কিবোর্ডে জোরেসোরে আঙুলের বারি মেরে স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরালো সায়াহ্ন। তারপর অস্থির হয়ে এদিকওদিক তাকালো। গত দু ঘন্টা হলো ল্যাপটপ কোলে করে ও ব্যালকনির বিনব্যাগে বসা। সকালেই অফিস যেতে হতো ওকে। কিন্তু মেজাজের অবস্থা ভালো না বলে ও ব্যস সন্ধ্যের শো এর জন্য অফিস যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপাতত সেখানকারই কাজ শেষ করতে বসেছিল। অথচ বিশ মিনিটের কাজটা ও দু ঘন্টাতেও শেষ করতে পারলো না। মনোযোগই দিতে পারলো না কাজে। কপাল চেপে ধরে সায়াহ্ন নিচে তাকালো। ব্যালকনির মেঝেতে পাঁচটা পোড়া সিগারেটের শেষাংশ। তবে সেগুলো পুরোপুরি ও খায়নি। টানার উদ্দেশ্যে ধরালেও, কাজে মনোযোগ দেবার জন্য এক দুবার টান দিয়েই সায়াহ্ন সেগুলো রেলিংয়ে রেখেছিল। তারপর ওর অনাগ্রহে সেগুলো আপনাআপনি পুড়েছে।
দরজায় নক শুনে সায়াহ্ন চোখ তুলে তাকালো। মিসেস সরোয়ার দরজায় দাঁড়ানো। বাসায় থাকলে খাবার বানানোর জন্য তিনি অবশ্য অবশ্য ছেলে আবদার শোনেন। এখনো তিনি সেজন্যই এসেছেন এমনটা ধারণা করলো সায়াহ্ন। পা দিয়ে ঠেলে পোড়া সিগারেটগুলো আড়াল করে উঠে দাঁড়ালো ও। ল্যাপটপ বিছানায় রাখতে রাখতে বলল,
– যা খুশি রান্না করো আজ।
– রান্না হচ্ছে না বাসায়। বিয়ের দাওয়াত আছে। কনের বাবা আমাদের সবাইকে যেতে বলেছেন। না গেলে তোর বাবার ইনসাল্ট হবে।
বলতে বলতে মিসেস সরোয়ার ছেলের এলোমেলো শার্টের গাদা গোছাতে লাগলেন। সায়াহ্ন মাকে দেখলো, অতঃপর তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কয়েক মিনিটে গোসল শেষ করে বেরিয়ে, শার্ট গায়ে পরে ড্রেসিংটেবিলের সামনে তৈরী হতে লাগল ও। মিসেস সরোয়ার অবাক হয়ে বললেন,
– কি ব্যপার? এখন কোথায় যাচ্ছিস?
– অফিসে।
– অফিস? তুই না ব্রেকফাস্ট টেবিলে বললি আজ অফিস যাবি না?
– এখন ইমারজেন্সি পরে গেছে।
মিসেস সরোয়ার ছোট্ট একটা দম ফেললেন। ছেলের স্বভাব পরিচিত তার। তিনি বেশ ভালোমতোই জানেন, কোনো ইমারজেন্সি পরেনি সায়াহ্নর। কেবলমাত্র দাওয়াতে যাবে না বলে অযুহাত বানাচ্ছে সে। সায়াহ্ন চুল উল্টে দিয়ে মোবাইল আর মানিব্যাগটা হাতে নিলো। হাতঘড়ি পরতে পরতে মায়ের সামনে এসে দাড়িয়ে বলল,
– ফিরতে দেরি হবে। চাবি নিলাম না। আর বাবাকে বলো, আমি বিয়েবাড়ি না যাওয়ায় তার ইনসাল্ট হয়েছে জেনে আমি গভীরভাবে শোকাহত। আসছি।
বরাবরের মতো মায়ের কপালে চুমু দিয়ে সায়াহ্ন বেরিয়ে যায়। মিসেস সরোয়ার হতাশায় মাথা দুলালেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে আরো একবার দুয়া করলেন, “আমার এই গা-ছাড়া ছেলেটার জন্য দ্রুত একটা বুঝদার মেয়ে পাঠাও মাবুদ! প্লিজ!”
বার্গারে কামড় দিতে দিতে সায়াহ্ন মাঝদুপুরে অফিসে ঢুকল। আধখাওয়া বার্গারটা সহ ওকে ডেস্কের দিকে এগোতে দেখল সবাই। কিন্তু ও ভ্রুক্ষেপহীন। ডেস্কের কম্পিউটার অন করে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো গিয়ে। ডানহাতে বার্গার ধরে রেখে সায়াহ্ন বা হাতে মাউসে কম্পিউটার ঘাটাঘাটি করছিল। তোফায়েল দুটো কাগজ হাতে এগিয়ে আসলো ওর দিকে। সায়াহ্ন একপলক বন্ধুকে দেখে, আবারো স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল,
– আধমরা হয়ে আছিস কেন? কি হয়েছে?
– গেস্টের ইমারজেন্সি পরে গেছে। আসবে না সে। এমডি বলেছে নতুন স্ক্রিপ্ট বানাতে।
সায়াহ্ন থেমে তোফায়েলের দিকে তাকায়। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো দুরে কাচের দেয়ালের ওপারে বসা হাসানের দিকে। ওর চেহারাটা দেখতেই চোয়াল শক্ত হয়ে যায় সায়াহ্নর। তোফায়েল গলা নামিয়ে বলল,
– হাসানের ওপর রাগ করিস না সায়াহ্ন। আজ সত্যিই ওর দোষ নেই। সত্যিই গেস্ট আজ লাস্ট মোমেন্টে জানিয়েছে যে আসতে পারবে না। কিন্তু তবুও বেচারা কেন যেন তোকে খোঁচাতে নিজে না এসে আমাকে পাঠালো, বুঝলাম না।
কয়েকফুট দূরে নিজের কেবিনে বসে হাসান ঢোক গিলল একটা। আগেরদিন সায়াহ্ন হামিদের দেওয়া চড়টাকে স্মরণ করে গলারদিক হাত বুলালো ও। চক্ষুলজ্জায় গালে হাত দিলো না। সাঁঝ চলে যাবার পরপরই যে চড় ওর দুনিয়া ধাঁধিয়ে দিয়েছিল, সেই চড়দাতার সামনে আজ “স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ” শিরোনাম নিয়ে যাওয়ার সাহস ওর নেই। এজন্যই তোফায়েলকে দিয়ে খবরটা পাঠিয়েছে ও।
সায়াহ্ন পানির বোতলটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অফিসের মূলদরজার দিকে হাটা লাগিয়ে সোজাশব্দে বলল,
– শো করব না আজ। বসকে বলিস।
—————
চৌধুরী পরিবার এ পাড়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর একটা। মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে তাদের তিনতলা বাসার গোটাটা আজ মরিচবাতিতে সাজানো হয়েছে। বাসার সামনের বড় জায়গাটায় প্যান্ডেল করা হয়েছে। সেই প্যান্ডেলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পানির জগ নিয়ে রাখছে অভ্র। কনে একদিকে ওর বন্ধুর বোন, আরেকদিকে সাঁঝের কলেজের বান্ধবী। উপরন্তু ওরা একই পাড়ার বাসিন্দা। যারফলে বিয়ের অনেকটুকো কাজকর্মের দায় নিয়ে বসে আছে অভ্র। প্যান্ডেলের একপাশের টেবিলে বসেবসে ওকেই দেখছে দিবা। অভ্র ওর আশপাশ দিয়েই পুরোটা সময় হাটাহাটি করছে। অথচ একবারের জন্যও ওরদিক চোখ তুলে তাকায়নি৷ এদিকে দিবা আসার পর থেকে ওর দিকেই চেয়ে আছে। আশায়। হয়তো চোখাচোখি হলে ও আর এমন করে থাকবে না। কিন্ত তা হয়না। অভ্র শুরু থেকেই এমনভাবে ওকে পাশ কাটাচ্ছে, যেন ওকে চেনেই না। যেমনটা কলেজে করে। মিসেস সরোয়ার একটু দুরে ফোনে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কল কেটে দিবার পাশের চেয়ারে বসে গেলেন তিনি। ডাক লাগালেন,
– এইযে বাবা? একটা জগ এদিকেও দাও।
জগ হাতের অভ্র চমকে পেছনে তাকায়। মিসেস সরোয়ারের ঠিক পাশেই বসা দিবার নড়চড় নেই। ও ওরদিকেই চেয়ে আছে। একটা ছেলে অভ্রকে পাশ কাটিয়ে আসছিল। ছেলেটার পথ আগলে হাতের জগটা তাকে দিয়ে দিলো অভ্র। দিবাদের টেবিল দেখিয়ে বলল সেখানে রাখতে। তারপর একটা মোজোর বোতল নিয়ে ছিপি খুলতে খুলতে চলে গেল ওখান থেকে। দাঁতে দাঁত পিষলো দিবা। হাতের টিস্যুটা সর্বশক্তিতে মুচড়ালো ও। তখনই সরোয়ার হামিদের সাথে মোশাররফ তালুকদার আসে জায়গাটায়। তাদের পেছনে মিসেস মোশাররফ, মাশফিক, আসিফ, রুবিও ছিল। সরোয়ার হামিদ হাত বাড়িয়ে মোশাররফ তালুকদারকে নিজেদের টেবিলটা দেখিয়ে বললেন,
– ভাই আপনারাও এখানেই বসেন। একসাথে বসি সবাই।
তালুকদার পরিবার অতি সৌজন্যের সাথে বসে যায়। মসজিদ, বাজার, চায়ের আড্ডা বা হাটাহাটিতে এ পাড়ায় যাদের সাথে সরোয়ার হামিদের ওঠাবসার সম্পর্ক আছে, তাদের মধ্যে মোশাররফ তালুকদার একজন। ছেলের হয়ে মোশাররফ তালুকদারের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। যারফলে ওনাদের সম্পর্কটা ঠিক হতে সময় লাগেনি। আর যেহেতু এখানে সায়াহ্ন হামিদ নেই, মাশফিকেরও অভিযোগের কোনো কারণ ছিল না। বাবার সাথে সরোয়ার হামিদের মিলতালকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল ও। দিবার এতক্ষণ রাগ ছিল। কিন্তু মিসেস মোশাররফকে দেখে ওর গাল লজ্জায় গরম হয়ে ওঠে। দুই পরিবার সামনাসামনি বসে ছিল। পরিচয়পর্ব শেষে মিসেস মোশাররফ হাসিমুখে দিবাকে বললেন,
– কেমন আছো দিবা?
– জ্ জ্বী আন্টি। আছি ভালো। আপনি?
– এইত্তো আলহামদুলিল্লাহ।
মিসেস মোশাররফকে মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখে মিসেস সরোয়ার অবাক হলেন কিছুটা। বললেন,
– দিবাকে কি আপনি আগে থেকে চেনেন?
– হ্যাঁ। সাঁঝের বই ফেরত দিতে তালুকদার নিবাসে গিয়েছিল ও। সেদিনই পরিচিত হলাম আমরা।
মিসেস সরোয়ার প্রসারিত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। যে মেয়ে এনিমে, বিদেশী নাটক সিনেমা দেখে সময়ের কুলকিনারা পায় না, সে সাঁঝের বই কবে নিলো? আর সেটা ফেরত দিতে ওদের বাসা অবদি চলে গেল? দিবা টু শব্দটাও করলো না। নিচেরঠোঁট কামড়ে ধরে দৃষ্টিনত করে রইল। মিসেস সরোয়ার সাঁঝের কথা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই সরোয়ার হামিদ খাবার প্লেটে নিতে নিতে বললেন,
– ভালো কথা! সাঁঝ-অভ্র, ওদের তো দেখলাম না। ওরা কোথায় মোশাররফ ভাই?
– অভ্র মনেহয় ওর বন্ধুদের সাথে। আর সাঁঝ আহিকে নিয়ে ভেতরে আছে।
মাশফিক জবাব দেয়। কথাবার্তায় এতবার সাঁঝের নাম আসায় বিরক্ত হচ্ছিল রুবি। আসিফ ওর প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল। কিন্তু রুবি নিজেই চামচ নিয়ে নিলো ওর হাত থেকে। নিজের প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বিড়বিড়িয়ে বলল,
– বলেছিলাম তোমরা খেয়ে এসো, আমি আহিকে নিয়ে থাকি। না! ওকে নিয়ে সাঁঝ থাকবে। ও কারো কথা শোনে না কেন বলোতো আসিফ?
– তুমিও জানো, কারো কথা সাঁঝের মতো কেউ শোনেনা। তবুও শুধুশুধু রিয়্যাক্ট করছো।
– শুধুশুধু?
– তা নয়তো কি? আমরা সবাই এখানে খাবো আর তুমি আহিকে নিয়ে থাকবে, সাঁঝ এটা কখনো হতে দিত না। তাছাড়া এটা ওর বান্ধবীর বাসা। ও এখানে যত কমফোর্টেবল, তুমি ততোটা হবে না এটা সাঁঝ জানে। তাই তোমাকে একা ছাড়েনি। আর তোমারও ওকে নিয়ে এতো ভাবতে হবেনা। এবাসায় ওর অসুবিধার কিছু থাকলে আমরাই ছাড়তাম না ওকে।
রুবি দুদন্ডের জন্য থেমে স্বামীর দিকে তাকালো। তাকে একেবারে স্বাভাবিক ভঙিতে খেতে দেখে ও নিজেও খাওয়ায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলো। সুজিকে ব্যাগে করে আনা হয়েছে। রুবি জানে, সাঁঝ যত্নেই রাখবে আহিকে। তবু চিন্তার রেশ ওর কপালের ভাজ থেকে সরলো না। না জানি সুজি ব্যাগেই আছে কিনা, না জানি কি করছে আহিটা!
বিছানায় শুয়ে হাতপা নাছড়ে আহি। জ্বলজ্বলে চোখে বোনকে দেখছে, আর হাসছে ও। সাঁঝ ওকে শুইয়ে দিয়ে উবু হয়ে ওর চেহারার সামনে দাঁড়ানো। হাত নাড়িয়েচাড়িয়ে, মুখভঙ্গি করে আহিকে ফুরফুরে রাখতে ও পরিপূর্ণ সফল। বিছানা থেকে দুরে ক্লিন ব্যাগে আয়েশে শুয়ে ছিল সুজি। আহির সাথে সাঁঝকে দেখলে কখনোই বিরক্ত করে না ও। কনে সাজের মৌ ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসা ছিল। দুবার আহির ঝলমলে মুখটা দেখে, কানের দুল ঠিক করায় মনোযোগ দিলো ও। বলল,
– তুই পারিসও ভাই! এইটুকুন বাচ্চাকেও হাসাচ্ছিস!
সাঁঝ মুচকি হেসে বান্ধবীর দিকে তাকাল। এ ঘরটায় কিছুক্ষণ আগে ছিল বেশ কজন। আপাতত সবাই বর আপ্যায়ন আর খেতে গেছে। ব্যস সাঁঝ আর চারটে মেয়ে। তিনজন মৌয়ের কাছে, আরেকজন নেলপলিশ পরতে ব্যস্ত। মৌ দুল পরা শেষে সাঁঝের দিকে ঘুরে বসল। সাঁঝ তখনো হাত নেড়ে, চুড়ির আওয়াজ করে আহির সাথে খেলছে। ওর ইশারা বুঝে আসলো না মৌয়ের। ও অধৈর্য্য হয়ে বলল,
– কি বুঝাচ্ছিস বলতো! ওরই বা কি বোঝার বয়স হয়েছে? কি বুঝে হাসছে ও এমন?
“ মৌমাছির বিয়ে!
টিকটিকিতে ঢোলক বাজায়,
ধুনুচি মাথায় দিয়ে।”
– Excuse me?
মেয়েলী আওয়াজে কিছুটা অসর্তকে পেছন ফেরে সায়াহ্ন। অল্পবয়সী মেয়েটাকে একপলক দেখে নিয়ে, আবারো দরজা দিয়ে ভেতরে তাকায়। সাঁঝ তখনো আহিকে নিয়ে ব্যস্ত। মানে বাইরের আওয়াজ যায়নি ওর কানে। সায়াহ্ন রাগ নিয়ে অফিস থেকে বাসায় তো ফিরেছিল, কিন্তু তখন ওদের বাসার দরজায় তালা ঝুলছিল। চাবি নিতে সায়াহ্ন মাকে কল করেছিল। মিসেস সরোয়ার ওকে বলেছেন, বিয়েবাড়িতে এসে চাবি নিয়ে যেতে। সায়াহ্নর উপায় ছিল না। বাসার বাইরে মাকে না দেখে ভেতরে ঢুকে গেছে ও। কিন্তু করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় চুড়ির আওয়াজে ওর পা থামে। ঘাড় ঘোরাতেই চোখ পরে, ঘরের ভেতরে বিছানায় আহির দিকে উবু হয়ে হাত নাড়াতে থাকা সাঁঝকে। তার পরণে সাদা স্কার্ট, পাথরের কারুকাজ করা মিষ্টি রঙের বড়হাতা কুর্তা। আজও সাঁঝের চুড়ির আওয়াজ আর চোখের খুনশুটিতে সায়াহ্ন আটকে রয়। আর একচুল নড়া হয়নি ওর। সাঁঝের ইশারা দেখে ও নিজেনিজেই ছড়াটা আওড়াচ্ছিল। মৌ না বুঝলেও, ও নিশ্চিত ছিল, সাঁঝ এই ছড়াটাই বুঝাচ্ছিল আহিকে। নিজের এই বুঝ নিয়ে খুশি হচ্ছিল সায়াহ্ন। কিন্তু মাঝখানে বাগড়া দিলো “এক্সকিউজ মি” শব্দদুটো। একপ্রকার বিরক্ত নিয়ে সায়াহ্ন দরজা থেকে সরে দাড়ালো। মেয়েটাকে সোজাসাপ্টা বলল,
– You are excused.
লাজুক ভঙিতে দাঁড়ানো মেয়েটা সোজা হয়ে যায়। যেন এমন জবাব আশা করেনি ও। তবুও জোরপূর্বক হেসে বলল,
– আপনি আরজে সায়াহ্ন হামিদ না?
– হুম।
– Big fan of you!
– Thanks.
– আব্. . .If you don't mind, one selfie? Please, please, plesse?
ছোট্ট একটা দম ফেলল সায়াহ্ন। না চাইতেও মাথা দুলালো। মেয়েটা উত্তেজনার সাথে ফোনের সামনের ক্যামেরা অন করলো। কিন্তু ওরচে বেশ লম্বা হওয়ায় সায়াহ্ন স্ক্রিনে আসছিল না৷ কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়াল ও। সেলফি তুলে খুশি হয়ে যায় মেয়েটা। সায়াহ্ন আর দাঁড়ালো না। একপলক ভেতরে আহির সাথে মজা করতে থাকা সাঁঝকে দেখে নিয়ে, চলে গেল ওখান থেকে।
—————
মৌকে গাড়িতে তুলে দেবার পর যখন মোশাররফ তালুকদার বাসায় ফেরার কথা বললেন, ঠিক তখন সুজির কথা মনে পরলো সাঁঝের। অফিস থাকায় মাশফিক আগেই তালুকদার নিবাসে চলে গেছে। ওরসাথে মিসেস মোশাররফ, রুবি, আসিফও গেছে। বন্ধু, বান্ধবী আর প্রতিবেশির দায়িত্ব পালনে অভ্র, সাঁঝ আর মোশাররফ তালুকদার বিয়েবাড়িতেই রয়ে গিয়েছিলেন। সাঁঝ দ্রুততার সাথে বাবাকে সুজির কথা বোঝালো। ওকে মৌয়ের ঘরেই রেখে এসেছে ও। মোশাররফ তালুকদার মাথা দুলিয়ে মেয়েকে সুজিকে আনার কথা বুঝিয়ে মৌয়ের বাবার সাথে বসলেন। স্কার্ট ধরে দৌড়াল সাঁঝ। অভ্রও কান্নারত বন্ধুকে নিয়ে হাতপা ছেড়ে ফাঁকা প্যান্ডেলে বসে ছিল। বোনকে বাসার ভেতরের দিক দৌড়াতে দেখে ডাক লাগাল ও। সাঁঝ ছুটতে ছুটতেই ওকে ইশারায় সুজির কথা বুঝাল। অভ্র জিজ্ঞেসও করলো, ও সাথে যাবে কিনা। সাঁঝ নাসূচক জবাব দেয়। সাথে এটাও বোঝায়, মৌয়ের ঘরেই সুজির ব্যাগ আছে। অভ্র গুরুতর কিছু ভাবলো না। আবারো চোখমুখ মলিন করে বন্ধুর সাথে বসে রইল ও।
মৌয়ের ঘরে এসে আটকায় সাঁঝ। মৌয়ের মা শুকনো মুখে এ ঘরে বসে ছিল। আর তার আশেপাশে মৌয়ের আত্মীয়স্বজন সবাই ছিল। সুজির ব্যাগটাও ছিল। ব্যস ব্যাগে সুজি ছিল না। ঘরে থাকা চারপাঁচটে বাচ্চাকে দেখে সাঁঝের আর বুঝতে বাকি রইল না কি ঘটেছে। অতিকষ্টে ব্যাগটা নিয়ে, সৌজন্য হাসির সাথে সাঁঝ ওখান থেকে চলে আসলো। বাসার সর্বত্র খুঁজেও সুজিকে না পেয়ে চুড়ির আওয়াজ করতে করতে বাগানের দিকে যাচ্ছিল ও। এরমাঝে কানে আসে,
– সাঁঝ?
থমকে রইল সাঁঝ। কোনোমতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল ও। সিল ব্রাউন শার্ট পরিহিত মানব তখন দুহাত দুরে দাঁড়িয়ে ওর দিকেই তাকানো। কিন্তু ঝড়ো হাওয়ার মতো উত্তাল মানুষটার চোখেমুখে এ মুহুর্তে শান্ত নদীর স্থিরতা, জলের মতো শীতলতা। সাথে শান্ত ভঙির স্বীকারোক্তি,
– সেদিন হাসানের বলা কথাটার জন্য, সরি৷
সাঁঝ কুর্তা শক্তমুঠো করে ধরল। আর সায়াহ্ন ডানহাতের মুঠোতে থাকা সিগারেটটা ফেলার কথা ভুলে গেল। বাসায় ফেরা হয়নি ওর। দিবা সরোয়ার হামিদের সাথে চলে গেলেও মিসেস সরোয়ার মৌয়ের মায়ের কাছে থেকে গিয়েছেন। সেইসাথে ছেলেকে বলেছেন কনেবিদায়ের পর তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সায়াহ্নর উপায় ছিল না। এদিকওদিক ঘুরে সময় পার করে, মাকে নেওয়ার জন্য আবারো এ বাসায় এসেছে ও। সমাগম এড়াতে বাগানের একপাশে দাড়িয়ে ও নিজেরমতো সিগারেট টানছিল। এখানে চুড়ির আওয়াজ ওরজন্য যতোটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল, ততোটাই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল সাঁঝের উপস্থিতি। সাঁঝকে দেখতেই সায়াহ্নর হাসানের কথা মনে পরে যায়। সরি বলার জন্য ওর জন্য এরচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হতো না। আর সে সুযোগটাই নেয় সায়াহ্ন। তবে ওর সরি হয়তো কবুল হয় না। কোনো জবাব না দিয়ে, প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সাঁঝ চুপচাপ ওকে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে যাচ্ছিল।
কিন্তু ন্যানোসেকেন্ডের ব্যবধানে বদলে যায় পরিস্থিতি। কানে আসা একাধারে বিকট শব্দের মাঝে সায়াহ্ন আস্তেধীরে ঘাড় ঘুরালো। আর বা কাধের পেছনদিকে তাকাতেই পলক ফেলা ভুলে যায় ও। আকাশে হতে থাকা আতশবাজির আলোতে ও স্পষ্ট দেখল, ওর পেছনে দাড়ানো সাঁঝ চোখ খিঁচে বন্ধ করে আছে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড; আতশের আওয়াজ থামার পর ফুলের পরিস্ফুটনের মতো সে চোখের পাতা মেললো। ভয়ার্ত চাওনির সে চোখজোড়া, ওর চোখেই চায়। ভয়ই ছিল সাঁঝের ওই চাওনিতে। আর সায়াহ্ন সেটা টেরও পেয়েছিল। কেননা সব বলতে জানা এই ভাসাভাসা চোখজোড়া ওর পরিচিত। তবে হয়তো সৌন্দর্য শব্দটার সাথে সায়াহ্নর খুবএকটা পরিচয় ছিল না। সেই পরিচিত চোখের পাপড়ির নড়চড়, ধনুকের মতো বাকা ভ্রুজোড়া, মাঝসিঁথির প্রান্তে থাকা ছোট্ট টিকলিটার সাথে প্রথমবারের পরিচয়ে সায়াহ্নর আজ মনে হলো, সৌন্দর্য শব্দটা এ মুহুর্তে সাঁঝ হয়ে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। বা হাতটা আস্তেধীরে ছাড় পাচ্ছে, সেটা টের পেয়ে সায়াহ্ন নিজের হাতের দিকে তাকালো। ওর শাটের গুতানো হাতার ভাঁজ অল্প পরিমানে মুচড়ে যাওয়া। একজোড়া হাত যে ওর ডানহাতের কনুইয়ের ঠিক ওপরদিকটা শেষ সম্বলের মতো আঁকড়ে ধরেছিল, ওটা তারই প্রমাণ।
সায়াহ্নর হাত ছেড়ে দিয়ে আস্তেকরে একপা পিছিয়ে গেল সাঁঝ। ওর ভয়টা তো অস্বাভাবিক নয়! বর আসার উল্লাসে বাচ্চারা যে আতশবাজি এখানটায় রেখে গিয়েছিল, সায়াহ্ন হামিদের ছোড়া সিগারেটের আগুনে সেগুলো যে এসময়, একাধারে, এভাবে ফুটতে শুরু করবে, তা ও কিকরে জানবে? পায়ের সাথে সুজির শরীরকে অনুভব করেও সাঁঝ নিচে দেখল না। বাহাতে ওড়না পেঁচিয়ে ও আগে দেখল আকাশের ঝলমলে আতশবাজির খেলা, তারপর অসহায়ের মতো করে তাকালো সায়াহ্নর দিকে। তালুকদার পুরুষেরা আগলে রাখে বলে ওকে কখনো অন্যকারো মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। তাই ওর কখনো মনেও হয়নি, এই চারপুরুষ বাদে কেউ ওকে আগলে রাখার দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু আজ সাঁঝের মনে হতে লাগলো, কারণে-অকারণে একজন ওকে প্রতিনিয়ত আগলে যাচ্ছে। এই লোকটার সামনে, আগে, পরে, প্রতিবারই ওকে এমন অস্বস্তিভরা পরিস্থিতিতে পরতে হয়; আর প্রতিবারই এই লোকটা ওর সামনে ঢাল হয়ে দাড়ায়। দুইপা সামনে দাড়ানো সুঠামদেহী মানুষটার উপস্থিতিতে সাঁঝের চারপাশ ক্রমশ অবরুদ্ধ লাগতে শুরু করলো এবারে। ওর কাউকে প্রয়োজন নেই। ও চায় না কেউ ওর ঢাল হয়ে দাঁড়াক। তবুও এমন পরিস্থিতি কেন? নিরুপায় না হয়েও ও এমন নিরুপায় কেন? ওর দায় নিতে, তালুকদার চারপুরুষ বাদে, অন্যকেউ কেন? আর সেই অন্যকেউটা, সায়াহ্ন হামিদই কেন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………