মৌনচন্দ্রা - পর্ব ১৩ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          অবাক হইনি, আরাধ্যা! ওই বয়সটাই তো তখন আগুন বয়স। আর কিশোরীর প্রথম প্রেম বলে কথা। তবে, হাতে মোবাইলটা না এলে হয়তো আরও একটু সময় লাগতো এই কুমির ভর্তি জলে নির্দ্বিধায় অবগাহনে। সত্যিই কি প্লে-বয়দের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে প্রেম হয়ে যায়? তারা কথার জালে ফাঁসাতে জানে, শুনেছি...কিন্তু চোখের ফাঁদে ফেলে রাতের ঘুম কেড়ে নিতে এই প্রথম শুনছি। তবে, সেই প্লেবয়কে ক্রেডিট না দিয়ে আমি তোমার বয়সটাকেই ক্রেডিট দেবো বেশি। অনভিজ্ঞ মন তোমার, প্রেমে পড়ার জন্য একদম পার্ফেক্ট বয়স...ঠিক এমন সময়েই রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ এক অভিজ্ঞ রিং মাস্টারের যে মোক্ষম সুযোগটা কাজে লাগিয়ে দুর্ধর্ষ সিংহীকেও বাগ মানিয়ে ফেলল।

আচ্ছা, আপনি ভিকারুননিসায় কোনো প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্বে অংশ নিয়েছেন কি কখনো? কেন যেন মন বলছে, এটা সম্ভব হলেও হতে পারে...হতেই পারে আমরা একই জায়গায় ছিলাম। ২০১০ সালে কোন ক্লাসে পড়তেন? একদম বাচ্চা ক্লাসে কি? তাহলে হয়তো না। 

“কেউ আজন্ম তপস্যা করেও প্রিয়র স্থান নিতে পারে না, সেখানে আমি মাত্র দুটো চিঠি আর কিছু শব্দেই? আপনি নিশ্চিত?”
হ্যাঁ, ম্যাডাম। নিশ্চিতই তো... তুমি যেমন বলে-কয়ে মায়ার জাল ছড়াতে পারো, আমিও তেমনি তোমার হাতে চকচকে ছুরিটা ধরিয়ে দিয়ে, বুক পেতে দিতে পারি না? 

আচ্ছা, আপনাকে শুধরে দেওয়া আমার কাজ না। তবে একটা প্রশ্ন—
শাড়ি পরা
চুড়ি পরা
টিপ পরা
নথ পরা—হলে
কাজল কেন লাগানো হবে? চোখেও কাজল পরাই কি শ্রেয় নয়? কিংবা চোখে কাজল দেওয়া? 

আপনাকে তুমি বলে ডাকলে, তখন নিজের মানুষ বলে মনে হয়...মনে হয় গল্পের নায়িকাকে প্রশ্ন করার মতো কাছে চলে এসেছি। শাড়ি পরার যে ব্যাপারটা বললে না? আমি একটু কম বুঝি ব্যাপারটা। আটপৌরে তো বুঝলাম, কিন্তু কিছুটা উঁচু করে পরা বলতে? তা আশালতা আয়নায় তাকিয়ে কিছু বলল না আয়নাকে? বলা উচিত ছিল কিন্তু। 

এতো ভেজা চুল ফ্লোরে গড়াতে দাও কেন, আরাধ্যা? অনধিকার চর্চা হয়ে যায়, কিন্তু না ফেললেই পারো। এ তোমার ভারি অন্যায় কিন্তু। আমার যা কিছু ভাল্লাগে, সেসবের অযত্ন হচ্ছে দেখলে রাগ হয় খানিকটা। তোমার যেমন শাড়ি পরে বউ বউ সাজতে ভাল্লাগে, আমারও হয়তো বিপরীত চরিত্রটায় নিজেকে কল্পনা করতে ভাল্লাগে। কিন্তু খেয়াল করলাম, সেটার জন্য আমার কোনো প্রিয় পোশাক নেই। আচ্ছা, মানুষ হিসেবে কি আমায় কেয়ারিং মনে হয়?  

আপনি 'লা নুই বেঙ্গলী' + 'ন হন্যতে' পড়েছেন? 

আচ্ছা, যমদূত ভাইসাব যদি তখন বলে বসে, “চা হবে না, একটা বিস্কুট দেই, খান!”...খাবেন আপনি?

আমি চমৎকারভাবে কথা বলতে জানি কি না, জানি না আরাধ্যা। আপনার লেখা পড়লে, তখন যা মনে আসে লিখে ফেলি। কোনো প্ল্যান নেই—এক্কেবারে 'যাচ্ছেতাই' লিখি। আমরা দুজনেই সমগোত্রীয় পাগল কিনা—তাই নিজেদের ভাষা বুঝতে বেগ পেতে হয় না খুব একটা। হয়তো ভালোও লাগে। 

আমার চিঠি যেন শেষই হচ্ছে না। হাই উঠছে বেশ কিন্তু চিঠিটা শেষ করতেই হবে। কেউ আমার হয়ে লিখে দিলে ভালো হতো। আমি চোখ বুজে ডিকটেট করতাম—সে লিখে যেত!

কাঠগোলাপ আমার সবচেয়ে পছন্দের, ঠিক এমন না কিন্তু। এর চাইতে আমার ভোরে ঝরা শিউলি পছন্দ বেশি, কিংবা বকুল। সেন্ট জোসেফস ক্যাথেড্রাল এর ভেতর এবং আমাদের স্কুল মাঠের ভেতর কৃষ্ণচূড়া ছিল। আগুন লাগতো গাছগুলোতে বছরের সেই সময়ে—প্রকৃতির মনমুগ্ধকর লালচে আগুন। তবে, আমার মেমোরিটার জন্য কাঠ গোলাপ পছন্দ। 

প্রথম প্রেমে পড়ার বয়স তখন। মানবীর প্রেমে না পড়ে, আমি পড়লাম একটা গানের প্রেমে, একটা স্মৃতির প্রেমে, একটা ঘুম ভাঙা অচেনা সকালে বৃষ্টি ভেজা একটা ফুলের প্রেমে। আমাদের সেই সময় তখন 'ভাইরাল', 'হাইপ' শব্দের আবিষ্কার হয়নি। এখনকার মানুষ জাতে ওঠার জন্য অনেক কিছুকেই ওভার রেটেড করে দিয়েছে। তাতে অর্নব কিংবা কাঠগোলাপ এর দোষ নেই আসলে। গল্পটা আরেক দিন বলব নাহয়, কেমন? 

হ্যাঁ, জীবনের ছন্দে সুর খুঁজে পেতে যদি গান শিখতে হয়—তাহলে শিখবেন। তবে, যাকে 'প্রিয়' ডাকা চলে—তাকে অনিশ্চিত কারো হাতে গান শিখতে তুলে দেওয়ায় দ্বিধা আছে আমার। প্রক্সি হিসেবে একটা কথা বলতে পারি—আমার ছাত্র-ছাত্রীরা (সত্যিকার স্টুডেন্টই বটে) সব সময়ই বলেছে আমি নাকি সুন্দর করেই শেখাতে এবং বোঝাতে পারি। 

আচ্ছা, এখানে একটা কথা বলে রাখি। যদি কখনও টেকনিক্যাল কারণে আমরা একে-অপরের থেকে হারিয়ে যাই..তখন অন্তর্জালের জগতে 'আদ্রিয়ান নাওয়াজ মেজবাহ' নামের কাউকে খুঁজে দেখতে পারেন। তবে, রিকোয়েস্ট থাকবে, এমন ইমার্জেন্সি না এলে প্লিজ কৌতূহলী হবেন না বেশি। 

আপনার পছন্দের গানটাও আমার পছন্দ বেশ। ওঁর অনেক গানই আমার পছন্দ। আমি শুনে শুনে বড় হয়েছি। বৃষ্টির দিনে শুনতাম, অলস বিকেলেও শুনতাম। সেসব দিনও ছিল গান শোনার, আরাধ্যা। সিডিতে প্লে করে শোনা হতো, মোবাইল আর ইন্টারনেট তখনও অধরা। 

আর হ্যাঁ, মনে রেখো আরাধ্যা, তোমার কষ্টে তুমি একা নও..

পুনশ্চ ১: অনেকগুলো গান গেয়ে গেয়ে ডিলিট করে দিয়েছি। গলা সায় দিচ্ছে না আপাতত। তাই, গলায় যাচ্ছে—এমন একটা গান পাঠালাম। 

পুনশ্চ ২: শুধু একটা চিঠি ভরে যদি 'আরাধ্যা আরাধ্যা' ডেকে চলি, খুব কি অবাক হবে? নাকি খুশিতে হাসবে?

পুনশ্চ ৩: নাম রাখায় আমি বড্ড কাঁচা। তবে 'সাড়ে দুই' কেমন হয়? আপনি আমি আর আমাদের অধরা কল্পজগৎ। হিসেবে এলে 'সাড়ে দুই' শব্দটা অস্তিত্বহীন। ঠিক যেমনটা আমরা সত্য হয়েও কল্পনা... 
আর যদি গল্পটা আপনার দিক থেকে হয়, তবে একটাই নাম আমার মাথায় এসেছে। “মৌনচন্দ্রা”... ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করবেন না। 

Mezbaah.
June 8, 2017 6:00 AM

—————

একসাথে তিনটি চিঠি পাওয়ার যেই লোভটা একটু আগে আমাকে লোভি বানিয়েছিল, দ্বিতীয় চিঠিটি খোলামাত্র তা কর্পূরের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল। অ্যাপের গ্লিচের কারণেই সম্ভবত একই চিঠি দুইবার এসেছে। আমি মন খারাপ করতে করতেও করলাম না। হেসে ফেললাম অনায়াসে।

চিঠি দুইটা আমি কয়েকবার পড়লাম। সাথে এড করা আছে একটা কাপল ইলাস্ট্রেশন। বেনুনির ভাঁজে কাঠগোলাপ গুঁজে দেওয়া। আরও আছে ৩০ সেকেন্ডের একটা অডিয়ো। আমি সেটাও শুনলাম। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেলাম। আজকাল আমার ঘুমোতে কষ্ট হয় না। শান্তি লাগে। বুকের ভেতরের গুমোট ভাবটা কবে যে কেটে গেল... 

Summer has come and passed
The innocent can never last
Wake me up, when September ends...
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp