“ওই যে সকালের ক্ষেপাটে মেয়েটা…ও মোতালেব স্যারের ভাগ্নি”
কথাটা শুনতেই মুখ হা হয়ে গেলো নুহাশের। মোতালেব স্যার? সে তো অয়নের শত্রু। মোতালেব সাহেবের অয়নকে অত্যধিক অপছন্দ। লোকটি পঁচিশ বছর শিক্ষকতা করার দরুন বেয়াদবি আর উদ্ধত্য আচারণ তার অতীব চক্ষুশুল। ছাত্রদের মধ্যে প্রচন্ড খচ্চর শিক্ষক সে। আর মোতালেব স্যারের মতে অয়ন অত্যধিক বেয়াদবের পর্যায়ে পড়ে। কারণ একবার অয়নের বাইকে এক্সিডেন্ট করেছিলেন তিনি। ফলে এক সপ্তাহ প্লাস্টার লাগিয়ে রাখতে হয়েছিলো মোতালেব স্যারকে। যদিও দোষটা তার ছিলো। তিনি কানে ফোন লাগিয়ে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। সে তো ভাগ্য ভালো ছিলো অয়ন ঠিক সময়ে ব্রেক কষেছিলো। কিন্তু সেটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তার বিশ্বাস সে ঠিকভাবে রাস্তায় তাকিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ফোন কানে তাতে কি, চোখ তো রাস্তায় ছিলো। তার দৃঢ় বিশ্বাস অয়ন ইচ্ছেকৃতভাবেই তাকে আহত করেছে। সেই থেকে অয়নের প্রতি সূক্ষ্ণ রাগ তার। অয়ন তার চিকিৎসার পুরো খরচ দিয়েছিলো। তার কাছে অনেকবার ক্ষমাও চেয়েছে। কিন্তু অয়ন আর তার সম্পর্ক মোটেই ভালো হয় নি। নুহাশ কপালে হাত দিয়ে বললো,
“অয়নের খবর আছে। মামার পা ভাঙছে, ভাগনীকে র্যাগ দিছে। মামা-ভাগ্নী ওর জীবনে আগুণ জ্বালায়ে দিবে শিওর”
অয়ন হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলো। নুহাশের বর্ণহীন মুখখানার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“কি হইছে? হাওয়া উড়ে গেছে কেন?”
“দোস্ত, তোর কপালটারে দেখতেছি। একেবারে সোনা দিয়ে বাঁধানো কপাল”
কথাটা বুঝতে পারলো না অয়ন। তার আগেই ফোন বাজলো। ফোনের দিকে তাকাতেই মুখ মিয়ে গেলো। ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম “আরিফুল শিকদার”। অয়ন ফোনটা কেটে নুহাশকে বললো,
“আজ থেকে কিছুদিন তোর মেসে থাকবো? সমস্যা নেই তো?”
“আমার কি সমস্যা? কিন্তু কথা সেটা না দোস্ত”
“খা না, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না”
*******
ঠিক আটটা পনেরোতে মিরাজ ফিরলো বাসায়। বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করে সে। মিরাজ ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই নিহার বেগম ছেলেকে বললেন,
“হাত মুখ ধুয়ে এসো, খাবার দেই”
এই বাড়ির নিয়ম নয়টায় খেয়ে যে যার ঘরে চলে যাবে, তারপর তুমি ঘুমাও নাকি হাডুডু খেলো কিচ্ছু যায় আসে না। আবার সকাল ছয়টার মধ্যেই তোমাকে বিছানা ছাড়তে হবে। কারণ ছয়টার সময় ছোটা কাজের মানুষটা আসে। মাত্র দুটো কাজ করে সে। মোতালেব সাহেব সরকারী চাকুরিজীবী। মিরাজতো এখন চাকরি পেয়েছে, কিন্তু সারাটাজীবন তো নিহার বেগমকে বাধা ধরা টাকাতেই সংসার চালাতে হয়েছে। তাই এখনো সেই অল্প টাকায় সংসার চালানো এবং মিতব্যায়ীতা তার যায় নি। তিনি ডর্মেও থাকেন না। কারণ ডর্মে যদিও অনেক বড় ফ্লাট পাবেন তিনি কিন্তু ভাড়াটা অনেক বেশি। এতো বড় ফ্লাটের প্রয়োজনীয়তা নেই নিহার বেগমের। তিনি সারাটাজীবন কঞ্জুসি করে এখন নিজের তেরশ স্কোয়ারফিটের একটি ফ্লাট কিনেছেন। নিজের বাসা, বাড়তি কোনো খরচ নেই। অথচ এখনো তার কঞ্জুসি কমে নি। মিরাজ ব্যাগ রাখতে রাখতে বললো,
“এখন খাব না মা, আমি বরং প্রাপ্তির সাথে একটু কথা বলে আসি। নতুন ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস করা শেষ। অনুভূতি কেমন জেনে আসি”
তখন নিহার কড়া স্বরে বললেন,
“প্রাপ্তির থেকে একটু দূরত্ব রাখো”
নিহার বেগম স্বল্পভাষী। বেশি কথা বলতে তার কার্পণ্য। প্রাপ্তির সাথে তার স্বভাবের মিল আছে অনেক। তারা দুজন-ই অমিশুক। কিন্তু মিল থাকলেই যে একে অপরকে পছন্দ করে এই কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। সেই বিষয়টাই প্রমাণ করলেন নিহার বেগম। তিনি প্রাপ্তিকে অপছন্দ করেন। তিনি প্রাপ্তির মা মুনিরাকেও অপছন্দ করেন। নিজের গন্ডি ব্যাতীত কাউকেই তার পছন্দ হয় না। প্রাপ্তিকে অপছন্দের আরেকটি কারণ অবশ্য আছে সেটা হলো মিরাজ এবং প্রাপ্তির সখ্যতা। একই ভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র হবার দরুন সে প্রাপ্তির প্রতি বেশ যত্নশীল। বিষয়টা ভালো লাগছে না নিহার বেগমের। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে, প্রেম ভালোবাসার তো স্টেশন নেই। প্রাপ্তিকে তিনি মোটেই নিজের ছেলের বউ রুপে মানবেন না। সম্ভব নয়। ফলে মিরাজ আসতেই যখন প্রাপ্তির ঘরের দিকে যাচ্ছিলো তখন ই বাধা দিলেন। মা অল্প কথা বলে, তাই স্বভাবতই অবাক হলো মিরাজ। ঠোঁট ফাঁক করে শুধাল,
“কেন?”
“সব কেনোর উত্তর নেই”
মিরাজ কথা বাড়াতে যেয়েও সুযোগ পেলো না। নিহার বেগম নিজ ঘরে চলে গেলেন। মিরাজ বিরক্ত হলো। মায়ের স্বভাব মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত করে।
****
রাতের খাবার টেবিলে মিরাজভাইয়ের সাথে সদেখা হলো প্রাপ্তির। প্রাপ্তি চুপচাপই খাচ্ছিলো। মিরাজ তখন জিজ্ঞেস করলো,
“ভার্সিটি কেমন লাগছে?”
নিহার বাঁকা চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। ছেলেটা আসলেই একটা বেয়াদব। মা বারণের পরও কথা শুনে না। প্রাপ্তি খেতে খেতেই উত্তর দিলো,
“ভালোই, খারাপ না। তবে তুমি কিন্তু আমাকে র্যাগের ব্যাপারটা বল নি”
র্যাগের কথা শুনতেই মিরাজ এবং মোতালেব সাহেব একত্রে চাইলেন প্রাপ্তির দিকে। মিরাজ অবাক স্বরে শুধালো,
“তোমাকে র্যাগ দিয়েছে নাকি?”
“চেষ্টা করেছে। তবে ঠিক দিতে পারে নি। আর আমি অবশ্য একটা কেরামতি করবো ভাবছি”
মোতালেব সাহেব আদুরে কন্ঠে শুধালেন,
“কি কেরামতি মা?”
“ভেবেছি সবাইকে জানিয়ে দিবো, আমি আপনার ভাগ্নী। সবাই আপনাকে সম্মান করে এবং ভয় পায়। তাই আমাকে আর ঘাটাতে আসবে না”
প্রাপ্তির কথায় হো হো করে হেসে উঠলেন মোতালেব সাহেব। মম মুগ্ধ কন্ঠে বললো,
“তুমি তো খুব বুদ্ধিমতী”
নিহার বেগম মুখ বাঁকালেন। তাচ্ছিল্য করে বললেন,
“এখানে বুদ্ধির কি হলো মম? তোমার বাপের নাম ভাঙ্গিয়ে সবাই খায়”
কথাটা বিষাক্ত কটাক্ষ হলেও প্রাপ্তির ভাবলেশহীন। গায়ে মাখালো না। মান অপমান শব্দগুলোর তাৎপর্য্য কেবল গায়ে মাখানো অবধি। এছাড়া এরা কেবল ই শব্দ মাত্র। মোতালেব সাহেব স্ত্রীর কথাটা আমলে নিলেন না। মিরাজ এবং মম খানিকটা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না। প্রাপ্তি খাওয়া শেষেই উঠে বললো,
“আমার খাওয়া শেষ মামি”
“বাসনটা ধুয়ে রেখো। এ বাসায় সবাই সবার প্লেট ধুয়ে ফেলে”
“জি”
কথাটা বলার প্রয়োজন ছিলো না। প্রাপ্তি নিজ থেকেই ধুয়ে রেখে দিতো। কিন্তু নিহার বেগম তাকে তবুও কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলেন।
***
প্রাপ্তি ঘুমায় মমর ঘরে। মেয়েটা প্রচুর পাঁকা। যদিও প্রাপ্তির থেকে এক বছরের ছোট কিন্তু তার চলাফেরা একেবারে বড়দের মত। প্রেম করে একটা ছেলের সাথে। প্রতিদিন রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা তারা শুধু কথাই বলে। এখন মম মিরাজের ঘরে গিয়েছে, সেই ফাঁকে প্রাপ্তি মাকে ফোন দিলো। সারাদিন মায়ের সাথে কথা হয় নি তার। এবার ফোন দেবার সাথে সাথেই ধরলেন মুনিরা বেগম,
“হ্যালো?”
“মা, ভালো আছো?”
ওপাশ থেকে মৃদু স্বর শোনা গেলো,
“আমি ভালো আছি রে মা, তুই ভালো আছিস?”
“হ্যা, আলহামদুলিল্লাহ”
“ক্লাস কেমন হলো?”
“ভালো”
“বন্ধু হলো?”
“বন্ধু দিয়ে কি হবে মা?”
মুনিরার প্রশ্নে একটু বিরক্তি নিয়েই উত্তর দিলো প্রাপ্তি। মুনিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফোনে। তারপর কথা পাল্টে শুধালে,
“খাইসোস নি?”
“হ্যা, খাইছি। যদিও খাইতে ইচ্ছে করতেছিলো না, কিন্তু না খেলে তো গায়ে শক্তি পাবো না”
মুনিরা একটু চুপ থেকে শুধালেন,
“ভাবী কিছু বলছে?”
“তোমার ভাবী কি বলার মানুষ? আকার ইঙ্গিতে বুঝায়”
মুনিরা নিজের ভাবীর স্বভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তবুও ঠেকায় পড়ে মেয়েকে সেই বাড়িতে রেখেছে। ওই শহরে পরিচিত কেউ নেই। প্রাপ্তি মেয়েটি হিসেবে অতটা চঞ্চল বা চতুর নয় বলে মুনিরার ধারণা। কারণ তাকে কখনো দরকার ছাড়া নিজ ঘর থেকে বের করা যেতো না। তাই অচেনা শহরে পরিচিত কারোর কাছে না রাখলে মেয়ের যদি বিপদ হয়। তাই সে বাধ্য হয়েই ভাইয়ের বাসায় রেখেছে। প্রাপ্তি কিছু সময় পর ধীর স্বরে বললো,
“আচ্ছা মা আমাকে কি আলাদা ছয়হাজার টাকা প্রতি মাসে দেওয়া যাবে? হোস্টেল ফি এখানে ছয়হাজারের মত।”
“তোমার আব্বা পড়াইতেই চায় না, আবার টাকা দিবে?”
“বুঝলাম। আচ্ছা লাগবে না। আমি ম্যানেজ করে নিব। এখানে অনেকেই টিউশন করায়”
“তুমি অচেনা শহরে কি করে ম্যানেজ করবা? থাক দরকার নাই, তুমি কিছু করবা না। আমি দেখতেছি”
এর মাঝেই ফোনের ওপাশ থেকে একটা কর্কশ কন্ঠ কানে এলো,
“ভাইজানরা আইতেছে ভাবী। ভাত হইছে?”
কণ্ঠটা প্রাপ্তির চাচির। ফলে প্রাপ্তি সাথে সাথেই ঝাঁঝালো স্বরে বললো,
“তোমার দেবরের বউকে বলো, হুকুম না দিয়ে তারে বলো আইসে ভাত রাধতে। যতসব”
“ছেলের মা সে, সে কি আর ভাত রাধবে?”
ভর্ৎসনা করে কথাটা বললো মুনিরা। সেই সাথে প্রকাশ ফেলো অপ্রকাশিত কিছু কষ্টের ধার। প্রাপ্তি উপস্থিত না থেকেও উপলব্ধি করতে পারলো। মা-মেয়ের সম্পর্ক বুঝি এমনই হয়। প্রাপ্তি আশ্বস্ত গলায় বলল,
“মা, যেদিন আমি চাকরি পাবো তোমাকে আর পাপিয়াকে এখান থেকে নিয়ে যাব। তোমার ওই বুইড়া থাক তার মা আর ভাই বোনের সাথে। বুঝবে তখন কত ধানে কত চাল!”
“ছিঃ এমনে বলে না, বাবা হয় তোমার”
“জানি, তাই তাকে বলার অধিকার আমার আছে। অন্য কেউ বললে জিভ খুলে ফেলব। তা সে কি এখনো আন্দোলন করতেছে?”
“হ্যা, তাতে ফাঁক নেই। কাল রাতেও অনেকক্ষণ ভাষণ দিলেন। ফতুয়া শোনালেন। মেয়ে বড় হলে বিয়ে দেওয়া উচিত, হেন তেন। আর দাদীকে তো চিনিস ই”
“ভালো, তাদের বল চিল্লায় যেতে। অন্তত আসল হাদিস জেনে আসবে। আচ্ছা, রাখছি। নয়তো তোমার শ্বাশুড়ি আর দেববের বউ আবার মুখ কালো করবে”
মুনিরা হাসলো। ভাগ্যিস মেয়েটার অনুভূতিগুলো শীতল। নয়তো এই অদ্ভূত কারাগারে সে এতোগুলো বছর থাকতে পারতো না। মজুমদার বাড়ির স্বৈরাচারী শাসক জামশেদ মজুমদারের সাথে আন্দোলনও করতে পারতো না। মজুমদার বাড়িতে মেয়েদের থেকে ছেলেদের মূল্য বেশি। এই বাড়িতে পুত্র মানেই সোনার খনি। পুত্র না যেনো সাত রাজার ধন। আর কন্যা তো পরের বাড়ি চলে যাবে। সে থাকা আর না থাকা দুই ই সমান।
প্রাপ্তির ছোট চাচার দুই পুত্র আস্তো অকর্মার ঢেকি। অথচ তাদের আদর সম্ভাষণের কমতি নেই। অথচ মুনিরার তিন কন্যা যদি আকাশের তারাও খুলে আনে তবুও তাদের কোনো মূল্য নেই। এই রীতির প্রত্যাবর্তক হলেন স্বৈরাচারী শাসকের জননী, অর্থাৎ প্রাপ্তির দাদীর। মুনিরার যখন তৃতীয়বার কন্যা হলো, পুত্রের বংশপ্রদীপ না থাকার কষ্টে তিনি তো প্রায় পরলোকেই চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যাওয়া হয় নি। ফলে তিনি এখনো স্বৈরাচারী শাসক জামশেদের প্রধান উপদেষ্টা হয়েই আছেন আর ভাই বোন প্রতিটি একটার থেকে আরেকটা বুদ্ধিদীপ্ত সচিব।
মুনিরা বেগমের মনে হয় জামশেদ সাহেবের স্বৈরাচারীতা কেবল-ই তার এবং তার তিন মেয়ের উপর। বড় মেয়ে পায়েলকে ইন্টার পাশ করতেই জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বড় ননদ ভালো ঘরানার একটি উচ্চশিক্ষিত গাধাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসলো। ছেলে থাকে কানাডায়। জামশেদ সাহেব অতি উচ্ছ্বাসের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। অর্থের অভাব নেই, অথচ মেয়েটিকে পড়ান নি। একরকম কন্যা দায় থেকে মুক্ত করলেন নিজেকে। অবশ্য মেয়েকে তিনি অঢেল দিয়েছেন। কমতি রাখেন নি। দূর্ভাগ্যবশত যদি শ্বশুরবাড়ির সাথে বনিবনা না হয় তবে মেয়ে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিতে পারবে। তবে এই বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর ক্ষমতা ততদিন থাকবে যতদিন মেয়েটি বিবাহিত থাকবে। অদ্ভুত নিয়ম। মুনিরা তখন কিছু বলতে পারেন নি। উনিশ বছরের মেয়েকে অন্যের ঘরে চলে যেতে দেখেও তিনি বিদ্রোহ করেন নি।
তবে প্রাপ্তি যখন গো ধরলো সে বিয়ে করবে না, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে তখন তিনি পিছ পা হলেন না। প্রাপ্তি বিয়ে করবে না, সে পড়বে। তাও আবার ছেলে মেয়ে মিশ্রিত একটি ভার্সিটিতে। তাও আবার ইঞ্জিনিয়ারিং। অনেক গুলো ধাক্কা একত্রে এ বাড়িতে প্রলয় আনলো। প্রতিটি ঘরে দেওয়ালে বিপদ সংকেত জানান দিলো। পায়েল পড়ালেখায় কলাগাছ। দুবারে ইন্টার পাশ করেছিলো। তাই তার অনার্স পড়ার ইচ্ছে বা চিন্তা কিছুই ছিল না। কিন্তু প্রাপ্তি ভিন্ন। মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়া। চুপচাপ, অমিশুক মেয়েটির বন্ধু বই। সে পড়তে ভালোবাসে। সাজাগোজা কিছুতেই তার আগ্রহ নেই। তার বয়সী মেয়েরা টিকটক করে বেড়ায় অথচ সে এসব দেখলে নাক শিটকায়। পরীক্ষার সময় পড়ার সময় নষ্ট হবে বলে মাঝে মাঝে গোসলও করতো না। পোশাক-আশাক, বেশভূষাতে তার কোনোদিনই নজর নেই। সে শুধু পড়তে ভালোবাসে। মেট্রিকে বোর্ডে প্লেস করেছে, ইন্টারেও বোর্ডে হাইয়েস্ট নাম্বার পেয়েছে। একচান্সে ভালো ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। এই মেয়েকে পড়াবে না তো কাকে পড়াবে।
কিন্তু জামশেদ সাহেব তার সিদ্ধান্তে অটল। কিন্তু মুনিরাও কম নয়, সেও কঠিন বিদ্রোহ শুরু করলো। না খেয়ে অনশনে বসলেন। শাসন শাসনের জায়গায় হলেও জামশেদ সাহেবের মুনিরার প্রতি অদ্ভুত টান আছে। রাতের বেলায় সকলের অগোচরে বউয়ের চুল আঁচড়ে তাকে সাজিয়ে সোহাগ করতে ভালোবাসেন। এই কথা অবশ্য দরজার বাহিরে আসে না। তাই বিদ্রোহ কাজে দিল। তবে শর্ত হলো প্রাপ্তিকে তিনি পড়ার সুযোগ দিবেন কিন্তু টাকা দিবেন না। আর প্রাপ্তিকে নিজ যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। এমন উৎকট শর্তের মানে নেই। তবে প্রাপ্তি রাজী হয়ে গেলো।
মুনিরা বেগমের ভাই মোতালেব একজন নামকরা ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির প্রফেসর। সেখান থেকে তার বড় ছেলেও পাশ করেছে। তাই সেই ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতেই এডমিশন পরীক্ষা দিলো প্রাপ্তি। চান্সও পেলো। সরকারী হওয়ায় খরচের চিন্তাও নেই। মেয়ে বৃত্তি পায় সবসময়, এবারো পাবে। তা দিয়েই তার চলে যাবে। আর কিছু খরচা মুনিরা নিজ থেকেই দিতে পারবে। সেই সাথে যদি মোতালেব সাহেবের বাড়ি থাকে তাহলে তো থাকা খাওয়ার খরচাও নেই। মুনিরা রাজী হলো। আর এদিকে মজুমদার নিবাসে প্রতিদিন শুরু হলো আন্দোলন। জামশেদ সাহেব তো জানিয়েই দিয়েছেন,
“মেয়ে যদি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ না করতে পারে তবে উনি সাথে সাথেই তাকে বিয়ে দিবেন”
প্রাপ্তিও বাবার মুখের উপর বলেই এসেছে, সে এই ভার্সিটির গোল্ড মেডেলিস্ট হবে। বাপ-মেয়ের মধ্যে কে জিতে সেটাই এখন জানার বিষয়। মায়ের সাথে কথা বলার পর মনটা প্রাপ্তির মন বসে গেলো হালকা। পড়ার খরচ, হোস্টেলের ফি সে কি সামলাতে পারবে? নাকি মামীর বাসাতেই থাকতে হবে?
***
সকাল বেলায় মেইন গেট থেকে আজ হেটে হেটে আসতে হয়েছে প্রাপ্তিকে। রিকশাটার চেইন খুলে যাচ্ছিলো বারবার। বৃদ্ধ চালক যতবার তা ঠিক করছে ততবার ই অবাধ্যের মত সেটা পরে যাচ্ছিলো। এদিকে তার ক্লাস ঠিক আটটা ত্রিশে। সে ক্লাস মিস করতে চায় না। তাই বৃদ্ধ চালককে টাকা বুঝিয়ে গটগট করে হাটা শুরু করে। পনেরো মিনিটের দীর্ঘ পথ। দম নেবার সময় নেই। পায়ের গতি সর্বোচ্চ বাড়িয়ে দিয়েছে। পারে না দৌড়াতে।
পনেরো মিনিটের পথ দশ মিনিতে অতিক্রম করে যখন ই থামলো একাডেমিকের সামনে অমনি শো করে একটি বাইক এসে ব্রেক করলো ঠিক তার পায়ের কাছে। ফলে আকস্মিক ঘটনায় কিঞ্চিত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সে। একেই হেটে আসায় তার নিঃশ্বাস ফুলে গেছে, উপরন্তু এতো সাংঘাতিক ঘটনা। টাল সামলাতে না পেরে টাইলসের উপর ধপ করে বসে পড়লো প্রাপ্তি। তার পা কাঁপছে। বাইকটা এতো দ্রুত এসেছে যে খেয়াল করতে পারে নি। একটু হলেই বাইকটা তার উপর উঠে যেত। প্রাপ্তিকে এমন পড়ে যেতে দেখে উপস্থিত সকলের মাঝে যেনো হাসির রোল পড়লো। বেশ মনোরঞ্জিত হয়েছে তারা। এদিকে বাইকের চালক এবং তার পেছনের ব্যক্তির কোনো হেলদোল নেই। নির্লিপ্ত, দায়সারাভাবে বাইকটা পার্ক করলো তারা। এদের প্রাপ্তি চিনে। সো কল্ড সিনিয়র ভাই আর তার চামচা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………