মেঘবন - পর্ব ১৫ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          মেরিনের কুঁচকানো মুখের দিকে অনেক্ষণ চেয়ে রইল তামজিদ। ঠোঁটের কোণের কুটিল হাসিটা জোড়ালো পর্দায় ঝলমল করছে। চোখে গভীর কটুক্তির ঢেউ। মেরিন একপলক সেই কুটিল হাসির প্রখরতা দেখলো, উত্তাল কটুক্তির গভীরতা পরিমাপ করলো। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই ধারালো নখের আঁচড়ে তার গাল ছুঁয়ে রাখা হাত খামচে ধরলো একবার, দু'বার! অথচ তামজিদ নড়চড়হীন। সামান্য ‘উহ্’ শব্দ পর্যন্ত করছে না লোকটা। বরং রয়েসয়ে গাল থেকে হাত সরিয়ে নিলো। বাহুর একপাশ রফাদফা করা র'ক্তলাল দাগগুলোর দিকে চেয়ে বিরবিরালো, “জংলী মহিলা!”

কথাটা শুনেও না শোনার ভাণ করলো মেরিন। বিরক্তিতে তেঁতে ওঠা কণ্ঠে অনেকটা আদেশের সুরে বললো, “খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে সরুন। আমি ভেতরে ঢুকবো।”

তামজিদ সরলো। ঠোঁটে হাসি নিয়েই। মেরিন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আবারও জ্বলন্ত চোখে তাকালো। তামজিদ থেকে এক প্রকার টিফিন বক্সটা ছিনিয়ে নিয়ে বললো, “আরেকবার আমার কাছে আসলে আপনার নাক ভেঙ্গে ভোঁতা করে দেব।”

“কেন? ও কি করেছে?” কন্ঠটা তালহার। সদ্য ঘুম থেকে উঠে এসেছে। মেরিন মেজাজ খারাপ নিয়েই তালহাকে আগাগোড়া দেখলো। এ লোক কি সারাদিন ঘুমায়? যখনই দেখে প্যান্ট কুঁচকানো, খালি গা, চুল এলোমেলো আর… মুখে তন্দ্রা ঘোর। 

নাকের ডগায় টগবগ করতে থাকা রাগটা আঙুলের সাহায্যে মুছে নেওয়ার চেষ্টা চালালো মেরিন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো, “আন্টি কোথায়?”
“কার আন্টি? কোন আন্টি?”
“আপনার মা।”
তালহা হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, “ওই রুমে। তুমি কি খাবার নিয়ে এসেছো? টিফিন হাতে যে? কি এনেছো দেখি! খেয়ে দেখবো, দাও।”

তালহার জিভ ইতোমধ্যে পানিতে টলমল করছে। চোখে দুর্দান্ত লোভ। চটপটে নজরে সে চেয়ে আছে মেরিনের হাতের টিফিন বক্সটার দিকে। যেন এক্ষুণি ছোঁ মেরে নিয়ে নেবে!
মেরিন ওসব পাত্তা দিলো না। তালহার ক্ষুধার্ত, করুণ চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে চলে গেল পাশের ঘরে। মাথার একপাশ অবুজের ন্যায় চুলকে তালহা এবার তামজিদকে শুধালো, “কি ব্যাপার? ও এমন রাগ দেখালো কেন?”

সদর দারজা লাগাতে লাগাতে তামজিদ বিরক্ত গলায় বললো, “আমি কি জানি?”
“কি জানি মানে? তুই মেরিনকে কিছু করিসনি?”
“করলে?”
তালহা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। পায়ের গোড়ালি তখনো চুলকাচ্ছে। কি মুশকিল! নিচু হয়ে গোড়ালির ক্ষ'ত স্থান চুলকে বললো, “মেরিনকে তারফানের জন্য রেখে দেয় ভাই। তোকে না তুবা মেয়েটাকে সমলাতে বললো?”
“তুবাকে ভালো লাগছে না।”

তড়িৎ গতিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তালহা। আশ্চর্য চোখে তামজিদের চোখে চোখ রাখলো। নিরস্ত গলায় বললো, “সত্যি..?”

তামজিদ উত্তর দিচ্ছে না, দিবে না। চোখের পলকে ঠোঁটটা চোখা করে কি যেন দেখালো সে। এরপর ধীরস্থির পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেল নিজ রুমে। তালহা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আওড়ালো, “বেয়াদব!”

—————

বড় চাচার সঙ্গে মেরিনের আগে কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। আধুনিক দুনিয়ার ভিডিও কলে যা একটু কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। তবুও কোনো এক অজানা কারণে তিনি মেরিনকে প্রচন্ড স্নেহ করেন। ননী সাহেবের ফোনে কল লাগালেই সর্বপ্রথম মেরিনের কথা জিজ্ঞেস করেন, ভালোমন্দ শুধান। মেরিন ভেবেছিল, সামনাসামনি দেখা হলে সে বড় চাচার সঙ্গে ওভাবে মিশতে পারবে না। মা থেকে শুনেছে, সেই তার জন্মের সময় বড় চাচা তাকে কোলে নিয়েছিলেন। এরপর তো ঊনিশ বছর কেটে গেল। 
মেরিন ইতস্তত পায়ে এগিয়ে এলো। জড়ানো কণ্ঠে শুধালো, “কেমন আছো, বড় চাচ্চু?”

উত্তরে বড় আদরমাখা হাতে মেরিনকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন তিনি। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ভালো আছি মা। তুই কেমন আছিস? দেখতে দেখতে কত হয়ে গেছিস! ভিডিও কলে কিন্তু তোকে অনেক ছোট লাগে।”

জবাবে মিষ্টি করে হাসলো মেরিন। আস্তে আস্তে তার জড়তা কেটে যাচ্ছে। বড় চাচার একেকটা কথায় খিলখিল করে হাসছে সে। বড় চাচা মজার মানুষ। জাপান থেকে মেরিনের উপহার হিসেবে তিনি সিলিকনের বিরাট এক সাপ নিয়ে এসেছেন। ভাইদের জন্য এনেছেন কালো রঙের মোটা কলম। জাপানিজ এক জ্যোতিষীবিদ তাকে বলেছে, এ কলম দিয়ে হিসাবনিকাশ করলে সংসারের আয় রোজগার বাড়ে। বড় চাচা সে কথা বিশ্বাস করেন কি-না জানা নেই, তবে ভাইদের এ কথা বিশ্বাস করাতে জানপ্রাণ দিয়ে একেকটা গবেষণা, যুক্তিতর্ক দাঁড় করাচ্ছেন একের পর এক। 
বড় চাচার এ বাড়িটা মাঝারি আকারের। চারপাশে ফুল গাছ, ফল গাছ, আগাছা। শুনেছে, বড় চাচার গাছ নিয়ে বিচ্ছিরি রকমের সৌখিনতা আছে। বাংলাদেশে থাকতে রাস্তায়, মাঠে, ঘাটে কোনো সুন্দর গাছ পেলেই তা নিয়ে আসতেন বাগানে গাঁথবার জন্য। সেখান থেকে বোঝা যায়, মেরিনের এই গাছের প্রতি তীব্র আসক্তি বোধকরি বড় চাচা থেকেই এসেছে।

বিগত ঊনিশ বছর এ বাড়িতে কেয়ারটেকার ছিল। এখন ওরা গ্রামে চলে গেছেন। যাবার আগে সম্পূর্ণ বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছেন বোধহয়। কোথাও এইটুকু পরিমাণ ময়লা নেই, আবর্জনার তিক্ত গন্ধ নেই। বরং কোত্থেকে যেন একটা মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। বেলীফুলের ঘ্রাণ। উহু! জুঁই ফুলের ঘ্রাণ নয়তো?
দৈবাৎ, পেছনে থেকে একটু সুরেলা, কোমল, আংশিক পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল, “তুমি আমার ছোটবোন? ম্যারিন?”

সঙ্গে সঙ্গে চোখ-মুখ কুঁচকে তাকালো মেরিন। এ হচ্ছে তার বড় চাচার বড় ছেলে। তাহসিন। হাট্টাকাট্টা হতে গিয়ে সামান্য হ্যাংলাপাতলা হয়ে গেছে। তবে মুখের হাসি নজরকাড়া। জাপান থাকতে থাকতে পুরো জাপানিজ অদল স্পষ্ট। তাও ভালো। এখনো অব্দি ঠিকঠাক বাংলা বলতে পারে। তাহসিনের ছোট দুই বোন তো আগাগোড়া জন্মই জাপানে। বাংলা বোঝে না, বলা তো বহু দূরের ব্যাপার। বাংলায় কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে হতবাক হয়ে শুধাবে, “নানি?”
প্রশ্ন করা লোকটা আরও হতবাক হয়ে শুধায়, “কিসের নানি? তোমার নানি তো মইরা গেছে অনেক আগে।”

বড় চাচি তখন লজ্জিত হেসে বলবে, “ওরা আসলে বাংলা পারে নাতো! আপনি কি বলেছেন সেটা জিজ্ঞেস করছে… জাপানিজ ভাষায়।”

জবাব দেওয়ার পূর্বে একটু কেঁশে নিলো মেরিন। চরম বিরক্তি চেপে বললো, “মেরিন হবে ওটা, ভাইয়া।”
“মেরিইন?” যেন উচ্চারণ করতে গিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলো তাহসিন। মেরিন মাথা নাড়িয়ে বললো, “জি। মেরিন।”

তাহসিন মিষ্টি করে হাসলো এবার। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ফের বললো, “তোমরা বাঙালিরা অনেক সুন্দর।”
মেরিন হাপুস নয়নে চেয়ে বললো, “আপনিও বাঙালি।”
“ওহ্, হ্যাঁ! তাই তো!”

দমকা হাওয়া বইছে। কিসের যেন চির চির শব্দে হৃদয় দোলা দিচ্ছে বার বার। কপালের কাছে চুল এলোমেলো হতেই সেটা কানের পেছনে গুঁজলো মেরিন। বসার ঘর থেকে হাসির শব্দ আসছে। ছোট চাচার পনেরো বছর বয়সী মেয়ে ইতি এসে ক্ষণেই ডাক দিলো, “আপু, নাস্তা খাবে না? বড় চাচা তোমাকে ডাকে।”

—————

বছরে একটা রাত আসে না? চাঁদের তীক্ষ্ণ আলোয় পৃথিবীর অন্ধকার ঝলসে দেওয়া রাত? রজনীর মনে আছে, সেদিনও স্পষ্ট চাঁদের আলো ছঁড়ানোর একটা রাত ছিল। ইমন বলেছিল, সে দাঁড়িয়ে থাকবে স্কুলের পেছনের ডোবা জায়গায়। ঠিক রাত্রি দশটায়, নিস্তব্ধ, নির্জন রাতে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল রজনী। কতক্ষণ যে ওই ডোবার দুর্গন্ধ জায়গায়, মশার কামড়ে জর্জরিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল! সেকেন্ড গড়ায়, মিনিট গড়ায়, ঘণ্টা গড়ায়! গা ছমছম করা পরিবেশে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে। ইমন কি আসবে না? এতক্ষণ লাগছে কেন? নাজুক চোখে টলমল করে অশ্রুজল। আবারও মন কু ডাকে, “ইমন কি আসবে না?”

ইমন এলো আরও ঘণ্টাখানেক লাগিয়ে। রজনী ততক্ষণে একেবারে ভেঙ্গে গেছে। তার হু হু করে কান্নার সুর ভৌতিক আমেজ সৃষ্টি করছে আমোদেই। এখন তো বাবা-মায়ের কাছে ফেরাও যাবে না। ভয় লাগছে, মা যদি মারেন?

“হুদা হুদা কাইন্দো নাতো! আসছি আমি। এই রজনী!”

রজনী মৃদু কেঁপে ওঠে। পরপরই শক্ত করে জাপটে ধরে ইমনকে। ইমনের বুকে মিলেমিশে একাকার হয়ে কান্নার তেজ বাড়ায়, “এত দেড়ি করলেন কেন? আমি কত ভয় পেয়েছি জানেন?”

ইমন উত্তর দেয় না। তার মনে তখন অন্য চিন্তা। এখানে সে আসতে চাইছিল না। একবার আসবে না বলে মনস্থিরও করে ফেলেছিল। কি বুঝে যে সেদিন রজনীকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বললো! বোকা মেয়ে রাজীও হয়ে গেছে। 
বাবা কাল কল দিয়ে অনেক হুমকি দিয়েছেন। মা হার্ট অ্যাটা’ক করেছেন দু’দিন আগে, তার চিন্তায়। সে দেখতে যায়নি। আবার নাকি কোন মেয়েকে দেখেছেন তার বিয়ের জন্য। ইমন ছবি দেখেছে। সুন্দরী, বড়লোক বাপের মেয়ে। রজনীর মতো গেয়ো, ইট-সিমেন্টে কাজ করা বাপের মেয়ে না। 

দূস্তর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কি করবে একবার ভাবলো ইমন। রজনীকে আগাগোড়া দেখে বললো, “ব্যাগ ট্যাগ আনো নাই? খালি হাতে আসছো?”
রজনী পিটপিট নজরে তাকালো, “পালাতে হলে ব্যাগ-ট্যাগ আনতে হয়?”

মনে মনে বিশ্রী এক গালি দিয়ে ইমন বললো, “লাগবে না কিছু। চলো, বাস ছাইড়া দিবো একটু পর।”

রজনী উত্তেজিত হয়ে পরলো। সামনে কি হবে, সামনে কি হবে— ভেবে খিলখিল করে হাসলো একটু পরপর। ইমনের সবকিছু বিরক্ত লাগছিল। বাবা কালকের মধ্যে বাসায় যেতে বলেছেন। নয়তো তাকে জ্যান্ত মে'রে ফেলবেন। চিন্তিত হয়ে সে বন্ধু আদনানকে মেসেজ করলো, “এখন কি করমু বন্ধু? আইডিয়া দে।”

ওপাশ থেকে দু'মিনিট পর ফিরতি বার্তা এলো, “মাইয়া লইয়া বাসে উইঠা গেছিস?”
“হ।”
“পতি’তালয়ে বেইচ্চা দেয়। মাইয়া সুন্দর। ভালো দাম পাবি।”

ইমন আড়চোখে একবার রজনীকে দেখলো, “সত্যি এমন করুম?”
“তো কি করবি? গেছোস ক্যান শা'লা তুই? এমনেই মাইয়া কিছুক্ষণ খাড়াই থাইকা চইলা যাইতো। তুই গেলি ক্যান? বন্ধু, তুমিও যে টাকার লাইগা গেছ আমি জানি।”

জবাবে ইমন হাসির ইমুজি দিলো কয়েকটা। এরপর লেখলো, “ঠিকানা দেয়। এত বকিস না শা'লা।”
আদনান ঠিকানা দিতেই মোবাইল প্যান্টের পকেটে পুরলো ইমন। অন্তর কাঁপছে। চোখবুজে সীটে হেলান দিয়ে সে ভাবতে লাগলো, ঠিক কত টাকা পাবে রজনীকে বিক্রির বিনিময়ে?

বাস যখন থামলো, তখন আকাশে মাত্র মাত্র সূর্য কিরণ ছড়াচ্ছে। মৃদু মৃদু শীতে অল্পসল্প কাঁপছে রজনী। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ইমনের কাছে আবদার করলো, “আপনার সোয়েটার আমাকে একটু দিবেন? অনেক শীত লাগতাছে।”

তেঁত মুখে ইমন মানা করতে গিয়েও কি বুঝে করলো না। আর কয়েক ঘণ্টাই তো! এরপর তো মেয়েটার সাথে তার আর কখনো দেখা হবে না।
সোয়েটার পরতে পরতে রজনী জিজ্ঞেস করলো, “আমরা কই যাচ্ছি? কাজী অফিস? নাকি আপনার বাসায়?”
“যাইলে দেখতে পাইবা।”

মোবাইলের পর্দায় আদনানের পাঠানো ঠিকানাটা আরেকবার দেখে নিলো ইমন। সিএনজি ডাকলো। রজনী আগে কখনো সিএনজিতে ওঠেনি। এত বড় শহর দেখেনি। সে তো এই প্রথম এলো শহরে। বড় বড় চোখে, অদম্য কৌতূহল নিয়ে আশপাশের সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো রজনী। সুখে, আহ্লাদে দুমড়েমুচড়ে গেল। তার এই আনন্দ, উল্লাস দেখে মনে মনে হাসলো ইমন। রজনীর এই আনন্দ কিছুক্ষণ পর আর থাকবে না। এই আনন্দ ক্ষণিকের।

—————

মাঝরাতে রজনী হায়দারের হাহাকার ভরা কান্নার আওয়াজে তালহা আর তামজিদ ছুটে এলো প্রায়। রজনী হায়দার হাত-পা ছুঁড়ছেন। আ’হাজারি করছেন। খামচে ধরছেন নিজের চুল, গাল, বাহু! তামজিদ সঙ্গে সঙ্গে মাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। তালহা কল লাগালো তারফানকে, “মা আবারও হ্যালুসিনেশন করছে তারফান! কাঁদছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।”

সব কিছু শান্ত হতে অনেক সময় লেগে গেল। রাত তখন দেড়টা। তারফান, তামজিদ আর তালহা মায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সবার চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি। তারফান একমনে নিচের দিকে চেয়ে বিরবিরাচ্ছে, “তুমি বলেছিলে সব ভুলে শুরু থেকে শুরু করতে। অথচ তুমিই কিছু ভুলতে পারোনি মা। তুমিই কিছু ভুলতে পারোনি!”

এরপর কি ভেবে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো তারফান। দরজা ঠেলে চলে যেতে নিলেই তামজিদ জিজ্ঞেস করলো, “কই যাস?”
“কাজে।”
“কি কাজ? সকালে ডিউটি কে করবে?”
“আমার জায়গায় তুই করবি।”

তামজিদ ভুরু কুঁচকালো, “আর আমার ডিউটি?”
“তালহার কালকে শুটিং অফ। ওর চুল কালো করে নিয়ে যা।”

তারফানের নিজস্ব গাড়ি নেই। মাঝরাতে ইখতিয়ারকে ডেকে ওর বাইক নিয়েই ছুটে পরলো গন্তব্যে। পথে টুকিটাকি বৃষ্টির ছঁটায় ভিঁজলো গেঞ্জি, চুল, সুশ্রী মুখশ্রী।
বাইক যখন থামলো, সবে আলো ফুঁটতে শুরু করেছে ধরণীতে। স্নিগ্ধ মাটির ঘ্রাণ ঘুরঘুর করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে বলিষ্ঠ শরীর। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিঁজিয়ে একহাতে কপাল ঢাকা চুল পেছনে ঠেললো তারফান। সামনেই আধপুরোনো-আধুনিক একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বিশাল বারান্দার ঠিক মাঝামাঝিতে মেরিন দাঁড়ানো। গায়ে ওড়না নেই। শাল দিয়ে পুরো শরীর জড়িয়ে রেখেছে। একটু গ্রাম সাইডে হওয়ায় এখানে ভোরে খুব বাতাস বয়, ঠান্ডা লাগে। 
তারফান গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। তাকিয়ে রইলো। তাকিয়ে থাকতে থাকতে অচিরেই চোখাচোখি হলো দু'জন। দু’মিনিটের জন্য। 

মেরিন প্রথমে বিস্মিত হলো, অবাক হলো, পরমুহূর্তে ভীষণ রাগে কটমট চোখে তাকালো তারফানের দিকে। পা ছুটলো এত দ্রুত! দিকবেদিন না দেখে নিচে নেমে এলো মেরিন। গেট খুলতে গিয়ে সামান্য শব্দ হলো, ক্যাঁচক্যাঁচ! ক্যাঁচক্যাঁচ!
মেরিন এগিয়ে এসেই প্রশ্ন ছুঁড়লো, “আপনি কে?”

তারফানের স্থির নয়ন তীক্ষ্ম হলো। মেরিনের সদ্য ঘুম থেকে ওঠা নির্মল মুখশ্রী, রাগে কাঁপতে থাকা ঠোঁট, লাল লাল গাল— সবকিছু এক এক করে, সময় নিয়ে দেখলো সে। উত্তর দিলো, “তারফান ওয়াহাজ।”

মেরিন রাগে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, আপনি জানেন?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp