অনেকগুলো নক্ষত্র একসঙ্গে নেমে এসেছে পৃথিবীতে। অন্ধকার মাঠে তারা মনের আনন্দে হুটোপুটি খেলছে। এমন প্রগলভতা মৌনিরাও করতো ছেলেবেলায়। যেদিন আকাশ ভেঙে বর্ষা নামতো। সেদিন ভাই-বোনেরা মিলে উঠোনে পিছল খেলত। কাদায় পা পিছলে কে কতদূর যেতে পারে সেই খেলা। ইশতিয়াক ভাই পা পিছলে অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারতেন। মৌনি পারত না। পড়ে যাবার ভয়ে মৌনি কখনও চেষ্টাই করেনি। মৌনি দুঃখ পেতে ভয় পায়, আঘাত পেতে ভয় পায়। অবহেলা ভয় পায়। আগ বাড়িয়ে এই ভয় তাকে কখনও কাউকে ভালোবাসতে দেয়নি। ছেলেবেলায় বর-বউ খেলায় নাহিদ ছিল সবথেকে পছন্দনীয় বর। সবার নাহিদকে চাই। এতোগুলো মেয়ের মধ্যে নাহিদকে বেছে নিতে হতো নাহিদের কাকে চায়? নাহিদ দ্বিধান্বিত চোখে সকলের দিকে তাকাতো। কার কথা বলবে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না। সে নাহিদের প্রথম পছন্দ না অথবা একটু পরেই নাহিদ তাকে প্রত্যাখান করবে এই ভয়ে মৌনি আগেভাগেই বর-বউয়ের খেলা থেকে সরিয়ে নিয়েছে নিজের নাম। ছেলেবেলায় শাওনকে বড় ভালো লেগেছিল। কিন্তু তখনই, সেই ছেলেবেলাতেই মৌনি একবার টের পেল খালামণি ভালোবাসে না তাকে। খালামণির ভালোবাসায় খাদ টের পেয়ে শাওনের নিখাদ ভালোবাসার প্রতিও মন টানেনি মৌনির। কারণ জানে, শাওনকে ভালোবাসলেই একটা মানসিক দ্বন্দ্ব, একটা টানাপোড়েনে অস্থির হতে হবে তাকে। মৌনি দ্বন্দ্ব ভালোবাসে না, বিশৃঙ্খলা ভালোবাসে না, প্রশ্ন ভালোবাসে না। অনেক প্রশ্ন জমে গেলে সে পালিয়ে যেতে চায়। বাবা কেন মাকে ভালোবাসেন না? কেন কাজের বাহানায় দূর দূরান্তে পড়ে থাকেন – এই প্রশ্ন মৌনির ঝুলিতে জমে আছে সেই আঠারো বছর ধরে। ছেলেবেলায় বড়চাচিকে সবসময় অসুস্থ দেখতো। মাঝেমধ্যেই বড়চাচা তাকে নিয়ে ঘরের দোর বন্ধ করে দিতেন৷ সকলে বলতো, বড়চাচির অসুখ ওঠেছে। কিন্তু কীসের অসুখ? সেই প্রশ্নও তো কত বছর পুরোনো। শাওন তার সঙ্গে কেন ওমন করলো? মৌনি আর সৌমিকে কেন সকলে বারবার পাশাপাশি দাঁড় করাতে চাইছে – এই সকল প্রশ্নগুলো নতুন। সবথেকে নতুন প্রশ্ন করেছে ইমতি, ‘তুমি আমার মায়ের মতো দেখতে কেন?’ মৌনি সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। যেমন করে ভাবতে ইচ্ছে করেনি, কেন মিষ্টিবুলি বড়চাচি কেবল তাকেই পছন্দ করেনি কোনোদিন। মৌনির মনে আছে, কৈশোরের শুরুতে একবার মায়ের শাড়ি পরেছিল মৌনি। দুই একজন তাকে বড় চাচির সঙ্গে তুলনা করেছিল বলে সেও কথায় কথায় চাচিকে বলে বসেছিল,
‘দেখো বড়চাচি, আমি তুমি সেজেছি।’
সরল চোখে তাকিয়ে থাকা ওই ছোট্ট মৌনির প্রতি আজ বড় মায়া হয় তার। সব চাইতে বেশি মায়া হয় সেই স্মৃতিটুকু মনে পড়ে। যেখানে বড়চাচি খুব নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিয়েছিলেন,
‘ আমি সেজেছ! কোথায় আমি আর কোথায় তুমি মৌনি? তোমার গায়ের রঙ তো ময়লা। শরীরের আকারও ঢেপসা ধরনের। দাঁতগুলোও একটু উঁচু ধাঁচের। মিথিকে আমার সাজে মানাতে পারে। ওর গঠন ছিপছিপে, গায়ের রঙও ভালো।’
সেদিন অপমানে নীল হয়ে গিয়েছিল মৌনি। কাঁচ ভাঙার মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল সমস্ত আত্মবিশ্বাস। তারপর অনেকদিন আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পেয়েছে সে। হাসতে ভয় পেয়েছে। বন্ধুত্ব করতে ভয় পেয়েছে। সেই সকল ভয় জয় করে আনন্দের বিজয়ঢঙ্কা বাজিয়ে লাস্যময়ী মৌনি হতে কতোই না যুদ্ধ করতে হয়েছে তাকে একদিন! মিথি আপা বলে, মৌনির নিজেকে নিয়ে বড় আহ্লাদ। মৌনি ভেবে পায় না, কেন থাকবে না আহ্লাদ? ওমন ভয়ের দিনগুলোতে আত্মাভিমানী মৌনির সঙ্গে সে ছাড়া আর কে ছিল এই পৃথিবীতে? মৌনিকে রোজ যে আত্মদ্বন্দের সমুদ্দুর পাড়ি দিতে হয়েছে সেই সকল সমুদ্দুরে কে ছিল দক্ষ মাঝি? ভেতর ভেতর উৎকণ্ঠায় অসার হয়ে যাওয়া, আত্মবিশ্বাস হারানো মেয়েটিকে কে বছরের পর বছর জড়িয়ে ধরে রেখেছিল উষ্ণ বুকে? মৌনিই তো! এই মৌনি তার নিজের আবিষ্কার। নিজের সন্তানের মতো আদুরে। এই আদুরে সন্তানকে মৌনি আহ্লাদ করবে না, তাই কী হয়!
মৌনি তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ মেলে তাকাল। ভাবনা কাটিয়ে দেখল ওগুলো আসলে নক্ষত্র নয়, জোনাক পোকা। পথ ভুলে তাদের একটি উড়ে এসে বসেছে মৌনির জানালার পাশে। উড়ে আসা জোনাক নিয়ে কোনো রকম উচ্ছ্বাস দেখাল না মৌনি। রাতের ওই অতন্দ্র প্রহরীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফের ঘুমের অতলে ডুবে গেল। আবার যখন ঘুম ভাঙলো তখন চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। অন্ধের মতো ছুটতে থাকা বাসটি ততক্ষণে পঞ্চগড় বাস টার্মিনালে এসে থেমেছে। মৌনি হাত-পা ছড়িয়ে একবার আড়মোড়া ভেঙে নিজের ব্যাগ-পত্তর নিয়ে নেমে এলো। ঘড়িতে ভোর চারটা বাজে। চারদিকে ভোর হওয়ার আগের আঁধার। বাস টার্মিনালে মৌনি বৈ অন্য কোনো রমণীর টিকিটুকুর সন্ধান নেই। পঞ্চগড় আসতে আসতে যাত্রীর সংখ্যাও কমে গিয়েছে। টার্মিনালের দুই-তিনটা ছোকরা বারবার ঘাড় ফিরিয়ে মৌনিকে দেখছে। মৌনি সে সকল পরোয়া করলো না। এখান থেকে তাকে যেতে হবে হোটেলে। গুগল ম্যাপ বলছে, গাড়ি করে মৌচাক হোটেল যেতে সময় লাগবে চার মিনিট। পায়ে হেঁটে পনেরো। মৌনির উচিত দ্রুত গাড়ির সন্ধান করে এখান থেকে কেটে পড়া। মৌনি গাড়ির সন্ধানে গেল না। টার্মিনালে এক বৃহৎ কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে পাকা বেদীতে আয়েশ করে বসল। কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ ঠান্ডা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিচ্ছে শরীর। মৌনির গায়ে শীতের কাপড় নেই। শীত নিয়ে তার মাথাব্যথাও নেই। তবে এক কাপ চা হলে সুবিধা হতো। টার্মিনালের ছেলেগুলোর চোখে তখনও কৌতূহল। কিঞ্চিৎ অসাধু অভিলাষও বোধ করি আছে। মৌনি তাদের কৌতূহল আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে গুনগুন করে গান ধরল,
‘ ওগো কাজল নয়না হরিণী
তুমি দাওনা ও দুটো আঁখি
ওগো গোলাপ পাপড়ি মেলো না
তার অধরে তোমাকে রাখি..’
গান শেষ করে মৌনি বিড়বিড় করে বলল,
‘ প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘা, এই গান কেবল তোমার জন্য।’
তারপর অনেকটা সময় চিত্রপুত্তলিকার মতো স্থির হয়ে বসে রইল মৌনি। ঠান্ডা হাওয়ায় তার চুল উড়ল। ফ্যাকাশে হলো আঁধার। টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেগুলো বিস্ময় নিয়ে দেখল এই আশ্চর্য মেয়েটি তখনও নিশ্চুপ, নীরবে তাকিয়ে আছে আকাশে। মেয়েটাকে এক মুহূর্তের জন্য পাগল বলে বোধ হলো তাদের। কিন্তু পোশাক-আশাক আর চেহারার গোপন আভিজাত্যে সে ভাবনাতেও ঠিক ভরসা হলো না। মৌনি এই ব্যস্ত টার্মিনালে একেবারে বিচ্ছিন্ন এক নগরীর মতো একলা বসে রইল সকাল ছয়টা পর্যন্ত। চায়ের দোকানের ঝাঁপ উঠে কাপের গায়ে চায়ের রং ছাড়ার পর তার ধ্যানভঙ্গ হলো। দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে সে গাড়ির খোঁজ করতে গেল। কাঞ্চনজঙ্ঘার আড়াল থেকে লাজুক সূর্য আড়মোড়া ভাঙতেই ভেতরের চঞ্চল মৌনিও আড়মোড়া ভেঙে স্বমহিমায় ফিরে এলো যেন। পঞ্চগড়ের ভোর, চায়ের কাপ, রিকশা, পথচারী একের পর এক রঙিন ফটোতে ভরে উঠতে লাগল ক্যামেরার মেমোরি।
ঢাকা আর ময়মনসিংহের বাইরে একলা বেরিয়ে আসা মৌনির এই প্রথম। হঠাৎ এই একলা ভ্রমণের পেছনেও অবশ্য কারণ আছে। কারণটা টাকা-পয়সার সাথে সম্পর্কিত। আজকাল আঁকার মতো নতুন কোনো সাবজেক্টই পাচ্ছে না মৌনি। এদিক-ওদিক ঘুরেফিরে যদি চমৎকার কিছু সাবজেক্ট পাওয়া যায়! তাছাড়া এই ঘুরাফেরা তার লেখালেখির জন্যও বেশ আরামদায়ক। মেলার জন্য একটা উপন্যাস সে লিখে ফেলবে এই ঘুরাঘুরির মধ্যেই। আর কিছু না হলেও ইউটিউব চ্যানেলে কিছু ভিউ পাওয়া হবে। এ সবই মৌনির বাইরের কথা। ভেতরে ভেতরে মৌনির আসলে একটা ছুটির দরকার ছিল। নিজের সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটানোর দরকার ছিল। বুকের ভেতর অনেকগুলো প্রশ্ন ক্রমেই কেমন দমবন্ধ করে দিচ্ছিল তাকে। মৌনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই প্রশ্নের চাপ না কমা পর্যন্ত সে ছুটবে। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ, দেশের সমস্ত ঘুরে ঘুরে মৌনি ফেলে আসবে তার সমস্ত প্রশ্ন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………