মৌনচন্দ্রা - পর্ব ০৯ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          রাত একটা বেজে বারো মিনিট ঢাকার এই নিভৃত নিশুতি। বিশাল ডর্মেটরির সবাই মৃতপ্রায় গভীর ঘুমে। আমার নিজেরও চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু অদ্ভুত এক খেয়াল চেয়েছে মনে। ইচ্ছে হয়েছে, এই মেয়েটা সকালে ঘুম থেকে উঠে যেন একটু খুশি হোক। এতো সুবিশাল চিঠির প্রত্যুত্তর এতো দ্রুত দেবার প্রবণতাও আমার নেই। কিন্তু ঐ যে, ইচ্ছে হয়েছে বলেই ঘুমের মূল্যে পাগলামো কিনলাম এক ছটাক! 

আচ্ছা? মেয়েরা তো চুল নিয়ে অনেক যত্নশীল হয় শুনেছি। চুল অমন মেঝেতে গড়াতেও দেন তাহলে? তা-ও কি না ভেজা চুল! মারাত্মক ব্যাপার রীতিমতোই। 

শাড়ি ভালোবাসা মেয়েদের ভেতর অন্য রকম একটা মাধুর্য্য থাকে। কিংবা বলা ভালো, আমি বিশেষ একটা মাধুর্য্য খুঁজে পাই। তবে সব শাড়ি পরুয়া মেয়েদের ভাল লাগে না। বরং বলা ভালো, শুধু তাদেরই ভালো লাগে—যারা জানে তাদের ঠিক কেন শাড়ি পরতে ভালো লাগে। তারা জানে, তারা কী করছে এবং কেন করছে। 

গত চিঠিতেই একবার লিখতে ইচ্ছে হয়েছিল যে, আপনি রিয়েল লাইফ 'রূপা' কি না। কিন্তু 'পদ্ম' নামটাও দিব্যি মানিয়ে যায়। প-দ্ম-লো-চ-না! পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর চোখ কার ছিল জানেন তো? অশোকের ছেলে কুনাল-এর। হাজার বছর আগের সেই গৃহত্যাগী পূর্ণিমায়, ঐ চোখ আরেকবার দেখলে হয়তো সিদ্ধার্থ ঘর ছাড়তে পারতেন না।

আপনার 'অশরীরী কোটেশন'-এ না হেসে পারিনি। আচ্ছা.. অশরীরীর কথা তো জানি-না। আমিই বরং ওদের হয়ে উত্তর দিয়ে দেই। 

"জ্বে না, আফা। মোটেই আনন্দ লাগে না। আর কেডায় কইছে যেহানে খুশি যাওন যায়? আপনে তো মইরা দেহেন নাই আমরা ক্যামন থাহি। আর জাজ না কী করার কথা কইলেন নাহ? ঠিক বুইঝা থাকলে, ঐডা মাইনসে আরও বেশিই করে। নাইলে, আপনে ক্যাম্নে ধইরা লইলেন আমরা এইসব করতে চাই? হইতে পারে না, আমরাও আফনাগোর লাহান ৯টা-৫টা অফিস করি, রান্নাবান্না কইরাই খাই। শুধু আপনেরা জানেন না বইলা এইসব ইচ্ছামতো কথা ছড়ান আমগো নামে। এই ক্ষেত্রে লেখকগুলা হইলো এক্কেরে প্রথম সারির বজ্জাত। বানানো কথায় কান দিবেন না।" 

হাহাহাহা...ঠিক বলছেন কি না কীভাবে বলব, পদ্ম? আমি তো অজাত, কুজাত বা অপজাত—কোনো জাতেরই অশরীরী নই। হলে, বিজ্ঞের মতো ভ্রু কুঁচকে 'হুউম' বলে সায় দিতাম হয়তো। তবে অশরীরী না হলেও, আপনার এমন চায়ের তৃষ্ণায় আমি দু'কাপ চা নিশ্চয়ই করে আনতাম? চায়ে কয় চামচ চিনি খান আপনি, আরাধ্যা? নাকি খান্নার দলে ভিড়েছেন বুড়ি হতে না হতেই? 

