হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ০৩ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          কিছু সময় পর আফজাল মেম্বারের সাথে ঘরে ঢুকলেন প্রভাবশালী রফিক সরকার, আজকের কন্যাদয়গ্রস্ত পিতা। লোকটার গায়ের রঙ রোদে পোড়া তামাটে, ও চলন গাম্ভীর্যপূর্ণ। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে, আর রাগে কপালে রগগুলো দপদপ করছে। তার পিছনে বল্লম, দা ও লাঠি হাতে চারজন জোয়ান। একটু আগপর্যন্ত তারা মাহিরদের খাতিরযত্ন করছিল আর এখন পারলে গলায় কো’প বসায়।

তিনি কোনো কথা না বলে সরাসরি বশিরের কলার চেপে ধরলেন এবং তাকে সজোরে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরলেন। বশিরের আম্মা আতঙ্কে মেঝেতে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

​রফিক সরকার দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন,
এতো বড় সাহস? শহর থেকে এসে আমার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিস? আমার মেয়েরে তোর ভাই মাঝপথে ফেলে পালাবে আর আমি বসে বসে আঙুল চুষব? তোদের বংশ আজ আমি পুতে দেব!

​বশির ভয়ে নীল হয়ে গেছে। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না দেখে মাহির দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রফিক সরকারের শক্ত কবজিটা খপ করে ধরে ফেলল। ওনারা রাজিবের পালিয়ে যাওয়ার আসল কারণ জানেও না। মাহিরেরও শোনার পর থেকে তীব্র বিতৃষ্ণা কাজ করছে কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া আপাতত বেশি জরুরী। সে হুংকারে দমে গেল না। শক্ত গলায় বলল,

​থামুন সরকার সাহেব! বশিরকে মেরে কোনো লাভ হবে না। আপনি বড় মানুষ। আপনার মান-সম্মান অনেক দামী। বশির রাজিবকে পালাতে সাহায্য করেনি। ও নিজেই এখন সর্বস্বান্ত। রাজিব কী করবে সেটা ও নিজেও জানত না। আপনি যদি এখন বশিরের ওপর হাত তোলেন, তবে খবরটা পাঁচ কান হবে। আমাদের ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা অতিথিদের বিদায় দিয়ে কাছের আত্মীয় স্বজনদের খুলে বলতে পারি। পুরোটা দোষ বশির স্বীকার করবে। আপনার মেয়ের কোনো অসম্মান হবে না।

-এইসব তামশা শহরে কাজে দিলেও এইখানে দিবে না। সবাই আমার উঠানেই থুতু ফেলবে। 

​রফিক সরকার মাহিরের দিকে হিংস্র চোখে তাকালেন। মাহিরের হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, তুমি কে হে?
 
মাহির অনিচ্ছা সত্ত্বেও জানাল, বশিরের বন্ধু।

-তোরা সবাই এক দলের। তোদের চক্রান্ত না থাকলে ওই ছোটলোক ছেলে আইসা, বিয়ের এক ঘন্টা আগে পালানোর সাহস পায় না। আজ তোদের কাউরে আমি জ্যান্ত এই গ্রাম ছাড়তে দেব না!

​আফজাল মেম্বার এতক্ষণ দরজার কাছে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। রফিক সরকারের কাঁধে হাত রেখে খুব নিচু সুরে বললেন,
রফিক ভাই শান্ত হোন। বাইরে মানুষের মেলা। আপনে এখানে চিল্লাচিল্লি করলে হুলস্থুল পড়ে যাবে। মানুষ জানলে তো আমাগো মেয়ের কলঙ্ক আরও বাড়বে। আপনে বাইরে গিয়ে মেহমানদের সামলান। আমি দেখতেছি।

-তুমি যে কি বা'ল করতে পারবা তা তো দেখলামই আফজাল!

আফজাল মেম্বার কাঁচুমাচু হয়ে গেলেন। নরম সুরে বললেন, 
আপনের রাগ জায়েজ ভাই। আমারই তো দোষ হইছে। কাফফারা দিমু তাই আমিই। আমি এদের ব্যবস্থা করতেছি।

​রফিক সরকার হাঁপাচ্ছিলেন। তিনি বশিরের দিকে আর একবার খুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে জোয়ানদের রেখে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

​আফজাল মেম্বার মাহিরের খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, কিন্তু তাতে এক ধরণের অমোঘ নির্দেশ। তিনি রাজিবের জন্য রাখা সেই সোনালী পাগড়িটা মাহিরের দিকে এগিয়ে দিলেন।

মাহির প্রথমে কোনো কথা খুঁজে পেল না। তার মনে হলো সে কোনো অবাস্তব স্বপ্ন দেখছে। কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতা কাটিয়ে সে এক কদম পিছিয়ে গেল, রাগে তার কপালে নীল রগগুলো জ্বলে উঠল।

​-আপনারা কি পাগল হয়ে গেছেন!

মাহিরের গলার স্বর ঘর কাঁপিয়ে আছড়ে পড়ল,
আমি এখানে এসেছি বন্ধুর ছোটভাইয়ের বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে, বর হতে নয়। এটা কোনো তামাশা না মেম্বার সাহেব! আপনি বলছেন আমি হুট করে একটা অপরিচিত মেয়েকে বিয়ে করে ফেলব? আমার নিজের একটা জীবন আছে, একটা পরিচয় আছে। আমি কারো দয়া বা পরিস্থিতির শিকার হতে এখানে আসিনি। একটু বাস্তবিক চিন্তাভাবনা করেন।

তিনি হিমশীতল গলায় বললেন,
বরযাত্রী যখন এসেছে, তখন বর সেজে কেউ একজন তো বিয়ের পিঁড়িতে বসবেই। শোনেন মাহির বাবাজি, আপনি শিক্ষিত ছেলে। রফিক ভাইরে আমি কোনোমতে বুঝাইয়া পাঠাইলাম। কিন্তু হের জেদ আমি চিনি। জুমার নামাজের পর প্যান্ডেলে বর না দেখলে ও নিজেই অ'স্ত্র নিয়া এই ঘরে ঢুকবে। তখন আমি চাইলেও আপনাদের বাঁচাতে পারব না।

​মাহির দৃঢ় স্বরে বলল, এটা তো অন্যায় মেম্বার সাহেব। আমি এখানে মেহমান। আমি কেন একটা অপরিচিত মেয়েকে বিয়ে করব? আমার নিজের একটা জীবন আছে, পরিবার আছে। 

​-পরিবার?

 মেম্বার সাহেব বিদ্রূপের হাসি হাসলেন, আপনার পরিবারের কাছে আপনার খবর যাওয়ার আগেই হয়তো এই নিশিখালি গ্রাম আপনাদের কবর হয়ে যাবে। আপনে কি বুঝতেছেন না আপনার বন্ধু নিজের জান বাঁচাতে এখন নিজের মা-রেও বেচতে রাজি? এই বিপদে আপনারেই হাল ধরতে হবে।

বশির মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখজোড়া শেয়ালের মতো ধূর্ত। কোন কুক্ষণে মাহির ওর সাথে এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিল!

মাহির বশিরের দিকে তাকাল। বশির তখন মাহিরের পা জড়িয়ে ধরে মেঝের ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে, 
মাহির, তুই রাজিবের বদলে বিয়েটা করে ফেল! তোকে ওরা পছন্দ করেছে। তুই রাজি না হলে ওরা আমাদের সবাইকে জ’বাই করবে রে! তোর পায়ে পড়ি মাহির, আমাকে বাঁচা!

​মাহিরের ভেতরটা ঘৃণায় কুঁকড়ে গেল। সে একবার জানালার বাইরে তাকাল। এখনো সেখানে প্যান্ডেলের মাইকে সুমধুর সানাই বাজছে। তার বিবেক, তার স্বপ্ন, তার ভবিষ্যৎ সবকিছু এখন এই গ্রামের অন্ধ ইজ্জতের কাছে বন্দি হয়ে গেছে।

​মেম্বার সাহেব মাহিরের কাঁধে হাত রাখলেন, 
বাবাজি বিয়েটা তো আর ফাঁসিকাষ্ঠ নয়। মেয়েটা আমাগোর কলিজার টুকরো। মোটেও ভাবাবেন না নষ্টা মেয়ে ধরিয়ে দিতেছি। চরিত্রের গ্যারান্টি আমি আফজাল মেম্বার! আজ তারে যদি আপনি উদ্ধার করেন, তবে নিশিখালি গ্রাম আজীবন আপনার কাছে ঋণী থাকবে। আর যদি না করেন... তবে আজ এই বাড়িতে বিয়ের সানাইয়ের বদলে শুধু কান্নার রোল উঠবে। আপনার হাতে মাত্র বিশ মিনিট সময়।

-কি আশ্চর্য! আমিই কেন? বশিরকে বলেন। সে তো রাজিবের আপন ভাই। তার দায় হলেও হতে পারে। আমি এর মাঝে কিভাবে আসলাম! 

-বশির? কেমন দোস্ত আপনে? বশিরের কথা বলতেছেন?
মেম্বার সাহেব গলার স্বর নিচু করে আরও কাছে এগিয়ে এলেন, 
বশির রাজিবের ভাই এইটা তো বড় কথা না। আপনি কি জানেন না আপনার এই পরম বন্ধুটি ডিভোর্সী? ওর ঘরে দুই দুইটা সন্তান আছে সেই খবর কি আপনি রাখেন না? আমার ভাতিজিকে কি আমি একটা দুই বাচ্চার বাপের হাতে তুলে দেব? রাজিবের চালচলন সুন্দর ছিল কিন্তু আর ওই পাতে মুখ দেওয়া যায় না। 

​মাহির স্তম্ভিত হয়ে বশিরের দিকে তাকাল। বশির তখন চোরের মতো মাথা নিচু করে আছে। বশির যে ডিভোর্সী এবং তার দুটো সন্তান আছে এই তথ্যটা বশির তার কাছে সবসময় গোপন করে গেছে।

​মেম্বার সাহেব এবার মাহিরের কাঁধে হাত রেখে খুব মোলায়েম সুরে বলতে শুরু করলেন, 
কিন্তু আপনার কথা আলাদা মাহির বাবাজি। আমি আদ্যোপান্ত জেনে নিছি। আপনি শিক্ষিত, আপনার চেহারায় আভিজাত্য আছে। আদব-লেহাজ তো নিজের চোখেই দেখলাম মাশাআল্লাহ! আপনার চাকরি কেবল শুরু, সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তার চেয়েও বড় কথা আপনারা শহরে নিজেদের পৈতৃক বাড়িতে সপরিবারে থাকেন। এমন একটা যৌথ পরিবারের শিক্ষিত ছেলের হাতে আমাগো মেয়ে তুলে দিতে পারলে রফিক ভাই শুধু শান্তই না, তিনি গর্ব বোধ করবেন।
রফিক ভাইকেও আমি তাই বুঝাইছি যে একটা কুলাঙ্গার গেছে তো কী হইছে, রাজিবের বড় ভাইয়ের বন্ধু মাহির সাহেব নিজেই আজ বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। আপনি ছাড়া এই মুহূর্ত এই আগুন নেভানোর মতো দ্বিতীয় কোনো যোগ্য লোক এইখানে নাই।

​মাহিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, যোগ্যতা থাকলেই কি একটা মানুষকে ধরে বেঁধে বিয়ে দেওয়া যায়? আমার সম্মতির কি কোনো দাম নেই?

​মেম্বার সাহেব বললেন, 
সম্মতির দাম থাকে যেখানে জীবনের নিরাপত্তা থাকে। আপনি কি ভাবছেন বাইরে দাঁড়ানো ওই দা-বল্লমওয়ালা লোকগুলো শুধু শোভাবর্ধন করতেছে? রফিক সরকাররে আমি যে যুক্তি দিয়া ঠেকাইছি, সেই একই যুক্তি দিয়া আপনারে প্রস্তাব দিতেছি। বশির বা ওর আম্মাকে মারলে রফিক ভাইয়ের হারানো ইজ্জত ফিরবে না, বরং আরও কেলেঙ্কারি হবে। কিন্তু একটা শিক্ষিত আর ভালো বরের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলে লোকে জানবে ছেলের পছন্দ হইছে তাই মেম্বার সাহেবরাই বিয়েটা অদলবদল করছে। এইটাই একমাত্র যুক্তি যেটা রফিক ভাইয়ের মাথা ঠান্ডা রাখছে।

​তিনি মাহিরের কাঁধে চাপ দিয়ে বললেন, 
আপনি শিক্ষিত মানুষ, অংকটা বুঝেন। একদিকে বশিরের পরিবারের ১০-১২টা লাশ আর আপনার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি, অন্যদিকে একটা সুন্দর মেয়ের জীবন বাঁচানো আর আপনার নিজের সুস্থ অবস্থায় ঢাকা ফেরা।

মাহিরের ভেতরটা অপমানে আর রাগে রি রি করছিল। সে বুঝতে পারল আফজাল মেম্বার তাকে খুব ঠান্ডা মাথায় একটা মরণফাঁদে ফেলেছেন। তাঁর যুক্তিগুলো যেমন কর্কশ, তেমনই অকাট্য।

তার ভেতরের আত্মসম্মানবোধ এবার তীব্রভাবে গর্জে উঠল। সে হাতের পাগড়িটা সজোরে খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে মেম্বার সাহেবের চোখের ওপর চোখ রাখল,
অংকটা আপনি ভুল করছেন মেম্বার সাহেব।

মাহিরের কণ্ঠস্বর এখন বরফশীতল, 
আপনি ভাবছেন আমি মেরুদণ্ডহীন? আপনি ভয় দেখাচ্ছেন? যুক্তি তো বলে আপনাদের মেয়ে একটা পলাতক ছেলের জন্য বিয়ের আসরে বসে আছে। যুক্তি বলে আপনাদের ইজ্জত এতটাই ঠুনকো যে একজন পথচারী সমতুল্যকে জবরদস্তি ধরে সেটা মেরামত করতে হয়।

​মেম্বার সাহেব কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু মাহির তাকে থামিয়ে দিয়ে বশিরের দিকে তাকাল,
বশির তুই ভাবলি কী করে আমি রাজি হবো? তোদের ফ্যামিলি রাজিবকে হ্যান্ডেল করতে পারেনি, তোরা তাকে জবরদস্তি করে এখানে এনেছিস সেই নোংরামি আমি কেন নিজের ঘাড়ে নেব? আর আপনি মেম্বার সাহেব, আপনি আমার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছেন? খুব ভালো কথা। একজন জলজ্যান্ত মানুষকে নিখোঁজ করে আপনি কি সত্যিই নিশিখালি গ্রামকে একটা পুলিশি তদন্তের মুখে ফেলতে চান?

​মেম্বার সাহেবের চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি দেখা দিল, কিন্তু তিনি দমে গেলেন না।

​-পুলিশ? প্রশাসন?
মেম্বার সাহেব মৃদু হাসলেন,
বাবাজি এই গ্রাম থেকে বড় রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে তিনটা বাঁশঝাড় আর দুইটা বিল পার হতে হয়। শীতের এই কুয়াশায় মানুষ নিজেই নিজের হাত দেখতে পায় না, পুলিশ তো দূরের কথা। আর নিখোঁজ? আপনি নিখোঁজ হবেন কেন? আপনি তো হাসিমুখে বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকা যাবেন। আমরা তো আপনারে সম্মান দিচ্ছি।

মেম্বার সাহেব আবার খুব নরম সুরে বললেন, 
আমি চাই না কোনো অঘটন ঘটুক। আপনি শিক্ষিত, সুন্দর ছেলে। আমার ভাতিজি সেও শুধু সুন্দরী না, অনেক গুণবতী। আপনি একবার তারে দেখলে বুঝবেন সে আপনার যোগ্য। আপনে ফিরায় দিলে নদীতে ডুবে মরা ছাড়া তার আর কিছু করার থাকবে না। গ্রামের মেয়েরা এইসব অপমান-অপবাদ সহ্য করতে পারে না।

মাহির অনুভব করল তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার যুক্তি আর জেদ সবকিছু এক শেকড়হীন আদিম শক্তির কাছে হার মানছে। তার চোখ দুটো এখন শূন্য।

​-মেয়েটা কি জানে? 

মাহির খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, সে কি জানে তার স্বামী বদলে যাচ্ছে?

​মেম্বার সাহেব ভাবলেশহীন গলায় উত্তর দিলেন, এইটা জানার তার দরকার নাই। মুসলমানের মেয়ের বিয়ে তো হয় কবুলের মাধ্যমে। এর আগে কি হইছে, কার সাথে হইছে তা ভিত্তিহীন। কাজি সাহেবের খাতায় আপনার নামই উঠবে। আইরিন শুধু জানবে তার ভাগ্য আজ নতুন মোড় নিল।

​মাহির দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। 

—————

আইরিন কলপাড়ে বসে নিজের শরীরের হলুদের প্রলেপগুলো ঘষে ঘষে তুলছিল। পৌষের এই কনকনে ঠান্ডা পানি তার গায়ে তীরের মতো বিঁধছে, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। উঠানে যখন বরের পালিয়ে যাওয়ার খবর নিয়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছে, আইরিন তখন ধীরপায়ে কলপাড়ে চলে এসেছে। তার গোসলটা সেরে নেওয়া দরকার।

​কামিনী ভয়ে ভয়ে তার আপাকে পানি তুলে দিচ্ছে আর আড় চোখে চাইছে। আপার চেয়ে বেশি শোক তো প্রতিবেশীরা দেখিয়ে দিয়েছে বুক চাপড়ে কেঁদে। 

আইরিনের বাসন্তী রঙের শাড়িটা পানিতে ভিজে তার তামাটে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সে যখন বালতি থেকে মগ ভরে ঠান্ডা পানি নিজের মাথায় ঢালল, তখন তার পুরো শরীর শিউরে উঠল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, বরং এক ধরণের বিচিত্র নির্লিপ্ততা। সে ভালো করেই জানে এই শীতের সকালে যে বর তাকে একা ফেলে পালিয়ে গেছে, সে আসলে তার জন্য ছিলই না।

​কলপাড়ের পাশেই কুলসুম বেগম দাঁড়িয়ে ছিল। কুলসুম বেগম আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদছেন। তাঁর চোখেমুখে ঘোরতর অনিশ্চয়তা। আইরিন বিরক্ত হয়ে বলল, ফ্যাচ ফ্যাচ করা বন্ধ করবা না? যাও খালাদের ধরে কান্না করো। এখানে থেকে মাথা ধরিয়ে দিচ্ছো আমার।

 তিনি কান্নারত গলায় বললেন,
 এই মরণ-ঠান্ডায় নিজের শরীরে এমন কইরা পানি ঢালিস না মা। বর পালানোর খবর পাইয়া কি তোর মাথাটা খারাপ হইয়া গেল? বিয়েটা ভেঙে গেছে বইলা এমন করিস না।

-ধূর! ক্ষুদায় মরে যাচ্ছি। ভালো-মন্দ যা রান্না হয়েছিল, আমাকে গরম করে দাও। এক কাপ কড়া লিকারের দুধ চা দিও সাথে। আর আমার ঘরটা খালি করাও। খালা-চাচী-মামী-ফুফু সবাইকে বিদায় করো।

-এমনে বলে বেয়াদব!

-আচ্ছা তো নিজের ঘরে নাও,সেখানে গীবত কন্টিনিউ করুক। আমার ঘর খালি করো। আমি খেয়ে ঘুমাবো। বিরক্ত লাগছে এখন। আরে তুমি ফোঁপানো বন্ধ করবা? 

-আমার মেয়েটার কপালেই খোদা….

​আইরিন একটা মগ ভর্তি পানি নিয়ে নিজের ঘাড়ের ওপর ঢালতে ঢালতে শান্ত গলায় বলল,
প্যারা নিও না তো। যা হয় ভালোর জন্যই হয় মনে নাই? মধ্যে দিয়ে টাকা পয়সা কতগুলো খরচ হলো কিন্তু আপদ বিদায় করতে পারো নাই।

​কামিনী তার আপার এই শান্ত রূপ দেখে আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, 
আপা, আব্বা তো বাইরে সবার ওপর চড়াও হয়েছে। তুমি অন্তত ঘরে চলো।

​আইরিন কোনো উত্তর দিল না। সে নখ দিয়ে ঘষে ঘষে হাতের মেহেদির রং হালকা করার চেষ্টা করছিল। সহজে উঠবে বলে মনে হয় না। 

 তার তামাটে ত্বকে পানির কণাগুলো রোদের আলোয় মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করছে। সে যখন নিজের ভেজা চুলগুলো ঝাড়ছিল, ঠিক তখনই বাড়ির সদর দরজার দিক থেকে একটা শোরগোল ভেসে এল।

​কাসিফ হাপাতে হাপাতে দৌড়ে কলপাড়ে এল। তার চোখেমুখে প্রচণ্ড উত্তেজনা। সে চিৎকার করে বলল,
মা! আপা! কামিনী আপা! তোমরা এখানে কী করো? জলদি চলো! বাবা আর মেম্বার চাচা ডাকে।

​কুলসুম বেগম চোখ মুছে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বদ পোলা ঠিক মতো বল? মেম্বার সাহেব কি বশিরদের বিদায় করে দিছে? নাকি মারামারি লাগছে?

​কাসিফ হেসে বলল, আরে না! বিয়ে হবে মা! মেম্বার চাচা বলছে বর রেডি। ওদের নামাজ পড়া শেষ। কাজি সাহেবরে খবর দেওয়া হয়েছে। জুমার পরেই আকদ হবে!

​আইরিনের হাতের মগটা মেঝেতে পড়ে গেল। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে কাসিফের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই নির্লিপ্ততা এক নিমেষে একরাশ বিস্ময় আর অবিশ্বাসে বদলে গেল।

​-বর রেডি মানে? 

আইরিন অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, রাজিব তো পালিয়েছে। তবে বর আসলো কোত্থেকে?

​উত্তেজিত কাসিফ ততক্ষণে মায়ের হাত ধরে টানতে শুরু করেছে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, আমি জানি না। মেম্বার চাচা বলছে নতুন বর রাজিবের চেয়েও সুন্দর। সাহেবের মতো লাগে। একদম রাজপুত্তুর। আপা, তুমি তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করো। ফুপু বলছে নতুন করে সাজাতে হবে!

​আইরিন একা কলপাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেজা শরীর দিয়ে ঠান্ডা পানি চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু এখন আর তার শীত লাগছে না।

—————

আইরিন এক ঘোরলাগা জগতের বাসিন্দা হয়ে গেল। মাত্র কয়েক মিনিট আগে যে মেয়েটি কনকনে ঠান্ডা পানিতে নিজের শরীরের প্রতিটি হলুদের দাগ ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেলছিল তাকেই এখন হিড়হিড় করে টেনে ঘরে আনা হয়েছে।

​ঘরের ভেতর তখন সাজসজ্জার নামে এক এলাহি কাণ্ড চলছে। কুলসুম বেগম আলমারি থেকে লাল বেনারসিটা বের করতে গিয়ে ঘর কাঁপিয়ে ফেললেন। দামী কাপড়টা মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। কামিনী পাগলের মতো এদিক-ওদিক দৌড়ে প্রসাধনী খুঁজে বের করল।

​আইরিনকে সেই ভেজা শাড়িতেই তক্তপোশের ওপর বসতে দেখে মা মেয়ে শাড়ি পাল্টাতে তাড়া দিতে লাগল। কুলসুম বেগম আঁচল ধরতেই আইরিন বিরক্ত হয়ে বলল, মা মেয়ে কি শুরু করলা? শাড়ি ধরে টানাটানি করছো কেন? 

আইরিনের ফুপু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিলেন। তিনি হেসে বললেন, শরম করে নাকি? রাতের বেলা যখন স্বামী টান দিবে সেই বেলা কিন্তু আবার এমনে গরম দেখাইস না। বাপের ভিটায়-ই মেয়েগো দেমাগ চলে।

আইরিন ফুপুকে শক্ত দুটো কথা বলতে গিয়েও বলল না। 

কিন্তু তিনি বলতে থাকলেন, কপালটা তোর কি যে ভালা। দেইখা আসছি, একদম তাগড়া যুবক। ভদ্র-সভ্য আছে। তয় মন মেজাজ ভালা দেখলাম না….

কুলসুম বেগম নরম স্বভাবের। কোনোকালেই কারো উপরে কথা বলতে পারেন না। এই ননাসের সাথে তো জীবনেও না। তাও সে মেয়ের মাথা ঠান্ডা করার জন্য বলল,
 আপা এইসব পড়ে কথা হবে। পুরুষ মানুষরা আইসা সব অগোছালো দেখলে আপনার ভাই সবার উপরে চেতবে।

আইরিনের কোমড় ছাপানো ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ে নতুন বেনারসির আঁচল ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু কারোর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কামিনী একটা তোয়ালে দিয়ে কোনোমতে আইরিনের পিঠ আর মুখটা মুছে দিল। আইরিনের মুখে কোনো রা নেই।

​কামিনী যখন আইরিনের মুখে মেকআপের ছোঁয়া দিতে চাইল, আইরিন চোখ রাঙিয়ে হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। চোখের কাজল লেপ্টে একাকার হয়ে গিয়েছিল, কামিনী সেটা মুছে দিয়ে খুব গাঢ় করে নতুন কাজল টেনে দিল। কালো রেখা আইরিনের টানা চোখের তামাটে মুখশ্রীকে আরও রহস্যময় করে তুলল।

​কামিনী যখন তার পায়ে আলতা মাখাচ্ছিল, তখন বাইরে থেকে অনেকগুলো মানুষের গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর জুতোর খটখট শব্দ শোনা গেল।
​-এই! কাজি সাহেব আসছেন! বসেন বসেন। কাসিফের আম্মা ভাবী কই?

 
আফজাল মেম্বারের উচ্চকণ্ঠ সারা বাড়ি কাঁপিয়ে দিল। ​মুহূর্তের মধ্যে ঘরের দরজা ঠেলে মেম্বার সাহেবের সাথে বয়স্ক একজন লোক ঢুকলেন। দূরে পেছনে রফিক সরকার দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চেহারায় অপমানের বদলে এক ধরণের ক্রূর তৃপ্তি।

​কাজি সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আইরিনের সামনে বসলেন। আফজাল মেম্বার তাগাদা দিয়ে বললেন,
-কাজি সাহেব সময় পার হয়ে যাচ্ছে। জলদি সই-সাবুদ নেন।

​কাজি সাহেব খাতাটা খুললেন। আইরিনকে উচু স্বরে প্রশ্ন করলেন, মা আইরিন জাহান সরকার, মাহির আহমেদের সাথে দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে আপনার এই বিয়েতে কি সম্মতি আছে?

​আইরিন থমকে গেল। মাহির আহমেদ নামটা তার কানে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এ আবার কোন আল্লাহর বান্দা! রফিক সরকারের সাথে তার এক দফা চোখে চোখ পরল।

​কামিনী আইরিনের হাতটা জোরে চিমটি কাটল। কুলসুম বেগম আইরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, কও মা! কবুল বলো।

​আইরিন একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। নাম রাজিব হোক কিংবা মাহির, তার বিশেষ কিছু যায় আসে না। তার ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। সে খুব অস্ফুট স্বরে বলল, কবুল।

তারপর দৃঢ় ও স্পষ্ট স্বরে আরো দু'বার বলল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।

​নিকাহনামার কাগজে সই করার সময় আইরিনের হাতটা কাঁপছিল। সে জানে না এই সই তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। সে শুধু দেখল, কাগজের ওপর তার নামটা আর মাহির নামের সেই অচেনা লোকটার নামটা পাশাপাশি বসে গেছে।
​কাজি সাহেব খাতাটা সশব্দে বন্ধ করে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। সরকার সাহেব, এবার বরকে আনতে পারেন। দোয়া হবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp