আঁধারে ঝিম ধরানো নিস্তব্ধতা। খাঁচায় বন্দী টিয়া পাখি কিছুক্ষণ পর পর ডেকে উঠছে। মধুর ডাক, অথচ তুবার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্রী ডাকের একটি মনে হচ্ছে। টিয়া পাখিটা তাকে তামজিদ দিয়েছিল। বড় ভালোবেসে, তাদের সম্পর্কের এক সপ্তাহের মাথায়। অথচ সেই ভালোবাসা এখন কই? তার ফোনকল, মেসেজ একটারও ফিরতি জবাব দিচ্ছে না কেন ছেলেটা? কাঁপতে থাকা শরীরে মোবাইল আঁকড়ে ধরলো তুবা। নড়বড়ে হাতে পঞ্চাশতম বার্তা পাঠালো, “তামজিদ? তুমি ঠিক আছো? সুস্থ আছো? অ্যাই! আমার মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছ না কেন?”
উহু! জবাব নেই। অপর পক্ষ ভয়ানক নিরবতা পালন করছে। তাকে তুচ্ছ ভাবে অদেখা করে দিচ্ছে। তৎক্ষণাৎ হাতে থাকা সেলফোন মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললো তুবা। দু'হাতে খামছে ধরলো তার ঘন, মোলায়েম কেশ। কানে আবারও টিয়া পাখির ডাক আসতেই চেঁচিয়ে উঠলো, “চুপ! একদম চুপ! আর একটা আওয়াজ বের করলে তোর গলা কে’টে কুঁচিকুঁচি করবো আমি।”
বোবা প্রাণ কি বুঝলো কে জানে! বারান্দা থেকে টিয়া পাখির আর একটা আওয়াজও ভেসে এলো না। নক্ষত্র তালুকদার এলেন তার একটুক্ষণ পরই। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ডাকলেন, “তুবা, দরজা খুলো।”
তুবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো, “না।”
“দরজা খুলো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
“কোনো কথা নেই। আমি তোমার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। সব তোমার জন্য হয়েছে। সব! শুধুমাত্র তোমার জন্য আমি সাধারণ লাইফ লিড করতে পারছি না।”
নক্ষত্র তালুকদারের চোয়াল শক্ত হলো। রাগে রীতিমতো শরীর থরথর করে কাঁপছে। কটমট গলায় তিনি বললেন, “সারাজীবন আমার টাকায় ফুর্তি করেছো। বন্ধুদের সাথে রাত নেই দিন নেই আড্ডা দিচ্ছো। ইদানিং দেখলাম টিভিতে তোমার বিজ্ঞাপন বের হয়েছে। আমরা রক্ষণশীল পরিবারের। আমাদের ঘরের মেয়েরা এমন বেহায়াপনা করে বেড়ায় না। তবুও আমি তোমাকে কিছু বলি না। দিনেদুপুরে গার্ড ছাড়া, মাক্স ছাড়া তুমি ছেলে নিয়ে ফুচকা খাও। ভাবো আমি এসবের খবর পাবো না? নিজেকে খুব চালাক ভাবো? প্রতিবার মিডিয়ার লোকদের ফাঁকি দিতে পারবে ভেবেছো? নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে শেখো তুবা। তোমার পেছনে অযথা সময় নষ্ট করার সময় আমার নেই।”
ধুপধাপ শব্দে নক্ষত্র তালুকদার চলে গেলেন। বাবার কথা তুবা আমলে নিলো না। ঠিক করে কথাগুলো শুনেছে কিনা সন্দেহ। সে ততক্ষণে মেঝে থেকে মোবাইল কুড়িয়ে এনেছে। ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখ কামড়াতে কামড়াতে ফের তামজিদকে কল লাগালো, একবার! দু’বার! লাগাতার…. ফোন বন্ধ বলছে।
—————
দুপুরের রোদের সঙ্গে ধরণীর বাকিসব উত্তপ্ততা বড্ড ফিকে পরে যায়। খরার ন্যায় খাঁ খাঁ করে আশপাশ। গলা শুকিয়ে চৌচির। এসময়টাতে মেরিন ভুলেও ঘর থেকে বের হতে চায় না। কিন্তু জুম্মুর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ছাদে উঠতে হয়েছে। জুম্মু ছেলেটা বড্ড পাজি। একলা হাতে বিল্ডিংয়ের পুরোটা জুড়ে ওর প্রবল বিস্তার। জ্বালিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে ফেলে একদম। তবে মেরিনের মতো ছেলেটার গাছের প্রতি প্রবল আগ্রহ। গাছের প্রাণ সত্যিই আছে কি-না! গাছ কি কথা শুনতে পায়? আমি শুনেছি কিছু গাছ মানুষের মতো হাঁটতেও পারে। তোমার কাছে কি ওমন গাছ আছে?— এমন কতশত প্রশ্ন যে জুম্মুর ঝুলিতে চাপা পরে আছে! মেরিন তা দেখে আজ সকালেই বললো, “এমন গাছ তো নেই। তবে আমার কাছে অনেক অনেক ফুল গাছ আছে। তুমি কাঁটামুকুট গাছ নিবে?”
জুম্মু জোড়ে জোড়ে মাথা দুলালো। অর্থ্যাৎ, হ্যাঁ, সে নিবে। মেরিন বললো, “তাহলে একটা টব নিয়ে আসো। আমি তোমাকে সুন্দর করে গাছ রেডি করে দিবো। সকাল, বিকাল পানি দেবে, যত্ন করবে। বুঝেছো?”
সেই জুম্মু দুপুর হতেই ইয়া বড় একটা টব নিয়ে হাজির।
রোদ্দুরের তাপ সরাসরি মেরিনের মাথায় পরছে। ফোনে দেখেছিল, আজ ৩৩ ডিগ্রি উত্তাপ। কপালের চিকন ঘাম রয়েসয়ে গাল গড়াচ্ছে। ভ্রু বিচ্ছিরি রকম কুঁচকানো। জুম্মু এদিক ওদিক দৌড়ে হরেক রঙের গাছ দেখলো, অবাক হলো। কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো, “মেরিন আপু… মেরিন আপু তুমি আমাকে এখান থেকে কোন গাছটা দিবে?”
টবে মাটি ভরতে ভরতে মেরিন জবাব দিলো, “ছোট ছোট লালফুলের কাঁটা গাছটা।”
জুম্মু নিমিষেই মন খারাপ করে শুধালো, “কাঁটা গাছ? তুমি আমাকে কাঁটা গাছ দিবে?”
“কেন? কাঁটা গাছে কি সমস্যা? গোলাপ গাছেও তো কাঁটা থাকে। অথচ গোলাপ ফুলকে আমার ফুলের রাণী বলি। কি, বলি না?”
জুম্মু বড় বড় নয়নে তাকালো। চোখ পিটপিট করলো। আশ্চর্য ভাবে কাঁটামুকুট গাছের ফুলগুলোর দিকে তাকালে তার মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। কাঁটার কথা আর মাথায় আসছে না।
গাছ নিয়ে জুম্মু চলে গেল। মেরিন থাকলো আরও কিছুক্ষণ। সূর্যের আলো তখন তীর্যক ভাবে পরছে। মেঘেদের বিস্তর বাহিনী একপাশ ঘিরে ধরেছে এইতো, এক্ষুণি। বাতাস বইছে ধীরস্থির ভাবে। মেরিনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। আনমনা মেরিন রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। চোখ বুজলো আকাশের দিকে মুখ করে। মনে মনে কি যেন গুণগুণ করে গাইলোও সে। এরপর… এরপর হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চমকে উঠলো মেরিন। তড়িৎ গতিতে পেছন ফিরে তাকালো। আগুনের ন্যায় জ্বলজ্বলে চুলের ব্যক্তি বড় আয়েশ করে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। পরনে সাধারণ ট্রাউজার, গেঞ্জি। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। মুখাবয়ব ঠিক গম্ভীর বলা যাচ্ছে না। শান্ত, বরং ভীষণ শান্ত। মেরিন ঢোক গিললো। হালকা সুরে বললো, “তারফান?”
খুব ধীর কণ্ঠস্বর। তারফানের অতদূর থেকে শোনার কথা নয়। সে শুনেওনি। তবে মেরিনের ঠোঁট নাড়ানো দেখে যেন বুঝে ফেললো। মাথা ঝুঁকিয়ে হাসলো। মৃদু, ক্ষীণ হাসি।
মেরিন সরু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার ডিউটি নেই? সারাদিন জিনের মতো ছাদে ঘুরঘুর করেন কেন?”
তারফান ওয়াহাজ ঠোঁট টিপে হাসলো। উত্তর দিলো না। পালটা প্রশ্ন ছুঁড়লো, “চিনলে কিভাবে?”
মেরিন বলতে চাইলো, “এমন পেঁচার মতো মুখ করে থাকলে যে কেউ চিনবে।” কিন্তু মুখে বললো, “আপনি আমার কথার উত্তর দিন আগে।”
“নাইট ডিউটি চলছে। দু'ঘণ্টা আগে ডিউটি থেকে ফিরেছি।”
“আপনি সেদিন আমাকে চিমটি কেটেছেন কেন?”
“কোনদিন?”
অবুজ কণ্ঠস্বর। চেহারাটাকে এমন ভোলাভালা বানিয়েছে যেন সত্যিই সে জানে না। নাটুকেপনা! মেরিন মুখ গোমড়া করে বললো, “পরশুদিনের আগের দিন। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়।”
“তোমার সাথে আমার সিঁড়িতে দেখা হয়েছিল?”
‘কনফিউশান’- শব্দটা যেন তারফানের মুখশ্রী চুইয়ে চুইয়ে পরলো। মেরিন তেঁতে উঠলো, “একদম অস্বীকার করবেন না। আপনি একটা মিথ্যুক! আমি কত ব্যথা পেয়েছিলাম জানেন?”
“জানি না।”
তারফানের ঠোঁটে তখনো সূক্ষ্ণ মিটিমিটি হাসি। চেপে রেখেছে। মেরিন এইতো, একটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারলো। এর আগে অবশ্য দেখার উপায় নেই। লোকটা একটা মিচকে শয়তান। জেনেবুঝে সব অস্বীকার করছে। বেত্তমিজ কি সে সাধে ডাকে?
তারফান নিজের পাশের ফাঁকা জায়গাটা দেখিয়ে বললো, “বসো।”
“আমি কেন আপনার সাথে বসবো?”
“বসবে না?”
মেরিন একপলক তারফানের মুখের দিকে তাকালো। এরপর পাশের ফাঁকা জায়গাটার দিকে। আমতা আমতা সুরে বললো, “ওখানে ময়লা।”
তারফান হাত দিয়ে ঝেরে দিলো জায়গাটা। যেন অসীম সমুদ্রের মতো ধুলোবালি মাখো মাখো জায়গাটার ঠুনকো কণা সরিয়ে মহৎ কাজ করে ফেলেছে—এমন নজরে তাকালো। বললো, “বসো।”
মেরিন বসলো। একহাতের মতো দূরত্ব রেখে। তারফান শুধালো, “টেস্ট করিয়েছ গলার?”
মেরিন জবাব দিলো, “হ্যাঁ।”
“আমাকে দেখাতে আনোনি কেন?”
“আমি চ্যাটজিটিপি থেকে দেখেছি, আমার সব ঠিকঠাক আছে। তাহলে আপনার কাছে আর যেয়ে কি করবো?”
তারফান কেমন করে যেন চোখ ঘোরালো। কেমন কেমন গলায় বললো, “গর্দভ!” এরপর আবার বললো, “পরশু থেকে আমার নাইট ডিউটি শেষ। রবিবারে রিপোর্ট নিয়ে আসবে।”
মেরিন এবার আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ আকাশ দেখলো। দুলতে থাকা তার গাছের পাতা দেখলো। তারফানকে দেখলো… লোকটা চোখ বন্ধ করে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আছে। সে আর মেরিন বসে আছে তবুও উচ্চতায় এত লম্বা লাগছে লোকটাকে! দৈত্য!
আচমকা খেয়াল হলো, তারফানের বাম হাতের তালুতে কেমন রক্ত ভেঁজা ব্যান্ডেজ। মেরিন সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলো, “আপনার হাতে কি হয়েছে?”
“কিছু না।”
“হু?”
“তুমি কখনো জোনাকিপোকা দেখেছো, মেরিন?”
অবাঞ্ছিত, আগামাথাহীন প্রশ্ন। রেলিংয়ে হেলে থাকা মাথা ঘুরিয়ে পৌরষ দৃষ্টি মেরিনের দিকে তাক করা। চোখদুটো শূণ্য, অনুভূতিহীন। অথচ এত ব্যক্তিত্বপূর্ণ।
মেরিন পলক ফেললো। উত্তর দিলো, “দেখেছি।”
“পছন্দ?”
“হ্যাঁ।”
তারফান আবারও চোখ মুদে ফেললো, “আমরা ভাইরা একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম। মেলায়। মায়ের আগে এত স্বাস্থ্য ছিল না। দূর্বল শরীর। তিন ভাইকে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলেন। বিকেলবেলার মেলা ছিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, রাত হলো, গভীর রাত। মেলার উলটো দিকে আমরা চলে গেলাম। শুনশান রাস্তা। ভয়ে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছি। নাক-মুখ কান্নায়-সর্দিতে ভেঁজা। হঠাৎ মায়ের ডাক শুনতে পেলাম। বিধ্বস্ত শাড়ি, নাক আর কপাল বেয়ে রক্ত ঝড়ছে। দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে না ধরে এমন মা'রা মে'রেছিলেন! ভয়ে আমরা আর কথাই বললাম না। মা আগলে আগলে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। বাড়ির ভেতরটা তখন এলোমেলো। সবকিছু ভেঙ্গেচুরে এদিক-সেদিক পরে আছে। মা আবার আমাদেরকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরলেন। জঙ্গলের মতো একটা নিরব, গুম জায়গায় নিয়ে এলেন। ওখানে এত এত জোনাকপোকা ছিল! টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আগুন যেন। আমি ভয় পাচ্ছিলাম। আমার ভাইরা ভয় পাচ্ছিল। কখনো এমন কিছু আগে দেখিনি তো! মা কিন্তু আমাদের মতো ভয় পাচ্ছিলেন না। হাসছিলেন।”
তারফান থামলো। মেরিনকে শুধালো, “জোনাকিপোকা দেখে তুমি কখনো ভয় পেয়েছো?”
মেরিন দু'দিকে মাথা নাড়ালো। সে ভয় পায়নি কখনো। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে কত কত বার জোনাকিপোকা দেখা হয়েছে। বাবার কোলে চরে জোনাকিপোকা ছুঁয়েছেও সে। বাবা থাকতে ভয় কিসের?
চিলেকোঠার ছোট্ট জানালার কাছে তালহা, তামজিদ দাঁড়িয়ে আছে। ছাদে উঁকিঝুঁকি মারছে। তামজিদের শরীরে আরেকটু হেলে দাঁড়িয়ে তালহা প্রশ্ন করলো, “তোর কি মনে হয়, তারফান মেরিনকে ভালোবাসে?”
“না।”
“কেন? মেরিন তো সুন্দর।”
তামজিদ কোণা চোখে তাকালো, “তোর পছন্দ?”
তালহা ভাবলেশহীন উত্তর দিলো, “হ্যাঁ।”
তামজিদ চমকে তাকাতেই তালহা হড়বড় করে বললো, “আরে এমনি পছন্দ হতে পারে না?”
“হুম, ভুলে গেছিলাম তোকে ডাস্টবিন থেকে আনা হইছে।”
তালহা সে কথা গায়ে মাখলো না। ফের প্রশ্ন করলো, “তুই কিভাবে বুঝলি তারফান মেরিনকে ভালোবাসে না?”
“তুই তারফানের চোখ দেখেছিস? আমরা জমজ হলেও, বিশেষ করে আমার আর তারফানের মধ্যে মিল থাকলেও আমাদের কিছু কিছু স্বভাব একদম আলাদা। তারফান যখন মায়ের দিকে তাকায়? ওর চোখে অভিমান আর রাগ খেলা করে। আমাদের দিকে তাকায় শান্ত চোখে। মাঝে মাঝে স্নেহ নিয়ে। কিন্তু মেরিনের দিকে তাকিয়ে আছে ব্ল্যাংক ভাবে। চোখের পর্দায় বড়সড় একটা গভীর দেওয়াল। কিচ্ছু নেই ওখানে।”
কানে তামজিদের কথা এঁটে তালহা ঠিক ঠিক তারফানের চোখের দৃষ্টি পরখ করলো, মিলিয়ে দেখলো। হ্যাঁ, ওই চোখদুটোয় শূণ্যতা ছাড়া কিচ্ছু নেই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………