আজকে মুনায়া বেশ বেগম সুস্থ অনুভব করছেন। নিজে থেকে সকালে রান্নাও করেছেন। তাবাসসুম অবশ্য বকাঝকা করে রান্নাঘর থেকে একবার বের করে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মুনায়া বেগমের বকাঝকার সামনে কি সে আর টিকতে পারে? তাই মুনায়া বেগমেকেই রান্না করতে দিয়েছিল।
মুনায়া বেগম একটু সুস্থ উপলব্ধি করায় এখন উঠেপড়ে লেগেছে যেন তাবাসসুমকে এ বাড়ি থেকে তারানোর জন্য। কতদিন ভার্সিটি মিস দিয়েছে। পড়ার কত ক্ষতি হলো। হেনতেন সকাল থেকে তিনি বকবক করে যাচ্ছিলেন আর রান্না করছিলেন। তাবাসসুম তো সোজা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে সে এখনই যাবেনা। মুনায়া বেগম যে পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ না হচ্ছে। দরকার পড়লে এখান থেকে ভার্সিটি করবে। এতেও মুনায় বেগম প্রচন্ড দ্বিরুক্তি। সে কিছুতেই মেয়েকে এত কষ্ট করে দিবেন না। তাও তার জন্য।
তাবাসসুমও কম যায় কিসে? মুনায়া বেগমকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মানিয়ে নিয়েছে। যতদিন পর্যন্ত মুনায়া বেগম পুরোপুরি সুস্থ না হচ্ছেন সে এক পাও নড়বে না। মেয়ের জিদের কাছে মুনায়া বেগম হার মেনে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
মায়ের পাশে তনুকে বসিয়ে রেখে তাবাসসুম ছাদে এসেছে। অনেকদিন হলো সে বাড়িতে এসেছে। কিন্তু ছাদে আসা হয়নি একবারও। আজকে একটু সুযোগ এবং সময় দুটোয় পেয়েছে। ছাদের গাছগুলোরও যত্ন নেওয়া হয়না অনেকগুলো দিন হলো। তাবাসসুম গাছগুলো ছুঁয়ে দিয়ে, রেলিঙের কাছ ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো।
আকাশ মেঘলা আজকে। বসন্ত সেই কবে চলে গিয়েছে। প্রকৃতি এখন বেশ উত্তপ্ত। তাবাসসুম ঋতুর খোঁজখবর জানে না। রাখেও না। তবে এখন যে গরমকাল সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সকালেই কি ভ্যাপসা গরম ছিল। এখন আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে চারপাশে হাওয়া দিচ্ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির অস্তিত্বও টের পেল সে। তাবাসসুম বেশ স্বস্তি নিয়ে দাঁড়ালো এবার।
মিনিট কয়েক পেরুলো না, তাবাসসুমের হাতের ফোন বেজে উঠল শব্দ তুলে। ফোন সামনে তুলতে স্ক্রিনে পরিচিত নাম্বার দেখে মুখে হাসি ফুটল তার। সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করে কানে তুলল।
“হ্যালো?”
“বৃষ্টির মধ্যে ছাদে কি করছো তুমি?”
তাবাসসুমের এই কথার পেক্ষিতে অবাক হওয়ার কথা ছিল। কারণ ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যাক্তিটি তার সম্পূর্ণ অচেনা। নামটা পর্যন্ত জানেনা সে। অথচ বড্ড আপন সে। তাবাসসুম চোখ বন্ধ করে নিল৷ সেই মেসেজ দেওয়া লোকটিকে জোরজবরদস্তি করায় যেদিন প্রথম ফোন দিল। তার মধুর স্বরে তাকে বসন্ত কন্যা বলে ডাকলো, তাবাসসুম বুঝেছিল সেদিনই সে কঠিন প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়েছিল৷ যে রোগ নিরাময়ের নয়। তাবাসসমু চাইলোও না নিরাময়ের কোনো প্রতিষেধন খুঁজতে বরং সে আরও আক্রান্ত হতে চাইল৷ তাই হচ্ছে। সে ক্রমাগত মৃত্যুর পথে দৌড়াচ্ছে। ভালোবাসা নামক এক সুখময় মৃত্যু।
তাবাসসুম ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বলল,
“কোথায় তুমি? জানলে কিভাবে আমি ছাদে আছি?”
ওপর পাশ থেকে নিঃশব্দে হাসির আওয়াজ আসলো।
“আমি সবটা সময় তোমার আশেপাশেই তো থাকি। তুমি দেখতে পাওনা।”
তাবাসসুম মন গোমড়া করে বলল,
“দেখা দাওনা তো।”
“সময় এলে দিবো।”
“তা সময় কবে আসবে আপনার?”
“তুমি যতটা তাড়াতাড়ি চাইবে।”
“আমিতো এখনই চাই।”
“এত অধৈর্য হতে নেই বসন্ত কন্যা। তুমি কিন্তু এখনো বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছো৷ ঘরে যাও।”
তাবাসসুম কান থেকে ফোন নামিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। ছাদের দরজা পর্যন্ত আসতে দেখতে পেল, রুশান ছাদে আসছে। রুশানের সাথে প্রতিদিন দেখা হয় তার৷ কিন্তু এখন অবশ্য ঝগড়া হয়না আগের মতো। রুশান শুরু থেকেই মুনায়া বেগম এর যাবতীয় ঔষুধ, ডাক্তার দেখানো সবকিছু নিজেই করেছেন। এই লোকটা ছিলো বলে স্বস্তি পায় তাবাসসুম।
রুশান তাবাসসুমের পাশ কেটে যেতে নিতেই, তাবাসসুম দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“এই বৃষ্টির মধ্যে ছাদে?”
রুশান তাবাসসুমের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“হ্যাঁ ভিজবো। আপনি ভিজবেন আমার সাথে?”
তাবাসসুম নাকোচ করতে চাইল। কিন্তু তার পূর্বেই রুশান বলে উঠল,
“অনেকদিন হলো বৃষ্টিতে ভেজা হয়না জানেন?”
তাবাসসুম ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই বৃষ্টিতে ভিজবেন? বৃষ্টি তো আসেই নি এখনো।”
রুশান ছাদের দিকে যেতে যেতে বলল,
“বৃষ্টি আসবে। ঝুম বৃষ্টি নামবে একটু পরে। দেখছেন না উত্তরের আকাশ কালো। আপনি শুমশুম শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?”
তাবাসসুম মাথা নাড়িয়ে বলল,
“জ্বী।”
“এটা বৃষ্টির শব্দ। উত্তর দিক থেকে তা ধেয়ে আসছে এদিকে। কিছুক্ষণের মাঝেই ঝুম বৃষ্টি পড়বে।”
তাবাসসুম ছাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সে আসলেই দেখতে চাইছে, রুশানের কথা সত্যি প্রমাণিত হয়ে ঝুম বৃষ্টি নামে নাকি? অবাক করা বিষয়, মিনিট দুয়েকের মাঝে ঝুম বৃষ্টি নামা শুরু করলো। মূহুর্তের মাঝে রুশানের সমস্ত শরীর ভিজে পানি ঝরতে লাগলো। রুশান চোখ বন্ধ করে আকাশপানে মুখ করে আছে। তাবাসসুম তাকিয়ে আছে রুশানের দিকে।
তার মাঝে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। মাঝে মাঝে রুশান নামক পুরুষটাকে তাবাসসুমের প্রচন্ড সন্দেহ হয়। তার প্রণয় পুরুষ কি এই লোকটাই? কিন্তু মুহূর্তেই মাথা থেকে তা ঝেরে ফেলে তাবাসসুম। সেটা কিভাবে সম্ভব? দুজনের কথাবার্তায় কোনো মিল নেই। আর না স্বভাবে? দুজন দুমেরুর মানুষ।
তাবাসসুমের ভাবনার মাঝে রুশান সহসা আওয়াজ তুলে বলল,
“আপনি ভিজবেন তাবাসসুম? আসুন।”
রুশান হাত এগিয়ে দিলো। তাবাসসুমের কি হলো, সে রুশানের এগিয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে ছাদের মাঝে এসে দাঁড়ালো। মুহুর্তের মাঝে ঝুম বৃষ্টি তার সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দিল।
রুশান তাবাসসুমের হাত ধরে ছাদের চিলেকোঠার একপাশের দেয়ালের কাছে নিয়ে এলো। যেখানে চিলেকোঠার টিনের চালা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। রুশান তাবাসসুম কে সেখানটায় দাঁড় করিয়ে বলল,
“টিনের চালা বেয়ে পড়া টুপটাপ বৃষ্টিতে ভিজেছেন কখনো তাবাসসুম?”
তাবাসসুম দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। রুশান হেসে বলল,
“চারপাশ দিয়ে হাটুন। দেখবেন ভালো লাগবে। গ্রামে আমরা এভাবে ভিজতাম জানেন?”
তাবাসসুম হেসে চারপাশে ঘুরতে লাগল। মন্দ লাগছে না তার। ভালোই লাগছে। তাবাসসুম এদিক থেকে সেদিক, সেদিক থেকে এদিক ঘুরছে। রুশান চিলেকোঠার দেয়ালে হেলার দিয়ে তাবাসসুমের করা পাগলামি দেখছে। আর হাসছে।
কিন্তু ছাদের দরজার সামনে থেকেও যে কেউ তাদের দুজনকে তীক্ষ্ণ চোখে অনেকক্ষণ যাবৎ দেখে চলেছে। সেটা দুজনের কেউ খেয়াল করলো না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………