মেঘবন - পর্ব ২০ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          ইখতিয়ার আদিল। মাথায় হাজারটা গন্ডগোল পাকানো বাড়িওয়ালার একমাত্র সুপুত্র। তার নামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। তাই বলে কি অহংকার আছে? উহু, অহংকারের বাপ থাকলে সেটাও আছে। কানায় কানায় পূর্ণ করে রেখেছেন আদিল সাহেব। আজকাল রাজনৈতিক কিসবে যেন জড়িয়েছেন। এমনিতে সে ভবঘুরে, কিন্তু অহংকার থাকলেও সারাটা দিন মাটিতেই লুটোপুটি খান। এলাকার বাচ্চাদের সঙ্গে তার বিশাল সমাবেশ। ভার্সিটির কিছু ছেলেপেলে তাকে খুবই অনুরোধ করে বলল, ‘ভাই, আপনারে একটা কথা কমু। রাখবেন, কন?’

ইখতিয়ার আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকালো। যেন প্রশ্ন করলো। ছেলেপেলে এবার আরেকটু সাহস নিয়ে বললো, ‘আমগো এলাকায় নতুন নেতা চাই। আগেরটা ক্যাস খাইয়া ভাগছে। আপনি আমগো নেতা হইবেন? আপনি অনেক বুঝান ভালো ভাই। হইবেন, কন?’

ইখতিয়ার একটু চিন্তা করে দেখলো। সত্যিই কি সে ভালো বোঝায়? ভেবে ভেবে আবিষ্কার করলো, হ্যাঁ, সে বোধহয় ভালোই বোঝায়। ভার্সিটি থাকতে ক্লাসের প্রত্যেকটা মেয়েকে সে খুব রয়েসয়ে, রসকষ মিশিয়ে একেকটা সাবজেক্টের একেকটা কঠিন প্রশ্নের উত্তর চট করে দিয়ে দিতো। মেয়েগুলোর ওপর বড্ড বেশি অবদান তার। বোধকরি তার জন্যই মেয়েগুলো ফেইল করেছে কি-না!
রাজনীতি বিষয়ে ইখতিয়ারের অল্পসল্প জ্ঞান আছে। সে তক্ষুনি রাজি হয়ে গেল। সাধারণ মানুষের সকাল যেখানে আট’টা-ন'টায়, তার সকাল হয় দুপুর দু'টোয়। কিন্তু আজকাল পার্টির কাজে সকাল সকাল উঠতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইখতিয়ারের বিরক্তির শেষ নেই। দুপুরের ভেতর কাজ শেষ করে ঘরে এসে পড়ে পড়ে ঘুমায় রাত দশটা অব্দি। তখন ঘড়িতে দশটার একটু বেশিই। আয়নায় নিজের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ইখতিয়ার। নাহ্! চেহারা তার ভালোই। কিন্তু তার বাপ তো অসুন্দর। মায়ের মতো চেহারাও হয়নি। এই সৌন্দর্য এলো কোত্থেকে? প্রশ্নটা মনে চেপে শক্ত চোয়ালে হাত বুলালো ইখতিয়ার। দাঁড়ি গজিয়েছে। ধারালো দাঁত আঙুলে বিঁধছে খুব। সেভ করতে হবে!

বসার ঘরের একপাশে সখ করে বিদেশি কারুকাজের বিশাল সোফাসেট সাজিয়েছেন সায়নউল্লাহ্। সেই সোফার একটাতে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন তিনি। ঘুমানোর আগে একটু পত্রিকা না পড়লেই নয়। নয়তো ঘুম আসে না তার। ইখতিয়ারকে টিপটপ সাহেব সেজে এই রাত্রিবেলা বের হতে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন। পত্রিকা পড়ার একফাঁকে ভীষণ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’

ইখতিয়ার শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বললো, ‘ছাদে। তারফান দেখলাম হাসপাতাল থেকে ফিরেছে।’

সায়নউল্লাহ্ এবার পত্রিকা থেকে নজর সরিয়ে সরাসরি ইখতিয়ারের দিকে তাকালেন, ‘চলাফেরা করো তো ভালো ছেলেদের সাথেই। তুমি এমন বখে গেছ কিভাবে? তারফান থেকে কিছু শিখতে পারোনা? এত এইমলেস কেন তুমি?’

‘বিয়ে করিয়ে দাও। এইমলেস থেকে পাওয়াফুল হয়ে যাবো।’

‘অসভ্য, হতচ্ছাড়া ছেলে!’

‘তোমারই আব্বু।’ কথাটা বলে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো ইখতিয়ার। গম্ভীর সায়নউল্লাহ্-র মুখ চেপে হঠাৎই টুপটাপ চুমু খেল বাম গালে। চোখ টিপে বললো, ‘স্যি ইউ পপস! হ্যাভ আ ভেরি ভেরি গুড নাইট। উম্মাহ্…’

শেষ চুমুটা দিয়ে প্রায় প্রাণ বাঁচিয়ে পালালো ইখতিয়ার। সায়নউল্লাহ্ নিশ্বাস নিতে পারলেন না কিছুক্ষণ। চোখ বড় বড় করে স্ত্রীর দিকে চেয়ে আছেন। হাঁসফাঁস গলায় উচ্চারণ করলেন, ‘তোমার ছেলেকে আমি একদিন চিবিয়ে খাবো, দিলরুবা!’

ছাদে প্রচন্ড রকমের বাতাস বইছে। শনশন আওয়াজ কানে তালা লাগানোর মতো। মেরিনের সবুজ রাজ্য যেদিকে? ঠিক সেদিকেই তারফানকে দেখতে পেল ইখতিয়ার। হাসপাতাল থেকে এসে সে আর জামা পালটায় নি, ফ্রেশ হয়নি। অবহেলায়, অনাদরে সাদা এপ্রোন আর কালো লেদারের মাঝারি ব্যাগটা ধুলো মাখো মাখো মেঝেতে পরে আছে। পরনের সাদা শার্টের হাতা কনুই অব্দি গোটাতে গোটাতে থমথমে নজরে ফুলগাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে তারফান। পরপর একহাতে মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাক চুলকাচ্ছে, লাল টকটকে হয়ে গেছে একদম। 
ইখতিয়ার দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘কি ব্যাপার! আজ গাছের এখানে কি তোর?’

‘গাছ এনেছি। গাছ কিভাবে লাগায়, জানিস কিছু?’

ইখতিয়ার হতবিহ্বল চোখে তাকালো। সে যতটুকু জানে, তারফান গাছগাছালি পছন্দ করে না। ফুল গাছ তো আরও আগে না। থতমত গলায় উত্তর দিলো, ‘জানি না। কিন্তু কেন?’

ব্ল্যাক প্যান্টের পকেট হাতিয়ে ফোন বের করলো তারফান। ইউটিউবে ঢুকতে ঢুকতে বললো, ‘এমনি।’

‘মেরিনের জন্য গাছ এনেছিস?’

ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নটা শুধাতেই ইখতিয়ার খেয়াল করলো, তারফান আপাতত ফোনে ডুবে গেছে। সদ্য নার্সারি থেকে আনা গাছ কিভাবে কি প্রোসেসিং করতে হবে তা ধাপে ধাপে মূখস্ত করে ইখতিয়ারের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো সে। ইখতিয়ার ফের প্রশ্ন করলো, ‘তোর সমস্যা হচ্ছে না? এলার্জিতে তোর নাক লাল হয়ে গেছে।’

‘হচ্ছে.. না…’ 

কথাটা আওড়াতে আওড়াতে একদফা হাঁচি দিয়ে ফেলল তারফান। নাক টেনে এদিক-ওদিক তাকালো। মেরিন মেয়েটা বড় বেখেয়ালি। বড় অগোছালো। গাছের আজগুবি সরঞ্জামগুলো বিশ্রীভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছে। মেঝেতে বসে, মাটি ঘাটাতে ঘাটাতে তারফান বললো, ‘কেন এসেছিস?’

ইখতিয়ার এবার লম্বা নিশ্বাস ফেলল। প্রচন্ড গর্ব নিয়ে বললো, ‘রাজনৈতিক যন্ত্রণায় যুক্ত হয়েছি। সামনের ইলেকশনে ইন-শাহ্-আল্লাহ্ এ এলাকার এমপি হবো।’

চট করে ইখতিয়ারের দিকে তাকালো তারফান। ইখতিয়ার দ্বিগুণ উৎসাহের সঙ্গে হাসলো, ‘হেল্প লাগলে বলিস। পাশে আছি।’

না চাইতেও মৃদু হাসির রেখায় ঠোঁটের কোণ এঁকেবেঁকে গেল যেন। তারফানের মস্তিষ্কে তখনো ইউটিউবে শোনা পুরুষ কণ্ঠের একেকটি কথা পুন:পুন করে ঝংকার তুলছে। প্রথমে গাছের জন্য মাটি তৈরি করতে হবে, নার্সারি থেকে আনা গাছ টবে ঠিকঠাক করে রাখতে হবে, এরপর পরিমাণ মতো পানি— কত কত কাজ! অথচ তারফানের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে। হাঁচি দিচ্ছে একবার, দু'বার, লাগাতার! ইখতিয়ার চিন্তিত গলায় বললো, ‘সকালে করিস। এত তাড়া কিসের?’

তারফান উত্তর দেয় না। দমকা হাওয়ায় তার চুল উড়ছে। কপাল ঢাকছে একবার, শূন্য করছে আরেকবার। মস্ত বড় আকাশের চাঁদ যেন অচিরেই হেসে উঠলো। গম্ভীর গলায় হেসে বলল, ‘শোনো তারফান ওয়াহাজ, কলঙ্ক আমারও আছে। তাই বলে কি আমার কলঙ্ক তোমার সমান? লোকে আমায় ভালোবাসে, তোমায় না।’

অথচ তারফান শুনলো, ‘মেরিন চাঁদের কলঙ্ক ভালোবাসে। কিন্তু তারফানকে না।’

—————

মেরিনের মতে, তারফান আর তামজিদকে আলাদা করার মতো কঠিন কাজ এ পৃথিবীতে দুটো নেই। জমজ মানুষের ক্ষেত্রে কি হয়? একটা না একটা অমিল থাকবেই। হয় সেটা সামান্য তিল, অথবা অন্যকিছু। এ কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণে মেরিন টের পেয়েছে, তারফান আর তামজিদের মধ্যে সেই সামান্যতম পার্থক্যটুকুও নেই। তারফানের যেমন কানের লতিতে বিরাট কালো তিল, সেদিন তামজিদের কানেও সেই একই তিল দেখেছে মেরিন। তারমধ্যে আবার নতুন করে তালহা চুলে কালার করে ঘুরছে। ভাইদের মতো তার চুলের রঙও এখন কালচে লাল। কি মুসিবত!
শব্দ করে নিশ্বাস ফেলে ছাদের ছোটখাটো বাগানের দিকে তাকালো মেরিন। তারফান বড়ো বিরক্ত ভঙিমায় গাছে পানি ঢালছে। সূর্যের তীর্যক রশ্মি বিরাট গাছ ভেদ করে একটু একটু ছুঁয়ে দিচ্ছে তারফানের চোখ, মুখ। তারফান আরও একবার বিরক্ত হলো। ঘামের কারণে কপালে ঠেসে চুল লেগে আছে। সেগুলো সরাতে গিয়ে কাঁদা-মাটি ভরালো কপালের একপাশটায়। রোষপূর্ণ গলায় ক্ষণেই বললো, ‘তুমি যেমন আজব তোমার এসব হবিও খুব আজব, মেরিন।’

‘আমি কি আপনাকে এসব করতে বলেছি? আপনি নিজেই শখ করে করছেন।’

তারফান চোখ তুলে তাকালো মাত্র। কিছু বললো না৷ রোদের কারণে সে ঠিকঠাক তাকাতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, ওইযে তার ব্যক্তিগত চিলেকোঠা? তার পাশ ঘেঁষে একটা অপ্সরীর মতো মেয়ে নরম মেদুর ছড়িয়ে বসে আছে। চারিদিকে মধুর মিষ্টি ঘ্রাণের ম ম সমাহার।
মেরিন ফের কিছু বলতে নিলো। চটপটে গলায় তড়িৎ জিজ্ঞেস করলো, ‘এই নতুন গাছগুলো তো আমার না। জবা, রজনীগন্ধা— এগুলো কোত্থেকে এলো?’

‘হু?’ 

তারফান যেন শুনলো না। কিংবা শুনতে চাইলো না। ইতোমধ্যে কপাল বিশ্রী রকম কুঁচকে চোয়াল শক্ত করে ফেলেছে সে। 

‘আপনি না আমার গাছের দায়িত্ব নিলেন? এ গাছ কার? নতুন কেউ কি ছাদে গাছ লাগাচ্ছে?’

‘জানি না।’ সামান্য গলা খাঁকিয়ে কাজে মন দিলো তারফান। মেরিন সন্দিহান গলায় শুধায়, ‘সত্যি জানেন না?’

তারফানের একবাক্যে উত্তর, ‘নাহ্।’

বলে, সে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো। রয়েসয়ে বসল মেরিনের পাশে। দূর আকাশে একটা চড়ুই পাখি শাহ্... করে উড়ে গেল। এবার আর রোদ লাগছে না। চিলেকোঠার বিস্তর দেওয়াল ছায়ার স্নেহে ঢেকে রেখেছে ওদের। 
তারফান থমথমে গলায় বললো, ‘হাত বাড়াও।’

‘জি? কেন?’ 

মেরিনের প্রশ্নাত্মক এক জোড়া চোখ। ঘন পাপড়ি পেরিয়ে পিটপিট করে তারফানের রুক্ষ, শক্ত মুখপানে স্থির হয়ে আছে। তারফান দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেললো। সিমেন্টের খসখসে মেঝের দিকে চেয়ে কিসের যেন হিসেব কষলো। লম্বা নিশ্বাস ফেলে নজর তুললো আবার। নিজেই টেনে ধরলো মেরিনের হাত। উল্টেপাল্টে হাতের ব্যান্ডেজ দেখে বললো, ‘পানি লাগিয়েছিলে হাতে, তাই না?’

মেরিন ঢোক গিলে। সামান্য হেসে বলে, ‘একদম পানি না লাগিয়ে থাকা যায়?’

‘অবাধ্য, মেরিন!’

কথার ফাঁকে ফাঁকে একটা শুভ্র ফুল মেরিনের আঙুলে আংটির মতো পরিয়ে দিলো তারফান। অনামিকা আঙুলে। রুক্ষ ভাবে একটু করে হাতও বুলিয়ে দিলো আংটির আশপাশে। মেরিন একপল হতবিহ্বল হলেও, পরমূহুর্তে নিজেকে সামলে নেয়। এই এতো দিনে সে তারফানকে একটু হলেও চিনেছে। লোকটা অদ্ভুত। কখন কি করে কিছুই ঠাওর করা যায় না। সেদিন চুমু খেল, বিয়ে করবে বলে হুট করে হাজির হয়ে তাকে চমকেও দিলো। আর এখন! এখন আংটি পরাচ্ছে! চিড়চিড় করে মাথায় কে যেন হাতুড়ি পেটা করলো তার। শুষ্ক ঠোঁট ভিঁজিয়ে মেরিন নিমিষেই তেঁতে উঠলো, ‘আপনি উন্মাদ, তারফান।’

উত্তরে অস্পষ্ট হাসে সে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশের পানে চায়। ম্লান কণ্ঠে টুকরো টুকরো করে বলে, ‘আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি মেরিন। আমি জোনাকি পোকাদের আর ভয় পাচ্ছি না। তাদের ধরতে পারছি, ছুঁচ্ছি। কিন্তু স্বপ্ন খনিকের হয়। ঘুম ভেঙে গেলে সেই একই ভয়, অন্ধকার!’ অল্প থেমে তারফান এবার মেরিনের চোখে চোখ রাখলো, ‘মেরিন, তুমি আমার কাছে একটা স্বপ্নের মতো।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp