মেঘবন - পর্ব ১৩ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে। সুদূর থেকে ধেয়ে আসছে গাঢ়, স্পষ্ট বাতাস। গাড়ি থেকে নামতেই সেই বাতাস মেরিনকে ছুঁয়ে দিলো। মাথার ওড়না এলোমেলো করলো। গাড়ির এসিযুক্ত অজানা ঘ্রাণ পেরিয়ে মুক্ত বাতাসের মুক্ত ঘ্রাণ নাকে লাগতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো মেরিন। এতক্ষণ ভয়ে তার বুক ধুকপুক করছিল। মেরিন ফিরে তাকালো। গাড়ির জানালা ভেদ করে দেখলো তামজিদকে। লোকটার সিগনেচার হাসি তখনো ঠোঁটে কুতকুত খেলছে। চোখা চোখে মেরিনকে দেখে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ালো এবার। রেডিও ততক্ষণে চালু করেছে। গান ভাসছে ওখান থেকে। গাড়ি নিয়ে টান দেওয়ার পূর্বে তামজিদও সেই গানের সঙ্গে সুর তুলে গেয়ে উঠলো, 

Breathe
I'm not in love, it's just a game we do
I tell myself I'm not that into you
But I don't wanna sleep, it's quarter after three
You're in my head like, Breathe
I'm not in love, it’s just a game we do

মেরিন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পা চললো ধীরে, খুব ধীরে। তারচেয়েও ধীরে চললো মস্তিষ্কে কিলবিল করা প্রশ্নগুলো। 

—————

দিনাজপুরের একটা ছোট্ট এলাকা। সেই এলাকার একদম শেষ মাথায় রতন ওস্তাদ নামের এক লোক থাকতেন। আদতে সেই লোক কোনো কিছুতেই আসলে ওস্তাদ ছিলেন না। কাজে-কর্মে, কথায়, আচরণে। বাপের ফেলে রাখা কুটির মতো বাড়ি ছাড়া নিজের সহায়-সম্পত্তি তেমন কিছু নেই। গরিব বলে ভাই-বোন তেমন খোঁজখবর রাখেনি কখনো। তারপর বয়স একটু বাড়লো… কিভাবে কিভাবে যেন কপালে একটা ইট-সিমেন্টের কাজ জুটে গেল। বিয়েও হলো। এলাকার মেথরের মেয়ে। জন্ম থেকে অভাব-অনটন দেখে এসেছে। সে হিসেবে রতন ওস্তাদের কাজ ভালো, মাইনে ভালো। সংসার জীবন ভালোই কাটছে। এরপর বছর ঘুরলো, খোদা কোল জুড়ে এক মেয়ে সন্তান দিলেন। ফুটফুটে, আগুন সুন্দরী মেয়ে। অথচ মেয়ের মা কালো, বাপ কালো। দু'জনের কারো চেহারাই সুন্দর না। কিন্তু মেয়ে হয়েছে চাঁদ জ্বলজ্বলে রত্ন। ক্লান্ত রজনীর নিঝুম রাতের ন্যায় শান্ত, নির্মল একটা মুখ। রতন ওস্তাদ তাই খুব ভাবলেন। ভেবে ভেবে নির্জন, নিস্তব্ধ রজনীর একফাঁকে ছোট্ট শিশুটিকে বুকের সঙ্গে পিষে নাম রাখলেন, ‘রজনী।’
আগে-পিছে কিছু নেই। শুধু রজনী।

মেয়েকে নিয়ে রতন ওস্তাদের আহ্লাদের শেষ ছিল না। নিজে না পরে, না খেয়ে মেয়ের পুরো পাঁচটা পূরণ করতে সদা মুখিয়ে থাকতেন। এলাকার মানুষ রতনের এই আহ্লাদ, পাগলামি দেখে কতশত বার যে মুখ বাঁকিয়েছে, হিসেবে নেই। কাজ করে ইট-সিমেন্টের। দিনে আনে, দিনে খায়। সে ব্যাটা লোকের মেয়েকে নিয়ে এত আহ্লাদ কেন? আবার নাকি ইস্কুল-কলেজও করাবে! উহ্! ঢংয়ের শেষ নেই।

এলাকাজুড়ে একটা হাস্যোজ্বল গুজব রটে গিয়েছিল ততদিনে। রজনীর মায়ের অন্যলোকের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। সেই ব্যাটার মেয়েই রজনী। রতন ওস্তাদ সেসব শুনতেন। বড় আমোদেই সহপাঠী বন্ধুরা খোশগল্প করতে আসতো তার সঙ্গে। রতন পাত্তা দিতেন না। মেয়েকে করে রেখেছিলেন মাথার মুকুট। ওইযে, মশা কামড়ায় বলে নিজ হাতে বাড়ির পেছনের নালা পরিষ্কার করলেন, রাত-বিরেতে কারেন্ট চলে গেলে ভোর অব্দি মেয়ের মাথার কাছে বসে হাতপাখা করতেন, নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, চুলে বেনুনি করে দিতেন! সেই মেয়ে বয়স ষোলো-সতের হবার আগেই একদিন রতন ওস্তাদের চোখ ফাঁকি দিলো। এলাকার বখাটে ছেলে, ইমনের হাত ধরে।

ইমন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। একটু বখাটে ধাঁচের। পরিবারের রুলস্ এন্ড রেগুলেশন থেকে বাঁচতে দূরের এক কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সারাদিন এদিক-ওদিক বসে থাকা, সিগারেট ফোঁকা আর আড্ডাবাজি ছাড়া হাতে তেমন কোনো কাজ ছিল না। এরপর একদিন স্কুল পড়ুয়া, সাদা কামিজ, ক্রসবেল্ট আর দুই বিনুনি করা এক মেয়েকে তার ভালো লেগে গেল। নাম জানতে পারলো, রজনী। 
ইমনের লাজ-লজ্জা তেমন নেই। পরেরদিনই সে মেয়েটার দুয়ারে গিয়ে হাজির হলো। নিজেকে ভ’য়ংকর প্রমাণ করতে যতটুকু সম্ভব ভারী গলায় শুধালো, “নাম কি তোমার?”

ভীতু রজনী নাম বলতে পারে না। ভয়ে কাঁপে। তার তো শুধু একটা ভয় না। শত শত ভয়। বাবার ভয়, মায়ের ভয়, এলাকাবাসীর ভয়— নতুন করে যোগ হলো, ইমনের ভয়। সেই ভয়কে রজনী হুট করেই জয় করে ফেললো। মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসলো এই ইমন নামক মানুষটাকে। ইমন একবার মুখ ফুঁটে বললো, “চলো রজনী, আমরা পালিয়ে যাই। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। আমাদের একটা সংসার হবে। সারাটা জীবন আমরা একসাথে থাকবো। কি, থাকবে না আমার সাথে?”

অবুজ রজনী ভালোবাসায় পিষ্ট হয়ে আর কিছু ভাবলো না। ইমনের বাড়িয়ে রাখা হাত ধরলো। মা বলতেন, বিয়ের পর মেয়েদের আলাদা আরেকটা পরিচয় হয়। নামের পেছনে স্বামীর নাম যোগ হয়। রজনীর অবশ্য হয়নি। হবে কিভাবে? যে আশাগুলি বুকের ভেতর চেপে সে ইমনের হাত ধরেছিল তার একটাও পূরণ হয়নি কখনো। না বিয়ে, না সংসার। রজনীর নামের পেছনে ইমনের নাম যোগ হয়নি। রজনী রয়ে গেছে, রতন ওস্তাদের শুধু রজনী হয়ে।

—————

বিল্ডিংয়ের বিশাল উঠোনে হৈ-হুল্লোড়ের মেলা বসেছে। ক্রিকেট ম্যাচ চলছে সেই সকাল থেকে। বিল্ডিংয়ের দেরফুট বাচ্চাগুলোও এবার জার্সি পরে নেমেছে ক্রিকেট খেলবে বলে। খেলতে তো আর পারে না, এই একটু দৌড়াদৌড়ি করবে। পাশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লালচে ইটে বসে খেলা দেখবো৷ এইতো! ওদের আর কাজ কি?

কলেজ থেকে মেরিন ফিরলো বিকেল করে। ঘড়িতে তখন সবে চারটা বাজছে। তারফান, তামজিদ, তালহা আর ইখতিয়ারসহ তার কিছু বন্ধুবান্ধব তখনো ক্রিকেট খেলছে। উঠোন পেরোনোর আগেই আচমকা ক্রিকেট বলটা হুলুস্থুল বেগে ছুটে আসলো মেরিনের দিকে। মেরিন চমকে পিছু হটলো। বলটা গড়িয়ে গড়িয়ে তার পায়ের কাছে এসে থেমেছে। ইখতিয়ারের গলা শুনতে পেল, “অ্যাই! অ্যাই মেরিন! অ্যাই প্রেম করে বেড়ানো মেয়ে! বলটা এদিকে ছুঁড়ে মারো!”

মেরিন চোখ-মুখ কুঁচকে সামনে তাকালো। অনেক, অনেকগুলো ছেলে তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। সবার পরনেই হাতা কাঁটা সাদা জার্সি। চুল এলোমেলো, মুখ ক্লান্ত। তারমধ্যে তিনটে একই রকম মুখের তিনটে বেত্তমিজকেও চোখে পরলো সাথে সাথেই। তিনজনেই মুখ গম্ভীর করে রেখেছে। একজনের হাতে সদ্য বল ছুঁড়ে মা’রা কাঠের ব্যাট। এই ব্যাট ছুঁড়ে মা’রা বেয়াদবটা কে, সেই হিসেবনিকেশে মেরিন আর গেল না। কাল রাতে তার দারুণ শিক্ষা হয়েছে। ভয়ে, প্রশ্নে সে রাতে চোখ অব্দি বন্ধ করতে পারেনি। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, চোখের নিচে কালচে আবরণ, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।

ইখতিয়ারের দিকে মেরিন বল ছুড়ে মারলো না। বরং গটগট পায়ে বিল্ডিংয়ের ভেতর চলে গেল। এ বিল্ডিংয়ে লিফট নেই। আশেপাশের সব বিল্ডিংয়েই আছে। এ নিয়ে ভাড়াটিয়ারা অভিযোগ করলে সায়নউল্লাহ্ বড় গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, “তোমরা একেকজন ফার্মের মুরগী হয়ে যাচ্ছো। তাই এক্সেসাইজের জন্য আমি লিফট-টিফট দেইনাই। বেশি বেশি হাঁটো, বেশি বেশি দিন বাঁচবা। পরে আমারে দোয়া করিও।”

এই তৃষ্ণা কাতর বিকেলে, দূর্বল শরীর নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে কার মনে কি দোয়া আসে, মেরিন জানে না। তার মনে তো বদদোয়া ছাড়া কিচ্ছু আসছে না। বরং বহু কষ্টে সেই বদদোয়াগুলো দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে মেরিন। একটা একটা সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠছে। উফ! যন্ত্রণা!

দৈবাৎ, তরফানকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখা গেল। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক দূরত্বে দেওয়ালের দিকে চেপে গেল মেরিন। জড়োসড়ো ভাবে আগেই চিৎকার করলো, “খবরদার! চিমটি কাটলে আপনার খবর আছে!”

মৃদু চিৎকারে তারফান থমকে দাঁড়ালো। বিচ্ছিরি রকম ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো মেরিন মুখপানে।
মেরিন থতমত গলায় শুধালো, “আপনি কে?”

ওপাশ থেকে উত্তর নেই। সে ফের আওড়ালো, “আপনি তামজিদ তাই না? উল্টাপাল্টা কাজ করতে এসেছেন? এবার কিন্তু আমি আপনার মাথা ফাটিয়ে দেব! আমাকে দূর্বল ভেবেছেন?”

সামনের ব্যক্তি এবারও জবাব দিলো না। দূরন্ত বেগে কাছে এসে হঠাৎ হাত চেপে ধরলো তার। মেরিন ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলো। এটা কেমন হাত? এত শক্ত কেন? হাড়গোড় গুড়িয়ে যাচ্ছে যেন।
মেরিন চেঁচাতে চাইলো, “হাত ছাড়ুন আমার! আমি ব্যথা পাচ্ছি না? এত শক্ত করে ধরেছেন কেন?”

হাতের শক্তি ঢিলে করে উত্তর এলো, “আমি তারফান মেরিন। তারফান ওয়াহাজ।”

ছাদে তখন ভালোই হাওয়া বইছে। মেরিন বসে আছে শেষের রেলিং ঘেঁষে। চিলেকোঠার কাছে, ফুল গাছ থেকে দূর। একটু পরেই তারফানকে চিলেকোঠা থেকে বের হতে দেখা গেল। পরনের জার্সি পাল্টায়নি। কপালের ঘাম স্নিগ্ধ, সতেজ। বাম হাতে মস্তবড় গিটার। অপর হাতে পানির বোতল। বড় বড় পা ফেলে কাছে এসেই মেরিনের পাশে ধপ করে বসে পরলো সে। একদম গা ঘেঁষে। গিটার একপাশে রেখে বোতলের ঢাকনা খুললো। মেরিনের দিকে বাড়িয়ে বললো, “খাও।”

পিপাসায় কাতর মেরিন দিরুক্তি করলো না। দু’চুমুক পানি খেয়ে চটপটে গলায় বললো, “আপনারা ভাইরা খুবই অসভ্য। নিজের চেয়ে আধবয়সী মেয়েকে ধরে টানাটানি করে।”

তারফান এবারও উত্তর দিচ্ছে না। এ লোকের সমস্যা কি? মেরিন গাল ফুলালো। আড়চোখে চেয়ে দেখল, তারফান গিটার হাতে নিয়েছে। সুর তুলছে। মৃদুমন্দ বাতাসে তার চুল এলোমেলো হচ্ছে। 
মেরিন বললো, “আপনি কি এখন গান গাইবেন?”
“হু।”
“আমাকে টেনে এনেছেন কেন?”
“তুমি শুনবে।”
“আপনি বললেই?”

গিটারের সুর তোলা বাদ দিয়ে এবার মেরিনের চোখে চোখ রাখলো তারফান। শূণ্য, রাতের আকাশের মতো ঝাপসা দৃষ্টি। হিম শীতল গলায় আওড়ালো, “আমি বললেই, মেরিন।”

মেরিন চোখ পিটপিট করলো। জবাব খোঁজার মাঝেই বাতাসের তালে তাল মিলিয়ে তারফান গিটারের সুর তুলে গেয়ে উঠল,

দেখো দেখো রাঙানো যে লালে
তোমার ওই গালে জমেছে কতো না রাগ
জানি মাফ করবে না, জানি জানি
তুমি অভিমানী, তবু দাও না আমায় এক ভাগ
তুমি বলো, "দেবো না তোমায়
"পড়েছে কি দায়, বলো জানো তুমি জানো কি?"
আমি বলি, "যদি দূরে যাই, তোমায় ভুলে যাই"
"বাসবে ভালো তখনও কি?"

খুব ধীর, ভরাট কণ্ঠ। একটু বেতাল। একটু ঝিমানো রাতের গাম্ভীর্যতা। মেরিনের গাল লাল হয়ে উঠলো। আশ্চর্য! তার লজ্জা লাগছে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp