হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ০২ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          সকালে হইচই শুনে মাহিরের ঘুম ভাঙল। ভারী জানালার পাল্লার ফাঁক দিয়ে সরু এক চিলতে রোদ এসে সরাসরি তার চোখের ওপর পড়েছে। মেম্বার বাড়ির বৈঠকখানা ঘরটায় এখন তিল ধারণের জায়গা নেই, সেখানে মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। বাচ্চাদের চিৎকার, বড়দের হাকডাক আর বাইরে থেকে আসা যাবতীয় শব্দ মিলেমিশে হট্টগোল তৈরি হয়েছে।

​মাহির ধড়ফড় করে উঠে বসল। পাশের বিছানায় রাজিব বসে আছে। তার চোখ দুটো লালচে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও সে চোখের পাতা এক করেনি। রাজিবের এই মূর্তিমান বিষণ্ণতা মাহিরের মনে খটকা লাগল। কিন্তু রাজিবের সাথে কোনোকালেই তেমন কথাবার্তা হয়নি তার। অনাধিকার চর্চার প্রতি তাই সে আগ্রহ দেখাল না। এমন ও হতে পারে আজকের পর শহরে ফিরে আর কখনো তাদের দেখা না হয়।

​ঘর থেকে বেরোতেই বারান্দায় বশিরের সাথে দেখা হয়। সে দাঁত মাজতে মাজতে বলে,
উঠেছিস? চল চল, জলদি নাস্তা করে নে। সময় বেশি নেই। ওইদিকে মহিলারা রাজিবকে হলুদ ডলতে নিয়ে যাচ্ছে। ঝটপট গোসল সেড়ে তৈরি হয়ে নে। কবুলের পর মেয়ে নিয়ে আজকেই রওনা দিব। এইখানে এডজাস্ট হচ্ছে না।

​বৈঠকখানার টেবিলে শ্বেতপাথরের থালায় ধোঁয়া ওঠা নারকেলের পিঠা সাজানো, খেজুর গুড়ের মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশে বাটিতে রাখা কষানো গরুর কলিজা ভুনা আর সাথে চালের রুটি। 
​খাওয়া শেষে আফজাল মেম্বার নিজেই তদারকি করে পাঠালেন কড়া লিকারের চা। কাঁচের গ্লাসে চায়ের ওপর দুধের ঘন সরের একটা আস্তর পড়ে আছে। চায়ে চুমুক দিতেই মাহিরের শরীরের সব আলস্য যেন এক নিমেষে উবে গেল। 

​নাস্তা শেষ করে মাহির ফ্রেশ হতে চাইল। কিন্তু ভেতর বাড়ির বাথরুমের দিকে গিয়ে দেখল সেখানে মহিলাদের লম্বা লাইন। দরজা খোলার কোনো লক্ষণ নেই। একপাশে যে কলপাড় আছে, সেখানেও চারেক লোক গামছা কাঁধে অপেক্ষা করছে।

​বশির মাহিরের কাঁধে একটা নতুন গামছা ছুড়ে দিয়ে বলল,
ভেতরের আশা ছেড়ে দে। বাড়িতে মেহমান অনেক, বাথরুম সব দখল হয়ে আছে। তুই বরং পেছনের পুকুরঘাটেই চলে যা। পুকুরের পানি এখন খুব পরিষ্কার, আর শীতের সকালে পুকুরের পানিতে গোসলের মজাই আলাদা। 

-এই ঠান্ডায় জমে যাব না?

-ব্যাটা-ছেলেদের কাছে এইসব কোনো ব্যাপার? ধূর বলদা।
​মাহির আর কথা না বাড়িয়ে সাবান আর তোয়ালে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হলো।

​কাল রাতে যে কুয়াশা ছিল, তা এখন শিশির হয়ে জমে আছে ফুল-পাতার ডগায়, ডগায়। তার পায়ের পাতা শিশিরে ভিজে একাকার হয়ে গেল। পথের দুপাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো লতা আর ঝোপঝাড়ের ওপর রোদের ঝিলিক পড়ছে। 

​পুকুরঘাট মাহিরের মনে হলো গত সন্ধ্যার তুলনায় আজ অন্যরকম লাগছে। বড় পুকুরটার তিন দিক ঘিরে আছে ঘন বাঁশঝাড় আর পুরোনো আম-কাঁঠালের বাগান। বাঁশের কঞ্চিগুলো উত্তুরে হাওয়ায় নাজেহাল হলেও, পুকুরের পানি আয়নার মতো স্থির।

​ঘাটের সিঁড়িগুলো পুরোনো ইটের তৈরি, খাঁজে খাঁজে সবুজ শ্যাওলা জমে আছে। মাহির সিঁড়ির এক পাশে তোয়ালে রেখে প্রথম ডুব দিল। কনকনে ঠান্ডা পানিতে তার পুরো শরীর শিউরে উঠল। কিন্তু কয়েকবার ডুব দেওয়ার পর শরীরটা বেশ সতেজ আর হালকা হতে লাগল।

—————

পুকুরঘাট থেকে ফিরে মাহির নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা খুলল। মেম্বার বাড়ির বৈঠকখানা ঘরটা এখন একটু খালি, সবাই বাইরের প্যান্ডেলে ব্যস্ত। সে তার সাদা ধবধবে সুতির পাঞ্জাবি আর পায়জামাটা পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে লক্ষ্য করল, 
পাশে রাখা রাজিবের ব্যাগটা নেই। সে ভাবল, হয়তো বশির এসে রাজিবের কাপড়চোপড় অন্য ঘরে নিয়ে গেছে।

​পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে মাহির জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রোদ আরও কড়া হয়েছে। হঠাৎ বশির ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। মুখে হাসি নেই, বরং অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। সে ঘরে ঢুকেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে মাহিরকে ধরল।
​-কিরে মাহির, রাজিব কই?

 ​মাহির অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়াল, 
আমি কী করে জানব? আমি না গোসল করতে গেলাম? ফিরে এসে দেখি ও ঘরে নেই। আমি ভাবলাম তোদের সাথে প্যান্ডেলে গেছে।

​বশিরের কপাল কুঁচকে গেল। সে ঘরের কোণার আলমারি আর খাটের নিচে একবার উঁকি দিয়ে বলল, 
প্যান্ডেলে তো নেই-ই, পুরো বাড়িতে কোথাও নেই। আমি তোকে গোসল করতে পাঠানোর কিছুক্ষণ পরেই ওকে বললাম তোয়ালে নিয়ে তোর পিছু পিছু যেতে। মেম্বার বাড়ির ভেতরে ভিড় দেখে বললাম তুই যে পুকুরে গেছিস ও যেন সেখানেই যায়। ও তো তোর পরেই বের হলো!

​-আমার পেছনে? আমি তো পুকুরঘাটে একাই ছিলাম। পুরোটা সময় ওখানে কাউকেই দেখিনি। ও যদি আসত, তবে পথেই তো দেখা হওয়ার কথা!

​বশিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দ্রুত রাজিবের নাম্বারে ডায়াল করতে লাগল। ঘরভর্তি নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু ফোনের ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ শোনা গেল - আপনার কলকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।

​বশির ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে নিচু স্বরে গালি দিয়ে বলল, হারামজাদাটা কি শেষে এই কাজটাই করল? ফোন অফ কেন?

​-শান্ত হ বশির। হয়তো চার্জ শেষ বা নেটওয়ার্ক নেই।

 মাহির ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, যদিও সে নিজেও মনে মনে রাজিবের সকালের ফ্যাকাশে মুখ মনে করে শিউরে উঠছে।

​বশির মাহিরের হাত শক্ত করে ধরল, 
না মাহির। তুই আয় আমার সাথে, চুপিচুপি একবার পেছনের বাগান আর গোয়ালঘরটা দেখে আসি। বাড়িতে জানাজানি হলে মেম্বার সাহেব আর কনে পক্ষের লোকজন হুলস্থুল বাঁধিয়ে দেবে। আমাদের ইজ্জত থাকবে না।

​মাহির আর বশির নিঃশব্দে পেছনের দরজা দিয়ে বের হলো। তারা মেম্বার বাড়ির বাগ আর খড়ের পালুইয়ের আড়ালে রাজিবকে খুঁজতে লাগল। মাহিরের মনে বারবার সেই খড়খড়ি তোলা জানালার কথা উঁকি দিচ্ছিল। রাজিব কি তবে পালিয়ে যাওয়ার আগে কাউকে কিছু বলে গেছে? নাকি নিশিখালির কুয়াশার মতো সেও কোথাও মিলিয়ে গেল?

​পুরো দশ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর যখন কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না, বশির ধপ করে উঠানের কাঠের গুড়ির ওপর বসে পড়ল। তার দুহাতে মুখ ঢেকে সে শুধু বিড়বিড় করে বলল,
 সর্বনাশ হয়ে গেল রে মাহির! কনে পক্ষ আর মেম্বার সাহেব জানলে আমাদের আস্ত রাখবে না। এখন আমি কী জবাব দেব?

মাহির বশিরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বশিরের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আর গলার স্বরে হাহাকার। মাহির কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

​-বশির রাজিব এমন কাজ কেন করল বল তো? ও কি সত্যিই পালিয়ে গেল? মানে, কোনো কারণ ছাড়াই ও এমন একটা কাজ কেন করবে?

​বশির মুখ থেকে হাত সরাল। তার চোখ দুটো এখন রাগে জ্বলছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফেটে পড়ল, 
ওই হারামি একটা বাজে মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। শহরের কোনো এক প’তি’তা পল্লীর মা’গির সাথে ওর সম্পর্ক। চিন্তা কর খালি! আম্মা শোনার পর ওকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার মতো করে গ্রামে নিয়ে এসেছে। ভেবেছিলাম বিয়েটা দিলে ওর মাথা ঠিক হবে, কিন্তু কুলাঙ্গারটা আমাদের বংশের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিয়ে পালাল!

​বশিরের কথা শুনে মাহির কয়েক মুহূর্ত স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে বিতৃষ্ণা কাজ করতে শুরু করল। সে বশিরের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, 
তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে বশির? ও একটা মেয়েকে পছন্দ করে আর তোরা ওকে জোর করে অন্য জায়গায় বিয়ে দিচ্ছিস? রাজিব কাল যেভাবে মূর্তির মতো বসে ছিল, আজ সকালে ওর চোখ যেভাবে রক্তবর্ণ হয়ে ছিল এগুলো কি তোদের চোখে পড়েনি? ও যে স্বাভাবিক ছিল না, সেটা তো পাগলও বুঝবে!

​বশির হুট করে মাহিরের দিকে তেড়ে এল। তার গলার রগ ফুলে উঠেছে, 
ওহ! তার মানে ও যে অস্বাভাবিক ছিল সেটা তুই জানতি? ও যে উল্টাপাল্টা কিছু একটা করবে সেটা তোর মাথায় ছিল? তাহলে তুই আমাকে আগে বললি না কেন? তুই তো সারা রাত ওর সাথে একই খাটে ছিলি! তুই আমাকে একবার খবর দিলে আমি ওকে পাহারা দিয়ে রাখতাম, ও পালানোর সুযোগ পেত না!

​বশিরের এমন অযৌক্তিক অভিযোগে মাহির অবাক হয়ে গেল। সে রাগে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। 
-তুই আমাকে দোষ দিচ্ছিস? আমি কে? আমি তো মেহমান হয়ে এসেছি বশির। তোরা ওকে জোর করে পিঁড়িতে বসাচ্ছিস, আর আমি কেন তোদের এই নোংরা পারিবারিক ক্যাচাল সামলাবো? ও সারা রাত ঘুমাতে পারেনি বা ও কাঁদছিল কি না আমি জানি না। আমি ভেবেছিলাম বিয়ের আগে মানুষ নার্ভাস থাকে। কিন্তু ও যে এমন করে বাঁচতে পালাবে, সেটা আমি কীভাবে জানব?

​-জানতি না মানে?
 বশির এবার মাহিরের পাঞ্জাবির কলার ধরতে চাইল,
 তুই কেন আমাকে সতর্ক করলি না? এখন যদি মেম্বার সাহেবের লোকজন আমাদের ছিঁড়ে ফেলে, তার দায় কি তুই নিবি? ওই মেয়েটার জীবন যে নষ্ট হলো, তার জবাব কি তুই দিবি?

​মাহির বশিরের হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে ঘৃণা।
 -ভুলেও ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করবি না। আমরা আর বাচ্চা নই। এই মেয়েটার জীবন তোরা নষ্ট করেছিস বশির। একটা ছেলে যে অন্য কাউকে ভালোবাসে, তার গলায় জোর করে মালা পরানো কি অপরাধ নয়? আর তুই এখন বড় বড় কথা বলছিস? নিজের ভাইকে চিনতে পারিসনি, আর এখন সব দোষ আমার কাঁধে দিচ্ছিস?

​বশিরের রাগ অসহায়ত্বে পরিণত হয়েছে। সে আবার কাঠের গুড়ির ওপর বসে পড়ল। দূর থেকে প্যান্ডেলের মাইকে বিয়ের গীত শোনা যাচ্ছে। সানাইয়ের সুরটা এখন মাহিরের কাছে বিদ্রূপের মতো মনে হচ্ছে।

​বশির বিড়বিড় করে বলল, 
এখন তর্ক করে লাভ নেই মাহির। মেম্বার সাহেব একটু পরেই বরের খোঁজ নিতে আসবেন। তিনি জানলে আজ এই গ্রামে রক্তারক্তি হবে। তুই আমাকে বাঁচা মাহির, কোনো একটা বুদ্ধি বের কর।

​মাহির বশিরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

—————

সরকার বাড়ির ভেতরের উঠানে বড়ো মেয়ের গায়ে হলুদের আয়োজন চলছে। উঠানের মাঝখানে চারটা বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার ওপর একটা নীল-লাল রঙের সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। রোদে সামিয়ানার ছায়া উঠানের ওপর এসে পড়েছে। মেঝেতে সবার জন্য বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটা শীতল পাটি। 

​কনে বসে আছে পুরোনো আম কাঠের জলচৌকিতে। তার পরনে বাসন্তী রঙের একটা সুতি শাড়ি। তার কোমড় ছাপানো চুলগুলো আলগোছে বেণী করা, আর সেই বেণীর ভাঁজে ভাঁজে তার ছোট বোন বাগান থেকে তুলে আনা টাটকা গাঁদা ফুল গেঁথে দিয়েছে। 

তার মুখটা একদম শান্ত। কোনো কথা বলছে না, শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দুহাতে মেহেদির নকশা। বড় বড় শ্বেতপাথরের থালায় হলুদ, চন্দন বাটা রাখা হয়েছে। পাড়ার মহিলারা পানের বাটা নিয়ে গোল হয়ে বসেছেন। তারা একটার পর একটা পান সাজাচ্ছেন আর নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছেন। মাঝেমধ্যে দুই-একজন প্রবীণ মহিলা সুর করে বিয়ের গীত গাইছেন। 

নয়া বরের লাগি রে... পান সাজাও বিবি জান...
আতর গোলাপ দিয়া রে... ঘর সাজাও বিবি জান...

​পাটির একপাশে বড় বড় থালায় নাস্তা সাজানো হয়েছে। তালের রস আর নারিকেল দিয়ে বানানো সাজ পিঠা, বড় বাটিতে নলেন গুড়ের সন্দেশ আর কাঁচের বয়ামে রাখা লম্বা লম্বা মুরালি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিঠা হাতে নিয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। 

​পাড়ার সম্পর্কের এক দাদী এক বাটি দুধ-হলুদ নিয়ে তার সামনে বসলেন। তিনি এক চিমটি হলুদ নিয়ে গালে আর কপালে মাখিয়ে দিলেন। দাদী হাসিমুখে বললেন, 
আমগো আইরিনের মুখটা এমন গম্ভীর কইরা রাখছিস ক্যান? জামাই তো ডরে ভো দৌড় দিবো। 

সে কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু একবার তার হলুদে মাখা হাতের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো আনন্দ নেই। সে চুপচাপ জলচৌকিতে বসে রইল। ঠিক এই সময়ে সদর দরজা দিয়ে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে একদল মানুষ ঢুকল। তাদের মাথায় বড় বড় বাঁশের ডালা। ডালাগুলো রঙিন কাগজে মোড়া। ডালার ভেতরে বড় একটা রুই মাছ, কয়েক রকমের মিষ্টি আর দামী শাড়ি-গয়না দেখা যাচ্ছে। গ্রামের যুবকরা ডালাগুলো উঠানের মাঝখানে নামিয়ে রাখল।
কামিনী এসে তার আপার হাতে ভয়ে ভয়ে গাজরা বেঁধে দিল। তারপর বলল, আপা তোমার কি ক্ষুদা লেগেছে?

কোনো উত্তর এলো না। কারণ তার মনোযোগ উঠানে দাড়ানো তার বাবার কাছে। আফজাল মেম্বার এসে তাকে কি যেন বলতে লাগলেন আর বাকবিতন্ড শুরু হয়ে গেল।

আইরিন নির্লিপ্ত হয়ে কামিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলি বুড়ি দাদীর কথার কিন্তু জোর আছে। আসলেই বর গায়েব হয়েছে। আহারে! 

—————

মাহির আর বশির যখন উপায় খুঁজতে ব্যস্ত ঠিক তখনই মেম্বার বাড়ির ভেতর থেকে বশিরের আম্মার আর্তচিৎকার শোনা গেল। নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি দিশেহারার মতো উঠানে এসে দাঁড়িয়েছেন। মাহির আর বশির দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরতেই দেখল এক হুলুস্থুল কাণ্ড।

​বশিরের আম্মা রাজিবের রেখে যাওয়া চিরকুটটা হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন। চিরকুটটা বিছানার ওপর পড়ে ছিল। বশির তার আম্মার হাত থেকে সেটা প্রায় কেড়ে নিয়ে পড়ল। রাজিব লিখে গেছে, সে তার পছন্দ করা মেয়ে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। আর পরিবারের এই জোর সে আর নিতে পারছে না। মুহূর্তের মধ্যে খবরটা দাবানলের মতো পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল।

আফজাল মেম্বার এতক্ষণ বাইরে মেহমানদের তদারকি করছিলেন। শোরগোল শুনে তিনি ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। তার পরনের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর কাঁধের দামী শালটা তার কর্তৃত্বের প্রতীক। তিনি বশিরের হাত থেকে চিরকুটটা নিলেন। তার শান্ত চোখের দৃষ্টি এক নিমেষে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল, 
বশির বাবাজি প্যান্ডেলে কাজি সাহেব এসে বসে আছেন। আপনারা দুই বন্ধু এখানে বাগানের নির্জনে কী করতেছেন? বর কই? রাজিবরে তো কোথাও দেখতেছি না।

​বশিরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, চাচা... আসলে রাজিব... ও একটু অসুস্থ বোধ করছিল। আমি ওকে একটু হাওয়া খেতে পেছনে পাঠিয়েছি।

মাহির বুঝে পেল না যে এখন মিথ্যে বলে কি লাভ! 

​মেম্বার সাহেব তার তীক্ষ্ণ চোখে বশিরকে একবার মেপে নিলেন। তারপর মাহিরের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বললেন, 
হাওয়া খেতে পাঠিয়েছেন নাকি ও হাওয়া হয়ে গেছে? খোঁজ নিয়া শুনলাম, আপনাদের মাইক্রোবাসের ড্রাইভার গাঁয়ের মোড়ে দাঁড়িয়ে বলতেছ যে রাজিব সাহেব ব্যাগ হাতে বড় রাস্তার দিকে দৌড়ে গেছে। কথা কি সত্য? 

বশির তটস্থ হয়ে তার আম্মার দিকে তাকাল। তিনি গাঁইগুঁই পরে আফজাল মেম্বারকে অনুরোধ করা মাত্রই জোরাল ধমক খেলেন, 
এরজন্যই ছোটলোকদের উপকার করতে নেই বুঝছেন তো বশিরের আম্মা? হেরা মর্ম বুঝে না। চড়া সুদ সমেত গলায় পাড় দিয়া ফেরত নিতে হয়।

 তিনি পানের পিক ফেলে ভারী গলায় বললেন, 
বশির আমাদের নিশিখালি গ্রামের ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে ঘটে নাই। বরযাত্রী নিয়ে এসে তোমরা আমাদের সাথে তামাশা করতেছ? 

বশিরের এমন থতমত অবস্থা দেখে মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 
চাচা দেখেন আমরা হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি। আমরা সরকার সাহেব ও তার মেয়ের কাছেও ক্ষমা চাইব। এটা একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। এমনটা হবে কেউ ভুলেও চিন্তা করেনি। যেচে পড়ে কে অপমানিত হতে আসবে বলুন?

-সুবিধা নেওয়ার বেলা তো গিধরদের কোনো ভুলচুক হয় না। তয় এই বেলা হইব কেন?

মাহির কথার মানে ধরতে পারল না। আফজাল মেম্বার তাদের গৃহবন্ধী করে চট করে স্থান ত্যাগ করল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp