শিকদার সাহেবের দিনলিপি - পর্ব ২৭ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          যে ভয় আমি করছিলাম তা মীরার দুঃসাহসিক কাজের কাছে কিছু না। আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি মীরা আমার বাসায় এসে আমার মায়ের সঙ্গে আমাদের প্রেম- বিয়ে নিয়ে কথা বলবে! জি মীরা তাই করেছে। আমি দোকানে ছিলাম সেই সুযোগে সে এসে মাকে আগাগোড়া সব বলেছে। রাহির বউ আমাকে ফোন না করলে তো আমি জানতেই পারতাম না।

মীরার মতিভ্রম হয়েছে। আমার মাকে বলে কি না ওর বাসায় গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিতে! আর আমার মা? সেতো ছেলে বিয়ে করানোর জন্য অতি উৎসাহী, সুযোগ একটা পেয়ে মীরার তালে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। একই জিনিস কেন বারবার বোঝাতে হয় আমি জানি না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে আমার। আজ আমি মীরার সঙ্গে প্রচণ্ড খারাপ ব্যবহার করেছি। স্পষ্ট ভাষায় বাসা থেকে বের করে দিয়েছি। আমার কষ্ট হয়েছে কিন্তু এ ছাড়া উপায় ছিল না। যতক্ষণ ও অপমানিত বোধ না করবে ততক্ষণ দূরে সরবে না।

বারবার আমাকে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কেন পড়তে হয় আমি জানি না। কী এমন পাপ করেছিলাম?

রাফসান শিকদার
১১ আগস্ট, ২০১৯

মীরা,

আমার হাওয়াই মিঠাই, চলো আমরা আবার ৯-১০ বছর পেছনে ফিরে যাই। কথা দিচ্ছি, এবার আর ভালোবাসা শেখাব না তোমায়। তোমার কাকচক্ষু জলের ওই দিঘিসুলভ চোখেও মরব না আর। তোমার প্রেমে মজে পাগল প্রেমিকও হব না আর। রং নাম্বারে কথা বলা অচেনা দূরের মানুষ হয়েই রয়ে যাব আজীবন। ভালোবাসার সুখে ভাসতেও হবে না। বিরহের দুঃখে ডুবতেও হবে না। খুব হিসেব করে পা ফেলব। জীবনটা হয়তো অন্যরকম হবে। নাকি পেছনে গিয়েও আবার আমারই ভালোবাসার জালে জড়াবে? চলো না মীরা… কথা দিচ্ছি, এবার আর জাল ফেলব না। এত কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।

রাফসান শিকদার
১৪ আগস্ট, ২০১৯

বকুল, বকুল রে,

আজকের দিনটা আমার জীবনে ভীষণ আনন্দের দিন। এমন আনন্দের দিন আমার জীবনে এর আগে একবারই এসেছিল, মা যেদিন ফিরে এসেছিল। কী হয়েছে জানিস? মীরার বাবা এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি নিজে মীরাকে আমার হাতে তুলে দিতে চায়। বিশ্বাস হচ্ছে তোর? আমারও প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি। উনার কথাবার্তায় ব্যবহারে একদিনেই আমি উনার ফ্যান হয়ে গেছি।

মা নাকি কিছুদিন আগে আমাদের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মীরাদের বাড়িতে গিয়েছিল। আমাদের বিচ্ছেদের কারণে মীরা নাকি অনেক পাগলামি করত, তা দেখে উনি কষ্ট পেতেন। এজন্য আমার ওপর অনেক রেগে ছিলেন কিন্তু সব জানতে পেরে তার রাগ ভেঙে যায়। শুধু তাই না। আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তার নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে, মীরার যোগ্য বলে মনে হয়েছে। আমি জানি না তিনি আমার সম্পর্কে ঠিক কী জেনে আমাকে মীরার যোগ্য বলে মনে করেছেন। তার নাকি মনে হয়েছে আমি মীরাকে সামলে রাখতে পারব। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল আমি জ্যাকপট পেয়ে গেছি। খুশিতে আমার গলা জড়িয়ে যাচ্ছিল। কথা বলতে পারছিলাম না। আমি এখনো ঠিকঠাক গুছিয়ে লিখতে পারিনি। তুই একটু কষ্ট করে বুঝে নিস। অনেক অনেকদিন পর আমি এত খুশি এত উত্তেজিত যে সব গুলিয়ে ফেলছি।

বাসায় ফেরার আগে অবশ্য নায়িকার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। এতদিন ও আমাকে বারবার জড়িয়ে ধরেছে আমি ধরতে পারিনি। প্রচণ্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি। আজ সব নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেয়ার দিন। আজ থেকে সব কষ্ট পুষিয়ে নেয়ার কাল শুরু। আজ ওকে একবার জড়িয়ে ধরতেই হবে।

কিন্তু তার জন্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হলো। আজ সুযোগ পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ নাচাল আমাকে। ফোনই ধরছিল না। ছটফট করছিলাম তবে এই শাস্তি আমি মাথা পেতে বরণ করলাম। ওর বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক ঘণ্টা। অবশেষে ফোন ধরলেন তিনি।

কী করেছি জানিস? সেই যৌবনের প্রেমের মতোই দুঃসাহসিক কাজ করেছি। লুকিয়ে ওদের বাসার ছাদে গিয়ে জড়িয়ে ধরে হৃদয় শান্ত করে এসেছি। হৃদয় অবশ্য আরেকটু বাঁধনহারা হতে চাচ্ছিল। কিন্তু ইরা পাহারায় ছিল। তাই আর বাড়লাম না।

রাফসান শিকদার
২৪ আগস্ট, ২০১৯

মীরার বড় ভাই দেশে ছিলেন না। তাই তিনি আসতে পারেন এমন সময়ে বিয়ের তারিখ ফেলা হবে। ভাইয়া ডিসেম্বরে দেশে আসবে। আমি একটা সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেলাম। বিয়ের তারিখ ফেললাম ৭ ডিসেম্বর। মা বললেন,

শনিবার কে আসবে তোর বিয়ে খেতে? বিয়ে হয় শুক্রবার। শনিবার কেন?

আমি বললাম,

ঠিকাছে তাহলে অনুষ্ঠান পরের শুক্রবার করো। কিন্তু বিয়ে পড়ানোর। কাজটা ৭ ডিসেম্বরেই হওয়া চাই।

আমার মা বুদ্ধিমতী মানুষ। তাকে এর বেশি বলতে হলো না। সে বুঝে গেল এই দিনটি নিশ্চয়ই বিশেষ। ৭ ডিসেম্বরই বিয়ের ডেট ফাইনাল হলো। কিন্তু দেখ, মীরাই বুঝল না। বিশেষ দিন মনে রাখতে না পারলে সে রাগ করত। অথচ এখন নিজেই ভুলে গেল। তুইও কি ভুলে গেছিস নাকি বকুল? ছি! এসব দিন মানুষ কীভাবে ভোলে? যা তোকে হোমওয়ার্ক দিলাম খুঁজে বের কর ৭ ডিসেম্বর কেন বিশেষ।

রাফসান শিকদার
৩০ আগস্ট, ২০১৯

মীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। সত্যিই তো তারিখের ব্যাপারটা বিয়ের সময় তার মাথায় আসেনি। রাফির সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে এই আনন্দে তখন দিন দুনিয়া। ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে এমন দিনটা সে কীভাবে ভুলে গেল? এই দিনেই রাফি তাকে নিজের করে নিল অথচ সে কিছুই টের পেল না। এমনকি বিয়ে হয়ে এতবছর কেটে যাওয়ার পরেও রাফি একটি বার তাকে এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল না! ডায়েরি না পড়লে তো এই সারপ্রাইজ তার কখনোই পাওয়া হতো না।
·
·
·
চলবে....................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp