বাসা থেকে বেড়িয়ে নিহিন একটা রিকশা নিল। ১০ মিনিটের পথ। যেন শেষই হচ্ছে না। নিহিনের হাত পা কাঁপছে, রিকশা শক্ত করে ধরে রেখেছে, তবু মনে হচ্ছে পড়ে যাবে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। হাতের চামড়ার নিচে অদ্ভুত একটা শিরশিরানি হচ্ছে! হাতটা কেটে ফেলে দিতে ইচ্ছা করছে। যেতে পারবে তো ঠিকমতো? কথা বলতে পারবে তো? নাকি প্রেস্টিজের বারোটা বাজিয়ে আসবে!
রেস্টুরেন্টে বসতেই কল্প বলল, “আন্টিটা এখনও আসেনি না?”
“না।”
“মেয়েরা অলওয়েজ লেট করে পাপ্পা।”
“আরে আমার মেয়ে বিশারদ রে!”
“বিশারদ কী পাপ্পা?”
“বিশারদ হচ্ছে স্পেশালিষ্ট।”
“ও, বাট পাপ্পা আই এম নট আ স্পেশালিস্ট! আমাদের স্কুলে এসেম্বলি শুরু হয়ে যাওয়ার পর যারা আসে তারা সবাই মেয়ে। ছেলেরা এসেম্বলির আগেই আসে সবাই, তাই বলেছি।”
“হুম, এমনও তো হতে পারে যে মেয়েরা লেট হয়ে গেলেও আসে বাট ছেলেরা লেট হলে আর আসে না। ঘুমিয়েই থাকে। সো তাদেরকে কীভাবে আইডেন্টিফাই করবি?”
এ প্রশ্নে চিন্তায় পড়ে গেল কল্প। কলরব বলল,
“এত চিন্তা করা লাগবে না। ৫ টায় আসার কথা, এখন পৌনে ৫ টা বাজে।”
“পোনে জানি কী?”
“পোনে না পৌনে।”
“একই কথা।”
“না, ভুল বাংলা আমি পছন্দ করি না, জানিস না?”
“উফ্ তুমি বলবে পোনে মানে কী?”
“মানে ৫ টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি।”
“আমরা এত্ত আগে এসেছি কেন?”
অবাক হয়ে বলল কল্প। কলরব বলল,
“ওই যে ছেলেরা আগে আসে তাই।”
“পাপ্পা, এসির মধ্যেও তুমি ঘামছ কেন?”
থতমত খেয়ে গেল, আসলেই একটু বেশিই ঘামছে। নিজের এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথেই তো দেখা করতে এসেছে, এত নার্ভাস হওয়ার কী আছে? ধুর মান-ইজ্জত সব যাবে মনে হচ্ছে। কোনোমতে বলল,
“আজ অনেক গরম পড়েছে তাই ঘামছি।”
“কিন্তু আমি তো ঘামছি না।”
“বাপ একটু চুপ কর, তোর এত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি।”
কল্প কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল ওদের টেবিলের দিকে খুব সুন্দর একটা মেয়েকে আসতে দেখে। কলরব কল্পর দৃষ্টিকে অনুসরণ করতেই নিহিনকে দেখতে পেল। কলরবের মনে হচ্ছিল সে হাওয়ায় ভাসছে। এত সুন্দর একটা মানুষ হয় কী করে? ইস ওকে যদি নিজের করে নেওয়া যেত সারাজীবননের জন্য! সেগুড়ে বালি! কোনোমতে কলরব বলল,
“অবশেষে ম্যাডামের দেখা পাওয়া গেল। বসো।”
নিহি প্ৰচণ্ড নার্ভাস। বসতে বসতে বলল,
“আমি কি অনেক দেরি করে ফেলেছি?”
“না আমরাই একটু আগে এসেছি, ওদিকটায় জাম থাকে, তাই আগেই বেড়িয়েছিলাম।”
এতক্ষণ কল্প নিহিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ বলে উঠল,
“তোমাকে আমি আগেও দেখেছি। কিন্তু কোথায়?”
মনে করার চেষ্টা করতে লাগল কল্প। নিহিন কল্পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাই? কোথায় দেখা হয়েছে বলতো? আমারও তো মনে পড়ছে না।” কলরব অবাক হলো আর তার চেয়েও বেশি ভয় পেয়ে গেল। নিহিন অনেক বড় হয়েছে আর অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবু কল্পর চেনা চেনা লাগছে, ধরে ফেলবে না তো? তাহলে বিপদের শেষ থাকবে না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল, আর কথা এড়ানোর জন্য বলল,
“আচ্ছা, পরিচয় করিয়ে দেই উনি আমার ছেলে কল্প। সুন্দরী মেয়েদের আবার ওনার খুব চেনা চেনা লাগে।”
নিহিন আর কল্প দুজনেই লজ্জা পেয়ে গেল।
হাফ ছেড়ে বাঁচল কলরব। কিন্তু ব্যাপারটা কল্প ভুলে না গেলে আবার একশো টা প্রশ্ন করে মাথা খারাপ করে দেবে।
খেতে খেতে অনেক গল্প হলো, অপ্রয়োজনীয় সব কথা। বেশির ভাগই কল্পকে নিয়ে, আর কল্প বলছে কলরবকে নিয়ে, আর নিহিন তৃপ্ত এক শ্রোতা। যা মনে আসছে তাই, তবু যেন অনেক না বলা কথা বলা হচ্ছে, অনেক প্রশান্তি। তারপর একসময় কল্প বলল,
“পাপ্পা আমি চাইল্ড জোনে গিয়ে খেলি?” কলরব বলল,
“আচ্ছা যা, সাবধানে।”
“ওকে পাপ্পা।”
কল্প চলে যাওয়ার পর নিহিন বলল,
“ও খুব লক্ষী না?”
“কী দেখে মনে হলো?”
“এই যে পারমিশন নিয়ে গেল। তুমি যেতে বলার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল।”
“হুম এটাকে যদি লক্ষ্মী বল, তাহলে ও লক্ষ্মী। বড়দের সাথে কখনো বেয়াদবি করে না। আর আমাকে প্রচণ্ড ভয় পায়। কখনো মারি না কিন্তু ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করি।
“কী সাংঘাতিক বাবা তুমি!”
“এরকম না হলে ওর মতো দুষ্টু ছেলে দিনের মধ্যে দশবার আমাকে কিনতো আর বেচতো।”
নিহিনের চোখের সামনে চুল এসে পড়ছে বারবার। আর নিহিন হাত দিয়ে সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিচ্ছে। কলরবের ইচ্ছে করছে নিহিনের হাতটা সরিয়ে নিজেই করুক এ কাজটা, কত করেছে একসময় যা এখন অসম্ভব। ইচ্ছের কথা বলতে না পেরে বলল,
“তোমার চুলগুলো কত বড় হয়ে গেছে। তোমাকে বড় চুলেই মানায়।”
“আমি বড় হয়েছি যে, তাই।”
বলেই আবার হেসে ফেলল নিহিন। কলরব এমন ড্যাবড্যাব করে
তাকিয়ে আছে যে নিহিন তাকাতেই পারছে না। কলরব বলল,
“তোমার হাসিটা আগের মতই সুন্দর আছে।”
“তোমার চোখে।”
“কখনোই না, আচ্ছা তোমার গালে এ তিলটা কি নতুন হয়েছে?”
“কই না তো, আগেও তো ছিল।”
“নাহ আমার স্পষ্ট মনে আছে তোমার গালে কোনো তিল ছিল না।”
“ও হ্যাঁ, হয়তো তখন ছিল না। তবে অনেকদিন আগেই এটা হয়েছে, ঠিক জানি না।”
“হুম, তুমি হাসলে তোমার গালে যে বাঁকা একটা ভাঁজ পড়ে সেটা আগেও বলেছি জানি না তোমার মনে আছে কি না, তিলটা ঠিক সেই ভাঁজের ওপরেই, অসাধারণ!”
নিহিন লজ্জা পেয়ে গেল। কিছু বলতে পারল না, শুধু মিটিমিটি হাসল। কলরব বলল,
“তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ, এই এত লজ্জা পাওয়াটা তার আরেকটা উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ইউক একটা বাচ্চা ছিলে। তখনও লজ্জা পেতে কিন্তু এত না।”
এবার একটু জোরেই হাসল নিহিন। বলল,
“হুম, আমি তো বড় হয়েছি, আর তোমার তো আমুল পরিবর্তন। যাকে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছাড়া জীবনে দেখিনি, তাকে আজ ক্লিন শেভে দেখছি, অপরিচিত লাগছে।”
“সবই তোমার বাবার কৃপা।”
“আমার বাবা!”
অবাক হলো নিহিন, কলরব ওর দুষ্টু হাসিটা বজায় রেখেই বলল,
“অবশ্যই, আমি চেয়েছিলাম গায়ক হতে, পড়াশুনায় মন ছিল না কখনো। আর তোমার বাবা চেয়েছিল কর্পোরেট জামাই। তোমার বাবার ইচ্ছে রাখতে গিয়ে তার মেয়েকে পাবার লোভে সেই যে গান ছেড়ে পড়াশুনায় মন দিলাম, তখন থেকেই ক্যারিয়ারের প্রতি খুব সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ব্যাংকে চাকরির একটা অফার পেলাম, ব্যস চোখ বন্ধ করে ঢুকে গেলাম, এমবিএর পর প্রোমোশন হলো। মনে হলো তোমার বাবার দৃষ্টিকোণ থেকে এবার বোধহয় যোগ্য হতে পেরেছি। তারপর তোমার বাবার সাথে দেখা করতে গেলাম, আমার কি কপাল দেখ, ততদিনে তার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল!”
নিহিন অন্য দিকে তাকাল। কলরব বুঝল না ওর মন খারাপ হলো নাকি অপরাধবোধ? তবে এটা শিওর হলো বিয়ের ঘটনা সত্যি। বলল,
“আমি জানি তোমাকে যদি জানানো হতো সব কথা, তাহলে তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করতে।”
“কিন্তু আমি অপেক্ষা করিনি।”
“আমি কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলাম তাই।”
নিহিন অন্যদিকে তাকিয়ে চুপ করেই রইল। কলরব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যই বলল,
“যাই হোক তোমার বাবার কৃপায় এ কর্পোরেট দুনিয়ায় আসা। ভালোই টাকা-পয়সা দিত ওরা, জানোতো পকেটে যথেষ্ট টাকা-পয়সা থাকলে নিজেকে রাজা রাজা মনে হয়। তোমাকে না পেয়ে দেবদাস অবশ্য হওয়া যেত কিন্তু অত সাহস নেই। তাই আর অন্যদিকে না গিয়ে এ ব্যাংকেই খাটতে লাগলাম। যার ফলশ্রুতিতে আবার প্রোমোশন হয়েছে, পকেট আরো ভারী হয়েছে, আরো শান্তি বেড়েছে তাই এখানেই লেগে আছি আজও। তাই ডেইলি শেভ করতে হয়, তবে আমার এই দাড়ি বিসর্জনের কারণে গাল ফুলানোর মত এখন আর কেউ নেই।”
নিহিনের মনে পড়ল, অনেকদিন পরও যদি কলরব শেভ করত তাহলেও নিহিন রাগ করত, তারপর গান শুনিয়ে রাগ ভাঙাতে হতো। সেজন্যই এ কথা বলল কলরব। তখন ব্যাপারগুলো অনেক স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু এখন লজ্জা লাগছে নিহিনের, ধুর এসব কথা কেন যে তুলতে গেল। নিহিনকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে এবার কলরব সিরিয়াস হলো,
“তবে আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে আমার জীবনের সব সাফল্যের দাবিদার তোমার বাবা। আমি মন থেকে ওনাকে শ্রদ্ধা করি। উনি সেদিন ওভাবে না বললে কখনো এতটা সিরিয়াস হতাম না ক্যারিয়ারের প্রতি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলাম, তারা কখনোই শাসন করেনি। যা মন চাইতো তাই করতাম, ওরকম থাকলে হয়তো আজও স্টুডেন্টই থেকে যেতাম কিংবা ভবঘুরে!”
এসব কথা শুনতে শুনতেই নিহিন হঠাৎ বলে উঠল,
“বিয়ে করোনি কেন এখনো?”
হেসে ফেলল কলরব। বলল,
“স্পাই টা কে বলো তো? খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তোমার আমার মধ্যে মিউচুয়াল এমন কে আছে গোপন কথা পাচার করার মত! আর যদি থাকেই তবে আগে কোথায় ছিল?”
“স্পাইটা হলো সাব্বির।”
চমকে উঠল কলরব,
“সাব্বির মানে… সাব্বির রাহমান? ফিউচার ব্যাংকের?”
“হুম।”
“ওকে তুমি কীভাবে চেনো?”
“আমার খুব কাছের বন্ধু।
“বলো কী! ওর সাথে কালকেও একসাথে লাঞ্চ করেছি। কিছু বলল না আমাকে।”
“আমি নিষেধ করেছিলাম বলতে।”
“ওকে ধরতে হবে, ভাই আগে না বন্ধু আগে? আচ্ছা ভালো কথা, ও আবার আমার গোপন সব কথা ফাঁস করে দেয়নি তো?”
“করতেও পারে!”
মিটিমিটি হাসছে নিহিন। ও হাসলেই তিলটাতে চোখ আটকে যাচ্ছে, এই মেয়ে মনে হচ্ছে ব্রহ্মচারিত্ব ঘুচিয়ে দেবে এবার। কলরব মনোযোগ অন্য দিকে নেয়ার চেষ্টা করল। বলল,
“আমার বিয়ের কথা কল্পর সামনে ভুলেও বলতে যেও না। তাহলে তোমাকে দেখতেই পারবে না আর।”
“কেন?”
“আত্মীয়স্বজনরা আর বাবা যখন আমাকে বিয়ে করতে বলে তখন ও খুব রেগে যায়।”
“রেগে যায় কেন?”
“ওর মনের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে ওর বাবা বিয়ে করলে এখনকার মত আর ভালোবাসবে না। নতুন মাকে ভালোবাসবে।”
“এগুলো তুমি ঢুকিয়েছো ওর মাথায় না?”
কলরব হেসে বলল,
“ছি ছি, আমি কেন ঢুকাব? আমি শুধু বলেছি আমি বিয়ে করলে ওর মা কষ্ট পাবে। ওর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ওর মা।”
চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল নিহিনের। বলল,
“তুমি সত্যি বড় বেশি সাংঘাতিক হয়ে গেছ। ছি, এইটুকুন বাচ্চার দুর্বলতার সুযোগ কেউ নেয়?”
আবার হাসল কলরব। বলল,
“তুমি বুঝবে না। যাই হোক, আমার কথা বাদ দাও, তোমার কথা বলো। বিয়ে তো হয়েছিল তাহলে সিংগেল কেন?”
“সংসার ভেঙে গিয়েছিল।”
“কীভাবে?”
“আমি বলতে পারব, তুমি সহ্য করতে পারবে না তার চেয়ে থাক, বাদ দাও এসব কথা।”
·
·
·
চলবে...................................................................................