই জানান দেওয়া যায়।
আপনার নামটাও বেশ সুন্দর...'আ-রা-ধ্যা'! বানান ঠিক লিখেছি নিশ্চয়ই? নামের ক্ষেত্রে আমি খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। সব নাম আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আপনারটা পছন্দের। মেজবাহ ও আরাধ্যা... উপন্যাসের চরিত্রের জন্য দিব্যি মানিয়ে যায়, বলুন?
মানুষ আমার লেখা পড়ে বলতো, আমি নাকি বইয়ের ক্যারেক্টারদের মতো করে কথা বলি। কিন্তু আপনার লেখা পড়ে এই প্রথমবার আমার মনে হলো, "Finally I've found one of my own kind!"
জানেন আরাধ্যা, শুধু এই কথার পিঠে কথা বলতে পারা...কিংবা আমার কথাটা বললেই অপরপক্ষের বুঝে যাওয়ার ব্যাপারটাই আমি আজীবন খুঁজেছি মানুষের ভেতর। পাইনি বলেই, তেমন কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি আমার। তাই, এমন কাউকে পেলে আমি হয়তো তার প্রেমে পড়লেও পড়তে পারতাম।
চিঠির মাঝামাঝি এসেই এমন একটা অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছোনো আমার একদমই ঠিক নয় কিন্তু আপনি কি হুমায়ুন প্রভাবিত? চিঠির পুনশ্চ পর্ব, বর্ণনা এবং জীবনাচরণ থেকে মনে হয় আপনি বাস্তবের কেউ নন। আপনি উপন্যাসের কোনো চরিত্রের জীবন যাপন করছেন। ওঁর উপন্যাসের মেয়েদের জীবনেও দুঃখ থাকে, তারাও আগুন ধরা রোদে বের হয়, কষ্ট বুকে রাত জাগে। কিন্তু আমরা পাঠকরা তা পড়ে কেমন যেন শান্তি পাই এবং মনে হয় এটাও ঠিক বাস্তব নয়—বাস্তবের মতো কিন্তু ঠিক বাস্তব নয়। আর বাস্তব নয় বলেই, উপন্যাসের জীবনটার প্রতি মোহ থাকে আমাদের... মোহ থাকে বলেই ঐ জীবনটা যাপন করতে ইচ্ছে করে। আর জানি সেটা সম্ভব নয় বলেই, বাস্তবতা থেকে পালাতে আমরা উপন্যাসে মুখ গুঁজি।
সত্যিই আপনি রোজ রাতে ছাদে গিয়ে বসে থাকেন? উপন্যাসের চরিত্রদের কখনো প্রশ্ন করার সুযোগ মেলে না আমাদের। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে অদ্ভুত এক দ্বিধা কাজ করছে। কারণ আপনি তো বাস্তবের মানুষ। আমি কট্টর প্রশ্নগুলো করে বসলে আমাদের চিঠির নাটকীয় সুরটা কেটে যাবে মাঝপথে। আচ্ছা, সময় দেই বিস্তারের জন্য আপনাকেই। বাস্তবতার সুর আমার নিজেরও ভালো লাগে না। একটু নাটকীয়তা তাই থাকুক না-হয়।
কিন্তু এমন নিশীথিনী স্বভাব কবে থেকে হলো, আরাধ্যা? কেনই-বা হলো? নিজেকে চাঁদের প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী বলছেন অথচ যে চাঁদ সূর্যের অপেক্ষায় সারা রাত জাগে...সে দেখা দিলে, যার সূর্যমুখ দেখেই সে ঘুমোতে যায়- তাকেই তো অগ্রাহ্য করছেন আপনি। চাঁদ যদি ইভ হয়, আপনি কি তবে লিলিথ-এর প্রতিনিধি? আজন্মের অভিমান বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন?
নিজে রান্না করে খান! তাহলে ধরে নিচ্ছি আপনি একলা থাকেন। আবার চাইলেই শহরের রাস্তায় এলোমেলো হাঁটার স্বাধীনতা আছে আপনার যখন-তখন। কিন্তু অ্যাপে আপনার যা বয়স দেখাচ্ছে, তার সাথে এটাও মেলাতে রীতিমতো হিমসিমই খেতে হচ্ছে আমায়। কীভাবে পারেন, আরাধ্যা? আমি তো পারি না।
সত্যিই কি জীবন খুব উদ্দেশ্যহীন আপনার? কিন্তু এই না বললেন শহুরে অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসুখ কাহিনির স্বাক্ষ্য বহনের জন্য জীবন পার করছেন? এটাও তো উদ্দেশ্যই একপ্রকার।
জীবনের কথা আলাদাভাবে বলার মতো নেই আমার। আমি নিজেও আপনার দলে। এতোটাই ক্লান্তি কাজ করে আজকাল যে কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সবকিছু থেকে। আমি যতটুকু এফোর্ট দিতে পারি, তার ১০% দিচ্ছি কি-না সন্দেহ আছে। কিন্তু মোটিভেশান এর অভাব বোধ হয় আজকাল খুব। সঙ্গীহীনতাতেও ভুগছি। আমি দুর্বল মানুষ। একলা যারা বিশ্ব জয় করে ফেলতে পারে—আমি তাদের মাঝে নই, আরাধ্যা।
কিন্তু হারে অনীহা আমার, জেতার আশা তাই ছেড়ে দিতে চাই নাই। এই মিডিওকার স্বপ্নবাজদেরও তো ঠাঁই হওয়া উচিত সমাজে, বলুন? জীবনের এই অবধি আমার এফোর্টের পাল্লাটাও নেহাত কম নয়। কিন্তু আজকাল ক্লান্ত লাগে বেশ। মাঝে মাঝে মনে হয়, চিরায়ত বাঙালির মতো ছোট কোনো একটা গ্রামের কোনো একটা স্কুলের শিক্ষক হয়েও জীবন পার করে দিতে পারতাম। খারাপ কী হতো তাতে! তারপর মনে হয়, নিজের সাথে অবিচার হতো সেটা। আমাকে নিয়ে আমার পরিবার, আমার শিক্ষকদের আশা অনেক। কিন্তু অনিশ্চিত জীবনে এখনো সুখের সংজ্ঞা খুঁজে না পাওয়াদের মাঝে আমিও একজন।
তবে কোনো কিছু আমি খুব করে চাইলে—সেসব ক্ষেত্রে "কী আর আছে জীবনে" বলে উদ্যোগটা আমি আজকাল নিয়েই ফেলি। এতটুকুই তো জীবন। উদ্যোগ বা সাহস করে কথা না বলে আজীবন মরমে মরার চাইতে বলে ফেলাই তো উচিত, তাই-না? নাকি “যা কিছু আমার, তা শুধুই আমার হয়ে থাক হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে”—বিশ্বাসী আপনি?
ও হ্যাঁ, কল্প-জগৎ? আমার চিঠি থেকেই একটা ধারণা করুন তো আছে কি নেই! কী ধারণা হয়, জানাবেন।
পুনশ্চ ১ঃ চিঠির শেষাংশে নয়, আরও আগেই হাসি এসেছে এবং তা বহুবার।
পুনশ্চ ২ঃ আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমাকে কেউ কেন চিঠি লেখে না এখানে। তারপর নিজের প্রোফাইল এর দিকে তাকালে মনে হয়, আমি নিজে হলেও লিখতাম না হয়তো। তেমন কিছু লেখা নেই About-এ। আপনাকে আমি র্যান্ডমলিই লিখেছিলাম। নামটা এবং especially আপনার avatar টা আমার কেন যেন ভালো লেগে যায় বেশ। চিঠিটা পাবার পরে মনে হলো, অ্যাপে থাকা গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছি একটা।
Mezbaah.
May 25, 2017 3:47 AM
Dhaka, Bangladesh
—————
আমি পড়লাম না চিঠিটা, কেবল চোখ বুলিয়ে রেখে দিলাম। চিঠির গল্প এতটা নিয়মিত হলে তাল কেটে যায়। অনিয়মে আমি চারদিন অপেক্ষা করলাম ফিরতি চিঠি লিখতে।
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………