কুহকিনীও কিন্তু সুন্দর, পদ্ম! নাহলে মায়া করার ক্ষমতা রইতো না তার। তাহলে পরোক্ষভাবে হলেও কিন্তু ভেতর ভেতর আপনি জানেন যে আপনার চোখ সুন্দর! আর চোখের ছানির মতো বিষণ্ণতাও চিরস্থায়ী নয়। আজ আছে, কাল সরিয়ে দিলেই রইলো না আর। 

আচ্ছা আরাধ্যা, ছন্দে সুর থাকে নাকি সুরের সঙ্গে ছন্দের বসবাস? হয়তো জীবনের ছন্দে সুর ঠিকই আছে—গানটাই ঠিক শেখা হয়ে ওঠেনি আপনার। আর শিখলেও, ভালো একজন গুরু ধরা প্রয়োজন। 

নাম ধরে ডাকা নিয়ে আপত্তি নেই একদম। আমি নিজেও বার বার নাম ধরে ডেকে কথা বলি, খেয়াল করেছেন? ভালো লাগে আমার এভাবে কথা বলতে। আর আমাদের ভেতর মানসিক বয়সের তফাত খুব একটা নেই মনে হয়। এদিক থেকে আমরা একই রেখায় দাঁড়িয়ে। আর অন্যের ক্ষতি না করে, নিজের ইচ্ছেকে সর্বাগ্রে রাখাকে যদি উগ্রতা বলে তাহলে স্বাধীনচেতা মানুষ মাত্রই উগ্র, প্রচণ্ড বেয়াদব (এই সমাজের কাছে)।

আরাধ্যা, কল্প জগতে কাউকে ভাবলে দেখবেন সুখই জাগে মনে। আর আপনি তো বাস্তবেরই কেউ। ক্ষতি কি যদি বাস্তবের কারও সাথে কল্প জগতের সুখ সুখ আমেজটাও থাকে? অশরীরী ভাবছি না, তাই। কিন্তু যেটাই হচ্ছে, ভালো লাগছে। শ্রীকান্ত আচার্যর একটা গানের মতো। কোন গানটা বলতে পারবেন? দেখুন তো পারেন কি-না। 

“আপনি মায়ায় পড়বেন না, অনুরোধ থাকবে। আরাধ্যারা হারিয়ে যেতে খুব ভালোভাবে জানে।”—এভাবে বলে কয়ে কাউকে মায়ার জাল বিছিয়ে দিতে প্রথম দেখলাম, আরাধ্যা।
I N T E R E S T I N G! 
তবে কী জানেন, সম্পর্ক তা সে যেমনই হোক না কেন—টান এবং বেদনা দুজনেরই সমান হওয়া উচিত। আরাধ্যারা যদি হারিয়ে গিয়ে সুখে থাকতে পারে—আমি সে সুখ হাসিমুখেই মেনে নেব। তার জন্য হৃদয় পুড়িয়ে কী লাভ যার নিজের হৃদয় পোড়ে না! 

বড় চিঠি পড়ে কিন্তু একটুও বিরক্ত হইনি, আরাধ্যা। বরং এতো দ্রুত ফুরিয়ে গেল বলে আক্ষেপ হয়েছে। আর হেসেছি এজন্যই যে, আমার ডায়লগই আজকাল আমাকে কেউ দিয়ে বসছে দেখে। হ্যাঁ, একটু বিরক্ত হবারও দরকার আছে জীবনে।

তাহলে ভার্চুয়ালি আমিই আপনার সবচেয়ে বড় চিঠি পাবার সৌভাগ্য লাভ করলাম, তাই-তো? জেনে খুশি হলাম, পদ্ম! আচ্ছা, আমাকেও কাগজে-কলমে লিখবেন কখনো? আমি প্রচণ্ড খুশি হবো! আমার জীবনে দুটো 'প্রথম' হবার স্বীকৃতি অর্জন করবে চিঠিটা। 

আচ্ছা, পদ্ম তো আপুর দেওয়া নাম। আমি 'কাঠগোলাপ' ডাকি না-হয়? বৃষ্টি ভেজা কাঠগোলাপ দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। এটা নিয়ে আমার ছোট ঘরকুনো জীবনের সবচেয়ে মধুর একটা স্মৃতি আছে। আমি তখন আপনার থেকেও বছর চারেকের ছোট। দৃশ্যগুলো এখনো চোখের সামনে ভাসে। জীবনে টাইম লুপ নাকি খুবই একঘেয়েমিময় জিনিস—যদি সম্ভব হতো কেউ ইচ্ছে পূরণের বর দান করলে, আমি হয়তো সীমিত টাইম লুপ চেয়ে নিতাম। 
আপনাকে লিখতে বসে মনে পড়ে গেল দিনটার কথা। সেদিনও এমন আকাশ কালো করে বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমার আকাশ আজও ঝরছে এখানে। আপনার জন্যেও একটা গল্প তাহলে পাওয়া হলো। কাঠ গোলাপ এর জন্য একটা কাঠগোলাপ এর গল্প। 

আমি আড়াই ঘন্টার উপর ব্যায় করলাম এই অবধি লিখতে। আশ্চর্য ব্যাপার, চিঠিটা লিখতে আরাম লাগছে! সময় এর হিসাব থাকছে না। সময় এভাবেও কেটে যেতে পারে, সেটা পরীক্ষার হল আর প্রিয়জন পাশে থাকা ছাড়াও যে হতে পারে— সেটাই প্রত্যক্ষ করলাম এই প্রথম। লিখবেন, লিখবেন... আবারও লিখবেন... দ্রুতই লিখবেন। নাহলে ভারি অন্যায় হবে। স্রষ্টাও আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমি জীবনে এতো পাপ করিনি যে, হুট করেই এই চিঠিসুখ থেকে বঞ্চিত করবেন আমাকে। 

প্রিয় কাঠ গোলাপ, তুমিও ভালো থেকো, কেমন? আর—
"না স্বর্গ, না প্রেম, না সুখ..
 কিছুরই খোঁজে ফিরিনা দুয়ার
 তাহলে আমার ঠাঁই কোথায়?
 আমি কি তবে তার নই আর?"

পুনশ্চ ১: দারুণ দ্বিধায় ফেলেছিলেন আপনার দ্বিতীয় পুনশ্চে এসে। চিঠি পড়ে যে মন ভরেনি, বৃষ্টিটা না এলেই পারত। আরো একটু বেশি পড়তে পারতাম। আর যদি না যেতে দিতাম, তবুও যেতেন? 

পুনশ্চ ২: আপনার সত্যিই হাটু সমান চুল? ভেজা চুল মাটিতে গড়িয়েছে যেহেতু, তেমনই তো হবার কথা। ঘন লম্বা চুল আমার ভীষণ পছন্দ। তাহলে এখানে Avatar-এ কাঁধ ছুঁইছুঁই চুল... এমন ছলনা কেন? ভাগ্যিস ছলনা করেছিলেন! 

পুনশ্চ ৩: এটা অতিরিক্ত লিখলাম, প্ল্যান ছিল না। কালো শাড়ি পরে ঘুর ঘুর করার সাথে পরিচিত আছি। ছাইরঙা শাড়ির এমন কেশবতী রমণীকে ঘুরঘুর করতে দেখার সাঁধ হচ্ছে এখন। 

- মেজবাহ
ড. এম. এ. রশিদ হল,
বুয়েট, ঢাকা।
May 30, 2017 5:55 AM
Dhaka, Bangladesh

—————

সে এবার নিজের একদম আসল ঠিকানাটা দিলো। রাতের ভেজা বৃষ্টিতে জ্বর আসাটা বাধ্যতামূলক। আমি প্যারাসিটামল গিলে কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে শুয়ে চিঠিটা অর্ধেক পড়লাম। বাকিটা কাল, পরশু, আর পরশুর পরেরদিন মিলিয়ে পড়ে নেব। মেজবাহ! প্রিয় মেজবাহ! আপনি আমার গুমোট আকাশের বৃষ্টি ঝড়ানো রংধনু। আপনি আমার নিস্পৃহতায় এক অকস্মাৎ উল্লাস।
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp