সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ - পর্ব ০৬ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

 “স্যার আমি অয়ন ভাইয়াকে পার্কিং থেকে বের হতে দেখেছি সেদিন সকালে”

প্রাপ্তির কথাটা শেষ হবার সাথে সাথেই মোতালেব জোর গলায় বললো,
 “শুনলে তো শাখাওয়াত। ও ছাড়া আমার শখের মোটরসাইকেলের এমন হাল কেউ করবে না। ও আসলে আমার উপর ক্ষোভ মিটিয়েছি। আমি তাকে ক্লাস করতে দেই নি। বেয়াদবির জন্য তার এটেন্ডেন্স কেটে দিয়েছি। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করেছে”
 
শাখাওয়াত অয়নের দিকে চাইলো। অয়ন এখনো নির্বিকার। তার মুখে গ্লানি, ভয় কিছুই পরিলক্ষিত হলো না। বরং হাতজোরা পেছনে নিয়ে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। শাখাওয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অয়নের উদ্দেশ্যে শুধালো,
 “স্যার কি ঠিক বলছে অয়ন?”

অয়ন নম্র স্বরে বললো,
 “স্যার কিছু অংশ ঠিক বলছে কিছু অংশ ভুল। হ্যা উনি আমাকে মাত্র তিন মিনিট লেটের জন্য ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছেন। আমার দোষ শুধু এতোটুকু ছিলো আমি পেছনের দরজা থেকে ঢোকার চেষ্টা করেছিলাম। স্যারের পছন্দ হয় নি। স্যারের ধারণা আমি স্যারের সাথে তর্ক করেছি। কারণ আমার মনে হয়েছে তিন মিনিট লেটটা স্যার চাইলেই কন্সিডার করতে পারেন। স্যারের আমার কথা পছন্দ হয় নি। সেজন্য আমাকে তিনি সেমিস্টারের আগেই ফেল করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এসবের জন্য আমি কখনোই তার মোটরসাইকেলের ক্ষতি করি নি। পার্কিংএ আমার বাইকও থাকে। আমি সেটাকেই গ্যারেজে নিয়ে যাওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। একটা তেলাপোকা আমার বাইকের চাকা ফাটিয়ে ফেলেছে”
 
মোতালেব সাথে সাথেই ক্ষিপ্র স্বরে বললেন,
 “শুনেছো কথা? তেলাপোকা কি চাকা ফাঁটাতে পারে? ও মিথ্যে বলছে”
 “স্যার আমি মিথ্যে বলছি না। আর আপনি এই মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে পারেন আমাকে কি মোটরসাইকেল ধরতে বা ভাঙ্গতে দেখেছে কিনা! সে আমাকে শুধু পার্কিং থেকে বের হতেই দেখেছে। বাইকটা একার পক্ষে বের করা সম্ভব হয় নি বলে আমি ওটাকে ওখানে রেখেই বের হয়েছিলাম। তখন ওর সাথে ধাক্কা লাগে। আপনি সিসিটিভি দেখতে পারেন স্যার”

শাখাওয়াত প্রাপ্তির দিকে চাইলে সে দৃঢ় স্বরে বললো,
 “আমি পার্কিং থেকে কিছু ভাঙ্গার শব্দ পেয়েই আমি ওদিকে গিয়েছিলাম। তখন আমি উনাকে দেখেছি। হ্যা, আমি তাদের কিছু করতে দেখি নি। কিন্তু যে শব্দ হয়েছে তাতে আমি শিওর উনি ভাঙচুর করছিলেন। পার্কিং এর অন্য কোনো যানের তো ক্ষতি হয় নি মোতালেব স্যারের মোটরসাইকেল বাদে। তাহলে তো আর সন্দেহের জায়গা থাকে না”

প্রাপ্তির কথায় অয়নের চোয়াল শক্ত হলো। অয়ন তখন শান্ত স্বরে বললো,
 “কোথাও ভুল হচ্ছে স্যার। আমি এমন কিছু করি নি। এখন শুধু একজনের মুখের কথায় আমাকে শাস্তি দেওয়া হবে যেখানে কোনো প্রমাণ নেই। সে আমাকে স্বচক্ষে কিছু করতেও দেখে নি। আর স্যার তো আমাকে অপছন্দ করেন কারণ একবার আমার ভুলের জন্য স্যারের পায়ে প্লাস্টার দেওয়া হয়েছিলো। নয়তো স্যার শুধু তিন মিনিটের জন্য তিনি আমাকে চার ক্রেডিটের কোর্সে কেনো ফেল করাবেন? আমি আবারো বলছি, প্লিজ সিসিটিভি চেক করুন”

মোতালেব রেগে গেলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,
 “এই ছেলে কি বলছো আদৌ বুঝছো তুমি?”
 “স্যার, এই ভার্সিটিতে হাজার পাঁচেক ছাত্রছাত্রী। প্রায় শত এর উপর মানুষ পার্কিং এর কাছে যাওয়া আসা করে। আমাকেই কেনো আপনার দোষী মনে হলো। আর চাক্ষুশ প্রমাণও নেই”
 “আমার ভাগ্নী মিথ্যে বলবে নাকি?”
 “সি, এই মেয়ে আপনার রিলেটিভ”

এবার শাখাওয়াত শান্ত স্বরে বললো,
 “আচ্ছা আমরা কেননা সিসিটিভিই চেক করি। তাহলেই তো বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে”

অয়নের ঠোঁটে হালকা হাসি দেখা গেলো। যা কেউ না দেখলেও প্রাপ্তি ঠিক ই দেখলো। পিয়নকে বলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সিসিটিভির ফুটেজ আনানো হল। সময় অনুযায়ী ফাইল অন করা হলো। একটা ফুটেজে দেখা গেলো অয়ন সত্যি তার বাইকটাকে ঠেলছে, সাথে নুহাশ আছে। ওই সময় লালবানুর পেছন অংশটা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে অয়ন বেরিয়ে গেলো। কিন্তু লালবানুর কাছেও সে যায় নি। প্রাপ্তি নিজেও অবাক। সে একবার অয়নের দিকে তাকাতেই অয়নের ফিঁচেল হাসিটা দেখলো। অর্থাৎ এই ফুটেজের সাথে অয়ন কিছু একটা করেছে। শাখাওয়াত এবার ভিডিও বন্ধ করে বললো,
 “স্যার অয়ন তো ঠিক বলছে স্যার। ও তো কিছু করে নি”
 “মানে কি ও কিছু করে নি। তাহলে কি ভুতে আমার মোটরসাইকেলটার এমন অবস্থা করেছে? ভুত তাহলে পাষন্ডের মতো আমার মোটরসাইকেলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, এটাই বলতে চাও?”

শাখাওয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মোতালেব অনেকু সিনিয়র শিক্ষক। সে তার জুনিয়র। তাই কিছু বলতেও পারছে না। খুব শান্ত স্বরে বললো,
 “স্যার আপনি ভাবুক হচ্ছেন। আসলেই তো অয়নের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। আপনার শান্তির জন্য, আমি ওকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি। এরপর সে এমন কিছু করলে তাকে আমি ছয় মাসের জন্য রাস্টিকেট করবো স্যার”

মোতালেব সাহেব প্রসন্ন হলেন না। রেগেমেগে শাখাওয়াতের রুম ছাড়লেন। প্রাপ্তিও দাঁড়িয়ে থাকলো না। শুধু যাবার সময় অয়ন ফিসফিসিয়ে বললো, 
 “আমার মাথায় ব্রেইন-ই আছে তেলাপোকা। ভূষি তো তোমার আর তোমার মামার মাথায়”

 প্রাপ্তির চোয়াল শক্ত হলো। শুধু কঠিন দৃষ্টি বিনিময় ছাড়া কিছুই করতে পারলো না সে। অয়ন যাবার অনুমতি চাইলেই শাখাওয়াত ইসলামের মুখখানা শক্ত হলো। গম্ভীর স্বরে বললো,
 “দাঁড়াও অয়ন। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে”

অয়ন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। শাখাওয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর স্বরে বললেন, 
 “তোমার বাবা ফোন করেছিলেন আমাকে। তুমি তো জানো আমরা কলেজ লাইফের বন্ধু। তাই সে বন্ধুর কাছে তার দুই ছেলের পড়াশোনার অবস্থা জানতে চাইলেন। আমি তাকে সত্যিটা বলতে তিনি হতাশ হলেন। যেখানে এক ছেলে ক্লাসের টপার, একজন যোগ্য সিআর, শিক্ষকরা তার প্রশংসা করতে পিছ পা হন না; সেখানে আরেক ছেলে একটা লুজার, ভ্যাগাবন্ড”

অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। শাখাওয়াত আবার গম্ভীর স্বরে বললো,
 “তোমার বাবা বলেছে তোমাকে যেন আমি একটু কেয়ার করি। অথচ আজকেই এমন একটা কমপ্লেইন। আবরারের চেয়ে তুমি কম কিছু নও। আমিও জানি। কিন্তু জীবনটাকে এভাবে নষ্ট করার কি মানে? আবরারের সিজিপিএ যেখানে ৩.৭৮ সেখানে তোমারটা ২.৫৬। আমি তোমার জায়গায় হলে অন্তত লজ্জার খাতিরেই সিরিয়াস হতাম”

অয়ন এখনো চুপ। শাখাওয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ধীর স্বরে বললো, 
 “তুমি আমার জন্য একটা কাজ করবে। এটা তোমার পানিশমেন্টও বলতে পারো। নেক্সট উইক একটা ইভেন্ট হবে। আমি চাই ইভেন্টটা তুমি ওরগানাইজ করবে। সেমিনার, প্রেজেন্টেশন এবং কেস স্টাডি; সব কিছু আয়োজনের দায়িত্ব তোমার। তুমি একটা টিম লিড করবে। তুমি এখন থার্ড ইয়ারে; সো তোমার ইয়ার, তার জুনিয়র দুই ইয়ার সবার সাহায্য নিবে। কিন্তু দায়বদ্ধতা তোমার। মনে রেখো এই সেমিনারে প্রাক্তনরাও আসবে। সো ইভেন্টটায় যেন কমতি না থাকে”

অয়ন কিছুটা বিরক্ত হলো। ভদ্রভাবে বললো,
 “স্যার আমি তো এতটা এক্সপার্ট নই এইসবে। আমার মনে হয়, আমাদের যোগ্য সিআর এটাকে ভালো হ্যান্ডেল করতে পারবে”
 “শিখবে। পানিশমেন্ট তো শেখার জন্যই দেওয়া হয় অয়ন”

অয়ন আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না। বাধ্য হয়ে একটা উটকো ঝামেলা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যেতে হলো ডিপার্টমেন্টাল হেড শাখাওয়াতের রুম থেকে। বের হবার সময়ে মন মস্তিষ্কে প্রাপ্তির প্রতি ক্ষোভখানাও ভুললো না। এই সব কিছু প্রাপ্তির জন্য। নিশ্চয়ই এখন আরিফুল শিকদারের কাছেও লালবানুর ইজ্জত হরনের কথা চলে যাবে। ফলে অয়ন রাগে সজোরে দেওয়ালে একটা ঘুষি মারলো। কিন্তু রাগ কমলো না। তাই মনে মনে স্থির করলো,
 “তেলাপোকা, আমার একটা সপ্তাহ বরবাদ করার শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে”

*****

ইভেন্টের ভলেন্টিয়ারের লিষ্ট বের করা হয়েছে। সকাল বেলায় প্রথম বর্ষের সিআর দিয়ে গেছে লিষ্টটি। লিষ্টটি না দেখেই শিহাবের দিকে ছুড়ে মারলো অয়ন। একরাশ অব্যক্ত বিরক্তি নিয়ে বললো,
 “চেক করতো তেলাপোকা এই লিষ্টে আছে কি না”

শিহাব সূক্ষ্ণ নয়নে এক একটা নাম দেখলো। না “প্রাপ্তি মজুমদার” নামটি কোথাও পেলো না। শান্ত স্বরে বললো,
 “নাহ, নেই”
 “সেকেন্ড ইয়ার জানায় নি ওদের? আমি যে বলেছিলাম প্রত্যেকটা ফার্স্ট ইয়ারকে জয়েন করতে”

পলাশ তখন বললো,
“বলেছে হয়তো, শুনে নি। এমন কি স্বাভাবিক নয়?”

পলাশের কথায় অয়ন উঠে দাঁড়ালো। পকেটে হাত গুজে বলল,
 “চল”
 
নুহাশ অবাক স্বরে শুধালো,
 “কোথায়?”
 “জুনিয়ারদের ক্লাসে। এখন তো ব্রেক চলছে। একটু ঘুর্ণি দিয়ে আসি?”
 “সিরিয়াসলি?”

নুহাশের মুখে অকৃত্রিম বিস্ময়। অয়ন আজ অবধি কখনো জুনিয়রদের রুমে যায় নি। কখনো কোনো জুনিয়রকে ডাকেও নি নিজের কাছে। র‍্যাগ জিনিসটা গ্রুপের অন্যরা দিলেও সে এড়িয়ে গেছে। অথচ আজ নিজে জুনিয়রদের কাছে যাবে। নুহাশ তাকে বোঝানোর জন্য বললো,
 “আমি সেকেন্ড ইয়ারের সাথে কথা বলছি। ওরা জানিয়ে দিবে যেন আজকের মিটিংএ পুরো ক্লাস থাকে”
 “উহু আমার তো পুরো ক্লাসের দরকার নেই। শুধু একটা তেলাপোকাকে দরকার। তাই আমি নিজেই যাব। আচ্ছা, তেলাপোকা ক্লাসে কেমন? মানে পারফোর্মেন্স, এটেন্ডেন্স ভাইস?”

শিহাব উত্তরে বললো, 
 “শুনেছি পড়াশোনা করে নাকি খুব। যদিও এখনো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারের সিআর বললো, বেশ এক্টিভ থাকে ক্লাসে”

অয়ন বাঁকা হাসলো। দু হাত দিয়ে কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো টেনে পেছনে নিলো। তারপর বললো,
 “তেলাপোকা এবার ফাঁদে পড়বেই”

*****

প্রাপ্তির সামনে মোটা বই। লাইব্রেরি থেকে মাত্র নিয়ে এসেছে। সামনের সপ্তাহ থেকে তাদের ক্লাসটেস্ট শুরু হচ্ছে। তাই পড়াশোনায় কোনো কমতি রাখবে না সে। মামার বাসার অবস্থাটা কেমন থমথমে। শাখাওয়াত স্যারের রুমের সেই ঘটনার পর থেকেই মোতালেব সাহেবের মনটা ভালো না। অয়ন নামক ছেলেটিকে শাস্তি না দিতে পারার রাগ তাকে ঘুমাতে দেয় না রাতে। লালবানুকে তিনি সুস্থ করে নিয়ে এসেছেন। প্রায় বারো হাজার খরচ গেছে। এতো বেশি টাকা পুরোনো একটি মোটরসাইকেলের উপর খরচ করা হয়েছে বলে নিহার বেগমের মন প্রসন্ন নয়। কিন্তু বুদ্ধিমতী মহিলা এই নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেন নি। তবে তিনি উঠতে বসতেই সংসারের খরচ খরচা নিয়ে কথা বলেন। মূলত একজন বাড়তি মানুষকে এতোগুলো দিন খাওয়াতে হচ্ছে এই ব্যাপারটি তার সহ্য হচ্ছে না। প্রাপ্তি নিশ্বাস ফেললেও তার তীব্র আপত্তি। এই তো গতকালের কথা, প্রাপ্তি রাত জেগে পড়ছিলো। ঘড়ির কাটা তখন তিনটার কাটায়। মম ঘুমে কাঁদা। এই মেয়ের কাজ প্রেম করা, খাওয়া আর ঘুমানো। যথারীতি সে প্রেম করার কার্য শেষে এখন ঘোড়া বেঁচে ঘুম। কিন্তু প্রাপ্তির তো ঘুমালে হবে না। রাত জেগে নোট বানানোর বাজে অভ্যাস তার। সে যখন লাইটটা জ্বালিয়ে পড়ছিলো ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করে নিহার বেগম। শীতল স্বরে বললেন,
 “প্রাপ্তি কাল সকালে উঠতে হবে। এখন ঘুমিয়ে যাও। বলেই লাইট অফ করে চলে গেলেন”

