মৌনচন্দ্রা - পর্ব ১০ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          সেদিন সাড়ে চার ঘন্টার বৃষ্টিতে ভিজে যখন রুমে এলাম, আমি সম্পূর্ণ পাথরের মতো ছিলাম। আমার সুখ লাগছিল না, আমার দুঃখও পাচ্ছিল না। আমি হাসছিলাম শুধু। অথচ ভেতরটা যেই কান্নাটুকু করার জন্য মরিয়া, আমি সেটুকু কাঁদতে পারছিলাম না। 
একসময় আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না আর। বসে থাকার জন্য যে শক্তিটুকু প্রয়োজন সেটুকুও টের পাচ্ছিলাম না। আমার ভেতরে তখন কি চলছিল, আমি ঠাহর করতে পারছিলাম না। 

এভাবে যে কতগুলো সময় কেটে গেল আমি তার হিসেব রাখিনি। একসময় হাটু ভেঙ্গে এলো আমার, বসে পড়লাম মেঝেতেই। নিঃশ্বাসেরা গলার মাঝখানে আটকে গেল। আমি দম নেওয়ার জন্য রীতিমতো হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। কাঁপতে লাগলাম থরথর করে। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে আমার জন্য কি কেউ নেই? সৃষ্টিকর্তা যার আছে, তাকেই আরও দিয়ে যাচ্ছেন। আর যার নেই, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আছেন।

আমার পরবর্তী চিঠিটা আমি লিখলাম তিনদিন পর—

—————

“প্রচণ্ড প্যানিকে সে-রাতে জড়োসড়ো হয়ে বসে যখন ফোন হাতে নিলাম, অ্যাপের নোটিফিকেশন আমাকে জানান দিলো, 'এই মেয়ে! চিঠি আসছে। ভয় কীসের? প্রকৃতি অসম্পূর্ণতা পছন্দ করে না। কারো না কারো মাধ্যমে, কোনো না কোনো সময় ঠিকই মাঝপথে ফেলে রাখা বিষয়টা সম্পূর্ণ হবে এবং হবেই। তোমার বেলায় আসছে চিঠি। কেউ একজন ফিরতি চিঠি পাওয়ার অদ্ভুত আকাঙ্খা অন্যমনস্কতায় তৈরি করে চিঠিটা পাঠাচ্ছে। এটা পড়া এবং পূনরায় লিখতে বসাটা তোমার কাজ, প্রকৃতি এ কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করাতে পারবে না; তাই তোমাকেই করতে হবে। কার্যসাধনের পূর্বে কিচ্ছু হবে না তোমার। নরম হও, কোমল হও, নিজেকে শান্ত করো। এত অস্থিরতা তোমার জন্য ভালো নয়।'

আস্তে-ধীরে শান্ত হয়ে বসলাম আমি। নিজেই নিজেকে কী উদ্ভট যুক্তি প্রদর্শন করে স্থির করি, হাস্যকর! প্রকৃতি তো নিয়ম অনুসারে কিছুই করে না, প্রকৃতি অনিয়ম করতে ভালোবাসে, অপূর্ণতাকে আলিঙ্গনে রাখে সারাটাক্ষণ। এর অনিয়ম করাটা যেন নিজ থেকেই একটা নিয়ম। ব্যতিক্রম তো তখন ঘটে, যখন দেখা যায় স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজ সম্পাদিত হয়ে যাচ্ছে!

আমি কতখানি বিচিত্র, তার আন্দাজ করুন এখন। ভরদুপুরবেলা বসেছি ডায়ারি লিখতে। লোকে লেখে নিঝুম সময়টায়, আর আমি লিখি উত্তপ্ততায়।

আমার প্রতি বছর ডায়ারি পালটানো হয়। কোনোটাই অবশ্য সম্পূর্ণ লেখা হয় না। তবুও পালটে ফেলি। প্রতিটি বছরে কতখানি পরিবর্তিত হচ্ছি, তা সহজেই অনুমান করার একটা ছক এটা। 

আজ গত বছরের ডায়ারিটা কী মনে করে যেন হাতে নিলাম। তখন পড়াশোনায় খুব ব্যস্ত ছিলাম বলে ডায়ারি লেখার মতো এমন অযৌক্তিক কাজ করার জন্য বেকার সময় আমার ছিল না। সমাজের ওই তথাকথিত “ভালো মেয়ে” নামে সুপরিচিত ছিলাম যে!

আমি বরাবরই স্কুলে টপার বাড়িতে বাবা-মায়ের লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে ছিলাম। আশেপাশের বাড়ির আন্টিরা নিজের মেয়েদেরকে তুলনা করে বলে, “ওকে দেখো, ওর মতো হও।”
নিয়ম মেনে চলতাম। অনিয়মের ধার ধারতাম না। কারো সাথে ঝগড়া করতাম না। তবুও কেন যেন স্কুলের কেউ আমার সাথে মিশতে চাইত না। এই ‘কেন’ এর কারণ আমার বুঝ হওয়ার পর পাই। আমাকে ওরা অহংকারী ভাবত। নিজ থেকে কারো সাথে কথা বলতাম না যে! কেউ বলতে এলেও চুপচাপ থাকতাম। টিচাররা পছন্দ করতেন। সিনিয়ররা আদর করতেন। 

আমার বাবা ছিলেন কলেজের প্রোফেসর, এটাও স্কুল-কলেজে কেউ জানত না। শান্ত শিষ্ট মেয়েটার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে ঠিক হাইস্কুলে ওঠার পর। বন্ধু হয় কিছু। প্রথমবার বন্ধুত্ব! আমাদের সার্কেলের বন্ডিং এত সুন্দর ছিল! প্রতিটা টিচার বলতেন, এই ব্যাচটার মতো ব্যাচ নাকি তারা এর আগে দেখেনি। আমার খুব ভালোবাসার মানুষ ছিল সবগুলো।

বোধহয় লাইফের সবটুকু বন্ধুত্ব, সবটুকু বিশ্বস্ততা, আহ্লাদ, খুনশুটি আমি ওই দুটো বছরে শেষ দিয়েছি। এরপর আমার মা মারা গেল। বাবার সাথে সখ্য আমার কখনো ছিল না। আমি ভীষণ একা হয়ে গেলাম। আগের চেয়েও বেশি গম্ভীর হয়ে পড়লাম। বন্ধুত্বে পড়ল ভাঁটা। পড়াশোনায় পিছিয়ে গেলাম। এ সেকশন থেকে সি সেকশনে চলে গেলাম।

আমার দীর্ঘশ্বাস আসছে কেবল। রোজ স্কুলে যেতাম, লাস্ট বেঞ্চে বসতাম, চুপচাপ ক্লাস করতাম কোনো পড়া ঠিকমতো পেরেও টিচারকে জানাতাম না। লিখতে দিলে কে সবার আগে লিখে টিচারকে দেখাবে, এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। আমি সবার আগে লিখে চুপচাপ বসে থাকতাম, দেখাতাম না। সে সময় একটা মেয়ের সাথে আমার নতুন করে বন্ধুত্ব হয়। সুরমা। 

এ সময় হাতে নতুন ফোন পাই। একাকিত্ব দূরীকরণের জন্য বাংলালিংকের “বন্ধু তুমি আমার” সার্ভিসে রেজিস্ট্রেশন করি। ওখানে পরিচিত হই শোহানের সাথে। সর্বনাশের সূচনা মূলত ওখানেই। 

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার বাবা আমারই বান্ধবী সুরমাকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। শহরটাও ছেড়ে দেই একরাতের ব্যবধানে। আর শোহানের কাছে গিয়ে কী জানতে পারি, জানেন? সে অলরেডি বিবাহিত।”

আমি লেখা থামিয়ে দিলাম এ পর্যায়ে। খুব করে জানতে ইচ্ছে করল, অপরিচিতা রিমি... সে কেমন আছে এখন? ভালো আছে তো? শোহান.. বা আশিকের ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছে? নাকি চোখ থাকতেও অন্ধ, মুখ থাকতেও বোবা সেজে থাকতে হচ্ছে তাকেও।
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp