মেঘবন - পর্ব ১২ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
“তুমি জানো, আকাশের তারারা কেমন হয়?”

মেরিন পিটপিট নজরে তাকায়। সুস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করে, “কেমন?”
“তোমার মতো মেরিন। উজ্জ্বল, চটপটে।”

তারফান মাঝে মাঝেই মেরিনকে খুব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে। এসব কথা অন্য লোকেরা বলে অন্যভাবে। তাদের চোখে প্রেম থাকে, আদর থাকে, যত্ন থাকে। কিংবা একটুখানি রাগ। কই! তারফানের গভীর চোখদুটোয় সেসব কখনো খুঁজে পায়নি মেরিন। কেমন কালো ধোঁয়ার মতো ঝাপসা দুটো চোখ। সূক্ষ্ণ, স্বচ্ছ কাঁচের মতো দৃষ্টি।

—————

রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। হালকা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির রেশ সকাল হতেই মিইয়ে গেলেও একটু একটু সোঁদা গন্ধ ঠিকই কেবিনের ছোট্ট জানালা গলিয়ে নাকে ঠেকছে। পরপরই আবার মিইয়ে যাচ্ছে। ফিনাইলের তেজি গন্ধের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকতে পারছে না সে। হেরে যেতে হচ্ছে বারবার।
রজনী হায়দার নিভু নিভু গলায় শুধালেন, “আমাকে বাসায় নিয়ে যাবি কবে তোরা? আমার আর এখানে ভালো লাগছে না। শরীর ম্যাজম্যাজ করে।”

তালহা মায়ের পাশ ঘেঁষে বসে আছে। ঠিক যেন বাচ্চা শিশু। বেজার মুখে সে উত্তর দিলো, “আমি তো নিতেই এসেছিলাম। তোমার ডাক্তার ছেলেরা দিবে না। শুধু পা-টা ঠিক নেই বলে, মা! নয়তো একটা পাকাপোক্ত যুদ্ধ শেষে তোমাকে কোলে করে নিয়ে যেতাম।”

রজনী হায়দার দূর্বল হাসলেন। সামান্য ব্যথায় ‘উহ্’ শব্দ করতেও শোনা গেল। ক্যানোলা লাগানো হাতটা আধো উঠিয়ে তালহার সুদর্শন মুখ ধরতে চাইলেন তিনি। তালহা একপলক সেই চাওয়া দেখলো, উদ্বেগ দেখলো। পরপরই মায়ের হাত সযত্নে নিজের খরখরে গালে রাখলো সে। রজনী হায়দায় মমতায় টইটুম্বর হয়ে বললেন, “তোরা হঠাৎ করে এত বড় হয়ে যাচ্ছিস কেন তালহা? সেদিন না আমার কোল জুড়ে এলি?”

আহ্লাদে অতিষ্ঠ হয়ে মোলায়েম হাতে চোখ-মুখ ঘঁষলো তালহা, “কই বড় হয়ে যাচ্ছি? আমি তো তোমার আজীবন ছোট ছেলে মা।"

কেবিনের একপাশে দুটো গাদির একটা সোফা আছে। সেখানে বসে বসে চিঙ্গাম চিবুচ্ছে তামজিদ। পাশে বসে থাকা তারফানকে বিরক্ত মুখে বললো, “দামড়া ব্যটার নাটক দেখছিস? উহ্! আহ্লাদে বাঁচে না!”
“ছোট দেখে ও সবসময় বেশি বেশি আদর পায়। ননসেন্স!” কপালে শতশত বলিরেখা ফেলে তামজিদের কথায় সায় জানালো তারফান।

তালহা তক্ষুণি কোণা চোখে তাকালো। ভাইরা যে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা বলছে— জানে। সে আরও মায়ের আদরে আষ্টেপৃষ্টে গেল। বাঁকা কণ্ঠে বললো, “মায়ের হাতের মা’রও আমি বেশি খেয়েছি। পিঠের দাগ এখনো দেখাতে পারবো। তোদের আছে পিঠে দাগ, হ্যাঁ?”

রজনী হায়দার বললেন, “আমার তিন ছেলেকেই আমি সমান সমান ভালোবাসি। তোরা দুই ভাই তালহাকে এভাবে জ্বালাস না তো! আমার ছোট ছেলে মোমের মতো। ওকে বেশি জ্বালাবি না।” 
বলে ধীরস্থির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। কি ভেবে বড় আফসোসের সুরে বললেন, “আল্লাহ আমাকে তিনটা রত্নের মতো ছেলে দিয়েছে। নিজে নিজে কষ্ট করে কত বড় হয়ে গেছিস তোরা! দুজন ডাক্তার, একজন ডিরেক্টর। কত গর্ব হয় আমার জানিস? অথচ ছোটবেলা থেকে আমি তোদের কিছু দিতে পারিনি। বাপ, খাবার, পোশাক, বেঁচে থাকার জন্য একটা সুস্থ পরিবেশ! কিছুই না। আমাকে নিয়ে তোদের অনেক অভিযোগ, তাই না? আমি তোদের জন্য একটা ভালো মা হতে পারিনি… একটা ভালো মা হতে পারিনি!”

কয়েক সেকেন্ড নিরবতায় কাটলো। তিরতির করে কাঁপতে থাকা জ্বলন্ত রাগে ছাঁই বর্ণ ধারণ করলো তারফানের ফর্সা মুখ। হিসহিসিয়ে সাবধান করলো, “তোমাকে মানা করেছিলাম এসব বলতে মা! অতীত ঘাটতে মানা করেছিলাম!”

রজনী হায়দার করুণ স্বরে বললেন, “তোরা ঘাটা বন্ধ করেছিস? আমার কথা একবারও শুনেছিস? বল! উত্তর দে!”

তারফান অনেক কিছু বলতে চাইলো। অনেক কিছু গলার আগায় এসে ঠেকলো। কিন্তু মায়ের ওই নমনীয়, অশ্রু ভেঁজা মুখশ্রীর বাঁধায় শব্দ আর বাহিরে পৌঁছেতে পারলো না। দুমড়েমুচড়ে ফের একবার ধূসর রঙে উড়ে গেল অভিমানগুলো। কম্পয়মান গলায় তারফান শুধু এটুকুই আওড়ালো, “তুমি আমাকে কখনো বুঝোনি মা... কখনো বুঝতে চাওনি...”

তারফান কেবিন থেকে চলে যেতেই তামজিদও সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। যেতে যেতে বললো, “ওর মাথা গরম। আমি দেখে আসি কোথায় গেল।”

কেবিন থেকে বের হওয়ার সময় তামজিদ শুনলো, মা কাঁদছেন। হৃদয় কাঁপানো একটা কান্না আছে না? সরাসরি বুকে গিয়ে বিঁধে? ওমন।

—————

রাত্রি ক'টা হবে? আট কি সাড়ে আট? হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিলো মেরিন। আট'টা বেজে পঁচিশ মিনিট। গা কাঁটা দিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। কোচিং তার সাড়ে সাতটার দিকে ছুটি হয়েছিল। বান্ধবীদের সাথে চটপটি খাওয়ার লোভে বাসায় ফেরেনি। এখন দেড়ি হয়ে গেছে। বাসায় গিয়ে মা-বাবাকে কি জবাব দেবে তারচেয়েও বড় চিন্তা বাসায় কিভাবে ফিরবে? হাতের পাঁচ আঙুলে যা ছিল সব চটপটি খেতে গিয়ে শেষ। ভেবেছিল হেঁটে হেঁটে যেতে পারবে। কিন্তু এখন শরীর ঝমঝম করছে। কি বিচ্ছিরি রকম অবস্থা!

দৈবাৎ! দুরন্ত বেগে একটা গাড়ি এসে থামলো মেরিনের ঠিক পাশে। কালো রঙের গাড়ি। মেরিন ভয়ে দু'কদম পিছিয়ে গেল। শক্ত করে ধরলো কাঁধ ব্যাগটা। রাস্তাটা তারফানদের হাসপাতালের উলটো দিক। একটু শুনশান বটে। 
গাড়ির জানালার কাঁচ সব উপরে ওঠানো। ড্রাইভিং সীটের জানালাটা আস্তে আস্তে নিচে নামলো। হলদে রঙের ক্যাঁটকেটে আলোয় স্পষ্ট হলো পুরুষালী রুক্ষ মুখ। মেরিন প্রথমে চুলের দিকে তাকালো, কালো চুল! চোখের দিকে তাকালো, উজ্জ্বল চোখ! 
মেরিন ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো, “তালহা ভাইয়া?”

ওপাশ থেকে জবাব এলো না। তালহার ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। হাত বাড়িয়ে ওপাশের দরজা খুলে বললো, “বাসায় যাচ্ছো নিশ্চই? উঠো, পৌঁছে দেই।”
মেরিন মৃদু গলায় বললো, “আমি যেতে পারবো।”
“উঠো, মেরিন।”

গম্ভীর কণ্ঠ। তালহা এভাবে কথা বলে না। কিন্তু চুল তো কালো! মেরিন দ্বিধাদ্বন্দে গাড়িতে উঠে বসলো। একটা মোলায়েম ঘ্রাণ গাড়ির সমগ্র জুড়ে ঘুরঘুর করছে। খুব মৃদু স্বরে রেডিওতে গান চলমান। মেরিন আরেকটু দরজা ঘেঁষে বসলো। আকাশের মস্ত বড় চাঁদের দিকে চেয়ে রইলো কয়েক পলক। এরপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো, “আন্টি কেমন আছেন?”

তালহা গাড়ির মোড় ঘোরানোর মাঝে উত্তর দিলো, “প্রেশার হাই। শরীর দূর্বল।”
“রিলিজ দিবেন কখন?”
“দেখি, দূর্বলতা কাটুক।”

মেরিন খেয়াল করলো, মাথার কোঁকড়ানো চুলগুলো এখন ক্ষীণ লালচে লাগছে। পুরোপুরি না। একদম সামান্য। মেরিন ডাকলো, “তালহা ভাইয়া?”
“হু?” অন্যমনস্ক স্বরে আওয়াজ তুললো তালহা।
“কিছু না।”

গাড়ির মোড় আবার ঘুরেছে। শর্টকাট রাস্তা হওয়ায় আঁকাবাঁকা গলি বেশি। মেরিন একমনে ছুটে চলা পথগুলো দেখছিল। ব্যস্ত মানুষের ব্যস্ততা দেখছিল। আচমকা পাশ থেকে হাসির শব্দ শুনতে পেয়ে ফিরে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে শুধাল, “হাসছেন কেন?”
“তুমি এত বোকা মেরিন!”
“মানে?”

তালহা উত্তর দিচ্ছে না। ঘাড় ফিরিয়ে কেবল একবার মেরিনকে দেখেছে মাত্র! মেরিন সতর্ক চোখে তাকালো। সন্দেহের বোনা তীর ঠোঁটে এঁটে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কে?”
“মেক আ গেস।”
“তারফান ভাইয়া?”
“না…’’
“তামজিদ ভাইয়া?”

এবার আর উত্তর পাওয়া গেল না। বরং নিমিষেই কুটিল হাসিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো তামজিদের শুকনো, ফাঁটা ঠোঁট। একহাতে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কোঁকড়ানো চুলগুলো চিরুনি করে বললো, “রাতের বেলা আমার চুল কালো দেখায়, মেরিন।”

কণ্ঠস্বর কি কৌতুকের ন্যায় শোনালো না? শোনালো! বরং বড় তাচ্ছিল্য ছিল সেই স্বরে, কথায়। মেরিন শক্ত হয়ে জমে গেল। সূক্ষ্ণ কিছু রাগ শরীরে সূচ ফোঁটাচ্ছে। সত্যি তো! মেরিন এত বোকা!
তামজিদ ফের বললো, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে? কোথা থেকে ফিরলে?”
মেরিন গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলো, “কোচিং-এ।”
“এত রাতে?”
“দেড়ি করে ছুটি দিয়েছে।”

আড়চোখে দেখলো, তামজিদ চোখ ঘুরাচ্ছে। ঠোঁটের কুটিল হাসি তখনো উদয়মান। তার কথা যে বিশ্বাস করেনি, তা স্পষ্ট।

তামজিদ গাড়ির রেডিও বন্ধ করলো। ইচ্ছে করে গাড়ির গতি কমিয়ে দিলো। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “তুমি তারফানকে ভালোবাসো?”
মেরিন বড় বড় চোখে তাকালো, “আপনার মাথা ঠিক আছে?”

তামজিদের হতবাক, বিস্মিত কণ্ঠস্বর , “করো না?”
মেরিনের কঠোর গলা, “না।”
“আচ্ছা! তাহলে আমাকে ভালোবাসো। আমি আপাতত ফ্রি আছি। হাত আর ঠোঁট ছাড়া বাকিসব পিওর ইন্টেক!”
“আপনার না প্রেমিকা আছে?”
“ওর প্রতি আমি অত সিরিয়াস না। তোমার প্রতি হবো…”

কথা শেষ হলো না। তৎক্ষণাৎ একটা ধারালো চড় পরলো তামজিদের বাম গালে। সঙ্গে সঙ্গে গালের নরম চামড়া জ্বলে উঠলো যেন! এটুকু একটা মেয়ের এত রাগ!
মেরিন ভেবেছিল, তামজিদ রেগে তাকে পালটা চড় লাগাবে। মনে মনে তাই শরীর শক্ত করে রেখেছিল। চিৎকার-চেঁচামেচি করে লাভ নেই। এই বন্ধ, চলন্ত গাড়িতে কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে না। দেখে দামি গাড়ি মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই সাউন্ডপ্রুভ?

মেরিনকে অবাক করে দিয়ে তামজিদ আচমকা হু-হা শব্দে হেসে উঠলো। পাগলের মতো। মেরিনের ভয় হলো তক্ষুণি। তামজিদকে অস্বাভাবিক লাগছে। সে কাঁপা গলায় বললো, “গাড়ি থামান। আমি নামবো।”

জবাব দিতে সময় নিলো তামদিজ। হাসির ফোয়ারা কমতে দু'চার মিনিট লাগলো। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে এসেছে। তর্জনী দিয়ে আলতো করে চোখের পানি মুছে বললো, “বাসা আসুক। থামাবো।”
“আমি আপনার সাথে যাবো না।”

কমিয়ে রাখা গাড়ির বেগ বাড়ালো তামজিদ, “সেটা তোমার গাড়িতে ওঠার আগে ভাবা উচিত ছিল মেরিন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp