বিল্ডিংয়ের ওপর পাশে ছোটখাটো একটা নার্সারি আছে। মেরিনের এখানে থাকাটাই মূলত এই নার্সারির জন্য। দুপুর হতেই সে কোনোমতে দু'মুঠো ভাত খেয়ে মাথায় বিরাট ওড়না জড়ালো। ওই তারফান ওয়াহাজ তাকে ছাদে গাছ লাগাতে মানা করেছে না? এই ব্যাটাকে যদি সে গাছ নিয়ে নাকানিচুবানি না খাইয়েছে! তাহলে তার নামও মেরিন খন্দকার না। হুহ!
নার্সারির বিশাল গেটটা লোহার তৈরি। তার পাশে মাঝারি আকারের টং দোকান আছে। ইখতিয়ার আদিল সেখানে বসে বসে চা খাচ্ছিল। সিগারেটের ছোঁয়াও বোধহয় পরেছে ঠোঁটে। হাতের দু'আঙুলে চেপে রেখেছে। মেরিনকে দেখা মাত্রই সিগারেটটা ফেলে দিলো। কাছে এগিয়ে মিটিমিটি হেসে শুধালো, “প্রেম করতে এসেছো?”
ইখতিয়ারকে মেরিনের ভালো লাগে না সেই প্রথম থেকে। এ লোক দেখা হলেই প্রেম বিষয়ক কথা জুড়ে দেয়। বিশ্রী বিশ্রী প্রশ্ন করে। সেই বিশ্রী প্রশ্নের উত্তরে মেরিন প্রতিবার মুখ কুঁচকে বলে, “আপনার মুখে কি প্রেম ছাড়া অন্য কোনো কথা নেই?”
“আছে তো! কোন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছো?”
শুধু মাত্র বাড়িওয়ালার ছেলে বলে ইখতিয়ার আদিল নামক বেত্তমিজটাকে চড় মারলো না মেরিন। চোখে মুখে আগের চেয়েও প্রগাঢ় বিরক্তি নিয়ে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। উত্তর দিলো না। কথা বললো না। লোহার গেটটা খুলল ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে। বহু পুরোনো তো! খোলার সময় কসরত না করলে হয় না।
এই নার্সারির তিনজন মালি। তারমধ্যে বয়স্ক একজনের সঙ্গে মেরিনের অল্প কয়েকদিনেই বেশ সখ্যতা হয়েছে।
মালি গোলাপ ফুলে পানি দিচ্ছেন। মেরিন এগিয়ে গিয়ে বললো, “কেমন আছেন, চাচা?”
মালি মেরিনকে দেখেই চমকে হাসলেন। উজ্জ্বল চোখে চেয়ে বললেন, “এইতো ভালা! গাছ নিতে আইছো নাকি? এই গোলাপগুলা নতুন আনছি। টকটইক্কা লাল! নিবা একটা?”
ততক্ষণে মেরিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইখতিয়ার। গাছ দেখে নাক কুঁচকে বললো, “তুমি এখানে গাছ নিতে এসেছো? গোলাপ গাছ! কাকে দিবে?”
মেরিন এই এলাকায় এসেছে সপ্তাহখানেক হবে হয়তো। এই সাতদিনের ব্যবধানে চার চারটা আধপাগল লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে তার। উহু! চারটে নয় তিনটে! কালকে তালহাকে দেখে মনে হয়েছে বাকি ভাইদের চেয়ে সে একটু হলেও বুদ্ধিমান, বুঝদার।
পাশে দাঁড়ানো মূর্খ ইখতিয়ারকে মেরিন এবারও আমলে নিলো না। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ভালোই টাকা পয়সা নিয়ে এসেছিল। একবার ছোট্ট নার্সারিটার আনাচে-কানাচে চোখ বুলালো। তারপর বললো, “নিবো চাচা। বেলী আর জবাফুলের একটা করে গাছও নিবো। কত পরবে?”
“পাঁচ'শ পরবো।”
মেরিনের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা দেখা দিলো। গাছের দাম দিন দিন বাড়ছে। টাকা মিটিয়ে গাছগুলো নিতে গিয়েও আরেক বিপত্তি। ভীষণ ওজন। দু'হাতে আলগানো যাচ্ছে না। ইখতিয়ার মিটিমিটি হেসে বললো, “তোমার প্রেমিক তো আসলো না হেল্প করতে, আমি হেল্প করবো?”
মেরিন নিশ্চই হেল্প নিতো। কিন্তু এই প্রেমিক-প্রেমিকার কথাটা বলায় মেজাজ বিগড়ে গেল তার। কতশত প্রেম করে বেড়িয়েছে এই লোক কে বলবে! মুখে এক প্রেম ছাড়া কিচ্ছু নেই। প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেরিন। গরম লাগছে। এখন আবার ছাদে গিয়ে গাছগুলো ঠিকঠাক করে রাখতে হবে। ক্লান্ত চোখে একবার ইখতিয়ারকে দেখে সে বললো, “আমার প্রেমিক মানা করেছে ভাইয়া। যার-তার থেকে হেল্প নিতে।”
—————
এসির তীব্র ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে দিচ্ছে। হাত দিয়ে চেপে এসির পাওয়ার বাড়ালো তালহা। টেবিল থেকে আপেল নিয়ে কামড় বসালো। গম্ভীরমুখো তারফানকে বললো, “একটা আপেল খেয়ে দেখ ভাই। মিষ্টি আছে। তুই কি এখন মায়ের সঙ্গে রাগ করে এ ঘরের খাবারও মুখে তুলবি না?”
তারফান জবাব দিলো না। তার পাশে বসে থাকা তামজিদও একই ভাবে চুপচাপ হয়ে আছে। চেহারায় অনেকাংশ মিল থাকলেও ভাইদের সাথে তালহার আচরণের মিল নেই বললেই চলে। সে হচ্ছে দুরন্ত এক পাখি। হেসে খেলে, দুষ্টুমি করে বেড়ায় সবসময়। অথচ তার বড় দু’ভাই স্বভাবে গম্ভীর, বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না। আকাম-কুকাম যা করবে নিরবে, সকলের অক্ষি গোচরের বাইরে।
তালহা তামজিদকে বললো এবার, “তুই তো খেয়ে দেখ তামজিদ? নাকি তারফানের মতো তুইও মায়ের সঙ্গে রাগ করেছিস?”
তামজিদ মুখ কুঁচকাল। ক্ষণকাল টেবিলে থাকা আপলেগুলোকে পরখ করে দেখলো সে। সবচেয়ে সুন্দর, টকটকে লাল আপেলটা পেয়ে যেতেই হাতে নিলো। তারফানকে শুধালো, “ব্যাটাকে পেতে আর কতদিন তারফান? হাত নিশপিশ করছে কাউকে মা'রার জন্য।”
“কোন ব্যাটা? কাকে মা'রবি তোরা?” কণ্ঠস্বরটা রজনী হায়দারের। তারফান, তামজিদ আর তালহার মা।
তারফান মায়ের দিকে একবার চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলো। শান্ত স্বরে বললো, “কাউকে না।”
“তোরা আবারও ওসবে জড়িয়েছিস তারফান? মানা করেছিলাম না তোদের? তোরা কি আমাকে একটা স্বাভাবিক জীবন পেতে দিবি না?”
উত্তেজিত হতে গিয়েও নিজেকে সামলালেন রজনী হায়দার। তার ইদানিং শ্বাসকষ্টের রোগ হয়েছে। একটু থেকে একটু হলেই নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। জোড়ে জোড়ে বার কয়েক নিশ্বাস নিয়ে-ফেলে নিজেকে শান্ত করলেন তিনি। তারফানের দিকে উত্তরের আশায় তাকালেন। অথচ লাভের লাভ কিছু হলো না। তারফান উত্তর দিবে না। কখনো দেয়নি। আগের ন্যায় শান্ত সুরেই জিজ্ঞেস করলো, “কেন ডেকেছ?”
রজনী হায়দার এবার খানিকটা নরম হতে চাইলেন। ছেলেকে ঠিক কতদিন পর দেখছেন তিনি? চারদিন? পাঁচদিন? এক সপ্তাহ!
অচিরেই মমতা নিয়ে বললেন, “ভাত খেতে ডেকেছি। আজ এখানে থাক বাবা। কাল যাস চিলেকোঠায়?”
“হোটেলে খেয়ে নেব।”
তারফান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সেখানে আর থাকলো না। বহুদিন পর মায়ের নমনীয় মুখ দেখে তাকে জড়িয়ে ধরার বাচ্চাসুলভ অভিলাষ জেগেছিল মনে। ঠিক ছোটবেলার মতো। যখন তারা তিনভাই মিলে মায়ের পুরোটা কোল দখল করে রাখতো। মায়ের বুকের বা'পাশটা থাকতো তারফানের জন্য বরাদ্দ। তারফান সেই জায়গা কাউকে দিতো না। কাউকে না!
ছাদে এসে তারফান প্রথমেই দেখতে পেল এক ছন্নছাড়া, গোমড়া মুখো মেয়েকে। যে কি-না আপাতত সিমেন্টের মেঝেতে বসে গাছগাছালি নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে। স্টিলের, প্লাস্টিকের কিসব আজগুবি সরঞ্জাম ছড়িয়ে ছিটানো। একপাশে একগাদা মাটি পরে আছে। কালো রঙের টবে গাছ লাগাতে লাগাতে বারংবার তাকাচ্ছে চিলেকোঠার বন্ধ দরজার দিকে। বন্ধ দরজায় আঁটসাঁট করে থাকা তালা দেখে হতাশ হচ্ছে, বিরক্ত হচ্ছে, মুখ কুঁচকাচ্ছে! ক্ষণে ক্ষণে মুখের ভাবভঙ্গি পালটানো মেরিনকে তারফান অনেক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলো। পর্যবেক্ষণ করলো ধীর স্থির ভাবে। এরপর বড় বড় পা ফেলে মেরিনের সামনে গিয়ে প্রশ্ন করলো, “তোমাকে না গাছ লাগাতে মানা করেছি?”
সুনশান, ঘুমন্ত দুপুরের শেষভাগ। গোটা ছাদে একটা কাকপক্ষীও নেই। এহেন সময় হঠাৎ কেউ গমগমে গলায় কথা বলতেই তড়িৎ গতিতে চমকে উঠলো মেরিন। বলতে মানা, প্রচন্ড ভয় পেল। মাথা উঁচিয়ে তারফানকে দেখা মাত্রই যারপরনাই রাগ দেখালো, “আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন কেন? কি সমস্যা আপনার?”
মেরিনের ভয় পাওয়া, চমকানো— সবটুকু মনোযোগ দিয়ে দেখলো তারফান। অথচ তার মুখের গম্ভীর ভাব তখনো অটল। মেরিন মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো। তেঁত হয়ে গেল তার মুখ, গলা। এ লোক এমন কেন? অদ্ভত, অদ্ভুত সব আচরণ! সে ফের বললো, “আপনার কথায় আমি গাছ লাগানো বন্ধ করবো না। আমি এখানে ভাড়া দিয়ে থাকি।”
“এই ছাদ আমার।”
“আপনি বললেই হলো?”
“হ্যাঁ।”
“প্রমাণ দিন তাহলে।”
তারফান প্রমাণ দিলো না। বরং আরেকটু কাছে গিয়ে দাঁড়ালো মেরিনের। এক কদম! দুই কদম! আচমকা হাঁটু গেড়ে মেরিনের মুখোমুখি বসে পরলো তারফান। এগিয়ে এলো কাছে, খুব কাছে! মেরিন বিস্ময়ে, আতঙ্কে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো। ঠিক সেই মুহুর্তে কিসের যেন প্রচন্ড আওয়াজে আত্মাশুদ্ধ কেঁপে উঠলো তার। চোখ মেলল তাড়াতাড়ি। সামনে তারফান নেই। সে চিলেকোঠায় চলে যাচ্ছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আওয়াজের উৎস খোঁজার চেষ্টা করলো মেরিন। মেঝেতে তার কালো টবটা নেই। ছাদের আনাচে-কানাচে কোথাও নেই। মুহুর্তেই কিছু একটা আন্দাজ করে দ্রুত ছাদের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো মেরিন। ওইতো! তার শখের কালো টব-টা টুকরো টুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে পরে আছে বিশাল উঠোনের এক এক জায়গায়। বিমূঢ় মেরিন চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেল যেন। মস্তিষ্ক কিছুক্ষণ কাজ করলো না। পেছন থেকে তারফানের দাম্ভিক কণ্ঠস্বর শুনতে পেল শুধু, “লাস্ট ওয়ার্নিং মেরিন। কথা শুনবে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………