নীল রঙের ছোট্ট বাতি। চোখে তীরের মতো চুভে চুভে মিলিয়ে যাচ্ছে। কি ভীষণ জ্বালায় আঁখিজোড়া বুজে এলো! ভুরুর এক সেন্টিমিটার নিচে গভীর ক্ষ'ত দাগ। চুইয়ে চুইয়ে র'ক্ত ঝরছিল একটু আগেও। এখন থেমেছে। জমাট বেঁধে চুলকাচ্ছে খুব। দু'চোখ ফুলে একাকার। লাল, গোলাপি, খয়েরি— কি বিশ্রী যে দেখাচ্ছে চোখদুটো! মনে হচ্ছে, মৌচাক চুরির অপরাধে মৌমাছি কামড়েছে বোধহয়। গাল দুটো কেমন চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। মার'লে বুঝি গাল চ্যাপ্টা হয়? ফুলে ফেঁটে যায় না? রজনী তো তাই জানতো। ঠোঁটজোড়াও রক্ষে পায়নি। বাম কোণে প্রচন্ড জোড়ে ঘুষি পরেছিল। উহ! কষ্টে প্রাণ যাচ্ছিল তখন। বুকে, পেটে, ও…ওখানে পর্যন্ত মেরেছে শ'য়তানগুলো। হাত-পা ছেড়ে মেঝেতে পরে থাকা রজনীর তখনো প্রাণ আছে। ফুলো ফুলো চোখের পাতা একটু একটু করে খুলতে পারছে সে, তাকাতে পারছে। বিদঘুটে নীল বাতিটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে খুব স্বল্প ভাবে নিশ্বাস টানলো-ছাড়লো রজনী। দুনিয়াটা দুলছে কেমন। আকাশ ভেঙ্গে তার মাথার উপর পরবে নাতো?
বুক কাঁপিয়ে, ঠোঁট ভেঙ্গে এত এত কান্না পেল! কিন্তু কাঁদতে পারছে না। শরীর কাঁপছে শুধু। মনে হলো, খুব দূর থেকে কেউ বলছে, “শা** বাইঁচা আছেনি দেখ। শা** ঘরে শা**! আমগো লগে এসমার্টনিস দেখাইতে আহো? পালাইতে চাও? এক্কেরে হইছে না এহন শিক্কা? ওই জামশেদ! ডাক্তার ডাক। মরলে টরলে সমস্সা। শা** লাইগা আগে থেইকা এডভান্স দিয়া রাখছে খদ্দরে। পা চালা অহনি! কই? জামশেদদদ!”
রজনী কাঁপা কাঁপা হাতে খুব আস্তে পেট স্পর্শ করলো। খুব আলতো হাতে। এই পতিতালয়ে সে এসেছে এক বছর হচ্ছে। ওইযে… ইমন রেখে গেল? সিএনজিতে এখানে আসার আগ অব্দি কত কত স্বপ্ন দেখিয়েছিল রজনীকে! তার স্বামী হবে, সংসার হবে, সুখে-শান্তিতে একটা টোনাটুনির ঘর হবে। কই? কই সংসার? কই স্বামী? কই তার ঘর? অথচ পেটে ঠিকই কার না কার বাচ্চা চলে এলো। সে জানতেই পারলো না। আচ্ছা, বাচ্চাটা কি মেয়ে হবে? যদি মেয়ে হয়? তখন? তার মতো তার মেয়েকেও কি… এত মার খাওয়ার পর মেয়েটা কি আদৌ বেঁচে আছে? রজনীর নিশ্বাস আটকে এলো। থরথর করে কাঁপতে লাগলো শরীর। সে শুনতে পেল, দূরে দাঁড়ানো ওই অ'মানুষগুলো কি যেন বলছে। কানে আসছে ঠিক, কিন্তু মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছে না। এবং তার পরপরই কানদুটোও কাজ করা বন্ধ করে দিলো। কেমন যেন ঝংকার তুলছে। এরপর… এরপর সব নিরব, শেষ, টুট……......।
সে যাত্রায় রজনী বেঁচে গেল। বেঁচে গেল পেটের সন্তানটাও। পতিতালয়ের লোকরা বলে গেছে, ভুলেও যেন আর পালানো চেষ্টা না করে। রজনী একবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমার মেয়ে হলে কি করবেন?”
ওরা উত্তর দেয়নি। বিশ্রীভাবে হেসেছে মাত্র। রজনী যা বুঝার বুঝে গেল। কতশত বার যে পেটের বাচ্চাটাকে মা'রার চেষ্টা করলো! কাঁচা পেঁপে খেলো, পেটে চাপ আসে এমন কত কি করলো! কাজ হলো না। তার এখানেরই একটা মেয়ের সাথে সখ্যতা হয়েছে। চুমকি নাম। সাহস করে তাকে দিয়ে ঔষধও আনালো। ঘড়িতে তখন রাত দুটো। বিছানায় একটা অচেনা লোক শুয়ে আছে। বিছানার একপাশে মেঝেতে বসে আছে রজনী। ময়লা ঘর। ওই নীল বাতি। রজনী বড় বড় চোখে ওই লোকের কুৎসিত মুখের দিকে চেয়ে রইলো। সে আজ ম’রে যাবে। এই ঔষধ খেয়ে। হাতে গুনে গুনে দশ-বারোটা ঘুমের ঔষধ নিয়ে বসেই রইলো রজনী। কতক্ষণ? অনেক্ষণ, অনেক্ষণ, অনেক্ষণ! ভয় লাগছে। ম'রা কি এত সহজ? রজনী একবার ভাবলো ছু’রি এনে এই লোককে আগে মা’রবে। এরপর একে একে এখানের সব খারাপ লোককে। ম’রবে যখন ভালো ভাবেই ম’রুক।
জীর্ণশীর্ণ শরীরে কোনোমতে লেপ্টে থাকা শাড়িটা কাঁধে মেললো রজনী। উঠে দাঁড়িয়ে এক পা এগোতে না এগোতেই ধপ করে বসে পরলো আবার। শরীর কাঁপলো, কপাল ঠেকলো তেলতেলে মেঝেতে। হু হু করে কাঁদলো ও। মা’রা, ম'রা কি এত সহজ? শুনেছে সহজ। তাহলে রজনী পারছে না কেন? এই কুৎসিত মানুষগুলোকে না পারুক, যে এখনো জন্মই নেয়নি তাকেও মা'রতে পারছে না রজনী। মায়া হচ্ছে। আল্লাহ! এত মায়া তুমি কেন দিলা?
সেসময় সূর্য ঘুম থেকে জেগেছে মাত্র। সূক্ষ্ণ জানালা দিয়ে কিরণের ছটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে রজনীকে। রজনী জ্বলন্ত চোখে সূর্যের আগমন দেখলো। শূণ্য মস্তিষ্কে শূণ্য শূণ্য ভাবনা তাড়া করলো। যন্ত্র'ণা দিলো। তবুও রজনী শপথ আওড়ালো, সে একদিন ঠিক পালাবে। তার বাচ্চাকে এই অ'মানুষগুলো থেকে বাঁচাবে। এবার পালালে কোনো কসরত বাকি রাখবে না সে। সব কমতি দূর করে ছুটে যাবে, যত দূর ছোটা যায়।
ন'মাসের পেট নিয়ে রজনী ঠিক পালালো। বিরাট শহরের কোনো এক বস্তিতে ঠিক জায়গা হলো। সে ভেবেছিল, তার ফুটফুটে একটা রাজকন্যা হবে। কিন্তু নাহ্, তিনটে রাজকুমার হলো এক সঙ্গে। আর কি আশ্চর্য, ওদের চেহারা হুবহু এক রকম। রজনী নাম রাখলো— তারফান, তামজীদ, তালহা।
—————
আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল তাহসিন। তার পরনে মেরুন রঙের হাফহাতা গেঞ্জি। চুল পরিপাটি থাকা সত্ত্বেও এলোমেলো লাগে। গালে হাত বুলিয়ে বুঝলো, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি বিধছে। ট্রিম করা লাগবে। জাপানিজরা গালে দাঁড়ি রাখতে চায় না। সে খুব কম পুরুষদেরই গালভর্তি দাঁড়ি দেখছে। অবশ্য ওদের দাঁড়ি উঠতেও চায় না। ছাগলের মতো কেমন একটু একটু করে গজায়। দেখতে বিচ্ছিরি লাগে। নতুন নতুন আঠারো হওয়ার পর তাহসিন বাবার কথায় মাঝে একবার দাঁড়ি রেখেছিল। তার সহপাঠীগুলো সে কি হাসি তখন! এরপর থেকে গালদুটো সবসময় ক্লিনসেভই রাখে সে। শুনেছে, বাঙালি মেয়েরা নাকি গালভর্তি দাঁড়ি খুব পছন্দ করে। এখানে যতদিন আছে, তাহসিনও রাখবে নাকি? যদি কোনো মেয়ে পটে যায়?
বিছানায় তার ছোট দুইবোন গড়াগড়ি খাচ্ছে। এখানে এসে তাদের খুব অসুবিধে হচ্ছে বৈকি! ওয়েদার সমস্যা, পানি সমস্যা, খাবারের সমস্যা, ভাষার সমস্যা! একমাত্র নিজ বাবা, মা, ভাই ছাড়া কারো সাথেই তারা কথা বলতে পারছে না। কেউ বাঙালি ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করলে ওরা ড্যাবড্যাব তাকিয়ে থাকে নতুবা ওরা জাপানিজ ভাষায় কিছু বললে অন্য সবাই ভুরু কুঁচকে চেয়ে থাকবে। কি জ্বালা!
ছোট দুইবোনের নাম কলি, মিলি। এক বছরের ছোট বড় ওরা। কলি জাপানিজ ভাষায় সুর তুলে বললো, “মেরিনের কাছে যাবো।”
তাহসিন তখনো আয়নায় নিজেকে দেখছে। চুল ঠিক করতে করতে বললো, “একদিনেই মেরিন পছন্দ হয়ে গেল?”
জবাবে মিলি বললো, “ওই মেয়েটা অনেক সুন্দর। চোখদুটো আমাদের মতো।”
তাহসিন ভুরু কুঁচকে তাকালো, “আমাদের মতো বলতে?”
“খেয়াল করোনি? আমাদের মতোই বাদামি চোখ। দেখতেও কি সুন্দর! প্রিন্সেসদের মতো।”
“হু, প্রিন্সেস!” মাথা বিজ্ঞের মতো দুলালো তাহসিন। মেরিনকে তার খেয়াল করে দেখা হয়নি। বোনদের দিকে চেয়ে বললো, “চলো তোমাদের মেরিনের কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু ও তো জাপানিজ ভাষা বুঝে না। কথা বলবে কিভাবে?”
কলি, মিলি দু’জনেই হাতের ফোন দেখিয়ে বললো, “গুগল ট্রান্সলেট করবো। এটা কোনো ব্যাপার না।”
মেরিন তখন বিবস মনে ঘরের এককোণে পরে আছে। জানালা দিয়ে একদম সরাসরি বিরাট বড় বটগাছ দেখা যায়। নানা-দাদারা বলেন, বট গাছে ‘গাগা’ থাকে। গাগা মানে ভূত, পেত্নী, পিশা’চ। এই গাছেও কি তবে গাগা থাকে?
টিউলিপ আক্তার বিরক্ত নজরে মেয়েকে দেখলেন একবার। ওর উদাসীনতা পরখ করলেন। রুষ্ট হয়ে বললেন, “তোর তারফানকে পছন্দ না কেন? কত ভদ্র একটা ছেলে!”
মেরিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “পছন্দ হওয়ার যেমন কারণ নেই, তেমনি অপছন্দ হওয়ারও কারণ নেই।”
“কেন নেই? তোর বড় চাচাকেও ছেলেটার ছবি দেখিয়ে ছিলাম। তিনিও পছন্দ করেছেন। তোর কেন পছন্দ না?”
মেরিন কপাল কুঁচকে আকাশ-পাতাল ভাবলো। ভীষণ রাগ নিয়ে বললো, “তুমি আমাকে না বলে দিন-দুনিয়ার সবাইকে ওই লোকের ছবি দেখাচ্ছ! কি জন্য? আমি বিয়ে করবো না উনাকে। আস্ত বেয়াদব লোক! আমার বিরুদ্ধে গিয়ে তুমি কি এখন আমার বিয়ে করিয়ে দেবে উনার সাথে?”
টিউলিপ আক্তার কিছুপল ভাবলেন, “সত্যি করে বল মেরিন, তোর কি কোনো পছন্দ-টছন্দ আছে?”
মেরিনের এক কথায় উত্তর, “না।”
“তাহলে? তামজিদ বা তালহার মধ্যে কাউকে পছন্দ? দেখ, তোর বড় চাচারা আপাতত বাংলাদেশে আছেন। তোর বিয়েটা খেয়ে গেল।”
মেরিন অতি আশ্চর্যে বার কয়েক পলক ফেললো। চোয়াল ঝুলে গেছে সামান্য। হতবাক নজরে চেয়ে কিছু বলতে নেবে, ওমনি! নজর পরলো দরজার ওদিকটায়। তাহসিন দু'পাশে তার দু'বোনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখে বিশাল প্রশ্নের বাহার। টিউলিপ আক্তার ওদের দেখেই বললেন, “কিছু বলবে বাবা? এখানে এলে যে?”
তাহসিন অস্পষ্ট আওয়াজে গলা পরিষ্কার করলো। ঠোঁটে ইয়া বড় হাসি এঁটে বললো, “ওরা মেরিনের কাছে আসতে চাইছিল, তাই নিয়ে এলাম।”
ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা। শুনতে ভালো লাগে? মেরিনের ভেতরটা আরও তেঁতো হয়ে গেল। বাচ্চা মেয়ে দুটো তক্ষুণি দৌঁড়ে এসে আঠার মতো জাপটে ধরলো ওকে। জাপানিজ ভাষায় কি কি বললোও যেন। মেরিন একটা শব্দও বুঝলো না। তার ক্লান্ত লাগছে। ওই তারফান নামক লোকের মুখ ঘুষি মেরে ভোঁতা করে দিতে পারলে ভালো লাগতো।
—————
টুং করে মেসেজের শব্দ আসতেই মাংস কাটা বন্ধ করলো তারফান। পাশে চুলায় গরম পানিতে পাস্তা উতরাচ্ছে। টিস্যু দিয়ে হাত মুছে ফোন হাতে নিলো সে। তামজিদের মেসেজ। তার নিচেই ড্রাফট হিসেবে পরে আছে মেরিনকে দেওয়া সেই মেসেজটা, ‘let’s Just Get Married, Meerin.’
মেসেজটা সে মেরিনকে পাঠায়নি। ইচ্ছে করেই। পাশ থেকে তালহা উঁকি দিলো মোবাইলের পর্দায়। চোখ-মুখ কুঁচকে বললো, “তুই তামজিদের মতো লুচ্চামি শুরু করলি কখন? ইছ!”
তারফান আড়চোখে তাকালো মাত্র। উত্তর দিলো না। তালহা জানতে চাইলো, “মেরিনকে ভালোবাসিস?”
“নাহ্।”
“না? সত্যি?” তালহা জানে। তবুও কোথাও না কোথাও তার এটাও মনে হয়, মেরিন তাদের একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে। এখন না হলেও পরে হয়তো হবে।
তারফানের কণ্ঠে গাম্ভীর্যের হালকা পারদ পরলো, “মেয়েটাকে রাগাতে ভালো লাগে আমার।”
“বিয়ে সত্যি করবি? মাকে জিজ্ঞেস করলাম। বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে নাকি! এখন তোর মতামত নিতে আমাকে বললো। কি বলিস? করবি বিয়ে?”
“করবো না।”
গায়ের এপ্রোন খুলে ফোনটা হাতে নিয়ে চলে গেল তারফান। এক্কেবারে ফ্ল্যাট ছেড়ে চিলেকোঠায় পা বাড়ালো। ছাদে মুক্ত বাতাস বইছে। শনশন-শনশন!
তারফানের চিলেকোঠার ছোট্ট টেবিলে গাদা গাদা বই-খাতা-ফাইলের স্তুপ। প্রতিটা ড্রয়ার ভর্তি বিভিন্ন জিনিস। আশ্চর্য ভাবে তৃতীয় নম্বর ড্রয়ারটা খালি। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে মাঝারি আকারের ড্রয়ারটার ভেতরে কেবলই মেরিন। মেরিনের চুলের ব্যান্ট, গাছের শুকিয়ে যাওয়া জুঁই, নুপুরের ভেঙ্গে যাওয়া ক্ষুদ্র ঝংকার আর ছবি! তরফান ছবিটা হাতে তুলে নিলো। কখনকার যেন? ওহ্! সেবার পিকনিকে জ্বরের ঘরে তুলেছিল। এমনিই। মেরিনকে দেখতে সুন্দর লাগছিল তাই। ভেবেছিল সে পরে ডিলিট করে দেবে। কিন্তু কিভাবে কিভাবে হাসপাতাল থেকে আসার পথে ছবিটা গ্যালারি থেকে নিয়ে প্রিন্ট করে নিয়ে এলো, ড্রয়ারে রাখলো।
তারফান ছবিটা একবার হাতের মুঠোয় মুচড়ে ফেলতে চাইলো। কিন্তু… ওটাতে মেরিন হাসছে। মেয়েটা হাসলে গালে টোল পরে। ডানদিকে। তারফানেরও তাই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………