মেঘবন - পর্ব ১৪ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          ভাঙ্গা ভাঙ্গা সুরে গাইতে থাকা কণ্ঠস্বর হঠাৎ থেমে গেল। পূব আকাশের রক্তিম আকাশ ধেয়ে বজ্র হাওয়া পুন:পুন: কাছে এগোচ্ছিল। সেই হাওয়া তারফানকে ছুঁয়ে দিলো একটু আদুরে হাত বুলিয়েই। অনবরত তার আঙুল গিটারের তারে সুর তুলছিল। রক্তিম আকাশের দিকে চোখ বন্ধ করে একমনে টিংটিংটুংটাং ধ্বনিতে আবেশিত হয়েছিল সারাটা বিকেল, সন্ধ্যে হবে হবে ক্ষণ। তারপর একদম আচমকাই একটা দমকা হাওয়া এসে তাকে ছুঁলো— কোঁকড়ানো, ঢেউ খেলানো চুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে কপালে লেপ্টে গেল, এলোমেলো হলো। মেরিন চোখের পলক ফেলতে পারছিল না। অবাক নয়নে চেয়ে চেয়ে দেখছিল সামনের মানুষটাকে। তারফান ওয়াহাজকে। কাঠখোট্টা একটা লোক। লোকই তো! বয়সে বড় না? সদা বেত্তমিজি করে বেড়িয়েছে। এখনো মেরিনকে জোড় করে ছাদে টেনে নিয়ে এলো। অথচ রাগের বদলে লোকটাকে বড় স্নিগ্ধ ঠেকছে মেরিনের কাছে। অপার্থিব কিছু মনে হচ্ছে। মেরিন ঢোক গিললো। ভয়ে, আশংকায় কিংবা অস্বস্তিতে। আপনা আপনি বাম হাত উঁচিয়ে তারফানের কোঁকড়ানো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিতে চাইলো। কানের পেছনে গুঁজে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু অত ছোটোছোটো চুল কি কানে গুঁজে দেওয়া যায়? সম্ভব? একদম না।

তারফান চোখ মেলে তাকালো সঙ্গে সঙ্গেই। প্রচন্ড বাদামি দুটো চোখের মণি। গোটা ইউনিভার্স যেন ওই ছোট্ট রাজ্যে বসবাস করে। 
চুল ছুঁয়ে থাকা মেরিনের হাত আচমকাই শক্ত থাবায় মুঠোয় পুরলো তারফান। ঠিক তখনকার মতো। হাড়গোড় গুড়িয়ে দেওয়ার মতো। মেরিন কুঁকিয়ে উঠলো। তারফানের বিশাল দেহি বদন তার দিকেই ঝুঁকে আছে। অস্বস্তিতে দুমড়ে মুচড়ে গেল সে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিঁজিয়ে পিটপিট নজরে তাকালো। বলতে চাইলো, “দূরে.. দূরে সরু…”

কথা শেষ হলো না। তারফান শেষ হতে দিলো না। পুরুষালী ঠোঁট তড়িৎ বেগে ছুঁয়ে দিলো মেরিনের মোলায়েম গাল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড! তারফান সরলো না। বরং তার মুখ ঢেবে গেছে মেরিনের গালে। তার অমসৃণ, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির সূঁচ গালে বিঁধতেই মেরিনের চোখে পানি চলে এলো। বুক ধরফর করলো। নিশ্বাস জোড়ালো ভাবে নিচ্ছে-ফেলছে। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ কাঁপলো, “আপনি… আপনি এত খারাপ!”

তারফানের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে সরে এলো খুব নির্লিপ্তভাবে, রয়েসয়ে। শক্ত করে ধরে থাকা মেরিনের হাত ছেড়ে দিলো। ধপ করে ছাদের খরখরে মেঝেতে বাড়ি খেলো ওটা। মেরিন একবার অবহেলায় ছেড়ে দেওয়া তার হাতটা দেখলো, এরপর তারফানকে দেখলো। লোকটা চোয়াল শক্ত করে রেখেছে, চোখদুটো তখনো এক আকাশ শূণ্যতা নিয়ে কি যেন দেখছে, ভাবছে। 

কানের খুব কাছ দিয়ে একটা কাক কা, কা আওয়াজ তুলে উড়ে গেল। তারফান শুনলো, মেরিন ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। চলে যাচ্ছে।

—————

পায়ের গোড়ালির আশপাশটায় বেশ বাজেভাবে চুলকাচ্ছে তালহার। নখের খুঁচখুঁচানিতে ইতোমধ্যে জায়গাটা ঝল'সে ফেলেছে সে। তাও শান্তি নেই। মাথার ওপর ত্যাছড়া সূর্যের কিরণ। কপালের ঘামরাশি মুছতেও তার সে কি আলসেমি! বিরক্তি! ডান ভ্রুয়ের শেষ মাথায় বার কয়েক আঙুল বুলালো তালহা। সামনে রিদিমা আর দীপ্ত নাটকের শুটিং করছে। এ নায়ক-নায়িকাগুলি কি খেয়ে যে নাটক করতে আসে, কে জানে! প্রডিউসারের কথায় হালের দু'জন জনপ্রিয় অভিনেতাকে নিতে হয়েছে। শুধু জনপ্রিয়তা আছে বৈ কি! অভিনয়ের ‘অ'-ও জানে না। এরচেয়ে পাশের মোর্শেদ কাকু কেরানির অভিনয়টা দারুণ করছেন। 

‘তিক’ করে শব্দ তুলে কপাল কুঁচকালো তালহা। জোড়েসোড়ে আওয়াজ তুললো, “বি নরমাল রিদিমা! শাড়ির আঁচল নিয়ে নড়াচড়া করছো কেন?”

রিদিমা একে একে সবার দিকে তাকালো। তটস্থ গলায় বললো, “এবার ঠিক করে করবো। স্যরি, তালহা।”

তালহা আর তাকালোই না রিদিমার দিকে। তার মেজাজ বিগড়ে গেছে। পাশে বসে থাকা সহ-পরিচালক অর্ক বললেন, “আপনাকে পছন্দ করে।”

তালহা ভ্রু তুলে তাকালো, “কে?”
“রিদিমা।”
এ কথার পিঠে ঠোঁট এলিয়ে হাসলো তালহা। অর্ক জোড় গলায় বললো, “আরে ফাপর মারছি না। সত্যিই পছন্দ করে। দেখেন, রিদিমা জনপ্রিয় একটা নায়িকা। ওকে সবাই চায়। এজন্য দাম বেশি। সবার সাথেই মেজাজ থাকে টুঙ্গে। যা-তা ব্যবহার! কিন্তু আপনার সামনে কাচুমাচু করে। লজ্জা লজ্জা হাসি তো ঠোঁটে মাস্ট। আপনি কখনো খেয়াল করেন নাই?”

দীপ্তর মেকাপ চলছে। গরমে ফাউন্ডেশন গলে গলে পরছে। তালহা বিরক্ত হয়ে মেকাপ আর্টিস্টকে ডাক দিলো, “সব মুছো। আবার নতুন করে করো। ফাউন্ডেশন কম দেবে। রিদিমার মেকাপটাও ঠিক করো। ফাস্ট!”
এরপর অর্কর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো, “করেছি।”
“তাহলে এখন? কি করবেন ভেবেছেন? এক্সেপ্ট করবেন? আপনি একটু ইশারা দিলেই মেয়ে পটে যাবে।”

আলসেমি ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙ্গলো তালহা। কানে গুঁজে রাখা কলম দিয়ে ফের খুঁচাকুঁচি করলো জখ'ম জায়গায়। দায় সারা স্বরে জবাব দিলো, “দেখি… কি করি।”

অর্ক কিছু বলার আগেই ফোনকলের শব্দ হলো। তালহার ফোন। তামজিদ কল করেছে। শুটিং স্পটের এদিক-ওদিক নজর বুলিয়ে কল রিসিভ করলো তালহা, “হ্যালো, বল।”

ওপাশ থেকে তামজিদের ঘুম জড়ানো কণ্ঠ, “তোর কাজ শেষ কখন?”
“দেড়ি হবে।” একটু থেমে শুধালো, “কেন কল করেছিস?”
“বিকেলে মাকে রিলিজ দিবো। আর…”
“আর কি?”

তামজিদ খুব থেমে থেমে বললো, “হায়দারকে পেয়েছি।”
প্রচন্ড চমকে আলস্য শরীর সোজা করে বসলো তালহা। অর্কের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সতর্ক গলায় শুধালো, “কই পেলি?”
“হাতের কাছেই ছিল। অথচ আমরা কত কত জায়গায় খুঁজলাম!”

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেঁজালো তালহা। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “এখন কি করবি?”
“যা করার কথা।”

হুট করেই বিগড়ে থাকা তিক্ত, তেঁত মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে গেল তালহার। স্টাফকে ডেকে জুস আনালো। তা খেতে খেতেই বাকি শুটিং দেখলো সে। রিদিমা, দীপ্ত অভিনয়ে ভুল করলে মোটেও বকলো না, রাগ দেখালো না। বরং সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো। 

রিদিমা তালহাকে পছন্দ করে এইতো, দু’মাস হচ্ছে। নাটকের চুক্তি হওয়ার পরে তালহার বিষয়ে অল্পসল্প ঘাটাঘুটি করেছিল সে। তালহার সাক্ষাতকারগুলো, তার প্রোফাইলের ছবিগুলো— দেখতে দেখতে কখন যে পছন্দ করে ফেললো! শুনেছে, ডিরেক্টর সাহেবের আরও দুটো একই রকম দেখতে ভাই আছে। তালহার প্রোফাইলে যদিও এ নিয়ে কোনো ছবি-টবি নেই। মিডিয়াতেও তেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাতে কি? রিদিমা তালহাকে পছন্দ করে। তার তালহা হলেই চলবে।
এসিস্ট্যান্ট রাতুলকে ঢেকে রিদিমা বললো, “তালহাকে একটা কোকাকোলার ক্যান দিয়ে এসো রাতুল... যাও। বলবে আমি দিয়েছি, বুঝেছো?”
রাতুল দীর্ঘশ্বাস গোপন করে উত্তর দিলো, “ঠিকাছে ম্যাম।”

অথচ দেখা গেল, সেই জুস তালহা ছুঁয়েও দেখেনি।

—————

কোনো এক অদৃশ্য ক্ষমতা বলে টিউলিপ আক্তার আর রজনী হায়দার একে অপরের পরম মিত্র হয়ে উঠেছেন। দু'জন দু'জনকে প্রতিদিন নিয়ম করে কল লাগাচ্ছেন, খবরাখবর নিচ্ছেন। রজনী হায়দার যতদিন হাসপাতালে ছিলেন? রোজ রোজ খাবারের একটা টিফিন বক্স পৌঁছে দিয়ে এসেছেন পাঁচ তলার বিশাল ফ্ল্যাট-টায়। আজও সকাল সকাল সেই নীল রঙা টিফিন বক্সে খাবারের মেলা বসেছে। গরম গরম ভাত, চিংড়ি ভুনা, ডিম ভাজি, ডাল— আরও কত কি!
মেরিন তখন ভারী কারুকাজের একটা সবুজ কামিজ পরে সারা ঘরময় টো টো করছে। মুখে আপাতত কোনো প্রসাধনী নেই। সাজসজ্জার বড্ড অভাব। কাল সকালের ফ্লাইটে বড় চাচা তার পরিবার নিয়ে জাপান থেকে ফিরেছেন। একেবারের জন্য। ননী সাহেব তাই সোফায় বসে উবার বুক করছেন। একটু পরই বড় ভাইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে বেরোবেন।

মেরিন চুল চিরুনি করার মাঝে বাবাকে শুধালো, “বড় চাচ্চুর জন্য যে শার্ট-টা কিনেছিলাম ওটা দেখেছো বাবা? পাচ্ছি না কেন?”
ননী সাহেব ব্যস্ত গলায় উত্তর দিলেন, “আমি কিভাবে জানবো? তোমার মাকে জিজ্ঞেস করো।”

মেরিন আবার ছুটলো মায়ের কাছে, রান্নাঘরে, “বড় চাচ্চুর জন্য যে শার্টটা কিনেছিলাম ওটা কোথায় মা? কোথায় রেখেছো?”

টিউলিপ আক্তার উত্তর দিলেন না। যেন শুনতেই পাননি। মেরিনের দিকে একপলক তাকিয়ে বললেন, “এখনো রেডি হোসনি কেন? ক'টা বাজে?”
“হবো একটু পর। তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দাও।”
“শার্ট লাগেজে আছে।” একটু থেমে বললেন, “তুই রেডি তো এখন হবি না… এক কাজ কর, এই টিফিন বক্স পাঁচ তলায় দিয়ে আয়। তোর রজনী আন্টির কাছে।”

মেরিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো। চটপটে গলায় জিজ্ঞেস করলো, “আমাকে যেতে হবে কেন? তুমি না প্রত্যেকবার দিয়ে আসো?”

টিউলিপ আক্তার চোখ রাঙালেন। অদৃশ্য শাসনে মেরিন যেন আর টু শব্দটিও করতে পারলো না। টিউলিপ আক্তার টিফিন বক্স এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই বক্সটা আন্টিকে দিয়ে কিছুক্ষণ বসবি। আন্টির ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবি। সাথে সাথে চলে আসবি না, বুঝেছিস কি বলেছি?”
গোমড়া মুখে মেরিন মাথা কাত করে সায় দিলো। অর্থাৎ, সে বুঝেছে।

দরজার একদম কাছ ঘেঁষে ছোট্ট বাটনের মতো একটা কলিংবেল। পাঁচবারের মতো সেই ছোট্ট বাটনে হাতের আঙুলের টিপ ফেলেছে মেরিন। অথচ ফলাফল শূণ্য। কেউ দরজা খুলছে না। বিরক্তিতে দাঁত খিঁচে আছে সে। এত ভারি টিফিন বক্স নিয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়? বিচ্ছিরি ভাবে তেঁতে উঠে শেষবারের মতো কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে গেল। ক্লান্ত, ঘুমন্ত একজোড়া চোখ আশ্চর্য হয়ে তাকালো মেরিনের দিকে। পরপরই গম্ভীর গলায় শুধালো, “কেন এসেছো?”

হাবভাবে তামজিদ। গম্ভীর ঠিক থাকতে পারছে না। ঠোঁটের কোণের সূক্ষ্ণ কুটিল হাসি মেরিন এইতো, ধরে ফেললো। নাক কুঁচকে বললো, “মা খাবার পাঠিয়েছে। সরুন।”

তামজিদ এক ভ্রু উঁচালো, “সরে?”
“ভেতরে ঢুকবো।”
“ভেতরে ঢুকে কি করবে? টিফিন বক্স দাও, তারপর চলে যাও।”
ভারি টিফিন বক্সটা মেরিন পারলে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে বললো, “আমি আন্টির সাথেও দেখা করবো… আপনি সরুন।”

বেয়াদব লোক তবুও সরছে না। হতাশ নজরে চেয়ে উদাস একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিফিন বক্সটা তামজিদের দিকে বাড়িয়ে দিলো মেরিন, “বক্সটা নিন।” তামজিদ সঙ্গে সঙ্গেই নিলো। মেরিন ফের বললো, “আপনারা ভাইরা খুবই বিরক্তিকর। ছোটদের স্নেহ তো দূর, বরং অসভ্যতা করেন। ডাক্তার হয়ে এসব করতে আপনাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।”

ঘুমে চোখদুটো যেন ঝিমিয়ে এলো তামজিদের। কাল সারারাত ঘুম হয়নি। মেরিনের কথায় মাছি তাড়ানোর মতো করে বললো, “ধুর! ওসব লজ্জা-টজ্জা ডাক্তাররা পায় না।”

মেরিনের বাম গালে কি যেন লেগে আছে। হলুদ, তরলের মতো কিছু। তামজিদ প্রশ্ন করলো, “এখানে আসার আগে কি খেয়ে এসেছো?”
“তা জেনে আপনি কি করবেন?”

তামজিদ শান্ত চোখে তাকালো। ভীষণ ঠান্ডা দৃষ্টি। মেরিন থতমত গলায় বললো, “গরুর মাংস দিয়ে রুটি।”
“গালে ঝোল লেগে আছে।”

বলতে বলতে তামজিদের হাত পৌঁছে গেল মেরিনের বাম গালের একদম মধ্যিখানে। বুড়ো আঙুলের তেজি ঘঁষায় ঝোলটুকু মুছার ফাঁকে আলতো হাসলো সে, “তুমি খেতে গিয়েও তিড়িংবিড়িং করো… মেরিন? শান্ত থাকতে পারো না?”

মেরিন কথা বলতে পারলো না। চোখ কুঁচকে যাচ্ছে। আশ্চর্য! এমন জোড়ে জোড়ে আঙুল ঘঁষছে কেন? 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp