সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ - পর্ব ০২ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প


অয়ন ঠান্ডা গলায় বলল,
 “ইন্টারেস্টিং। মেয়েটার পুরো ডিটেইলস বের করতো। আমিও তো দেখি কোন স্বর্গের বড়ইপাতা সে, যার দুর্দিন শুরু হবে আমাকে ভালোবাসি বললে”

নুহাশের চোয়াল ঝুলে গেলো। অবশ্য অয়নের মাথা কখন কি ঘুরে সেটা যদি সে বোঝা দায়!

***

প্রাপ্তির ব্রহ্মতালু জ্বলছে। মেজাজ তিরিক্ষি। জোরে জোরে হাটছে সে। এবছর গরমকাল শুরু হতেই গরমের তান্ডব মারাত্মক। ক্ষিপ্র সূর্যের তাপে ঝলসে যাবার যোগাড় ধরনীর প্রতিটি প্রাণের। ক্যাম্পাসের পিচঢালা পথ আগুনের ফুলকির ন্যায় উত্তপ্ত। একটু ছাওনির আশায় অসহায় বেজুবান কুকুরগুলো ঠাঁই নিয়েছে একাডেমিকের সুবিশাল ছাদের নিচে, জিহবা বের করে শরীর ঠান্ডা করছে তারা। প্রাপ্তির ঘাড় বেয়ে ঘামের রেখা নেমে আসছে। চুলগুলো হাতের কালো ব্যান্ড দিয়ে এলোমেলো খোঁপা করলো। শ্যাম্পু না করার জন্য কেমন আঠা আঠা আর জট পাকিয়ে আছে চুলগুলো। ক্যান্টিনের মাঠ থেকে একাডেমিক বিল্ডিং অনেক দূর। এই গরমে এতোটা পথ হেটে আসাও কষ্টের। প্রাপ্তি একবার ঘড়ি দেখলো। সময় নেই বেশী। মাত্র পাঁচ মিনিট আছে। অশৈল্য মেয়েগুলোর জন্য তার দেরি হয়ে গেছে। সময় নিয়ে প্রাপ্তি খুব সিরিয়াস। তার লক্ষ্য ঠিক সময়ে ক্লাসে পৌছাবে, একেবারে সামনের বেঞ্চে বসবে। যেন স্যারের পড়া শুনতে পারে ভালো করে। সাধারণত ভার্সিটি নিয়ে একটি প্রচলিত বাচ্য রয়েছে,
 “ভার্সিটিতে উঠো পড়াশোনা নেই”

এই বাচ্যের পাল্লায় পড়ে অনেক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা জলাঞ্জলি দেয়। কিন্তু প্রাপ্তি সেটা চায় না। কারণ এখান অবধি আসতে তাকে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে। তার একটাই লক্ষ্য ভালো রেজাল্ট করা। আশেপাশে তাকানোর সুযোগ নেই। ঘরশত্রুগুলোকে দেখিয়ে দিতে হবে তাকে পড়ানো অর্থের অপচয় নয়।

কিন্তু প্রথম দিনই যেনো সব এলোমেলো হয়ে গেছে। রাগ হচ্ছে প্রাপ্তির। ঐ সিনিয়রদের থেকে বেশি রাগ হচ্ছে মিরাজ ভাইয়ের উপর। সে কি করে এই র‍্যাগিং এর কথা চেপে গেলো তার কাছ থেকে। বাসায় যাক, একেবারে চেপে ধরবে প্রাপ্তি। অবশ্য প্রাপ্তির আগেই বোঝা উচিত ছিলো। এখন বাজে এগারোটা, ক্লাসের সময়। এই ক্লাসের সময়ে যে ছেলে ক্লাস না করে মোটরসাইকেলের উপর বখাটে ছেলেদের মতো পা উঠিয়ে শুয়ে থাকে সেই ছেলে যে কোডিং এর “ক” ও জানে না এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই প্রাপ্তির। এমনকি এটাও আন্দাজ করাই যায় সে পড়াশোনা করেই না। কারণ যারা পড়াশনা করে তাদের বেশভূষা নিয়ে মাথা ব্যাথা থাকে না। কিন্তু ছেলেটি যেভাবে কলেজে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে সে আরব আমিরাতের কোনো সম্রাট। মোটরসাইকেলটির দাম কম করে হলেও পাঁচ ছয় লাখ টাকা তো হবেই। যার কাছে এই বেকার অবস্থায় এতো দামী বাইক থাকে তার পড়াশোনা তো লাটে উঠবেই। প্রাপ্তির অন্তস্তল থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। তার আর এই অয়নের মাঝে কত পার্থক্য। একজন সব সুবিধা থাকতেও পড়ে না আর আরেকজন পড়ার জন্য সংগ্রাম করছে নিজ পরিবারের সাথে। অজানা কারণেই প্রাপ্তির মনে অয়ন নামক মানুষটির জন্য শীতল ক্ষোভ জন্মালো। 

অনেক দ্রুত হাটা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হলো না। স্যার ইতোমধ্যে প্রবেশ করে ফেলেছে ক্লাসে। প্রাপ্তি দুই মিনিট লেট। হন্তদন্ত হয়ে শুধালো,
 “স্যার আসবো?”

স্যার একবার তাকে পূর্ণ পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর বললো, 
 “আসো”

সেও হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো ক্লাসে। বসলো একটি ফাঁকা বেঞ্চে। বই খাতা বের করলো। তার দৃষ্টি সামনের দিকে। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলো সবাই আড়চোখে তাকেই দেখছে। মনে হচ্ছে অন্য গ্রহের কোনো প্রাণী এসেছে তাদের মাঝে। অবশ্য চাকচিক্যের মাঝে মলিন জিনিস বেশি চোখে পড়ে। প্রাপ্তিও বোধ হয় তাই বেশি নজর কাড়ছে। এর মাঝে পাশে বসা মেয়েটি ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
“তুমি কি দাঁত না মেজেই চলে এসেছো? ঘুমাচ্ছিলে বুঝি? সকালে উঠার অভ্যাস নেই?”

একসাথে তিনটি প্রশ্ন। প্রাপ্তির চোখ কুঁচকে এলো। মেয়েটির ঘন কথার জন্য স্যারের কথা শোনা যাচ্ছে না। প্রাপ্তি নিষ্পৃহ স্বরে বললো,
 “তুমি তোমার চোপাটা একটু বন্ধ রাখো, আমি ক্লাস করছি। ক্লাসের শেষে আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিবো”

মেয়েটির মুখটা কালো হয়ে গেলো। প্রাপ্তির ধারণা হলো মেয়েটি তাকে আর বিরক্ত করবে না। কিন্তু ভুল, ক্লাস শেষ হতে না হতেই সে বললো,
 “তুমি খুব রুড, এতো রুড হওয়া ভালো না। রুড মানুষের সাথে কেউ মিশে না। কিন্তু আমি অবশ্য অত কিছু গায়ে লাগাই না। আমার নাম রাইসা। তোমার নাম প্রাপ্তি না?”
 “হ্যা”
 “আজ থেকে তুমি আর আমি এক সাথে বসব ওকে?”

রাইসা নামক মেয়েটি খুব চিপকু টাইপ। প্রাপ্তির ধারণা সে একটু বোকা। বোকা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা বোকামি। কিন্তু প্রথম দেখায় আসলে বোঝা যায় না কে কেমন। প্রাপ্তির ধারণা ভুল হতেই পারে। হতে পারে সে বোকার নাটক করছে। সে তার সাথে মিশতে চায় তার বানানো নোটপত্রের জন্য। স্কুল, কলেজে এমন হাজারো মেয়েদের দেখেছে সে। যারা কেবল তার ভালো ছাত্রীর ট্যাগের জন্য তার সাথে মিশত। রাইসা এমন হলে দারুন ধূর্ত সে। প্রাপ্তির মজা লাগছে। এমন ধূর্ত মানুষদের সাথে মিশতে ভালো লাগে তার। পরে তাদের বেশ আচ্ছামত মজা দেখানো যায়। প্রাপ্তি আগের মত দায়সারা স্বরে বলল,
 “বেশ, বসো”
 “আচ্ছা, তুমি এমন ভাবে কেনো এসেছো? তোমাকে দেখে পাগল পাগল লাগছে”

প্রাপ্তি ফিঁচেল হেসে বললো,
 “আসলে আমি স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নে একজন হুজুরটাইপ মানুষ আমাকে বলেছে বিশ্বের সব জ্ঞানীরা এমন বেশভূষায় থাকে। শুনোনি, আর্কিমিদিস যে ন্যাংটা ঘুরতো? উনি বললেন, আমি যদি জ্ঞানী হতে চাই, তাহলে আমাকে এমন বেশভূষায় থাকতে হবে। তাই আমিও সেই জ্ঞানী হবার সাধনা করছি। যদি ১০০০১ দিন আমি এমনভাবে থাকি আমি হয়ে যাব আইনস্টাইনের দাদা”
 “সত্যি?”

প্রাপ্তি মিথ্যে বলেছে। কিন্তু রাইসা অবিলম্বে সেটা বিশ্বাস করে নিয়েছে। তার চোয়াল ঝুলেছে, কিন্তু চোখ কেমন চকচক করছে। তাই প্রাপ্তির দ্বিধা রইলো না মেয়েটি আসলে একটা আস্ত হাদা। প্রাপ্তির কখনো হাদা বন্ধু হয় নি। এইবার একটা পরীক্ষা করাই যাক। হাদা বন্ধু ভালো নাকি ধূর্ত বন্ধু। তাই প্রাপ্তি সিদ্ধান্ত নিলো সে এই হাদা রাইসার সাথে বন্ধুত্ব করবে। দেখা যাক মেয়েটি কোনো কাজে আসে কি না। প্রাপ্তির ঠোঁট বিস্তৃত হলো। তাই হাসি দেখে রাইসাও অকারণে হেসে বলল,
 “তুমি মজা করছো তাই না?”
 “যাক তুমি একেবারেই নির্বোধ না”

রাইসা তখন চোখ কুঁচকে বললো,
 “তুমি খুব ঠোঁটকাটা তো! আচ্ছা বাদ দেও, এখন বল তুমি এভাবে চলাফেরা কেন কর? ভার্সিটিতে এমনভাবে চলতে আমি কাউকে দেখি নি”

প্রাপ্তি চোখ টিপে বললো,
 “এটা একটা সিক্রেট। অন্য এক সময় বলব”

রাইসা আবার বোকা হাসলো। প্রাপ্তি লক্ষ করলো সবাই কানাঘুষা করছে। কিন্তু এসবে প্রাপ্তির কিছু যায় আসে না। সে এমনই লেবেন্ডিস। কিচ্ছু করার নেই। 

সব ক্লাসে রাইসা প্রাপ্তির সাথেই বসলো। সব ক্লাস শেষে রাইসা হাসিমুখে বললো,
 “চল কোথাও বাহিরে ঘুরে আসি”

প্রাপ্তি ঘড়ির দিকে তাকালো। এখন ঘড়িতে ১.১০ বাজে। এখন বাসায় যাবে সে। মামীকে বলেছে ১.২৫ এর মধ্যে বাসায় ঢুকবে। অন্যথা করা যাবে না। তাই বিনা ভনীতায় সে বললো,
 “আমার সময় নেই। তুমি যাও। আমাকে বাসায় যেতে হবে”
 “বাসায় যেয়ে কি করবে? দেখো সবাই ঘুরতে যাচ্ছে”
 “আমি ঘোরাঘুরি পছন্দ করি না”

প্রাপ্তি যে একেবারে যন্ত্রমানবী তা বুঝতে বাকি রইলো না রাইসা। কিন্তু সেও নিরুপায়, প্রাপ্তি বাদে কেউই তার সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী না। তারা অনেক মডার্ণ, ঢাকার মেয়ে। তাদের চালচলন, কথা বার্তা সব-ই উন্নত। রাইসাগ্রামে মানুষ, তার স্কুলও ছিলো অজপাড়াগায়ে। সে এতো সুন্দর ইংলিশ বলতে পারে না। সে তো একটু ভালো ছাত্রী হবার দরুন এই ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। গ্রামের মধ্যে সে একা ইঞ্জিনিয়ার। অথচ মেয়েগুলো দু পয়সার দাম দিলো না। হতাশ হলো রাইসা। তার মুখখানা বসে গেলো। প্রাপ্তির দৃষ্টিগোচর হলো না তা। তাই তার কাঁধে হাত রেখে বললো, 
 “আমরা বৃহস্পতিবার যাব। বইও কিনতে হবে। রুটিন অনুযায়ী সেদিন ল্যাব থাকবে না। ঠিক আছে? আজ আমাকে বাসায় যেতেই হবে”

সাথে সাথে রাইসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। প্রাপ্তির মজা লাগছে। রাইসাকে দেখে পাপিয়ার কথা মনে পড়েছে। পাপিয়া প্রাপ্তির ছোটবোন। সাথে সাথে মনে পড়লো মায়ের সাথে কথা বলা হয় নি। সকালে তাড়াহুড়ো করে আসায় কথা বলার সুযোগ হয় নি। বাসায় যেয়ে সবার প্রথমে তাকে ফোন করবে। বাবার অবস্থাও জানার ইচ্ছে, লোকটি কি এখনো হরতাল করছে? নাকি সাময়িক বিরতি দিয়েছে?

******

প্রাপ্তি পৌঁছাতে পৌঁছাতে একটা পয়তাল্লিশ বাজলো। গ্রীষ্মের তান্ডব তখন প্রচন্ড। ধরণী হাপিয়ে উঠেছে। বাতাসের ছিটেফোঁটা নেই। মামার সাথে কথা বলতে যেয়ে দেরি হয়ে গেলো। ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে বাসার কলিংবেল বাজালো সে। ঘাড় বেয়ে গলগল করে ঘাম নেমে যাচ্ছে। এই শহরে নতুন সে। রিক্সাভাড়া সম্পর্কিত জ্ঞান তার নেই। তাই হেটে এসেছে। যেখানে রাস্তার কুকুরগুলোও এখন ছাওনি খুঁজে বেড়াচ্ছে রোদ থেকে বাঁচতে, সেই কাঠফাঁটা রোদে হেটে এসেছে সে। দুবার কলিংবেল বাজিয়েছে সে, কিন্তু দরজা খুললো না কেউ। প্রাপ্তি ঘড়ি দেখলো। মামী সর্বদা নিয়মের ছকে চলা মানুষ। তার এখন গোসলের সময়। মিরাজভাই বা মম বোধহয় বাড়ি নেই। তাই দরজা খুলছে না। প্রাপ্তি দাঁড়িয়ে রইলো। দরজা খোলা হলো গুনে গুনে বিশ মিনিট পর। এই বিশ মিনিট গরমেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো প্রাপ্তিকে। অন্যের বাড়িতে থাকার এটাই শাস্তি। তোমার কথা চিন্তা করার সময় নেই কারোর। তোমার মেনে চলতে হবে সবার কথা। নিহার বেগম দরজা খুললেন অপ্রসন্ন মুখে। তিনি গোছানো মানুষ, কখনো খারাপ আচারণ করেন না। তবে তার মুখশ্রী বলে দেয় সে তোমার উপর বিরক্ত। প্রাপ্তি ঘরে ঢুকলো। ফ্যানটা ছেড়ে বসলো ডাইনিং টেবিলে। একটু ঠান্ডা হওয়া প্রয়োজন। নিহার বেগম কাঠকাঠ স্বরে বললেন,
 “মিরাজ আর মম বাড়ি নেই। আমি এখন খাবো না। তুমি চাইলে খেয়ে নিয়ে পারো। খাবার আছে রান্নাঘরে”

প্রাপ্তি ছোট করে “আচ্ছা” বললো। তারপর নিজঘরে চলে যাইতে নিলে নিহার বেগম বললেন,
 “ফ্যানটা বন্ধ করে যাও। বিদ্যুৎ বিল অনেক আসছে। আর এসি লাগিও না”

প্রাপ্তি আবার “আচ্ছা” বললো। মামার বাসায় থাকতে তার মোটেই ভালো লাগে না। মামী মুখে না বললেও এমন ভাব দেখান যেনো সে ফকিরের বাচ্চা। জীবনে এসি বা গাড়ি দেখে নি। অন্যের বাসায় থাকা এজন্যই সহ্য হয় না প্রাপ্তির। সে আগেই মামাকে বলেছিলো সে হোস্টেলে উঠবে কিন্তু মামা রাজী হন নি। মামাকে আবার বলবে সে। কিন্তু পরমুহূর্তেই চিন্তা এলো হোস্টেলের ফি দেওয়ার টাকা তো তার কাছে নেই। বাবা পাঠাবে বলে মনেও হচ্ছে না। মার সাথে কথা বলে দেখবে কি? মার কথা মনেই পড়তেই ফোন দিলো, কিন্তু কেউ ধরলো না। মা হয়তো এখনো রান্নাঘরেই। 

****

ক্লাস শেষে ক্যান্টিনের নির্দিষ্ট জায়গায় হুড়মুড় করে এসে বসলো অয়নের দল। ভার্সিটিতে ভর্তি হবার ছয় মাস পর থেকেই ক্যান্টিনের এই টেবিলটা তাদের আড্ডা খানা। বন্ধুদের সুখ, দুঃখ, আড্ডার আস্তানাঘর এই টেবিল। অসহিষ্ণু গরমে ক্যান্টিনটাও আযাবের মত লাগছে। ফলে এসেই শিহাব ক্যান্টিনের সাহায্যকারী এক পিচ্চিকে বললো, 
 “এই পিচ্চি, ফ্যান ছাড়। আর ছুটে গিয়ে একটা ঠান্ডা নিয়ে আয়”
 
ছেলেটা ফ্যান ছাড়লো তবে কাঁধের গামছাটা টেবিলে বাড়ি দিতে দিতে বললো,
 “ঠান্ডা হইবো না। ভাইজান কইছে এহন থেইক্যা কিন্না খাওন লাগবো। বাকি অফ”

শিহাব টাকা বের করতেই যাবে তখনই থামিয়ে দিলো নুহাশ, সকালের অপমান এখনো ভুলে নি সে। উপর থেকে আজকে ক্লাসেও স্যারের বাটা খেয়েছে। হোস্টেলে বাটি পায় নাই। তাই মাথায় এখন আগুন জ্বলছে। ফলে পিচ্চির কথায় আগুনের মাত্রা বাড়লো বৈ কমলো না। সাথে সাথে বলে উঠলো,
 “মামদোবাজী নাকি? তুই কি নতুন এখানে? যায়ে পল্টু ভাইকে বল, নুহাশ এসেছে। শুধু ঠান্ডা না সবার জন্য ভাতও নিয়ে আয়”

পিচ্চি তার কথামত ভেতরে গেলো অবশ্য কিন্তু ফিরলো ফাঁকা হাতে। এসেই টেবিলের উপরের ফ্যানটাও বন্ধ করে দিল, যা দেখে নুহাশ সহ সকলের মুখে বিস্ময়। পিচ্চি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
 “পল্টু ভাইরে আপনের নাম কইছি। আপনের নাম হুইন্নাই কইছে, “টেবিলের ফ্যানডাও বন্ধ কইরে দে”। বাকির খাতা না চুকাইলে কোনো খানা পাইবেন না”
 “পল্টু ভাইয়ের কি মাথা গেছে নাকি?”
 “তা জানি না, তয় এহন থেইক্যা হুদু নগদে খানা পাওন যাইবো”

নুহাশের আজকে দিনটাই খারাপ, প্রথমে ঐ পিদ্দি মেয়ে, তারপর স্যার, এখন পল্টু ভাই। সবাই শুধু অপমান-ই করছে। এদিকে বন্ধুরা অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়লো। শিহাব টিটকারি মেরে বলল,
 “পল্টু ভাই তো তোর মুখের উপর অপমান করে দিলো রে, তোর নাম শুনে ফ্যান অফ করে দিলো। কি সম্মান তোর!”
 “শালার আজ দিন-ই খারাপ। যেয়ে দেখ পল্টু ব্যাটার বউ মনে হয় রোমান্স করতে দেয় নি বলে তার মেজাজ খারাপ। ধ্যাত। সব হচ্ছে অয়নের জন্য। অথচ একে দেখে ঠিক প্রেমে ব্যস্ত”

অয়ন তখন গভীর মনোযোগে তার ফোনে চ্যাটিং করতে ব্যস্ত। নুহাশের মেজাজ আরোও খিঁচলো। হিনহিনে স্বরে বললো,
 “আর কত প্রেম করবি রে শালা, ম্যাসেজেই বিয়ে করে নিবি নাকি?”

অয়ন এবার মোবাইল থেকে চোখ তুললো। নুহাশ ভীমক্ষেপা। তাই এখনো মোবাইল রেখে দেওয়াই শ্রেয়। তাই অয়ন মোবাইলটা বা সাইডে রেখে পকেট থেকে কড়কড়ে দুটো এক হাজার টাকার নোট বের করে পিচ্চি ছেলেটাকে দিয়ে বললো,
 “যাও পাঁচটা ভাঁত, দুটো ডাল, তিনটে সবজি, পাঁচটা মুরগী আর পাঁচটা ঠান্ডা নিয়ে এসো। বাকি যা উফুরকে এই নুহাশের খাতায় জমা করে দিও”

পিচ্চি ছেলেটি টাকা নিয়ে চলে গেলে অয়ন চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিলো। বা হাতে কপালের চুলগুলো পেছনে টানতে টানতে বললো,
 “হ্যা, এবার বল কি বলছিলি?”
 “বলছি তুই প্রেম করতে করতে টায়ার্ড হোস না?”
 
অয়ন হতবাক স্বরে শুধায়,
 “কে প্রেম করে? আমি ওসব নোংরা কাজে নেই ছিঃছিঃ। আমার মত ভালো ছেলেকে বদনাম করিস না”

বেশ ঢং করে অয়ন কথাটা বললো। সাথে সাথেই নুহাশ মুখ ভেঙচালো,
 “না না তুমি প্রেম কর না, তো এতোক্ষণ কি করছিলা? এমেরিকার খোঁজ?”

নুহাশের কথায় হাসলো অয়ন। অয়ন তার হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বললো,
 “কবিতার সাথে কথা বলছিলাম, মেয়েটার মন খারাপ। আমার আবার মেয়েদের মন খারাপের বিষয়টা ভালো লাগে না। নিতে পারি না, কষ্ট হয়। কোনো সুন্দরী মেয়ে মন খারাপ করবে, এটা দেশ ও জাতির প্রতি অন্যায়”
 “ওরে আমার দেশ দরদীরে! এই কবিতাটা কে?”

অয়ন উঠে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ হেসে বললো,
 “ফ্রেন্ড”
 
সাথে সাথেই শিহাব মজার ছলে বললো, 
 “তোর কত ফ্রেন্ড রে? সত্যি করে বল, ফ্রেন্ড নাকি গার্লফ্রেন্ড? পৃথিবীর সব মেয়েরা খালি তোমার ফ্রেন্ড-ই হয়”
 “ওই আরকি! যা ভেবে তোরা শান্তি পাস”
 “তো শিলার কি খবর? যার সাথে কিছুদিন আগে রিক্সায় ঘুরছিলে?”
 “বড্ড পাকাও ভাই। আমি ওকে ব্লক করে দিয়েছি”
 “বাহবা! দশদিনেই মন উবে গেছে? তো এই কবিতার সাথে পিরিতি কয়দিন চলবে?”

অয়ন গোনার ভান করে বলল, 
 “জানি না। যতদিন না সে আমার প্রেমে পড়বে, আই এম ওকে উইদ ইট”

অয়নের কথা শুনে নুহাশ রেগে বললো,
 “শালা, তুমি মাইয়্যাগোর লগে পিরিতি করে কথা কইবা আর যখন সে তোমার প্রেমে পড়বে তখনই তুমি নাক শিটকাবা! মশকরা?”

নুহাশের কথাশুনে পোঁড়া ঠোঁট বিস্তৃত হয়। তার কাঁধে হাত রেখে বলে,
 “মেয়েরা আমাকে একা ছাড়ে না, আমার কি দোষ? আমি আবার পিওর জেন্টালম্যান, কোনো মেয়েকে কষ্ট দিতে পারি না। সুন্দরী মেয়েদের তো একেবারেই না। তাই তো কথা বলি, ঘুরে বেড়াই, হাসি তামাসা করি। কিন্তু প্রেম, নো, নো, নো। নো ওয়ে। একদম প্রথম দিনেই খাস বাংলায় বলে দেই, “মাফও চাই, দোয়াও চাই। তবে প্রেম আমি করবো না”। এই অয়ন শিকদার প্রেমের জন্য তৈরি-ই না। সব করবো কিন্তু প্রেম না। প্রেম করলে কমিটমেন্ট দিতে হবে, কমিটিমেন্ট দিলে বিয়ে। ভাই, আমি এই বিয়ে নামক খড়ার নিচে মাথা দিব না, নো নেভার কাভি নেহি”

 বলেই হাত মুখে ধুতে যাবার জন্য পা বাড়ায়। পেছন থেকে নুহাশ বিদ্রুপ করে বলে উঠে,
 “বাছা, বেশি উড়ো না। যেদিন প্রেমে পড়বা না, একেবারে হাটু ভেঙ্গে পড়বা”

অয়ন সদর্পে উত্তর দিলো,
 “তেমন মেয়ে এখনো জন্মায় নি যে আমাকে প্রেমে ফেলে! আমার হৃদয়ের গেটে তালা ঝুলছে। চাবি আমি হারিয়ে ফেলেছি। তাই তুই আমার প্রেমের চিন্তা না করে ঐ ক্ষেপাটে মেয়ের ডিটেইলস জোগাড় কর।”
“কেনো তার সাথেও টাইমপাস করবি?”
“হু নোস?”

বলে হাসতে হাসতে ওয়াশরুমের দিকে যেতে লাগলো। তখনই একটি মেয়ে তাকে ডাকলো। শিহাব, নুহাশ এবং বাকিদের দেখিয়ে বলল,
 “দেখ, আরেকটা প্রপোজাল”
 “আর এর অবস্থাও হবে সকালের মত। শালা মেয়েগুলো আমাদের দেখে না কেনো?”

এরমধ্যে পলাশ এসে ধরাম করে ব্যাগটা রাখলো টেবিলে। শব্দ করে বসলো পা ছড়িয়ে। নুহাশ হেসে বললো,
 “কি রে, মোতালেব স্যারের সাথে রোমান্স শেষ?”
 “মুখ খারাপ করিস না আমার, খাচ্চর ব্যাটা আমার পেজেন্টের নাম্বার দিলোই না। শুধু তাই না, মোতালেব স্যার বলেছে এই সেমিস্টারে ক্লাস না করলে উনি কাউকে মার্ক দিবে না, এক্সামে বসতে দিবে না”

কথাটা শোনা মাত্র নুহাশ হাসতে হাসতে বললো,
 “এই সেমিস্টারে তাহলে মজা হবে। মোতালেব ভার্সাস অয়ন। সকাল আটটায় নিখুঁত বিনোদন”

পলাশ তখন মিচকে হাসি দিয়ে বললো,
 “তার থেকেও বড় বিনোদন শুনবি?”
 “কি?”
 “ওই যে সকালের ক্ষেপাটে মেয়েটা…ও মোতালেব স্যারের ভাগ্নি”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp