ছাদের রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে তাবাসসুম। হাতে তার আইসক্রিমের বাটি। চামচ দিয়ে আইসক্রিম নাড়াচাড়া করছে সে৷ আজকেও কোকিল ডাকছে, তবে তার কোনো ভাবান্তর নেই। সকালের ঘটনা মনে পড়তেই, রাগে তাবাসসুমের চোখ ছলছল করে উঠল৷ রুশানের কথা মনে পড়তে দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। লোকটা ইচ্ছে করে তাকে ওতগুলো লোকের সামনে অপমান করেছে। ভাবতেই শরীর জ্বলছে তাবাসসুমের। রাগে আইসক্রিমের বাটিটা নিচে ফেলে দিল ও। চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করল৷ অতঃপর নিচে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
ছাদের দরজা পর্যন্ত আসতেই রুশানের মুখোমুখি হলো তাবাসসুম। রুশানকে দেখে কিছু মুহুর্ত দাঁড়ালো তাবাসসুম। হঠাৎ পুনরায় রাগে সমস্ত শরীর জ্বরে উঠল ওর। রুশানকে ধাক্কা দিয়ে সাইড কাটিয়ে চলে আসল ও৷
দুই সিড়ি নামতে পিছন থেকে রুশান তাবাসসুমের হাত ধরে ফেলল৷ শান্ত কন্ঠে বলল—
“কথা আছে।”
তাবাসসুম ঘুরে দাঁড়ালো। রুশানের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল—
“আপনার সাহস কি করে হয়, আমার হাত ধরার? আর আপনার সাথে? আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই।”
বলেই তাবাসসুম নিচের সিঁড়িতে পা ফেলল আবার। রুশান সময় ব্যয় না করে বলল—
“আমি ইচ্ছে করে ফেলে দেইনি আপনাকে।”
তাবাসসুম থেমে গেল। রুশানের দিকে এগিয়ে আসল ও। রুমানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রেগে বলল—
“আপনি বলবেন, আমি আপনাকে ইচ্ছে করে ফেলে দেইনি। আর আমি বিশ্বাস করে নিবো? তাহলে ওতগুলো মানুষ থাকতে আপনার পায়ের সাথে লেগে কেন পড়লাম আমি? বলুন? আরও তো লোকজন ছিল ওখানে। আসল ব্যাপারটা কি বলুন তো? আপনার সাথে আমার সামান্য ঝগড়া বলে আপনি ওতগুলো লোকের সামনে আমাকে অপমান করলেন। মুখে মুখে ঝগড়া করা, আর ভরা বাজারে ফেলে দিয়ে অপমান করা এক জিনিস নয় মিস্টার রুশান। আপনার সাথে আমি আর একটা কথাও ব্যয় করতে চাইনা। আপনাকে আর দেখতেও চাচ্ছি না। আমার চোখের সামনে আর আসবেন না আপনি। পুরো বিকালটা ছাদ আমার জন্য। তাই নেক্সট টাইম বিকেল টাইমে ছাদে আসবেন না।”
তাবাসসুম কথাগুলো বলে দম নিল। রাগে চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। শরীর মৃদু কাঁপছে। তাবাসসুম রোষানল দৃষ্টিতে রুশানের পানে একবার তাকালো। দৃষ্টিতে রাগ ঝেড়ে ও ঘুরে দাঁড়ালো। পা বাড়ানোর আগেই রুশান পুনরায় তাবাসসুমের হাত ধরে ফেলল। তাবাসসুমের হাত টেনে ধরে ছাদে এনে দাঁড় করালো নিজের মুখোমুখি। শান্ত স্বরে বলল—
“নিজে নিজেই খুব সুন্দর করে বুঝে ফেললেন বিষয়টা। আমার বলার প্রয়োজন পড়ল না। ইন্টেলিজেন্ট।”
তাবাসসুম রাগী কন্ঠে বলল—
“হাত ছাড়ুন।”
“হাত ছাড়লে চলে যাবেন।”
“হাত ছাড়বেন আপনি?”
“স্যরি মিস। আগে আমার কথাটা শান্তভাবে শুনুন। তারপর আমিই হাত ছেড়ে দিবো।”
তাবাসসুম হাত মোচড়ামুচড়ি করে রাগ নিয়ে বলল—
“শুনবো না। আপনাকে দেখে রাগ লাগছে আমার।”
“জানি।”
তাবাসসুম মুখ ঘুরিয়ে নিল। রুশান মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সহসা বলে উঠল—
“স্যরি।”
রুশান তাবাসসুমের ঘুরিয়ে রাখা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–
“মিস তাবাসসুম। স্যরি। স্যরি। স্যরি। ইচ্ছে করে আমি আপনাকে ফেলে দেইনি। এটা সম্পূর্ণ একটা দুর্ঘটনা। দেখুন আমি জানতামও না ওটা আপনি ছিলেন। আমি সামনের দিকে যেতে নিচ্ছিলাম। আপনিও তখন পা বাড়িয়েছিলেন, তখন হঠাৎ পায়ের সাথে পা লেগে পড়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া আপনার সাথে ঝগড়ার রেশ ধরে সবার সামনে আপনাকে অপমান করবো এমন কোনো মনোভাব আমার ভিতর ছিল না। নেইও। এটা সম্পূর্ণই দুর্ঘটনা মিস তাবাসসুম।”
তাবাসসুম গম্ভীর স্বরে বলল—
“বুঝতে পারছি। হাত ছাড়ুন এখন।”
“আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না?”
“না করছি না।”
“তাবাসসুম!”
তাবাসসুম মুখ ফিরিয়ে তাকালো রুশানের পানে। ছেলেটা কেমন নির্মল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার পানে৷ তাবাসসুম চোখ নামিয়ে নিল। কিছুক্ষণ নিরব রইল। রুশান তাকিয়ে রইল তাবাসসুম পানে। সহসা তাবাসসুম মুখ উঠিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল–
“বিশ্বাস করেছি আপনার কথা। হাত ছাড়ুন এবার।”
“মিথ্যা বলছেন কেন? আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে না৷”
“মিথ্যা বলছি না। ছাড়ুন।”
রুশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত ছেড়ে দিল তাবাসসুমের। তাবাসসুমের থেকে বেশ খানিক দূরে সরে দাঁড়ালো রুশান। তাবাসসুম কিছুক্ষণ রুশানের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। রুশান পুনরায় দীর্ঘশ্বাস নিল। মেয়েটা তাকে বিশ্বাস করলো না। অথচ না করারই কথা এতদিন যেভাবে ঝগড়া হলো তাদের মাঝে।
রুশান খেয়াল করলো, সামনের লম্বা একটা গাছে কোকিল এসে বসেছে। রুশান এক দৃষ্টিতে সেদিক পানে তাকিয়ে রইল। কোকিলটা কিছুক্ষণ পরপরফ কুহু কুহু করে ডেকে ডেকে উঠছে। রুশানের বিরক্ত লাগছে। তবুও যায়গা থেক সড়ছে না সে।
সহসা পিছন থেকে মেয়েলী কন্ঠ ভেসে আসল। চমকে তাকালো রুশান। তাবাসসুম কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরও খানিক অবাক হলো। মেয়েটা তো চলে গেলো।
তাবাসসুম রুশানের দিকে এগিয়ে আসল। রুশানের পানে দৃষ্টি রেখে বলল—
“স্যরি মিস্টার ঝগড়াটে।”
“দোষটাতো তো আমার। আপনি কেন স্যরি বলছেন?”
“আপনার কথা শোনা উচিত ছিল আমার।”
“আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন?”
“আপনি ঝগড়াটে হলেও, আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে হচ্ছে না। তাই বিশ্বাস করলাম।”
রুশান চোখ ছোট ছোট করে বলল—
“আমি ঝগড়াটে?”
“হ্যাঁ আপনি ঝগড়াটে কচু।”
কথাটা বলেই তাবাসসুম মুখ ফুলালো। রুশান তাবাসসুমের ফোলা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। রুশানের হাসির শব্দ শুনে তাবাসসুম হাসলো। তাকালো রুশানের পানে। কি অদ্ভুত ভালো লাগল তার কাছে রুশানের হাসিটা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………