মেঘবন - পর্ব ০৪ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          এই বিল্ডিংয়ের মালিক বড় হয়েছেন ভিন দেশে। তার চিন্তাধারা, মতামতও তাই অনেকটা ভিনদেশির মতোই। সেখান থেকে এই যে ছাদসংলগ্ন চিলেকোঠা? বিদেশিদের মতোই এই চিলেকোঠাও বানিয়েছেন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগিয়ে। ছোট্ট একটা মাঝারি ঘর। অতি সামান্য ওয়াশরুম। একপাশে ক্ষুদ্র জানালা। আলো-বাতাস তেমন ঢোকে না। গুমোট পরিবেশ। সারাদিন এসি চালিয়ে না রাখলে গরমে জান যায় যায় অবস্থা। একপাশে ছোট্ট পড়ার টেবিল, বিছানা। সবকিছু সাদা রঙের। কেবল মাথার ওপরের ছাদ কালো কাঠের বিধায় বেশ গর্ব নিয়ে চোখে বিঁধে।
তারফান গোসল করে খালি গায়ে বের হলো। পরনে শুধুমাত্র ছাঁই রঙা একটা ট্রাউজার। তোয়ালে দিয়ে মাথার ভেঁজা চুল মুছতে মুছতে তাকালো বিছানার ওদিকটায়। তামজিদ হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। তারফানকে দেখে আলস্য কণ্ঠে বললো, “আজকে তোর এখানে ঘুমাবো।”

মাথা মোছার একফাঁকে জানালা গলিয়ে ছাদে উঁকি দিলো তারফান। উহু, মেরিন নেই। চলে গেছে। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “কেন? আমার সাথে কি তোর?”
“তোর সাথে কি মানে? তোর-আমার চেহারা মিল! পছন্দ মিল! প্রফেশন এক! তোর সাথেই তো আমার সব হওয়ার কথা, ‘বড় ভাই’!”

মনে হলো, ‘বড় ভাই’ ডাকটা বড্ড তাচ্ছিল্য নিয়ে উচ্চারণ করলো তামজিদ। তারফান কথা বাড়ালো না। তাকালো না। কাঠের টি-টেবিলের ন্যায় ছোট্ট ওয়ারড্রব থেকে সাদা টি-শার্ট বের করলো। তামজিদ রয়েসয়ে হামি দিলো একবার, দুবার! কণ্ঠে কেমন ছাড়া ছাড়া ভাব নিয়ে শুধালো, “তোর টেবিলে একটা নূপুর রেখেছিলাম। দেখেছিস?”
“নাহ্।”

গম্ভীর উত্তর। তামজিদ হাসলো। তাদের ভাইদের কথায় কথায় মিথ্যা বলার স্বভাব আছে। ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি রেখেই ফের জিজ্ঞেস করলো, “মেয়েটাকে দিয়ে দিয়েছিস?”
তারফান এবারও মিথ্যা বললো, “নাহ্।”

শার্ট পরে চুলগুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে নিলো তারফান। ভালো লাগছে না। শরীর গরম হয়ে আছে। মাথায় চিনচিনে অসহ্য ব্যথা। এই অসময়ে গোসল করে ভুল করেনি তো? চেয়ার টেনে টেবিলের সামনে বসলো তারফান। নাকে কালো ফ্রেমের চশমা জড়ালো। এ কয়েকদিন অসুস্থ না হয়েও কৌশলে হাসপাতাল থেকে সিক লিভ নিয়েছিল সে। ঘড়িতে এখন একটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। আর চার ঘণ্টা পর ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। রিপোর্টগুলো বের করে এক এক করে চোখ বুলাতে লাগলো তারফান। গম্ভীর মনোযোগে সবটা পরখ করতে গিয়েও থমকালো তামজিদের হঠাৎ প্রশ্নে, “তুই কি মেয়েটাকে পছন্দ করিস তারফান? নূপুর দিলি কেন?”

তাদের তিন ভাইয়ের শরীর বই-পুস্তকের টেলিপ্যাথির মতো। একজন অসুস্থ হলে বাকি দুইজনও অসুস্থ হয়। একজনের কষ্ট হলে বাকি দু'জনও মানসিক দুশ্চিন্তা, অস্বস্তি আর উদ্বেগে দিশেহারা হয়। অন্য সবে ছাড় পেলেও এই দুটো ব্যাপারে কোনোকালে কোনো রেহায় মিলেনি। সে কি যে এক ভয়ানক ভোগান্তি! এই যেমন, তারফানের মাথা ব্যথা করছে। জ্বর আসবে। ঠিক সেই একই মাথা ব্যথা নিয়ে তামজিদও কপাল কুঁচকে রেখেছে। চোখের দৃষ্টি নিভু নিভু। জ্বরে হাঁসফাঁস করা মুখশ্রীর ঠোঁট শুকিয়ে রক্তশূণ্য দেখাচ্ছে। তাদের এই গোপন টেলিপ্যাথির কারণেই তারফান বেশ ভালো করেই জানে, এই নূপুর তামজিদ সহজে মেরিনকে দিতো না। একটু ঘুরাতো, একটু মজা নিতো। তারফান অবশ্য জানতো না নূপুরটা মেরিনের। টেবিলে অজানা কারো নূপুর পেয়ে পকেটে পুরেছিল বাহিরে কোথাও ফেলে দিবে বলে। তবে ফেলা হয়নি, ফেলতে পারেনি।

টেবিল থেকে ভ্যাসলিনের কৌটো তামজিদের দিকে ছুঁড়ে মার'লো তারফান। কাঠকাঠ নজরে একবার তাকালো। গম্ভীর গলায় বললো, “ঘুমা, বেশি বকিস।”
“কেন? সত্যিই পছন্দ করিস? সামথিং সামথিং?”
তারফান তাকিয়ে রইলো কেবল। উত্তর দিলো না। তামজিদ চোখ বুজে অল্পসল্প হাসলো। এমন জ্বর জ্বর লাগছে কেন? শরীরের কাঁথাটা আরেকটু আঁটসাঁট করে গায়ে জড়ালো সে। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “তোর জ্বর আসছে, তাই না?”

তারফান আস্তে করে উত্তর দিলো, “হু, ঘুমা।”
“এই রাতে গোসল করতে গেলি ক্যান বা’ল? আমার কালকে ইম্পোর্টেন্ট ওটি আছে।”

তারফান জবাব দিলো না। তামজিদের কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছে। এসব জ্বর-ট্বর সে তারফানের মতো সহ্য করতে পারে না। শরীর দূর্বল হয়ে আসে। সেই দূর্বল কণ্ঠেই ধীরে ধীরে বললো, “দেখবি, এখন তালহাও জ্বর নিয়ে এখানে ঘুমাতে চলে আসবে।”

বলতে দেড়ি, চিলেকোঠার মাঝারি দরজা আচমকা ধাম শব্দে খুলে গেল। ঘর থেকে বালিশসহ নিয়ে এসেছে তালহা। ঘুমু ঘুমু মুখশ্রী। পায়ের শক্তি টালমাটাল। চোখ কঁচলাতে কঁচলাতে বললো, “তোদের জ্বর হয়েছে তাই না? মিনিটে মিনিটে তোদের এইসব জ্বর আমার কিন্তু আর ভাল্লাগতেছে না! একটু নিয়ম বেঁধে চলতে পারিস না?”

বলতে বলতে তালহা তামজিদের শরীর ঘেঁষে শুয়ে পরলো। তারফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়ালো, “একা আমিই এই বিছানায় ঘুমাতে পারি না। গাদাগাদি করে শুয়ে তোরা কি আরাম পাস, হু? আমাকে বিরক্ত না করলে তোদের চলে না?”

দু’ভাই ঘুমের অতলে ডুবে যাওয়ার মাঝে প্রায় ততক্ষণাৎ উত্তর দিলো, “না, চলে না।”

—————

আজ শুক্রবার। উঠানে বিল্ডিংয়ের সবাই মিলে ছোটখাটো একটা পিননিক করছে। প্রতি সপ্তাহে করে। সন্ধ্যা থেকে তাই তোড়জোড় করে সব প্রতিবেশি মিলে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী চাল, ডাল, মাছ, মাংস এনেছে। বিশাল উঠানের মধ্যিখানে ইট বসিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে। ছোট থেকে বড় সবার উচ্ছলময় উল্লাসে ঘরের ভেতর টেকা যাচ্ছে না। মেরিন টিভি দেখছিল। টিউলিপ আক্তার মাথায় ওড়না জড়াতে জড়াতে বললেন, “কিরে? যাবি না? ওখানে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল বলে!”

টিভির পর্দা থেকে চোখ সরালো না মেরিন। ছন্নছাড়া কণ্ঠে বললো, “যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও।”
“এটা কেমন কথা মেরিন? ইখতিয়ার ছেলেটা বারবার বলে গেল। না গেলে হয়? বেয়াদব বলবে সবাই। তাড়াতাড়ি ওঠ!”

অগত্যা মেরিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠলো। মায়ের মতোই মাথায় ওড়না জড়িয়ে প্যাকেট হয়ে নিলো। এ বিল্ডিংয়ে বিয়ের বয়সী ছেলের ওভাব নেই। যাকে দেখ সে-ই ছেলের বিয়ের জন্য বউ খুঁজছে। এইতো, সেদিন! তিন তলার এক আন্টি এসেছিলেন বাসায়। মেরিনকে দেখে তার সে কি প্রশংসা! মেরিন একটু সরতেই কথায় কথায় টিউলিপ আক্তারকে বললেন, “আমার এক ছেলে ভাবি। ইঞ্জিনিয়ার। ভদ্র-সভ্য। কোনো বাজে রেকর্ড নাই। আপনার মেয়েটাকেও দেখলাম, মাশাল্লাহ, মিষ্টি হীরের টুকরা যেন! তা, ওর জন্য কি ছেলে টেলে দেখছেন?”

তখন থেকে মেরিন ওই ভদ্রমহিলাকে দুইচোক্ষে দেখতে পারে না। দেখা হলেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। নিচের পিকনিকে নিশ্চই তিনিও আছেন? আহ্! মেরিনের যেতে ইচ্ছে করছে না।

দেখা গেল, পিকনিকে পা পরা মাত্রই কোত্থেকে ওই ভদ্রমহিলা ছুঁটে এলেন। টিউলিপ আক্তারের সঙ্গে জড়াজড়ি করে বুকে লাগলেন। কি আশ্চর্য! এমন জড়াজড়ি করছেন কেন? সেই সকালে না দেখা হলো?
ভদ্রমহিলা এবার মেরিনকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরলেন। নাম বোধহয় রবি চৌধুরি। অপ্রয়োজনীয় আবেগ দেখিয়ে বললেন, “কেমন আছো মা? খাও না ঠিক মতো? শরীরের এই অবস্থা কেন? শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছ।”

জবাবে মেরিন শুধু হাসলো। কিছু বললো না। রবি চৌধুরি টিউলিপ আক্তারকে ফিসফসিয়ে বললেন, “দেখেছেন ভাবি? ওই পাঁচতলার ভাবি এখনো আসেনি। আসবেও না। সামজিকতার কিচ্ছু নাই ওই মহিলার মধ্যে। আপনাকে বলেছিলাম না? ঘাপলা আছে কোনো।”

বোঝা গেল, তারফান, তালহা আর তামজিদের মায়ের কথা বলা হচ্ছে। মেরিন অতসবে গা ভাসালো না। ওদের মা হয়তো কোনো সমস্যায় পরেছেন। তিনি আসেননি তো কি হয়েছে? ওইযে, তালহাকে দেখা যাচ্ছে সবার সঙ্গে হাসতে-খেলতে। তালহার সঙ্গে আরও কিছু ছেলেমেয়েরাও আছে। বাচ্চাগুলো পুরো উঠান জুড়ে দৌঁড়াচ্ছে। পুরুষেরা রান্নাবান্নায় ব্যস্ত। আজ ওদের খাবার বানিয়ে বেড়ে দেওয়ার দিন। একফাঁকে নিজ বাবাকেও দেখতে পেল মেরিন। প্রচন্ড আমোদ নিয়ে ইখতিয়ারের বাবার সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছেন। আচ্ছা! ইখতিয়ার কোথায়? বাকি দুটো বেত্তমিজই-বা কোথায়?

ভাবনার অকূল পাথারেই একটা মেয়ে এসে টেনে নিয়ে গেল মেরিনকে। নাম অনুপ্রভা। মেরিন থেকে দু'তিন বছরের ছোট। কয়েকদিন হলো পরিচয় হয়েছে। খুব আদুরে একটা মেয়ে।
অনুপ্রভা খানিকটা অনুযোগের সুরে বললো, “তুমি ওদের বড়দের মাঝে কেন বসে আছো, আপু? আমরা ছোটরা এখানে গল্প করছিলাম দেখোনি? এলে না কেন?”

মেরিন এবারও উত্তরে হাসলো মাত্র। তালহার সামনাসামনি চেয়ারে বসলো। মেরিনকে দেখেই তালহা এত স্নিগ্ধ করে হাসলো! মেরিনের আফসোস হলো খুব। তালহার মতো তার বাকি দুটো ভাইও যদি শয়তানি বাদ দিয়ে এমন ভালো হতো!
তালহাকে দেখতে কিঞ্চিৎ অসুস্থ লাগছে। চোখ অল্পসল্প লাল। মুখ মলিন। ভার কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “কেমন আছো, মেরিন?”

মেরিন ছোট্ট করে উত্তর দিলো, “ভালো। আপনি?”
“আমিও ভালোই। এখানে এটা তোমার প্রথম পিকনিক না?”
“জি।”
“তোমার গাছ কেমন আছে?”

এ পর্যায়ে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেরিন। আর গাছ! সেই যে রাতে গেল! আজ দু'দিন হচ্ছে ছাদে ওঠা হয় না। বলা বারণ, তারফানের হুটহাট অদ্ভুত আচরণের কারণেই। 
তালহার প্রশ্নের পিঠে মেরিন হতাশ কণ্ঠে পালটা প্রশ্ন করলো, “আপনারা এমন গাছ অপছন্দ করেন কেন?”

তালহা চমকপ্রদ হয়ে বললো, “আমি? কই! আমার তো গাছ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমার দুই ভাই অবশ্য পছন্দ করে না। তারফানের ফুলে এলার্জি আছে। তারফানের কারণে তামজিদও তেমন একটা গাছ পছন্দ করে না।”

ছেলেদের মধ্যে কে যেন সাউন্ডবক্স নিয়ে এসেছে। সেখান থেকে সুরেলা পুরুষকণ্ঠে গান বাজছে,

‘তোমারে দেখিল পরানো ভরিয়া
আসমান জমিন দরিয়া
চলিতে চলিতে থামিয়া
দেখিব তোমারে আমিও
ও রুপে দিলা তুমি পাগল করিয়া’

বিল্ডিংএর গেট খুলে গেল। আলো-আঁধারি পথে তারফান আর তামজিকে বড় বড় পা ফেলে আসতে দেখা যাচ্ছে। ক্লান্ত শরীর, ক্লান্ত মুখ! দু'জনে এসেই তালহার পাশের চেয়ার দুটোতে বসে পরলো। শ্বাস নিলো, ফেললো। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেরিন গোপন মনে ওদেরকেই দেখছিল। তামজিদ ওর দিকে তাকাচ্ছে না। সে বরাবরের মতোই বিরক্ত, ত্যাক্ত। তবে তারফানের সামনে মেরিনের লুকোচুরি বেশিক্ষণ টিকলো না। আড়চোখে তাকানোর মাঝেই দৈবাৎ, তারফানও তাকালো মেরিনের দিকে। নিমিষেই চোখাচোখি হলো, দৃষ্টি বিনিময় হলো। মেরিন সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিলো। ঠোঁট কামড়ে আশপাশে নজর বুলালো। ইখতিয়ারকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হাতে কোক, পেপসির বোতল। 

রয়েসয়ে মেরিন ফের চোরাদৃষ্টিতে তাকালো তারফানের দিকে। লোকটা তখনো চেয়ে আছে। স্থির নজর, শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল। তবে মেরিনের দিকে তাকিয়ে নেই। তাকিয়ে আছে মেরিনে পায়ের দিকে। অল্প লাল হয়ে থাকা পায়ের গোড়ালিতে। তারপর… তারপর আমচকা আবারও চোখে চোখ রাখলো তারফান। মেরিনকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকালো। গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “হু? কি? আমাকে বেশি সুন্দর লাগছে মেরিন?”

মেরিন চোখ বড় বড় করে তাকালো। হতবাক হলো তালহা, তামজিদ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp