ইখতিয়ার আদিল সদ্য মাস্টার্স পাশ করা একটা বেকার, বদমাইশ, ছন্নছাড়া ছেলে। বাপের টাকা আছে, ব্যবসা আছে, বিল্ডিং আছে— তার আর কোনো কিছু করা লাগবে কেন? অচেনা, অজানা লোকদের ধরে বেঁধে প্রেমের ক্লাস নেওয়াই যেন তার মূখ্য এবং এক মাত্র কাজ। তবে এই পিকনিকে এসে লোকটার আরেকটা ভিন্ন রূপ লক্ষ্য করলো মেরিন। এইযে, বাচ্চাদের সাথে কি সুন্দর দুষ্টুমি করছে, হাসছে, খেলছে! হাতে একটা পেপসি নিয়ে হঠাৎই এগিয়ে এসে মেরিনের পাশে চেয়ার টেনে বসলো সে। লজ্জায় ভার হয়ে থাকা মেরিন এতে যেন আরেকটু মিইয়ে গেল। একটু আগের কথাটা যে তারফান বলেছে, মেরিন জানে। সর্বদা কাঠখোট্টা করে রাখা মুখটা তারফান ব্যতীত আর কার হবে? তালহা ব্যতিক্রমী স্বভাবের। নির্লজ্জের ন্যায় সে এখন হাসছে। তামজিদের ঠোঁটে অবশ্য কুটিল হাসি নেই। তার ভ্রু দুটো গুরুগম্ভীর ভাবে কুঁচকে আছে।
একে একে তিন ভাইকে পরখ করে মেরিন আরও খানিকটা মাথা নুয়ালো। পাশ থেকে ইশতিয়াক পেপসির বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো, “নাও, পাড়ায় পাড়ায় প্রেম করে ক্লান্ত হয়ে গেছ নিশ্চই? এটা খাও। ভালো লাগবে।”
মেরিন বিরক্ত হলো। প্রচন্ড রকমের বিরক্ত। কিছু বলতে নেবে তার আগেই অনুপ্রভা বলে উঠলো, “মেরিন আপু ভালো মেয়ে, ইখতিয়ার ভাইয়া। প্রেমিক-টেমিক নেই। তুমি শুধু শুধু আপুকে জ্বালিও নাতো!”
“কি বলো? তোমার মেরিন আপুর প্রেমিক নেই?” অতি আশ্চর্যের সঙ্গে কথাটা বলে এক প্রকাশ জোড় করেই পেপসির বোতলটা মেরিনের হাতে ধরিয়ে দিলো ইখতিয়ার। মেরিন নিতে না চাইলে নিচু স্বরে বললো, “তোমার জন্য এনেছি মেরিন। নাও।”
মেরিন আর দিরুক্তি করতে পারলো না। পিটপিট নজরে তাকালো। দু'হাতের মুঠোয় শক্ত করে পেপসির বোতলটা ধরে রাখলো। হাতের তালু ভিঁজে ভিঁজে যাচ্ছে। কি ঠান্ডা!
মেরিন থেকে মনোযোগ সরিয়ে এবার তিন ভাইয়ের দিকে তাকালো ইখতিয়ার। ঠোঁটে মৃদু হাসি এঁটে বললো, “কাল মাঠে একটা ক্রিকেট ম্যাচ খেলবো ভাবছি। পাশের এলাকার শান্তদের সাথে। খেলবি তোরা?”
তারফান, তামজিদ বিরক্ত নজরে চেয়ে রইলো মাত্র। উত্তর দিলো না। মুখের ভেতরটা তেঁত হয়ে আসছে। জ্বর বাড়ছে। ডিউটি শেষে এই বিচ্ছিরি পিকনিকে বসার মতো উদার মন মানসিকতা মোটেও ছিল না ওদের। তালহার জোড়াজুড়িতে আসতে বাধ্য হয়েছে। তালহার মতে, তারফান আর তামজিদ দিন দিন মায়ের মতো অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য! সামাজিকতা দিয়ে কি ধুঁয়ে ধুঁয়ে পানি খাবে?
তালহা রয়েসয়ে উত্তর দিলো, “আমরা পারবো না সম্ভবত। আমার নাটকের শুটিং সবে শুরু হলো। হাতে সময় নেই। তারফান আর তামজিদও ছুটি কাটিয়ে দুইদিন ধরে ডিউটি করছে।”
নাটকের শুটিংয়ের কথা শুনে কান খাঁড়া করলো মেরিন। তালহা কি কোনো ফিল্মস্টার? নায়ক? কই! কোনো নাটক-সিনেমায় তো কোনোদিন দেখেনি সে।
ইখতিয়ার প্রশ্ন ছুঁড়লো, “এবারের নাটকের থিম কি? নায়ক-নায়িকা কে?”
“থিম মোটামুটি। আজকালকার প্রডিউসারদের টাকা ঢালতে যত কিপটামি! মন মতো কিচ্ছু করতে পারছি না। হালের আলোচিত দু'জন নায়ক নায়িকাকে নিতে হয়েছে। রিদিমা আর দীপ্ত।”
ইখতিয়ার বুজদারের মতো মাথা দুলালো। সে অত শত সিনেমার ব্যাপারে জানে না। শয়তানি-বাঁদরামি করেই দিন চলে যায়। এসবের খবর রাখার সময় কই?
মেরিন হতবাক নজরে তালহাকে দেখছিল। এ জীবনে স্বচোক্ষে কোনো ডিরেক্টরকে দেখেনি সে। সিনেমা জগত থেকে বহু দূরে থাকা মেরিনের সিনেমা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। বলা যায়, মা টিউলিপ আক্তার থেকে এ আগ্রহ আঙুলে গুণে গুণে পেয়েছে সে।
দৈবাৎ! প্রকাণ্ড এক দমকা হাওয়া বইলো। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ঝুলন্ত বাতি নড়লো চড়লো। তাদের মাথার ওপর বিশাল মেহেদী গাছ। তেজি বাতাসে দুলতে দুলতে একটা মেহেদী পাতা এসে চুলে আটকে গেল মেরিনের। ইখতিয়ার আড়চোখে বার বার মেরিনকেই দেখছিল। এবার হাত বাড়িয়ে চুল থেকে মেহেদী পাতা ছাড়িয়ে নিলো। মেরিন চমকে উঠতেই দ্রুত বললো, “রিল্যাক্স! পাতা সরাচ্ছিলাম শুধু।”
অথচ মেরিন শান্ত হতে পারলো না। কয়েক সেকেন্ড বড় বড় চোখে ইখতিয়ারের দিকে চেয়ে হাতের পেপসির দিকে তাকালো। এখনো মুখে তুলেনি ওটা। ফের তাকালো সামনে, তারফানের দিকে। লোকটা মেরিনের দিকে চেয়ে নেই। নজর ঝুকানো। ক্লান্ত শরীর বিশ্রী ভাবে চেয়ারে এলিয়ে দিয়েছে। চুল আগের চেয়েও এলোমেলো। হাতের দু'আঙুলে কপাল ঘঁষছে একবার, দু’বার, লাগাতার! এরপর হঠাৎ ধীরে ধীরে তারফান নজর তুললো। মেরিনের সমগ্র মুখে তার তীক্ষ্ণ চোখজোড়া ঘুরঘুর করলো যেন। কি ভীষণ ভারী চোখের চাহনি! খেয়াল হলো, তারফানের মতো বাকি দু'জনকেও কেমন অন্যরকম লাগছে। তারা কি অসুস্থ?
উত্তরটা অবশ্য পেল না মেরিন। তার তিন-চার মিনিট পরই একে একে তিন ভাই-ই পিকনিক ছেড়ে চলে গেল। অথচ পিকনিক সবে শুরু হয়েছে। শেষ হতে তখনো ঢের বাকি।
—————
আকাশের মন-মেজাজ ঠিক নেই। এই ঝড় আসবে আসবে তো এই আসছে না। টিমটিম হলদে বাতি জ্বলছে আগের মতোই। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে। সবাই প্রচুর ব্যস্ত। একটু পরেই খাবার হয়ে যাবে। টিউলিপ আক্তার এক ফাঁকে মেরিনকে ডেকে বললেন, “তোর বাপ বলে তার মোবাইল বাসায় রেখে আসছে। কাকে যেন কল করবে! একটু গিয়ে মোবাইলটা নিয়ে আয় না, মা? যাহ্।”
মেরিন মনে মনে এমন একটা সুযোগই খুঁজছিল। এই পিকনিকে তার একদমই ভালো লাগছে না। রবি চৌধুরি একটু আগেই কোত্থেকে যেন তার ছেলেকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছিলেন। নাম শৌনক। সুন্দর-মুন্দর ক্যাবলা ধরণের একটা ছেলে। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকেই কেমন হাঁ করে মেরিনে দিকে চেয়ে ছিল। ওইযে! এখনো চেয়ে আছে!
মেরিন সময় নষ্ট না করে বিল্ডিংয়ের ভেতর ঢুকে গেল। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে একতলা পেরোলো, দু'তলা পেরোলো, এরপর তিনতলায় যেতেই প্রচন্ড বিস্ময়ে যারপরনাই থমকালো সে। লম্বা সিঁড়ির তিন দিকে তিনটা উজবুক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে। তারফান, তামজিদ, তালহা! মুখশ্রী ভয়াবহ লাল। চোখের দৃষ্টি নিভু নিভু। অবস্থা সুবিধার না। ঠোঁট নাড়িয়ে কি যেন বিড়বিড়াচ্ছে ওরা।
মেরিন চিৎকার দিতে গিয়েও দিলো না। শুষ্ক গলায় ঢোক গিললো, “আপনারা এভাবে সিঁড়িতে বসে আছেন কেন?”
প্রায় তৎক্ষণাৎ তালহা চোখ-মুখ খিঁচে উত্তর দিলো, “এই…এই দুইটা শ’য়তানের জন্য! এই দুইটা শ’য়তান আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে! সারাটাদিন খালি জ্বর আর জ্বর!”
তালহার কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে। কথা বলছে খুব আস্তে, ধীরে। মেরিন হকচকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো, “জি? কি বললেন?”
তামজিদ বিরক্ত কণ্ঠে তালহাকে ধমক লাগালো, “চুপ কর শা'লা! আমার দোষ কোথায়? আমি রাতে পিরিতের গোসল করছি?”
তামজিদের কথায় পাত্তা দিলো না তালহা। একে তো মাথা ব্যথায় মগজ কিলবিল করছে। দু’দিন ধরে হালকা হালকা জ্বর। তারওপর আবার ইখতিয়ারের দেওয়া ঠান্ডা পেপসি খেয়েছিল তিনজনই। তালহা হাঁসফাঁস কণ্ঠে অনুরোধ করলো, “আমাদেরকে একটু পাঁচতলায় দিয়ে আসবে মেরিন? প্লিজ?”
পাহাড়ের মতো দৈত্য তিনটা মানুষ। শরীরে মাংসের ঘাটতি নেই। এমন তিনটা মানুষকে মেরিন কিভাবে কি করবে? কপাল গুটিকয়েক ভাঁজ ফেলে কিঞ্চিৎ ভাবলো মেরিন। নিচ থেকে কাউকে ডেকে আনবে কি? পা বাড়িয়ে নিচে যেতে নিলেই তামজিদ জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় যাচ্ছো?”
“নিচে। কাউকে ডেকে আনি?”
“লাগবে না।”
কথাটা বলেই রেলিং ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো তামজিদ। উঠালো তালহাকেও। তারফান অবশ্য নিজে নিজেই উঠলো। সিঁড়িতে একেকটা পা খুব সাবধানে ফেলছে। তবুও পায়ের দূর্বলতা স্পষ্ট। তালহা প্রায় আর্তনাদের সুরে বললো, “তুমি আমার পিছু পছু থেকো মেরিন। আমি পরে গেলে আমাকে ধরবে।”
মেরিন জানে, তালহাকে পরে যাওয়া থেকে সে বাঁচাতে পারবে না। উলটো তালহাসহ সিঁড়িতে পরে হাড়-গোড় ভাঙ্গার মতো অভাবনীয় কাজ অবলীলায় করতে পারবে। তবুও লোকটার আবদার সে ফেললো না। ওদের পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। বাবার মোবাইলের কথা বেমালুম ভুলে প্রশ্ন করলো, “আপনারা তিনজন একসাথে অসুস্থ হলেন কিভাবে?”
তারফানের ছোট্ট উত্তর, “বদনজর।”
“জি?”
তারফান প্রতিত্তোর করলো না। তারা প্রায় পাঁচতলায় চলে এসেছে। তালহা, তামজিদ বিশাল দরজার কাছে গিয়ে পকেট হাতড়ে চাবি খুঁজছে। তারফান ছাদের দিকে যাচ্ছে। মেরিন কি মনে তারফানের পিছু পিছু ছাদে গেল।
ঘাড় ফিরিয়ে একবার মেরিনকে গম্ভীর নয়নে দেখলো তারফান। থমথমে গলায় শুধালো, “আমার পিছু কি? বাসায় যাও।”
মেরিন আমতা আমতা স্বরে বললো, “আপনার পিছু নেইনি। ছাদে এসেছি।”
বলে একবার ছাদের এদিক-ওদিক তাকালো মেরিন। আহ্! তার শখের গাছগুলো! শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। একপাশের টমেটো গাছে তিন-চারটে টমেটো ধরেছে। তারফানকে শান্ত হয়ে রেলিং ঘেঁষে বসে থাকতে দেখে মেরিন মনে সাহস জোগাল। পানির পাইপের কল ছেড়ে একে একে পানি দিতে লাগলো প্রতিটা গাছে। তারফান কিছু বললো না। নজর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেরিনকে দেখতে লাগলো শুধু। বাচ্চা একটা মেয়ে। বয়স কত হবে? ঊনিশ-বিশ? তারফান থেকে সম্ভবত দশ-এগারো বছরের ছোট। দেখতে ছোট্ট বিড়ালছানার মতো। ছটপটে স্বভাব, চঞ্চলতায় ভরপুর।
তারফানের চোখের দৃষ্টি গভীর হলো। একটু একটু করে হঠাৎই গাঢ় হলো। মেরিনের মাথার ঘোমটার আড়ালে থাকা বেণুনী ওড়না গলিয়ে কোমড়ে দোল খাচ্ছে। বহুদিন বাদে নিজের শখের গাছগুলো ছুঁতে পেরে মেয়েটার সে কি আনন্দ! উল্লাস! প্রশান্তি! তারফান একনজরে চেয়ে দেখলো সেই উল্লাস, আনন্দ। মৃদু গলায় শুধালো, “মানুষের বন-জঙ্গল এত পছন্দ হয় কি করে?”
মেরিন সরু চোখে তারফানের দিকে তাকালো একবার। উত্তর দিলো না। তারফানের মতোই গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বললো, “আমি জানি আপনার ফুলে এলার্জি। সেটা আমাকে আগে বললেই হতো। শুধু শুধু আমাকে এত ভয় দেখানোর দরকার ছিল না।”
তারফান প্রশ্ন করলো, “আগে বললে? কি করতে? হু?”
“গাছ গুলো চিলেকোঠার একটু দূরে দূরে লাগাতাম। তাহলেই তো আর সমস্যা হতো না, তাই না?” কথাটা বলে একটু থামলো মেরিন। তারফানকে তখনো শান্ত থাকতে দেখে ফের বললো, “আমি কিন্তু গাছ লাগানো বন্ধ করবো না। আপনি আমাকে আর ভয় দেখাবেন না।”
“কেন দেখাবো না?”
“তারমানে ভয় দেখাবেন? কেন? আমি কি করেছি?”
তারফান কিছু বলছে না। তাকিয়ে আছে। অন্যরকম অদ্ভুত নজরে। মেরিন একটু কাছে এগিয়ে গেল। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা নিয়ে বললো, “খারাপ লাগছে বেশি? আপনি চিলেকোঠায় না গিয়ে এখানে বসে আছেন কেন?”
তারফান জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিলো। দূর কোথাও বাজ পরেছে। আওয়াজ আসছে। বললো, “বাসায় যাও মেরিন। ঝড় আসবে।”
মেরিন পলক ঝাপটালো, “আপনি যাবেন না?”
“না।”
“কেন?”
“মেরিন!”
মেরিন শুকনো ঢোক গিললো। এভাবে ডাকার কি আছে? শেষবারের মতো ছাদের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
সময় গড়ালো। বাতাসের আনাগোনা বাড়ল। তারফান তখনো রেলিংয়ে শরীরের ঠেকিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ। জ্বরে মৃদু মৃদু কাঁপছে শরীর। কম্পনরত গলায় সে বিড়বিড়িয়ে ডাকলো, “মেরিন….মেরিন!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………