প্রাপ্তির রাগ হলো খুব। বেশি রাগ হলো নিজের বাবার উপর। আজ সে মেয়েদের প্রতি উদাসীন না হলে এই অপমান সহ্য করার মানে হয় না। মামাকে বর্তমানে হলে উঠার কথা বলতে পারছে না। কারণ লোকটা অয়নের কাছে পরাজিত হয়ে বেশ আহত। এখন তার কাছে নরমাল কথা বলা মানেই পাপ যেন। উলটা পালটা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই দাঁতে দাঁত চেপে প্রাপ্তি বসে রয়েছে। তার পড়াশোনা গুলো ক্যাম্পাসেই শেষ করতে হয় তাকে। সকালে তাড়াতাড়ি চলে আছে ক্লাসে। এখানে এসে পড়ে। রাইসার মনটা খারাপ। একটা বান্ধবী জুটেছে কিন্তু সে একটা যন্ত্রমানবী। তার কোনো বিষয়েই আগ্রহ নেই। সারাদিন বইয়ের মাঝে মুখ ডুবিয়ে রাখে। এই যে ডিপার্মেন্টের এত্তো বড় ইভেন্ট হবে, মেয়েটির কোনো আগ্রহ নেই। সে নির্বিকার। কত বার রাইসা বললো,
 “চল, আমরাও ডেকোরেশনের কাজ করি। আমি ভালো আর্ট করতে পারি”
 “যাও নাম লিখাও”
 “তুমি লিখাবে না?”
 “পাগল। ক্লাসের পর অহেতুক কে সময় নষ্ট করবে? আমার সময় নষ্ট করার মত সময় নেই”
 “এতো পড়ে কি করবে? এতো জেনে কি হবে? মরে গেলে সব শেষ”

বলেই গলায় বুড়ো আঙ্গুল বুলিয়ে জিভ করলো রাইসা। প্রাপ্তি হাসলো স্মিত। তারপর বললো,
 “তাহলে আমার কি করা উচিত?”
 “করার কি কাজের অভাব আছে? এমনেই তুমি পড়তে পড়তে শহীদ হচ্ছো। একটু জীবন ইঞ্জয় করলে কিচ্ছু যায় আসবে না। আমাকে দেখো, জীবনে খুব ইচ্ছে ছিলো ইঞ্জিনিয়ার হবার। তাই কত কষ্ট করে চান্স নিলাম। আমার ইচ্ছে ফুরিয়ে গেছে। আমি তো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি ভাই এখন প্রেম করবো”
“আর পড়াশোনা?”
 “কবি বলেছেন, “ভার্সিটি হলো এমন জায়গা যেখানে প্রেম আর পড়াশোনা একই সাথে চলে, ব্যাপার দুটো অন্তরঙ্গভাবে জড়িত”—আর এমনিতেও এই কোডিং ফোডিং আমার মাথায় ঢুকে না। স্যাররা আসে বুলেটের মত পড়িয়ে চলে যায়। আমার মাথায় সব প্রজেক্টাইলের মতো মনে হয়। জিজ্ঞেস করলে যে কিডনি ছিনিয়ে নেওয়া লুক দেয়।
 “তা কোন কবি বললো এতো জ্ঞানী বাক্য?”
 “কবি রাইসা সরকার”

রাইসার কথায় হেসে দিলো প্রাপ্তি, বইটা বন্ধ করে বললো,
 “আমার জীবনে এতো পুলক নেই গো। আমার বাসায় একজন বাংলা সিনেমার খলনায়ক আছেন। আমার চরম শত্রু। আর তার কিছু চ্যালাপেলা। আমি তাদের দেখিয়ে দিতে চাই আমি পড়াশোনা করে অনেক কিছু হতে পারি, মেয়ে মানেই বিয়ে করে সংসার করবো তেমনটা জরুরি নয়। তাই আমার এতো পুলক নেই”
 “খলনায়কটা কে?”

প্রাপ্তি রাইসার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না। তার পূর্বেই গটগট করে একদল ছেলে মেয়ে প্রবেশ করলো। তাদের আসতে দেখেই ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা গল্পগুজব ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো। প্রাপ্তি সামনের দিকে তাকাতেই কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। দুই পকেটে হাত দিয়ে নির্লজ্জ হাসি ঠোঁটে অঙ্কিত করে দাঁড়িয়ে আছে সৌম্য যুবক। তার গভীর গাঢ় দৃষ্টি দেখছে প্রাপ্তিকে। প্রাপ্তির মুখ শক্ত হয়ে গেলো। দৃষ্টির ধার বাড়লো। পারলে চোখের আগুন দিয়েই ভস্ম করে দিত এই অসভ্য অয়ন নামক পুরুষকে। অয়ন দাঁড়ালো ডাইসের উপর। খুব দায়সারা ভাব তার। মোটা কন্ঠ ঝংকার তুললো নিস্তব্ধ ক্লাসে,
 “আজ তোমাদের লিস্ট দেখলাম। ষাট জনে মাত্র পঁচিশ জন জয়েন করেছো। কেনো? পাত্তা দিচ্ছো না নাকি? ডিপার্টমেন্টের এতো বড় ইভেন্ট অথচ ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের আগ্রহ নেই। কি লাভ! শুধু ক্লাস করলেই যে তোমরা স্কিলে বস হবে এমন কিছু নয়। শুধু বই পড়ে কেউ আইনেস্টাইন হয় না”

প্রতিটা প্রাণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলো। সদ্য ভার্সিটির এতো বড় বড় কথা তাদের মস্তিষ্কে ঢুকছে না। অয়ন এবার শীতল স্বরে বললো,
“এই ইভেন্টের দায়ভার স্বয়ং ডিপার্টমেন্টের হেড শাখাওয়াত স্যার আমাকে দিয়েছে। এখন যদি তোমরা জয়েন না করো, আমি স্যারকে তোমাদের লিস্ট দিব। প্রথম বর্ষেই কি কালার হতে চাও? ইভেন্টে পাঁচটা সেগমেন্ট আছে, আমি প্রত্যেক জনের নাম চাই প্রতিটা সেগমেন্টে।”

অয়নের হুমকি কাজে দিলো। সুরসুর করে সবাই নাম লেখালো। বাধ্য হয়ে প্রাপ্তিকেও নাম লেখাতে হলো। রাইসা তো খুব আনন্দিত। কেস স্ট্যাডি এবং ব্যাকগ্রাউন্ডের দলে যোগ দিলো প্রাপ্তি। মনে মনে হাজারো গালি দিলো অয়নকে। পুরো এক সপ্তাহের জন্য তার চার ঘন্টার জলাঞ্জলি। 

*****

বিশাল অডিটোরিয়ামে প্রোগ্রামের জন্য স্টেজ তৈরি করা হচ্ছে। অয়ন একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে। মাথার উপর চলছে পঁচিশ বছর পুরোনো ফ্যান। তবুও বিভীষিকাময় গ্রীষ্মের দাপটে অস্থির হয়ে উঠেছে সে। সাদা টিশার্টটা ঘামে গায়ের সাথে লেগে গিয়েছে। সামনে প্রায় পঁচিশ জনের মত প্রথম বর্ষের ছেলে-মেয়ে স্টেজের সাজসজ্জার কাজ করছে। এদের মধ্যে প্রাপ্তিও একজন। চোখে মুখে অসীম বিরক্তি। রাইসার জোরের জন্য এই বাজে জিনিসে তাকে নাম লেখাতে হলো। ক্লাস শেষ হয়ে যাবার পরও এই গরমে বাসায় না যেয়ে তাকে বসে থাকতে হচ্ছে যা অত্যন্ত বিরক্তিকর। তার খিঁচিয়ে থাকা মুখখানা দেখে এই জ্বালাময়ী গরমের তেজেও শান্তি লাগছে অয়নের। নুহাশ একটা খাতা নিয়ে নিজেকে বাতাস করছে। পকেট ভর্তি চুইংগাম কিনে আনতে বলেছে অয়ন যার কোনো কারণ তার জানা নেই। বিরক্তি নিয়ে বললো,
 “চল না মামা, ক্যাফে যাই। একটু ঠান্ডা শরবত গলায় ঢালি। নয়তো হলে চল। একটু ঘুমায়ে আসি। এই গরমে এখানে তাল পারার কি মানে?”

অয়ন ফিঁচেল হাসি হাসলো। যা দূর্বোধ্য ঠেকলো নুহাশের কাছে। অয়ন হাত পা টেনে বললো,
 “দাঁড়া তোর নিরস দুপুরে রস ঢেলে দিচ্ছি, অপেক্ষা কর”
 “ছিঃ ছিঃ নোংরা কথা।”
 
অয়ন চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। নুহাশ হাসলো। অয়ন তার মাথায় গাট্টা দিয়ে বলল,
 “এতো নষ্ট কেন তুই? আগে জানলে তোকে হজ্জে পাঠাতাম। ভার্সিটির সবার থেকে একটাকা করে উঠাতাম চাঁদা। অন্তত তোর নষ্ট ব্রেন সোজা হত”
 “থামো মামা, সারাদিন মেয়েবাজি তুমি কর আর আমার ব্রেইন নষ্ট? কি হিপোক্রিটরে তুই!”
 “তোদের নজর লাগছে। তাই তো এখন মেয়েদের দেখলেই এলার্জি হয়”
 “আমাদের নজর লাগছে নাকি তুমি অন্যজনের উপর নজর দিছ”

বলেই প্রাপ্তির দিকে ইশারা করল। অয়ন বিদ্রুপ ভরে হাসলো। তারপর বললো,
 “নজর তো মামা দিছি, কিন্তু এই নজর সেই নজর নয়। এই নজর ছোবল নজর। দেখ না সামনে বিনোদন কারে বলে”

বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। প্রাপ্তি গত আঁধা ঘন্টা যাবৎ খুব কষ্টে একটা শলার বোর্ড রঙ করেছে। ঘামে একেবারে ভিজে গেছে সে। ঠোঁটের উপর নোনা ঘাম জমেছে। খানিকক্ষণ পর পর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। এই পরিশ্রমের জিনিসটা মুহূর্তেই বাতিল করে দিলো অয়ন। গলায় তীব্র কাঠিন্য,
 “আমি বলেছিলাম, গাঢ় নীল আর সাদার শেড। শেডের মধ্যে যেন ভ্যারিয়েশন দেখা যায়। এটা কি বানিয়েছো। আবার কর”

প্রাপ্তির ইচ্ছে করলো উঠে বোর্ডটা অয়নের মাথায় ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু সে সেটা করলো না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো। কারণ শাখাওয়াত স্যারের চোখে খারাপ হতে চায় না। শিক্ষকদের চোখে উত্তম সারিতে থাকার তীব্র বাতিক তার। তাই গিলে ফেললো রাগ। তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। গরমে অস্থির হয়ে গেলো। কোনো মতে মুঠোবন্দি করে খোঁপা করলো। তারপর আবার লেগে পড়লো কাজে। 

তিন ঘন্টা বাদে অবশেষে কাজ শেষ হলো। মাথায় পানি দেওয়া প্রয়োজন। চুল গুলো খুলতেই চমকে উঠলো সে। তার চুলের ভেতর একগাদা চুইংগাম লাগানো………
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp